০৭. শহরের সীমানা ছাড়িয়ে

শিগগিরই শহরের সীমানা ছাড়িয়ে এলো গাৰ্থ। নিবিড় বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছে সরু পায়ে চলা পথ। হাঁটার গতি বাড়ালো ও। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ বন পেরিয়ে যেতে চায়। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারলো না। এক জায়গায় বড় বড় গাছ খুব ঘন হয়ে বেড়ে উঠেছে। চাঁদের আলো ঢাকা পড়ে গেছে সেখানে। মাত্র জায়গাটার শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে গাৰ্থ, এমন সময় দুদিক থেকে দুজন দুজন করে চারজন লোক লাফ দিয়ে এসে পড়লো.ওর ঘাড়ের ওপর।

সাথে মাল কড়ি যা আছে চটপট দিয়ে দাও দেখি, বাছা, বললো একজন।

যেতে দাও আমাকে, চিৎকার করে উঠলো গার্থ। ধস্তাধস্তি করে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করছে নিজেকে।

ব্যাটার তেজ তো কম নয়, দাঁড়াও দেখাচ্ছি, বলে চারজন টানতে টানতে নিয়ে চললো গার্থকে।

বনের ভেতর একটুখানি একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে থামলো তারা। চঁদের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে জায়গাটা। ওদের সাড়া পেয়ে আরো দুই ডাকাত বেরিয়ে এলো গাছপালার আড়াল থেকে। গার্থ দেখলো তাদের হাতেও অন্য চারজনের মতো মোটা লাঠি, কোমরে ঝুলছে ছোট এক ধরনের তলোয়ার। সব কজনের পরনে সবুজ পোশাক। চারজন ছিলো, হলো ছজন। ছাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা বলতে গেলে শূন্য। তবু গাৰ্থ আশা ছাড়লো না।

কত টাকা আছে তোমার কাছে, বলো, হুঙ্কার ছাড়লো এক ডাকাত।

আমার নিজের টাকার কথা যদি বলো, তাহলে ত্রিশটা স্বর্ণমুদ্রা, অচঞ্চল কণ্ঠে বললো গাৰ্থ। আমি একজন ক্রীতদাস। আমার স্বাধীনতা কেনার জন্যে অনেক কষ্টে টাকাগুলো জমিয়েছি।

কিন্তু তোমার বলে দেখে তো মনে হচ্ছে না মাত্র ত্রিশটা আছে, বললো দলের সর্দার। আমার বিশ্বাস ত্রিশের অনেক বেশি আছে এর ভেতরে।

তা আছে। তবে গুলো আমার নয় আমার মনিবের। যদি নিতেই চাও আমার টাকাগুলো নিয়ে ছেড়ে দাও আমাকে।

কে তোমার মনিব?

গৃহহীন নাইট।

আজকের টুর্নামেন্টে যিলিবিজয়ী হয়েছেন?

হ্যাঁ।

গৃহহীন নাইট! আসলে নাম কি লোকটার?

উহুঁ, তা বলা সম্ভব নয়। আমার মনিব চান না তার নাম পরিচয় জানাজানি হোক।

বেশ, তাহলে তোমার পরিচয় বলো।

তা-ও সম্ভব নয়। আমার পরিচয় বললেই মনিবের পরিচয়ও প্রকাশ হয়ে যাবে।

হুঁ। তোমার মনিব তো আজ অনেক রোজগার করেছে, তাই না?

তা করেছেন, তবে অর্ধেকের বেশিই আবার বিলিয়ে দিয়েছেন।

আচ্ছা! খুব দয়ালু লোক দেখছি! তা কত টাকা পেলেন আর কত বিলালেন?

চার নাইটের কাছ থেকে চারশো স্বর্ণমুদ্রা পেয়েছেন। দুশো নিজে রেখে দুশো বিলিয়ে দিয়েছেন।

পাগল নাকি! দুশো স্বর্ণমুদ্রা বিলিয়ে দিলো! একটু থামলো সর্দার। কোন চারজন টাকা দিয়েছে? নাম বলো।

বললো গার্থ।

আর সেই টেম্পলার স্যার ব্রায়ান দ্য বোয়া-গিলবার্টের খবর কি? সে টাকা দেয়নি?

চেয়েছিলো দিতে। আমার মনিব নেননি।

কেন? সব খুলে বলো তো, মজার ব্যাপার মনে হচ্ছে!

আমার মনিব প্রাণ ছাড়া আর কিছু নেবেন না টেম্পলারের কাছ থেকে। আবার ওঁরা লড়বেন, এবং দুজনের একজন না মরা পর্যন্ত সে লড়াই চলবে।

হো! হো! হো! চিৎকার করে উঠলো সর্দার;এখন বলো তো, তুমি অ্যাশুবিতে গিয়েছিলে কেন?

ধার শোধ দিতে।

ধার শোধ! কার?

আমার মনিবের। আইজাক নামের এক ইহুদীর কাছ থেকে উনি যুদ্ধের ঘোড়া, অস্ত্রশস্ত্র ও সাজ পোশাক ধার করেছিলেন। ঘোড়া ছাড়া আর সব মনিব রেখে দিয়েছেন। তাই ওগুলোর দাম শোধ করতে আমি গিয়েছিলাম।

কত দিলে?

আশি স্বর্ণমুদ্রা। কিন্তু বুড়ো ইহুদী সব আবার ফেরত দিয়ে দিয়েছে, তার ওপর আমাকে পুরস্কার দিয়েছে বিশ স্বর্ণমুদ্রা।

ও মিথ্যে কথা বলছে! চিৎকার করে উঠলো এক ডাকাত।

গল্প দেয়ার আর জায়গা পাও না, বললো আরেকজন। ইহুদীর বাচ্চা হাতে টাকা পেয়ে ফেরত দিয়ে দিলো, তাও আবার আশির বদলে একশো!

আমি সত্যি কথাই বলছি। রেগে গিয়ে ঝঝের সঙ্গে বললো গার্থ। বিশ্বাস না হয় আমার থলে খুলে দেখতে পারো। এর ভেতরে ছোট একটা রেশমী কাপড়ের থলে আছে, তাতে ঠিক একশো স্বর্ণমুদ্রা আছে।

এই, একটা আলো আনো তো, বললো দস্যু সর্দার। দেখি ও সত্যি বলছে কি না।

একটা মশাল জ্বাললো এক ডাকাত। গার্থের হাত থেকে থলেটা নিয়ে খুললো সর্দার। সব কজন ডাকাত ঝুঁকে পড়লো তার দিকে। এমন কি যে দুজন গার্থকে ধরে রেখেছিলো তারাও মুঠো শিথিল করে এগিয়ে গেল থলের ভেতর কি আছে দেখতে। এই সুযোগ ছাড়লো না গার্থ। এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করে আরেক ঝটকায় এক ডাকাতের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে সর্ব শক্তিতে বসিয়ে দিলো সর্দারের মাথায়। গার্থের থলেটা হাত থেকে খসে পড়ে গেল সর্দারের। মাটিতে লুটিয়ে পড়লো সে।

গাৰ্থ টাকার থলেটা তুলে নিয়েই ছুটে পালানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ও একা, ডাকাতরা অনেক। পারলো না পালাতে। ছুটে দুতিন পা যাওয়ার পরই আবার ধরা পড়ে গেল সে।

ইতোমধ্যে উঠে দাঁড়িয়েছে সর্দার। গার্থের মতো দশাসই লোকের হাতে বাড়ি খেয়েও কিছুই যেন হয়নি তার।

বদমাশ! মাথা ডলতে ডলতে সে চিৎকার করলো। আমার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, এর ফল তোমাকে ভোগ করতে হবে। এবং এখনই। তার আগে তোমার মনিবের কথা শেষ করে নেই, ততক্ষণ চুপ করে দাঁড়াও। একটু নড়লেই প্রাণটা খোয়াবে! সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে যোগ করলো, রেশমের থলেটার ওপর হিব্রু অক্ষরে কি যেন লেখা আছে, ভেতরেও আছে ঠিক একশোটা স্বর্ণমুদ্রা। আমার মনে হয় ও যা বলছে সত্যি। টাকাটা ওর মনিবেরই। ও টাকা আমরা নিতে পারি না। ওর মনিব বেচারা আসলে আমাদেরই মতো।

আমাদেরই মতো! তা কি করে হয়?

কেন না? বেচারা আমাদেরই মতো গরীব, হতভাগ্য আমাদের মতোই তলোয়ারের জোরে উনি এই টাকা আয় করেছেন। আমাদের শত্রু রেজিনান্ড এবং ম্যালভয়সিঁকে উনি পরাজিত করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের পয়লা নম্বর শত্রু টেম্পলার ব্রায়ান ওঁরও শত্রু। শুনলে তো ব্যাটা ইহুদী কেমন উদার ব্যবহার করেছে ওঁর সাথে? আমরা তার চেয়ে কম উদারতা দেখাই কি করে, বলো তো?

ঠিক, ঠিক! এক সাথে চেঁচিয়ে উঠলো সব কজন ডাকাত। তা আমরা দেখাতে পারি না!

তারপর একজন গার্থকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো, এর সাথেও কি আমরা অমন উদার আচরণ করবো?

তোমরাই ঠিক করো, বলো সর্দার।

কক্ষনো না, জবাব দিলো এক দস্যু। ওকে ভালো রকম একটা শিক্ষা দিতে হবে। তোমার মাথায় বাড়ি মেরেছে!

ঠিক আছে, বলে বিশালদেহী এক ডাকাতের দিকে তাকালো সর্দার। মিলার তৈরি হওলাঠি নিয়ে। গার্থের দিকে ফিরলো সে। বললো, যুৎসই. একটা বাড়ি মেরেছো আমার মাথায়, দেখি মিলারকেও তেমন একটা মারতে পারো কি না। যদি পারো তোমাকে ছেড়ে দেবো।

কোনো আপত্তি নেই, বললো গার্থ।

যে দুজন ওকে ধরে ছিলো সর্দার তাদেরকে বললো, ছেড়ে দাও ওকে, আর ওর হাতে একটা লাঠি দাও।

গাৰ্থ এবং মিলার, দুজনেই লাঠি হাতে এগিয়ে গেল ফাঁকা জায়গাটার মাঝামাঝি জায়গায়।

আয়, ব্যাটা, সাহস থাকে তো! মাথার ওপর আশ্চর্য কৌশলে লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে চিৎকার করলো মিলার। আমার হাতে কত জোর তা টের পাবি!

ব্যাটা, তোর মতো ছিচকে চোরকে দেখে ভয় করি নাকি? একই রকম দক্ষতায় লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে জবাব দিলো গার্থ।

শুরু হলো লড়াই। হিংস্র ভঙ্গিতে একে অপরের ওপর লাফিয়ে পড়লো গার্থ এবং মিলার। কিন্তু দুজনেই দক্ষ লেঠেল। দুজনেই প্রতিপক্ষের আক্রমণ ফিরিয়ে দিলো নিপুণ কৌশলে। আবার আক্রমণ করলো। এভাবে চললো বেশ কিছুক্ষণ। কেউ কাউকে কাবু করতে পারলো না কায়দা মতো একটা ঘা-ও লাগাতে পারলো না। শেষ পর্যন্ত রেগে উঠলো মিলার। কৌশল ভুলে গায়ের জোরে লাঠি চালাতে লাগলো আনাড়ীর মতো। দেখে হাসতে শুরু করলো ওর সঙ্গীরা। ফলে আরো রেগে গেল মিলার। এতক্ষণ শুধু আক্রমণের ক্ষেত্রে কৌশলের অভাব দেখা যাচ্ছিলো, এবার প্রতিরক্ষার বেলায়ও দেখা যেতে লাগলো। মাথাটাকে যে আগলে রাখতে হবে তা ওর মনেই রইলো না। প্রথম সুযোগেই গাৰ্থ সেখানে বসিয়ে দিলো একটা রাম বাড়ি। এমন জোরে বাড়িটা লাগলো মিলারের মাথায় যে বেচারা মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মাটিতে। এবং জ্ঞান হারালো।

সাবাস! সাবাস! চিৎকার করে উঠলো ডাকাতরা। দারুণ দেখিয়েছে! তোমার ধন-প্রাণ দু-ই বাঁচলো, ফাঁকতালে মার খেয়ে মরলো বেচারা মিলার।

এবার তুমি যেতে পারো, বললো সর্দার। আমার দুই সঙ্গী তোমাকে বন পার করে দিয়ে আসবে, যাতে আর কোনো বিপদ না ঘটে তোমার।

তার কোনো দরকার ছিলো না, বিনয়ের অবতার সেজে বললৈ গার্থ।

দরকার না থাকলে ওরা যাবে। তার আগে একটা কথা তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমাদের সম্পর্কে মুখ খুলবে না কোথাও, আর আমরা কারা জানার কোনো চেষ্টা করবে না কখনও। যদি খোললা বা করো, তোমার কপালে দুঃখ আছে।

প্রতিশ্রুতি দিলো গাৰ্থ, সে কাউকে কিছু বলবে না। তারপর ডাকাতদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হলো নিজের পথে। লাঠি হাতে সঙ্গে চললো দুই দস্যু।

বনের প্রান্তে পৌঁছুতেই আরো দুজন ডাকাত যোগ দিলো ওদের সাথে। ফিসফিস করে নিজেদের ভেতর কি আলাপ করলো ওরা, তারপর ফিরে গেল বানর ভেতর। অবাক হলো গর্থ। ডাকাত দলটা খুবই সুসংগঠিত মনে হচ্ছে!

দুই ডাকাত পথ দেখিয়ে একটা পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে গেল ওকে। দাঁড়িয়ে পড়ে নিচের দিকে ইশারা করে বললো, এই পথে চলে যাও। ঐ যে দেখা যাচ্ছে টুর্নামেন্টের জায়গা। আমরা এবার বিদায় নেবো। যাওয়ার আগে আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, প্রতিশ্রুতির কথা মনে রেখো। যদি না রাখো, আবারো বলছি, কপালে তোমার দুঃখ আছে।

তোমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারো, একটা কথাও বেরোবে না আমার মুখ দিয়ে, বললো গাৰ্থ। বিদায় জানানোর আগে একটা কথা বলি, কিছু মনে কোরো না, তোমরা ডাকাতি ছেড়ে দিয়ে ভালো হয়ে যাও। তোমাদের মতো লোকের এ কাজ মানায় না। শুভরাত্রি।

নিরাপদে মনিবের তাবুতে পৌঁছুলো গার্থ। এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে পুরো ঘটনা শোনালো মনিবকে। তারপর তাঁবুর প্রবেশপথের কাছে শুয়ে পড়লো একটা ভালুকের চামড়া বিছিয়ে। ওকে না ডিঙিয়ে কেউ তাবুতে ঢুকতে পারবে না।

শুয়ে পড়লো নাম না জানা নাইটও। কিছুক্ষণের ভেতর গভীর ঘুমের কোলে ঢলে পড়লো দুজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *