০৮. আঁধারে চোখ মেলে চাইল কিনো

আঁধারে চোখ মেলে চাইল কিনো। কাছেই কিসের যেন নড়াচড়া টের পেল, কিন্তু স্থির রইল ও, একচুল নড়ল না। আঁধার ভেদ করে দেখার চেষ্টা করছে। ছোট্ট বাসাটার খুদে গর্তগুলো দিয়ে চুইয়ে ঢুকেছে চাঁদের আলো।

চাঁদের বিভায়, হুয়ানা আলগোছে উঠে পড়ছে মাদুর ছেড়ে লক্ষ্য করল কিনো। চুলোর উদ্দেশে ওকে যেতে দেখল সে। হুয়ানা পাথরটা সরাতে মৃদু একটু শব্দ হলো। এবার সে নিঃশব্দে দরজার দিকে যাচ্ছে। মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়িয়ে, ঝুকে পড়ল কয়েটিটোর দোলনার ওপর। এবার পা টিপে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। কিনো ভয়ানক রেগে গেছে। ধড়মড় করে উঠে পড়ে অনুসরণ করল হুয়ানাকে। সাগরের উদ্দেশে হুয়ানার চলমান পদশব্দ নিস্তব্ধ রাতে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে কিনা।

অনুগমনরত কিনোর মাথায় আগুন ধরে গেল।

ঝোপ-ঝাড়ের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে, পাথর মাড়িয়ে অবিচল এগিয়ে চলেছে হুয়ানা।

হঠাৎ করে কিনোর অশুয়ান পায়ের আওয়াজ পেয়ে, পড়ি কি মরি করে দৌড় দিল সে।

হাত শূন্যে, মুক্তোটা এক্ষুণি ছুঁড়ে ফেলে দেবে সাগরের জলে। কিনো ঝাপিয়ে পড়ে শক্ত করে চেপে ধরল হাতটা, তারপর মোচড় মেরে কেড়ে নিল মুক্তোটা।

চটাস করে এক চড় পড়ল হুয়ানার গালে। পাথরের ওপর সে মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে, কষে এক লাথি মারল কিনো। চাঁদের উদ্ভাসিত আলোয়, ছোট ছোট ঢেউ বয়ে যাচ্ছে হুয়ানার দেহের ওপর দিয়ে, লক্ষ্য করল কিনে। পানিতে, হুয়ানার পায়ের কাছে ফুলে ভেসে উঠছে স্কার্টটা।

কিনো নিচের দিকে চেয়ে হিংস্র কুকুরের মতন দাঁত খিচাল। বিস্ফারিত, আতঙ্কিত চোখ তুলে চাইল হুয়ানা। কসাইয়ের সামনে দাঁড়ানো ভেড়ার মত লাগছে ওর নিজেকে। কিনো ওকে এখন মেরে ফেলতে চাইলেও ঠেকাতে পারবে না। মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করছে হুয়ানা। একটু পরে হুঁশ ফিরে পেল যেন কিনো। হুয়ানা কি করতে যাচ্ছিল ভেবে দুর্বল হয়ে পড়ল। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা-ভাবনা করতে পারছে না ও। ঘুরে দাঁড়িয়ে টলতে টলতে ঝোপের মধ্যে দিয়ে ফিরে চলল।

হঠাৎ, শুনতে পেল কে যেন ছুটে আসছে ওর দিকে। আতঙ্কিত কিনো ঘুরে দাঁড়াল। ছোরাটা বের করে চালিয়ে দিতে, ওটা ঘ্যাঁচ করে গেঁথে গেল প্রতিপক্ষের দেহে। আর্তনাদ ছেড়ে এবার কে যেন টান মেরে মাটিতে ফেলে দিল ওকে, পকেট হাতড়াচ্ছে ওর লোভীর মত। মুক্তোটা ধস্তাধস্তির ফলে, ছোট্ট পাথুরে পথটার ওপর গড়িয়ে পড়ল। চাঁদের আলোয় ঝিকোচ্ছে ওটা।

ওদিকে পানিতে পড়ে রয়েছে হুয়ানা। মুখ আর শরীরের একটা পাশে ভয়ানক যন্ত্রণা হচ্ছে তার। কোনমতে হাঁটুতে ভর দিয়ে বসল। কিনোর ওপর রাগ হচ্ছে না ওর। কিনোকে হুয়ানার প্রয়োজন, ওকে ছাড়া বাঁচবে না সে। কিনোকে অতখানি বোঝে না, কিন্তু এটা জানে লোকটাকে ভালবাসে সে। কিনোকে অনুসরণ করবে ও। হয়তো বাঁচাতে পারবে কিনোকে এই অভিশপ্ত মুক্তোটার হাত থেকে।

সাগরের পানিতে মুখ ধুয়ে, ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়াল হয়না। তীর ধরে শ্লথ পায়ে কিনোর খোজে চলল। দক্ষিণ দিক থেকে ভেসে এসেছে কয়েক খন্ড মেঘ। তাদের ফাঁক-ফোকর গলে মাঝেমধ্যে উঁকি দিচ্ছে চাঁদ। কাজেই আলো আঁধারির মধ্যে হাঁটতে হচ্ছে হুয়ানাকে। পিঠটা ভেঙে পড়ছে ব্যথায়, নুয়ে পড়েছে মাথা। ঝোপ-ঝাড়ের মধ্য দিয়ে যখন এগোচ্ছে চাদঁ তখন মেঘে ঢাকা। আলো ফুটলে, পাথুরে পথটার ওপর ঝকমক করতে দেখল ও মস্তবড় মুক্তোটাকে। হাঁটু গেড়ে বসে ওটা তুলে নিল হুয়ানা।

এক টুকরো মেঘের আড়াল নিল আবার চাঁদ। হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে হুয়ানা ভাবছে, আবারও সাগরে ফিরে যাবে কিনা। মেঘের ওপাশ থেকে চাঁদ ফুড়ে বেরোতে, হুয়ানা লক্ষ্য করল, ওর সামনে পায়ে চলা পথটার ওপর দুজন পুরুষ লোক পড়ে রয়েছে। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল হুয়ানা। কিনো না ওটা? অপর লোকটা অপরিচিত। গলা বেয়ে রক্তের নদী বইছে তার।

একটু নড়ে উঠে কথা বলার চেষ্টা করল কিনো। ধীরে ধীরে নড়াচড়া করছে ওর হাত-পা, আধ মরা কোন জন্তুর চার পায়ের মতন লাগছে দেখতে।

পথের ওপর এক লোক মরে পড়ে আছে। এবং তার পাশে পড়ে রয়েছে কিনোর ছোরা। রক্তে মাখামাখি ওটা।

পুরানো জীবনের জন্যে হুতাশ উঠল হুয়ানার মনে। মুক্তোটা পাওয়ার আগে কত নিশ্চিন্ত-নিঝঞাট ছিল তাদের জীবন।

কিন্তু রত্নটা পাওয়ার পর থেকে যেন শনির দশায় পেয়েছে ওদেরকে। মুক্তো তো নয় যেন রাহু একটা। অলক্ষুণে কত ঘটনাই তো ঘটে গেল। আর এখন, কিনো কিনা এক লোককে খুন করে বসে আছে। বাচ্চা নিয়ে পালানো ছাড়া ওদের স্বামী-স্ত্রীর এ মুহূর্তে আর কি করার আছে? এ তল্লাট ছেড়ে পালিয়ে যেতে হবে ওদের।

হুয়ানার জ্বালা-যন্ত্রণা নিমেষে দূর হয়ে গেছে। রাস্তার ওপর থেকে টেনে হিচড়ে, লাশটা এক ঝোপের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল সে। এবার স্বামীর কাছে গিয়ে ভেজা স্কার্ট দিয়ে তার মুখ মুছিয়ে দিল। শেষমেষ, কথা ফুটল কিনোর মুখে।

ওরা মুক্তটা কেড়ে নিয়ে গেছে, বলল। আমার সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

অসুস্থ বাচ্চাকে যেভাবে দেবে, তেমনিভাবে স্বামীকে সান্ত্বনা দিল হুয়ানা।

এই যে, তোমার মুক্তা, বলল ও। রাস্তার ওপর পড়ে পেয়েছি। আমার কথা শুনতে পাচ্ছ এখন? এই যে, তোমার মুক্তা আমার কাছে। বুঝতে পারছ আমার কথা? এক লোককে খুন করে ফেলেছ তুমি। পালাতে হবে আমাদের। লোকে আমাদের পিছু নেবে। কিনো, বুঝতে পারছ কিছু? ভোরের আলো ফোটার আগেই আমাদের এখান থেকে সরে পড়তে হবে।

কে যেন হামলা করে আমার ওপর, বলে কিনে। আত্মরক্ষার জন্যে ওকে আঘাত করি আমি।

তোমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে মনে করেছ?

না, বলল কিনো, গভীর শ্বাস টেনে বুক ভরে নিল। তুমি ঠিকই বলেছ!

দৃঢ়তা-বলিষ্ঠতা ফিরে পাচ্ছে কিনো।

যাও, বাসায় গিয়ে কয়েটিটোকে নিয়ে এসো, বলল ও। সমস্ত শস্যদানাও নিয়ে আসবে। পানিতে ক্যানু ভাসাচ্ছি, এ এলাকা ছেড়ে পালাব আমরা।

কিনো ওর ছোরাটা তুলে নিয়ে, হুয়ানাকে রেখে রওনা হলো। সৈকতের উদ্দেশে ছুটতে ছুটতে অবশেষে ক্যানুর কাছে এসে থামল। মুখ হাঁ হয়ে গেছে, চাঁদের আলোয় নৌকার তলদেশে মস্ত এক গর্ত আবিষ্কার করে। রাগে দেহে মত্ত হাতির জোর অনুভব করল কিনে। শক্ত প্লাস্টারে তৈরি ও দাদার আমলের এই ক্যানু। কোন্ হতচ্ছাড়া জানি ওটার দফারফা করে ছেড়েছে।

যে কোন মুক্তো-ডুবুরির জন্যে, নৌকার ক্ষতি হওয়া মানে পেটে লাথি পড়া। এমনকি মানুষ খুন করাটাকেও এখানে এত বড় পাপ হিসেবে দেখা হয় না। নৌকার ছেলেপুলে নেই, এবং সে অসহায়, যুদ্ধ করতে পারে না। ক্ষতিগ্রস্ত নৌকা আবার সারিয়ে তোলা প্রায় অসম্ভব একটা কাজ।

ক্ষুব্ধ, ব্যথিত কিনো এখন করতে পারে না হেন কাজ নেই।

 

কিনোর জীবনে বেঁচে থাকার এখন একটাই উদ্দেশ্য। আত্মগোপন করে লড়াই করা। পরিবারের জন্যে যুদ্ধ করতে হবে ওকে। সমুদ্রতট ধরে ছুট দিল ও উর্ধ্বশ্বাসে, ঝোপ-ঝাড় এড়িয়ে পথ করে নিয়ে বাসার কাছাকাছি এসে হাজির হলো।

ধলপহরের আলোয় মোরগের পাল সবে ডাকাডাকি শুরু করেছে, জেগে উঠছে লোকালয়। প্রথম ধোঁয়ার রেখা পাক খেয়ে উঠে যাচ্ছে কাঠের বাসাগুলোর ওপরে। নাস্তা তৈরি হচ্ছে ঘরে ঘরে। ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে।

ঝোপে-ঝাড়ে পাখিদের কলরোল। চাঁদের কিরণ ফিকে হয়ে আসছে, ক্রমেই ঘন হচ্ছে দখিনা মেঘরাজি। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ পাচ্ছে কিনা।

তড়িঘড়ি বাসার উদ্দেশে এগোনোর সময়, সহসা খুশি-খুশি হয়ে উঠল কিনোর মন। এখন ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা-ভাবনা করতে পারছে সে। চিন্তা তো একটাই। সটকে পড়তে হবে। জামার ভেতর রাখা প্রকাণ্ড মুক্তোটায় হাত ছোয়াল ও। এবার টের পেল ছোরাটা ওর গলায় ঝুলছে।

হঠাৎ, সামনে ক্ষীণ আলো লক্ষ্য করল কিনো, তারপর লম্বা এক অগ্নিশিখা লকলক করে বাতাসে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। দিনের বেলার মত পরিষ্কার হয়ে উঠেছে রাস্তাটা উদ্ভাসিত আলোয়, জোরালো শব্দ করছে অগ্নিশিখাটা।

ওর মাথা গোঁজার ঠাই, কাঠের বাসাটায় আগুন লেগেছে, খিঁচে দৌড় দিল কিনো। মাত্র অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় এ ধরনের বাসা।

কিনো দৌড়াচ্ছে, মুখোমুখি পড়ে গেল কোলে কয়োটিটোকে নিয়ে ছুটে আসা হুয়ানার। কাঁদছে অসহায়-নিস্পাপ বাচ্চাটা। হুয়ানার চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে, আতঙ্কে।

কি ঘটেছে নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছে কিনো। তাই হুয়ানাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। হুয়ানা নিজে থেকেই বলল।

কয়েকজন লোক আসে বাসায়, জানাল হুয়ানা। মুক্তাটা খুঁজছিল। না পেয়ে আগুন দেয়।

কিনোর মুখ আলোকিত আগুনের উজ্জ্বল আভায়।

কারা ছিল ওরা?

জানি না, বলল হুয়ানা। দেখতে পাইনি।

বাড়ি-ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসছে পাড়া-প্রতিবেশী। কাঠের জ্বলন্ত খড়ি খসে অন্যান্য বাসায় যাতে না পড়ে সে চেষ্টায় প্রাণান্ত পরিশ্রম করে চলেছে তারা।

কিনোর হঠাৎ ভয় লেগে উঠল। আলোর ঔজ্জ্বল্য ওকে ভড়কে দিয়েছে। ঝোপের ভেতর পড়ে থাকা মৃতদেহটার কথা মনে পড়ে গেল ওর।

বাহু ধরে টেনে হুয়ানাকে বাড়িটার ছায়ায় নিয়ে এল সে। পড়শীদের চোখে পড়তে চাইছে না। হুমকি-ছড়ানো আগুনের কাছ থেকে বউকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল।

ওরা স্বামী-স্ত্রী ত্বরিত পৌঁছে গেল হুয়ান টমাসের বাসায়। হুয়ানাকে টানতে টানতে ভেতরে প্রবেশ করল কিনো। বাইরে নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিচারে শোরগোল করছে।

পড়শীদের ধারণা, কিনো হয়তো সপরিবারে জ্বলন্ত বাসাটার ভেতরে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *