০৭. বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেছে ওরা

বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেছে ওরা, কেউই কথা বলছে না, বেকুবের মত তাকিয়ে আছে মোটকু মহিলার দিকে; কিন্তু সামান্য বিকারও দেখা গেল না বিগ জুলিয়ার মধ্যে। চওড়া হাসি উপহার দিল সে, চোখ টিপল এড মিচেলের উদ্দেশে। কী জানো, জীবনে কাউকে দেখে এত খুশি হইনি আমি! মাইকের কাছে এই ওঅটর হোলের কথা শুনেছিলাম। বলেছিল ওর কিছু হয়ে গেলে এখানে চলে আসতে।

নিজের জায়গা ছেড়ে নড়েনি এরিক ক্ৰেবেট, এখনও জুলিয়ার দৃষ্টির আড়ালে রয়েছে; মহিলাকে ছাড়িয়ে গেল ওর দৃষ্টি। প্যাক হর্সটাকে দেখল, ভারী দুটো স্যাডল ব্যাগ ঝুলছে ওটার পিঠে। দারুণ ঘোড়া, যেমন তেজী তেমনি শক্তিশালী। সমীহের চোখে ঘোড়াটাকে দেখল ও, শেষে জুলিয়ার দিকে মনোযোগ দিল আবার

আমরা তো মনে করেছিলাম টুকসন পর্যন্ত যেতে পথে কারও দেখা পাব না। লোকজন হয় খুন হয়ে গেছে, নয়তো ভয়ে লুকিয়ে পড়েছে।

টুকসন থেকেই তো এসেছি আমরা! হঠাৎ গুলি খেল মাইক, সুযোগ বুঝে ঝড়ের বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছে ও। শরীরের বুলেটটা নিয়ে একটুও গ্রাহ্য করেনি। কেনই বা করবে, অন্য লোকটার শরীরে যে পাঁচটা ঢুকিয়েছে ও!

না গেলেই পারত ও। তবে ওর তো জানার উপায় ছিল না যে একদল ইন্ডিয়ানের কোলে গিয়ে পড়বে। কিন্তু অ্যাপাচিদের আগেই গুলি করল ও, শটগান দিয়ে দু’জনকে ফেলে দিল। আরও দুটো গুলি ঢুকল ওর শরীরে, তারপরও খুন করেছে একজনকে। শেষে ওকে কায়দা করে ফেলল ইন্ডিয়ানরা। ওর উইনচেস্টারটা নিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছি আমি।

চাতালের একপাশে ঝোপে ঘেরা ছোট্ট একটা গুহার মত জায়গা নিজের জন্য বেছে নিয়েছে মেলানি, সেখান থেকে বেরিয়ে এল ও। বাজি ধরে বলতে পারি তুমি জিম রিওসের মেয়ে, ওকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা করল জুলিয়া।

আমার বাবাকে চেনো তুমি?

ওর কথা কত শুনেছি! আর সেদিন নিজের চোখে দেখলাম টুকসনে। র্যাটলস্নেকের চেয়েও খেপা ছিল সে, শুধু লেজ ছিল না, এই যা! বলছিল অকম্মার ধাড়ি এক টিনহর্ন নাকি ওর মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছে! সবার উদ্দেশে দাঁত বের করে হাসল জুলিয়া। তোমাদের মধ্যে সেই সৌভাগ্যবান অকম্মার ধাড়িটা কে, বলো তো?

চুলোর গোড়া পর্যন্ত রক্তিম হয়ে গেছে বেন ডেভিসের মুখমণ্ডল। মিস রিওস আর আমি শিগগিরই বিয়ে করব, আড়ষ্ট স্বরে বলল সে।

নিঃশব্দে হাসল বিগ জুলিয়া। মিস্টার, ওকে বিয়ে করতে পারবে তুমি, যদি না তোমাকে ধরতে পারে জিম রিওস! আর যদি ধরতে পারে, দশ নম্বরী বুট দিয়ে ব্র্যান্ড বসাবে তোমার পিঠে!

ঝট করে দৃষ্টি সরিয়ে নিল মেলানি, অপমানে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে অপূর্ব মুখটা। সামান্য ইতস্তত করল বেন ডেভিস, মোক্ষম একটা জবাব দেবে যেন, শেষে ঘুরে দাঁড়িয়ে মেলানির পিছু নিল।

পাথরের আড়ালে, লুকআউটে ফিরে গেল এরিক ক্ৰেবেট। এদিকে দ্রুত হাতে, প্যাকহর্সের পিঠ খালি করে ফেলল জুলিয়া, ঘোড়া দুটোকে নীচের কালে নিয়ে গেল এড মিচেল। দুটো ঘোড়াই দারুণ অবস্থায় আছে, ওদের যে কোন ঘোড়ার চেয়ে শ্ৰেয়ুতর তো বটেই, এমনকী টুকসন থেকে এ-পর্যন্ত আসার পথে এত চটপটে বা শক্তিশালী কোন ঘোড়া চোখে পড়েনি এরিকেরহাতে সময় নেই। পুব দিগন্তে হলুদ ছোপ পেয়েছে আকাশ, শিগগিরই সূর্য উঠবে।

ভোরের অস্পষ্ট আলোয় মাইলকে মাইল জুড়ে বিস্তৃত বাদামি বালির সমুদ্র চোখে পড়ছে, কদাচিৎ সাদা ছোপ রয়েছে, এগুলো আসলে মৃত ঘোড়ার ক্ষয়ে যাওয়া কঙ্কাল। বহু বছর ধরে পড়ে আছে এভাবে-চলার পথে মারা গিয়েছিল অসহায় প্রাণীগুলো। পথটাকে এলাকার লোকজন বলে ক্যামিনো ডেল ডায়াবলো, অর্থাৎ শয়তানের মহাসড়ক। গোল্ড রাশের শুরুর দিকে এই পথে যাত্রা করেছিল ভাগ্যান্বেষী মানুষ, চারশোরও বেশি লোক মারা গিয়েছিল ক্ষুৎপিপাসায়; বালিয়াড়ি আর অনুচ্চ পাথুরে রীজের বুক চিরে চলে যাওয়া অস্পষ্ট পথটাকে অলঙ্কৃত করেছে সাদা হাড় এবং পরিত্যক্ত ওয়াগনের ধ্বংসাবশেষ। প্রথম যখন এই পথে যাত্রা করেছিল এরিক, একদিনে ষাটটারও বেশি কবর গুনেছিল। কিন্তু কত লাশ গোর দেওয়া হয়নি বা কতজনের হাড়গোড় কয়োটের দল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলেছে, সেই হিসাব কারও জানা নেই।

দিনের আলো বাড়ছে। নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজন হলো না, যার যার পজিশনে গিয়ে অপেক্ষায় থাকল সবাই। মনোযোগ দিয়ে সকালের শব্দ শুনছে, প্রত্যেকেই জানে কিছু যদি ঘটে, সেটা আজই ঘটবে।

সত্যি কি ঘটবে?

চুরুতি সম্পর্কে শোনা বিভিন্ন গল্প মনে পড়ল এরিকের। নেকড়ের মতই ধূর্ত, অবিশ্বস্ত ও বিপজ্জনক লোকটা। ক্লান্তি নামক শব্দটার সঙ্গে পরিচয় নেই তার। বেপরোয়াও, অনেক সময় দলের লোকজনের স্বার্থও দেখে না। ওদের কাছে ঘোড়া, বন্দুক এবং অ্যামুনিশন আছে, সবই কাজে লাগবে অ্যাপাচিদের। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, সাহায্য আসার কোন সম্ভাবনা নেই। পানির উৎস খুঁজে পেলে স্রেফ অপেক্ষা করলেই চলবে চুরুতির, সাদারা একসময় দুর্বল হবেই। ক্ষুৎপিপাসা, উদ্বিগ্ন অপেক্ষা বা স্নায়ুর চাপের প্রভাব সম্পর্কে খুব ভাল করেই জানে চুরুতি।

হঠাৎ করেই গর্জে উঠল একটা রাইফেল, বলা যায় বালির বুক থেকে গর্জে উঠল, কারণ রাইফেলধারী ইন্ডিয়ানকে কেউই দেখতে পায়নি ওরা। ড্যান কোয়ানের মাথা থেকে কয়েক ইঞ্চি দূরে পাথরে লেগে ছিটকে গেল বুলেট, তীক্ষ্ণ শব্দে বাতাসে শিস কেটে মাটিতে পড়ল ওটা।

ওদের পিছনে, লাভার তৈরি পাথুরে জমি থেকে আরেকটা গুলি ছুটে এল

তারপর একেবারে নীরব হয়ে গেল সব। নীরবতা, নির্জনতা এবং সূর্যোদয় ও সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ার মত মিলিয়ে গেল পরিবেশের স্বস্তিকর শীতলতা। ঘণ্টাখানেক পেরিয়ে গেল, কিছুই ঘটল না। আরও এক ঘণ্টা পেরোল। হঠাৎ, করালের কাছ থেকে একসঙ্গে গর্জে উঠল কয়েকটা রাইফেল, মিনিট খানেক পর মাত্র একটা গুলি হলো, এবং শেষে গর্জে উঠল দুটো। ডেভিস, চিডল আর মিচেল রয়েছে ওখানে।

ক্রল করে এরিকের পাশে চলে এল সার্জেন্ট হ্যালিগান। একটা ঘোড়া মেরে ফেলেছে হারামজাদারা! তিক্ত স্বরে জানাল সে।

ঝট করে তার দিকে ফিরল এরিক, ওর ডান ঘোড়ার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন।

না, তোমারটা না, জানাল সার্জেন্ট। আমারটা!

একটা কমে গেল। আশা করছি হাঁটতে দক্ষ তুমি, সার্জেন্ট।

এখান থেকে যদি জীবিত বেরোতে পারি, সেজন্য হাঁটতে বা ক্রল করতেও আপত্তি নেই আমার, হ্যাটের সুয়েটব্যান্ড থেকে ঘাম মোছার সময় বলল হ্যালিগান

অনেকক্ষণ হলো নীরব হয়ে আছে পরিবেশ। আকাশে সামান্য মেঘও নেই। শয়তানের উদ্বাহু নৃত্যের মত তাল্পতরঙ্গ নাচছে খোলা মরুভূমিতে। রাইফেলটা হাত বদল করল সার্জেন্ট, ঘর্মাক্ত হাতের তালু মুছল শার্টে।

ক্ৰেবেট, ফোর্ট থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা কোরো না, নিচু স্বরে বলল সে। অন্তত শিগগিরই পৌঁছা’বে না। আমরা চলে আসার সময় ওখানে বিশজনও ছিল না। যত জরুরিই হোক, ফোর্ট অরক্ষিত রেখে কারও সাহায্যে সৈন্য পাঠাবে না কমান্ডার।

অধৈর্য ভঙ্গিতে পাশ ফিরল ড্যান কোয়ান। কীসের অপেক্ষায় আছে বেজন্মা ইন্ডিয়ানরা? লড়াই করতেই যদি এসে থাকবে, শুরু করছে না কেন?

ইন্ডিয়ানদের মতিগতি কবে কে বুঝতে পেরেছে? কারণও কি অনুমান করা সম্ভব? হয়তো ভাবছে তাড়াহুড়োর কিছু নেই।

নীরব হয়ে গেল কোয়ান, একটু পর বলল: আমি কী ভাবছি, জানো? ঠিক কাজটাই করছে ওরা।

বেন ডেভিসের অবস্থান থেকে গর্জে উঠল একটা রাইফেল, পরপরই নীরবতা নেমে এল, শুধু হালকা বাতাস বয়ে যাওয়ার শব্দ। বাতাস দ্রুত গরম হয়ে উঠছে।

সবার পজিশন আর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে চলে গেল সার্জেন্ট। রাইফেলটা হাত বদল করে চোখ কুঁচকে বালির সমুদ্রের দিকে তাকাল ড্যান। মিমি মেয়েটা খুব ভাল, হঠাৎ মন্তব্য করল সে।

গম্ভীর মুখে সায় জানাল এরিক। ভাগ্যবান কোন লোকের গুণী স্ত্রী হবে ও, যোগ করল ও।

বয়স যদি আরেকটু বেশি হত, হয়তো… শুরু করেও থেমে গেল ড্যান। উঁহু, আগে দেশটা ঘুরে-ফিরে দেখতে চাই। শুনেছি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় গাছ আছে ক্যালিফোর্নিয়ায়! ওগুলো দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা কি ঠিক হবে?

চাইলে দেখবে, মরুভূমিতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছে এরিক, দূরে এক জায়গায় বালির উপর জড়ো হওয়া কয়েকটা পাথর দেখতে পেল, ঠিক পাথর বলে মনে হচ্ছে না। এরিকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে ব্যাপারটা। মরার আগে সবারই ঘুরে-ফিরে দেশটা দেখা

রাইফেল তুলে নিল এরিক, পাথরের স্তুপের একটু পিছনে চ্যাপ্টা একটা পাথরে সাইট নির্দিষ্ট করল। লম্বা দম নিয়ে নিজেকে সুস্থির করল, চোখ পিটপিট করে চোখ থেকে ঘাম ছাড়াল, শেষে ট্রিগার টেনে দিল

পাথরপের পিছনে অস্ফুট স্বরে চেঁচিয়ে উঠল কেউ, তৎক্ষণাৎ আবার গুলি করল এরিক, তৃতীয় গুলিটা করল পাথর ছাড়িয়ে। আর কোন চিৎকার শুনতে পেল না।

এই রিকোশেটগুলো কখনও কখনও গুলির চেয়েও কার্যকরী, বলল ড্যান। শরীরে ঢুকে ছিড়ে ফেলে নরম মাংস। তলোয়ারের কোপ খাওয়ার মত দশা হয়।

পিছিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ একটা জায়গায় সরে এল, এরিক, উঠে দাঁড়াল। এখানেই থাকো, ড্যান। একটু হলেও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে ওরা, তবে সাবধান থেকো। পাথুরে চাতাল ধরে নীচে নামতে শুরু করল ও। ঠিকই বলেছ, মিমি ভাল মেয়ে। আমার ধারণা খুব ভাল মেয়ে।

কফি পান করার জন্য আগুনের কাছে থামল ও। সময় নিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনা করল। একটা ঘোড়া খুন হয়েছে, কোনভাবেই দুর্ঘটনা বলা চলে না, কারণ সওয়ার না থাকা মানে পায়ে হাঁটতে বাধ্য হওয়া, আর পায়ে হাঁটতে গেলে মরুভূমিতে টিকে থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

নিজের অবস্থান ছেড়ে আগুনের কাছে চলে এসেছে জেফ কেলার। কফিপট তুলল। এক ঝলুক দেখেই তার মতিগতি টের পেয়ে গেল এরিক-ঝামেলার ফিকির করছে বিশালদেহী। কেলারের মত মানুষের জন্য এটাই স্বাভাবিক। এভাবেই চলতে থাকবে-তারপর একদিন ভুলের মাশুল দেবে, অন্যের হাতে খুন হয়ে যাবে। তবে সমস্যার কথা, এটা এমন এক মুহূর্ত যখন প্রতিটি লোককে প্রয়োজন ওদের।

ইনজুনটাকে পালছ নাকি? কর্তৃত্বের স্বরে জানতে চাইল সে।

এখান থেকে যদি বেরিয়ে যেতে পারো, ওর প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করবে তুমি। এখন সবার সাহায্য দরকার আমাদের।

জ্ঞাতিভাইদের কাছে পাঠিয়ে দাও ওকে, পরামর্শ দিল কেলার। আসলে কি কোন পার্থক্য আছে ওদের? এটা সাদাদের জায়গা।

চিডল পিমা গোত্রের। পিমারা নিরীহ ইন্ডিয়ান, অন্যদের মত মারকুটে বা হিংস্র নয়। প্রাচীন কাল থেকে অ্যাপাচি এবং ইয়াকি, দুই গোত্রের শত্রু ওরা। তুমি অ্যাপাচিদের যতটা ঘৃণা করো, টনি চিডল তারচেয়েও বেশি করে। সুতরাং আমাদের সঙ্গে থাকবে ও।

সেক্ষেত্রে, কফিতে চুমুক দিল সে, সময় নিয়ে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুখ মুছল। ওকে তাড়িয়ে দেওয়ার কাজটা আমাকেই করতে

প্রথম কথা… উঠে দাঁড়াল এরিক। যোদ্ধা হিসাবে তোমার চেয়ে ঢের সেয়ানা ও, টিকতেই পারবে না ওর সঙ্গে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমাকে নেতা মেনেছে সবাই। ওর সঙ্গে যদি লাগতে যাও, আগে আমার সঙ্গে লাগতে হবে।

কফিপটের কিনারার উপর দিয়ে তাকিয়ে আছে কেলার, সাবধানী চাহনিতে মাপল ওকে। যা দেখতে পেল, একটুও পছন্দ হলো না তার। ছিপছিপে দেহের স্বল্পভাষী এ-ধরনের মানুষ আগেও দেখেছে সে, এরিক ক্রেবেটের নির্লিপ্ত উদাসীনতার মানে এই নয় যে বিপদ বা ঝামেলার সঙ্গে মোলাকাত ঘটেনি তার। তবে নিজের সামর্থ্য বা দানবীয় শক্তির উপর আস্থা আছে কেলারের, জীবনে বহুবার ভরসা করেছে এর উপর, এবারও করার সাহস পেল। আমার সঙ্গে লাগতে এসো না, স্পষ্ট হুমকির সুরে পরামর্শ দিল সে। শরীরে বড় হতে পারি, কিন্তু পিস্তলটা ভালই চলে আমার হাতে। ঠিক ফুটো করে ফেলব তোমাকে।

এখনই হয়ে যাক না হয়? মৃদু স্বরে চ্যালেঞ্জ করল এরিক।

ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল সে। সময়টা আমিই বেছে নেব, তোমার পছন্দমত হবে কেন? নিজের ভাল চাইলে আমার পথ থেকে দূরে থেকো।

ঘুরে হেঁটে চলে গেল বিশালদেহী সৈনিক।

আপাতত মুলতবি থাকল ব্যাপারটা, টের পাচ্ছে এরিক, তবে একসময় লোকটার মুখোমুখি হতেই হবে। এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। কেলারের মারমুখী স্বভাব আর নির্জলা ঘৃণাবোধ ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে একই কাতারে নামিয়ে এনেছে এরিককে। সম্ভবত ছোটবেলা থেকে সব ইন্ডিয়ানকে এক দৃষ্টিতে মাপতে শিখেছে, নির্জলা এসিডের মত ক্রিয়া করেছে এতটা বছর, তিক্ত ঘৃণার দাস হয়ে গেছে কৈলার, যা থেকে তার মুক্তি নেই। নেই শোধরানোর সুযোগও। এ ধরনের মানুষের কাছে নিজের অহমই মুখ্য, একটা অঙ্গ হারাবে কিন্তু অহঙ্কার বিসর্জন দেবে না, কারণ ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকে এরা।

আচমকা এল আক্রমণটা। বাদামি ভূতের মত উদয় হলো অ্যাপাচিরা, উধাও হয়ে গেল একইভাবে। অদৃশ্য ইঙ্গিতে যেন, কিংবা কোন শব্দও শুনতে পেল না ওরা, হঠাৎ ছুটে এল। ছুটতে ছুটতে গুলি করল, ঝাঁপিয়ে পড়ল বালির উপর, এবং পরমুহূর্তে উধাও হয়ে গেল ওদের দৃষ্টিসীমা থের্কে, শূন্য মরুভূমিতে তাদের চিহ্নও দেখা গেল না। দেখে মনে হবে আচমকা এই তৎপরতা বালিতে সূর্যালোকের কারসাজি বা দষ্টিভ্রম…কিন্তু ফল: আগের চেয়ে কাছে চলে এসেছে ওরা। নরকে

৭৭

এবং আরও একটা ঘোড়া মারা গেছে।

চাপা স্বরে মুখখিস্তি করল এরিক, ইন্ডিয়ানদের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছে।

চারপাশে অটুট নীরবতা, অপেক্ষায় আছে সবাই, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছে বালি আর লাভাভূমির উপর; আশা করছে আবারও ত্বরিত তৎপরতা দেখাবে ইন্ডিয়ানরা-ছুটে আসবে ঝড়ের বেগে, এই সুযোগে ছুটন্ত টার্গেট পেয়ে যাবে ওরা। উদ্বিগ্ন মনে কপাল থেকে ঘাম মুছল সার্জেন্ট হ্যালিগান, মনে মনে ভাবছে না জানি ফোর্টের কী অবস্থা। গুটিকয়েক লোক আছে ওখানে, মাঝারি মাত্রার একটা ইন্ডিয়ান হামলা ঠেকানোর জন্য মোটেই যথেষ্ট নয়।

গুলি করব কাকে? অভিযোগ করল ড্যান। ভূতের মত, এই ছিল এই নেই!

অযথা সময় নষ্ট করেছি! ত্যক্ত স্বরে বলল মার্ক ডুগান। ইয়োমার দিকে চলে যাওয়া উচিত ছিল।

তোমার পাসি যেমন গেছে? জানতে চাইল এরিক।

ওটা তো দুর্ঘটনা ছিল! রার্গে কেঁপে উঠল ডুগানের কণ্ঠ। এমন কিছু ঘটবে না আর। দুর্ঘটনা একবারই ঘটে।

অ্যাপাচিরা এ-ধরনের দুর্ঘটনা তৈরিতে ওস্তাদ।

একইসঙ্গে গুলি চালাল মিচেল আর চিডল, শব্দ শুনে মনে হলো একটা রাইফেল থেকে গুলি হয়েছে; পরপরই গর্জে উঠল ডেভিসের অস্ত্র। কাছের বালিয়াড়ির চূড়ায় বিদ্ধ হলো বুলেটগুলো, মুহূর্ত খানেক আগে সেখানে উঁকি দিয়েছিল এক ইন্ডিয়ান।

যাহ্, লাগেনি! বিতৃষ্ণায় থুথু ফেলল মিচেল

কিন্তু ভড়কে দিয়েছি ওদের, খানিকটা সন্তুষ্টির সুরে তাকে আশ্বস্ত করল ড্যান কোয়ান। এখন থেকে ওভাবে লাল মুখ দেখানোর সাহস করবে না। তুমি হয়তো মিস্ করেছ, কিন্তু মুখের কাছ দিয়ে গুলি গেলে খেপে যায় ইন্ডিয়ানরা, ওরাও বুঝতে পারে যে অল্পের জন্য বেঁচে গেছে।

ধীরে ধীরে সময় কাটছে। তাপতরঙ্গের উদ্বাহু নৃত্য কমে এসেছে। পশ্চিমাকাশে গড়িয়ে গেছে সূর্য। একসময় অন্ধকার নেমে আসবে। তখনই হবে আসল বিপদ। অন্ধকারে চুপিসারে এগিয়ে আসতে পারবে হিংস্র অ্যাপাচিরা

একে একে সবার কাছে গেল এরিক, বিভিন্ন স্থান অর্থাৎ কোণ থেকে মরুভূমি জরিপ করল। প্রায় একশো গজ দীর্ঘ এলাকা কাভার করছে ওরা, কিন্তু হামলা করে সুবিধা করতে পারবে না প্রতিপক্ষ। ওদের প্রতিরক্ষা পরিধির বাইরে কাভার রয়েছে, তবে ভিতরের কাভার অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। বিশেষ করে উপরের দুই কূপের মধ্যবর্তী খোলা জায়গাটা বেশ সুরক্ষিত, সীমানার দিকে পাথরসারি পেরোতে না পারলে ওদের কোন ক্ষতিই করতে পারবে না ইন্ডিয়ানরা।

ধীরে ধীরে পেরিয়ে যাচ্ছে সময়। মাঝে মধ্যে দু’একটা গুলি করছে রেডস্কিনরা, কিংবা তীর ছুঁড়ছে। তবে মানুষ বা ঘোড়া, কারোই ক্ষতি হলো না। পুরো দলের মধ্যে শুধু বেন ডেভিসই একবার গুলি ছোড়ার সুযোগ পেল, ছুটন্ত এক ইন্ডিয়ানকে বেঁধাতে চাইল সে; মেস্কিট আর শোলা ক্যাকটাসের ফাঁকে একটা ছায়া দেখেছিল মুহূর্তের জন্য; গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে নাকি টার্গেটে বিধেছে, কারও পক্ষে বলা সম্ভব হলো না।

দুপুর গড়িয়ে গেল। বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে খরতাপ ছড়িয়ে পশ্চিম আকাশে চলে গেল ক্লান্ত সূর্য, দূরের পাহাড়সারির আড়ালে চলে গেল একসময়। লাভাভূমির ওদিক থেকে ডেকে উঠল একটা কোয়েল, অনাগত রাতের ঘোষণা দিল।

আগুনের পাশে বসে কফি গিলছে এরিক, উষ্ণতা পেতে দু’হাতে মুঠো করে ধরেছে কাপটা। এখানে যা কিছু আছে, আনমনে ভাবছে ও, শুধু আগুন আর কফিকে বন্ধু বলা চলে; এই লড়াইয়ে বা এদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে চায়নি ও, কিংবা এদের সঙ্গে একাত্মও হতে পারেনি। একা থাকলে, নিজের পথে নিরাপদ দূরত্বে চলে যেতে পারত ও, ইন্ডিয়ানদের অবরোধের মুখে পড়ত না; ওর ঘোড়াটা মরুভূমিতে চলতে অভ্যস্ত, সঙ্গের ক্যান্টিন দুটো তুলনামূলক বড়-দুটোয় যতটুকু পানি আঁটে, দিব্যি কয়েকদিন চলে যেত। টুকসনের ট্রেইলে থাকার কথা, অথচ এখানে আটকা পড়ে গেছে, সঙ্গী হিসাবে আছে এমন কিছু মানুষ যাদের সঙ্গে হৃদ্যতা নেই; ওর প্রতি দরদ দূরে থাক, বেশিরভাগ লোক ঘৃণাই করে ওকে।

আমরা কি বেরিয়ে যেতে পারব? জানতে চাইল মেলানি।

পারব।

তোমার কী ধারণা-এরাই সব? নাকি আরও ইন্ডিয়ান আছে ধারে কাছে?

সঠিক বলা মুশকিল।

বাবার কথা মনে পড়ছে। বাবা হয়তো আমাকে খুঁজছে।

ওর জায়গায় থাকলে আমিও তাই করতাম।

কিন্তু খোঁজাখুঁজির দরকারটা কি? বেনকে ভালবাসি আমি, ওকে বিয়ে করব বলেই চলে এসেছি।

বেশ তো, কেউ তোমাকে বাধা দিচ্ছে না।

তুমি ওকে পছন্দ করো না, তাই না?

শ্রাগ করল এরিক। ওর সম্পর্কে কীই-বা জানি আমি? হয়তো ভালমানুষ সে…তবে তোমার যোগ্য নয়।

তুমি এমনকী আমাকেও পছন্দ করো না।

তোমার সমস্যাটা বড় কিছু নয়, সামান্য উপলব্ধির ব্যাপার মাত্র। এই দেশে তোমার বাবার গুরুত্ব কিংবা তার কাছে দেশটার গুরুত্ব যেদিন বুঝতে পারবে, মনে হয় না তোমার উপর অসন্তুষ্ট হবে কেউ।

বাবা একটা লোককে খুন করেছে, নিজের চোখে দেখেছি আমি।

খুনোখুনি খুব স্বাভাবিক ব্যাপার, অন্তত এখানে। আমাদের কথাই ধরো, সত্যি যদি এই ঝামেলা থেকে বেরিয়ে যেতে পারি, দেখা যাবে অন্তত একজন হলেও ইন্ডিয়ান খুন করেছি আমরা, কিংবা নিজেদেরই খুন করেছি।

বাবার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা!

আসলেই কি?, স্মিত হাসল এরিক, ইশারায় ডেভিসকে দেখাল। ওর ব্যাপারে কী বলবে? যুদ্ধে ছিল ও, খুনোখুনি ছাড়া নিশ্চই কর্নেল হয়নি?

কিন্তু সেটা তো যুদ্ধ ছিল!

তোমার বাবাও যুদ্ধে রত ছিল, তবে তার সঙ্গে কোন ব্যানার বা গায়ে ইউনিফর্ম ছিল না, এই হচ্ছে পার্থক্য। ওর মত বহু মানুষ লড়ছে, কখনও একা কখনও হয়তো সঙ্গী পাচ্ছে…এটা বেঁচে থাকার লড়াই, টিকে থাকার লড়াই; এবং এভাবেই এই দেশটাকে গড়ে তুলছে ওরা। তোমার প্রতিবেলার খাবার, প্রতিটি পোশাক…সবকিছু ওই লড়াই বা যুদ্ধের ফসল।

বাবা একটা ছেলেকে খুন করেছে, নিজের চোখে দেখেছি আমি…একেবারে বাচ্চা ছেলে!

হ্যাঁ, তবে ওই ছেলেটার হাতে একটা পিস্তল ছিল, তাই না? উঠে দাঁড়াল এরিক। বুনো দেশ এটা, ম্যাম। এখানে টিকে থাকতে হলে কঠিন হতে হয় পুরুষদের, সমর্থ সন্তান জন্ম দেওয়ার যোগ্যতা থাকতে হয় মেয়েদের। ইশারায় মিমি রজার্সকে দেখাল ও। ওকে দেখো, এই মেয়েটা পশ্চিমে টিকে থাকার জন্য যোগ্যা, যে-কোন পুরুষের যোগ্য সঙ্গিনী হতে পারে ও। ওর মধ্যে দৃঢ়তা আছে, আবার মেয়েলি সত্তারও কমতি নেই। পরিপূর্ণ নারী।

পানির কাছ থেকে দূরে সরে গেল ও, চুরুতির দুশ্চিন্তা জুড়ে বসল মনে। রেনিগেড এই ইন্ডিয়ান সম্পর্কে শোনা সব গল্প বা তথ্য মনে করার প্রয়াস পেল, টুকরো টুকরো ঘটনা জোড়া দিল; এসবের উপর নির্ভর করছে ওদের জীবন। চুরুতির দলকে ঠেকাতে হলে নানান তথ্য জানতে হবে, সেগুলোকে নিজেদের কাজে লাগাতে হবে।

পিছনে, রেগে গেছে মেলানি রিওস, একইসঙ্গে দ্বিধান্বিতও। প্রায় অবজ্ঞার দৃষ্টিতে মিমি রজার্সের দিকে তাকাল ও। কী আছে মেয়েটার মধ্যে যা ওর নেই? প্রশ্নটা নিজেকে করলেও, উত্তরটা জানা আছে ওর। সাহস আছে মিমির, প্রায় বিরল প্রকৃতির সাহস। খুব কম মেয়ের মধ্যে গুণটা দেখা যায়। বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার মধ্যে দুঃসময় পেরিয়ে এসেছে মেয়েটি, অথচ কাঁদা দূরে থাক, সামান্য ফোপায়ওনি! আর ও, তিক্ত মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলো মেলানি, অ্যারিজোনার সবচেয়ে সুন্দর ও বিলাসবহুল র‍্যাঞ্চে থাকার পরও প্রতিদিন অভিযোগ করত যে ওখানে থাকা সম্ভব নয় ওর পক্ষে!

পাথুরে চাতালে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে এরিক ক্ৰেবেট, তবে খোলা জায়গায় এসে দাঁড়ানোর ব্যাপারে সচেতন। কূপ ছাড়াও আশপাশে কোথাও পানির উৎস রয়েছে নিশ্চই, সেগুলো খুঁজে পেয়েছে চুরুতি। ইন্ডিয়ানদের খুব বেশি পানির প্রয়োজন হয় না, অল্পতে অভ্যস্ত ওরা; কয়োট বা চ্যাপারাল মুরগীর মত দু’এক চুমুক পানি হলে দিব্যি কয়েকদিন কাটিয়ে দিতে পারে।

হামলা করতে দেরি হওয়ার কথা নয়, ধৈর্য ধরার নিশ্চই উপযুক্ত কারণ আছে চুরুতির। নিজেদের রক্ষিত সীমানা ছাড়িয়ে অন্ধকার মরুভূমির দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকাল এরিক। কী পরিকল্পনা করছে চুরুতি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *