০৭. বিশদ পরিকল্পনা নিয়েছে জেকব

বিশদ পরিকল্পনা নিয়েছে জেকব। সোনালী স্ট্যালিয়ন, আর সেই সাথে ওই দলের আরও কয়েকটা ঘোড়া ওর চাই। একটু দূরে দূরে থেকে নিজের উপস্থিতি স্বাভাবিক বলে মানিয়ে নিতে চাইছে সে। এক সপ্তাহ পিছন পিছন ঘুরে ওদের স্বভাব-চরিত্র মোটামুটি জেনে নিয়েছে ও। এমনকী খুরের চিহ্নগুলোও ওর চেনা হয়ে গেছে। এই কদিনে দু’টো হরিণও মেরেছে সে।

এর মধ্যে ডালিয়াকে আর কাছছাড়া করেনি জেকব। সবসময়ে পাশেপাশে রেখেছে। রোদ আর বাতাসে ওর চামড়ার সাদাটে ভাবটা কেটে গিয়ে সুন্দর তামাটে রঙ, ধরেছে। নির্জন জীবনযাত্রায় নিজেকে চমৎকার মানিয়ে নিয়েছে ডালিয়া। ইউরোপের জগক্টাকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে এখানে প্রতিটি দিন আলাদা করে বেঁচে থাকার সংগ্রামটাকেই এখন পুরোপুরি উপভোগ করছে সে।

দশম দিন কফি ফুরিয়ে যাওয়ায় ওরা আবার ফিরে এল পুরোনো আস্তানায়। ঢোকার আগে অত্যন্ত সতর্কভাবে আশপাশটা বারবার পরীক্ষা করে দেখল জেকব। ক্লিফের পাশ দিয়ে সবটা জায়গা ভাল করে খুঁজে দেখে কেউ ওদের জন্য লুকিয়ে ওত পেতে বসে নেই নিশ্চিত জেনেও কয়েক ঘণ্টা পরে একাই সে ক্যানিয়নে প্রবেশ করল।

সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে মাল বোঝাই গাধাগুলোকে ডালিয়ার জিম্মায় রেখে একাই সে আবার ক্যানিয়নের মুখটার কাছে ফিরে গেল। মার্শ-পাসের সাথে মিশেছে ওটা। ঘোড়া থেকে নেমে মোকাসিনের একজোড়া জুতো পরে নিয়ে পায়ে হেঁটে ট্রেইলের উপর গিয়ে নতুন চলাচলের চিহ্নগুলো পরীক্ষা করে দেখল।

তারা এই এলাকা ছেড়ে যাবার পর মাত্র অল্প কয়েকটা নতুন চিহ্ন হয়েছে দেখল জেকব। বেশির ভাগই ইন্ডিয়ান টাটু আর জংলী ঘোড়ার পায়ের চিহ্ন। ফিরে আসবে, হঠাৎ একটা বুটের ছাপ তার চোখে পড়ল। ছাপটা বেশ বড়-ভারি মানুষের। অল্প খুঁজতেই নতুন নাল লাগানো ঘোড়ার পায়ের দাগ দেখতে পেল সে।

লোকটা এখানে ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়িয়েছিল। সন্দেহ নেই কান খাড়া করে অপেক্ষা করছিল সে। তারপর আবার মার্শ-পাসের ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেছে।

নিকোলাসের পায়ের ছাপ কখনও দেখেনি জেকব। কিন্তু ওর মনে হচ্ছে এগুলো তারই। ওজন আর আকারেও মিলছে-পদক্ষেপের দূরত্ব দেখে উচ্চতা অনুমান করছে সে। ফেরার সময়ে সাবধানে বেছে বেছে পাথরের উপর পা ফেলে কোনরকম ছাপ না রেখে ফিরল জেকব

ডালিয়া দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। ওকে দেখে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এল।

ওখানে কিছু চিহ্ন দেখলাম, বলল জেকব। আমার মনে হয় ওগুলো নিকোলাসের পায়ের ছাপ।

ও কি আমাদের খুঁজে পাবে?

কাঁধ ঝাঁকাল জেকব। ক্যাম্পটা হয়তো খুঁজে পাবে, ওখানে আমাদের অসংখ্য চিহ্ন রয়ে গেছে। কিন্তু ওখান থেকে আমরা কোন্ পথে বেরিয়েছি তা সে খুঁজে পাবে না। বেরিয়ে আসার চিহ্নগুলো সব এমন ভাবে মুছে দিয়ে এসেছি যে দেখে মনে হবে ওখানে অন্তত কয়েক বৎসরের মধ্যে কারও আনাগোনা হয়নি।

.

সোজা উত্তর দিকে এগিয়ে সোনালী স্টালিয়নের এলাকায় পৌঁছে গেল। রাত কাটাবার জন্য মুনলাইট ক্রীকের ধারে পাথরের ফাঁকে ক্যাম্প করল ওরা। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। পশ্চিম দিগন্তের দিকে ডালিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করল জেকব

দিগন্ত রোধ করে প্রায় বারো মাইল দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল প্রশস্ত স্তম্ভ। ওটা নো ম্যানস মেসা, বলল সে। ওর সবচেয়ে উঁচু জায়গাটা আশেপাশে চারদিকের জমি থেকে অন্তত হাজার ফুট উঁচু। ওটার প্রত্যেকটা ধারই উচ্চতায় কম পক্ষে পাঁচশো ফুট হবে। লম্বায় নয় মাইল আর পাশে সিকি মাইল থেকে দেড় মাইল চওড়া। মানুষের পক্ষে ওখানে ওঠা অসম্ভব মনে হয় বলেই ওটার ওই নাম হয়েছে। তবে আমার ধারণা উপরে ওঠার একটা পথ আছে। ওর পশ্চিম ধার ধরে অর্ধেকের কিছু বেশি গেলে একটা ব্যাজ আছে, ওখান দিয়ে উপরে ওঠার একটা চেষ্টা করতে চাই আমি। যদি কোন কারণে আমাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হয়, যেখানটায় ক্লিফটা বাঁক নিয়ে পুব দিকে ঘুরে গেছে, সেখানে আমার জন্যে অপেক্ষা। করো তুমি। ওখানেই আবার মিলিত হব আমরা।

পরদিন ঘোড়াটার দেখা পাওয়া গেল। হঠাৎ অপ্রত্যাশিত ভাবে ওদের একেবারে সামনাসামনি পড়ে গেল সোনালী স্ট্যালিয়ন।

পশ্চিমে অরগ্যান রকের দিকে এগোচ্ছিল ওরা; পাহাড়ের ভিতর একটা সরু পথ ধরে ছুটে বেরিয়ে এসেই থমকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল সে। ওদের মাঝের দূরত্ব মাত্র গজ পঞ্চাশেক। সামনের জমিটা মোটামুটি সমতল। ইচ্ছা করলে এখনই ওটাকে ধরার চেষ্টা করতে পারত জেকব। খুব বেগে ছুটে গিয়ে ল্যাসো ছুঁড়ে হয়তো ধরা সম্ভব হবে, কিন্তু অত ঢালু, আর নরম বালুর উপর দিয়ে জোরে ছুটতে গিয়ে ওর ঘোড়ার ঠ্যাং ভেঙে যেতে পারে। ব্যর্থ হলে এতদিন কাজ যতটা এগিয়ে ছিল সব পণ্ড হয়ে যাবে

স্ট্যালিয়নটাকে দেখে সম্মোহিত হয়ে চেয়ে রইল জেকব। কাছে থেকে ওটাকে আরও সুশ্রী দেখাচ্ছে রঙটা ঠিক উজ্জ্বল সোনার মোহরের মত। পাছায় আর তিনটে পায়ে সাদা ছোপ, কিন্তু তার মধ্যেও আবার সোনালী বুটি রয়েছে। গলাটা গর্বিত ভঙ্গিতে বাঁকানো।

স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কান খাড়া করে জেকব আর ডালিয়াকে দেখল সে। সাথের অন্য ঘোড়াগুলো দ্রুতবেগে বেরিয়ে এসে ওর পাশে থেমে দাঁড়াল।

ওদের চলার গতি মুহূর্তের জন্য থমকে যেতেই বন্ধুসুলভ স্বরে জেকব ডেকে উঠল, ও বেটা, বন্ধুত্ব করবি?

সজোরে মাথা নেড়ে শব্দ করে নাক ঝাড়ল ঘোড়াটা, তারপর আঁকাবাঁকা পথ ধরে পাথরের ভিতর দিয়ে অন্যদের পথ দেখিয়ে ফাঁকা জায়গার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। দলে বাকি পুরুষ ঘোড়াগুলো ওর সাথে একটা সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রেখে ওকে অনুসরণ করছে।

নীচের সমতল জমির উপর দিয়ে ঘোড়াগুলো ছুটতে ছুটতে চোখের আড়ালে চলে গেল। ডালিয়ার দিকে ফিরে জেকব জিজ্ঞেস করল, কেমন দেখলে?

সত্যি, মৃদু গলায় জবাব দিল সে। সত্যিই অপূর্ব।

ধীর গতিতে ঘোড়াগুলো যেদিকে গেছে সেদিকেই এগিয়ে চলল ওরা।

এদিকে একটা গল্প চালু আছে-কিছু সোনাভর্তি ওয়্যাগন এদিকে হারিয়ে গেছে-অনেক সোনা নাকি ছিল ওতে। সোনা চাই না, ওই স্ট্যালিয়নটা আর ওই দলের কয়েকটা ঘোড়া পেলেই আমি খুশি।

হঠাৎ চট করে নিজের ঘোড়া ঘুরিয়ে ডালিয়ার ঘোড়ার পথ রোধ করে থেমে দাঁড়াল জেকব। ট্রেইলের চিহ্ন দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে ডালিয়ার চোখ। জেকবের দৃষ্টি অনুসরণ করে মাটির দিকে চাইল সে।

ওদের সামনেই তিনটে নাল পরানো ঘোড়ার পায়ের ছাপ। বুনো ঘোড়ার দলটা দাগগুলো মাড়িয়ে কিছুটা অস্পষ্ট করে গেলেও বেশ বোঝা যাচ্ছে দাগগুলো খুব পুরোনো নয়।

গতরাতের ছাপ, বলল জেকব। জলদি লুকিয়ে পড়তে হবে আমাদের।

ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বুনো ঘোড়াগুলো যেপথ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল দ্রুত সেদিকে চলল ওরা।

হসকিনিনি মেসার তলায় কপার ক্যানিয়নের মুখের কাছে থামল জেকব। ঘুরে চারদিকে চেয়ে দেখল সে-কোন দিকেই ধুলো ওড়ার কোন চিহ্ন দেখা গেল না।

নতুন নাল লাগানো ঘোড়ায় চড়া তিনজন লোক, বলল জেকব।

ওরা কি আমাদের খুঁজছে?

কাঁধ ঝাঁকাল সে। কে জানে? হয়তো তাই?

অনেকক্ষণ সমতল প্রান্তরের উপর তীক্ষ্ণ নজর রেখে, ধীরে ধীরে সঙ্গীকে নিয়ে কপার ক্যানিয়নে ঢুকল জেকব। পশ্চিমে এগিয়ে চলল ওরা। বিকেলের দিকে পিউটে মেসার নীচে ক্যাটল ক্যানিয়নে ক্যাম্প করল।

পাথরের আড়ালে ছোট্ট একটা আগুন জ্বেলে ডালিয়াকে খাবার তৈরি কাজে ব্যস্ত রেখে চারপাশটা একটু ঘুরে দেখতে বেরুল জেকব।

রাতে খাবার খেতে বসে ডালিয়া বলল, জে, তুমি কিন্তু সেই সোনার ওয়্যাগনের গল্পটা আমাকে এখনও বলেনি

বলব, জবাব দিল সে। শোনো, আসলে আমার মনে হচ্ছে এদেরই একজনের পায়ের ছাপ আমি মার্শ-পাসে দেখেছি। ওরা চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমাদের বেশ কয়েকদিন ঘাপটি মেরে লুকিয়ে বসে থাকতে হবে।

খাবার কিন্তু বিশেষ কিছুই নেই।

জানি…একটু কষ্ট করে থাকতে পারবে না?

হাসল সে। নিশ্চয়ই, তুমি পারলে আমিও পারব।

খাওয়া শেষ হতেই আগুনটা নিভিয়ে দিল জেকব। তারপর পাথরের মাঝে একটা ভাল আশ্রয় খুঁজে নিল। সহজে কারও ওখানে ঢোকার সাধ্য হবে না। একটা গর্ত মত জায়গায় ঘোড়া আর গাধাগুলোকে রাখা হলো-বাইরে থেকে কারও নজরে পড়বে না ওগুলো।

সব কাজ সেরে অবার ডালিয়ার পাশে এসে বসল জেকব। তুমি হারানো সোনার ওয়্যাগনগুলোর থা জিজ্ঞেস করছিলে না? সে এক পুরোনো গল্প, আরম্ভ করল সে। পশ্চিমে মাটিতে পোঁতা গুপ্তধনের কথা অনেক শোনা যায়-কিছু পাওয়া গেছে, বাকিগুলো গুপ্তই রয়ে গেছে। ইন্ডিয়ানদের ভয়ে বা আক্রমণের মুখে অনেক সময়ই সাথে নিলে বোঝা, বাড়বে বলে সোনা-দানা মাটিতে পুঁতেছে মানুষ। কখনও মালিক প্রাণ হারিয়েছে, আবার কখনও বা ফিরে আসার সাহস হারিয়েছে। সোনা দেখতে যত সুন্দর আর জ্বলজ্বলে হোক না কেন, কয়েকশো মাইল ফোস্কাপড়া গরম আর অ্যাপাচি ভরা মরুভূমির কথা মনে পড়লে অনেকেই ফেলে আসা সোনার চাকচিক্যের আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে।

সতেরোজন লোক ছয় গাধার দুটো গাড়ি নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে রওনা হয়েছিল। ওদের প্রত্যেকের সাথেই ছিল নিজস্ব ঘোড়া আর প্রচুর পরিমাণে অস্ত্রশস্ত্র। গাড়ি দু’টোতে খাবার আর অন্য জিনিসপত্রের সাথে ছিল সোনা-অনেক সোনা।

সোনা যে ঠিক কতখানি ছিল তা কেউ জানে না। খুবই ধনী ছিল ওরা। কয়েকটা চালায় ভরে সোনার তাল, বার আর মুদ্রা-অর্থাৎ ওদের যথাসর্বস্ব নিয়ে স্যান ফ্রানসিসকো গিয়ে বসবাস করবে ঠিক করেছিল ওরা।

মোহেড ইন্ডিয়ানের সাথে যুদ্ধে একজন মারা পড়ে কলোরাডোয়। বীলি ম্প্রিং-এর কাছে এসে আরও একজন অক্কা পেল। কলোরাডোর যুদ্ধে তীর খেয়ে। জখম হয়েছিল লোকটা। বেশ দুর্বল হয়ে পড়লেও কেউ আশা করেনি লোকটা শেষ পর্যন্ত মারা যাবে।

দূরে উত্তর-পুবে স্যান ফ্রানসিসকোর পাহাড়ের চূড়া দেখতে পেয়ে আশ্বস্ত হয়ে রাতের মত ওরা বিশ্রাম নেয়ার জোগাড় করছে, এমন সময়ে একদল কয়োটেরো অ্যাপাচি ওদের আক্রমণ করল। তিনদিন ধরে যুদ্ধ চলল-খুব একটা ক্ষতি হলো না ওদের-একজন মরল আর দু’জন আহত হলো। মারাত্মক জখম হয়নি কেউ।

কিন্তু সেই রাতে আহতদের একজন মারা গেল। এবারও লোকটার মৃত্যু হবে কেউ আশা করতে পারেনি। সামনেই কিছু কঠিন পথ পার হতে হবে ওদের, সমৰ্থ সবকয়টা লোকের সাহায্য দরকার। পরপর দু’জন লোক অমন অপ্রত্যাশিত ভাবে মারা যাওয়ায় কেমন একটা ভয় ঢুকে গেছে ওদের মনে। কুসংস্কার বিশ্বাস করতে আরম্ভ করেছে ওরা।

মাত্র তেরোজন সমর্থ লোক আর দু’টো মন্থর গতি গাধার গাড়ি নিয়ে অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে জানে ওরা। আহত লোকটার হাত জখম হয়েছে-ঘোড়ায় চড়তে অসুবিধে নেই তার-কিন্তু দু’দুজন জখম লোককে পটল তুলতে দেখে অসম্ভব ভয় পেয়েছে লোকটা-স্বাভাবিক।

পরবর্তী তিনদিন নির্বিঘ্নেই কাটল ওদের। কিন্তু তার পরেই সেই আহত লোকটাও হঠাৎ রাতের বেলা মারা গেল। দলের মধ্যে একজন স্প্যানিশ লোক। প্রতিদিনের ঘটনা ডায়েরীতে লিখে রাখত। মৃতদেহটাকে কবর দেয়ার ব্যবস্থা করতে গিয়ে রবার্তো খেয়াল করল লোকটার কানের কাছে এক ফোঁটা রক্ত দেখা যাচ্ছে। ভাল করে পরীক্ষা করে সে দেখল কানের ভিতর দিয়ে একটা স্টীলের তার মগজে ঢুকিয়ে লোকটাকে খুন করা হয়েছে। তারটা তখনও কানের ভিতরেই রয়েছে। রবার্তো ধরে নিল অন্য দু’জন আহত লোককেও একই উপায়ে মারা হয়েছে। যে-ই মেরে থাকুক, সে এই দলেরই কেউ।

কতদিন আগের ঘটনা এটা?

পনেরো-ষোলো বছর হবে। এখানকার জন্যে ওটা খুব দীর্ঘ সময়। সে যাক, রবার্তো ভয়ে কুঁকড়ে রইল। কাউকেই কথাটা জানাল না। খুনীর উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট-সোনা।

রাতে আগুনের ধারে বসে সবার সামনে ঘটনা খুলে বলল রবার্তো-জানাল তাদের মধ্যেই রয়েছে খুনী। পরদিন সকালে সবাই আবার রওনা হলো বটে, কিন্তু এখন আর কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

রবার্তো আর ওর সাথে দলের আর একজন তোক সামনে এগিয়ে চারদিকে খেয়াল রাখছিল, বহুদূরে কয়োটেরোর একটা বিরাট দল দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে এসে সবাইকে সাবধান করল ওরা। ওই ইন্ডিয়ান লোকগুলো ওদের দেখেছে কিনা বলতে পারল না রবার্তো।

ওরা ঠিক করল প্রায় অব্যবহৃত একটা ট্রেইল ধরে উত্তর-পুবে সরে গিয়ে ইন্ডিয়ানদের সাথে সংঘর্ষ এড়িয়ে যাবে। যুদ্ধ ওরা এড়িয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু সেইসাথে সোনাগুলোও হারাল।

বালুর ঝড়ের মধ্যে পড়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলল। একটা গাধা পাথরে হোঁচট খেয়ে পা ভেঙে বসল। ওটাকে মেরে ফেলতে বাধ্য হলো ওরা। অনেক সগ্রাম করে পুব দিকে এগিয়ে শেষ পর্যন্ত মরমন কুয়ার কাছে পৌঁছল সবাই।

অবশ্য কুয়াটা তখন ওই নামে পরিচিত ছিল না..নাম থেকে থাকলে ওটার হয়তো ইন্ডিয়ান কোন নামই ছিল। এই মরু এলাকায় প্রচুর পানি পেয়ে খুশিতে সব ভুলে গেল ওরা। সেই রাতেই ওদের আর একজন মানুষ অদৃশ্য হলো। আগুনের জন্য ক্যাম্পের কাছেই কাঠ আনতে গেছিল লোকটা। অনেক পরে সবাই টের পেল কাঠ আনতে গিয়ে লোকটা আর ফেরেনি।

ওর আর দেখা পাওয়া যায়নি। কিছু পায়ের ছাপ অবশ্য পাওয়া গেছিল, কিন্তু কতগুলো পাথরের কাছে এসে চিহ্ন মিলিয়ে গেছে।

একটু চুপ করে কান পেতে শব্দ শোনার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে জেকব আবার আরম্ভ করল, এগারোজন বাকি রইল আর। বিজন ক্যানিয়নে পথ হারিয়ে অসহায় বোধ করছে সবাই। কয়েকবার চেষ্টা করে প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত কানা গলির মাথা থেকে ফিরে আসতে হয়েছে। ওয়্যাগনসহ চলা খুব কষ্টসাধ্য হচ্ছে। এই সময়ে ওদের আর একটা গাধা খোড়া হয়ে গেল।

বদমেজাজী হয়ে উঠেছে সবাই। কয়েকবার নিজেদের মধ্যেই মারপিট হবার জোগাড় হলো। ওদের সাথে একজন চোদ্দ-পনেরো বছর বয়সের ছেলে ছিল; ক্যালিফোর্নিয়া থেকে রওনা হবার সময়ে শেষ মুহূর্তে ওদের সাথে যোগ দিয়েছিল সে। এই ছেলেটাই ভাগ্যক্রমে ওখান থেকে বেরোবার একটা পথ খুঁজে পেয়ে যায়। পাহাড়ের ভিতর দিয়ে খুব সরু একটা পথ। ওই পথ ধরেই খোলা মরুভূমিতে বেরিয়ে পাহাড় ঘেঁষে অস্পষ্ট পুরোনো ইন্ডিয়ান ট্রেইল ধরে দক্ষিণে রওনা হলো ওরা।

কতদূর এগিয়েছিল তা কেউ বলতে পারে না। পথের মধ্যেই কয়োটেরোর আক্রমণ হলো। আক্রমণটা অপ্রত্যাশিত ভাবে এলেও চট করে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে প্রবল বিক্রমে যুদ্ধ চালিয়ে গেল তারা। ইন্ডিয়ানরা ওদের বেশির ভাগ পশুই তাড়িয়ে নিয়ে চলে গেল। যুদ্ধের শেষে দেখা গেল মাত্র চারজন বেঁচে আছে। আর সেই ছেলেটা।

ওই চারজনের মধ্যে রবার্তো ছিল একজন। সে বেঁচে না থাকলে তার ডায়েরী থেকে এসব কথা আর জানা যেত না। যুদ্ধ শেষ হতেই ওদের ভিতরই আর একটা লড়াই বেধে যাবার উপক্রম হলো। মন্টি নামের ছেলেটাকে খুন করার জন্যে খেপে উঠল একজন। অন্যেরা অনেক কষ্টে তাকে থামাল।

ছেলেটাকে মারতে চাইল কেন?

কারণ যুদ্ধের সময়ে ছেলেটা একটা গর্তের ভিতর লুকিয়ে ছিল সারাক্ষণ-বিন্দুমাত্র সাহায্যও সে করেনি।

কিন্তু মন্টি যে ছেলেমানুষ!

পশ্চিমে ছেলেমানুষ বলে কিছু নেই। ওর চেয়েও অনেক কম বয়সের ছেলেদের এখানে বড়দের সাথে কাঁধ মিলিয়ে পাশাপাশি যুদ্ধ করতে হয়। অন্যান্য বিপদেও তাদের বড়দের সাথে সমান ঝুঁকি নিয়ে সবার দুঃখ-দুর্দশার সমান ভাগ। নিতে হয়।

পশুগুলো সব হারানোর পরে ওয়্যাগন দু’টো ওখানেই ফেলে যাওয়া ছাড়া আর উপায় রইল না। যে কয়টা বাড়তি ঘোড়া ছিল তাদের পিঠে সোনা বোঝাই করে কঠিন পাথুরে উঁচুনিচু পথ ধরে পাহাড়ের দিকে ফিরে গেল ওরা।

বেশিদূর যাবার সাহস তারা পায়নি-কাছেই এক পাহাড়ের ভিতর একটা গর্তে সোনা লুকিয়ে রাখল। ওদের ভয় ছিল যে-কোন মুহূর্তেই আবার ইন্ডিয়ান আক্রমণ আসতে পারে, মোটে এই ক’জনে আর একটা আক্রমণ কিছুতেই ঠেকাতে পারবে না ওরা।

লোকালয়ে ফিরে কুলিমজুর ভাড়া করে ওখান থেকে সোনা উদ্ধার করে নিয়ে যেতে যা খরচ পড়বে তার জন্যে যথেষ্ট সোনা মজুদ রেখে বাকিটা লুকিয়ে রাখা হলো। ওদের সবার চোদ্দ-পুরুষ হেসে খেলে রাজার হালে কাটিয়েও শেষ করতে পারবে না এত সোনা। কিন্তু মন্টির কাপুরুষতার জন্যে ওকে বঞ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ওর হাত-পা আর চোখ বেঁধে সোনা লুকিয়ে রেখে এল ওরা।

ওদেরই কেউ বাকি দু’জন বা তিনজনকে খুন করেছিল। ছেলেটা খুন হয়েছিল কি বেঁচে আছে জানা যায়নি।

মাঝে মাঝে ঘোড়া বদল করে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে শেষ পর্যন্ত ওরা সান্তা যে পৌঁছল। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না বলে শহরে পৌঁছে আলাদা হয়ে গেল সবাই। পরদিন সকালে রবার্তো আর একজনকে সাথে নিয়ে সাথীর খোঁজে তার ঠিকানায় পৌঁছে দেখল বুকে ছুরিবিদ্ধ অবস্থায় নিজের কামরায় মরে পড়ে আছে লোকটা।

কথা ছিল শহরে পৌঁছেই লোকজন জুটিয়ে সোনা উদ্ধার করে নিয়ে আসবে ওরা। কিন্তু ভাব-গতিক দেখে বিকেলের আগেই সরে পড়ল রবার্তো-যথেষ্ট ধকল গেছে ওর উপর-সোনার ভাগ আর চায় না সে। ল্যাস ভেগাস হয়ে সেইন্ট লুই চলে গেল সে। আর ফেরেনি-অন্যদের কী হলো তাও আর খোঁজ করার চেষ্টা করেনি।

ওর সাথীরা নিশ্চয়ই সোনার জন্যে ফিরে এসেছিল?

হয়তো-কিন্তু গুপ্তধন-শিকারীদের ধারণা ভিন্ন। অবশ্য তার কারণও আছে। আসলে রবার্তোর ডায়েরীটা না থাকলে এসব কিছুই জানা যেত না। যতদূর জানা গেছে ওর সঙ্গীরা খুন হয়েছে।

সবাই?

পকেট থেকে পাইপ বের করে তাতে তামাক ভরে সে জবাব দিল, হ্যাঁ, কেবল সেই ছোট ছেলে মন্টি ছাড়া আর সবাই মৃত।

ওদের কে খুন করল তা জানা যায়নি?

না।

জে, আমরা একটু খুঁজে দেখলেই তো পারি? এই এলাকাটা তোমার ভালই চেনা আছে। ভাল করে খুঁজলে হয়তো পেয়েও যেতে পারি!

সুইটি, ওই সোনালী ঘোড়াটা আমার চোখে সোনার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর আর লোভনীয়। তা ছাড়া এই নির্জন এলাকায় ওটা সোনার চেয়ে অনেক বেশি কাজে আসবে। ওই সোনার কথা ভুলে যাওয়াই ভাল-ওর পিছনে ছুটে এ পর্যন্ত অনেক লোক মারা পড়েছে।

এই এলাকাতেই কোথাও লুকানো আছে সোনা, তাই না?

অন্ধকারে কয়েক সেকেন্ড কান পেতে শুনল সে। ডালিয়াও জবাবের জন্য তাগাদা দিল না। সে জেনে ফেলেছে এটা ওর অভ্যাস। কথার ফাঁকেও বারবার জেকব ঘোড়াগুলোর প্রতিক্রিয়া খেয়াল করে দেখছে, লক্ষ করেছে ডালিয়া। বিপদ এলে ঘোড়াই মানুষের আগে তা টের পাবে।

কেলভিন ওই সোনা অনেকদিন থেকে খুঁজে বেড়াচ্ছে-পায়নি। রবার্তোর মৃত্যুর পরে ওই ডায়েরীটা ওর ভাগনের হাতে পড়ে। সে সোনার খোঁজে এখানে এসেছিল, ওর সাথেই কেলভিন প্রথম এই এলাকায় আসে। এখন সম্ভবত এই এলাকা সম্বন্ধে ওর চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না।

ওরা তা হলে সোনা খুঁজে পায়নি?

না তবে একদল পিউটে ওদের খুঁজে পেয়েছিল। ইন্ডিয়ান যোদ্ধার একটা দল ডার্টি ডেভিল হয়ে কলোরাডোতে ঢোকে। আক্রমণ করে রবার্তোর ভাগনে আর কেলভিনকে জখম করে ওদের ঘোড়া তাড়িয়ে নিয়ে চলে গেছিল ইন্ডিয়ানরা।

একমাস আধপেটা খেয়ে পায়ে হেঁটে বহু কষ্ট সহ্য করে শেষ পর্যন্ত প্রাণে বেঁচে ফিরেছিল ওরা। রবার্তোর ভাগনের সোনার লোভ পুরোপুরি মিটে গেছিল ওই একমাসে। মামার ডায়েরীটা কেলভিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে পুবে চলে যায় সে। মিসিসিপির পশ্চিমে কেলভিন ছাড়া সম্ভবত এক মাত্র আমিই ওই ডায়েরীটা নিজের চোখে দেখেছি।

উঠে ঝোঁপের ভিতর দিয়ে ওপাশে চলে গেল জেকব। উৎকর্ণ হয়ে শব্দ শোনার চেষ্টা করছে সে। ডালিয়া কিছুতেই বুঝে পায় না লোকটা কী করে ঝোঁপের মধ্যে দিয়ে এমন নিঃশব্দে যাতায়াত করে।

ঝোঁপের ভিতর একা চুপচাপ স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইল জেকব-শুনছে। মনের মধ্যে নিজেদের পরিস্থিতিটা পর্যালোচনা করে নিচ্ছে সে।

ফ্রীডমের লোকগুলো সহজে তার পিছু ছাড়বে না-ওদের চেহারা দেখে সে বুঝেছে ওরা সবাই দৃঢ়সংকল্পের অধিকারী। নিকোলাসের কথাও ভাবছে সে। ওই লোকটাও ছাড়বে না তাকে। হঠাৎ তার মনে হলো দু’টো দলের তো একই উদ্দেশ্য-তাকে খুঁজে বের করা, ওরা একত্র হয়ে কাজে নামেনি তো? চতুর লোক নিকোলাস। শক্তি বাড়াবার সুযোগ কোনমতেই ছাড়বে না সে।

ইচ্ছা করেই ফ্রীডমের লোকগুলোকে মরমন কুয়ার কাছে নিয়ে গিয়েছিল জেকব। সে ভেবেছিল সোনার লোভে পড়ে ওর কথা ভুলে লোকগুলো সোনা। খুঁজতে লেগে যাবে। কিন্তু ঘটানচক্রে মনে হচ্ছে তার ফন্দিটা ঠিক কাজে লাগেনি।

এই এলাকাটা বিরাট, কিন্তু এতগুলো লোক যদি একসাথে তাকে খুঁজতে শুরু করে, তবে ঠিকই বের করে ফেলবে।

ওই স্ট্যালিয়নটার সাথে ওই দলের আরও কয়েকটা ঘোড়া ধরতে হলে জেকবের কিছু সময় দরকার। ওগুলো কোথায় পানি খায়, কোথায় ওদের ফাঁদে ফেলে ধরতে সবচেয়ে সুবিধা হবে, এসব সঠিক জেনে নিতে ওর অন্তত পক্ষে তিরিশ-চল্লিশ দিন সময় লাগবে-বেশিও লাগতে পারে।

বিকল্প একটা উপায় বের করতে হবে ওকে। যে করেই হোক ওদের ধোকা দিয়ে বোঝাতে হবে যে সে এই তল্লাট ছেড়ে চলে গেছে।

ভাবতে ভাবতেই সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল জেকবের ঠোঁটে। একটা পথ বের করে ফেলেছে সে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *