০৮. ওরা ঢুকলেও ফিরে চাইল না নেব

ওরা ঢুকলেও ফিরে চাইল না নেব। যেন শুনতেই পায়নি। ক্যাপ্টেনের দেহে প্রাণ আছে কিনা জানতে চাইল পেনক্র্যাফট। কিন্তু উত্তর দিল না নেব। তবে কি সত্যিই মারা গেছেন ক্যাপ্টেন?

অনুমানের ওপর কখনও ভরসা করেন না স্পিলেট। এগিয়ে গিয়ে উবু হয়ে বসলেন ক্যাপ্টেনের পাশে। নাড়ী দেখলেন, বুকে কান পেতে শুনলেন। তারপর আস্তে করে বললেন, বেঁচে আছেন। কিন্তু নাড়ীর গতি অত্যন্ত ক্ষীণ।

একলাফে স্পিলেটের পাশে এসে বসল পেনক্র্যাফট। ক্যাপ্টেনের বুকে কান পেতে সেও শুনল হ্যৎপিন্ডের শব্দ। বেঁচেই আছেন ক্যাপ্টেন।

গুহা থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল হার্বার্ট। কোথেকে যেন রুমাল ভিজিয়ে আনল। ভিজে রুমাল দিয়ে ক্যাপ্টেনের শুকনো ঠোঁট মুছে দিলেন স্পিলেট। একটু পরই আস্তে করে নিঃশ্বাস ফেললেন ক্যাপ্টেন।

ভয় নেই, নেব, বললেন স্পিলেট। এ যাত্রায় মরবেন না উনি।

বাঁচবেন? লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল নেব। বলুন, কি করলে জ্ঞান ফেরানো যাবে ওঁর, চাঙ্গা করা যাবে?

তাড়াহুড়ো করলে কাজ হবে না, নেব।

হাতের তালু দিয়ে ঘষে ঘষে ক্যাপ্টেনের হাত-পায়ে তাপ দিতে শুরু করলেন স্পিলেট আর পেনক্র্যাফট।

ওঁকে খুঁজে পেলে কি করে? নেবকে জিজ্ঞেস করল পেনক্র্যাফট।

বিষণ্ণ ভাবটা এখন চলে গেছে নেবের চেহারা থেকে। পেনক্র্যাফটের প্রশ্নের জবাবে বলল, আপনারা ঘুমিয়ে পড়লে চিমনি গুহা থেকে পালিয়ে আসি আমি। ক্যাপ্টেনের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে অনিশ্চিতভাবে এদিক ওদিক ঘুরতে থাকি। এ জায়গার কাছাকাছি এসেই টপের দেখা পেলাম। আমাকে দেখে খুশির ঠেলায় চেঁচাতে চেঁচাতে ছুটে এসে আমার হাত চাটতে লাগল টপ। তারপর পায়জামার কাপড় কামড়ে ধরে টেনে নিয়ে এল এখানে। ক্যাপ্টেনকে মড়ার মত পড়ে থাকতে দেখে ভেঙে পড়লাম। আমি তো ভেবেছিলাম মারাই গেছেন উনি। টপকে পাঠিয়েছিলাম আপনাদের ডেকে আনার জন্যে। ওর মত ট্রেনিং পাওয়া কুকুরের পক্ষে কাজটা কিছুই না।

হঠাৎ আবার কথাটা মনে হলো স্পিলেটের। এই ঝড়-বৃষ্টির রাতে এতটা পথ পেরিয়ে গিয়েও কাদাপানি লাগেনি কেন টপের গায়ে? আর ওরা যে চিমনি গুহায়ই আছে তা টপ জানল কি করে? হোক না সে ট্রেনিং প্রাপ্ত। ওর কাছে ভৌতিক মনে হলো ব্যাপারটা। কুসংস্কারাচ্ছন্ন নেব ভয় পাবে বলে চেপে গেলেন তিনি।

অনেকক্ষণ পর একটু নড়েচড়ে উঠলেন ক্যাপ্টেন! একটা হাত তোলার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। আরও কিছুক্ষণ ঘষাঘষির পর ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল ক্যাপ্টেনের  তাড়াতাড়ি ওঁর মুখে একটু পানি ঢেলে দিল পেনক্র্যাফট  সেই সাথে একটু মুরগীর স্যুপ। সেটুকু গিলে নিয়ে চোখ মেললেন ক্যাপ্টেন। বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস করলেন, দ্বীপ, না মহাদেশ?

সে কথা পরে হবে। বিস্মিত ভাবে বলল পেনক্র্যাফট, ভাল হয়ে নিন তো আগে।

আর কোন কথা না বলে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লেন ক্যাপ্টেন।

এরকম লোক তো দেখিনি! মরতে মরতে বেঁচে উঠেছে, আর উঠেই জানতে চাইছে দ্বীপ না মহাদেশ! বিড় বিড় করে বলল পেনক্র্যাফট।

ক্যাপ্টেন ঘুমিয়ে পড়লে হার্বার্ট আর পেনক্র্যাফট গুহা থেকে বেরিয়ে এল। একটু দূরের গাছ থেকে কয়েকটা ডাল ভেঙে নিয়ে লম্বা ভাবে সাজাল। তার উপর আর কয়েকটা ডাল আড়াআড়ি ভাবে রেখে ঘাস-পাতা দিয়ে ঢেকে দিতেই স্ট্রেচারের মত হয়ে গেল। বয়ে নিয়ে যেতে হবে ক্যাপ্টেনকে।

গভীর ঘুমের পর দুপুরের দিকে উঠে বসলেন ক্যাপ্টেন। গুহার দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পেনক্র্যাফটের দেয়া পাখির গোশত খেলেন।

তা ব্যাপারটা কি, ক্যাপ্টেন? পানিতেই পড়ে গেছিলেন নাকি? জিজ্ঞেস করল হার্বার্ট।

পানিতেই পড়েছিলাম। ঢেউয়ের ধাক্কায় হাত ফসকে যায় দড়িটা। পড়েই সাঁতরাতে শুরু করলাম। সাঁতরাতে সাঁতরাতেই টের পেলাম আমি একা নই, আমার সামনেও কেউ সাঁতরাচ্ছে! একটু পরেই চেঁচামেচি শুরু করল টপ। আমাকে পড়ে যেতে দেখে সেও সাগরে লাফিয়ে পড়েছে। একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন ক্যাপ্টেন, কিন্তু কতক্ষণ আর ওই উত্তাল ঢেউয়ের সাথে লড়াই করা যায়? হাতে পায়ে খিল ধরে গেছে। তারপরই জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান হলে দেখি আমার জামা-কাপড় কামড়ে ধরে টানাটানি করছে টপ। আবার সাঁতরাতে চেষ্টা করতেই পায়ের নিচে মাটি ঠেকল। টলতে টলতে ডাঙায় উঠে দ্বিতীয়বার জ্ঞান হারালাম আর কিছুই মনে নেই।

আশ্চর্য! চোখ কপালে তুলল পেনক্র্যাফট, তীরে উঠেই জ্ঞান হারালেন? তাহলে তীর থেকে মাইলখানেক দূরের এই গুহায় এলেন কি করে? টপ নিশ্চয়ই বয়ে আনেনি। ওর পক্ষে সেটা সম্ভবও না।

তাই নাকি? নিজেও আশ্চর্য হলেন ক্যাপ্টেন, আমি ভেবেছিলাম তোমরাই আমাকে এ গুহায় বয়ে এনেছ। সত্যিই আশ্চর্য! আমি নিজে হেঁটে আসিনি একথা ঠিক। তাহলে? এ উপকারটুকু কে করল? আমরা ছাড়া আর কেউ আছে এই দ্বীপে?

এখনও দেখিনি কাউকে, বলল স্পিলেট, তবে আছে বলে মনে হয় না। পাখিগুলো মানুষকে ভয় পায় না, কারণ এর আগে মানুষ দেখেনি।

হঠাৎ কি কারণে যেন উত্তেজিত মনে হলো ক্যাপ্টেনকে। বললেন, পেনক্র্যাফট, গুহার বাইরে পায়ের ছাপ নিশ্চয়ই আছে। কারণ তোমরা ঢুকেছ, বেরিয়েছ। দেখো তো, এ ছাড়া কোন পায়ের ছাপ আছে কিনা, যার সাথে আমার জুতোর ছাপ মিলে যায়।

পাওয়া গেল। অনেকগুলো ছাপের সাথে মিলে গেল। ক্যাপ্টেন সাইরাস হার্ডিংএর জুতোর ছাপ। তার মানে পানি থেকে উঠে এখান পর্যন্ত হেঁটেই এসেছেন ক্যাপ্টেন।

পেনক্র্যাফট এসে কথাটা জানাতেই ক্যাপ্টেন বললেন, তাহলে ঘুমের ঘোরে টহল দেয়ার পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সেই প্রবাদটা সত্যিই। ঘোরের মাঝে হেঁটেছি আমি, পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে টপ। টপ, আয়তো এদিকে।

একলাফে মনিবের কাছে এসে দাঁড়াল প্রভুভক্ত কুকুর। ওর পিঠটা চাপড়ে দিলেন ক্যাপ্টেন।

কিন্তু সন্দেহ থেকে গেল স্পিলেটের মনে। হতচ্ছাড়া এই জায়গার এ আরেক রহস্য নয়তো?

আর দেরি করার কোন মানে হয় না। চিমনি গুহায় ফিরে যাওয়া উচিত, বাইরে থেকে ঘাস-পাতার গদিওয়ালা স্ট্রেচারটা নিয়ে আসা হলো। ধরাধরি করে শুইয়ে দেয়া হলো ক্যাপ্টেনকে। পেনক্র্যাফট আর নেব স্ট্রেচারটা কাঁধে তুলে নিতে রওনা দিল সবাই। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে চিমনি গুহায় পৌঁছুল ওরা। বালির ওপর নামিয়ে রাখা হলো স্ট্রেচার। তখনও ঘুমাচ্ছেন ক্যাপ্টেন।

চিমনি গুহার কাছে এসে অবাক হয়ে গেল সবাই। চেনাই যাচ্ছে না আর এলাকাটাকে। ঝড়ের দাপটে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়েছে বিশাল সব পাথর। অনেকগুলো আবার সাগরের তীর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। গুহার মুখে পড়ে থাকা কয়েকটা পাথরের গায়ে সামুদ্রিক গুল্ম লেগে আছে। এখানে ওই গুল্ম এল কোথেকে? তবে কি সাগরের ঢেউ এখান পর্যন্ত এসেছে? সবাই বিস্মিত হয়ে ভাবছে, হঠাৎ কি মনে হতেই একছুটে গুহায় গিয়ে ঢুকল পেনক্র্যাফট  ঢুকেই চক্ষু স্থির। ঝড়ে ফুসে উঠা সাগরের উত্তাল তরঙ্গ গুহায় ঢুকে তছনছ করে দিয়ে গেছে গুহাটাকে। যেখানে অগ্নিকুন্ডটা ছিল সেখানে থিক থিক করছে কাদা। পাগলের মত গিয়ে আগুন লাগানো রুমালটার জন্যে কোটরে হাত দিল সে। পানি লাগল হাতে। রুমালটা নেই। তাহলে এখান পর্যন্ত উঠেছিল ঢেউ! আর এই ঢেউই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ওদের আগুন জ্বালাবার শেষ সম্বলটুকুও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *