০৮. একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগলো

অবাক হয়ে একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগলো ওরা। এমন কি জরুরী ব্যাপার ঘটলো যে এই দুর্যোগের মাঝেওউড়তে হলো বিমানটাকে?

ঝড়ের মাঝে ওড়ার ট্রেনিং দিচ্ছে? নিজের কানেই বেখাপ্পা শোনালো যুক্তিটা। না, তা হতে পারে না।

এখান থেকে ওড়েনি, রবিন বললো। হয়তো অন্য কোনোখান থেকে এসেছে। কিংবা উড়ে যাচ্ছিলো এখান দিয়ে। আবহাওয়া বেশি খারাপ হয়ে যাওয়ায় ল্যান্ড করছে।

হ্যাঁ, তা হতে পারে, একমত হলো মুসা। আশ্রয় খুঁজছে।

মাথা নাড়লো কিশোর। না, আমার তা মনে হয় না। এয়াররুট থেকে অনেক দূরে এই এয়ারফীন্ড। তাছাড়া এটাকে ঠিক এয়ারপোর্টও বলা যায় না, অতি সাধারণ একটা এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশন। আর যদি আবহাওয়া খারাপের কারণে নামতে বাধ্যই হয়, এখানে কেন? ধারেকাছেই প্রথম সারির বিমান বন্দর রয়েছে, ওখানে যাবে। আশ্রয়, সাহায্য সবই পাওয়া যাবে ওখানে।

তাহলে হয়তো মহড়াই দিচ্ছে, জিনা বললো। জনির ভাই। ঝড়ের মাঝে উড়ে হাত পাকিয়ে নিচ্ছে।

যা-ই হোক, এঞ্জিনের শব্দ হারিয়ে যেতেই ব্যাপারটা গুরুত্ব হারালো ওদের কাছে, আপাতত। হাই তুললো রবিন, শোয়া দরকার। ঘুম পাচ্ছে।

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকালো কিশোর। ঘড়ি দেখলো। রবিন, রাফিকে নিয়ে তুমি আর জিনা এটাতেই থাকো। আমি আর মুসা চলে যাচ্ছি ওটাতে। দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দরজার ফাঁক বন্ধ করে দেবে। কিছু দরকার হলে, কিংবা অসুবিধে হলে ডাকবে আমাদের।

আচ্ছা, মাথা কাত করলো রবিন।

বৃষ্টির মাঝে মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল কিশোর আর মুসা। দরজার ফাঁকটা শক্ত করে আটকে দিয়ে এসে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো রবিন।

জিনাও হলো। তার পাশ ঘেঁষে শুয়ে পড়লো রাফিয়ান। সারা রাতে একটা শব্দও করলো না আর।

পরদিন সকালেও মুখ গোমড়া করে রইলো আকাশ। তাঁবুর ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে মুসা বললো, আবহাওয়ার পূর্বাভাস শোনা উচিত ছিলো। আজও পরিষ্কার হবে কিনা সন্দেহ। কটা বাজে, কিশোর?

আটটা! আজকাল ঘুম খুব বেড়ে গেছে আমাদের। চলো দেখি, ওরা উঠলো কিনা। অ্যানারা পরে নাও, নইলে ভিজবে।

গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে তখনও। ঝর্না থেকে হাতমুখ ধুয়ে এলো ওরা। নাস্তা করতে বসলো। তাবুর মধ্যে গাদাগাদি করে খেতে ভালো লাগছে না। রোদ নেই, ফলে মনও বিষণ্ণ হয়ে যায়। ভাবছে, দিনটা যদি কিছু পরিষ্কার হতো, জনিদের ফার্মে অন্তত যাওয়া যেতো।

নাস্তার পরে মুসা বললো, যে-রকম অবস্থা, গুহায়ই বোধহয় ঢুকতে হবে আমাদের। বাইরে কোথাও যেতে পারবো না।

তা-ই চলো, জিনা বললো।

ম্যাপ দেখে নেয়া দরকার, পরামর্শ দিলো কিশোর। গুহার কোনো একটা মুখ নিচয় রাস্তা-টাস্তার কাছে বেরিয়েছে। পাহাড়ের গোড়ার দিকেই কোথাও হবে।

থাকলে থাক না থাকলে নেই,মুসা বললো, গেলেই দেখতে পাবো। আর না থাকলেই বা কি? আসল কথা, এখন বসে থাকতে ভাল্লাগছে না, একটু হাঁটাহাঁটি করতে চাই, ব্যস।

বাস, ঝোপঝাড়, সব ভেজা। ওগুলোর মধ্যে দিয়ে হাঁটতেই বিরক্ত লাগে। লাফিয়ে লাফিয়ে আগে আগে চলছে রাফিয়ান।

সবাই টর্চ নিয়েছে তো? মনে করিয়ে দিলো রবিন। গুহার ভেতরে কিন্তু দরকার হবে।

যা, রাফি ছাড়া সবাই নিয়েছে। তার অবশ্য দুটো প্রাকৃতিক টর্চই আছে, চোখ, গুহার অন্ধকারেও দেখতে পাবে। তাছাড়া রয়েছে প্রখর ঘ্রাণশক্তি আর শ্রবণশক্তি, মানুষের নাক-কানের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ওর যন্ত্রগুলো।

ঢাল বেয়ে কিছুক্ষণ নেমে উত্তরে মোড় নিলো ওরা। হঠাৎ করেই এসে পড়লো একটা চওড়া পথে, ঘাস আর আগাছা নেই ওখানে, কেটে সাফ করা।

দাঁড়িয়ে গেল কিশোর। নিশ্চয় কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে এই পথ।

তাই তো মনে হচ্ছে, রবিন বললো। চকের খনিটনি আছে বোধহয়। রাস্তায় পড়ে থাকা একটা খড়িমাটির ডেলায় লাথি মারলো সে।

চলো না এগিয়ে দেখি, বললো জিনা।

পথের একটা মোড় ঘুরতেই নোটিশ চোখে পড়লো। ওটার বাংলা করলে দাঁড়ায়ঃ গুহা এদিকে। দড়ি লাগানো পথগুলো ধরে গেলে ভালো। যেগুলোতে দড়ি নেই সেগুলোয় ঢুকলে পথ হারানোর ভয় আছে। সাবধান!

ভালোই তো মনে হচ্ছে, উত্তেজনা ফুটলো কিশোরের কণ্ঠে। জনিও বলেছিলো বটে, ওগুলোতে বিপদ আছে। চলো, ঢুকেই দেখা যাক।

হাজার হাজার বছরের পুরানো এগুলো, রবিন বললো। স্ট্যালামাইট আর স্ট্যালাকটাইট জমে থাকে এসব গুহায়।

শুনেছি, জিনা বললো, হাত থেকে নাকি ঝুলে থাকে জমাট বরফ। নিচে থেকেও বরফের স্তম্ভ উঠে যায় ওপর দিকে, ওপরেরগুলোকে ধরার জন্যে।

আমিও শুনেছি, মুসা বললো। নাকি ভূগোল বইয়ে পড়লাম, মনে নেই। ছাত থেকে যেগুলো নামে ওগুলোকে বলে স্ট্যালাকটাইট, আর মেঝে থেকে যেগুলো ওঠে ওগুলোকে স্ট্যালাগমাইট।

বইয়েই বোধহয় পড়েছি। হাত নাড়লো জিনা, কি জানি, কোনটাকে কি বলে।

গুহার কাছাকাছি এসে পথের চেহারা অন্যরকম হয়ে গেল। আলগা খড়িমাটি পড়ে নেই। রুক্ষও নয়, বেশ মসৃণ। প্রবেশপথটা মাত্র ছয় ফুট উচু, তার ওপরে একটা সাদা রঙ করা বোর্ডে বড় বড় কালো অক্ষরে লেখা রয়েছে মাত্র দুটো শব্দঃ বাটারফ্লাই কেভস।

রাস্তার মোড়ে যে হুঁশিয়ারিটা দেখেছিলো, সেরকমই আরেকটা নোটিশ দেখা গেল গুহা-মুখের ঠিক ভেতরে।

ওটার দিকে রাফিয়ানকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হেসে জিনা বললো, পড়ে নে ভালোমতো। আমাদের কাছাকাছি থাকবি।

টর্চ জ্বেলে ঢুকে পড়লো ওরা। চারটে টর্চের আলোয় ঝলমল করে উঠলো চারপাশের দেয়াল। অবাক হয়ে চিৎকার শুরু করে দিলো রাফি। বদ্ধ গুহায়

প্রতিধ্বনি তুললো সেই ডাক, বিকট হয়ে এসে কানে বাজলো।

রাফির নিজেরই পছন্দ হলো না সেই শব্দ। চিৎকার থামিয়ে জিনার গা ঘেঁষে এলো। হাহ হাহ করে হাসলো জিনা। দূর, বোকা, এটা তো গুহা। জীবনে কম গুহা দেখেছিস, ভয় পাচ্ছিস যে এখন?…এই, সাংঘাতিক ঠাণ্ডা তো এখানে! ভাগ্যিস অ্যানারাক এনেছিলাম।

গোটা দুই ছোট আর সাধারণ গুহা পেরিয়ে বড় একটা গুহায় ঢুকলো ওরা। যেখানে সেখানে বরফ চমকাচ্ছে। কিছু ঝুলে রয়েছে হাত থেকে, কিছু উঠে গেছে মেঝে থেকে। ওপরের বরফের সঙ্গে নিচের কোনো কোনোটা মিলে গিয়ে তৈরি হয়েছে থাম, দেখে মনে হয় এখন গুহার ছাতের ভার রক্ষা করছে ওগুলো।

দারুণ। বিড়বিড় করলো রবিন। দেখার মতো জিনিস!

সুন্দর, কিন্তু কেমন যেন গা ছমছমে, কিশোর বললো। বলতে পারবো না কেন। এসো, পরের ওহাটা দেখি।

পরেরটা আবার ছোট। তবে বরফ আছে। টর্চের আলো ঠিকরে পড়ছে ওগুলোতে। সৃষ্টি করছে রামধনুর সাত রঙ। আরিব্বাবা! চোখ বড় বড় করে ফেললো জিনা। একেবারে পরীর রাজ্য!

পরের গুহাটায় কোনো রঙ নেই। দেয়াল, মেঝে, ছাত, থাম সবকিছু একধরনের ফ্যাকাসে সাদা, টর্চের আলো ঠিকরে এসে চোখে লাগে। আসলে স্ট্যালাকটাইট আর স্ট্যালাগমাইট এতো বেশি লেগে গেছে এখানে, থাম এত ঘন, মাঝের ফাঁক দিয়ে অন্যপাশ দেখাই কঠিন।

মোট তিনটে সুড়ঙ্গমুখ দেখা গেল এই গুহাটায়। একটাতে দড়ি আছে, দুটোতে নেই। যে দুটোতে নেই, ওগুলোর মুখের কাছে দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দিলো অভিযাত্রীরা। ভেতরটা অন্ধকার, নিস্তব্ধ। তাকিয়ে থাকতে থাকতে গায়ে কাঁটা দিলো ওদের। যদি ঢুকে পথ হারায়, আর কোনোদিন বেরোতে পারবে কিনা সন্দেহ!

দড়িওয়ালাটা দিয়েই ঢোকা যাক, জিনা প্রস্তাব দিলো। ওমাথায় কি আছে দেখে ফিরে আসবো। কি আর থাকবে, হয়তো আরও কিছু গুহা।

দড়ি ছাড়া একটা গুহামুখের ভেতরে ঢুকে ঝুঁকতে আরম্ভ করলো রাফিয়ান। তাড়াতাড়ি ডাক দিলো তাকে জিনা, এই, জলদি বেরিয়ে আয়! হারিয়ে যাবি?

কিন্তু ফিরলো না রাফি, ঢুকে গেল আরও ভেতরে। ঘন কালো অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে শঙ্কিত হলো সবাই।

খাইছে! বলে উঠলো মুসা। কি দেখে গেল ওখানে? রাফি, এইই রাফি! বিকট প্রতিধ্বনি উঠলো গুহার দেয়ালে দেয়ালে।

ঘেউ ঘেউ করে সাড়া দিলো রাফি। মনে হলো, মুহূর্তে ওই ডাকে ভরে গেল সমস্ত গুহা আর সুড়ঙ্গ। বিচিত্র আওয়াজ! সহ্য করতে না পেরে কানে আঙুল দিলো রবিন।

ঘাউ! ঘাউ! ঘাউ! ঘাউ। ডেকেই চলেছে যেন একাধিক কুকুর। অথচ রাফি ডেকেছে মাত্র দুবার। ছুটে বেরিয়ে এলো সে। সাংঘাতিক অবাক হয়েছে। বিশ্বাসই করতে পারছে না যেন এই শব্দের স্রষ্টা সে নিজে।

গলায় শেকল পরিয়ে আনা উচিত ছিলো তোকে, বকা দিলো জিনা। খবরদার, আর কাছ থেকে সরবি না।

কথা শুনলো এবার রাফি। কাছে কাছেই রইলো। গুহা থেকে গুহায়, সুড়ঙ্গ থেকে সুড়ঙ্গে ঘুরে বেড়াতে লাগলো দলটা। দড়ি লাগানো জায়গাগুলোতেই শুধু ঘুরছে ওরা। অনেক সুড়ঙ্গ দেখলো, যেগুলোতে দড়ি নেই। ভেতরে কি আছে। দেখার লোভও হলো, কিন্তু জোর করে দমন করলো কৌতূহল। অযথা বিপদে পড়ার কোনো মানে হয় না।

একটা গুহায় একটা ডোবামতো দেখা গেল। পানি জমে বরফ হয়ে আছে। আয়নার কাজ করছে ওটা। ছাতের সব কিছুর প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে ওর ভেতর। ঠিক এই সময় একটা অদ্ভুত শব্দ কানে এলো ওদের। চিনতে পারলো না কিসের শব্দ। সোজা হয়ে কান পাতলো সবাই।

কাঁপা কাঁপা, তীক্ষ্ণ শব্দটা যেন ক্রমান্বয়ে ভরে দিতে লাগলো সব গুহা, সুড়ঙ্গ। একবার বাড়ছে, আবার কমছে…বাড়ছে…কমছে…

বেশিক্ষণ চুপ থাকতে পারলো না রাফি। ঘেউ ঘেউ করে চেঁচিয়ে উঠলো সে। যেন তার ডাকের জবাবেই আরও জোরে হলো আগের বিচিত্র শব্দটা।

এ-কি ভূতুড়ে কাণ্ড! ভয়ে ভয়ে অন্ধকার সুড়ঙ্গের দিকে তাকিয়ে রইলো মুসা।

ব্যাপারটা কি! ফিসফিসিয়ে বললো জিনা, জোরে বলতে ভয় পাচ্ছে। চলো, এখানে আর এক মুহূর্তও না!

কানে আঙুল দিয়ে ছুটলো ওরা। দৌড়ে চললো প্রবেশপথের দিকে। যেন হাজারখানেক বুনো কুকুর একসঙ্গে তাড়া করেছে ওদেরকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *