০৮. ধরণীর চিৎকার

ধরণীর চিৎকার

ম্যালোনের মুখে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের কথা অনেক শুনেছি, কিন্তু কখনও দেখিনি তাকে। আর তার সঙ্গে কাজ করতে হবে, এটা তো স্বপ্নেও ভাবিনি কোনদিন। অপ্রত্যাশিভাবে চিঠিটা পেয়ে তাই খুবই অবাক হলাম। লিখেছেন:

১৪, এনমোর গার্ডেন্স,
কেনসিংটন।

স্যার,

কূপ খননে একজন বিশেষজ্ঞ দরকার আমার। সত্যি কথাটা স্বীকার করছি, বিশেষজ্ঞদের সম্পর্কে আমার ধারণা ভাল নয়। কাউকেই কোন ব্যাপারে বিশ্বাস করতে পারি না। কোন কাজে জ্ঞান আহরণ করতে হলে মগজ থাকা চাই। ব্যাপারটা আরও খোলাসা করে বলি। নিজের মস্তিষ্কের ক্ষমতা এতই বেশি আমার যে, কম ক্ষমতাবান মানুষের ওপর আর ভরসা করতে পারি না।

যাই হোক, আপনার সম্পর্কে মোটামুটি ভাল ধারণা পেয়েছি আপনার বন্ধু ম্যালোনের কাছে। আপনাকে আমার একটা কাজ করার সুযোগ দিতে চাই। সুতরাং আপনার সঙ্গে দেখা হওয়া প্রয়োজন। আমার কাজের ধরনটা খুবই উঁচুদরের। যদি বুঝি কাজের লোক আপনি, তাহলে কাজটা পাবেন।

কি কাজ, চিঠিতে বলা যাবে না। ব্যাপারটা অত্যন্ত গোপনীয়। আগামী শুক্রবার সকাল সাড়ে দশটায় আমার সঙ্গে দেখা করুন। অন্য কোথাও কোন প্রোগ্রাম থাকলে এখুনি বাতিল করুন। লাঞ্চটা আমার এখানে সারবেন সেদিন। মিসেস চ্যালে ভার কাউকে না খাইয়ে ছাড়েন না।

জর্জ এডোয়ার্ড চ্যালেঞ্জার

ক্লার্ককে ডেকে চিঠির জবাব দিতে বলে দিলাম। সামান্য ভুল করে বসল ক্লার্ক। লিখল, স্যার, আপনার তারিখবিহীন চিঠিটা পেয়েছি। নির্দিষ্ট দিনে মিস্টার পিয়ারলেস জোনস আপনার ওখানে হাজির হবেন…

ওই তারিখবিহীন শব্দটাই ধরে বসলেন চ্যালেঞ্জার : শুক্রবারের আগেই তাঁর আরেকটা চিঠি এসে হাজির। লিখেছেন:

চিঠিতে তারিখ না দেয়ার তুচ্ছ ব্যাপারটা নিয়ে আপনি মন্তব্য করেছেনবুঝতে পারছি, ঘটে ঘিলুর কিছুটা অভাব আছে আপনার। নইলে অতি সহজেই তারিখটা জেনে নিতে পারতেন।

অমার তারিখ দেবার দরকারটা কি? প্রচুর পয়সা দিয়ে ডাকটিকেট কিনতে হয়। তার বিনিময়ে চিঠি ডেলিভারি দেবার আগে খামের ওপর একটা গোল সিল মারে সরকারের লোক। তারিখ যদি এতই প্রয়োজন, ওখান থেকে বের করে নিতে পারতেন। আর যদি সিল অস্পষ্ট হয়ে থাকে, তারিখ বোঝা না যায়, তো সঙ্গে সঙ্গে পোল্ট অফিসে খেঁজ নেয়া উচিত ছিল। ওব্যাটারা আমাদের কষ্টে উপার্জিত টাকায় দেয়া ট্যাক্স থেকে বেতন নিয়ে থাকে। ঠিকমত কাজ করবে না কেন?

যা হোক, আপনাকে যে ব্যাপারে ডাকা হয়েছে কথা বলবেন শুধু সেই ব্যাপারে। আমার চিঠি সম্পর্কে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

বদ্ধ উন্মাদের পাল্লায় পড়লাম মনে হলো। তার কাজে নিজেকে জড়ানোর আগে ম্যালোনের সঙ্গে একটু আলাপ করে নেয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম। নইলে শেষে কোন বিপদে গিয়ে পড়ি কে জানে!

শুনে তো হেসে গড়িয়ে পড়ল ম্যালোন। এই ব্যাপার। চিঠিতে গালাগাল করেছে তো শুধু। বাড়ি এসে যে ধরে পেটায়নি, বেঁচেছিস। গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধাতে চ্যালেঞ্জারের জুড়ি নেই।

কেউ কিছু বলে না?

বলে না মানে? তার বিরুদ্ধে মামলা-মোকমার লিস্ট দেখলে মাথা ঘুরে যাবে তোর। লোকে দুচোখে দেখতে পারে না তাকে। বেশির ভাগ মারামারির মামলা। মামলা করতে চ্যালেঞ্জারেরও জুড়ি নেই। কে কোন পত্রিকায় তার সম্পর্কে একটা সমালোচনা করে কথা বলল কি দেবে মামলা ঠুকে।

মানুষকে সত্যি মারে? তো আর বললাম কি এতক্ষণ? ভাবিসনে তোকে ছেড়ে দেবে। কাউকে ছাড়ে। কথা বলতে খুব সাবধান! খেপে গেলে আর রক্ষা নেই। আমাকেও রেহাই দেয়নি! ভদ্র পোশাক পরা এক আধুনিক গুহামানব। জন্মটা একটু দেরিতে হয়ে গেছে, এই যা। নিওলিথিক বা কাছাকাছি কোন যুগের অতিবুদ্ধিমান বর্বর বলা চলে তাকে।

বর্বরের অমন ব্রেন…

সত্যি আশ্চর্য! ইউরোপে, বলতে গেলে পৃথিবীতেই এ যুগে এমন ব্রেন আরেকটা আছে কিনা সন্দেহ। ওই ব্রেনের কাছে কোন স্বপ্নই স্বপ্ন নয়। অবাস্তবকে বাস্তব করে তোলে। একবার যদি কোন কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তো তাকে ঠেকানোর সাধ্য কারও নেই।

নাহ, থাক, বাদই দিই। এ লোকের সঙ্গে কাজ করা যাবে না বুঝতে পারছি। অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করে দেব।

সেটা তোর ইচ্ছে। তবে যদি মানিয়ে নিতে পারিস…দেখবি তাঁর মত ভাল লোক পৃথিবীতে নেই।

একসঙ্গে একজন মানুষ খারাপ এবং ভাল হয় কি করে?

সেটা চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে পরিচিত হলেই বুঝবি। আসলে চ্যালেঞ্জারকে ভয় করার তেমন কোন কারণ নেই, বিশেষ করে তুই যখন খবরের কাগজে কাজ করিস না। স্বভাবটা পাগলাটে, কিন্তু মনটা বড় নরম। লোকের বিপদে নিজের জীবন তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করেন না। গুটি বসন্তে আক্রান্ত এক ইন্ডিয়ান শিশুকে কোলে করে একবার ভয়ঙ্কর মদিরা নদীর ধার দিয়ে একশো মাইল পথ হেঁটে এসেছিলেন। যদি তার মন জয় করতে পারিস, আখেরে কাজ দেবে। ত্যাড়ামি করলেই মরবি। মেরে হাড় গুড়ো করবে।

থাক, ভাল হওয়ারও দরকার নেই, মার খাবারও দরকার নেই। যাবই না।

পাবি কিন্তু তাহলে। হেংগিস্ট ডাউন রহস্য সম্পর্কে কিছু শুনেছিস? ওই যে দক্ষিণ উপকূলে মাটির গভীরে লোহার পাইপ পোতা হচ্ছে?

শুনেছি। গোপনে কয়লাখনি আবিষ্কারের কাজ চলছে।

ওসব গুজব। আসল কথাটা ও জানিস না। বুড়োর সব খবর রাখি আমি, আমাকে সবই বলেন। তাকে কথা দিয়েছি, কাউকে বলব না। তাই তোকেও বলা যাবে না। যদি যাস, চ্যালেঞ্জারই তোকে বলবে সব। এমনিতেই তিনি মস্ত ধনী। তার ওপর অনেক বিজ্ঞান-পাগল মানুষ বিজ্ঞান-সাধনার জন্যে প্রচুর দান করে। এই তো সেদিন এক ভদ্রলোক মিস্টার বেটারটন, বিশাল সম্পত্তি দান করেছেন চ্যালেঞ্জারকে। ভদ্রলোক রবার ব্যবসায়ী। সম্পত্তিটার দাম এই বাজারে কয়েক কোটি পাউন্ডের কম না। ওটা বিক্রি করে দিয়েছেন চ্যালের। সাসেক্সের হেংগিস্ট ডাউনে বিশাল এক পতিত জমি কিনেছেন। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে নিয়েছেন। জমির মাঝামাঝি একটা গভীর খাদ আছে। বৃষ্টির পানিতে খড়িমাটি ধুয়ে চলে গিয়ে এই খাদের সৃষ্টি হয়েছে। ওখানে মাটি খোঁড়া শুরু করেছেন তিনি। বাইরের কোন লোকৰ্কে ধারেকাছে ঘেঁষতে দেন না। শ্রমিকদের মোটা মাইনে দেন। অনেক টাকা বেতনে পাহারাদার রেখেছেন। ফলে কেউ, ভেতরের কথা ফাঁস করে না।

আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি হাসল ম্যালোন, মাঝের ওই খাদ ঘিরে দেয়া হয়েছে ডবল তারের বেড়া। তারওপর ডজনখানেক ভয়ঙ্কর ব্লাডহাউন্ড ছেড়ে · দেয়া হয়েছে ভেতরে। চুরি করে ঢোকার সাধ্য নেই কারও বাপেরও। প্রচণ্ড কৌতূহলে ফেটে মরছে পত্রিকাওয়ালারা। রাতের বেলা কাঁটাতারের প্রথম বেড়াটা ডিঙিয়েছিল দুএকজন রিপোটার কি খাদের মধ্যে আর ঢুকতে পারেনি। কুকুরের তাড়া খেয়ে কোনমতে পালিয়ে বেঁচেছে। বিশাল কাজে হাত দিয়েছেন এবার চ্যালেঞ্জার। কাজের দায়িত্ব নিয়েছে স্যার টমাস মর্ডেন কোম্পানি। তারাও মুখ খুলছে না। কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন চ্যালেঞ্জার। মোটা টাকা পাবি কাজটা করলে। করবি না কেন?

করব না, ম্যালোনকে বলে দিলেও শেষ পর্যন্ত কৌতূহল দাবিয়ে রাখতে পারলাম না। শুক্রবার সকালে রওনা দিলাম চ্যালেঞ্জারের বাড়ির উদ্দেশে। সময়ের ব্যাপারে হুঁশিয়ার ছিলাম, তাই দেরি তো হলোই না বরং নির্দিষ্ট সময়ের বিশ মিনিট আগে পৌঁছুলাম। গেটের কাছে আনকোরা নতুন একটা রোলস রয়েস দাঁড়িয়ে আছে। দরজায় রূপার তীর আঁকা। গাড়িটা আমার চেনা। মালিক জ্যাক ডেভনশায়ার। মর্ডেন কোম্পানির ছোট সাহেব।

গেটের ভেতর ঢুকব কিনা ভাবছি, এমন সময় ভেতর থেকে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে এলেন ডেভনশায়ার। তারস্বরে চেচাচ্ছেন, হারামখোর বুড়ো। জাহান্নামে যাক…

কাকে গালাগাল করছেন, মিস্টার ডেভন? সকাল বেলায়ই মেজাজ খারাপ?

আরে, মিস্টার পিয়ারলেস জোনস? আপনি এখানে?

প্রফেসর চ্যালেঞ্জার ডেকেছেন। একটা কাজ দিতে চান।

চলে যান। ওই ভালুকটার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন না।

কেন?

কেন? অত বদমেজাজী আর খেয়ালি লোক ভাই আমি জীবনে দেখিনি। এসেছিলাম কাজের বিল নিতে। বেয়াল্লিশ হাজার পাউন্ড পাব। ও বেটা বুড়ো ভালুক চাকর দিয়ে বলে পাঠাল, এখন হবে না, অন্য সময় আসতে। বুড়ো এখন ব্যস্ত। কি করছে জানেন? একটা ডিম খাচ্ছে। আমি কি রাস্তার লোক? আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার…

শিস্ দিয়ে উঠলাম। তারমানে টাকা পাচ্ছেন না?

পাব। পাই পাই হিসেব করে দিয়ে দেবে চ্যালের। একটি পয়সাও মারবে। কিন্তু দেবে নিজের মর্জিমত। ওর ডিম খাওয়ায় কেন ব্যাঘাত ঘটালাম, সেটাই হলো রাগ। বুঝুন, এ রকম একটা সাধারণ ব্যাপারে রাগে কেউ? একেবারেই অসভ্য। ভ্রতার ছিটেফোঁটাও নেই ওর মধ্যে। আমার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচালেন ডেভনশায়ার, কি কাজ করতে এসেছেন?

জানি না। দেখা করলে বলবেন বলেছেন।

ও জানেনই না এখনও! ভাল, ভাল। যান, যান। মস্ত এক অভিজ্ঞতা হবে। গুহামানব দেখেননি তো এখনও, দেখার চান্সটা ছাড়া উচিত হবে না। কথাবার্তা বুঝেশুনে বলবেন। নইলে কপালে দুঃখ আছে আপনার।

গাড়িতে গিয়ে উঠলেন ডেভনশায়ার।

স্টার্ট নিয়ে চলে গেল রোলস রয়েস।

গেটের কাছে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছি, আর ঘন ঘন ঘড়ি দেখছি। ঠিক সময় হলে ভেতরে ঢুকব না কিছুতে। শুরুতেই প্রফেসরের কোপদৃষ্টিতে পড়তে চাই। ঈশ্বরই জানেন, কোন ফ্যাসাদে পড়তে যাচ্ছি।

খেলাধুলার অভ্যাস আছে আমার। শক্ত-সমর্থ শরীর। ভয়ডর তেমন নেই প্রাণে। কিন্তু প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবতেই কেন যেন বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে। ভয়ে না উত্তেজনায় ঠিক বুঝতে পারলাম না।

মারামারি করতে এলে ঠেকাতে পারব। কিন্তু অকারণে যদি অপমান করে বসেন? সহ্য করতে পারব না। হয়তো ছেড়ে কথা বলব না। কি যে ঘটবে তখন, এটা ভেবেই অস্বস্তিটা হচ্ছে বেশি।

কিন্তু চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে দেখা করার প্রচণ্ড কৌতূহল ঠেকাতে পারলাম না। কপালে যা থাকে, ভেবে ঠিক সাড়ে দশটায় ড্রইংরুমের দরজায় ধাক্কা দিলাম। চাকর দরজা খুলে দিল। পাথর-কুঁদা চেহারা ওর। ভাবলেশহীন। অনেক পোড় খেয়ে নির্বিকার। গম্ভীর কণ্ঠস্বর, অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?

ভড়কে গেলাম। চাকরের ভাবসাবই যদি এই হয় তো মনিবের কেমন হবে! একবার ভাবলাম ফিরে যাই। কৌতূহলেরই জয় হলো আবারও। জবাব দিলাম, হ্যাঁ।

পকেট থেকে ছোট ডায়রী বের করে পাতা ওল্টাল চাকর। জিজ্ঞেস করল, স্যারের নামটা?

পিয়ারলেস জোনস।

ঠিকই আছে। সাড়ে দশটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট। আসুন।

চাকরের পেছন পেছন এগোলাম।

লোকটা বলল, কিছু মনে করবেন না, মিস্টার জোনস, এই কড়াকড়ির দরকার আছে। বড় উৎপাত করে খবরের কাগজওয়ালারা। তাই হুঁশিয়ার থাকতে হয়। প্রফেসর সাহেব একদম দেখতে পারেন না ওদের।

ম্যালোন লেখক মানুষ। নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারে। কিন্তু আমার কাজ যন্ত্রপাতি নিয়ে। কলমের জোর নেই। তবু বলতে যখন বসেছি, কিছুটা বোঝানোর চেষ্টা তো করতেই হবে। বিশাল মেহগনি কাঠে তৈরি টেবিলের ওপারে বসা মানুষটাকে মানুষ মনে হলো না আমার, কোটপ্যান্ট পরা এক গরিলা বসে আছে চেয়ারে। গালভরা দাড়ির জঙ্গল। রোমশ ভুরুর নিচে আধবোজা চোখ। মণিদুটো ধূসর, অস্বাভাবিক উদ্ধৃত। নিতান্ত অবহেলায় তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। যেন আমি একটা নর্দমার কীট।

পকেট থেকে কার্ড বের করে টেবিলের ওপর রেখে ঠেলে দিলাম।

তাকালেনও না চ্যালেঞ্জার। খসখসে গম্ভীর গলায় বললেন, দলিল-দস্তাবেজ দেখাতে হবে না। আপনি যে পিয়ারলেস জোনস না বলে দিলেও বুঝতে অসুবিধে হয় না। চেহারাখানা কি, আহা! নামটাও তেমনি। শুনলে হাসি পায়!

মেজাজ খিঁচড়ে গেল। রাগ দেখিয়ে বললাম, আমার চেহারা কিংবা নামের সমালোচনা শুনতে আসিনি। কাজটা কি তাই বলুন।

গুড, গুড। মেজাজ আছে! গায়ে ফোস্কা পড়ল নাকি? দুর্বল স্নায়ুর লক্ষণ, একটুতেই মেজাজ খারাপ হয়ে যাওয়া। সাবধানে কথা বলা দরকার। সিনাই পেনিনসুলায় খনন কাজের ওপরে লেখাটা পড়েছি। আপনিই লিখেছেন তো?

আমার নামেই বেরিয়েছে, রাগটা না কমায় ঘুরিয়ে জবাব দিলাম।

আপনার নামে বেরোলেই যে আপনি লিখেছেন, সেটা প্রমাণ হয় না। কত লোকে আরেকজনের লেখা নিজের নামে ছেপে দিয়ে বসে থাকে। সেটার যখন কেউ প্রশংসা করে আবার আত্মতৃপ্তি পায়। সে যাকগে, বসুন। পচা লেখা আপনারটা। বড়ই একঘেয়ে। তবে আইডিয়াটা নতুন, সেজন্যে পড়তে পেরেছি। নতুন চিন্তার খোরাক আছে। বিয়ে-শাদী করেছেন?

না।

গুড। পেটে কথা রাখতে পারবেন তাহলে।

কথা দিলে সেটা রাখতে হয়, এটাই শিখিয়েছেন পূর্বপুরুষেরা।

যাক, একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। যত বাজে নামই রাখুক, পূর্বপুরুষদের দূরদৃষ্টি আছে। ম্যালোন ছেলেটা অবশ্য,এমনভাবে বললেন যেন ছেলেটার বয়েস মাত্র দশ বছর, আপনার সুখ্যাতি করেছে খুব। আপনাকে নাকি বিশ্বাস করা যায়। বিশ্বাসই হলো সব কাজের মূলধন। পৃথিবীর বড় বড় এক্সপেরিমেন্টের মত এটাও…না না, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এক্সপেরিমেন্ট এটা…কাজেই মুখে তালা আঁটতে হবে। আমার সম্পর্কে নিশ্চয় অনেক আজেবাজে কথা শুনেছেন। সত্যি কাজ করতে চান তো?

করতে পারলে সৌভাগ্যই মনে করব।

আমার এ কথাটায় খুশি হলেন মনে হলো প্রফেসর। তা-তো নিশ্চয়। এ সৌভাগ্যের ভাগ অবশ্য কাউকেই দেয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু কি করব, একা কুলিয়ে উঠতে পারছি না। যাকগে, পেটে কথা রাখবেন বলে কথা দিয়েছেন যখন, পূর্বপুরুষেরও দোহাই দিলেন, বিশ্বাস করলাম। যা বলব, মন দিয়ে শুনবেন। তর্ক করবেন কম। তর্ক আমি একদম সইতে পারি না। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে কিছু বোঝার চেষ্টা করলেন। হঠাৎ ছুঁড়ে দিলেন প্রশ্নটা, বলুন তো আমাদের এই পৃথিবীটা জ্যান্ত, না মরা?

আঁ! ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। এমন অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসবেন চ্যালেঞ্জার, কল্পনাও করিনি। শুনেছি উল্টো কাজ করতে জুড়ি নেই প্রফেসরের, উল্টো জবাবই দিলাম। জ্যান্ত।

ভেরি গুড! খুশি হলেন চ্যালেঞ্জার। অল্পবিস্তর ঘিলু তাহলে আছে মাথায়। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, জ্যান্ত। জ্যান্ত প্রাণী। শ্বাস নেয়ার যন্ত্র আছে পৃথিবীর, রক্তবাহী শিরা-উপশিরা-ধমনী সবই আছে। এমনকি স্নায়ুমণ্ডলীও আছে।

এ যে দেখছি বদ্ধ উন্মাদ! হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম বোকার মত।

আমার তত্ত্বটা মাথায় ঢুকল না, বুঝতে পারছি, মৃদু হাসলেন প্রফেসর। ঢুকবে, আস্তে আস্তে। রোমশ জর শরীরের সঙ্গে পৃথিবীর বাদাভূমির অনেক মিল। এ রকম অনেক মিল আছে নানা রকম প্রাণীর সঙ্গে। ভূমিকম্পটা হলো গা চুলকানো কিংবা আঙুল মটকানো।

আগ্নেয়গিরির ব্যাপারটা তাহলে কি?

এটা খোঁজার জন্যে আর দূরে যাওয়া লাগে না। ওরকম তেতে থাকা জায়গা আমাদের দেহের মধ্যেই আছে।

এ যে দেখছি ভয়ঙ্কর উন্মাদ। সময় থাকতে কেটে পড়ার কথা ভাবতে ভাবতে মুখ ফসকে বলে ফেললাম, তাহলে বডি-টেম্পারেচারের ব্যাপারটা কি বলুন তো? কূয়া খুঁড়তে গিয়ে লক্ষ করেছি, পাতালে যত মেমে যাওয়া যায়, তাপমাত্রা তত বাড়ে। যেন পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলটা টগবগ করে ফুটছে।

হাত দিয়ে একটা নিরাশ ভঙ্গি করলেন চ্যালেঞ্জার। বললেন, বাচ্চা ছেলেদের ভূগোল বইতে লেখা থাকে পৃথিবীর দুই মেরু কমলালেবুর মত সামান্য চাপা। তারমানে দুই মেরু কেন্দ্রের একটু বেশি কাছাকাছি। তাহলে কেন্দ্রের উত্তাপ তো দুই মেরুতে বেশি হবার কথা। তার বদলে ওখানে বরফ কেন?

ভাবিনি তো!

তা ভাববেন কেন? মৌলিক চিন্তায় অনেক ঝক্তি আছে। সাধারণ মানুষ এ সব ব্যাপার বুঝতে চায় না, ভাবতেও চায় না। আচ্ছা, একটা জিনিস দেখাচ্ছি আপনাকে, ড্রয়ার থেকে বের করে দেখিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন প্রফেসর, এটা কি জানেন?

কাঁটাওয়ালা এক জাতের সামুদ্রিক জন্তু।

সামান্য ভুল হয়ে গেল। সামুদ্রিক ঠিকই, তবে কাঁটাওয়ালা নয়, এমন ভঙ্গিতে বললেন প্রফেসর, যেন আমি একটা দুধের শিশু। খোলসে ঘুচলো এবং ভোতা এই যে টিলাটকরগুলো দেখছেন, এগুলো কাটা নয়। প্রাণীটার নাম জানেন না বোঝা যাচ্ছে, তাহলে নামটাই বলতেন, সামুদ্রিক প্রাণী বলতেন না। এর নাম ইকিনাস। পৃথিবীর একটা খুদে মডেল বলতে পারেন। ভাল করে দেখুন, এর দুই মেরু সামান্য চাপা, আকারেও মোটামুটি গোল। টিলাটরগুলোকে পৃথিবীর পাহাড়-পবর্ত বললে নিশ্চয় ভুল হবে না। মানতে আপত্তি আছে?

আছে তো অবশ্যই, বললাম না সেকথা। পুরো ব্যাপারটাই হাস্যকর, নিছক পাগলামি! ভিত্তিহীন সব যুক্তি দিয়ে চলেছেন প্রফেসর। মুখের ওপর বলার সাহস পেলাম না। আমি যত শক্তিশালীই হই, মারপিট বাধালে ওই গরিলার সঙ্গে পারব না বুঝে গেছি। নিরীহভাবে যতটা সম্ভব ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু প্রাণী হলে তার খাবার দরকার। পৃথিবী কি খায়? খাবারটা আসে কোত্থেকে?

ভেরি গুড! বুদ্ধি আছে ঘটে, দারুণ এক হাসি দিলেন চ্যালেঞ্জার। আমার মনে হলো ওটা হাসি নয়, যুদ্ধংদেহী গরিলার বিকট মুখব্যাদান! চট করে আসল পয়েন্টে চলে আসতে পারছেন। তবে সূক্ষ ব্যাপারগুলো বুঝতে পারেন না। তাতে অবশ্য দোষ দিই না। সামারলির মত লোকই পারত না…ও, আপনি তো আবার আরশোলাটাকে চেনেন না…।

না না, চিনি, মানে নাম শুনেছি।

শুনে কিছু বোঝা যায় না। এই যে আমি, আমার নামও তো শুনেছেন। কিন্তু শোনা লোকের সঙ্গে আমার কোন মিল আছে কি?

মিল নেই স্বীকার করলাম, কিন্তু মনে মনে। শুনেছি আধপাগল। এখন দেখি পুরো পাগল। জবাব দিলাম না।

দুই সেকেন্ড আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রফেসর বললেন, আপনার মুখের ভঙ্গিই বলে দিচ্ছে আমার সম্পর্কে আপনার কি ধারণা। তা থাকগে… বলছিলাম…আপনার প্রশ্ন, পৃথিবীর খাবার আসে কোত্থেকে? কি খেয়ে বাঁচে পৃথিবী? এ প্রশ্নের জবাব দেবার আগে দেখা যাক, ইকিনাসরা কি খেয়ে বাঁচে! এরা জলচর। গায়ের টিলাটরগুলোতে অসংখ্য খুদে ছিদ্র আছে। এই সব ছিদ্র দিয়ে পানি ঢোকে শরীরে। এটাই এদের খাদ্য…

তারমানে পানি খেয়ে বাঁচে পৃথিবী, বলতে চাইছেন?

না। পৃথিবীর পুষ্টি যোগায় ইথার। পুরো মহাশূন্যটায় ছড়িয়ে আছে এই ইথার। ছুটতে ছুটতে পুষ্টি শুষে নিচ্ছে পৃথিবী। ঠিক একই ভাবে সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহরাও ইথার খেয়ে প্রাণ বাঁচাচ্ছে। এখন বুঝতে পারছেন, ইকিনাসের সঙ্গে মিলটা কোনখানে?

চুপ করে রইলাম।

ভাবলেন, আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। অনুকম্পার হাসি হাসলেন। যেন জীবন ধন্য করে দিলেন আমার। বললেন, মনে ধায়া একটু এখনও আছে। আপনার, খানিক পরে সেটুকুও থাকবে না। ইকিনাসমেডেল কল্পনা করে ধৈর্য ধরে আমার কথা শুনুন, বুঝে যাবেন।

চুপ করে রইলাম। পাগলের প্রলাপ তর্ক না করে শোনার প্রস্তুতি নিলাম।

ইকিনাসের গা কেমন শক্ত দেখেছেন? এর শক্ত খোলর ওপরে বেশ কিছু খুদে পোকা যদি ছেড়ে দিই, টের পাবে কিছু? আই মীন, জ্যান্ত অবস্থায় কিছু টের পেত কি?

মনে হয় না।

মনে হয় না আবার কি? আমি বলছি, পেত না।

ঠিক আছে পেত না। কি হলো তাতে?

ভাঙা জাহাজ বহুদিন সাগরে থাকলে যেমন তার গায়ে শেওলা পড়ে, জলজ কীট বাসা বাঁধে, তেমনি পৃথিবীর গায়েও শেওলা পড়েছে, কীটেরা বাসা বেঁধেছে। জিজ্ঞেস করতে পারেন, জাহাজ থাকে পানির নিচে, পৃথিবী থাকে কোথায়? ওই যে আগেই বললাম, ইথার। ইধার হলো গ্রহদের মহাসমুদ্র। পৃথিবীরও তাই। এর গায়ের বিশাল বিশাল বনগুলো হলো শেওলা। আর কীট, অর্থাৎ প্রাণী যে কত আছে সেটা অনুমান না করতে পারার মত বোকা অন্তত আপনি নন। যাই হোক, এই যে আমরা, মানে সব প্রাণীকূল মিলে পৃথিবীর গায়ে জীবাণুর মত কিলবিল করছি, পৃথিবী কি টের পাচ্ছে?

জবাব দিলাম না। কি দেব?

পাচ্ছে না, প্রফেসর বললেন। পাত্তাই দিচ্ছে না আমাদের। হঠাৎ একদিন ভাবতে গিয়ে মনে হলো, পৃথিবীর সঙ্গে একটু রসিকতা করা যাক। একটা খোঁচা দিয়ে দেখব কি করে।

মাথা একেবারেই গেছে প্রফেসরের। তর্ক করারও কোন মানে হয় না।

তাকে জানিয়ে দেব, প্রফেসর বলছেন, আমরা আছি। অত ফেলনা নই আমরা। উপেক্ষার কন্ত নই। একজন লোক অন্তত আছে খোলের ওপর, যে ইচ্ছে করলে খুঁচিয়ে শান্তি নষ্ট করে দিতে পারে তার। এমন খোঁচা মারব, হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে ছাড়ব; পৃথিবীকে বুঝতে বাধ্য করব, যে-সে তোক নয় প্রফেসর চ্যালেঞ্জার।

মাথা ঘুরছে আমার, প্রফেসর!

বুঝতে পারছেন না বলে ঘুরছে। অথচ কাজটা কিন্তু খুবই সহজ। আবার ইকিনাসের কথায় ফিরে আসা যাক। বাইরে শক্ত খোলা, কিন্তু ভেতরে নরম সংবেদনশীল মাংস আর দেহযন্ত্র। হয়তো ভোলার ওপরে বাসা বেঁধে থাকা কোন প্রাণী ঠিক করল, ইকিনাসের টনক নড়াতে হবে। কি করবে সে? ভেতরের নরম জায়গায় আঘাত হানবে। কি করে? খোলা ফুটো করে খোঁচানোটাই সহজ। নয় কি?

ঈশ্বরই জানে! হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লাম আমি।

আমিও জানি। মশা কামড়ানোর কথাই ধরুন না। আমাদের চামড়ায় বসে হুল দিয়ে ছিদ্র করে মশা। হুলটা রক্তের সংস্পর্শে আসার পর কামড়টা টের পাই আমরা। অনুভূতিটা আসে যন্ত্রণার মাধ্যমে। আমি কি করতে চাই নিশ্চয় অনুমান করতে পারছেন এখন? অন্ধকারে আলো দেখা যাচ্ছে?

পৃথিবীর খোলা ফুটো করে ভেতরে শলা ঢোকানোর বুদ্ধি করেছেন, তাই তো?

পরম আনন্দে চোখ মুদলেন প্রফেসর। চোখ খুলে হাসলেন। ধরে ফেলেছেন, যাক।

ফুটোটা কি আমাকেই করতে হবে?

না। সেটা আমি আগেই করে ফেলেছি। অনেক এগিয়ে আছে কাজ।

কারা করল?

মর্ডেন কোম্পানি। এ জন্যে রাশি রাশি বারুদ, শাবল, গাইতি, কোদাল, বিরাটাকৃতির তুরপুন কাজে লাগাতে হয়েছে ওদের। দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছে।

ভূ-ত্বকে ফুটো করে দিয়েছেন? সত্যি?

ভড়কে গেছেন, বুঝতে পারছি। নাকি আমার কথা অবিশ্বাস করছেন?

না না, তা করছি না…

তাহলে যা বলছি, শুনুন। পৃথিবীর চামড়া ফুটো করার কাজ শেষ। চোদ্দ হাজার চারশো বেয়াল্লিশ গজ পুরু তৃক ফুটো করতে কি পরিমাণ পরিশ্রম হয়েছে নিশ্চয় ব্যাখ্যা করে বলতে হবে না আপনাকে। বাড়তি একটা লাভ হয়েছে তাতে। বিশাল এক কয়লার খনির সন্ধান পেয়েছি। এক্সপেরিমেন্টের পুরো খরচাই উঠে আসবে ওই খনি থেকে। সাংঘাতিক বেগ পেতে হয়েছে খড়িস্তরে পানির ঝর্না আর হেংগিস্ট-বালি নিয়ে। তবে ওসব পেরিয়ে গেছি।

কাজ তো যা করার করেই ফেলেছেন। আমি আর কি করব?

মশা হবেন।

সত্যি ঘাবড়ে গেলাম এবার। মশা!

হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন চ্যালেঞ্জার, অনেক কঠিন কথা বুঝে ফেলেন, সহজন্তুগুলো পারেন না। মগজের দুর্বলতাই এর কারণ। শুনুন, মশা যে কাজ করে, সেই কাজ করতে হবে আপনাকে। ফুল ফোটাবেন পৃথিবীর ত্বকে।

হাঁপ ছাড়লাম। যাক, মানুষই থাকছি। নিজের আবিষ্কৃত কোন যন্ত্র দিয়ে ল্যাবরেটরিতে আমাকে মশা বানিয়ে ফেলছেন না প্রফেসর। হুল পাব কোথায়?

হুলের কি আর অভাব নাকি? শলা ঢোকাবেন। ধাতব ডাণ্ডা। আট মাইল। লম্বা।

মাথা খারাপ! পাঁচ হাজার ফুটের বেশি ঢোকানোই কঠিন। আমি অবশ্য ছহাজার দুশো ফুট পর্যন্ত নামিয়েছি। এর বেশি সম্ভব না।

সবটা না শুনেই মন্তব্য করেন কেন? ধমকে উঠলেন প্রফেসর। আপনি পারেননি বলে যে কেউই পারবে না, এটা ভাবা বোকামি। আপনার বেন আর আমার ব্রেন এক নয়। আমার মগজের জোর আপনার চেয়ে বহুগুণ বেশি। কূয়া খোড়ার শেষ সীমা কতটা, জানা আছে আমার। না বুঝে লক্ষ লক্ষ পাউন্ড বোকার মত খরচ করছি না। যা বলব, তাই করবেন। কথা বলবেন কম। আপনার মোটা মাথাটা ঘামানোর কোন প্রয়োজন দেখছি না। একশো ফুট লম্বা ধারাল ড্রিল রেডি করুনগে! ই কট্রিক মোটরে চালানো হবে ড্রিলটা।

ইলেকট্রিক মোটর কেন?

সময় হলে সেটা জানতে পারবেন। অত লম্বা ড্রিল আপনার জানামত আছে কিনা সেটা বলুন।

আছে।

কাজ শুরু করে দিন তাহলে। যন্ত্রপাতি জোগাড় করে ফেলুন। টাকার জন্যে ভাবনা নেই। কাজটা করতে পারলে যা চাইবেন তাই পাবেন।

কি ছিদ্র করতে হবে? বালি, কাদামাটি, খড়িমাটি, নাকি পাথর? না জানলে ঠিক বুঝতে পারব না কোন যন্ত্রটা দরকার।

জেলি।

অ্যাঁ! চমকে উঠলাম।

হ্যাঁ, জেলি, একই কথা বললেন আবার প্রফেসর। মজা করছেন না। ধরে নিন, জেলির মাঝে ড্রিল ঢোকাতে হবে আপনাকে। ওই রকমই নরম জিনিস। দেয়ালের বিশাল ঘড়িটার দিকে তাকালেন। অনেক কথা বললাম। জরুরী কাজ আছে আমার। আপনি এখন উঠুন। অফিসে গিয়ে কন্ট্রাক্টের কাগজপত্র রেডি করে ফেলুন। পাকাপোক্ত কাজ পছন্দ আমার। কখন কার বিরুদ্ধে মামলা করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে, কে জানে। দুনিয়ার কোন মানুষকে বিশ্বাস নেই। ঠিক আছে, যান।

উঠলাম। দরজার কাছে গিয়ে ঘুরে তাকালাম। আশ্চর্য! ঘাড় গুঁজে লেখায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন চ্যালেঞ্জার। আস্তে করে ডাকলাম, প্রফেসর?

বিদেয় হননি এখনও! খেঁকিয়ে উঠলেন প্রফেসর। খানিক আগে যে আমার সঙ্গে ভাল আচরণ করেছিলেন তার বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট নেই। এ যেন আরেক চ্যালেঞ্জার।

প্রফেসর, এক্সপেরিমেন্টটা আপনার অসাধারণ। কি উদ্দেশ্যটা…।

এক্ষুণি বেরোন! লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন প্রফেসর। গর্জন করে বললেন, অকারণ কৌতূহল মোটেও পছন্দ নয় আমার! দাঁড়িয়ে রইলেন যে! গেট আ-উ-ট!

একলাফে দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে এলাম। পর্দার অন্য পাশে এসে আবার দাঁড়ালাম। এতটা রাগার পর কি করছেন প্রফেসর দেখার লোভটা সামলাতে পারলাম না কিছুতে। পর্দা সামান্য ফাঁক করে ভয়ে ভয়ে উঁকি দিলাম ভেতরে। কোনদিকে নজর নেই প্রফেসরের। ঘাড় গুঁজে কি যেন লিখছেন। বেমালুম ভুলে গেছেন আমার কথা। সত্যি এক আজব চরিত্র!

বেরিয়ে এলাম বাইরে।

.

আমার অফিসে ফিরে দেখি ম্যালোন বসে আছে। সাড়া পেয়ে ঘুরে তাকাল। চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের বিবরণ শোনার প্রচৎ লোভ সামলাতে পারেনি। চলে এসেছে।

আমার আপাদমস্তক ভাল করে দেখল সে। হাত-পা তো আন্তই আছে! পেটায়নি? যেন না পেটানোয় খুব নিরাশ হলো। দেখা না করেই চলে আসিসনি তো?

অতটা কাপুরুষ কি আমাকে মনে হয় তোর?

প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের কাছে সবাই কাপুরুষ। আসল কথা বল। কেমন লাগল বুড়োটাকে?

দাম্ভিক, উদ্ধত, চাঁছাছোলা, নীরস কথাবার্তা-তুই বললি গুহামানব, আমি তো দেখলাম উন্মাদ। অতিবুদ্ধিমান এক উন্মাদ। তবে…

চুপ করলি কেন? তবেটা কি?

দুনিয়ার যত খারাপ বিশেষণ আছে, সব প্রয়োগ করা যায় তার ওপর; কেবল খারাপ মানুষ, এই কথাটা বাদে।

মানুষটা যদি খারাপই না হলো, তাহলে খারাপ বিশেষণ প্রয়োগ করে লাভটা কি? হাসতে হাসতে বলল ম্যালোন, আসল কথাটা হলো তার মত মানুষকে আমাদের বুদ্ধি দিয়ে মাপতে যাওয়াটাই বোকামি। আমাদের বেলায় যেটা অশোভন, তার বেলায় সেটাই শোতনীয়।

তা জানি না। তবে একটা কথা স্বীকার করতে পারি অকপটে, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার অসাধারণ এক প্রতিভা।

আমিও তোর সঙ্গে একমত। বাজে কথার লোক নন তিনি। তার কোন কাজই অকাজ নয়। হেংগিস্ট ডাউনের ব্যাপারে কিছু বলেছেন?

বলেছেন।

পৃথিবীকে খোঁচা মারার আইডিয়াটা তোর কেমন লাগল?

পাগলামি।

কিন্তু অবাস্তব নয়, অন্তত চ্যালেঞ্জারের জন্যে। অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেন তিনি। দেখিস, তার এই এক্সপেরিমেন্ট সফল হবে। তোকে যা যা করতে বলেছেন, রেডি করে ফেল।

.

এরপর কয়েক সপ্তাহ আর কোন খবর নেই। প্রফেসরের কথামত সব তৈরি করে ফেলেছি। চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমাকে কি ভুলেই গেলেন নাকি প্রফেসর? এই সময় একদিন এসে হাজির হলো ম্যালোন।

প্রফেসরের খবর কি? জিজ্ঞেস করলাম।

তিনিই পাঠিয়েছেন।

পাইলট ফিশ হাঙরের আগে আগে ছোটে।

হ্যাঁ, আমি পাইলট ফিশই। হাঙরের সঙ্গে যে বন্ধুত্ব, এতেই পাইলটের স্বস্তি। ওসব কথা থাক। চ্যালেঞ্জার তো প্রায় শেষ করে এনেছেন সবকিছু। যে কোন সময় ভেল্কি দেখিয়ে বসবেন। তোর খবর কি?

আমি রেডি। হুকুম হলেই কাজ শুরু করব।

ভাল। তোর সম্পর্কে প্রফেসরের ভাল ধারণা। শেষ পর্যন্ত নিজের বদনাম করিসনে। চল, ওঠ। ট্রেনে যেতে যেতে বলব কি করতে হবে তোকে।

.

২ মে। বসন্তের মধুর সকাল। প্রফেসরের সঙ্গে শুরু হলো আমার এক আজব কর্মকাণ্ড। রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হতে চলেছি।

ট্রেনে বসে একটা চিঠি বের করে দিল আমাকে ম্যালোন। চ্যালেঞ্জার লিখেছেন। আমাকে কি কি করতে হবে চিঠিতেই জানিয়েছেন।

মিস্টার পিয়ারলেস জোনস,

হেংগিস্ট ডাউনে পৌঁছে চীফ এঞ্জিনিয়ার মিস্টার বার ফোর্থের সঙ্গে দেখা করুন। আমার পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে অনেকাংশে সাহায্য করছেন তিনি। ম্যালোনের হাতে চিঠি পাঠালাম, ওর মাধ্যমেই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখব। আমার সময় খুব কম। সবার সঙ্গে সব সময় ব্যক্তিগতভাবে দেখা করা সম্ভব নয়।

শুনুন, চোদ্দ হাজার ফুট নিচে অদ্ভুত সব ব্যাপার ঘটতে দেখেছি। পৃথিবীর দেহ সম্পর্কে আমার ধারণাই শেষ পর্যন্ত সত্য হয়েছে। আরও জোরাল প্রমাণ দরকার। নইলে নির্বোধ বিজ্ঞানী মহলের জড়মস্তিষ্ককে নাড়া দেয়া যাবে না। প্রমাণ সংগ্রহ করতে আপনার সাহায্য বেশি প্রয়োজন। লিফটে চড়ে পাতালে নামার সময় যদি চোখ থাকে তো দেখতে পাবেন, মাধ্যমিক খড়িস্তর, কয়লার স্তর, গ্র্যানিট পাথর, ইত্যাদি। এই এ্যানিটের স্তর অতিরিক্ত পুরু। কূয়ার একেবারে তলাটা ত্রিপল দিয়ে ঢাকা। খবরদার, ওই ত্রিপলে হাত দেবেন না। ওখানেই পৃথিবীর স্পর্শকাতরতা সবচেয়ে বেশি। মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

তলদেশ থেকে বিশ ফুট ওপরে কূয়ার দেয়ালে আড়াআড়িভাবে লোহার দুটো মজবুত বরগা লাগানো হয়েছে। ওই বরগাতে মোটর বসাবেন। একশো ফুট ড্রিলের দরকার নেই আর, পঞ্চাশ ফুট হলেই চলবে। বরগার সঙ্গে শক্ত করে মোটর বাধবেন, যেন খুলে না পড়ে। তাহলে এত কষ্ট সব ভেস্তে যাবে। গোলমাল করে দেবে সব। কিছু জানার বা বলার থাকলে ম্যালোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করবেন।

.

দারুণ উৎকণ্ঠা নিয়ে সাউথ ডাউনসের উত্তর সানুদেশে স্টরিংটন স্টেশনে পৌঁছুলাম। আমাদের নিয়ে যাবার জন্যে ঝরঝরে এক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে স্টেশনের বাইরে। কিছু মনে করলাম না। নিতে যে এসেছে এই যথেষ্ট। গাড়িতে উঠে বসলাম।

এবড়োখেবড়ো কাঁচা রাস্তা। ভয়ানক ঝাকুনি খেতে খেতে চলল গাড়ি।

মাত্র ছসাত মাইল পথ। ও যেতেই কোমর বাঁকা হয়ে গেল। পিঠে ব্যথা। রাস্তায় আর কোন গাড়ি দেখলাম না। লোকজনও বড়ই কম। তবে রাস্তায় চাকার দাগ বিস্তর। মালপত্র নিয়ে ভারি গাড়ি যাতায়াত করছে প্রচুর। এক জায়গায় একটা ভাঙা লরি পড়ে থাকতে দেখলাম। কোনমতেই আর চালাতে না পেরে ফেলে চলে গেছে ড্রাইভার। আরেক জায়গায় রাস্তার পাশে ঘাসের মধ্যে পড়ে আছে মরচে ধরা বিশাল এক যন্ত্র। হাইড্রলিক পাম্প।

শুকনো হাসি হাসল ম্যালোন, বুঝলি কিছু?

কি বুঝব? অবাক চোখে তাকালাম ম্যালোনের দিকে।

প্রফেসরের কাণ্ড। যে জিনিস চেয়েছিলেন, যন্ত্রটার পাম্পের মাপ তারচেয়ে সামান্য একটু কম। এক ইঞ্চির দশ ভাগের এক ভাগ। তাতেই খেপে গেছেন চ্যালেঞ্জার। বাতিল করে দিয়েছেন যন্ত্র। একটা পাইপয়সাও দেননি কোম্পানিকে।

আদালতে কেস করেনি কোম্পানি?

করেছে। লাভ কি? দোষটা তো ওদেরই। কম হলো কেন? সে-জন্যেই বলছি, যা করতে বলবেন তিনি, অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। একটু গোলমাল করলেও পয়সা তো পাবিই না, খেসারত দেয়া লাগবে।

ভয়ই করতে লাগল। বাদই দেব নাকি কাজটা? এখনও সময় আছে।

আমি কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই ঘ্যাচ করে ব্রেক কষে দাঁড়াল ড্রাইভার। কাঁটাতারের বেড়া দেয়া। এক জায়গায় গেট। গেটের একপাশ থেকে বিশালদেহী এক লোক এসে দাঁড়াল গাড়ির কাছে। মাথা নামিয়ে জানালা দিয়ে ভেতরের আরোহীদের দেখল। মস্ত বড় কান লোকটার। এত বড় কান আর কোন মানুষের দেখিনি আমি। যোগ্য প্রফেসরের মোগ্য দারোয়ান বটে।

জেনকিনস, আমি ম্যালোন।

সোজা হয়ে দাঁড়াল লোকটা। বটাস করে বুট ঠুকে স্যালুট করল। একেবারে মিলিটারি কায়দা। আমি ভেবেছিলাম, স্যার, আমেরিকান অ্যাসোশিয়েটেড প্রেসের সেই জোকটা।

ওদের লোক এসে গেছে নাকি?

এসেছিল। দূর দূর করে তাড়ানো হয়েছে। একটু আগে টাইমস থেকেও এক ব্যাটা এসেছিল। তাড়িয়েছি ওকেও। একেবারে ফলের মাছি। ভনভন করে এসে ঘেঁকে ধরে। ওই দেখুন না, আঙুল তুলে দেখাল গার্ড। বেশ অনেকটা দূরে চকচক করছে কি যেন। টেলিস্কোপ বসিয়েছে শিকাগোর ডেইলি নিউজের লোক। আঠার মত লেগে আছে। ঝাকে ঝাকে আসছে ওরা।

আসুক। তোমার কাজ তুমি করো।

গাড়ি থেকে নেমে আমাকে নিয়ে এগোল ম্যালোন। ভেতরে ঢুকে কয়েক গজ এগিয়েছি, এমন সময় পেছন থেকে চিৎকার শোনা গেল, ম্যালোন, প্লীজ, ম্যালোন…

চমকে ফিরে তাকালাম। বেঁটে, মোটা একজন লোককে জাপটে ধরেছে জেনকিনস।

ছাড়ো না! ছাড়ো! চেঁচাচ্ছে লোকটা। উহ, পাঁজন্তুরা ভেঙে যাচ্ছে! ম্যালোন, প্লীজ, বলো না কিছু…

জেনকিনস! ছেড়ে দাও ওকে, ডেকে বলল ম্যালোন। গেটের দিকে এগিয়ে গেল। কি হে, বরবটি? এখানে কি? ফ্লিট স্ট্রীটের রাজত্ব ছেড়ে সাসেক্সে এসেছ কেন মরতে?

তুমি যে জন্যে এসেছ, জেনকিনসের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে বুক ডলতে ডলতে বলল লোকটা, হেংগিস্ট ডাউন রহস্যের ওপর ফিচার লিখতে হবে। বসের হুকুম। তথ্য না নিয়ে যেন না ফিরি।

কি রয়, ভেতরে ঢুকতে হলে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের অনুমতি লাগবে, বলল ম্যালোন।

চেষ্টা করেছিলাম। গিয়েছিলাম আজ সকালে।

তারপর? চেয়ে দেখলাম চাপা হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে গেছে ম্যালোনের চোখ-মুখ।

মুখ কালো করে জবাব দিল রয়, বলল, অনুমতি দেবার আগে জানালা দিয়ে মাইরে ছুঁড়ে ফেললে কেমন হয়?

হাসিটা আর চেপে রাখতে পারল না ম্যালোন। আমিও হেসে উঠলাম।

তুমি কি বললে? হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল ম্যালোন।

বললাম, খুব খারাপ হয়, বলেই ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। ভেবেছিলাম, বাঁচলাম। কোথায়! আমার পেছন পেছন তীরবেগে বেরিয়ে এল বুড়ো ভালুকটা। আমার ক্যামেরাটা হাত থেকে পড়ে গেল। ওটা তুলে ছুঁড়ে মারল গরিলাটা। সোজা এসে পিঠে লেগেছে। আরেকটু বায়ে লাগলেই মেরুদণ্ডটা যেত। কসম খেয়ে ফেলেছি আর কোনদিন অত ভারি ক্যামেরা কিনব না। কোনমতে ওটা কুড়িয়ে নিয়ে দে ছুট। আর পেছন ফিরে তাকাইনি। ওফ, ওই পাগলটার সঙ্গে কি করে টিকে আছ তুমি, ম্যালোন?

হা-হা করে হাসতে লাগলাম। টেরা চোখে আমার দিকে তাকাল সাংবাদিক। মনে হলো আমার হাসি ভাল লাগছে না ওর।

থাকাটা যে সহজ না, সে তো নিজেই বুঝলে, ম্যালোন জবাব দিল। শোনো, একটা উপদেশ দিচ্ছি তোমাকে। প্রফেসরের পেছনে লেগো না। ধরা

পড়লে একটা হাড়ও আস্ত থাকবে না। অযথা মাঠে-ঘাটে পড়ে না থেকে নিজের অফিসে ফিরে যাও। দিন কয়েকের মধ্যেই প্রফেসর তোমাদের ডেকে পাঠাবেন। যাও।

ঢাকা তাহলে যাবে না এখন?

না।

সামনে ঝুঁকে এল রয়। কিছু মালপানি ছাড়লে…

নিজের কর্মচারীদের প্রচুর টাকা বেতন দেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার।

বাড়তি কিছু পেলে নেবে না?

চেষ্টা করে দেখতে পারো। লাভের মধ্যে পাজরের কখান হাড় ভাঙবে।

আর কথা না বলে ঘুরে দাঁড়াল ম্যালোন। লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোল। আমাকে বলল, ওর নাম রয় পাকিল। ওয়ার ফিল্ড রিপোর্টার। এক সময় দুজনে একসঙ্গে কাজ করেছি। নিজেকে অজেয় ভাবে সে। খবর জোগাড়ের জন্যে দুনিয়ার কোন বাধাকেই বাধা মনে করে না। সেই অহষ্কার ভাঙল আজ।

দূরে কতগুলো বাড়ি। টালির ছাত। ছবির মত সাজানো এক কলোনি। আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকাল ম্যালোন। বলল, ওগুলো ওয়ার্কারদের ঘর। মোটা মাইনে পায়, থাকার এমন সুব্যবস্থা। কাজেই অসৎ উপায়ে পয়সা রোজগারের কথা ভাববেই না। তা ছাড়া সব কজন অবিবাহিত। মদ খায় না। সেজন্যেই অত চেষ্টা করেও ভেতরের কোন কথা ফাঁস করতে পারেনি রিপোর্টাররা।

বুড়ো বিজ্ঞানীর অ্যাডমিনিস্ট্রেশন যে এমন.চমকার হবে ভাবতে পারিনি।

একটা বাংলোমত বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। বারান্দায় পায়চারি করছেন রোগা, লম্বা, বিষণ্ণ চেহারার এক লোক। আমাদের দেখে বারান্দা থেকে নেমে এগিয়ে এলেন। আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনিই এভিনিয়ার জোনস?

আমি মাথা নাড়তে হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি বার ফোর্থ।

হাত মেলালাম।

ফোর্থ বললেন, আপনি এসেছেন, বেঁচেছি। উফ, একেবারে শেষ হয়ে গেছি। যা টেনশন! নিন, দায়িত্ব নিন এবার। আমাকে বাঁচান! বাবারে বাবা! কম ঝামেলা! কূয়া খুঁড়েই চলেছি। কখনও ছিটকে বেরিয়ে আসছে চক মেশানো পানির ফোয়ারা, কখনও কয়লার খনি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, কখনও পথ আটকাচ্ছে তেল, আবার কখনও গনগন করে উঠছে আগুন। গ্র্যানিট পাথরের কথা আর না-ই বা বললাম!

নিচে কি খুব গরম?

মোটামুটি। বদ্ধ বাতাসে যতটুকু ভাপসা হয় তারচেয়ে বেশি।

প্রফেসরের খবর কি? নিচে নেমেছেন কখনও?

গতকাল নেমেছিলেন। কাজ দেখে ভারি খুশি!…যাকগে, আজ দুপুরে আপনারা আমার এখানে পাবেন। খাওয়ার পর আপনার কাজ বুঝিয়ে দেব।

উত্তেজনায় খিদে মরে গেছে। খেলাম অতি সামান্যই। খাওয়ার পর আমাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন ফোর্থ। প্রথমে নিয়ে গেলেন এগ্রিন হাউসে। শেড়ের বাইরে ঘাসের ওপর ছড়িয়ে আছে বিস্তর ভাঙাচোরা যন্ত্রপাতি। লোহার দরে বেচে দেয়া ছাড়া ওগুলো আর কোন কাজেই লাগবে না। একপাশে একটা প্রকাও অ্যারল হাইড্রলিক বেলচা পড়ে থাকতে দেখলাম। শুরুতে এটা দিয়েই মাটি খোড়া হয়েছিল। ওটার পাশে আরেকটা অতিকায় মেশিন। ইস্পাতের দড়িতে বালতি বেঁধে পাতালে নামিয়ে আলগা বালি আর মাটি তুলে আনার কাজ করা হতো এই যন্ত্রের সাহায্যে। এগ্রিন হাউসের ওপরে পাওয়ার হাউস। ওখানে উঠে দেখলাম হেলায় পড়ে আছে কয়েকটা শক্তিশালী টারবাইন এগ্রিন। মিনিটে একশো চল্লিশবার ঘোরার ক্ষমতা রাখে প্রতিটি টারবাইন। হাইড্রলিক অ্যাকুমুলেটর চালু রাখে। ফলে তিন ইঞ্চি পাইপের মধ্যে দিয়ে চলতে থাকে চার-চারটে ভীষণ শক্তিশালী রক ড্রিল, ঘুরতে থাকে ব্র্যান্ড টাইপের ধারাল ফলা। একটা দুশো হর্স পাওয়ারের বিশাল টারবাইন দেখলাম। দশ ফুট পাখা ঘুরিয়ে বারো ইঞ্চি পাইপের মধ্যে দিয়ে চাপ চাপ বাতাস সুড়ঙ্গে ঢোকানোর কাজ করছে এটা।

আশপাশ ভুলে গিয়ে তন্ময় হয়ে দেখছিলাম প্রকাণ্ড যন্ত্রপাতিগুলো। পরিচিত ঝনঝন শব্দে ফিরে তাকালাম। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা লরি।

নিচে নেমে এলাম। বিশাল লেল্যান্ড লরিটা আমারই। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, পাইপ এবং অন্যান্য বিস্তর টুকিটাকি জিনিস নিয়ে এসেছে। পেছনে মালপত্রের ওপর চেপে বসে আছে ফোরম্যান পিটার। তার পাশে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে সারাগায়ে কালিঝুলি মাথা অ্যাসিসট্যান্ট।

এঞ্জিন হাউসের কাছে এসে থামল লরি। লাফ দিয়ে নামল পিটার। তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে ফোর্থ আর ম্যালোনের সঙ্গে কূয়ার কাছে চললাম.।

আজব জায়গা। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এলাহী কাণ্ড চলছে। কুয়ার মুখ ঘিরে ঘোড়ার খুরের আকৃতির ছোটখাট এক পাহাড়। অশ্ব-ধূর পাহাড় নাম রাখলে চমকার মানিয়ে যাবে। কূয়া কাটার সময় খুঁড়ে আনা মাটি, পাথর আর কয়লা জমে সৃষ্টি হয়েছে ওই পাহাড়। পাহাড়ের ঢালে বসানো সারি সারি লোহার প্রাম, বড় বড় চাকাওয়ালা যন্ত্র, পাম্প মেশিন এসব। বিশাল থামে ইস্পাতের বরগা পেতে পাতালে নামার লিফট ঝোলানো হয়েছে। পাহাড়ের একপ্রান্তে কূয়ার পাড়ে একটা লম্বা পাকা বাড়ি। এই বাড়ির একদিকের প্রান্তে পাম্পটা বসানো।

পাহাড়ে গিয়ে উঠলাম। নিচে ঝুঁকে কূয়ার দিকে তাকালাম। প্রকাণ্ড মুখ হাঁ করে আছে। তেরছাভাবে বিকেলের রোদ পড়েছে গর্তের মুখে, ভেতরের কয়েকশো ফুট পর্যন্ত দেখা যায়। প্রথমে খড়িমাটির স্তর। আলগা মাটি ঝরে পড়ার সম্ভাবনা রোধ করা হয়েছে ইটের গাঁথনি দিয়ে। অনেক নিচে আলপিনের মাথার মত ছোট্ট একটা আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছে। নড়ছে মনে হলো আলোটা। গভীর গর্তের দিকে কয়েক সেকেন্ডের বেশি তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। মাথা ঘুরে উঠল।

আলোকবিন্দুটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ও কিসের আলো?

লিফট, পাশ থেকে বলল ম্যালোন। গর্তটা আটমাইল গভীর। লিফট ছাড়া নামার উপায় নেই। শক্তিশালী আর্কলাইট জ্বালানো হয় লিফটে। চলেও খুব জোরে। এই তো, উঠে এল বলে। নামবি নাকি?

নামতে তো হবেই, বললেন ফোর্থ। ওনার কাজটাই তো তলায়।

দ্রুত বড় হচ্ছে আলোকবিন্দু। গাঢ় অন্ধকারে নক্ষত্র গতিতে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতই ধেয়ে এল। প্রখর দীপ্তিতে দিনের আলোর মত উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে কূয়া। চোখ ধাধিয়ে গেল। ঘট-ঘট-ঘটাং করে থামের মাথায় বসানো ধাতব চাতালে এসে ঠেকল লিফটের ছাত। ঝোলানো সিড়ি বেয়ে নেমে এল চারজন লোক।

দুই ঘণ্টা শিফটে কাজ করে এরা, বললেন ফোর্থ। নতুন চারজন নামবে এবার। মিস্টার ম্যালোন, যাবেন নাকি আবার?

চলুন। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কি করব?

নামতে হলে বিশেষ পোশাক পরে নেয়া লাগে। ফোর্থের সঙ্গে এঞ্জিন হাউসের লাগোয়া একটা ঘরে গেলাম। হালকা তসর জাতীয় কাপড়ের পোশাক বের করে দিলেন ফোর্থ। জুতো, মোজা, জামা-কাপড় সব খুলে ফেলুন। কূয়ার নিচে ওসব জিনিস নিরাপদ নয়।

পরনের সব কাপড়-চোপড় খুলে বিশেষ পোশাক পরে নিলাম। পায়ে দিলাম রবারের চটি।

বেরোনোর উপক্রম করছি এমন সময় বাইরে চেঁচামেচি শোনা গেল। সেই সঙ্গে কুকুরের উত্তেজিত চিত্তার।

ছুটে বেরিয়ে গেল ম্যালোন।

আমিও বেরোলাম। দেখি পিটারের তেলকালি মাথা অ্যাসিসট্যান্টকে মাটিতে চেপে ধরেছে এক গার্ড। গোটা দশেক কুকুর ওদের ঘিরে ঘেউ ঘেউ করছে। লোকটার কাছ থেকে কি যেন কেড়ে নেবার চেষ্টা করছে গার্ড।

গায়ের জোরে গার্ডের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারল না লোকটা। ওর হাত থেকে জিনিসটা কেড়ে নিয়ে এক আছাড়ে ভেঙে ফেলল। তারপর পা দিয়ে মাড়িয়ে চুরমার করতে লাগল। একটা ক্যামেরা। অবাক হয়ে দেখলাম, পিটারের অ্যাসিসট্যান্ট সেজেছে সেই রয় পার্কিন্স। লরিতে মুখ ঘুরিয়ে বসে ছিল। অতটা খেয়াল করিনি। ছদ্মবেশটা ভালই ধরেছে।

টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল রয়। ছড়ে যাওয়া কনুই ডলতে লাগল। চোখে গগাখরোর বিষ। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, দুই পয়সার গার্ড, তোমাকে আমি দেখে নেব! আমার এত দামের ক্যামেরাটা ভাঙলে। তোমাকে আমি ছাড়ব না!

দোষটা তোমারই, রয়, নীরস কণ্ঠে বলল ম্যালোন, বিনা অনুমতিতে ঢুকেছ। ছবি তুলেছ নিশ্চয়। নাহলে ক্যামেরাটা ভাঙত না।

আমারও রাগ হলো। কড়া গলায় ধমকে উঠলাম, আমার কোম্পানির ইউনিফর্ম পেলেন কোথায়?

মিটিমিটি হাসতে লাগল রয়।

রাগে আরও পিত্তি জ্বলে গেল আমার। প্রথম দর্শনেই লোকটাকে খারাপ লেগেছে। এমন ভঙ্গিতে হাসছে, ঠাস করে এক চড় মারতে ইচ্ছে করল।

গা জ্বালানো হাসি হাসতে হাসতে রয় বলল, আমার অসাধ্য কাজ দুনিয়ায় নেই। গেটের বাইরে প্রস্রাব করতে দাঁড়িয়েছিল আপনার অ্যাসিসট্যান্ট, আশেপাশে আর কেউ ছিল না। পেছন থেকে আধলা ইট দিয়ে মারলাম মাথায় এক বাড়ি। টু শব্দটি করতে পারল না। ওকে টেনে নিয়ে গেলাম ঝোপের আড়ালে। দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে ওর ইউনিফর্ম পরে লরিতে উঠে বসলাম। আরেকদিকে মুখ ফিরিয়ে ছিলাম সারাক্ষণ। আপনার ফোরম্যান তাই চিনতে পারেনি। বলে খিকখিক করে হাসতে লাগল অসহ্য লোকটা।

চিৎকার করে উঠলাম, আবার হাসছেন! আপনাকে পুলিশে দেয়া উচিত!

ভাল চাও তো জলদি বেরোও! ম্যালোন বলল। প্রফেসর এসে দেখে ফেললে ক্যামেরার দশা আর তোমার দশা একরকম হবে। যাও, পালাও।

হই-হল্লা শুনে জেনকিনস এবং আরও একজন গার্ড ছুটে এল। রয়কে দেখিয়ে বলল ম্যালোন, একে বের করে দিয়ে এসো। খেয়াল রেখো, আর যেন কোনমতেই ঢুকতে না পারে।

দুদিক থেকে ধরে চ্যাংদোলা করে রয়কে নিয়ে চলল দুই গার্ড। সুযোগ দিলেই কিনো আরম্ভ করবে। সেটা বুঝে চুপ করে রইল সে।

এই ঘটনার পরদিন অ্যাডভাইজার পত্রিকায় এক চাঞ্চল্যকর নিবন্ধ বেরোল। লেখক স্বয়ং রয় পার্কিল।

হেড টাইটেল:

পাগল বৈজ্ঞানিকের উন্মাদ।

নিচে সাব-টাইটেল:

অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার সরাসরি পথ।

নিবন্ধটা পড়ে সন্ন্যাস রোগ হতে হতে অল্পের জন্যে বেঁচে গেলেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, আর এর ফলে নিজের অফিসে বসেই গরিলা-মানবের হাতে জানটা যেতে বসল অ্যাডভাইজার-এর সম্পাদক সাহেবের। তার পরদিন সে-কথাও ফলাও করে ছাপা হলো পত্রিকায়। গরিলা-মানব নামটা তাদের দেয়া। অতএব অতিরিক্ত সাবধানতা বশত দ্বিতীয় দিন আর অফিসে থাকলেন না সম্পাদক সাহেব।

যাই হোক, আগের নিবন্ধটায় রয় পার্কিন্স তার সমস্ত প্রতিভা সন্নিবেশিত করেছে। অনেক রঙ চড়িয়ে, ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে চুটিয়ে লিখেছে কাটাতার ঘেরা গলাকাটা গুণ্ডা বেষ্টিত টহলদার ব্লাডহাউন্ড প্রহরিত কম্পাউন্ডে বহু অভিজ্ঞ ওয়ারফিল্ড রিপোর্টারের রোমহর্ষক অভিযান কাহিনী। এনমোর গার্ডেন্সের রোমশ ষাঁড়টা নাকি অ্যাংলো অস্ট্রেলিয়ান সুড়ঙ্গ প্রায় শেষ করে এনেছে। কিন্তু তার ভাড়াটে গুণ্ডারা সুড়ঙ্গমুখের কাছ থেকে মারতে মারতে বের করে দিয়েছে রয় পার্কিন্সকে। তার ক্যামেরা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। গুণ্ডাদের কাউকে কাউকে চেনে রয়। এদের একজন নাকি সাংবাদিক হবার সুদূর স্বপ্ন নিয়ে পত্রিকা পাড়ায় অনেকদিন ঘুরঘুর করেছে, কিন্তু ক্ষমতায় কুলোয়নি বলে সে-চেষ্টা বাদ দিয়েছে। আরেকজনের পৈশাচিক চেহারা, পোশাকও পরেছে তেমনি। হেলপার হবার যোগ্যতা তার নেই, অথচ নিজেকে এঞ্জিনিয়ার বলে জাহির করে।

এমনি সব চমৎকার বর্ণনা দিয়ে আমাদের পিণ্ডি চটকে মনের বোঝ অনেকখানি হালকা করেছে রয়। আমরা ব্যাপারটা ভুলে গেলেও প্রফেসর চ্যালেঞ্জার ভুললেন না। আর এর জন্যে ফ্লীট স্ট্রীটের প্রায় সব রিপোর্টারকে খেসারত দিতে হলো নিদারুণভাবে।

যা হোক, আগের কথায় ফিরে আসি। পিটারের অ্যাসিসট্যান্টকে উদ্ধার করে আনল জেনকিনস। তাকে নিয়ে কাজে লেগে গেল পিটার। কয়েকজন শ্রমিকও এসে কাজে হাত লাগাল। লরি থেকে মাল খালাস করতে লাগল। অনেক ধরনের যন্ত্রপাতি: বেলবক্স, ক্রোজফুট, ভি-ড্রিল, স্কেল এবং আরও অনেক কিছু।

আমি, ম্যালোন আর মিস্টার ফোর্থ গিয়ে লিফটে চড়লাম। লিফট মানে ইস্পাতের শক্ত, মোটা তারে ঘেরা খাঁচা। হু-হু করে পাতালে নেমে চলল লিফট। নামার সময় দেখলাম, আরও লিফট ওঠানামা করছে কূয়ায়। কয়েকটা লাইন।

লন্ডনের অন্য সব সাধারণ লিফটের মত নয় এখানকার খাঁচাগুলো। হালকা, অনেক বেশি মজবুত, দ্রুতগামী। ঝড়ের গতিতে নামছে। অথচ টেরই পাচ্ছি না তেমন। ওপর থেকে তীব্র গতিতে নিচে নামার সময় যে রকম অনুভূতি হওয়ার কথা, সেসব কিছুই হচ্ছে না।

কূয়ার দেয়ালে লাগানো হয়েছে উজ্জ্বল ইলেকট্রিক আলো। স্পষ্ট দেখা যাবে সবকিছু।

চোখের সামনে দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে মাটির একটার পর একটা স্তর; স্যাঁ স্যাঁ করে ওপর দিকে মিলিয়ে যাচ্ছে। খড়িস্তর, কফিরঙা হেংগিস্ট স্তর, তারপর কুচকুচে কালো কয়লার স্তর-মাঝে মাঝে কাদামাটির বলয়।

ইঁটের গাঁথনি দিয়ে আলগা মাটি জায়গায় জায়গায় ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। যাতে ধসে না পড়ে। এত গভীর কূয়া, অথচ খোড়ার গুণে ধসে পড়ছে না। আশ্চর্য! দেখলে তাক লেগে যায়! কি পরিমাণ যান্ত্রিক দক্ষতা আর মেহনতের ফলে সম্ভব হয়েছে এই কাজ, অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করা যায়। এর পরিকল্পনা যিনি করেছেন তার প্রতি শ্রদ্ধায় নুয়ে আসে মাথা। বলাবাহুল্য, প্ল্যানটা করেছেন স্বয়ং প্রফেসর চ্যালেঞ্জার।

কয়লার খনির ঠিক নিচে তাল তাল সিমেন্টের ডেলা দেখলাম বলে মনে হলো। লিফটের দ্রুতগতির জন্যে শিওর হতে পারলাম না।

হুস করে গ্র্যানিট স্তরে নেমে এল লিফট। উজ্জ্বল আলোয় লক্ষ হীরের মত ঝকমক করছে দেয়ালের গায়ে বেরিয়ে থাকা কোয়ার্জ ক্রিস্টালের দানা।

নেমে গেলাম আরও নিচে। মাটির এতটা গভীরে নামতে পারব, কল্পনাও করিনি কোনদিন। চোখের সামনে তীরবেগে উঠে যাচ্ছে প্রাচীন পাথরের বিচিত্র নমুনা। লালচে-সাদা ফেলুপার স্তরের সৌন্দর্যের কথা জীবনে ভুলতে পারব না। গোলাপী রঙের আদিম পাথর অপার্থিবরূপে ঝলমল করছে। দেয়ালের গা থেকে বেরোচ্ছে যেন গোলাপী বিদ্যুতের ছটা।

যতই নামছি, উত্তাপ বাড়ছে। ভারি, ভাপসা হচ্ছে বাতাস। ঘাম বেরোচ্ছে দরদর করে। গায়ের সাথে লেপ্টে গেল হালকা তসরের পোশাক। এক সময় গরম যখন অসহ্য হয়ে উঠল, ঠিক তখনই চাতালের ওপর থেমে গেল লিফট। চীফ এঞ্জিনিয়ারের নির্দেশে লিফট থেকে চাতালে নামলাম।

অবাক হয়ে চারদিকের দেয়াল দেখছে ম্যালোন। সাহসী লোক বলে জানি ওকে। জানি সহজে ভয় পাওয়ার লোক নয় সে। অথচ ওর চোখেও আতঙ্ক ফুটতে দেখলাম। এরপর আমার ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু কি দেখে অত ভয় পেল ম্যালোন?

দেয়ালে হাত বোলালেন এঞ্জিনিয়ার। তারপর হাতটা আমার চোখের সামনে মেলে ধরে বললেন, দেখছেন, গাঁজলা মত জিনিস বেরোচ্ছে? হাত দিয়ে দেখুন, চটচটে। প্রফেসর তো দেখে খুশিতে নাচতে আরম্ভ করেছিলেন। আমি কিছুই বুঝিনি। দেখুন কি রকম থরথর কাঁপছে দেয়াল। এরপর যতই নিচে নামবেন, দেয়ালের এই কাঁপুনি দেখবেন। কাপছে এ ভাবে সারাক্ষণ। মাটি কাঁপে জ্যান্ত জীবদেহের মত, শুনেছেন কখনও?

আগের বারও এ ভাবেই কাঁপতে দেখেছি দেয়াল, ম্যালোন বলল। তোর মোটর আর ড্রিল বসানোর জন্যে বরগা ঢোকানো হচ্ছিল তখন। ভীষণভাবে কেঁপে কেঁপে উঠছিল দেয়ালটা, যেন প্রচণ্ড ব্যথা পাচ্ছে। প্রফেসরের আজগুবি গল্প আর আজগুবি মনে হয় না এখন!

তলায়, তেরপলের নিচে কি আছে দেখলে ভিড়মি খাবেন, আরও ভয় ধরিয়ে দিলেন ফোর্থ। মাটি মাখনের মত নরম। অতি সহজে কেটে গেছে। তার নিচে আরেকটা অদ্ভুত স্তর। মাটির আট মাইল নিচে যে এ জিনিস থাকবে দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করিনি।

কিসের স্তর? জানতে চাইলাম।

দেখতে চান?

ওখানে যখন ড্রিল বসাতে হবে আমাকে, না দেখে কিভাবে কাজ করি?

ঠিক আছে, আসুন। খবরদার, চাপটাপ দেবেন না এখনি। প্রফেসর বলেছেন, সর্বনাশ ঘটে যেতে পারে তাহলে।

আমাদের আরেকটা লিফটে নিয়ে গেলেন ফোর্থ। এই লিফট গর্তের একেবারে তলায় নিয়ে যাবে।

তেরপলের ফুটখানেক ওপরে থামল লিফট।

নিন, দেখুন, ভয়ে ভয়ে বললেন আমাকে ফোর্থ।

সাবধানে তেরপলের এক কোণ ধরে টান দিলাম। উজ্জ্বল আলোয় তলার জিনিসটা দেখে শিউরে উঠলাম।

ধূসর বর্ণের চকচকে একটা তিমির পিঠের মত জায়গা। গাঁজলা মাথা। শ্বাস ফেলার ছন্দে যেন ধীর গতিতে উঠছে আর নামছে। মৃদু তরঙ্গের ক্ষীণ আভাস, স্পন্দনবেগ সঞ্চারিত হচ্ছে ওপর দিয়ে। হালকা ঘষা কাচের মত রঙ। ভেতরে আবছা কোষের মত জিনিস দেখা যাচ্ছে। সাদাটে অস্বচ্ছ বম্ভর মাঝে যেন অজানা এক রহস্যময় জগৎ। দুরুদুরু বুকে মন্ত্রমুগ্ধের মত সেই অসাধারণ দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এটাই কি সেই জেলি? যার কথা বলেছিলেন প্রফেসর?

ফিসফিস করে কথা বলল ম্যালোন। আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর। যেন ঘুম ভেঙে জেগে উঠে সর্বনাশ ঘটিয়ে ছাড়বে জ্যান্ত ভয়ঙ্কর পৃথিবী। একটা ছাল ছাড়ানো জন্তু যেন! প্রফেসরের-ইকিনাস তথ্যই তো সত্যি হতে যাচ্ছে দেখছি! তাঁকে পাগল ভেবেছি, আসলে মাথামোটা তো আমরাই।

সর্বনাশ! এর মধ্যে ড্রিল গাঁথব আমি! ভয়ে কেঁপে উঠল আমার গলা।

সেটা তোর সৌভাগ্য, আমার কাঁধে হাত রাখল ম্যালোন! এবং আমার চরম দুর্ভাগ্য, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তোর সঙ্গে থাকতে হবে।

আমি থাকছি না, সাফ বলে দিলেন এঞ্জিনিয়ার। প্রফেসর জোর করলে সব ছেড়েছুড়ে সোজা দক্ষিণ আমেরিকায় পালাব। যাতে কোনদিন খুঁজে না পান।

অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল এ সময়। ধূসর পিচ্ছিল পিঠটা ওপর দিকে ঠেলে উঠতে লাগল বুদুদের মত। তরঙ্গ খেলে গেল তাতে। আস্তে আস্তে বুদ্বুদটা আবার বসে গেল নিচের দিকে। আগের মত ধীরগতিতে স্পন্দিত হতে লাগল পিঠ।

এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য আর সইতে পারলাম না। সাবধানে আবার তেরপল নামিয়ে ঢেকে দিলাম।

আমরা আছি বুঝতে পেরেছে মনে হচ্ছে! ভয়ার্ত গলায় বললেন ফোর্থ। জীবন্ত প্রাণীর মত ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ও আছে।

ফুলল কেন? ম্যালোনের প্রশ্ন। চোখও আছে নাকি? আলো দেখতে পেয়েছে?

ব্যাপারটা নিয়ে আর আলোচনা করতেও সাহস পেলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে এবার কি করতে হবে, মিস্টার ফোর্থ?

চাতালের এক পাশ বরাবর দুটো বরগা ঢোকানো হয়েছে দেয়ালের গায়ে। পাশাপাশি। মাঝখানে নয় ইঞ্চি ফাঁক। এই বরগার ওপর মোটর বসিয়ে ফ্লাক দিয়ে ড্রিল ঢোকাতে হবে। কাজটা বুঝিয়ে দিলেন আমাকে এঞ্জিনিয়ার।

সহজ কাজ, বললাম। আজ থেকেই শুরু করব।

বলার সময় তো বলে ফেললাম, কিন্তু কি পরিমাণ বিপজ্জনক, কাজে হাত দেয়ার আগে কল্পনাও করিনি।

কূয়া খোড়ার অভিজ্ঞতা আমার দীর্ঘদিনের। কিন্তু এখন যে কাজে হাত দিলাম, এ অভিজ্ঞতা আগে তো কোনদিন হয়ইনি; ভবিষ্যতেও হবে বলে মনে হয় না, যদি না আবার চ্যালেঞ্জারের পাল্লায় পড়ি। কিসের গায়ে ড্রিল ঢোকাতে হবে, কল্পনা করে অস্বস্তিতে ঘেমে গেল হাতের তালু।

মোটর চালানোর জন্যে ওপর থেকে বিদ্যুৎ আসবে। আট মাইল লম্বা তার জেনারেটরের সঙ্গে যুক্ত করে নিয়ে আসা হলো চাতালে। মোটরের সঙ্গে যুক্ত করলাম। সুইচ দিলে চলতে থাকবে এখন মোটর।

ফোরম্যান পিটারের সাহায্যে কিছু বিশেষ টিউব লিফটে করে নামিয়ে আনলাম চাতালে। ড্রিল পপাতায় মাধ্যাকর্ষণ অনেকখানি সাহায্য করে। ভারি ড্রিল নরম মাটির গায়ে অনায়াসে ঢুকে যায় এই আকর্ষণের ফলে।

বরগার ওপর মোটর বসানো কিছু না, কিন্তু ঘাম ছুটে গেল পরের কাজটা করতে গিয়ে। ভয়ের চোটে যতটা না আসল গরম, তার চেয়ে বেশি লাগছে। কাজ করতে গেলে হাত ফসকে ছোটখাট যন্ত্রপাতি পড়ে যাবার ভয় আছে। একবার পড়লেই হলো। আঘাত সহ্য করবে বলে মনে হয় না ওই জেলির মত নরম বটা। নিমেষে ঘটিয়ে দেবে চরম সর্বনাশ। প্রফেসর এ জন্যেই বার বার সাবধান করেছেন।

এত ভাবলে কাজ করতে পারব না। টানটান হয়ে আছে উত্তেজিত স্নায়ু। জোর করে দুশ্চিন্তা বিদায় করলাম মন থেকে।

নিরাপদেই কাজ শেষ হলো এক সময়। লিফটে করে উঠে এলাম। বাইরে বেরিয়ে গর্তের পাড়েই মাটির ওপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। দপদপ করছে মাথার ভেতর। ফেটে যাবে যেন খুলিটা।

খবর পাঠানো হলো প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের কাছে-কাজ শেষ। এবার তার কাজ তিনি করতে পারেন।

সব ঠিকঠাক করে দিয়ে সেদিনই ফিরে এলাম হেংগিস্ট ডাউন থেকে।

.

তিনদিন পরে এল নিমন্ত্রণ পত্র। চ্যালেঞ্জার লিখেছেন:

প্রফেসর জি. ই. চ্যালেঞ্জার, এফ. আর. এস. এম. ডি. ডি. এসসি-র তরফ থেকে আমন্ত্রণপত্র।

উপলক্ষ: জড় জগতের ওপর মানুষের প্রভুত্বের এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করার জন্যে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

সময়: ২১ জুন, মঙ্গলবার, সকাল ১১-৩০।

স্থান: হেংগিস্ট ডাউন, সাসেক্স।

স্টেশন: স্টরিঙটন। ভিক্টোরিয়া স্টেশন থেকে সকাল ১০-০৫ মিনিটে বিশেষ ট্রেন ছাড়ার ব্যবস্থা থাকবে। টিকিটের পয়সা নিজের পকেট থেকে দিতে হবে। অবস্থা আয়ত্তের বাইরে চলে গেলে পালিয়ে বাঁচার জন্যে তৈরি থাকতে হবে।

বিঃ দ্রঃ মহিলাদের আসা একেবারেই বারণ। এলে ঢুকতে দেয়া হবে না।

.

একই রকম আমন্ত্রণপত্র পেল ম্যালোন। লন্ডনের নামী-দামী মানুষদের কাছেও এই পত্র গেল। আর দাওয়াত পেল পত্রিকার লোকেরা। সমস্ত পত্রিকার সম্পাদক থেকে শুরু করে বড় সাহেব, ছোট সাহেব এমনকি পিয়ন-দারোয়ানেরাও বাদ গেল না। খবরটা শুনে অবাক হলাম। হঠাৎ যে কেন ওদের প্রতি এতটা সদয় হয়ে উঠলেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার বোঝা গেল না।

সোমবার বিকেলে হেংগিস্ট ডাউনে গিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা শেষবারের মত ভাল করে দেখে এলাম। কোন খুঁত থেকে গেলে আমাকে দেশছাড়া করবেন প্রফেসর।

ঠিকই আছে সব। জায়গামত ঝুলছে ড্রিল, ওজন চাপানো রয়েছে, মোটরের সঙ্গে ইলেকট্রিক কানেকশনের কোন গোলমাল হয়নি। যেমন রেখে গিয়েছিলাম, তেমনি আছে। সুইচবোর্ড রেখেছি গর্তের মুখ থেকে পাঁচশো গজ দূরে, নিরাপদ দূরত্বে।

.

মঙ্গলবার। গতরাতে ভাল ঘুম হয়নি। সাংঘাতিক উত্তেজনার মধ্যে কেটেছে। সকাল সকাল বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম।

নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেন ধরে এসে পৌঁছুলাম সাউথ ডাউনসে। রোদ ঝলমলে সুন্দর সকাল। হেংগিস্ট ডাউনের মত রুক্ষ জায়গাতেও রঙবেরঙের প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। আকাশ ঘন নীল।

লোকে গিজগিজ করছে হেংগিস্ট ডাউন। বৃটেনের সমস্ত মানুষ এসে যেন হাজির হয়েছে। যেদিকে চোখ যায় শুধু লোকের মাথা। বিশ্রী কাঁচা রাস্তাটায় মোটর গাড়ির ভিড়। লন্ডন শহরে নিশ্চয় আর কোন গাড়ি নেই, সব আজ চলে এসেছে। কম্পাউন্ডের গেটে নামিয়ে দিচ্ছে আরোহীদের। অনেক কষ্টে পথ বের করে সরে গিয়ে পার্ক করছে কাঁটাতারের বাইরে ডানদিকের খোলা প্রান্তরে।

ভীষণ-দর্শন একঝাক প্রহরী পাহারা দিচ্ছে গেটে। হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। কার্ড চেক করতে করতে ওদের অবস্থা কাহিল। গেটে লোকের ভিড়। যারা কার্ড পায়নি, তারাও এসেছে। অনেক রকমে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছে গার্ডদের। কিন্তু ওরা অটল। লোক বাছাই করায় চ্যালেঞ্জারের জুড়ি নেই, বুঝলাম!

খোলা জায়গাটার এক প্রান্তে পাহাড়। যারা কার্ড পায়নি, ভেতরে ঢুকতে না পেরে ওখানে গিয়ে উঠছে। দূর থেকে যদি কিছু দেখা যায়, এই আশায়।

কম্পাউন্ডের ভেতরে কাটাতারের বেড়া দিয়ে বিভিন্ন মর্যাদার মেহমানদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কার্ড পরীক্ষা করে যার যার জায়গায় বসিয়ে দিচ্ছে গার্ডেরা।

লর্ড সভার সদস্যদের বসার জায়গাটাকে ছাগলের খোয়াড়ের মত মনে হলো আমার। হাউস অভ কমনসের মাননীয় সভ্য এবং বিজ্ঞানীদের বসার জায়গাটাও এরচেয়ে উন্নত নয়। টিন আর বালির বস্তা দিয়ে বিশেষ একটা দিক একেবারে আলাদা করে রাখা হয়েছে। ওখানে বসবেন রাজ-পরিবারের তিনজন।

উচ্চমানের সম্মানিত অতিথিরা এলেন সোয়া এগারোটায়, কয়েকটা বিশেষ গাড়িতে চেপে। তাদের সম্মানের সঙ্গে পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় বসিয়ে দিল কয়েকজন গার্ড।

সবাই এসে যেতে নিজের জন্যে নির্দিষ্ট মঞ্চে গিয়ে উঠলেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার। সম্মিলিত ব্যঙ্গের হাসি আর হাততালির রোল উঠল। তীক্ষ্ণ শিসের শব্দও শোনা গেল গোলমাল ছাপিয়ে।

মাথায় উঁচু চুড়াওয়ালা চকচকে ধাতব টুপি পরেছেন চ্যালেঞ্জার গায়ে সাদা ওয়েস্টকোটের ওপর জমকালো ফ্ৰককোট। চোখে অবজ্ঞামেশানো চাহনি, যেন নিমন্ত্রণ করে কৃতার্থ করেছেন মেহমানদের। দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে স্পষ্ট অহমিকা। এখানকার কাউকেই নিজের সমকক্ষ তো দূরের কথা, কাছাকাছিও যে ভাবেন না, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে এটাই বুঝিয়ে দিচ্ছেন।

ভিড়ের ভেতর থেকে নতুন করে শিস দিয়ে উঠল কোন অভদ্র যেন। অন্য একজন চেঁচিয়ে বলল, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার একেবারে জেহোভা কমপ্লেক্সের আদর্শ নিদর্শন।

শুনছেন সবই, কিন্তু কান দিচ্ছেন না প্রফেসর। চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিয়ে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে শুরু করলেন বক্তৃতা:

ভদ্রমহোদয়গণ, আজকের অনুষ্ঠানে মহিলাদের আসতে নিষেধ করেছি আমি। তাদের এখানে আসা নিপ্রয়োজন। কিন্তু তাই বলে ভাববেন না আমি মহিলা-বিদ্বেষী। যাই হোক, ওসব বাজে কথা থাক। আজকে এক বিশেষ এক্সপেরিমেন্ট করতে যাচ্ছি আমি। সফল হবই। কিন্তু বিপদের সম্ভাবনা আছে প্রচুর, গর্বিত ভঙ্গিতে আবার একবার সবার দিকে তাকালেন প্রফেসর। হাততালির আশা করলেন বোধহয়, কিন্তু কেউ তালি দিল আর।

আপনাদের চেহারায় অস্বস্তি লক্ষ করছি। কেউ বেশি ভয় পেয়ে থাকলে চলে যেতে পারেন। পত্রিকা অফিস থেকে যারা এসেছেন, তাদের জন্যে খুশির খবর আছে। আপনারা সব এদিক ওদিক ছিটিয়ে আছেন কেন? দেখার প্রয়োজন আপনাদেরই বেশি। কারণ পত্রিকার মাধ্যমেই পৃথিবীর সব দেশের লোক আমার পরীক্ষার কথা জানতে পারবে। আপনাদের অনুরোধ করছি, গর্তের মুখের কাছে মাটির পাহাড়টায় গিয়ে উঠে বসুন। পরিষ্কার দেখতে পাবেন সবকিছু; ছবি তোলা সহজ হবে। অনুরোধ করছি বলে ভাববেন না আপনাদের পছন্দ করা শুরু করেছি। ঘূণাটা সেই আগের মতই আছে। আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় দেখতে পেলেও আগের মতই মেরে হাড় গুঁড়ো করব। তবে আজকের কথা আলাদা। বিশেষ এই দিনটিতে অন্তত আপনাদের প্রতি রাগ, বিদ্বেষ ও ঘৃণা ভুলে যাবার প্রাণপণ চেষ্টা করছি আমি। আসুন, আপনারা সবাই মাটির পাহাড়ে চড়ন। ওটাই আপনাদের জন্যে সবচেয়ে ভাল জায়গা। আপনাদের মধ্যেও যদি কেউ ভয় পেয়ে থাকেন, সময় থাকতে চলে যেতে পারেন।

কোন সাংবাদিকই ভয় পেল বলে মনে হলো না। একে একে সবাই গিয়ে পাহাড়ে চড়ল। পত্রিকা অফিসের পিয়ন-দারোয়ানরাও পিছিয়ে রইল না। অপ্রত্যাশিতভাবে বলার ভাল জায়গা পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। দুএকজন রিপোর্টার প্রফেসরের উদ্দেশ্যে হাততালিও দিয়ে ফেলল।

মুচকি হাসলেন প্রফেসর। তারপর আবার শুরু করলেন, সামান্য একপাল মানুষকে খোটা দেয়ার কোন অভিপ্রায় আমার নেই। কিন্তু একটা ব্যাপার পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কি আমি করতে যাচ্ছি, সেটা ব্যাখ্যা করতে চাই না! করে কিছু বোঝাতে পারব না! কাউকে অসম্মান করার জন্যে বলছি না, আসলে আপনাদের মোটা মাথায় আমার পরীক্ষার তাৎপর্য তেমন বোধগম্য হবে না।

অভদ্রভাবে কথার মাঝে বাগড়া দেয়ার চেষ্টা করছেন কয়েকজন, দেখতে পাচ্ছি। মোষের শিংয়ের চশমাওয়াল; সাহেবকে অনুরোধ করছি, অহেতুক মাথার ওপর ছাতা নাড়বেন না। অন্যের দেখতে অসুবিধে হচ্ছে। এত শোরগোল করছেন কেন? ও, একপাল মানুষ শব্দটা পছন্দ হয়নি? বেশ, পরিবর্তন করে বলছি। আমার এক্সপেরিমেন্ট দেখতে এসেছেন একপাল অসামান্য মানুষ। শব্দচয়ন নিয়ে মাথা গরম করে বোকারা। হ্যাঁ, যে কথাটা বলতে যাচ্ছিলাম-মোষ ভদ্রলোক বাধা

দিলে, আই মীন, মোষের শিংওয়ালা ভদ্রলোক-আজকের এক্সপেরিমেন্টের ব্যাপারে অনেক চিন্তাভাবনা করে একটা বই লিখছি আমি। আমার জন্যে বইয়ের ভাষা খুব সহজ। তারপরেও ভাবছি, আপনাদের অতিসামান্য জ্ঞান-বুদ্ধিতে সেটা কতখানি সহজ হবে, কে জানে। বইটা এখনও প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু আমি জানি প্রকাশিত হলেই দুনিয়ার বড় বড় বিজ্ঞানীদের মাঝে সাড়া পড়ে যাবে। বড় বলছি বটে, কিন্তু তাই বলে ভাববেন না ওরা আমার চেয়ে বড়। পৃথিবী সম্পর্কে, পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কে এ ধরনের যুগান্তকারী বই আর লেখা হয়নি। এ যুগের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হয়ে থাকবে এটা।

দারুণ শোরগোল উঠল দর্শকদের মাঝে। টিটকারি আর ধারাল কথার শোর পড়ে গেল। নানাজনের নানা কথা:

আসল কথা বলে ফেলো, বোকা ভালুক!

ইয়ার্কি মারার জন্যে ডেকেছেন নাকি, সাহেব?

ফালতু কথা বলে আজ পার পেতে দেব না তোমাকে, মিয়া!

অনেক পয়সা খরচ করে এসেছি! কিছু একটা দেখাতেই হবে!

ভেবেছিলাম এসব শুনে খেপে যাবেন প্রফেসর। কিন্তু শান্ত রইলেন। বুঝিয়ে বলার আগেই যদি বার বার এ রকম বাধা আসে, তো হট্টগোল থামানোর জন্যে অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে আমাকে। ব্যবস্থাটা মোটেও উপভোগ্য হবে না বলে দিচ্ছি। হ্যাঁ, যা বলছিলাম, ভূ-স্তরে ছিদ্র করে একটা কূয়া বানিয়েছি আমি। পৃথিবীর দেহের নরম জায়গায় খোঁচা মেরে ফলাফলটা দেখতে চাই। ড্রিল বসানোর ভার দিয়েছি একজন উপযুক্ত ব্যক্তির ওপর। তার নাম পিয়ারলেস জোনস। কূপবিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে জাহির করে। সংবেদনশীল পৃথিবীর খোলসের ঠিক নিচে পিন ফোটানো হবে। এরপর কি ঘটবে, আমিও ঠিক জানি না।

প্রফেসরের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছি আমি আর ম্যালোন। আমাদের দিকে তাকিয়ে হুকুম দিলেন, যান তো, গিয়ে শেষবারের মত দেখে আসুন সব ঠিক আছে কিনা।

চ্যালেঞ্জারের বেয়াড়া বক্তৃতায় এমন শ্রোতা নেই যার গা জ্বলছে না। আমরা ভেতরের লোক, আমার নিজেরই মনে হচ্ছে, ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে স্নায়ুতে হুল ফোটানো হয়েছে। বাইরে থেকে যারা এসেছে, তাদের মনের অবস্থা বুঝতে পারলাম; অসন্তোষ আর ঘোর আপত্তির গুঞ্জনে মুখর হয়ে উঠল কম্পাউন্ড। শঙ্কিত হয়ে পড়লাম, গণপিটুনি না শুরু হয়ে যায় প্রফেসরের ওপর। কিন্তু ততটা এগোল না শ্রোতারা। প্রচণ্ড কৌতূহলে ফুটছে। কি করতে চান প্রফেসর, দেখতে চাইছে। সহ্য করছে সে-কারণেই;

মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন চ্যালেঞ্জার। সামনে ট্রাইপডে বসানো কন্ট্রোল প্যানেল। প্যানেলের একটা বিশেষ সুইচ টিপলেই চালু হয়ে যাবে জেনারেটর। বিদ্যুৎ গিয়ে চালু করবে মোটর, তীব্র গতিতে নেমে যাবে ড্রিলের ফলা।

লিফটে করে বিশ মিনিটে সুড়ঙ্গের তলায় মোটরের কাছে পৌঁছে গেলাম আমি আর ম্যালোন। যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে দেখলাম। সব ঠিকই আছে। নিচে তেরপলের তলায় কি ঘটছে দেখার প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু কৌতূহল দমন করতে পারলাম না দুজনের কেউ। দুরুদুরু বুকে নেমে গেলাম লিফটে করে। তেরপলের কোণা ধরে টান দিলাম। স্তব্ধ হয়ে গেলাম দেখে।

এই বিচিত্র বিস্ময় বলে বোঝানো কঠিন। রহস্যময় কসমিক টেলিপ্যাথি মারফত যেন আগেভাগে খবর পেয়ে গেছে বৃদ্ধ গ্রহটা, আর দেরি নেই, এখুনি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এক আজব পরীক্ষা যাতে তার বিশেষ যন্ত্রণা পাবার সম্ভাবনা আছে। মানুষ-কীটগুলোকে আর বেশি আস্কারা দেয়া যায় না। তাদেরকে যৎসামান্য শিক্ষা দেবার জন্যে যেন ফুসে উঠেছে পৃথিবী। প্রচণ্ড রাগে টগবগ করে ফুটছে তার স্নায়ুমণ্ডল। বড় বড় ধূসর বুদ্বুদ চড়চড় শব্দে বেরিয়ে আসছে ভেতর থেকে। ওপরে পৌঁছে ফেটে যাচ্ছে বিশ্রী শব্দে। উপরিভাগের কয়েক ইঞ্চি নিচে ছোটবড় কোষের মত বস্তুগুলো দারুণ উত্তেজনায় অস্থির। ঘনঘন পরস্পরের গায়ে লেগে গিয়ে আবার আলাদা হয়ে যাচ্ছে। স্পন্দনের ঢেউ আগের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত এবং জোরাল। কোষগুলোর মাঝে প্রবাহিত হচ্ছে ঘন কালচে-লাল এক ধরনের তরল পদার্থ। বদ্ধ ভাপসা বাতাসে তীব্র কটু গন্ধ।

কানের কাছে ফিসফিস করে বলল ম্যালোন, ও, মাই গড! জোনস, চলো, এক্ষুণি পালাই! যে কোন মুহূর্তে ফেটে পড়বে পৃথিবী। কোন কাণ্ড বাধাচ্ছে প্রফেসর, ঈশ্বরই জানে!

বিশ ফুট ওপরের চাতালে উঠে এলাম। দেয়ালের গায়ে ভয়াবহ দৃশ্য নিচের ধূসর প্রহেলিকার মতই স্পন্দিত হচ্ছে এখন নরম দেয়াল। আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় শঙ্কিত যেন। দেয়ালের ভয়ানক কাঁপুনির ফলে প্রায় খুলে এসেছে বরগা দুটো। ধসে পড়বে যে কোন সময়। সুইচ টেপার আর দরকার হবে না। এমনিতেই ঢুকে যাবে ড্রিলের ফলা পৃথিবীর নরম সংবেদনশীল অংশে।

ম্যালোনকে বললাম, কেয়ামত হয়ে যাবে আজই, ম্যালোন। প্রফেসরের পাগলামি সমস্ত প্রাণিজগতের বিষম বিপদ ডেকে আনবে। তারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেব আমি। যা হয়, হোক। আপনা-আপনি বরগা ধসে পড়লে আমার করার কিছু নেই। কিন্তু গোটা দুনিয়াটাকে বিপদে ফেলতে পারব না আমি। ওফ, কি ভয়ঙ্কর!

দ্রুতহাতে মোটর থেকে জেনারেটরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলাম। তারপর লাফ দিয়ে লিফটে উঠলাম দুজনে। সঙ্গে সঙ্গে লিফটের সুইচ টিপে দিল ম্যালোন। তীরবেগে উঠতে লাগল লিফট। কিন্তু কুয়ার মুখে পৌঁছানো পর্যন্ত টিকবে কিনা বর্গাটা নিশ্চিত হতে পারলাম না।

সুড়ঙ্গের মুখে চাতালে এসে দাঁড়াল লিফট। এক লাফে নেমে এলাম। কয়েক গজ পেরোতে না পেরোতেই ঘটল অঘটন। একসঙ্গে কয়েক কোটি কামান গর্জে উঠল যেন কূয়ার তলায়। থরথর করে কেঁপে উঠল পায়ের তলার মাটি। টাল সামলাতে না পেরে উপুড় হয়ে পড়ে গেলাম ঘাসের ওপর।

ভয়ঙ্কর সাইক্লোন দুরন্ত বেগে বয়ে যাবার আগে যেমন হয় তেমনি, কিন্তু তারচেয়েও হাজারগুণ বেশি জোরাল শব্দ ভেসে এল আবার কূয়ার তলদেশ থেকে। নিথর গ্রীষ্মের আকাশ চিরে ওই শব্দের রেশ ধেয়ে গেল দক্ষিণ উপকূলের দিকে। চ্যানেল পেরিয়ে চলে গেল হয়তো ফরাসী ভূমিতেও। বুঝলাম, এটা আহত ধরিত্রীর আর্তনাদ।

কূয়ার মুখের দিকে ফিরে তাকালাম। প্রথমে কামানের গোলার মত ছিটকে বেরিয়ে এল একে একে চোদ্দটা লিফট। তারপর ঘেঁড়াখোড়া তার আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি। তীরের ফলার মত আকাশের দিকে ছুটে গেল লম্বা ড্রিলের ফলাটা। ফিরে এসে কোথায় কার গায়ে পড়বে, কয়জনকে একসঙ্গে গাথবে, কে জানে! আলকাতরার মত ঘন চটচটে লালচে-কালো উষ্ণ প্রস্রবণ বেরোল এরপর। ফোয়ারার মত আকাশের প্রায় দুহাজার ফুট ওপরে উঠে গেল। তীব্র দুর্গন্ধে ভরে গেল হেংগিস্ট ডাউনের বাতাস।

উপরে উৎক্ষিপ্ত হয়ে সেই তরল পদার্থ সোজা এসে পড়তে লাগল অশ্বখুর পাহাড়ে। দুর্গন্ধময় তরল পদার্থে পত্রিকা অফিসের প্রতিটি লোক যেন গোসল করে উঠল। এতক্ষণে বুঝলাম কেন ওদেরকে আদর করে ডেকে নিয়ে গিয়ে ওখানে বসিয়েছিলেন প্রফেসর। নিদারুণ এক রসিকতা করেছেন পত্রিকাওয়ালাদের সঙ্গে। রয় পার্কিন্স আর তার সম্পাদকের অপমানের শোধ নিয়েছেন। তিনি জানতেন পৃথিবীর দুর্বল জায়গায় খোঁচা সাগলে ওই দুর্গন্ধময় তরল পদার্থ বেরোবে। ফোয়ারার মত উঠে গিয়ে ঝরে পড়বে অশ্ব-পুর পাহাড় আর তার চারপাশের এলাকায়। তাঁর অনুমান সঠিক হয়েছে। পরে শুনেছি জঘন্য সেই তরল পদার্থের গন্ধ নাকি জামাকাপড় তো বটেই, গা থেকে তাড়াতেও কয়েক মাস লেগেছিল সাংবাদিকদের। রাস্তায় বেরোতে পারেনি। ফ্লীট স্ট্রীটের খবরের কাগজের অফিসগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

যাই হোক, পৃথিবীর আক্ষেপ থামল এক সময়। উত্তেজনায় সময়ের হিসেব রাখতে পারিনি, তাই বলতে পারব না ঠিক কতক্ষণ তড়পেছে গ্রহটা!

চারদিক আবার নিথর হয়ে আসতে উঠে দাঁড়ালাম। যার যার জায়গায় স্থাণুর মত স্থির বসে আছে জনতা। টু শব্দ নেই। মঞ্চে ঠায় দাঁড়িয়ে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার। কূয়ার দিকে তাকিয়ে হাসছেন মিটিমিটি।

সব গণ্ডগোল থেমে যাবার পর প্রায় একসঙ্গে হুল্লোড় করে উঠল জনতা। চ্যালেঞ্জারের জয়জয়কারে ফেটে পড়ল হেংগিস্ট ডাউনের কম্পাউন্ড। কিন্তু একজন সাংবাদিকও কথা বলল না। ক্যামেরা ব্যবহার করল না কেউ একটা ছবি তুলল না প্রফেসরের। চ্যালেঞ্জারের প্রতি তীব্র ঘৃণা আর বিদ্বেষ আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে ওদের।

লন্ডনের কোনও পত্রিকায় এই অকল্পনীয় আজব খবরটা বেরোল না।

পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশের পত্রিকায় কিছু কিছু খবর বেরোল, তবে তাতে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের গবেষণার কথা কেউ লেখেনি; ওর লিখেছে:

পৃথিবীর সবকটা আগ্নেয়গিরি, এমনকি মৃত আগ্নেয়গিরিগুলো পর্যন্ত কয়েক মিনিট অগ্নিবর্ষণ করেছে লন্ডন সময় সকাল সাড়ে এগারোটার পর থেকে। ভিসুভিয়সের চুড়া উড়ে গেছে। লাভার স্রোত বেরিয়েছে এটনার মুখ দিয়ে। ইটালির বেশির ভাগ আদুরের খেত ধ্বংস হয়ে গেছে লাভার কারণে। ব্রিটিশ সরকারের কাছে পাঁচ লক্ষ লিরা খেসারত দাবি করেছে এ জন্যে ইটালির সরকার। (ব্রিটিশ সরকার দোষটা চাপিয়ে দিয়েছে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের ঘাড়ে, খেসারতটা দিতে হবে চ্যালেঞ্জারকে। পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল মুখর হয়ে গিয়েছিল স্ট্রলির আর্তনাদে। পৃথিবীর সব জায়গাতেই প্রচণ্ড ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। অনেক বাড়িঘরের ক্ষতি হয়েছে। (এ সব ক্ষতিপূরণও দিতে হবে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারকে) ব্রটিশ সরকারকে হুমকি দিয়েছে ক্ষতি হওয়া দেশগুলোর সরকার-এক মাসের মধ্যে সমস্ত ক্ষতিপূরণ আদায় না করলে একজোট হয়ে বৃটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে তারা।

ক্ষতিপূরণের সব টাকা দিতে রাজি হয়েছেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার। টাকার অভাব হবে না। হেংগিস্ট ডাউনের বিশাল কয়লাখনির মালিক এখন তিনি।

যেদিন পৃথিবীকে খোঁচা মেরেছেন প্রফেসর, সেরাতে তার বাড়িতে বিল নিয়ে গেলাম। নির্দ্বিধায় চেক কেটে দিলেন তিনি। চেকটা বাড়িয়ে ধরে বললেন, মিস্টার জোনস, রয় পার্কিন্সের মুখটা দেখেছিলেন তখন? আমি দেখেছি। আহা, যা চেহারা হয়েছিল না! দেখার মত! সবার আগে ভাল ছবি তোলার জন্যে গর্তের একেবারে কিনারে গিয়ে বসেছিল বোকা ছাগলটা। হাহ্ হাহ্ হাহ্ হাহ্‌! ঘরকাঁপানো প্রচণ্ড অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *