০৭. বহুত সময় লাগিয়ে দিলে

বাপরে, বহুত সময় লাগিয়ে দিলে! তিন গোয়েন্দাকে লিফট থেকে বেরোতে দেখেই বলে উঠল বব। আমরা আর পাঁচ মিনিট দেখেই দেখতে যেতাম কি হয়েছে তোমাদের এত দেরি করলে কেন?

কি বলল লোকটা জানতে চাইল ডলি।

জাল পয়সাগুলো কি ওরাই বানাচ্ছে? অনিতার প্রশ্ন।

অন্য লোকটার খবর কি? জিজ্ঞেস করল ফারিহা।কোথায় ধরে নিয়ে গেল ওকে?

সব প্রশ্নের জবাবই দিল কিশোর। জানাল আগামী দিনের পরিকল্পনা।

এখন আমাদের বাড়ি ফেরা দরকার, বলল সে। ভাগ্যিস বাড়িতে বলে এসেছিলাম দেরি হতে পারে

সবাই বাড়িতে বলে এসেছে, বড়দিনের বাজার দেখতে যাচ্ছে ওরা।

তুষারপাতের বিরাম নেই। রাস্তাঘাট, বাড়ির ছাত, সব তুষারে ঢেকে দিচ্ছে।

বাস স্টপে যাওয়ার পথে অনবরত তুষারকণাকে ধাওয়া করে যেতে লাগল টিটু।

পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল ওদের, সারা গ্রাম সাদা তুষারে ঢেকে গেছে।

গরম কাপড়-চোপড়ে গা মুড়ে, মাথা ঢেকে ঘর থেকে বেরোল সবাই।কিশোরদের বাগানের ছাউনিতে মিলিত হয়েছে সকাল সাড়ে আটটায়।রবিন বাদে।

সকালের বাসে শহরে চলে গেছে সে এত তুষার দেখে আনন্দে ফেটে পড়ার কথা ছিল ওদের। কিন্তু মগজে এখন

অন্য চিন্তা তুষারের বল বানিয়ে ছোঁড়াছুড়ি খেলা, কিংবা তুষারমানব বানানোর আগ্রহ নেই।

চিন্তিত ভঙ্গিতে কিশোর বলল, ভাবছি, এত তুষারের মধ্যে ডগলাস ফার্মটা খুঁজে পাওয়া না কঠিন হয়ে দাঁড়ায় আমাদের জন্যে।

কথা বলার সময় মুখ থেকে বেরোনো বাতাস সাদা ধোঁয়ার মত হয়ে যাচ্ছে।

তোমাকে আগুন বের করা ড্রাগনের মত লাগছে, কিশোর, হেসে বলল ফারিহা।

কিন্তু তার দিকে তাকিয়ে ভ্ৰকুটি করল কিশোর। হাসল না। কেউই হাসল না। রসিকতা করার মত মানসিক অবস্থা নেই এখন কারও।

কিশোর ঠিকই বলেছে ডলি একমত হলো তার সঙ্গে। ফার্মটা খুঁজে পাব

তো? তুমি বলার আগে ভাবিইনি। কি করে পাব? এই এত তুষারের মধ্যে রাস্তার মধ্যে আরও কয়েন যদি পড়ে থাকে, থাকবে তুষারের নিচে ঢাকা। খুঁজে পাওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। তারমানে কোন সূত্রও চোখে পড়বে না।

আগেভাগেই অত চিন্তা করে লাভ নেই.মুসা বলল। আগে গিয়ে তো দেখি। পাওয়া না পাওয়া সে তো পরের ব্যাপার।

টিটুর চিৎকারে ফিরে তাকাল ওরা। ছাউনির দরজার বাইরে চলে এসেছে সে। দৌড়ে চলে এল ওদের কাছে।

টেনে-হিঁচড়ে তাকে নিয়ে গিয়ে আবার ঘরের ভেতর ঢোকানোর চেষ্টা শুরু করল ফারিহা।

ও বুঝে গেছে, আমরা অভিযানে বেরোচ্ছি। টিটুর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়াল কিশোর,উঁহুঁ, নেয়া যাবে না রে তোকে, টিটু। তুষারে ভিজে সর্দি বাধাবি।মরবি তখন।

তা ছাড়া যাবি কি করে? অনিতা বলল। আমরা তো যাব সাইকেলে।

সাইকেলে যেতে পারব কিনা সন্দেহ আছে, বব বলল।

মেশিন যদি আসে, রাস্তা সাফ হয় তাহলে পারব; না হলে হাঁটা ছাড়া গতি নেই।

টিটুকে ভেতরে নেয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে ফারিহা। কিন্তু নিতে আর পারে না।করুণ আর্তনাদ শুরু করে দিল টিটু।ওকে নিয়েই যাই না কেন, মুসা বলল। একটা টবোগান নিলে তাতে চড়ে দিব্যি চলে যেতে পারবে টিটু। ভিজবেও না। ঠাণ্ডাও লাগবে না।

হ্যাঁ, বুদ্ধিটা মন্দ না, ডলি বলল।

বেশ, রাজি হলো অবশেষে কিশোর। কিন্তু সারাক্ষণ একা তো আমার পক্ষে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় ভারী জিনিসটা।

তোমার একা টানার দরকার কি? সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল বব। পালা করে টানব আমরা সবাই।

টিটুকে সবাই ভালবাসে ওরা। ওকে ফেলে যেতে মন চাইল না কারোরই।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই রওনা হলো গোয়েন্দাদের বিচিত্র মিছিলটা। ছয়টা সাইকেল, আর কিশোরের সাইকেলের সঙ্গে বাধা ছোটখাট স্লেজের মত একটা টানা গাড়ি।তাতে চড়ে আরামছে চলেছে টিটু।

তুষার কাটার গাড়ি এসেছে। মেইন রোডটা পরিষ্কার করার পর গলিগুলো সাফ করছে এখন। আগে আগে গেছে গাড়িটা। সুতরাং রাস্তা সাফ। এগোতে অসুবিধে হচ্ছে না গোয়েন্দাদের।

বিশাল যন্ত্রটার দুই পাশে একনাগাড়ে ছিটকে পড়ে উঁচু হয়ে পাড়ের মত জমে যাচ্ছে তুষার।যতই গাঁয়ের ভেতর দিকে এগুচ্ছে, পুরু হচ্ছে তুষারের স্তর।

সবাই বেশ সতর্ক রয়েছে। কড়া নজর রেখেছে। কোনমতে ডগলাস ফার্মের রাস্তাটা চোখ এড়িয়ে যেতে দেবে না।

চিন্তা নেই একমাত্র টিটুর। টোবোগানে পা ছড়িয়ে বসে মহানন্দে ভ্রমণ করছে।

রবিন ততক্ষণে পৌঁছে গেছে রোভারদের ফ্ল্যাটের দরজায়।

হাতে দুটো ফাদার ক্রিস্টমাসের পোশাক, আর কাঁধে ঝোলানো ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে এল রোভার।

কোন খবর নেই নিশ্চয়? জিজ্ঞেস করল সে।

না, মাথা নাড়ল রবিন। সবে তো সকাল হলো। তবে এতক্ষণে নিশ্চয় ডগলাস ফার্মের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেছে সবাই।

রাস্তায় নেমে হেনরির দোকানের দিকে হাটতে শুরু করল দুজনে। মিল রোডের সেই অফিস বিল্ডিংটায় ঢুকে পোশাক পাল্টে ফাদার ক্রিস্টমাসের পোশাক নিল, আগের দিন যেখানে খুলেছিল টনি আর রোভার।

বেরিয়ে যখন এল, সম্পূর্ণ নতুন মানুষ। একেবারেই চেনা যাচ্ছে না। আর কে-ই বা খেয়াল করতে যাচ্ছে যে একজন ফাদার ক্রিস্টমাস আগের দিনের ফাদার ক্রিস্টমাসের চেয়ে সামান্য খাটো?

অবশেষে সেই জায়গাটায় পৌঁছে গেল গোয়েন্দারা, যেখানে ডগলাসের ফার্মটা পাওয়া যাওয়ার কথা। একপাশে খোলা মাঠ, আরেক পাশে বন। বন আর মাঠের মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলে যাওয়ার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।

মেঘে ভারী হয়ে আছে আকাশ। সীসার মত রঙ। দিনের আলোটাও কেমন বিচিত্র। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা তুষারের কারণে। শামুকের গতিতে তুষার সাফ করতে করতে চলেছে তুষার কাটার যন্ত্রটা। সোজা চলে যাচ্ছে। পাশের গলিপথে নামার কোন ইচ্ছে নেই।

খোলা মাঠে অনেক বেশি পুরু হয়ে পড়েছে তুষার। তার মধ্যে সাইকেল।

নামানোর চেষ্টা করল মুসা। মুহূর্তে অর্ধেক চাকা দেবে গেল। মজা করার জন্য তার মধ্যেই প্যাডাল করে সাইকেল চালানোর চেষ্টা করল সে। কিন্তু গেল কাত হয়ে তুষারের মধ্যে পড়ে। সবাই হাসতে লাগল। উঠে দাঁড়িয়ে কাপড় থেকে তুষার ঝেড়ে ফেলল মুসা।

সাইকেল থেকে নেমে পড়ল কিশোর। একটা গাছের নিচে রেখে, সৰাইকে রাখুতে বলল। মুসার অবস্থা দেখেই বোঝা গেছে, গলিপথে সাইকেল চালানো কঠিন ব্যাপার হবে।

গাছের নিচে থাকলে অন্তত ভিজবে না সাইকেলগুলো। আকাশের দিকে তাকাল কিশোর। চেহারা দেখেছ? আবার শুরু হবে তুষারপাত।

তার কথা শেষ হতে না হতেই এক কণা তুষার এসে পড়ল নাকের ডগায়।

চলো, যাওয়া যাক! হাটতে শুরু করল সে।তুষার মাড়িয়ে হাটতে লাগল ওরা। রাস্তার চিহ্নও চোখে পড়ছে না। গাছের ডালপালা সব নুয়ে পড়েছে তুষারের ভারে। নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় ওদের মাথায় খসে পড়ে, শব্দ করে ভেঙে ছিটকে যাচ্ছে চতুর্দিকে। দেখতে দেখতে পা থেকে মাথা পর্যন্ত সাদা পাউডারের মত তুষারে সাদা হয়ে গেল ফারিহা।

আজকে আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যাবে না। খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার সামিল! ডলি বলল। সবার পেছনে পড়ে গেছে সে। ক্লান্তি আর ঠাণ্ডায় কাহিল।

আরে এত তাড়াতাড়িই হতাশ হয়ে যাচ্ছ কেন? বব বলল। কি ঘটবে।

আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। ফার্মটা পাবই আমরা।

ডলিকে উৎসাহ জোগানোর চেষ্টা করলেও কথাটা নিজেই বিশ্বাস করতে পারল না বব।

কিন্তু কিশোর সহজে দমার পাত্র নয়। এগিয়েই চলল সে ঘন হয়ে পড়ছে এখন তুষার। সীমিত করে দিচ্ছে দৃষ্টিশক্তি। সামনে কয়েক হাতের বেশি নজরে আসছে না। সেজন্যেই গাড়িটাকে দেখার অনেক আগেই ওটার ইঞ্জিনের শব্দ কানে এল ওদের।

খাইছে! বলে উঠল মুসা। এ রাস্তা দিয়েই আসছে মনে হচ্ছে? মিছিলের আগে আগে হাটছে সে। আমাদের দিকেই আসছে!

জলদি লুকাও! সাবধান করে দিল কিশোর, গাড়িতে যে-ই থাক, আমাদেরকে তার দেখে ফেলা চলবে না।

সবাই একমত হলো তার সঙ্গে। ওদের মনে হতে লাগল গাড়িটার মধ্যে বিপদ রয়েছে। কিন্তু কেন, সে-প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না কেউ। তুষারের মধ্যে দিয়ে যত দ্রুত পারল, দৌড়ে ঢুকে পড়ল আবার জঙ্গলে। গাছের নিচে ঘাপটি মেরে বসে রইল। বাড়ছে ইঞ্জিনের শব্দ।

অবাক কাণ্ড! মুসা বলল। আসার পথে চাকার দাগ তো কোথাও দেখলাম না।আর এ রাস্তাটা থেকে অন্য কোন দিকে কোন রাস্তা বেরোয়নি।সোজা চলে গেছে-ডগলাস ফার্মই হোক, বা অন্য যে কোনখানেই হোক।

নজরে এল গাড়িটা। বড় কাল একটা গাড়ি। একজন আরোহীকে দেখেই চিনে ফেলল অনিতা গাছের গোঁড়া আরও সেঁটে গেল। লোকটার চোখে পড়তে চায় না।

তুষারের জন্যে ধীরে চলতে বাধ্য হচ্ছে গাড়িটা। চলে গেল পাশ দিয়ে।

ধরা পড়ার ভয়ে তুষারের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে থাকল গোয়েন্দারা। টিটুর মুখ চেপে ধরে রাখল কিশোর, যাতে শব্দ করতে না পারে। ইঞ্জিনের শব্দ পুরোপুরি মিলিয়ে যাবার পর খুব সাবধানে মাথা তুলল।

গেছে!উঠে দাঁড়াল সে। দেখলে? কাল যে তিনজনকে দেখেছিলাম, ওরাই গেল কোথায়? ফারিহার প্রশ্ন।

নিশ্চয় হেনরির দোকানে, একসঙ্গে বলে উঠল বব আর অনিতা।

সর্বনাশ! আঁতকে উঠল ডলি। রবিন আছে না ওখানে।

আছেই তো! অত ভয় পাবার কিছু নেই! কিশোর বলল। এ সব কাজে নতুন নয় সে। নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা তার আছে। আমাদের কাজ আমরা করতে থাকি। ফার্মে গিয়ে জালিয়াতদের গোপন আস্তানা খুঁজে বের করা দরকার।

টনিকেও উদ্ধার করে আনতে হবে।

হ্যাঁ, একমত হয়ে মাথা দোলাল মুসা। ওদের এই শয়তানি খেলা যত তাড়াতাড়ি পারা যায় বন্ধ করা দরকার।

তারমানে বলতে চাইছ কিশোরের দিকে তাকাল বব, ডগলাস ফার্মের দিক থেকেই ওরা এসেছে?

মাথা ঝাকাল কিশোর।

এবং তারমানে, অনিতা বলল, গাড়ির চাকার দাগ অনুসরণ করে গেলেই পেয়ে যাব ফার্ম হাউসটা? কপালটা খুলতে আরম্ভ করেছে মনে হয়!

কিন্তু আমাদের পায়ের ছাপের কি হবে? মনে করিয়ে দিল ফারিহা। ওদের চোখে পড়ে যাবে না সেগুলো?

তা তো পড়তেই পারে, জবাব দিল মুসা। কিন্তু যে হারে তুষার পড়ছে, দেখতে দেখতে ঢেকে যাবে। তা ছাড়া গাড়ি চালানোর সময় সর্বক্ষণ ওয়াইপার চালাতে হয়। সামনে হাতি দাঁড়িয়ে থাকলেও এর মধ্যে দিয়ে দেখাটা কঠিন। তাছাড়া দাগ থাকতে পারে সন্দেহ করলে তবে তো দেখার চেষ্টা করবে।

হ্যাঁ, একমত হয়ে মাথা দোলাল কিশোর। হয়তো তোমার কথাই ঠিক। কিন্তু সাবধানের মার নেই। সুতরাং কোন রকম ঝুকি নিতে আমি নারাজ। রাস্তা ছেড়ে এখন থেকে বনের ভেতর দিয়েই এগোব।

যাত্রা শুরুর ইঙ্গিত পেয়ে লাফ দিয়ে গিয়ে আবার টবোগানে চড়ল টিটু। তাকে টেনে নেয়ার পালা এখন ববের। বনের ভেতর দিয়ে চলতে রাস্তার চেয়ে খাটনি কম লাগল। তুষার কম। গাছপালা থাকায় রাস্তার মত পুরু হয়ে পড়তে পারেনি। প্রায় মাইল দেড়েক এগোনোর পর খামারবাড়িটার চালা চোখে পড়ল ওদের।

ডগলাস ফার্ম। বুঝতে পারল, তার কারণ, রাস্তায় গাড়ির চাকার যে দাগ রয়েছে, সেটা শুরু হয়েছে বাড়িটার গেটের কাছ থেকে।

দাঁড়াও, হাত তুলে সবাইকে থামতে ইশারা করল কিশোর। শুনতে পাচ্ছ?

বনের কিনারে যে যেখানে ছিল, মূর্তির মত দাঁড়িয়ে গেল। কান পাতল।

ফার্মের ভেতর থেকে গুঞ্জনের মত একটা শব্দ কানে আসছে। অথচ বাড়িটা নির্জন মনে হচ্ছে। কাউকে চোখে পড়ছে না

তিনজন লোককে গাড়িতে করে চলে যেতে দেখেছে। তাহলে ভেতরে শব্দ হচ্ছে কিসের?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *