০৮. পাথুরে চাতাল থেকে কূপের কাছে

পাথুরে চাতাল থেকে কূপের কাছে নেমে এল এরিক। পানির কিনারার পিছন দিকে, একজন শুতে পারবে এমন একটা জায়গা খুঁজে পেল। দিনের উত্তাপ চলে যাওয়ায় ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে পরিবেশ, দক্ষিণে উপসাগর থেকে ধেয়ে আসছে হালকা ঝিরঝিরে বাতাস।

বিছানায় শুয়ে, খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল ও, হাজারো তারা জ্বলজ্বল করছে; মনে মনে একটা সমাধান খুঁজে বেড়াচ্ছে এরিক। মিনিট কয়েক আকাশ-পাতাল ভাবার পর বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে শুলো, চোখ বন্ধ করার পরক্ষণে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু হঠাৎ পূর্ণ সজাগ হয়ে উঠল, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জাগিয়ে তুলেছে ওকে। অস্বাভাবিক নড়াচড়া টের পেয়েছে।

স্থির শুয়ে থাকল ও, সামান্যওঁ নড়েনি, চারপাশে আবছা অন্ধকার। কান খাড়া করল। জেগে ওঠার পর মনে হয়েছিল, একটু আগে ঘুমিয়েছে, কিন্তু তারার অবস্থান দেখে বুঝল ইতোমধ্যে কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। অপেক্ষায় থাকল, একরকম নিশ্চিত যে কারও ক্ষীণ নড়াচড়ার শব্দে ঘুম ভেঙেছে। পাথুরে চাতাল, লাভাভূমি আর রক্ষিত সীমানার প্রতিটি জায়গা খুঁটিয়ে নিরীখ করল। ফের শুনতে পেল শব্দটা, তবে এবার আগের চেয়ে কাছে।

কূপের কাছে একটা কিছু নড়ছে। আবছা একটা অবয়ব উঠে দাঁড়াল, মুহূর্ত কয়েক স্থির দাঁড়িয়ে থাকল। বিশাল কাঠামো, এমনকী বিশালদেহী জেফ কেলারের চেয়েও…বিগ জুলিয়া!

এমন নয় যে কূপের কাছে যাওয়ার কোন কারণ থাকতে পারে না মহিলার, কিংবা একই জায়গায় থাকার কথাও নয়; কিন্তু জুলিয়ার চলাফেরার মধ্যে এমন অস্বাভাবিকতা আছে যে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল এরিক। ভারী, স্যাডল ব্যাগ দুটো হাতে রয়েছে জুলিয়ার, পায়ে নিশ্চই মোকাসিন-শব্দ হচ্ছে না বললেই চলে। চুপিসারে, ইন্ডিয়ানদের মত ভূতুড়ে কায়দায় ওকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল, কূপের দক্ষিণে লাভার চাঙড়ের অন্ধকারে হারিয়ে গেল, সারাক্ষণই ধাতব পদার্থের সঙ্গে ধাতবের সংঘর্ষের হালকা ঝনঝন শব্দ হচ্ছে।

অনুসরণ করবে বলে উঠতে উদ্যত হয়েছিল এরিক, কিন্তু দ্বিধা করল। জুলিয়া যাই করুক, চায় না সেটা দেখে ফেলুক কেউ। কাজটা যাই হোক, সম্ভবত ওর কাছে তার কোন গুরুত্ব নেই…নাকি আছে?

জুলিয়া যখন ফিরে এল, তখনও উদ্বিগ্ন এরিক। দেখল স্যাডল ব্যাগ দুটো নেই মহিলার হাতে।

মেয়ে তো বটেই, এমনকী গড়পড়তা পুরুষদের চেয়েও যথেষ্ট শক্তিশালী জুলিয়া। স্যাডল ব্যাগ দুটো ওর জন্যও ভারী ছিল। প্রথম যখন এসেছিল, ঘোড়া ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ দুটো তুলে নিয়েছিল, অন্য কেউ নাড়াচাড়া করার সুযোগ যাতে না পায়; আর এখন…গোপনে ব্যাগ দুটো লুকিয়ে রেখেছে কোথাও। অস্বাভাবিক তো বটেই, রীতিমত কৌতূহল বোধ করার মত…

আসলে কে এই বিগ জুলিয়া? সত্যি টুকসন থেকে এসেছে? সেক্ষেত্রে ঘোড়া দুটো এত তরতাজা থাকে কী করে? যদি অন্য কোথাও থেকে এসে থাকে, এত কম সময়ে টুকসনে গেল কী করে যেখানে মেলানির খোঁজে আসা জিম রিওসের সঙ্গে দেখা হয়েছে?

এটা ওর ব্যাপার নয়, নিজেকে বোঝালেও ভারী ব্যাগের কথা মনে পড়ল এরিকের…এত ভারী কী হতে পারে? একমাত্র সোনারই এত ওজন। মূল্যবান কিছু না হলেই বা লুকিয়ে রাখরে কেন? এরিক ছাড়া অন্য কেউ কি দেখেছে ঘটনাটা?

অনেকক্ষণ জেগে থাকার পর একসময় ঢুলতে শুরু করল কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও জানে না, পরে যখন চোখ মেলে তাকাল, ধূসর ফ্যাকাসে আকাশ চোখে পড়ল। ঝটিতি বিছানা ছাড়ল ও, বোর্ডরোল গুটিয়ে রেখে নীচে কূপের কাছে চলে এল। হাত-মুখ ধুয়ে রুমাল দিয়ে মুছল। আঙুল চালিয়ে মাথার চুল আঁচড়ে কালো হ্যাট চাপাল মাথায়।

পাহারায় থাকা এড মিচেল এগিয়ে এল ওর দিকে। সব শান্ত, জানাল সে। দেয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে সিগারেট ধরাল সে, চোখের কোণ দিয়ে দেখল এরিককে। উপসাগর কত দূরে, জানো? জানতে চাইছি, ওখানে যাওয়া সম্ভব?

তিনদিন লাগবে, বেশিও লাগতে পারে। পৌঁছতে হলে ভাল একটা ঘোড়া, প্রচুর পানি আর শয়তানের ভাগ্য দরকার হবে। এখান থেকে দক্ষিণে এক ফোঁটাও পানি পাবে না, সেরি ইন্ডিয়ান ছাড়া কোন মানুষ থাকে না ওদিকে।

এটাই হয়তো বেরিয়ে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা।

অসম্ভব! কার কাছ থেকে ধারণাটা পেয়েছে মিচেল, মনে মনে ভাবছে এরিক। প্রচুর পানি লাগবে, অথচ একজন লোকের কাছে ক্যান্টিন থাকে একটা, বড়জোর দুটো। ওই পানিতে এতদূর যাওয়া সম্ভব হবে না। তা ছাড়া, ওখানে পৌঁছেই বা কী করবে?

বোটে যদি চড়তে পারি…।

সম্ভাবনা কম। খুব কম বোটই এতদূর আসে, আর কোনটাই তীরে ভিড়ে না। উঁহু, এড, অন্য কিছু ভাবো

ওর ব্যাখ্যায় নিরস্ত হয়েছে বলে মনে হলো না, পিছন থেকে মিচেলকে চলে যেতে দেখল এরিক। উপসাগরের দিকে যাওয়া চরম বোকামি হবে, যেখানে যথেষ্ট ঘোড়া বা পানি নেই সঙ্গে যাবেও বা কীসের আশায়? কোন আশ্রয় রা বাহন সেখানে থাকলে তো? তা ছাড়া, পুরো পথে আছে লাভার চাঙড় আর পাথুরে জমি; কোথাও এক ফোঁটা পানি নেই, নেই লোকালয়, এমনকী ধ্বংস হয়ে যাওয়া কোন বাথানও পাওয়া যাবে না। পিনাকেটের চারধারে এরচেয়ে দুস্তর ও নির্জন এলাকা আর নেই। কিন্তু কারও কাছ থেকে ধারণাটা পেয়েছে মিচেল, সত্য-মিথ্যে বলে তাকে প্ররোচিত করেছে কেউ।

বাঁচার একটাই পথ-ইয়োমার দিকে যেতে হবে। অন্য কোন পথে চেষ্টা করা পণ্ডশ্রম হবে। দক্ষিণে মরুভূমিকে স্রেফ মৃত্যুফাঁদ বলা চলে। বাঁচতে হলে এখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, সম্ভব হলে ইন্ডিয়ানদের ক্যাম্পের অবস্থান জানতে হবে। ক্যাম্পের অবস্থান জানা হয়ে গেলে পাল্টা আক্রমণ করতে পারবে ওরা, উচিত একটা শিক্ষা দিতে পারলে হয়তো ওদের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে অ্যাপাচিরা। মাঝখানের সময়টুকু, এখানেই মোটামুটি নিরাপদ ওরা।

এমন নয় যে ইন্ডিয়ানরাই ওদের একমাত্র বা সবচেয়ে বড় শত্রু, বরং নিজেদের মধ্যকার, বিদ্বেষ, ঈর্ষা বা প্রতিহিংসা এবং উদ্বিগ্ন অপেক্ষাই ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়াতে পারে। জানে হামলা করবে ইন্ডিয়ানরা, প্রতিটি মুহূর্ত তটস্থ থাকছে, অথচ আক্রমণ আসছে না-দুঃসহ এই উদ্বেগ বা স্নায়ুর চাপ কাটিয়ে ওঠা মুশকিল বটে।

*

পাহাড়ী চাতালে উঠে এল এরিক ক্ৰেবেট। চারপাশ বড় নীরব, মরুভূমিতে কিছুই নড়ছে না। চরম এই বিপদের মধ্যেও-অবরুদ্ধ অবস্থায়, যখন যে-কোন মুহূর্তে নৃশংস ইন্ডিয়ানরা হামলে পড়বে ওদের উপর, চারপাশে প্রতিটি পাথর বা ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে অ্যাপাচিরা-সকালের মরুভূমির সৌন্দর্য অভিভূত করছে। এরিককে। মরুভূমির স্থবিরতা, সীমাহীন বিস্তৃতি, দূরে চিরুনির মত খাজকাটা পর্বতসারি, নিঃসঙ্গ শৃঙ্গ এবং সর্বোপরি সুনীল খোলা আকাশ…অপূর্ব লাগছে দেখতে।

কোথাও কিছু নড়ছে না, এমনকী গিরগিটিও নয়। মরুভূমির এই শান্ত চেহারা আসলে সতর্কসঙ্কেত, নৈঃশব্দ্য মানে অনাগত আক্রমণের আগমনবার্তা! টুকসনের পুবে বা ধারে-কাছে থাকলে হয়তো সাহায্য পেত ওরা, কিন্তু এখানে নিজেদের চেষ্টায় যা কিছু করতে হবে। ভবিষ্যতে বা ভাগ্যে যাই থাকুক, সেটা নিজেদেরই নির্ধারণ করতে

হঠাৎ গতরাতে বিগ জুলিয়ার রহস্যময় তৎপরতার কথা মনে পড়ল।

চোখের কোণে ক্ষীণ নড়াচড়া ধরা পড়ল, চট করে রাইফেলটা একটু উপরে সুবিধাজনক পজিশনে নিয়ে এল এরিক, সতর্ক এবং প্রস্তুত।

কিছুই ঘটল না।

কিন্তু এরিক নিশ্চিত, ঝোঁপের পিছনে একটা কিছু আছে। জীবন্ত কিছু

সোনাগুলো-যদি সত্যি সোনা হয়ে থাকে-কোথায় লুকিয়েছে জুলিয়া? কাজটা করতে বেশিক্ষণ লাগেনি, মিনিট কয়েকের মধ্যে সেরে ফেলেছে; তারমানে বেশি দূরে যায়নি, যেহেতু ইন্ডিয়ানদের হাতে ধরা পড়ার কিংবা হারিয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। আশপাশে গুপ্ত জায়গার অভাব নেই লাভার চাঙড আর বোল্ডারের ফাঁকে ফাঁকে অসংখ্য জায়গা রয়েছে যেখানে লুকিয়ে রাখতে পারে স্যাডল ব্যাগ দুটো-গর্ত, ফাটল, ধসে পড়া পাথর…। ব্যাগ দুটো সম্ভবত মাটি বা পাথরচাপা দেয়নি, কারণ এ-ধরনের কোন শব্দ কানে আসেনি ওর। বেশি দূরে যেহেতু যায়নি, পাথর চাপা দিলে পাথর গড়ানোর শব্দ নির্ঘাত শুনতে পেত। সেক্ষেত্রে, নিশ্চই কোন গর্ত বা ফাটলে নামিয়ে রেখেছে।

কফির জন্য আগুন ধরিয়েছে কেউ, ধোঁয়া উঠছে। মরুভূমি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ক্যাম্পের দিকে তাকাল এরিক, বিস্ময়ের সঙ্গে দেখল মিমি রজার্স নয়, বরং মেলানি রিওস পানি চড়িয়েছে।

বগলে রাইফেল চেপে ধরে আগুনের দিকে যাচ্ছে জেফ কেলার, একপাশে চুল ঝাড়ছে জুলিয়া। মুহূর্তের জন্য মহিলাকে খুঁটিয়ে দেখল এরিক, বোঝার চেষ্টা করল; শেষে সিদ্ধান্তে উপনীত হলো-বিপজ্জনক মহিলা; পুরুষদের মতই শক্তিশালী, কঠিন পাত্র।

সামনের মরু প্রান্তর খুঁটিয়ে দেখল এরিক। যথেষ্ট আড়াল আছে, চাইলে হামলার আগে একত্রিত হতে পারবে অ্যাপাচিরা। ঠিক ওখানেই একটু আগে নড়াচড়া চোখে পড়েছে ওর। অবচেতন মনের তাড়নায় হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল ও, সামনে দেখতে পেল ড্যান কোয়ানকে। চারটা আঙুল তুলে দেখাল তাকে।

সামান্য ইতস্তত করল ড্যান, পরে বুঝতে পারল কী চাইছে এরিক; কেলার, ডেভিস, ডাফি আর হার্শকে পাঠিয়ে দিল। পাথুরে ঢাল ধরে দ্রুত উপরে উঠে এল চারজন! বিপজ্জনক জায়গাটাকে সামনে রেখে বিভিন্ন জায়গায় তাদের বসিয়ে দিল এরিক, যার যার অস্ত্র নিয়ে অপেক্ষায় থাকল সবাই।

ক্যাম্পে আকস্মিক তৎপরতায় আধো-ঘুম থেকে জেগে গেল এড মিচেল, রাইফেল তুলে নিয়ে যোগ দিল ওদের সঙ্গে। পাথর আর ঝোঁপের আড়ালে অপেক্ষায় থাকল, ওরা। মিনিটের পর মিনিট কেটে গেল, কিন্তু কিছুই ঘটছে না; সকাল এখনও শীতল, স্বস্তিদায়ক। মরুভূমিতে কোন নড়াচড়া নেই। কিছুই নড়ছে না, এমনকী ধূলিও উড়ছে না। একেবারে শান্ত।

ঝাড়া বিশ মিনিট কেটে গেল। এরিকের সামনের পাথরটাকে ঘিরে চক্কর মারছে একটা মাছি। একই অবস্থানে থাকায় আড়ষ্ট হয়ে গেছে ওর পেশি।

আধ-ঘণ্টা পর অধৈর্য হয়ে উঠল ওরা। পঞ্চাশ ফুট দূরে এক ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে এল একটা পাখি, ডানা ঝাঁপটাল ক্যাম্পে আগুনে যোগ করার জন্য শুকনো ডাল ভাঙল কেউ, নিস্তরঙ্গ সকালে তীক্ষ্ণ শোনাল শব্দটা। নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে মেলানি আর জুলিয়া, পাথুরে চাতালের উপরে অপেক্ষমাণ পুরুষরা কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।

নিঃশব্দে গলা পরিষ্কার করল এরিক, লম্বা শ্বাস নিল। পকেট থেকে তামাক বের করছে কেলার। সূর্য উঠছে, পশ্চিমের পাহাড়ের চূড়ায় হলুদ আর গোলাপি ছোপ লেগেছে। হাই তুলে একটু পাশে সরে গেল ড্যান। আচমকা থমকে গেল পাখিটা, এক লাফে শূন্যে উঠল, তারপর দ্রুত সটকে পড়ল ঝোঁপের আড়ালে। পরপরই ঝড়ের বেগে এল অ্যাপাচিরা।

বালি বা ঝোঁপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ওরা, অথচ একটু আগেও দেখে মনে হয়েছে ওখানে কিছু নেই; লাভার চাঙড়ের প্রান্ত থেকে বড়জোর ত্রিশ গজ দূরে। ভেবেছিল একজন পাহারায় থাকবে, বড়জোর দু’জন; কিন্তু ছয় রাইফেলের তোপের মুখে এসে পড়ল। চুরুতিকে দেখেই গুলি করল এরিক ক্ৰেবেট, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পিছনের এক অ্যাপাচির শরীরে বিদ্ধ হলো গুলিটা। পরমুহূর্তে চাতালে উঠে এল ছুটন্ত ইন্ডিয়ানরা। লড়াইটা পৌঁছে গেল হাতাহাতির পর্যায়ে, সমানে সমান।

এরিকের গুলির পরপরই চাতালে পা রাখল এক অ্যাপাচি। খপ করে ওর রাইফেলের ব্যারেল চেপে ধরল সে, কষে তার কুঁচকিতে লাথি হাকাল এরিক। ভারসাম্য হারাতে রাইফেল ছেড়ে দিল সে। রাইফেল ঘুরিয়ে গায়ের জোরে অ্যাপাচির মাথার উপর নামিয়ে আনল এরিক। পরিণতিতে কী হয়েছে দেখার সুযোগ হলো না, চোখের কোণ দিয়ে, আরেকজনকে দেখতে পেয়ে ঝটিতি গুলি করল, দেখল হাঁটু মুড়ে পড়ে যাচ্ছে অ্যাপাচিটা।

পরপরই উধাও হয়ে গেল ইন্ডিয়ানরা, মিনিট দুয়েক আগে যেমন ছিল, তেমনি শান্ত ও নির্জন হয়ে গেল মরুভূমি। দু’এক জায়গায় রক্ত পড়ে আছে। আহত বা নিহতদের টেনে নিয়ে গেছে সঙ্গীরা।

একজনও নেই…এমনকী এরিক যার মাথায় রাইফেলের ব্যারেল চালিয়েছিল, সেও নেই। কোনভাবে গড়িয়ে সরে গেছে, তারপর বোল্ডার বা পাথরের আড়ালে চলে গেছে। ইন্ডিয়ান হামলার চিহ্ন নেই কোথাও, কেবল কয়েক জায়গায় বালিতে পড়া রক্ত, গানপাউডারের কটু গন্ধ এবং টম হার্শের বুকে একটা তীর সেই সাক্ষ্য দিচ্ছে।

নিথর পড়ে আছে হার্শ। বোল্ডারের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে বসেকজি ব্যান্ডেজ করছে ড্যান, গুলি আঁচড় কেটেছে।

ক’টাকে সাবাড় করেছি আমরা? চিন্তিত স্বরে জানতে চাইল টেরিল ডাফি।

দুই বা তিনজন, জবাবে বলল এরিক। আর তিন-চারজন আহত হয়েছে।

কীভাবে বুঝলে যে ওরা আসছে? বিস্ময়ের সুরে জিজ্ঞেস করল ড্যান

অনুমান। একটা ঝোঁপ নড়তে দেখে মনে হলো মোক্ষম সময় এসে গেছে।

এবার? বেন ডেভিসের প্রশ্ন, বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল হার্শের দিকে। আহত সৈনিককে আগুনের কাছে বয়ে নিয়ে গেল জেফ কেলার।

অপেক্ষা করব, ঘোড়ার উপর নজর রাখব। এবার ঘোড়ার জন্য চেষ্টা চালাবে ওরা।

নিজের বেডরোলে চলে গেছে মিচেল। মরুভূমি শান্ত, স্থবির। মাংস আর কফি নিয়ে চাতালে উঠে এল মেলানি, গোগ্রাসে গিলল এরিক

ব্যান্ডেজ বাঁধা শেষ করে মেলানির দেওয়া কফিতে চুমুক দিল ড্যান। ডেভিস আর ডাফি অপেক্ষা করছে।

সত্যি কি সম্ভাবনা আছে আমাদের? জানতে চাইল মেলানি।

আমার মতে আধাআধি, যদি গাঁট হয়ে বসে থাকতে পারি এখানে।

ওরা এখানে চলে আসবে না তো?

একটা মিনিট যদি অসতর্ক থাকি, দেখবে ঠিক ঠিক চলে এসেছে।

উঠে দাঁড়াল ডাফি। নীচে ঘোড়ার কাছে যাচ্ছি আমি।

নীচ থেকে উঠে এল কেলার। বিশাল শরীর হলেও, চলাফেরা যথেষ্ট স্বচ্ছন্দ, বাড়তি আয়াস খরচ করতে হয় না। গোড়ালির উপর বসে পাইপে তামাক ঠাসল সে। ঘন দাড়ির কারণে কালচে দেখাচ্ছে। দুই চোয়াল। রক্তক্ষরণ থামছে না, জানাল সে। আমার মনে হয় এ যাত্রা টিকবে না হার্শ।

বিগ জুলিয়া ওর শুশ্রূষা করছে, বলল ড্যান।

হ্যাঁ, দেয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে কষে পাইপে টান দিল কেলার। ওর স্যাডল ব্যাগ দুটো দেখেছ? মনে হলো খুব ভারী।

বিশালদেহী সৈনিকের দিকে তাকাল ডেভিস। নিজের চরকায় তেল দাও।

দিতেই তো চাই, কিন্তু ব্যাগ দুটো দেখে কৌতূহল হচ্ছে। সোনা আছে বোধহয়, নইলে এত ভারী হবে কেন?

কেউ কিছু বলল না। মরুভূমিতে ব্যস্ত এরিক ক্রেবেটের দুই চোখ। আর কেউ না হলেও ঠিকই খেয়াল করেছে কেলার, ভাবছে এরিক, নির্ঘাত ঝামেলা করবে সে। যা স্বভাব, সেনাবাহিনীতে আছে বলে প্রভাব খাটাবে কেলার, চাই কি সোনা নিয়ে পগার পার হয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করতে পারে।

করালের ওদিকে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ হলো, তারপর কয়েক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল। সবশেষে, পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা টনি চিড়লের বন্দুক গর্জে উঠল।

সূর্য প্রায় মাথার উপর উঠে গেছে। দারুণ গরম পড়বে। এরইমধ্যে পিঠ তাতাচ্ছে। ক্রল করে ওদের পাশে চলে এল মার্ক ডুগান। পানির লেভেল প্রায় দুই ইঞ্চি নেমে গেছে, বলল সে। কেউ বোধহয় এ-নিয়ে আমল দেয়নি। আমরা খাচ্ছি, ঘোড়াও কম নয়। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খরচ করে ফেলেছি। আজীবন তো থাকবে না কূপের পানি।

কেউ ভাবেনি তা নয়, এরিক ভেবেছে। তিনটা কূপই তলার দিকে সরু। নীচের কূপে পানি এমনিতে কম ছিল, ওটা থেকে ঘোড়াগুলোকে খাইয়েছে; অন্য দুটোয় পানি থাকলেও দলটা বেশ বড় ওদের, যোগানের সঙ্গে খরচের কথা চিন্তা করলে দুশ্চিন্তা হতে বাধ্য। এভাবে খরচ করলে শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে।

এভাবে অবরুদ্ধ অবস্থায় কতদিন টিকতে পারবে? দু’দিন, তিনদিন? উঁহু, বেশিদিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে না অ্যাপাচিদের। এদের সম্পর্কে জানে বলে সেই চেষ্টা করার ইচ্ছে নেই এরিকের। কিন্তু বিকল্প কোন উপায়ও নেই। বিশাল মাথাটাকে খাটাচ্ছে কেলার, ডুগান সারাক্ষণই গম্ভীর হয়ে আছে আর বুড়ো নেকড়ের মত সতর্ক চোখে ডুগানকে নজরে রাখছে এড মিচেল। যে-কোন সময়ে গাড়া বেধে যেতে পারে। মেয়েদের ব্যাপারেও নিশ্চিন্ত নেই এরিক, বিগ জুলিয়া অস্বস্তি ধরিয়ে দিয়েছে ওর মনে, কারণটা নিজেও জানে না।

মাথার উপর উঠে এসেছে সূর্য। দাবদাহে খাক হয়ে যাওয়ার যোগাড়। কপাল থেকে ঘাম মোছার সময় বিড়বিড় করে উত্তাপ, ধূলি আর নিজের ভাগ্যকে অভিসম্পাত করল এরিক; মনে মনে ভাবছে; যাই ঘটুক এদের কাছে ওর হতাশা প্রকাশ করা যাবে না। বরাবরের মত আত্মবিশ্বাসী থাকতে হবে।

নচ্ছারগুলো আবার হামলা করলেই ভাল হত, অধৈর্য স্বরে বলল বেন ডেভিস। এভাবে অপেক্ষা করতে ভাল লাগছে না!

সাবেক কর্নেলের দিকে তাকাল এরিক। আভিজাত্য হারিয়ে গেছে। ক্ষৌরিহীন অবস্থায় লোকটাকে তুলনামূলক দুর্বল এবং বিরক্তিকর মনে হচ্ছে। ডেভিসের দামী ঝলমলে পোশাকের দশা এ-মুহূর্তে ওরগুলোর চেয়েও করুণ; সব মিলিয়ে জড়সড়, পরাজিত একজন মানুষ মনে হচ্ছে

দূরে, মরুভূমিতে নাচছে তাপতরঙ্গ। অসীম ধৈর্য নিয়ে মাথার উপর চক্কর কাটছে একটা শকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *