০৭. রাতের খাওয়ার জন্যে তৈরি

রাতের খাওয়ার জন্যে তৈরি হতে লাগলো ওরা। রবিন আর জিনা গিয়ে খাবার নিয়ে এলো ভাঁড়ার থেকে। রাফিয়ান গেছে সাথে, যদি কোনো সাহায্য করতে পারে এই আশায়। কিন্তু মুখে ঝুলিয়ে আনার মতো কিছু না থাকায় খালিমুখেই ফিরতে হয়েছে তাকে।

খেতে বসে বার বার অস্বস্তিভরে পশ্চিম আকাশের দিকে তাকাতে লাগলো কিশোর। নাহ, বৃষ্টিটা বোধহয় আসবেই। দেখো, ইতিমধ্যেই অর্ধেক আকাশ ছেয়ে ফেলেছে মেযে। সূর্য তো সেই যে ঢুকেছে মেঘের মধ্যে, আর বেরোচ্ছে না। মনে হয় আজ তাঁবু খাটাতেই হবে।

হ্যাঁ, একমত হয়ে মাথা দোলালো জিনা।

করলে তাড়াতাড়ি করতে হবে, মুসা বললো। বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। রাতে আজ শীতই লাগবে।

চলো, তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠে ঝোপের ভেতর থেকে বের করে ফেলি, রবিন বললো। চারজনে হাত লাগালে বেশিক্ষণ লাগবে না তাবু খাটাতে।

সত্যিই তাই। এক ঘণ্টাও লাগলো না। বিশাল ঝোপের ধারে খাঁটিয়ে ফেলা হলো তাঁবু।

ভালোই খাঁটিয়েছি, কি বললো, তাঁবু দেখতে দেখতে নিজেদের তারি করলো মুসা। সাধারণ বাতাস তো দুরের কথা, হারিকেন এলেও উড়িয়ে নিতে পারবে না। আরামেই থাকবো ভেতরে। এখন বিছানা করে ফেলা দরকার। কম্বল আজ গায়ে দিতে হবে, কাজেই বিছানো চলবে না। বড় আর পাতা দিয়েই বিছানা করতে হবে।

কাছেই গমের খেতের ফসল সবে কাটা হয়েছে। সেখান থেকে খড় তুলে আনলো ওরা। ঝোপের অভাব নেই, পাতারও অভাব হলো না। প্রচুর পাতা জোগাড় করে আনা হলো। সেসব বিছিয়ে তৈরি করে ফেলা হলো চমৎকার পুরু আর নরম গদির মতো বিছানা। তার ওপর যার যার অ্যানারাক বিছিয়ে দিয়ে চাঁদরের কাজ সারলো।

কাজ সেরে বাইরে এসে আরেকবার তাকালো আকাশের দিকে। নাহ, বৃষ্টি আসবেই, আর কোনো সন্দেহ নেই। সেই সাথে ঝড়ও আসতে পারে। তবে ওদের আশা-সকালে থেমে যাবে বৃষ্টি। আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাবে। আবার বাইরে বেরোতে পারবে ওরা। আর যদি না-ই হয়, কি আর করা, চলে যাবে গুহা দেখতে।

মেঘ করায় স্বাভাবিক সময়ের আগেই অন্ধকার হয়ে গেছে। তাঁবু খাটানো হয়েছে দুটো, কিন্তু ঘুমানোর আগে এক তাবুতে বসে গল্প করবে ঠিক করলো ওরা। রেডিও শুনবে। তাবুতে ঢুকে চালু করে দিলো রেডিও। রাফিকে ডাকলো জিনা। কিন্তু ভেতরে এলো না কুকুরটা, বাইরেই শুয়ে থাকলো। বোধহয় আরাম লাগছে ওখানেই।

রেডিওটা সবে অন করেছে কিশোর, এই সময় ঘেউ ঘেউ করে উঠলো রাফিয়ান। সঙ্গে সঙ্গে সুইচ অফ করে দিলো সে।

নিশ্চয় কেউ আসছে, জিনা বললো। কে?

হয়তো জনি, আন্দাজ করলো মুসা। আকাশের অবস্থা খারাপ দেখে আমাদেরকে বাড়িতে নিয়ে যেতে আসছে।

নাকি আঁধার রাতে মথ খুঁজতে বেরোলেন মিস্টার ডাউসন, হেসে বললো রবিন।

হাসলো কিশোর। মুসার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললো, বলা যায় না, মিসেস ডেনভারও হতে পারে। ঝড়ের রাতে কাউকে যাদু করতে বেরিয়েছে হয়তো।

দূর, বাজে কথা বলো না তো, গায়ে কাঁটা দিল মুসার। আল্লাহ না করুক। মিসেস ডেনভার ভালো মানুষ, ডাইনী নয়। তাছাড়া পৃথিবীতে ডাইনী বলে কিছু নেই…

তা-ই নাকি? আরে, আমাদের মুসা আমান বলে কি? ভূতপ্রেতের ওপর থেকে বিশ্বাস তাহলে উঠে যাচ্ছে তোমার। আশ্চর্য!

ভূতের কথায় আরও কুঁকড়ে গেল মুসা।

কিশোরের সঙ্গে সঙ্গে রবিন আর জিনাও হাসতে আরু করলো।

ওদিকে ডেকেই চলেছে রাফিয়ান।

কে এলো, দেখতে হয়। বলে তাবুর দরজা দিয়ে মাথা বের করে জিজ্ঞেস করলো কিশোর, এই রাফি, কে-রে?

মুখও ফেরালো না রাফিয়ান। কিশোরের কথা যেন কানেই যায়নি। একই দিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ করে চলেছে। নিশ্চয় কিছু দেখতে পেয়েছে।

শজারু-টজারু হবে, ভেতর থেকে বললো জিনা।

কি জানি। তবে আমার মনে হয় ওকে নিয়ে গিয়ে দেখা উচিত কি দেখেছে। জানা দরকার। অন্য কিছুও হতে পারে।

তাঁবু থেকে বেরিয়ে পড়লো কিশোর। আয়, রাফি। কি দেখেছিস? দেখা তো আমাকে।

লেজ নাড়তে নাড়তে ছুটলো রাফিয়ান। পেছনে প্রায় দৌড়ে এগোলো কিশোর। অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। গাছের শেকড়ে কিংবা লতায় লেগে হোঁচট খাচ্ছে। টর্চ আনা উচিত ছিলো, ভাবলো সে। এখন আর আনার সময় নেই। অনেকখানি চলে এসেছে।

ঢাল বেয়ে দৌড়ে চললো কিছুক্ষণ রাফিয়ান, এয়ারফীন্ডের দিকে মুখ। তারপর বার্চ গাছের একটা জটলার পাশ কাটিয়ে এসে দাঁড়িয়ে গেল। আরও জোরে চিল্কার করতে লাগলো।

আবছামতো একটা ছায়া নড়তে দেখলো কিশোর। চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো, এই, কে?

আমি…আমি…, জবাব দিলো একটা দ্বিধান্বিত কণ্ঠ। ডরি।

ছায়ার হাতে লম্বা লাঠির মাথায় জালের মতো দেখতে পেলো কিশোর।

আমাদের ফাঁদগুলো দেখতে এসেছি, আবার বললো ডরি। ঝড় আসছে তো। ভাবলাম, দেখেই যাই কোনো মথ-টথ পড়লো কিনা। বৃষ্টি এলে সব ধুয়ে চলে যাবে, পরে এসে কিছুই পাবে না।

ও, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো কিশোর। আমি ভেবেছিলাম না জানি কি। তা মিস্টার ডাউসনও বেরিয়েছেন নাকি?

যা! রাতে প্রায়ই বেরোই আমরা, মথ শিকারে। কাজেই যদি তোমাদের কুকুরটা রাতে ডেকে ওঠে, যখনই ডাকুক, ধরে নেবে আমরা।…চেঁচিয়ে তো কান ঝালাপালা করে দিলো ওটা! থামাও না। বড় পাজি কুকুর মনে হচ্ছে।

এই রাফি, চুপ! ধমক দিয়ে বললো কিশোর। লোক চিনতে পারিস না?

চুপ হয়ে গেল বটে রাফি, কিন্তু তার অস্বস্তি দূর হলো না। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো ছায়াটাকে।

আরেকটা ফাঁদ দেখতে যাচ্ছি আমি, ডরি বললো। তোমরা যাও। কুকুরটার মুখ বন্ধ রাখতে বলবে।

টর্চ জ্বলে উঠলো ডরির হাতে। হাঁটার তালে নেচে নেচে এগিয়ে চললো আলোটা।

আমরা এই পাহাড়েই ক্যাম্প করেছি, কিশোর বললো। এই তো, বড় জোর শখানেক গজ হবে। ইস, টর্চ আনলে আপনার সঙ্গে যেতে পারতাম। রাতে মথ ধরা দেখতে ইচ্ছে করছে। নিশ্চয় খুব ভালো লাগতো।

জবাব দিলো না লোকটা। চলে যাচ্ছে। যতোই দূরে সরছে, ধীরে ধীরে স্নান হয়ে আসছে টর্চের আলো।

ফিরে চললো কিশোর। অন্ধকারে দিক ঠিক রাখাই মুশকিল। আরও নানারকম অসুবিধে তো রয়েছেই। একশো গজ যেতেই পথ হারালো সে। ক্যাম্পের কাছ থেকে অনেক ডানে সরে গেল। অবাক হলো রাফি। কিশোরের শার্টের হাতা কামড়ে ধরে আস্তে টান দিলো।

কি-রে। দাঁড়িয়ে গেল কিশোর। পথ ভুল করলাম নাকি? সর্বনাশ, তুই না থাকলে তো এই অন্ধকারে সারারাত ঘুরে মরতাম! তবু কিছুতে খুঁজে পেতাম না। যা, পথ দেখা।

পথ দেখিয়ে তাকে নিয়ে চললো রাফিয়ান। কিছুদূর এগিয়ে তিনটে টর্চের আলো চোখে পড়লো কিশোরের। তার দেরি দেখে বেরিয়ে পড়েছে রবিন, মুসা আর জিনা।

কিশোওর, তুমি? শোনা গেল রবিনের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ। এতোক্ষণ কি করছিলে?

আর বলো না, পথ হারিয়েছিলাম। টর্চ ছাড়া বেরোনোই উচিত হয়নি। রাফি সাথে না থাকলে আজ আর তাঁবুতে ফিরতে পারতাম না।

কি দেখে চেঁচামেচি করল জানতে চাইলো জিনা। প্রজাপতি মানব, ডরি। ও বললো মিস্টার ডাউসনও নাকি বেরিয়েছেন।

কেন? মুসা বললো। ঝড় আসছে দেখছে না? মথ-টথ কি আর বেরোবে নাকি এখন। নিশ্চয় বাসায় ঢুকে বসে আছে।

মধু-ধরা ফাঁদ দেখতে বেরিয়েছে নাকি। যদি ধরা-টরা পড়ে থাকে? কিশোর জানালো। কোথায় যেন পড়েছি, হে ডালে মধু মাখিয়ে রাখা হয়। সেই মধুর গন্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে মথ এসে সেখানে পড়ে। তখন ওগুলোকে ধরা মোটেই কঠিন না।

তাই নাকি? মজার ব্যাপার তো, মুসা বললো। দেখতে যেতে পারলে হতো।…এহহে, বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে আরম্ভ করেছে। ডরি আর তার মথ, সবাই ভিজবে। চলো চলো, তাঁবুতে চলল।

এবার আর বাইরে থাকতে চাইলো না রাফিয়ান। পানির বড় বড় ফোঁটা ভালো লাগলো না মোটেও। সবার আগেই ঢুকে পড়লো তাঁবুর ভেতর। বসলো রবিন আর জিনার পাশে।

জায়গা তো সব তুইই দখল করে ফেললি, রাফি, হেসে বললো জিনা। আরেকটু ছোট হতে পারলি না।

জবাবে জিনার হাঁটুতে মাথা রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললো রাফি। যেন তার দুঃখ বুঝতে পেরেছে। _ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিনা বললো, কাণ্ড দেখে। ওরকম বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছিস কেন? তোর আবার কিসের দুঃখ? ও, বুঝেছি। বাইরে বসে শজারু দেখতে পারবি না, হাঁকডাক করতে পারবি না, এই জন্যে?

বসে বসে কি করি? ঘুমও তো আসছে না, কিশোর বললো। তার টর্চটা জেলে,শুইয়ে রেখেছে রেডিওর ওপর। রেডিওতেও বোধহয় শোনার মতো কিছু নেই।

গল্প করা ছাড়া আর কি করার আছে? জিনা বললো। এক কাজ করো, তোমাদের অথৈ সাগর ভ্রমণের গল্পটা আরেকবার বলো। অনেক মজা করে এসেছে।

মজা না ছাই, গজগজ করলো মুসা। ছাইভস্ম কতো কি যে খেলাম। শুঁয়াপোকাও বাদ দিইনি?

ওই শুঁয়াপোকাই বলতে গেলে জান বাঁচালো আমাদের, রবিন বললো। ওগুলো খেয়ে খানিকটা শক্তি পেয়েই না আবার খাবার খুঁজতে পেরেছি। নইলে তো মরেছিলাম। আরিব্বাপরে, যা রোদ আর গরম ছিলো, জিনা, কি বলবো? কুমালো ওদিকে গুলি খেয়ে বেহুশ, মরে মরে অবস্থা। পানি নেই। বড় বাঁচা বেঁচে এসেছি। জীবনে আর ওমুখো হচ্ছি না আমি।

আমার কিন্তু অতো খারাপ লাগেনি, কিশোর বললো। দ্বীপটা ছেড়ে আসতে শেষে কষ্টই হয়েছে।

বলোই না আরেকবার গল্পটা, অনুরোধ করলো জিনা।

গুছিয়ে গল্প বলায় ওস্তাদ রবিন। কেস-ফাইল লিখতে লিখতে এটা রপ্ত করেছে। সে-ই আরম্ভ করলো।

বাইরে ভালোমতোই শুরু হয়েছে ঝড়-বৃষ্টি। ছোই তাঁবুটাকে হ্যাঁচকা টানে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছে প্রবল বাতাস।

গল্প বলে চলেছে রবিন। মুসাকে অক্টোপাসে ধরে মারার উপক্রম করেছে, সেই জায়গাটায় এসেছে, তন্ময় হয়ে শুনছে সবাই, এই সময় নিতান্ত বেরসিকের মতো ঘেউ ঘেউ শুরু করে দিলো রাফিয়ান। চমকে দিলো সবাইকে। শুধু চেঁচিয়েই ক্ষান্ত হলো না। তাবুর ফাঁকে নাক ঢুকিয়ে ঠেলে মাথাটা বের করে দিলো বাইরে। আরও জোরে চেঁচাতে লাগলো।

মরেছে! আরেকটু হলেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতো আমার, বলে উঠলো মুসা। এই রাফি, তোর হলো কি?…আরে আরে দেখো, আবার বেরিয়ে গেল। এই, ভিজে ঠাণ্ডা লাগাবি তো। কি দেখতে গেছিস? দুটো পাগলকে? ওরা মথ ধরতে এসেছে…আয়, আয়।

কিন্তু ফিরেও এলো না রাই, চিৎকারও থামালো না। গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে চলেছে। কিশোর গিয়ে টেনে আনার চেষ্টা করলে তার দিকে তাকিয়ে রেগে উঠলো। শেষে জিনা গিয়ে তাকে ধরে আনলো।

ব্যাপারটা কি? কিছুটা অবাকই হয়েছে কিশোর। এই রাফি, চুপ কর না। কানের পর্দা ফাটিয়ে দিলি তো।

কোনো কিছু উত্তেজিত করেছে তাকে, চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো জিনা। অস্বাভাবিক কিছু!…এই শোনো, শোনো, একটা চিৎকার শুনলে?

কান পাতলো সবাই। কিন্তু ঝড়ো বাতাস আর তাঁবুর গায়ে আছড়ে পড়া বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে আর কিছু শোনার উপায় নেই।

কিছু থাকলেও এখন যাওয়া সম্ভব না, মুসা বললো। ভিজে চুপচুপে হয়ে যাবো। আর এই বৃষ্টিতে খুঁজে বের করাও মুশকিল হবে। রাফি, চুপ কর। যেতে পারবো না।

তবু থামলো না রাফি।

শেষে রেগে গেল জিনা। ধমক লাগালো, এই, চুপ করলি! হতচ্ছাড়া কুত্তা কোথাকার!

রেগে এভাবে তাকে খুব কমই গালি দেয় জিনা। অবাক হয়ে চুপ করলো সে। ফ্যালফ্যাল করে তাকাতে লাগলো জিনার মুখের দিকে।

হয়েছে, আর ওরকম করে তাকাতে হবে না, পাজি কোথাকার! চুপ, একদম চুপ! ইঁদুর, ছুঁচো যা দেখবে চেঁচাতে শুরু করবে। আর একটা চিৎকার করলে চড়িয়ে দাঁত ফেলে দেবো…।

জিনার কথা শেষ হলো না। ঝড়ের গর্জন আর মুষলধারে বৃষ্টির ঝপঝপ ছাপিয়ে শোনা গেল আরেকটা ভারি গোঁ গোঁ আওয়াজ। ইঞ্জিনের।

 

চট করে পরস্পরের দিকে তাকালো চারজনে।

খাইছে! এরোপ্লেন! ফিসফিস করে বললো মুসা, যেন বিমানটা শুনতে পাবে তার কথা। এই ঝড়বৃষ্টির মাঝে বেরোলোয় ব্যাপারটা কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *