০৮. এই সময় মুসা দেখলো ঝিনুক

এই সময় মুসা দেখলো ঝিনুক আর সাগরের হাসি নেমে আসছে। পানি এতই পরিষ্কার, মনে হচ্ছে পানিতে নয় ডাঙাতে রয়েছে ওরা। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে হাঙরটার দিকে সাঁতরে যাচ্ছে ঝিনুক। এখনও উঠছে মুসা, শেষ হয়ে আসছে শক্তি। যেন দুঃস্বপ্নের মাঝে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে দেখছে দৃশ্যটা। ধীরে ধীরে ঘুরছে বিশাল দানবটা, তাকে ধরার জন্যে আসছে। ওটার মাথার কাছ দিয়ে চলে গেল ঝিনুক। পলকের জন্যে মুসা দেখলো, তার হাতটা উঠল নামলো একবার দ্রুত, সাপের মত ছোবল মারলো যেন ছুরি। হাঙরের মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত, বেরিয়ে এলো। আবার আঘাত হানলো ঝিনুক। পাক খেয়ে ঘুরে গেল হাঙর। হাঁ হয়ে গেছে মুখ। বেরিয়ে পড়েছে মারাত্মক দাঁতের সারি। কাছাকাছি রয়েছে সাগরের হাসি, তাকে কামড়াতে গেল ওটা। ওপর দিকে ছুরি চালিয়ে হাঙরের পেট কেঁড়ে দিলো মেয়েটা।

হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি শুরু করেছে মুসা। পানিতে লাথি মেরে ভেসে উঠতে চাইছে ওপরে। পানি আর আগের মত পরিষ্কার নয়, রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে গেল চোখের সামনে থেকে হাঙর। ঘোলাটে লাল পানির ভেতরে এখন কি ঘটছে, আর দেখা গেল না। একটাই ভাবনা, যে করেই হোক, ভেসে উঠতে হবে। মনে হচ্ছে এই বুঝি পায়ে কামড় বসালো হাঙরটা। ফুসফুসের বাতাস শেষ। যখন ভাবলো, আর উঠতেই পারবে না, এই সময় পানির ওপরে ভেসে উঠলো মাথা। হাত বাড়িয়েই রেখেছে ডজ আর কিশোর। একটানে তাকে তুলে নিলো ওপরে।

কয়েক সেকেন্ড কেবিনের মেঝেতে চিত হয়ে রইলো মুসা। জোরে জোরে দম নিচ্ছে। অবশেষে কোনমতে জিজ্ঞেস করলো, ওরা উঠেছে?

না, জবাব দিলো ডজ।

কিন্তু…নিচে…একটা হাঙর…

জানি। দেখেছি। ওটাকে মারতেই গেছে দুজনে।

ওদেরকেই মেরে ফেলবে তো!

তা পারবে না। এরকম লড়াই অনেক করেছে ওরা। মারকুইজানদের সঙ্গে পারে না হাঙর। পেছন থেকে না জানিয়ে হঠাৎ এসে যদি ধরে ফেলতে পারে, তো পারে, নইলে সম্ভব না। হাঙর শিকার করতে ওস্তাদ মারকুইজানরা। ওদের কাছে খেলা।

আমার কাছে মোটেও খেলা মনে হয়নি, বিড়বিড় করলো মুসা। টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালো নিচে কি ঘটছে দেখার জন্যে।

পানিতে ভাসলো সাগরের হাসির মাথা। হাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠে এলো ওপরে। ফুচচ করে মুখ থেকে পানি ফেলে বললো, আউফ! ম্যাকো!

তার পর পরই উঠে এলো ঝিনুক। কাঁধের একটা কাটা থেকে রক্ত পড়ছে। সেটা দেখে চিৎকার করে উঠলো মুসা, খাইছে! কামড়ে দিয়েছে!

নাআহ, তেমন কিছু না, ডজ বললো। সামান্য আঁচড়। সিরিশ কাগজের মত ধারালো হাঙরের চামড়া, ঘষা লাগলে ছড়ে যায়।

মেঝেতে বসে জোরে জোরে হাঁপাতে লাগলো দুই পলিনেশিয়ান। নিজেরা নিজেরা কথা বলছে।

কি বলে? জানতে চাইলো ওমর।

বলছে, মারতে পারেনি। তার আগেই এসে হাজির হয়েছে একটা সোর্ডফিশ। ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছে। রক্তের গন্ধে হাজির হয়েছে। ওরা বলছে, হাঙরের চেয়ে বড় ওটা।

নিশ্চয় ততটা ডেনজারাস নয়, তাই না?

তা বলা যায় না। হাঙরের মত যখন তখন মানুষকে আক্রমণ করে না বটে, তবে যদি করে, তো বাঁচার আশাও শেষ। হাঙরের কবল থেকে ফেরা যায়; ওদের কবল থেকে না। সাংঘাতিক শক্ত তলোয়ার দিয়ে জাহাজের তলা ফুটো করে দেয়, মানুষ তো কিছু না।

বিশ্বাস করেন, একথা? মুসার প্রশ্ন।

করব না কেন? অ্যাডমিরালটি রেকর্ড দেখলেই বুঝবে। প্রাইমাউথের জাহাজ দা ফরচুনকে একবার আক্রমণ করেছিলো সোর্ডফিশ। তামার পাত লাগানো ছিল জাহাজটার তলায়। পাতের ওপরে ছিলো তিন ইঞ্চি পুরু লোহাকাঠ, তার ওপরে বার ইঞ্চি পুরু ওককাঠের তক্তা। সেসব তো ফুড়েছেই, ওপরে রাখা একটা তেলের ড্রামও ফুটো করে দিয়েছিলো। আরেকবার একটা ব্রিটিশ জাহাজ-নামটা ভুলে গেছি, ওটারও তলা ফুটো করেছিলো সোর্ডফিশ। সমস্ত পাম্প চালিয়ে দিয়ে পানি সেচতে সেচতে বন্দরে ফিরেছিলো জাহাজটা। সোর্ডফিশকে ছোট করে দেখো না।

তাহলে কেটে পড়া দরকার, শঙ্কিত হয়ে উঠলো ওমর। জাহাজেরই যদি এই গতি করে, ফ্লাইং বোটের ওপর খেপে গেলে সর্বনাশ করে দেবে। এক ইঞ্চি ধাতব পাত ওটার জন্যে কিছুই না, বুঝতে পারছি। তার কথা শেষ হতে না হতেই পানিতে জোর আলোড়ন উঠলো। এই, কি হল?

সবাই তাকালো সেদিকে। পানিতে প্রচন্ড আলোড়ন, সেই সাথে ফেনা। দেখ দেখ! চিৎকার করে উঠলো কিশোর।

সবার চোখ পড়েছে সেদিকে। পানিতে লাফিয়ে উঠলো বিশাল এক হাঙর। মুসাকে আক্রমণ করেছিলো যেটা সেটাও হতে পারে কিংবা অন্যটা। একটা মুহূর্ত যেন ঝুলে থাকলো শূন্যে, তারপর ঝপাস করে পড়লো। মস্ত ঢেউ উঠলো পানিতে। পরক্ষণেই একটু দূর ভেসে উঠলো সোর্ডফিশটা। নিশ্চয় ওটাই হাঙরটাকে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়েছিল।

আপু! আপু! চেঁচিয়ে উঠলো ঝিনুক। জলদি পালান!

ওমর, জলদি! তাগাদা দিলো ডজ। ঝিনুক যখন ভয় পেয়েছে, তার মানে..

আর শোনার জন্যে দাঁড়ালো না ওমর। ককপিটের দিকে দৌড় দিলো। শখানেক গজ দূরে রয়েছে সোর্ডফিশ। বিমানটাকে বোধহয় কোন শয়তান জানোয়ার ভেবে ছুটে আসতে শুরু করলো আক্রমণ করার জন্যে।

চালু হয়ে গেল একটা ইঞ্জিন। তার পর পরই দ্বিতীয়টা। সবে চলতে শুরু করেছে বিমান, এই সময় প্রচন্ড এক আঘাতে কেঁপে উঠলো থরথর করে। ঝাঁকি দিয়ে পানির ওপরে উঠে গেল কয়েক ইঞ্চি। সীট থেকে প্রায় উড়ে চলে গেল ওমর। যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণের কেউ রইলো না। কোনমতে উঠে গিয়ে সীটে বসে আবার জয়স্টিক চেপে ধরলো সে।

মুহূর্ত পরেই তিরিশ ফুট দূরে ভেসে উঠলো সোর্ডফিশ। দ্রুত বিমানটাকে ওটার কাছ থেকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো ওমর। কিন্তু ওড়ার আগেই আবার এক ভয়াবহ ঝাঁকুনি। ভোজবাজির মত যেন কেবিনের মেঝে ফুড়ে উদয় হলো একটা বিশাল তলোয়ারের মাথা। পলকের জন্যে। তারপরই এক হ্যাচকা টানে সরে গেল ওটা। গলগল করে পানি ঢুকতে শুরু করলো ফুটো দিয়ে। একটা তোয়ালে দিয়ে পানি বন্ধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলো কিশোর। চেঁচাতে লাগলো, ওমরভাই, জলদি! জলদি করুন! দুই মিনিটও লাগবে না ডুবতে!

ককপিটের দিকে ছুটে গেল মুসা। তাড়াতাড়ি ওড়ান! ফুটো করে দিয়েছে!

চেষ্টা তো করছি!

পঞ্চাশ ফুট গিয়ে ঘুরতে শুরু করলো সোর্ডফিশ। আবার এসে খোঁচা মারার ইচ্ছে বোধহয়। আবার আসছে! বলেই পিস্তল বের করে গুলি করতে লাগলো ডজ। ওটার গায়ে লাগলো কিনা বোঝা গেল না, তবে ততক্ষণে মাছটার চেয়ে গতি বেড়ে গেছে বিমানের। কেবিনে ফিরে এসে মুসা দেখলো তুলকালাম কান্ড শুরু হয়েছে সেখানে। পানি বন্ধ করার চেষ্টা করছে সবাই প্রাণপণে। কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না। ইতিমধ্যেই ভেসে গেছে মেঝে। কিশোর বললো মুসাকে, ওমর ভাইকে চালিয়ে যেতে বল। থামলে আরও বেশি ঢুকবে।

ছুটে এসে ওমরকে খবরটা জানালো মুসা।

তুলতেই পারছি না! ফাসফেঁসে কণ্ঠে বললো ওমর। একেতো ঝিনুকের ভার, তার ওপর পানি…উঠতেই চাইছে না!

কি করব?

সমস্ত ভার ফেলে দিতে হবে। আগে গিয়ে ডুবুরির সরঞ্জামগুলো ফেল। ওগুলোই সব চেয়ে ভারি।

ছুটে কেবিনে ফিরে এলো মুসা। জানালা দিয়ে দেখলো, ডজ আইল্যান্ড প্রায় মাইল দুয়েক দূরে এখনও। তীব্র গতিতে ট্যাক্সিইং করে ছুটছে বিমান। তবে ওড়ার শক্তি অর্জন করতে পারছে না কিছুতেই। ওমর ভাই বলেছে, ডাইভিং গীয়ারগুলো ফেলে দিতে। বোঝা কমাতে।

একটা মুহূর্ত দ্বিধা করলো না ডজ। টেনে নিয়ে এলো বেজায় ভারি ডাইভিং কিট, সাথে লাগানো চল্লিশ পাউন্ড ওজনের বুটসহ। দরজা দিয়ে ফেলে দিলো পানিতে। ওগুলো অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগেই ফেললো হেলমেটটা। তার পর একে একে পাম্প, লাইন, আর আরও যা যন্ত্রপাতি আছে, সব।

ঝিনকুগুলোর দিকে হাত বাড়ালো মুসা। তাকে বাধা দিলো সাগরের হাসি, না, দরকার নেই। আমি নেমে যাচ্ছি। কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে। তার পেছনে গেল ঝিনুক।

ধরো! ধরো! চেঁচিয়ে উঠলো কিশোর।

ভয় নেই, ডজ বললো। মাত্র এক মাইল। ওটুকু সাঁতরানো কিছুই না ওদের জন্যে।

অনেকখানি ভারমুক্ত হয়ে গিয়ে অবশেষে উঠতে শুরু করলো বিমানটা। পানি ছেড়ে ওপরে উঠতেই ফুটো দিয়ে বেরিয়ে যেতে লাগলো কেবিনের পানি। আরও কমে যেতে লাগলো ভার। লেগুনের ওপর যখন চক্কর মারতে শুরু করলো ওটা, সব পানি বেরিয়ে গেছে ততক্ষণে।

ওমরের কাছে এসে দাঁড়ালো কিশোর। তাকে বললো ওমর, সবাইকে গিয়ে বলো, বেশি পানিতে নামালে আবার পানি ঢুকে ডুবে যাবে। পানির কিনারে নামিয়ে বালিতে তুলে ফেলার চেষ্টা করবো। পানি ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন সবাই লাফিয়ে নেমে যায়। ভার কম থাকলে বালিতে তোলা সহজ হবে।

ছুটে এসে সবাইকে কথাটা বললো কিশোর।

যতটা সম্ভব আস্তে পানিতে নামানোর চেষ্টা করলো ওমর। কিন্তু বিমানের পেট পানি ছুঁতে না ছুঁতেই আবার গলগল করে পানি ঢুকতে আরম্ভ করলো। সোজা সৈকতের দিকে ছোটালো সে।

পঞ্চাশ গজ দূরে থাকতে প্রথম লাফ দিলো মুসা। বিশ মাইল গতিতে ছুটছে তখন বিমান। মাথা তুললো বিমানের পেছনে ঢেউ আর ফেনার মধ্যে। তার পেছনে গেল কিশোর। সবার শেষে ডজ। পানিতে হাবুডুবু খেল তিনজনেই, সব চেয়ে বেশি কিশোর।

আবার যখন কেবিনে এসে উঠলো তিনজনে, কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল ওমরকে। ঝিনুকগুলো বের করে সৈকতে ফেলার চেষ্টা করছে। তিনজনকে দেখে কাজের ভার ওদের ওপর ছেড়ে দিয়ে ককপিটে ফিরে এলো সে। একটু একটু করে ইঞ্জিনের জোর বাড়িয়ে বালিতে টেনে তোলার চেষ্টা করতে লাগলো বিমানটাকে। ঝিনুক ফেলতে শুরু করেছে অন্য তিনজনে। এতে আরও কমে যেতে লাগলো। ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগিয়ে চললো বিমান।

সমস্ত জিনিসপত্র বের করে আনা হলো বিমান থেকে। কতটা ক্ষতি হয়েছে দেখতে বসলো ওমর। ডজের উদ্দেশ্যে বললো, তুমি তো মানাই করেছিলে। বললে কি দরকার। এ জন্যেই বুঝলে, এ কারণেই ওগুলো আনতে চেয়েছি আমি। জানতাম প্রবালে ঘষা খেয়ে ফুটো হয়ে যেতে পারে। পাতগুলো এনে ভাল করেছি, কি মনে হয়?

নীরবে মাথা ঝাঁকালো শুধু ডজ।

আরেকটু হলেই মারা পড়েছিলো, কিশোর বললো। ডজের বড়জোর তিন ইঞ্চি দূর দিয়ে গিয়েছিলো মাথাটা। একটু সরে লাগলেই এতক্ষণে…, কথাটা শেষ করে হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দিলো সে।

বাপরে বাপ, যে জায়গার জায়গা, হেসে বললো ওমর। বিমানের তলায় আরমার প্লেট লাগিয়ে নেয়া দরকার। যাকগে। ক্ষতি বেশি হয়নি। পাত কেটে লাগিয়ে ফুটোটা বন্ধ করে ফেলা যাবে। বাড়ি ফেরার বন্দোবস্ত হবে, তবে ঝিনুক তোলার এখানেই ইতি।

আর বোধহয় দরকারও নেই, মুসা বললো।

না। অনেক হয়েছে, সায় জানালো ডজ। যা পেয়েছি নিয়ে চলে যাই। পরে আসা যাবে।

ওই যে ওরা আসছে, কিশোর বললো। আরেকটু দেরি হলেই ভাবনায় পড়ে যেতাম।

একটুও ক্লান্ত মনে হলো না দুই পলিনেশিয়ানকে। স্বচ্ছন্দে সাঁতরে আসছে। কাছে এসে হাত তুলে হেসে বললো, কাওহা! যেন পুরো ব্যাপারটাই একটা রসিকতা।

ঝিনুকগুলো রোদে ফেলে রাখতে হবে, ডজ বললো। আশা করি কালই খুলতে পারব। এই, হাত লাগাও, কিশোর। আর মুসাকে বললো সে। শেষ করে ফেলি।

এগুলোতেও নিশ্চয় কিছু পাওয়া যাবে, ঝিনুকগুলো দেখিয়ে ওমর বললো। স্কুনার একটা কিনে ফেলতে পারবে, ডজ। আরও মুক্তো তুলতে ফিরে আসতে পারবে।

চোয়াল ডললো ডজ। কি জানি। আসতে তো চাইই। তবে মুক্তো পাওয়া এবং ধরে রাখার জন্যে ভাগ্য লাগে। আমার সেটা আছে বলে মনে হয় না। যা কিছু ভালো হয়েছে সব তোমাদের ভাগ্যে।

ননসেন্স! অধৈর্য হয়ে হাত নাড়লো ওমর। ওসব বিশ্বাস কর নাকি। কাল বিকেলে রাটুনায় ফিরে যাচ্ছি আমরা। এর মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *