০৮. কোন ধরনের মেশিন-টেশিন হবে

কোন ধরনের মেশিন-টেশিন হবে, বব বলল অবশেষে।

ফার্মের ভেতর থেকেই আসছে শব্দটা, অনিতা বলল।

আমি যাচ্ছি, কিশোর বলল। দেখে আসিগে। তোমরা সব এখানেই থাক।

আমি আসি, মুসা বলল।

না, তুমিও থাকো। লোক তো নিশ্চয় আছে। আমাকে ধরে ফেলতে পারে।

দুজন ধরা পড়ার চেয়ে একজন পড়া ভাল।কেঁপে উঠল ডলি।ঠান্ডায় না ভয়ে বুঝা গেল না। রবিনের কথা মনে পড়ল তার। টনিকে যে ভাবে কিডন্যাপ করা হয়েছে, রবিনকেও করবে না তো? বলা যায় না, কিশোরকেও আটকে ফেলতে পারে। তখন কি হবে?

কিশোর, সাবধানে থেকো, ফারিহা বলল।

টিটু কি বুঝল কে জানে, চাপা স্বরে গরগর করে উঠল। কিশোরের সঙ্গে যেতে চায় বোধহয় সে-ও তোর যাওয়ার দরকার নেই, হেসে বলল কিশোর। সবার সঙ্গে থাক।

আদর করে মাথা চাপড়ে দিল কুকুরটার।

পা বাড়াল সে। বনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল খোলা জায়গায়। দৌড় দিল খামারবাড়িটার দিকে। যত তাড়াতাড়ি পারল ছুটে এসে গা ঠেকিয়ে দাঁড়াল বাড়ির পাথরে দেয়ালে। কান পেতে শুনতে শুনতে অপেক্ষা করতে লাগল। কেউ দেখে ফেললে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু এল না কেউ। কানে আসছে একটানা গুঞ্জনের মত শব্দ। কাছে থেকে জোরাল শোনাচ্ছে। মেশিনই।

কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে পা টিপে টিপে, দেয়াল ঘেষে জানালার দিকে রওনা দিল সে। তুষারে চাপা পড়ে যাচ্ছে জুতোর শব্দ। ভালই। মনে মনে তুষারকে ধন্যবাদ দিল সে কয়েক পা এগিয়ে আবার থেমে গেল। সতর্ক হয়ে উঠেছে প্রতিটি ইন্দ্ৰিয়।

সামান্যতম বিপদের গন্ধ দেখলেই দেবে দৌড়।

পার হয়ে গেল কয়েক সেকেন্ড। কিছুই ঘটল না।

আবার পা বাড়াল সে। জানালার কাছে এসে সাবধানে গলা বাড়িয়ে উঁকি দিল ভেতরে।

প্রথমেই চোখে পড়ল টনিকে। হাত-পা বাধা অবস্থায় পড়ে আছে মেঝেতে। একটা লোক বসে আছে তার কাছে। জানালার দিকে পেছন করে। কিশোরকে দেখতে পেল না।

ঠোঁট গোল করে শিস দেয়ার ভঙ্গি করল কিশোর। কিন্তু শব্দ বের করল না।

আরেকটু কাত হয়ে তাকাল ভাল করে দেখার জন্যে।

গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে স্থির দৃষ্টিতে এদিকে তাকিয়ে আছে বাকি সবাই।

কিশোরের প্রতিটি নড়চড়া লক্ষ্য করছে। বুকের মধ্যে প্রবল বেগে লাফাচ্ছে তাদের

হৃৎপিণ্ড।

নিশ্চয় কিছু দেখেছে! হঠাৎ বলে উঠল মূসা।

কি দেখল, উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠল উলি। আস্তে কথা বলার কথা ভুলে গেছে।

তাকে সাবধান করে দিল মুসা।

কি দেখেছে, এখুনি জানা যাবে, অনিতা বলল। ওই যে, ফিরে আসছে।

দৌড়ে আসছে কিশোর।

সামান্য সময়ের জন্যে থেমেছিল, আবার পুরোদমে পড়তে আরম্ভ করেছে তুষার।

টনিকে দেখে এলাম! কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল কিশোর। বেধে মেঝেয় ফেলে রেখেছে।

এই ঠাণ্ডার মধ্যে! ওরা মানুষ না! দত কিড়মিড় করল মুসা।

মাত্র একজন লোক আছে পাহারায়, জানাল কিশোর। ওকে সরিয়ে দিতে হবে, যাতে টনিকে মুক্ত করতে পারি বলা সহজ, করা কঠিন, বব বলল! গিয়ে বললেই তো আর সরে যাবে।

তা তো যাবেই না, হেসে বলল কিশোর। তবে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। ছোট ছোট কিছু পাথর জোগাড় করা দরকার।

তুষারে ঢেকে আছে সব, পাব কোথায়? অনিতা বলল, আর কোন বুদ্ধি বের করতে পারো না?

না, পারি না। এটাই একমাত্র বুদ্ধি। সময় আছে আমাদের হাতে। পাথর জোগাড় করা অসম্ভব হবে না। কিছুটা কৰ্কশ কষ্ঠেই জবাব দিল কিশোর, তুমি পারলে অন্য কোন বুদ্ধি বের করোগে। আমি পাথর দিয়েই কাজ সারতে চাই।

এক মুহূর্ত দেরি না করে গাছের গোঁড়ার তুষার সরাতে শুরু করল সে।

নিচের মাটি পাথরের মত কঠিন। পাথর খুঁড়ে তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে গলদঘর্ম হলো, কিন্তু বের আর করতে পারল না।

নাহ, খোঁড়ার জন্যে দিনটা আজ বড়ই প্রতিকূল! বিরক্ত কষ্ঠে বলে টিটুকে ডাকল। টিটু আয় তো এদিকে।

দুই লাফে কাছে চলে এল টিটু।

পাথুরে জায়গাটা দেখিয়ে দিয়ে হুকুম দিল কিশোর, খোড়।

কিশোর কি চায়, এক কথাতেই বুঝে ফেলল বুদ্ধিমান কুকুরটা। খোঁড়ার কাজে মানুষের আঙুলের চেয়ে তার নখ যে কত বেশি দক্ষ, বুঝিয়ে দিল পলকে।

একের পর এক পাথর খুঁড়ে তুলে ফেলতে লাগল সে।

পাথর তোলার পর তাকে থামতে বলল কিশোর। হয়েছে।

অনেক ধন্যবাদ তোকে। এনে ভালই করেছি। বাড়ি গিয়ে দুটো বড় বড় হাড় পাবি। হাড়ের কথা শুনে আনন্দে হাঁক ছাড়তে গেল টিটু। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ চেপে ধরল ফারিহা। না না, টিটু না! বব পাথরগুলো দেখিয়ে বলল কিশোর।তুমি পাথর ছুড়বে। ওই যে কুড়াঁটা দেখছ, লোকটাকে ওদিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করো। এই সুযোগে আমি আর মুসা গিয়ে টনির বাঁধন খুলে দেব।

ঠিক আছে।খুশি মনে রাজি হয়ে গেল বব। আশা করি মেয়েরাও আমাকে সাহায্য করতে পারবে। যত বেশি লোককে কাজে লাগানো যায়, তত ভাল। কি বলো? ডলি, ফারিহা আর অনিতা একেক জন একেক দিকে সরে যাক। সবাই মিলে ছুঁড়তে থাকলে বোকা হয়ে যাবে লোকটা। বুঝতে পারবে না কোনদিক থেকে আসছে।

বুদ্ধিটা মন্দ না, স্বীকার করল কিশোর। বেশ রসদ ভাগ করে নাও তোমরা। প্রথম পাথরটা ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশনে যাব আমি আর মুসা।

খামারবাড়িটার চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল ডলি, ফারিহা, অনিতা আর বব।

ঠকাস করে গিয়ে প্রথম পাথরটা পড়ল জানালার কাঠের ফ্রেমে।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না গোয়েন্দাদের। দরজায় দেখা দিল লোকটা। ডানে-বাঁয়ে তাকাতে লাগল। প্রবল তুষারপাতের মধ্যে কিসের শব্দ হলো, বোঝার চেষ্টা করছে।

আরেকটা পাথর গিয়ে পড়ল। লোকটার কাছাকাছি। চরকির মত পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল সে। এগিয়ে এল পাথরটার দিকে।

ঠকাস! গোলাঘরের ঘুণে ধরা দরজায় গিয়ে লাগল তৃতীয় পাথরটা।

ঠকাস! ঠকাস!

আরও দুটো পাথর।

অবাক হয়ে ঘুরতে থাকল লোকটা। কুকুরের লেজের গোড়ায় মাছি বসে বিরক্ত করলে সেটাকে ধরার জন্যে যেমন করে ঘুরতে থাকে কুকুর। হয়তো ভাবছে, তুষারপাতের সঙ্গে সঙ্গে পাথর-বৃষ্টিও শুরু হলো বুঝি! দেখতে যাচ্ছে না কেন? অধৈর্য হয়ে উঠল মুসা। যাবে না নাকি?

ওরা বেশি কাছাকাছি পাথর ফেলছে, বিরক্ত হয়ে বলল কিশোর। ওদের বলে এলাম কুয়াটার দিকে নিয়ে যেতে।

ঠকাস!

যষ্ঠ পাথরটা গিয়ে লাগল কুয়ার দেয়ালে।

এইবার পড়তে দেখল প্রহরী। সাধারণ পাথর। তারমানে আকাশ থেকে পড়ছে না। ভাল করে দেখার জন্যে এগিয়ে গেল।

চলো! ফিসফিস করে মুসাকে বলে দৌড় দিল কিশোর।

তুষারপাতের মধ্যে পুরু তুষারের আস্তরণ মাড়িয়ে তাড়াতাড়ি দৌড়ানো সহজ ব্যাপার নয়। তা ছাড়া শব্দ করা যাবে না। ভাগ্য ভাল, পাথরটার দিকে গভীর মনোযোগ রয়েছে লোকটার। তাই অন্য কিছু খেয়াল করল না।

খোলা দরজা দিয়ে ছুটে ভেতরে ঢুকে পড়ল দুই গোয়েন্দা। টনির কাছে চলে এল। কিছু বলার সময় নেই এখন, তাকে বলল কিশোর। আপনাকে ছাড়াতে এসেছি আমরা।

পকেট থেকে পেন্সিল কাটার ছুরি বের করে লোকটার বাঁধন কেটে দিল।

টনির চোখে সতর্কতা দেখে আবার বলল, আমরা আপনার বন্ধু রোভারের বন্ধু।

দড়ি কেটে বসা লাল হয়ে যাওয়া জায়গাগুলো উলতে শুরু করল টনি। বলল, এই লোকগুলো জালিয়াত। কয়েন জাল করে। খুব খারাপ লোক। সব করতে পারে। ওরা আমাকে বলেছে, ওদের কয়েন ছড়িয়ে বেড়াচ্ছি আমি। ওদেরই একজন কয়েনগুলো কোথাও দিয়ে আসতে যাচ্ছিল, রাস্তায় ব্যাগ ছিড়ে পড়ে যায়।

হাতড়ে হাতড়ে যা পারে তুলে নিয়েছিল। তখন সব খুঁজে পায়নি অন্ধকার ছিল বলে। গোণা ছিল বোধহয়। পরে গুনে দেখে কম। আবার যায় তুলে আনতে কিন্ত গিয়ে আর পায়নি একটাও। আমি আর রোভার তুলে নিয়ে গিয়েছিলাম।

সেগুলো খোঁজার জন্যে তখন লোক লাগাল ওরা। হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াতে লাগল। জানি আমরা, বাধা দিয়ে বলল কিশোর। গত হস্তায় রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছিলেন আপনি আর রোভার।

ও, জানো! টনি অবাক।

গত তিনদিন ধরে এই জাল কয়েন নিয়ে তদন্ত করছি আমরা। কিন্তু একটা কথা বুঝতে পারছি না, কাল আপনাকে ধরে নিয়ে এল কেন ওরা?

বললামই তো, ওদের কয়েন মানুষকে দিয়ে ফেলেছি আমরা। সত্যি বলছি, একেবারে না জেনে। ওরা চায় না ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যাক। এখানে কয়েনগুলো বানাচ্ছে ওরা, কিন্তু বাজারে ছাড়বে দূরের কোন শহরে নিয়ে গিয়ে।

যাতে সূত্র ধরে ধরে পুলিশ ওদের খুঁজে না পায়।

তাই।

কেন, মেশিনের শব্দ শুনছ না? আঙুল তুলে মাটির দিকে দেখাল টনি।

সেলারে বসে বানাচ্ছে এতক্ষণে বোঝা গেল শব্দটা কম কেন। মেশিনটা রয়েছে মাটির নিচের ঘরে।

রক্ত চলাচল বন্ধ থাকায় উঠে দাড়াতে কষ্ট হলো টনির। তিনজন লোক আছে ওখানে। ওই যে দেখো, ট্র্যাপডোর। সেলারে নামার দরজা। এত লোকের কথা শুনে সতর্ক হয়ে উঠেছে কিশোর। সোজা থানায় গিয়ে পুলিশকে জানাতে হবে।

না না, আর যা-ই করো, পুলিশের কাছে যেয়ো না! কাতর অনুনয় শুরু করল টনি। লোকগুলো ভয়ঙ্কর। কাল ধরে এনেছে আমাকে। আজ আনতে গেছে টনিকে। এতক্ষণে হয়তো ধরে ফেলেছেও ওকে!

সর্বনাশ! চমকে গেল কিশোর। টনিকে ধরলে রবিনকেও ধরবে ওরা, ছাড়বে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *