০৮. কয়েক মিনিট পুরোদমে প্যাডাল ঘোরানোর পর

কয়েক মিনিট পুরোদমে প্যাডাল ঘোরানোর পর স্বস্তির নিঃশাস ফেলল কিশোর। সবুজ ভ্যানটা স্যান ফ্রানসিসকোর দিকে যাচ্ছে না, এমনকি সান্তা মনিকার দিকেও নয়। সোজা শহরের দিকে।

সিগন্যালের শব্দ পরিষ্কার বলে দিচ্ছে কোনদিকে কখন মোড় নিচ্ছে গাড়িটা। রকি বীচের মেইন টীট দিয়ে চলেছে এখন। ইশারায় গতি কমানোর নির্দেশ দিল দুই সহকারীকে কিশোর। সিগন্যাল, অনেক জোরাল, তারমানে খুব কাছেই রয়েছে গাড়ি। ট্রাফিক পোস্টে লাল আলো দেখে থেমেছে বোধহয়। তাড়াতাড়ি চলে ওটার একেবারে গায়ের ওপর গিয়ে পড়তে চায় না সে। রিয়ার ভিউ মিররে তাদের দেখে ফেলতে পারে হ্যারিকিরি বা তার সঙ্গী।

রিচার্ড হ্যারিসের অলঙ্কারের দোকান আর ট্রাসটি ব্যাঙ্ক পেরো ওরা। হঠাৎ থেমে গেল বীপ-বীপ। হাত তুলে মুসা আর রবিনকে থামার নির্দেশ দিল কিশের। এক পা মাটিতে নামিয়ে দিয়ে সাইকেলেই বসে রইল। এদিক ওদিক ঘোরল ট্র্যাকারের অ্যান্টেনা। বায়ে ঘোরাল, শব্দ নেই। পুরো ডানে ঘোরাতেই আবার শোনা গেল বীপ-বীপ।

সামনে পথটাকে আড়াআড়ি কেটেছে আরেকটা পথ, শহরের বাইরে বেরিয়ে ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে পাহাড়ের ওপর। সে-পথেই এগিয়ে চলল তিন গোয়েন্দা।

রাস্তায় মোড় আর ঘোরপ্যাঁচ এত বেশি এখন, সিগন্যাল শুনে ভ্যানটাকে অনসকণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। এই আছে জোরাল বীপ-বীপ, পরক্ষণেই কমতে কমতে একবারে মিলিয়ে যাচ্ছে। সিগন্যাল ধরার জন্যে বার বার অ্যান্টেনা ঘোরাতে হচ্ছে, তবে বিশেষ ভাবছে না কিশোর। আন্দাজ করে ফেলেছে, কোথায় যাচ্ছে ভ্যান।

রকি বীচের উত্তর-পশ্চিমে নিচু পাহাড়শ্রেণীর ঢালের গায়ে আর পাদদেশে বেশ কিছু বাড়িঘর আছে। জায়গাটা লিটল টোকিও নামে পরিচিত, রকি বীচের জাপানী

পল্লী।

লিটল টোকিওর সীমানায় পৌঁছেই আবার থামার নির্দেশ দিল কিশোর। শখানেক গজ দূরে একটা একতলা বাড়ির গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সবুজ ভ্যান।

পথের ধারে সাইকেল রাখল তিন গোয়েন্দা, গাছের সারির আড়ালে লুকিয়ে চোখ রাখল বাড়িটার ওপর।

হ্যারিকিরির বাড়ি নাকি? বলল মুসা।

জবাব দিল না কিশোর। ভ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে।

গাড়িবারান্দায় একজন লোক, গাড়িটার পাশ কাটিয়ে আসছে। বাড়ির ভেতরে থেকেই বেরিয়েছে মনে হয়। রাস্তায় এসে নামল লোকটা। আরেকটা লাল গাড়ি পার্ক করা ওখানে, তাতে চড়ে চলে গেল।

হ্যারিকিরি? শিওর হতে পারছে না রবিন। সব জাপানীর চেহারাই এক রকম লাগে তার কাছে।

না, মাথা নাড়ল কিশোর, তার সঙ্গী।

কিশোরের দৃষ্টিশক্তির ওপর পুরো আস্থা রয়েছে রবিনের, তবু জিজ্ঞেস না করে পারল না, কি করে বুঝলে?

সহজ। ওর হাঁটা, ওর চোখ, ওর কান। কেন, আরেকটা জিনিস খেয়াল করোনি? কোমরের কেষ্ট…আর প্যান্টে লেগে থাকা গ্রিজের দাগ?

খেয়াল করেনি রবিন। অতি সাধারণ জিনিস বলেই।

তাহলে, ধরে নিতে অসুবিধে নেই, ওটা হ্যারিকিরিরই বাড়ি, বিড়বিড় করল কিশোর, কিন্তু এই ধরে নেয়ার ব্যাপারটায় মোটেই সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। শিওর হওয়া দরকার। ডাকবাক্সটায় নাম দেখলে বোঝা যাবে কার বাড়ি।

ডাকবাক্স দেখতে হলে বাড়ির কাছে যেতে হবে। বাক্সটা এপাশে আছে না ওপাশে, বলা যাচ্ছে না, ওপাশে থাকলে বাড়ির পাশ কাটিয়ে যেতে হবে।

রবিন তুমি যাও, বলল কিশোর। মুসা বেশি লম্বা। আমারও চুল বেশি কোঁকড়া, দূর থেকেই চোখে পড়ব দুজনে। জানালার কাছে যদি হ্যারিকিরি থাকে, সহজেই আমাদের চিনে ফেলবে। তোমার উইণ্ডচীটারটা খুলে চুলগুলো এলোমেলো করে নাও। আর দশজন আমেরিকান ছেলের সঙ্গে তোমার তফাত বুঝতে পারবে না সে, তুমি যেমন জাপানীদের আলাদা করে চিনতে পারো না।

ও-কে, আর দশটা সাধারণ ছেলের মতই দেখতে, জেনে খারাপ লাগছে রবিনের। তবে সে চোখে পড়ার মত নয় বলে গোয়েন্দাগিরিতে উন্নতি করতে পারবে ভেবে ভালও লাগছে। চিয়াত করে চেন টেনে উইচীটার খুলে কিশোরের হাতে দিয়ে রওনা হলো রবিন।

গাড়িবারান্দার ধারেই রয়েছে সাদা রঙ করা ডাকবাক্স। দেখেও থামল না রবিন, সোজা হেঁটে গেল আরও খানিকটা যেন এখানকার কোন কিছুর প্রতি কোন আগ্রহই নেই তার-তারপর থেমে ফিরে তাকাল।

লেখা রয়েছে : এম হারিকিরি।

সাদা বাক্সে উজ্জল কালো কালিতে লেখা অক্ষরগুলো ফুটে রয়েছে। পড়তে কোন অসুবিধে হলো না। ঘুরে আবার পা বাড়াতে যাবে, এই সময়েই জাগল সন্দেহটা। মনে হলো, হ্যারিকিরির আগে আরেকটা নাম লেখা ছিল ঠিক ওই জায়গাটাতেই।

নিশ্চিত হতে হলে ভালমত দেখা দরকার। তার জন্যে আরও কাছে যেতে হবে। ঝুঁকিটা নেবে সে ঠিক করল।

ঠিকই সন্দেহ করেছে রবিন। সাদা রঙের প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে আগের লেখা, তবে তেমন যত্ম নেয়নি, নইলে চোখে পড়ত না। কখন রঙ করা হয়েছে? সতর্ক দৃষ্টিতে বাড়ির দিকে তাকাল সে, কাউকে দেখা যাচ্ছে না। আরও এগোল, চলে এল বাক্সের একেবারে কাছে। ছুঁয়ে দেখল, আঠা আঠা লাগে। হুঁ, বেশিক্ষণ হয়নি, তাই এমন চকচকে। বাড়িও কি এই কিছুক্ষণ আগে বদলাল নাকি হারিকিরি?

কাজের কাজ করেছি একটা, নিজের প্রশংসা না করে পারল না রবিন। কিশোরও এর চেয়ে বেশি কিছু করতে পারত কিনা সন্দেহ। বন্ধুদেরকে খবরটা জানানোর জন্যে তাড়াতাড়ি ঘুরে রওনা হলো সে।

দুই কদম এগিয়েই শব্দ শুনে ফিরে তাকাল রবিন, স্থির হয়ে গেল পাথরের মত। গাড়িবারান্দার ওপার থেকে আসছে একজন লোক। বেঁটে, কালো কোট গায়ে, ডোরাকাটা প্যান্ট, মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল। কালো চশমা নেই এখন চোখে।

এই ছেলে, শোনো, এই, ডাকল রিচার্ড হ্যারিস।

দৌড়ে পালাতে চাইল রবিন। পারল না। পা কথা শুনছে না। অনেক সময় দুঃস্বপ্নে যেমন প্রচণ্ড ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও হাত-পা নাড়ানো যায় না, অনেকটা যেন সেই রকম।

কাছে এসে দাঁড়াল হ্যারিস। লোকটার হাতে লাঠি নেই, কিন্তু তাতে কি? পকেটে পিস্তল তো থাকতে পারে।

ভালই হলো, বলল হ্যারিস, তোমাদেরকেই খুজছি মনে মনে।

ঠোঁট ভালমত দেখা যায় না, ফলে হাসছে কি না বোঝা গেল না। তবে চোখ দুটো আন্তরিকতা মাথানো বলে মনে হলো রবিনের।

অন্যেরা কোথায়? তোমার বন্ধুরা?

ভেবেছিল হাতও নড়াতে পারবে না, কিন্তু পারল, হাত তুলে দেখাল রবিন রাস্তার দিকে। হ্যারিসকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল।

সাইকেলের হ্যান্ডেলে বাধা ট্র্যাকারটা রবিনের উইণ্ডচীটার দিয়ে ঢেকে দিয়েছে কিশোর।

লিটল টোকিওতে প্রায়ই আসো তোমরা? জিজ্ঞেস করল হ্যারিস।

জাপানী রেস্টুরেন্টে খেতে আসি, জবাব দিল কিশোর। জাপানী খাবার মুসার খুব পছন্দ।

হ্যাঁ, ভাল খাবার। বিশেষ করে ফুজিয়ামা, আমিও যাই মাঝেমধ্যে, বলল হ্যারিস। হাসল কিনা বুঝতে পারল না রবিন। চলো না আজও যাই। আমি লাঞ্চ খাওয়াব তোমাদের?

দ্বিধা করছে কিশোর, কি জবাব দেবে? শেষবার যখন হ্যারিসের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তার দিকে পিস্তল তাক করে রেখেছিল। তার আগের বার লাঠি দিয়ে বাড়ি মেরে মাথা ফাটিয়ে দিতে চেয়েছিল। সেই লোকই এখন লাঞ্চের দাওয়াত দিচ্ছে, ঘটনাটা কি?

ঠিক আছে, খাইয়ে যদি খুশি হন, অবশেষে বলল কিশোর। আমাদের আপত্তি নেই। থ্যাংক ইউ।

চলো তাহলে, হাঁটতে শুরু করল হ্যারিস। তাকে অনুসরণ করল তিন গোয়েন্দা, যার যার সাইকেল ঠেলে নিয়ে চলেছে।

কিশোরের কাছাকাছি রইল রবিন। ফিসফিস করে বলল, কি কি দেখে এসেছে।

নীরবে মাথা নোয়াল শু কিশোর।

রেস্টুরেন্টের বাইরে সাইকেল স্ট্যাণ্ডে তুলে রাখল ওরা।

ছেলেদেরকে নিয়ে কোণের একটা বড় টেবিলে এসে বসল হ্যারিস।

ওয়েইটার এসে জাপানী ভাষায় কিছু জিজ্ঞেস করল, হ্যারিসও একই ভাষায় জবাব দিল।

বাহ গহনার দোকানের মালিক দেখছি আবার ভাষাবিদও মনে মনে বলল মুসা। তা অর্ডার কি দিল? সাপ-ব্যাঙ না হলেই বঁচি এখন।

জাপানে ছিলাম কয়েক বছর,ছেলেদেরকে জানাল হ্যারিস। মুক্তোর ব্যবসা করতাম। সেখানেই ভাষাটা শিখেছি।

শুরুতেই চা নিয়ে এল ওয়েইটার। সবার কাপে কাপে ঢেলে দিল হ্যারিস। আবার চেয়ারে বসে বলল, জানালাম, তোমরা গোয়েন্দা।

এইবার হাসিটা দেখতে পেল রবিন। কিছু বলল না। অন্য দুজনও চুপ।

মিস কোরিন কারমাইকেল তোমাদের মক্কেণ, আবার বলল হ্যারিস। পাখি খুনের তদন্ত করছ।

মাথা নোয়াল কিশোর।

হ্যারিকিরি বলল একটা মরা কবুতরের পায়ে বাধা, একটা মেসেজ পেয়েছ তোমরা।

আবার মাথা নোয়াল কিশোর, মুখে কিছু বলল না।

বাজারে যে তরকারী সাপ্লাই দেয়, সে ব্যাপারে নাকি কিছু লেখা ছিল।

হ্যাঁ, মুক্তো-পেঁয়াজ, বলল কিশোর।

ওয়েইটার ফিরে আসায় আলোচনায় বাধা পড়ল। ছোট ছোট ডজনখানেক ডিশ টেবিলে নামিয়ে রেখে চলে গেল।

নীরবে খাওয়া চলল কিছুক্ষণ।

কবুতরটা কি মিস কারমাইকেলের বাগানে পেয়েছ? মুখ তুলল হ্যারিস।

না, কিশোরের মুখভর্তি সরু চালের ভাত, স্যামন মাছ, বাঁশের কোড় আর নোনা সালাদ, চমৎকার খাবার। গিলে নিয়ে বলল, রাস্তায় পেয়েছি। হ্যারিকিকে যা যা বলেছে, হ্যারিসকেও ঠিক তাই বলবে।

আবার নীরবে খেয়ে চলল হ্যারিস। শেষ করে ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছল। তারপর হাত ঢোকাল পকেটে।

স্থির হয়ে গেছে মুসা, মুখের সামনে থেমে গেল কাঁটাচামচে গাথা মাছের টুকরো। পিস্তল বের করবে না তো লোকটা? এই প্রকাশ্য জায়গায় সাহস পাবে?

মানিব্যাগ বের করল হ্যারি।

ব্যাপার হলো কি জানো মিস কারমাইকেল আমার খুব ভাল বন্ধু, খুব দামী কাসটোমার, ক্ষণিকের জন্যে উজ্জ্বল হলো তার চোখ। পাখি কিরকম ভালবাসে জানি, ওগুলো মারা পড়লে কতখানি দুঃখ পায় তা-ও জানি। ওকে সাহায্য করতে চাই আমি, যতটা পারি, মানিব্যাগ থেকে পঞ্চাশ উলারের একটা নোট বের করে কিশোরের দিকে বাড়িয়ে ধরল। নাও, এটা রাখো। তোমাদের ফিরে কিছুটা, আগাম। তদন্ত চালিয়ে যাও। দরকার হলে আরও দেব। কে পাখিগুলোকে খুন করেছে, ব্যাগটা আবার পকেটে রাখতে রাখতে বলল, জানার চেষ্টা করো।

থ্যাংক ইউ, নোটটা নিয়ে পকেটে ঢোকাল কিশোর। আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করব।

হ্যাঁ, সাধ্যমতই করব, বাইরে বেরিয়ে সাইকেলের তালা খুলতে খুলতে আরেকবার বল কিশোর, চোখ হ্যারিসের দিকে চলে যাচ্ছে গহনার দোকানের মালিক।

নিশ্চয় কর, বলল মুসা, পঞ্চাশ ডলার… থেমে গেল কিশোরের দিকে তাকিয়ে।

চিন্তামগ্ন গোয়েন্দাপ্রধান, তার কথা শুনছে বলে মনে হলো না।

ওর দোকানে টমকে নিয়ে গেলাম, বিড় বিড় করল কিশোর। পায়রাটা তার প্রয়োজন হলে সে বল? হ্যাঁ, চিনেছি। জানি, কার। রেখে যাও, মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসব। মাথা নাড়ল সে, যেন কিছু একটা ব্যাপার বিশ্বাস হচ্ছে না। তা না করে কাল : জীবনে দেখিনি। পায়রাটাকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম, তা-ও কিছু বলল না। তারপর, পিস্তল দেখিয়ে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল। থামল এক সেকেণ্ড, নিচের ঠেiটে চিমটি কাটতে কাটতে আবার মাথা নাড়ল। মিস কারমাইকেলের বাগানে রাতের অন্ধকারে লাঠি দিয়ে বাড়ি মেরে আমার মাথা ফাটিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল। সবশেষে, আজ ডেকে এনে লাঞ্চ খাওয়াল…ভ্রুকুটি করল। হ্যাঁ, লাঞ্চ খাওয়াল। টাকাও দিল। পাখির খুনীকে ধরে দিতে পারলে আরও টাকা দেবে বলল। অবাকই লাগছে, এতগুলো পরস্পর বিরোধী কাণ্ড। কিন্তু সব চেয়ে অবাক করেছে রিচর্ড হ্যারিস, হঠাৎ যেন বাস্তবে ফিরে এল সে।

কি? খেই ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল রবিন। বলো না, কি? কেন অবাক করল রিচার্ড হ্যারিস?

শুধু রাতের বেলা কালো কাচের চশমা পরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *