০৭. স্তব্ধ হয়ে গুহার ভেতরে দাঁড়িয়ে

স্তব্ধ হয়ে গুহার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে অস্টিন। পরিষ্কার দেখেছে, এই গুহাটাতেই ঢুকেছে সাসকোয়াচ। বেরোনর একটাই পথ দেখতে পাচ্ছে। তাহলে গেল কোথায় রোবটটা? নিশ্চয়ই আরও কোন মুখ আছে।

একদিকের দেয়ালের ধার ঘেঁষে গিয়ে ওপাশের ঢালু দেয়ালটার কাছে এসে দাঁড়াল সে। বায়োনিক হাতের আঙ্গুল দিয়ে টোকা দিল দেয়ালে ফাঁপা জায়গা আছে কিনা খুঁজছে। কিন্তু পেল না। আবার গুহামুখে ফিরে এল সে। ইনফ্রা-রেড সেন্সরটা আবার চালু করল। এবারে সাসকোয়াচকে খোঁজার চেষ্টা করল না। আবহাওয়ায় কোন অস্বাভাবিকতা আছে কিনা বের করার চেষ্টা চালাল। বেশিক্ষণ লাগল না, পেল। সুড়ঙ্গের পাশের দেয়ালের চাইতে পেছনের দেয়ালটা দুই ডিগ্রী বেশি গরম।

আবার এগিয়ে গেল অস্টিন। একপাশের দেয়ালে একবার নক করে দেখল। তারপর পেছনের দেয়ালে নক করতেই পরিবর্তনটা টের পেল। ফাঁপা নয়, কিন্তু শব্দে পার্থক্য আছে। অপেক্ষাকৃত জোরে বায়োনিক হাতে আবার নক করল। ক্ষুদে এক টুকরো পাথর খসে পড়ল দেয়ালের গা থেকে। আঙ্গুল দিয়ে খুঁচিয়ে ছিদ্রটা বড় করল। টোকা দিয়ে দেখল, শব্দ আরও বদলে গেছে। খোচাতে খোচাতে এক ফুট গভীর করে ফেলল সে ছিদ্রটা। আছে। একটা ধাতব দরজার অংশ চোখে পড়ছে এখন।

হাসল অস্টিন। পিছিয়ে এল কয়েক পা। তারপর ছুটে গিয়েই শূন্যে লাফ দিল। জোড়া পায়ে লাথি মারল দেয়ালের গায়ে। মেরেই ডিগবাজি খেয়ে এসে সোজা হয়ে দাঁড়াল মাটিতে। ধাতব দরজার এপাশের পাথর চৌচির হয়ে মাটিতে খসে পড়ল। আবার পিছিয়ে এল সে। আবার ছুটে গিয়ে একই পদ্ধতিতে লাথি চালাল ধাতব দরজার গায়ে। বিচ্ছিরি শব্দ করে কব্জা থেকে ছুটে গিয়ে ছিটকে পড়ল দরজা। ওপাশে সুড়ঙ্গ।

ক্রিস্টালে তৈরি সুরঙ্গের দেয়াল, মেঝে, ছাদ। উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত। মেঝেটা সমতল। কিন্তু এর একপাশ থেকে উঠে গিয়ে ছাদ হয়ে অর্ধবৃত্তাকারে অন্য পাশে এসে মিশেছে দেয়াল। ছাদের কয়েক ইঞ্চি পর পরই ট্রি ক্লিনিক ক্রিস্টাল জ্বলছে। আইস টানেল বলে মনে হল অস্টিনের। মানুষের বানানো। এ ধরনের জিনিস প্রকৃতির সৃষ্টি হতেই পারে না।

প্রচন্ড কৌতূহল জাগল অস্টিনের। কি আছে ভেতরে? ঢুকে দেখবে? ভয়ঙ্কর বিপদ ঘটার সম্ভাবনা আছে এতে। সে নিশ্চিত, এই সুরঙ্গ পথেই গেছে সাসকোয়াচ, হয়ত তার স্রষ্টাদের কাছেই। যারা সাসকোয়াচের মত জিনিস সৃষ্টি করতে পারে, তাদের অসাধারণ শক্তি সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই অস্টিনের। ঢুকলে হয়ত প্রাণ নিয়ে আর বেরোতে পারবে না কখনও। শেষ পর্যন্ত কৌতূহলেরই জয় হল। ভেতরে ঢোকাই স্থির করল সে। দেখতে হবে, কি আছে ভেতরে। কারা সৃষ্টি করছে সাসকোয়াচের মত রোবট। কেন? তাদের উদ্দেশ্য কি?

আইস টানেলে পা দিল অস্টিন। সাবধানে এগিয়ে চলল।

পঞ্চাশ ফুটের মত এগিয়ে শেষ হয়েছে আইস টানেল। ওপাশে হালকা অন্ধকার। সুড়ঙ্গের মাঝামাঝি এসে থামল অস্টিন। অদ্ভুত একটা শব্দ কানে গেছে। হঠাৎই ঘটতে শুরু করল ঘটনাগুলো। সুড়ঙ্গের আলোগুলো কাঁপতে শুরু করেছে। প্রথমে ধীরে, তারপর আস্তে আস্তে দ্রুত হতে লাগল। সেই সঙ্গে সাইরেনের মত তীক্ষ্ণ শব্দ উঠল। ঘুম ঘুম অনুভূতি হল অস্টিনের। টলে উঠল। নিজেকে স্থির রাখার চেষ্টা করছে প্রাণপণে। অবশ হয়ে আসছে দেহ। কিন্তু কোন ব্যথা নেই শরীরের কোথাও। শংকিত হয়ে পড়ল সে।

টলতে টলতে আরও তিন পা এগিয়ে গেল অস্টিন। আর পারল না। হাঁটু ভেঙে বসল, পরক্ষণেই গড়িয়ে পড়ে গেল। আবছাভাবে চোখে পড়ল, হালকা অন্ধকারে ভেতর থেকে আলোয় এসে দাঁড়িয়েছে দুজন পুরুষ আর একজন মেয়ে।

চোখ মেলে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে অস্টিন। কিন্তু কিছুতেই পারল না। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ঘুম পাড়ান হচ্ছে তাকে। ইলেকট্রোস্লীপ।

অবিশ্বাস্য! অস্টিনের ওপর ঝুকে দাঁড়িয়ে বলল মেয়েটা।

এই পৃথিবীর সবচেয়ে আজব মানুষ ও, বলল প্রথম পুরুষ।

তাইই, বলল মেয়েটা।

ভালমত পরীক্ষা করে দেখতে হবে ওকে।

মেরে না ফেলে ঘুম পাড়ান হয়েছে তাকে এজন্যেই।

দুপুর। যথারীতি আবার কাজ শুরু হয়েছে ট্রিনিটি বেস এ। দেখে মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বেসের লোকেরা। আর্মি জীপ আসছে যাচ্ছে। আশেপাশের বন অঞ্চল চষে ফেলা হচ্ছে যেন। নতুন একটা জেনারেটর ট্রাক আনা হয়েছে। পোড়া ট্রাকটাকে ট্রাক্টর দিয়ে টেনে নিয়ে গিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে জঙ্গলের পাশে। আধ ডজন সশস্ত্র লোক পাহারা দিচ্ছে বেস এলাকা। আগে ছিল না, কিন্তু এখন কাটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে জায়গাটুকু। আবার হামলা আসার আশংকা করছেন গোল্ডম্যান। কিন্তু এবারে আর যাতে সহজেই কৃতকার্য হয়ে ফিরে যেতে না পারে আক্রমণকারী, তার জন্যেই এতসব ব্যবস্থা।

কর্কবোর্ডের বিশাল এক টপোগ্রাফিক্যাল ম্যাপ আটকে নিয়েছেন গোল্ডম্যান। তার আশেপাশে দাঁড়িয়ে আছে রেনট্রি সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন এবং ইউ.এস ফরেস্ট সার্ভিসের একজন রেঞ্জার।

এই অঞ্চলের দিকে গেছে কর্নেল অস্টিন, ম্যাপের এক জায়গায় পেন্সিলের চোখা মাথা ছুঁইয়ে বললেন গোল্ডম্যান। ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে বললেন, সার্চ পার্টিতে কজন লোক আছে এখন?

চুরানব্বই জন, উত্তর দিল ক্যাপ্টেন।

আমার লোক আছে আরও সাতাশজন, বলল রেঞ্জার। ওরাও খুঁজছে।

গুড। আকাশ থেকে খোঁজার ব্যবস্থা হয়েছে?

দুটো ফরেস্ট সার্ভিস হেলিকপ্টার ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে, বলল রেঞ্জার। বনবিভাগের সেরা দুজন পাইলট আছে দুটোতে।

রাতের আগেই, দৃঢ় গলায় বলল ক্যাপ্টেন, ওদের খুঁজে বের করব আমরা।

ধন্যবাদ। খোঁজ পেলেই জানাবেন আমাকে।

পেনসিলটা বোর্ডে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালেন গোল্ডম্যান। তারপর রেনট্রিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন তাঁবু থেকে।

অস্টিনের জন্যে ভাবনা হচ্ছে, না? গোল্ডম্যানের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল রেনট্রি।

সহজে হাল ছেড়ে দেবার লোক নয় ও।

কি জানি, অনিশ্চিয়তা গোল্ডম্যানের গলার স্বরে।

মিস্টার গোল্ডম্যান, আরেকটা সমস্যা কিন্তু মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।

কি?

ব্যাপারটা সিরিয়াসই।

সিরিয়াস! দাঁড়িয়ে পড়লেন গোডম্যান। রেনট্রির দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার?

সেন্সরে বেশির ভাগ ডাটা কালেকশন হয়ে গেছে আমাদের ইতিমধ্যেই। টেলিমেট্রি বলছে… কথাটা কিভাবে বোঝাবে নিজেই বুঝতে পারছে না রেনট্রি। উসখুস করতে লাগল সে।

কি বলছে?

এখনও শিওর নই আমি। আমাদের ব্যবহৃত ইনস্ট্রমেন্টসগুলোতে কোন গোলমাল না থাকলে, অর্থাৎ ভুল রিডিং না দিলে, ভয়ের ব্যাপারই।

ভয়? কিসের ভয়? ভুরু কোঁচকালেন গোল্ডম্যান।

ব্যাপারটা ভৌগলিক। মহাদেশগুলোর ক্রমবিবর্তনের কথা তো জানেনই আপনি?

হ্যাঁ, কোথায় যেন পড়েছিলাম, হয়ত কোন সাইন্স ম্যাগাজিনেই, প্রতিটি মহাদেশ একটা করে রকপ্লেটে চড়ে আছে। এই প্লেট আবার অন্য আরেকটা মহাদেশের রকপ্লেটের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। শুনেছি, নিউইংল্যান্ডের উপকূল এক সময় আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে লেগেছিল?

ঠিকই শুনেছেন। এই প্লেটগুলো একটা আরেকটার সঙ্গে অনবরত ঘষা খাচ্ছে। বলে গেল রেনট্রি, চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এতে। আর এটাই পর্বতগুলোর উৎপত্তির কারণ। বর্তমানে, ক্যালিফোর্নিয়াকে উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি ভাবে কেটেছে একটা ফল্ট এবং এটা যুক্ত হয়েছে প্যাসিফিক আর নর্থ আমেরিকান প্লেটের সঙ্গে। এই দুটো প্লেটের জংশনের নাম দিয়েছি আমা স্যান আজি ফল্ট।

কিন্তু এসব ভূবিজ্ঞানীদের ব্যাপার স্যাপার আমার শুনে লাভ কি?

বলছি। নর্থ আমেরিকান প্লেটের তুলনায় প্যাসিফিক প্লেটটা বছরে এক ইঞ্চি বেশি সরছে। তার মানে, ক্যালিফোর্নিয়ার একটা অংশ সরছে উত্তরে, অন্য অংশটা দক্ষিণে। যদি নড়াচড়াটা স্বাভাবিক আর সহজভাবে হয় তো ভয়ের কিছুই নেই।

যদি না হয়? জানতে চাইলেন গোল্ডম্যান।

হঠাৎ প্রচন্ড ঠোকাঠুকি শুরু করবে দুটো প্লেট। ঠেকে যাবে, চাপ বাড়বে, তারপর হঠাৎই একে অন্যের থেকে আলগা হয়ে যাবে।

এবং ঘন ঘন মারাত্মক ভূমিকম্প হতে থাকবে?

ঠিক ধরেছেন। এই অঞ্চলে কেন অত ঘন ঘন ভূমিকম্প হচ্ছে, অনেকখানি পরিষ্কার হয়ে এসেছে এখন আমার কাছে। এটা এড়ানর বন্দোবস্ত করা যায়। উচ্চ চাপে পানির ধারা ছাড়তে হবে ফল্টগুলোতে, কিম্বা ফল্টের কাছাকাছি মাটির গভীরে নিউক্লিয়ার এক্সপ্লেশন ঘটাতে হবে। এতে করে কৃত্রিম পদ্ধতিতে প্লেটগুলো পরস্পরের গা থেকে সরিয়ে দিতে পারি আমরা। পো মুভমেন্ট ঘটবে। এতে অতি সামান্যভাবে ভূমিকম্প হবে কয়েকবার। কারও কোন ক্ষতি হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, একটা প্রলংকর ভূকম্পন এড়াতে পারব আমরা।

কিন্তু এখনও বুঝতে পারছি না, এসব আমাকে বরে লাভ কি? অধৈর্য হয়ে পড়েছেন গোল্ডম্যান।

সবটা না বললে বুঝতে পারবেন না। আবার বলে চলল রেনট্রি, আসলে স্যান ফ্রানসিসকোর সঙ্গে ঠেকে গেছে স্যান আজি ফল্ট এবং ঠেকেছে ভালমতই। উনিশশো দশ সালে এই ফল্টের একধারে একটা শেড তৈরি হয়েছিল। যদি স্বাভাবিকভাবে প্লেট সরে থাকে তো এখন শেডটা আগের পজিশনের চাইতে তের ফুট সরে যাবার কথা। কিন্তু মোটেই সরেনি ওটা। তের ফুট, সোজা কথা নয় এবং এর জন্যে দায়ী একটা ফল্ট।

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইলেন গোল্ডম্যান। কোন কথা বললেন না।

মাত্র কিছুক্ষণ আগে, লেটেস্ট সেন্সর রিডিং পড়ে জানলাম, ওটা ট্রিনিটি ফল্ট। মাঝামাঝি বসে গিয়ে এটাই জোড়া লাগিয়ে দিয়েছে স্যান ফ্রান্সিসকো আর স্যান আজি ফন্টের নিচের প্লেট দুটো। একটু থামল রেনট্রি। গোল্ডম্যানের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল, জানেন, ওই প্লেট দুটো হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কি ঘটবে।

এদিক ওদিক মাথা নাড়লেন গোল্ডম্যান, না। এতক্ষণে সত্যি সত্যি কৌতূহলী হয়ে পড়েছেন তিনি, কি ঘটবে?

সেন্সর রিডিং দিয়েছে, শিগগিরই ধ্বংস হয়ে যাবে ট্রিনিটি ফল্ট।

কি করে?

ভয়ঙ্কর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এই ফল্টের তলায়। প্লেটগুলো সরে যাবার চেষ্টা করছে সাংঘাতিক ভাবে। শিগগিরই বিস্ফোরিত হবে ট্রিনিটি ফল্ট।

বিস্ফোরিত হবে! কপালের পাশের শিরাটা সামান্য ফুলে উঠেছে গোল্ডম্যনের।

হ্যাঁ। এবং সঙ্গে সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে প্লেট দুটো। এরপর কয়েক মিনিটও আর টিকবে না স্যান আন্দ্রিজ। স্যান ফ্রানসিসকোও বিপদটা এড়াতে পারবে বলে মনে হয় না।

ক্রিস্ট! চাপা গলায় প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন গোল্ডম্যান। কোন দিকে এগিয়ে চলেছে ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে পারছেন না তিনি।

টানেলের তিন কতগুলো ঠেলনের সহকাট। প্রথম পুরুষারেটিং টেবিলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *