০৮. খুব সহজেই কাজ হলো

খুব সহজেই কাজ হলো এবার।

এটাই তো মনে হচ্ছে, হাতের কাগজটার দিকে চেয়ে ঠিকানা মিলিয়ে নিল মূসা দুটো ঠিকানা লিখে নিয়েছে, তার একটা মিলছে। গাড়ি রাখুন।

রাস্তার ধারে রোলস নামিয়ে আনল শোফার। হ্যানর্সন নয়, নতুন আরেকজন। বেঁটে, শয়তানী ভরা চাহনি, নাম ক্র্যাব। মুসার মনে হলো কাঁকড়ার দাঁড়ার মতই হাত নাড়ে লোকটা। রবিনও রয়েছে গাড়িতে। দুজনের কেউই পছন্দ করতে পারছে নতুন শোফারকে। সকালে রোলস-রয়েসের জন্যে ফোন করেছিল কিশোর, কোম্পানির ম্যানেজার জানিয়েছে জরুরী কারণে ছুটি নিয়েছে হ্যানসন। নতুন ড্রাইভার দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে গাড়ি।

এঞ্জিন বন্ধ করে দুই গোয়েন্দার দিকে ফিরে হাসল ক্র্যাব। কিশোর আসেনি সঙ্গে। বোরিস আর রোভার গেছে পুরানো মাল আনতে। চাচা-চাচী গেছেন আরেক কাজে। ফলে বাধ্য হয়ে ইয়ার্ডে পাহারায় থাকতে হয়েছে কিশোরকে।

কিছু তদন্ত করতে যাচ্ছ তোমরা? জিজ্ঞেস করল ক্র্যাব। হ্যানসন বলেছে। তোমাদের কথা। এসব ব্যাপারে আমিও খুব ইনটারেসটেড। যাও, আমি গাড়িতে আছি। দরকার পড়লে ডেকো। নিজের কপালে টোকা দিল। চোর-ডাকাতের স্বভাব রেকর্ড করা আছে এখানে।

লোকটার অহঙ্কারী ভাবসাব ভাল লাগল না মুসার। বলল, চোর-ডাকাত ধরতে যাচ্ছি না। একটা হারানো কাকাতুয়া খুঁজতে যাচ্ছি।

হারানো কাকা:… থেমে গেল ক্র্যাব, বিষয় পছন্দ হলো না। কিংবা হয়তো ভাবল মুসা তার সঙ্গে রসিকতা করছে। গম্ভীর হয়ে একটা খবরের কাগজ টেনে নিয়ে পড়ায় মন দিল।

ভূত-থেকে-ভূতে চালু করে দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই দুটো কাকাতুয়ার খোঁজ পাওয়া গেছে। আরও কিছু তথ্যও জানা গেছে। কদিন ধরেই নাকি কয়েকটা কাকাতুয়ার জন্যে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে মোটা এক লোক, শেষে ক্যাপ্টেন কিড আর শারলক হোমস নামের দুটো কাকাতুয়া পেয়ে ডবল দাম দিয়ে কিনে নিয়ে গেছে।

বাকি দুটো কাকাতুয়া, স্কারফেস আর রবিন হুডকে নিতে এসেছে এখন রবিন আর মুসা। ওগুলোর বর্তমান মালিকেরা বিক্রি করতে রাজি হলে কিনে নিয়ে যাবে, আর তা নাহলে রেকর্ড করে নিয়ে যাবে কাকাতুয়া দুটোর বুলি। টেপরেকর্ডার নিয়ে এসেছে সে-জন্যে সঙ্গে করে।

সিমেন্টে বাঁধানো পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল দুই গোয়েন্দা। দু-ধারে উঁচু পাতাবাহারের ঝাড়। পথের শেষ মাথায় পুরানো একটা বাড়ি, নতুন প্লাসটার করা হয়েছে।

ওরা বাড়িটার ফুট বিশেক দূরে থাকতেই খুলে গেল সামনের দরজা। বেরিয়ে এল ওদের চেয়ে সামান্য বেশি বয়েসী একটা ছেলে। টিংটিঙে তালপাতার সেপাই, মুসার চেয়ে লম্বা, বাঁকা নাক। দুই গোয়েন্দাকে দেখে বত্রিশ দাঁত বের করে হাসল।

এহহেরে! আবার এসেছে জ্বালাতে! বলে উঠল মুসা। এই রবিন সরো, সরো, শুঁটকির গন্ধ লাগবে গায়ে।

রকি বীচে ফিরে এসেছে আবার তিন গোয়েন্দার চিরশত্রু টেরিয়ার ডয়েল।

মুসার কথায় কিছুই মনে করল না টেরি। হাসি আরও বিস্তৃত হলো। হাতের খাঁচাটা তুলে ধরে এগোল কয়েক পা, বলল, এটার জন্যেই এসেছ, না?

খাঁচার ভেতরে একটা কাকাতুয়া। হলদে ঝুঁটি। এক চোখ কানা, ভয়ানক কোন লড়াইয়ে স্বজাতির ঠোঁট কিংবা নখের আঘাতে হারিয়েছে বোধহয় চোখটা।

কাকাতুয়া? বিস্ময় চেপে রাখতে পারল না মুসা। বলেই ফেলছিল, এটার জন্যেই এসেছে।

কিন্তু তাড়াতাড়ি বাধা দিল রবিন। কাকাতুয়া? ওই কানা পাখি আমাদের কি কাজে লাগবে, মিস্টার শুঁটকি?

কিন্তু ধাপ্পাটা কোন কাজে লাগল না। টেরি জানে, এটার জন্যেই এসেছে রবিন আর মুসা।

গতরাতে এসেই শুনল্লাম কাকাতুয়ার খবর, হেসে মুসার দিকে চেয়ে চোখ টিপল টেরি, রাগানোর জন্যে। তা কালু মিয়া কাকাতুয়া দিয়ে কি করবে? ভেজে খাবে?

শুঁটকির ভর্তা বানিয়ে খাব, রেগে গেল মুসা।

হা-হা করে হাসল টেরি। দারুণ বলেছ হে কালু মিয়া। বুদ্ধি খুলছে আজকাল। তো তোমাদের খোকা শারলক কই? কাকাতুয়ার খবর চেয়েছে কেন?

শার্টের হাতা গোটাতে শুরু করল মুসা।

হাত চেপে ধরল রবিন। টেরিকে জিজ্ঞেস করল, তুমি খবর পেলে কি করে?

এটা একটা প্রশ্ন হলো নাকি? আমেরিকার সব ছেলেই তো জানে, দুটো কাকাতুয়ার খোঁজ চায় শারলক পাশা। আমিও শুনলাম বন্ধুদের কাছে। তাই সকাল সকালই চলে এসেছি। চল্লিশ ডলারে কিনেছি এটা। নেবে নাকি? দেড়শো ডলার লাগবে।

এক আধলা দিয়েও নেব না আমরা, জবাব দিল রবিন। ওই কাতুয়া চাইনি আমরা, কানা কাকাতুয়া।

তাই নাকি? তাহলে অযথা সময় নষ্ট করছি। আরেক কাস্টোমার আগেই বলে রেখেছে আমাকে। পুরো দেড়শো দেবে। চলি, বাই-বাই। পা বাড়াল টেরি।

আই নেভার গিভ আ সাকার অ্যান ইভন ব্রেক! হঠাৎ কর্কশ গলায় বলে উঠল কাকাতুয়াটা।

অবাক হয়ে পাখিটার দিকে তাকাল টেরি। ভাবল, বকাটা তাকেই দিয়েছে। রেগে গিয়ে ধমক লাগাল, শাটাপ! গটমট করে হেঁটে গেল গাড়িবারান্দার এক দিকে। এঞ্জিন স্টার্ট নিল। শাঁ করে ঝোপের ওপাশ থেকে বেরিয়ে এল নীল একটা স্পোর্টস কার, চালিয়ে নিয়ে চলে গেল টেরি।

শুঁটকি কার কাছে বেচবে? রবিনকে জিজ্ঞেস করল মুসা। হাইমাস?

জবাব দিতে পারল না রবিন। তাড়াতাড়ি নোট বই বের করে লিখে নিল, স্কারফেস—মানে কানা কাকাতুয়াটা কি বুলি আউড়েছে।

একটা তো গেল, বলল মুসা। চলো, দেখি আরেকটা পাই কিনা।

ক্র্যাবকে আরেক ঠিকানায় যেতে বলল মুসা।

কয়েক রক পরেই বাড়িটা। এত পুরানো বিলডিং, জায়গায় জায়গায় প্ল্যাস্টার খসে গেছে, বেরিয়ে পড়েছে ইটের পাজর।

গাড়ি থেকে নেমে বাড়িটার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল মুসা, ভাবছি, ভূতথেকে-ভূতের সুবিধে যেমন, অসুবিধেও তেমনি। সবাই জেনে যাচ্ছে খবর, শত্রুরাও জেনে যাচ্ছে। ফলে বেকায়দা হয়ে যায়। শুঁটকি তো কয়েকবারই অসুবিধেয় ফেলল এভাবে।

রবিন হুডকে না নিয়ে গেলেই বাঁচি, বলল রবিন।

পাওয়া গেল রবিন হুডকে। কোন কারণে খোঁজ পায়নি বা খবরই জানেনি শুঁটকি, কিংবা আগ্রহ দেখায়নি। যা-ই হোক, নিতে পারেনি, বা নেয়নি। আছে। বাড়ির মালিকের মাথা জুড়ে বিশাল টাক। জানাল, কেনার সময় একবারই কথা বলেছিল কাকাতুয়াটা, সেজন্যেই কিনেছে, তারপর একেবারে জবান বন্ধ। আর একটি বারও বুলি আউড়ায়নি। বাড়িওয়ালী গেছে রেগে। স্বামীকে কদিন ধরেই চাপ দিচ্ছে কাকাতুয়াটা বিদেয় করে দিয়ে একটা ক্যানারি কেনার জন্যে।

কাজেই, সস্তায়ই পাওয়া গেল কাকাতুয়াটা। পঁচিশ ডলারে কিনেছিল বাড়িওয়ালা, পঁচিশ ডলারেই বিক্রি করে দিল দুই গোয়েন্দার কাছে। টীকাটা গুণে নিয়ে পকেট রেখে বলল, কেন কিনছ, বুঝতে পারছি না। কথা জানে ব্যাটা, কিন্তু বলে না। দেখো, তোমরা বলতে পারো কিনা। বাচ্চারা অনেক সময় অনেক কিছু পারে, যা বুড়োদের পক্ষে অসম্ভব।

থ্যাংক ইউ, স্যার, বলল রবিন। দেখব চেষ্ট করে।

কাকাতুয়াটাকে নিয়ে বেরিয়ে এল ওরা।

বিষণ্ণ হয়ে খাঁচায় বসে আছে রবিন হুড। ছেলেদের দিকে ফিরেও তাকাল না।

তাজ্জব ব্যাপার? বলল মুসা। কথা বলে না কেন?

দেখা যাক, কিশোর বলাতে পারে কিনা…আরে, গাড়িটা গেল কোথায়? এখানেই তো ছিল।

আশেপাশে গাড়িটাকে খুঁজল ওরা। কিন্তু নেই।

ওই ক্র্যাবের বাচ্চাকে দেখেই ভাল্লাগেনি আমার, গোমড়া মুখে বলল মুসা। ব্যাটা আমাদের ফেলে চলে গেছে।

তা-তো গেছে, যাই কি করে এখন? আরেকটা গাড়ি কিংবা ট্যাকসির জন্যে, এদিক ওদিক তাকাল রবিন। যেন তার মনের খবর জানতে পেরেই ঘ্যাচ করে এসে পাশে থামল একটা ঝরঝরে ভ্যান। ড্রাইভিং সীট থেকে জানালা দিয়ে মুখ বের করল এক মহিলা। রোলস-রয়েসটাকে খুঁজছ? ওদিকে চলে যেতে দেখলাম।

কেন যে গেল বুঝতে পারছি না, কপাল চুলকাল রবিন।

যাবে কোথায় তোমরা?

জানাল মুসা।

এসো, বাস স্টেশনে নামিয়ে দেব। ওদিকেই যাচ্ছি, আমন্ত্রণ জানাল মহিলা।

মহিলাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাল মুসা। এসো, রবিন। কি আর করা। উইলশায়ার থেকে বাস ধরব।

মহিলার পাশে উঠে বসল মুসা।

রবিন উঠল তার পাশে। চিন্তিত। চেনা চেনা লাগছে মহিলার কণ্ঠস্বর, আগে কোথাও শুনেছে।

চলতে শুরু করেছে ভ্যান।

আরে, ওদিকে কোথায়? তাড়াতাড়ি বলল রবিন। উল্টোদিকে যাচ্ছেন তো। উইলশায়ার ওদিকে।

উইলশায়ারে যাচ্ছেটা কে? পেছন থেকে বলে উঠল একটা কর্কশ কণ্ঠ, কথায় ব্রিটিশ টান। অন্যখানে যাচ্ছি আমরা।

চমকে ফিরে চাইল দুই গোয়েন্দা।

সীটের পেছনের একটা পার্টিশন সরে গেছে। আরাম করে বসে আছে হাইমাস। গোল মুখে কুৎসিত হাসি।

আমার সঙ্গে যাবে তোমরা, যেখানে নিয়ে যাব, আবার বলল হাইমাস। একটু গোলমাল করেছ কি… কথাটা শেষ করল না সে। ইয়া বড় এক ছুরি বের করল। পাতলা ঝকঝকে বাঁকা ফলা, হাতলের কাছটায় একটা সাপের ছবি খোদাই করা।

এটার নাম সর্প-ছুরি, ভীষণ ভঙ্গিতে ছুরিটা নাড়ল সে। হাজার বছর আগে দামেসকে তৈরি হয়েছিল। এটার একটা বাজে ইতিহাস আছে। বারোজন লোককে খুন করেছে ইতিমধ্যেই। আরও এক বা দুজনকে খুন করতে কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। তেরো নম্বর কে হতে চাও? আনলাকি থারটিন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *