০৮. টিউবা সিটির দিকে পা

ইচ্ছা করেই এতদিন টিউবা সিটির দিকে পা বাড়ায়নি জেকব। ওর পক্ষে ফ্রীডম শহরের চেয়ে টিউবা যাওয়া অনেক সোজা হত-কাছেও পড়ত। তবু সে টিউবা যায়নি কারণ ওখান থেকে রসদ আনতে গেলে তার এই অঞ্চলে উপস্থিতির খবর অ্যারিজোনার শেষ মাথা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।

কিন্তু এখন ঠিক তাই সে চাইছে।

সব গুছিয়ে নাও, ডালিয়াকে বলল জেকব। আমরা এদেশ থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে প্রেসকটের দিকে রওনা হব।

ডালিয়ার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির জবাবে আবার সে বলল, অন্তত সেই রকমই ভাব দেখাব আমরা। প্রেসকটের দিকে রওনা হয়ে যেন সত্যি ওই দিকেই যাচ্ছি এমন ভান করব-পরে বালির পাহাড়গুলো ঘুরে আবার এদিকে ফিরে আসব। বালুর ওপর আমাদের সব ছাপ খুব জলদি মিলিয়ে যাবে।

তুমি ওদের বোঝাতে চাও যে আমরা চলে গেছি?

কিছু সময় খরচ হবে, কিন্তু অনেক ঝামেলা থেকে আমরা বেঁচে যাব।

কিন্তু ওরা যদি টিউবা সিটিতেই আস্তানা গেড়ে থাকে? ওদিক দিয়েই তো যেতে হবে আমাদের?

হতে পারে। সম্ভাবনাটাকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেয়া যায় না। যদি তাই হয়, তবে ওখানেই একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে। ভাগ্যে থাকলে তাই হবে।

মানুষে মানুষে একটা অদৃশ্য নিয়তির যোগসূত্র থাকে। সেই টানেই হয়তো সেদিন রাতে হঠাৎ লী-র ঘুম ভেঙে গেল। জেগে উঠে শুয়ে থেকেই নিজের দুই হাতের উপর মাথা রেখে অন্ধকার রাত্রির দিকে চেয়ে রইল সে।

নিকোলাসের উপর নির্ভর করে আর বসে থাকা যায় না। আগামীকাল কী। তার র‍্যাঞ্চের কাজ শেষ করে কিছুদিন ফুরসত পাবে-ইউজিনও আসবে ওর সাথে।

ইউজিনের কথা মনে পড়তেই একটু বিরক্তি বোধ করল লী। ওর গা জ্বালানো উদ্ভট মন্তব্য, আর শেষের দিকে এই মিশনের প্রতি আস্থার অভাবই লী-র এই বিরক্তির কারণ। চুলোয় যাক ওর কথা…এমনিতে অবশ্য লোক হিসাবে ইউজিন খুব খারাপ নয়।

লী-র চিন্তাধারা উত্তরে মোড় নিল এবার। টিউবা সিটি..হা ওখানেই যাবে সে। নাভাজো এলাকায় কেউ থাকলে টিউবা সিটিতে ঠিকই তার খবর পাওয়া যাবে। আর তা ছাড়া রসদের দরকার হলে, ফ্রীডমে আসার পথ যখন বন্ধ, জেকবকে টিউবা সিটি থেকেই তা সগ্রহ করতে হবে। ফ্রীডমে না ফিরে আগেই ওদের টিউবা গিয়ে জেকবের অপেক্ষায় বসে থাকা উচিত ছিল।

অন্ধকার কাটেনি, তবু বিছানা ছেড়ে উঠে জামাকাপড় পরে নিল লী। আগুনটাকে একটু উস্কে দিয়ে একটা মোমবাতি জ্বালাল সে। তারপর উইনচেস্টারটা নামিয়ে পরিষ্কার করতে বসল। ওর সামনে আগুনের শিখা যুদ্ধের নাচ নাচছে।

আরও উত্তরে পাহাড়ের একটা খাঁজের ভিতরে লকলকে ফণা তুলে নাচছে আর একটা আগুন। আগুনের পাশে কুঁজো হয়ে বসে গভীর চিন্তায় মগ্ন নিকোলাস। ওর সঙ্গী দু’জনের একজন এখনও ঘুমাচ্ছে, অন্যজন সজাগ রয়েছে। একবার ওদিকে চেয়ে দেখল নিকোলাস।

টিউবায় ফিরে যাব আমরা, বলল নিক। সকালে সূর্য ওঠার সাথে সাথেই রওনা হব।

ঠিক আছে, লম্বা চিকন মুখো লোকটা সাড়া দিল। যুবকের চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল। ওদের দুজনকে ধরার পর মেয়েটাকে কে পাচ্ছে? প্রশ্ন করল সে।

নিকের প্রকাণ্ড মাথাটা ধীরে ধীরে ওর দিকে ঘুরল। চোখে-চোখে চেয়ে আছে লোকটার দিকে সে-ঠাণ্ডা আর স্থির ওর চোখ দুটো। আমি, শান্ত গলায় জবাব দিল নিকোলাস। আমার আশ মিটে গেলে ইচ্ছা করলে তুমি ওকে পেতে পারো। তবে একটা কথা, আমাদের কাছ থেকে কোন অবস্থাতেই ওকে জীবিত ফিরতে দেয়া চলবে না।

অবজ্ঞাভরে কাঁধ ঝাঁকাল যুবক। তাতে আপত্তি নেই আমার, বলে আগুনের কাছ থেকে একটু সরে স্থির দাঁড়িয়ে দূরে অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইল সে। সেই চোখা চূড়াটা উত্তর দিকে দেখা যাচ্ছে। তা হলে…

ফিরে চাইল সে। আগুনটাকে একটু খুঁচিয়ে দিচ্ছে নিক। ওকে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না যুবক। এতে ওই বিশাল লোকটার একটা মতলব নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু সেটা কী তা জানার কোন আগ্রহ তার নেই। সে-ও একটা নিজস্ব পরিকল্পনা আর উদ্দেশ্য নিয়েই হাজির হয়েছে এখানে।

উঠে দাঁড়াল নিকোলাস। ঘুমাতে যাচ্ছি আমি। তুমি আমাদের ঘোড়াগুলোর একটু দেখাশোনা করো, মন্টি।

.

যাযাবর নাভাজোদের তৈরি পরিত্যক্ত কঁচা ঘরগুলো নিয়েই গড়ে উঠেছে টিউবা সিটি ব্যবসা কেন্দ্র। একজন হোপি চীফের নামেই এই শহরের নাম।

জেকব তার পিস্তলের ট্রিগার থেকে চামড়ার বেল্টটা সরিয়ে ফেলল। ঘোড়ার পিঠে খাপে ভরা উইনচেস্টার রাইফেলটাও সহজে বেরিয়ে আসে কিনা একবার পরখ করে দেখল সে। 

টিউবা পোস্টের দিকে এগিয়ে উত্তর দিককার বালির ঢিবির মধ্যে দিয়ে ঘুরে পশ্চিমে গিয়ে ভাল করে পরিস্থিতিটা বুঝে নিল। মাত্র একটা ক্লান্ত দুর্বল ইন্ডিয়ান টাট্ট বাঁধা রয়েছে পোস্টের বাইরে। শান্ত পরিবেশ-সকালের স্তব্ধ বাতাসে চিমনির ধোয়া অলস গতিতে পাক খেয়ে উপরে উঠছে।

ঘরটা কাঁচা বলে ভিতরটা বাইরে থেকে অনেক ঠাণ্ডা। একটা লিকলিকে পাতলা লোক কাউন্টারে বসে চামড়ার ফিতে দিয়ে বেণী গেঁথে বেল্ট তৈরি করছে। আগুন নেভানো ফায়ার-প্লেসের কাছে আর একটা চেয়ারে পা তুলে দিয়ে বসে আছে একজন শক্তিশালী পেশীওয়ালা মানুষ। লোকটার কঠিন তামাটে মুখে দু’টো গভীর লম্বা ক্ষত চিহ্ন।

দোকানদারির কাজ কেমন যেন বেখাপ্পা ঠেকে আমার, অসন্তোষ প্রকাশ করল রোগা লোকটা। কিন্তু তবু কিছুটা স্বস্তি, নাভাজো ইন্ডিয়ানের দল ওদের ছাগল নিয়ে সরে গেছে আরও ভিতর দিকে পাহাড়ের উপর। গত দুই সপ্তাহের মধ্যে আর কোন ইন্ডিয়ান দেখিনি আমি।

ষণ্ডা-মার্কা লোকটা পাইপ হাতে নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে আছে। সব সময়েই বাইরেটা পরিষ্কার দেখা যায় এমন জায়গায় ওর বসার অভ্যাস। বদ্ধ পরিবেশে দম আটকে আসে ওর।

তুমি কি আবার সোনার খোঁজে বেরুবে, কেলভিন? কথা বলার সঙ্গী পেয়ে পাতলা লোকটা খুব খুশি। চুপ করে থাকতে শেখেনি সে-বলার কিছু না থাকলেও বকবক করাই চাই

হু, জানালা দিয়ে দুজন মানুষকে ঘোড়ায় চড়ে আসতে দেখে সেদিক থেকে চোখ না সরিয়েই জবাব দিল কেলভিন। উত্তর দিক থেকে পৌঁছেছে ওরা, অথচ এখন আসছে পশ্চিম থেকে। অর্থাৎ ঘরের বাইরে কয়টা ঘোড়া বাধা আছে দেখে নিয়ে তবেই আগে বেড়েছে। ওদের মধ্যে একজন মেয়ে। পাশ ফিরে জিনে বসার ভঙ্গি দেখেই তা বোঝা যাচ্ছে। এদেশে মেয়েদের সচরাচর ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে দেখা যায় না।

এক মিনিট পরে পাইপ ধরিয়ে তাতে লম্বা একটা টান দিয়ে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে কেলভিন বলল, দু’জন অতিথি আসছে। নিজেকে একটু দুরস্ত করে নাও-ওদের একজন আবার মহিলা।

চমকে উঠে কাউন্টার থেকে নেমে তাড়াতাড়ি জানালা দিয়ে উঁকি দিল সে। তাই তো? এ যে দেখছি সত্যিই একজন জলজ্যান্ত ভদ্রমহিলা!

ঘোড়া বাঁধার রেলের কাছে পৌঁছে নিচু গলায় মহিলাকে কিছু নির্দেশ দিয়ে ঘোড়া থেকে নামল পুরুষ লোকটা। মেয়েটি ঘোড়ার পিঠেই বসে রইল।

ঝামেলা, বলে উঠল কেলভিন।

বুঝলাম না, কী বললে?

কিছু না। নিজের মনেই কথা বলছি। তুমি এদিকে কান দিয়ো না।

রাইফেলের ব্যারেল দিয়ে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল জেকব। এতে ওর উই চেস্টারটা কাউন্টারের দিকে তাক করা থাকল। কিন্তু ওটা কোমরের কাছে। ধরা রয়েছে বলে ভিতরে বসা লোকের কাছে আপত্তিজনক বা অশোভন দেখাল না।

কেলভিনের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। কিছু বলতে গিয়েও আবার পাইপ মুখে দিয়ে চুপ করে গেল সে। জেকব ওর দিকে এমনভাবে চাইল যেন ওকে চেনেই না সে।

এখানে মহিলাদের হাত-মুখ ধোয়ার কোন জায়গা আছে? আমার স্ত্রীর জন্য বলছি।

নিশ্চয়ই, ব্যস্ত হয়ে উঠে হাত দিয়ে তার পিছনের দরজাটা দেখাল রোগা লোকটা। মালিকের থাকার ঘরটায় সব ব্যবস্থাই আছে-এটা ব্যবহার করতে পারে তোমার স্ত্রী।

ঘাড়টা সামান্য ফিরিয়ে ডালিয়াকে ভিতরে আসতে বলে ঘরে ঢুকল জেকব। ওকে ঘোড়া থেকে নামাতে গেলে ভিতরের দিকে পিঠ ফেরাতে হবে-কোন ঝুঁকি নিতে রাজি নয় সে। কেলভিনের সাথে গত কয়েক বছরে তার আর দেখা হয়নি, তবু ওর তরফ থেকে বিপদ আশা করছে না জেকব।

আমাদের কিছু রসদ দরকার, যত্ন করে লেখা একটা তালিকা কাউন্টারের উপর রাখল সে। এদিকে পশ্চিমে সবচেয়ে কাছে পড়বে প্রেসকট, তাই না?

হুঁ। দরজার দিকে চেয়ে ছিল লোকটা, ডালিয়াকে ঢুকতে দেখে চোখ দু’টো ওর উপরই আটকে গেল। মেয়েটার উপস্থিতি এই সাদামাঠা ঘরটার চেহারাই পালটে দিয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় চলেছ? ডালিয়ার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই জেকবকে প্রশ্ন করল লোকটা।

না, প্রেসকটের আশেপাশেই কোথাও..হয়তো স্কাল ভ্যালিতে যাব।

দরজার ওপাশে হাত-মুখ ধুতে গেল ডালিয়া। তালিকা অনুযায়ী মালপত্র জড়ো করায় ব্যস্ত হলো লোকটা। ফায়ার-প্লেসের কাছে গিয়ে দাড়াল জেকব

এখান থেকে পশ্চিমের পথটা কেমন? কেলভিনকে প্রশ্ন করল সে।

মাঝবয়সী কেলভিন কৌতুকপূর্ণ চোখে ওর দিকে চেয়ে জবাব দিল, দু’একবার ওদিকে গেছি আমি..রাস্তাটা মোটামুটি ভালই।

নিচু গলায় সে প্রশ্ন করল, ফ্রীডমের লোকটাকে তুমিই মেরেছ?

হ্যাঁ।

চেহারার বর্ণনায় তোমার সাথে মিল আছে…কিন্তু ঘটনার বর্ণনায় নেই।

বারের দিকে মুখ করে দাড়িয়ে ছিল সে। সামান্য ঘুরেই গুলি করে লোকটা। আমার প্রথম গুলি লাগে ওর বাম কাঁধের পিছনে, ঠিক মেরুদণ্ডে। দরজাটাকে বাঁ দিকে রেখে দাঁড়িয়ে ছিল, চালাকি করে সামনের দিকে কোমরে গোঁজা পিস্তল বের করে বাম কনুইয়ের তলা দিয়ে গুলি চালিয়েছিল সে। অন্যায়ভাবে ওকে মারিনি।

সে বিষয়ে কখনোই সন্দেহ করিনি আমি।

কাউন্টারের লোকটা মাপজোখ করে প্যাকেট গুছাচ্ছে।

ওরা তোমাকে ধরার জন্যে একজন কঠিন চেহারার অপরিচিত লোককে মার্শাল নিযুক্ত করেছে।

নিকোলাস?

চমকে মুখ তুলে চাইল কেলভিন। তুমি চেনো ওকে?

একটু আড়াআড়ি আছে আমাদের, বদ্ধ দরজাটা দেখিয়ে সে বলল, ওকে নিয়ে।

কিছুটা সময় নীরবে কাটল। লিস্ট দেখে প্রত্যেকটা জিনিসই খুঁজে বের করতে হচ্ছে। বেচারী নতুন মানুষ। মালিক ওর উপর ভর দিয়ে ব্যবসার কাজে প্রেসকট গেছে। দেরি হচ্ছে, কিন্তু জেকবের তাড়া নেই।

ওদিকে তিনজন লোক রয়েছে, ওদের চেনো তুমি?

একটু ইতস্তত করে কেলভিন বলল, না,…ঠিক চিনি বলা যায় না। ওদের একজন সম্ভরত নিকোলাস।

আরও অনেক লোকই আসবে এখন। আমি ওদের মরমন কুয়ার কাছে নিয়ে গেছিলাম।

শুনেছি। মেঝেতে পা নামিয়ে বসল, কেলভিন। তাতে ওদের কোন কাজ হবে না। বহু বছর আগে থেকেই জায়গাটা চিনি আমি-লাভ হয়নি। হঠাৎ কী মনে করে সে আবার বলল, তুমিও কি সেই হারানো ওয়্যাগনগুলো খুঁজছ নাকি?

আমি? আরে না! আমিও সোনার আশাতেই ঘুরছি, তবে আমার সোনা চার খুরের ওপর দাঁড়ানো একটা স্ট্যালিয়ন।

দু’একবার আমার চোখেও পড়েছে। সত্যি, ওটা একটা ঘোড়ার মত ঘোড়াই বটে!

কেউ জানতে চাইলে বোলো প্রেসকটে স্কাল ভ্যালিতে গেছি আমি। ওখানেই বাস করব।

সুন্দর জায়গা।

অযাচিতভাবে প্রশ্ন করা বা কিছু বলা, কেলভিনের স্বভাববিরুদ্ধ। জেকব যে প্রেসকটে যাচ্ছে না তা আগেই আন্দাজ করেছে সে। নিজে যেমন নেশার ঘোরে সোনার পিছনে ঘুরছে, জেকবও তেমনি ঘুরছে ঘোড়ার পিছনে। ঘোড়া ছেড়ে নড়বে না ও।

ডালিয়া এঘরে ফিরে এল। ওর দিকে চেয়ে নতুন করে বিস্মিত হলো কেলভিন একেই বলে রূপ! ঈশ্বর, তুমি মহান!

ছালায় বাঁধা রসদ তুলে নিয়ে বাইরে মালবাহী গাধাগুলোর কাছে গেল জেকব। ট্রেইলের দিকে চেয়ে দেখল। পাহাড়ের ভিতর ঢোকার আগে পর্যন্ত স্বস্তি পাবে না সে। গাধার পিঠে বোঝাটা তুলে দিয়ে শক্ত করে বাঁধা শেষ হতেই ডালিয়া এগিয়ে গেল ওর দিকে। দোকানির সাথে কেলভিনও দরজার কাছে এসে দাড়িয়েছে।

ডালিয়াকে ধরে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিয়ে ওদের দিকে ফিরে জেকব বলল, স্কাল ভ্যালির ওদিকে যদি কখনও তোমরা যাও, আমার ওখানে অবশ্যই এসো-তোমাদের দু’জনেরই দাওয়াত রইল।

কেউ আসছে, বলল কেলভিন। দু’জন ঘোড়সওয়ার।

আতঙ্কিত কণ্ঠে ডালিয়া ডাকল, জে!

ভয় পেয়ো না।

মাত্র দু’শো গজ দূরে, পশ্চিম দিক থেকে আসছে ওরা-অর্থাৎ ওরা ফ্রীডমের লোক হওয়াও বিচিত্র নয়। স্বাভাবিক নিশ্চিন্ত গতিতে এগিয়ে আসছে। একটু একটু করে কিছুটা সরে গেল জেকব। এখন গোলাগুলি হলে ডালিয়ার গায়ে লাগার ভয় নেই।

কাছে এসে ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিয়েছে ওরা। জিনের পেটি বাঁধার ছলে নিজের ঘোড়ার আড়ালে রইল জেকব

এসে পড়ল ওরা। ওদের দুজনকেই চিনতে পারল জেকব। তার পিছনে ধাওয়া করে যে দলটা গেছিল, এরা সেই দলে ছিল।

নিজের ঘোড়াটা কাঠের রেলের সাথে বেঁধে রেখে দরজার দিকে চাইল বার্ট। দেখল কেলভিন সন্ত্রস্তভাবে ওখান থেকে সরে দাড়াল। ওর হাবভাবে ঝট করে মাথা ঘোরাল বার্ট। তার ভয় হচ্ছে হয়তো এই সেই লোক।

এই অবস্থায় ওর পক্ষে দ্রুত পিস্তল বের করে গুলি করা অসম্ভব। লক্ষ্য ভেদ করতে হলে তাকে সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়িয়ে তাক করে গুলি ছুঁড়তে হবে। ক্লাইভ যে ঠিক কোথায় আছে দেখতে পাচ্ছে না-সে তার পিছনেই বাম দিকে কোথাও আছে।

জেকব যেখানে রয়েছে সেখান থেকে ওদের দুজনকেই গুলির আওতায় পাচ্ছে। এসব কিছুই না বুঝে নিশ্চিন্ত মনে জিনের পেটি খুলছে ক্লাইভ। বার্ট ঘামছে।

বেশ, বেশ, এই তো চাই, কর্কশ চড়া সুরে বলে উঠল বার্ট। ঘোড়ার খুব যত্ন নেয় এমন লোকই আমার পছন্দ!

তোমার আবার হঠাৎ কী হলো? ক্লাইভের গলায় বিস্ময় প্রকাশ পেল। আমি

এতক্ষণে জেকবের দিকে চোখ পড়ল তার। একেবারে স্থির হয়ে জমে গেল ক্লাইভ। জেকব যে তৈরি হয়ে আছে তা বুঝিয়ে দেবার অপেক্ষা রাখে না।

তোমরা দু’জন পিস্তলের বেল্ট দুটো খুলে ফেলল, শান্ত গলায় বলল জেকব। শান্তিপূর্ণ জায়গা এটা, একে গোলাগুলি করে রক্তাক্ত করা ঠিক হবে না। লক্ষ্মী ছেলের মত বেল্ট খুলে মাটিতে ফেলে দাও।

এই যে শোনো, শুরু করল ক্লাইভ। আমি…’

চুপ করো, ধমকে উঠল বার্ট। যা বলা হচ্ছে, তাই করো!

দু’টো বেল্টই মাটিতে পড়ল। দোকানির উদ্দেশে জেকব বলল, বেল্ট দু’টো তুলে নিয়ে যাও। কিন্তু সাবধান, আমাদের মাঝখানে দাড়িয়ো না যেন-ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে।

ওগুলো উঠিয়ে নেওয়া হতেই ঘোড়ার পিছন থেকে বেরিয়ে এল জেকব। এবার একটু পিছনে সরে স্থির হয়ে বসো। বাইবেলের বাণী শোনাব আমি।

সংক্ষেপে ডেরিকের মৃত্যুর ঘটনাটা সে বর্ণনা করল। শেষে বলল, আমার পিছনে ধাওয়া করার জন্যে তোমাদের দোষ দিই না আমি, কারণ তোমরা আসল ঘটনা জানতে না। এখন জানলে।

অর্থাৎ কী বলতে চাও তুমি? উদ্ধত কণ্ঠে প্রশ্ন করল বার্ট।

মানে এর পরেও যদি আমার পিছনে তোমাদের ঘুরতে দেখি তা হলে ধরে নেব বন্ধুত্ব চাও না তোমরা।

তোমার পিছনে ঘুরছি কে বলল? প্রতিবাদ করল ক্লাইভ। আমরা দু’জন তো সোনা খুঁজতে এসেছি!

সেটা তোমাদের খুশি। কিন্তু মনে রেখো আবার আমার পিছনে লাগতে আসলে চিরদিনের মত তোমাদের জন্যে ছয়ফুট মাটির ব্যবস্থা আমি করব।

ইচ্ছা করেই ওদের দিকে পিছন ফিরে ঘুরে নিজের ঘোড়র কাছে এগিয়ে গেল জেকব। ঘোড়ায় চড়ে ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে চেয়ে দেখল দুজনের কেউ বিন্দুমাত্র নড়েনি।

চুপ করে থাকার মানুষ নয় বার্ট। সে বলে উঠল, তুমি খুব বাহাদুর, কিন্তু তাতে আমাদের কিছু আসে যায় না। এটা জেনো, মরণ লেখা আছে তোমার কপালে। লী যদি তোমাকে শেষ করতে নাও পারে, নিকোলাস অবশ্যই করবে।

ওর কথায় কান না দিয়ে ডালিয়াকে নিয়ে রওনা হয়ে গেল জেকব। একবার পিছন ফিরে দেখল ওরা দু’জন তখনও বসেই আছে। ওরা ছোট পাহাড়টার ধারে পৌঁছা’নো পর্যন্তও দু’জনে বসেই রইল। যখন উঠল তখনও কোন তাড়াহুড়া দেখা গেল না ওদের মধ্যে।

তোমাকে দেখে ভয়ে একেবারে অস্থির হয়ে উঠেছিল ওরা, বলল ডালিয়া।

না, লিয়া, ভীতু নয় ওরা। ওদের বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিলাম আমি। ওই অবস্থায় নেহাত হাঁদারাম ছাড়া ঝুঁকি নেবে না কেউ। ভিন্ন পরিস্থিতিতে ওরা আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়তে দ্বিধা করবে না।

তুমি যা করলে তাতে শক্ত নার্ভের দরকার।

নিজের কর্তব্য মানুষকে করতেই হয়।

সোজা পশ্চিম দিকে এগিয়ে চলল ওরা। মাঝে মাঝে পিছন ফিরে কেউ অনুসরণ করছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখছে জেকব। কিন্তু ধুলো ওড়ার কোন চিহ্ন দেখা গেল না।

ওই লোকটার সাথে তোমার আগের পরিচয় ছিল?

কেলভিনের সাথে? হ্যাঁ, ওকে আমি অনেকদিন থেকেই চিনি। হারানো ওয়্যাগনের সোনা যদি কেউ খুঁজে বের করতে পারে, তবে কেলভিনই পারবে।

নিশ্চিত হয়ে অমন কথা কেউ বলতে পারে না। যে কেউ পেতে পারে। অপ্রত্যাশিত ভাবেও বেরিয়ে পড়তে পারে ওগুলো। বলেই অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল ডালিয়া। উদ্বিগ্ন স্বরে সে প্রশ্ন করল, আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় ওরা আমাদের কথা বিশ্বাস করবে? মনে করবে আমরা সত্যিই দেশ ছেড়ে চলে গেছি?

আশা করতে দোষ নেই। এবারে ওই ঘোড়াগুলোর জন্যে ফিরে যাব আমরা।

ঘোড়া নিয়ে প্রেসকটে ফিরলে তো ওরা ওখানের হামলা করতে পারে?

হয়তো। কিন্তু আমার ধারণা ওরা প্রেসকটে আমাদের খোঁজ না পেয়ে হতাশ হয়ে ওই এলাকায় আর খুঁজতে যাবে না।

ছায়া দেখে সময় অনুমান করার চেষ্টা সরল জেকব। সামনে একটা জায়গা আছে যেখানে মুহূর্তের জন্যও বালু স্থির থাকে না। রাতের অন্ধকারে সে ওখানে। পৌঁছতে চায়। তা হলে ওদের পায়ের ছাপ তো থাকবেই না, উপরন্তু অন্ধকারে ওরা যে কোনদিকে গেছে সেটা কারও দেখে ফেলারও ভয় থাকবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *