০৭. পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে

পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে

শৈশব থেকে আমি যাত্রা করলাম যৌবনের পথে। মন আমার আনন্দে ভরপুর।

আমার বয়স এখন সতেরো। আমি স্কুলের হেড-বয়। উক্টর স্ট্রং আমাকে প্রতিশ্রুতিবান তরুণ পণ্ডিত বলে উল্লেখ করেন। অ্যাগনেস উইকফিল্ডও এখন আর ছোট্ট মেয়েটি নয়! সে এখন আমার পরামর্শদাতা ও বন্ধু। স্কুলের কথা, আমার স্বপ্নের কথা, কি কি আমার ভাল লাগে, কার কার সাথে আমার লড়াই সব আমি ওকে বলেছি।

স্কুল জীবন ফুরিয়ে গেল। এসময় আমার ভবিষ্যৎ জীবন, পেশা ইত্যাদি নিয়ে দাদীর সঙ্গে অনেকবার আলোচনা হলো। কোন বিশেষ পেশার দিকে আমার টান ছিল না। তাই দাদী বললেন মাসখানেক কোথাও বেড়িয়ে আসতে। এতে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্তে আসার সুবিধে হবে। তিনি বললেন ইয়ারমাউথে গিয়ে পেগোটিকে দেখে আসতে। ফেরার পথে লণ্ডনে কয়েকদিন থাকতে।

আমি প্রথমে গেলাম ক্যান্টারবেরিতে। অ্যাগনেস ও মি. উইকফিল্ডের কাছে বিদায় নেয়ার জন্যে। লক্ষ করলাম যে আমি যে কদিন ছিলাম না এর মধ্যে বুড়োর কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। তার হাত কাঁপে, গলার আওয়াজ কাঁপে। চোখে এক ধরনের খ্যাপাটে দৃষ্টি। অ্যাগনেস উদ্বিগ্ন। বাপের এই পরিবর্তন নিয়ে প্রায় আতঙ্কিত।

বিষণ্ণ হৃদয়ে বইপত্র কাপড়-চোপড় গুছিয়ে বাঁধাছাদা করলাম ডোভারে দাদীর বাড়িতে পাঠাবার জন্যে। উরিয়া হীপ খুব উৎসাহ দেখাল এ কাজে আমাকে সাহায্য করতে। মনে হলো আমি চলে যাচ্ছি দেখে সে আসলে খুশি হয়েছে।

লণ্ডনের কোচে চাপলাম। আমি একজন সুশিক্ষিত যুবক। গায়ের পোশাকআশাকও ভাল। পকেটে প্রচুর পয়সা। বছর কয়েক আগে ছেড়া পোশাকে ক্লান্ত অবসন্ন দেহে যে ছেলেটি এই একই পথে পায়ে হেঁটে ডোভারে এসেছিল তার সাথে আজকের এই আমার কি বিরাট পার্থক্য! সালেম হাউসের সামনে দিয়ে যাবার সময় গোপন ইচ্ছা জাগল ভেতরে গিয়ে মি. ক্রিক্‌লকে আচ্ছা করে দিয়ে তার হাতে যে পিটুনি খেয়েছি সেটার প্রতিশোধ নিতে।

চ্যারিংক্রশ-এ কোচ থামল রাতের জন্যে। ডিনারের পরে কফি-রূমে বসে আছি। এমন সময় এক সুশ্রী সুবেশধারী তরুণের দিকে নজর গেল। সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারলাম তাকে। ডাক দিলাম, স্টিয়ারফোর্থ! আমার সঙ্গে কথা বলবে না?

মাই গড! বলে চেঁচিয়ে উঠল সে। আরে, এ যে দেখছি ছোট্ট কপারফিল্ড!

পুরানো স্কুলের বন্ধুকে দেখে ভীষণ খুশি হলাম। আমি একজন তরুণ ভদ্রলোক। না হলে তার গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলতাম। চোখে পানি বেরিয়ে। পড়েছিল, ওটা মুছে ফেললাম। বসলাম দুজনে মুখোমুখি। বললাম সালেম হাউস ছাড়ার পরে আমার জীবনে যা যা ঘটেছে সব। সে-ও বলল তার কাহিনি। সে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্র। এখন চলেছে মায়ের কাছে।

আমি যাচ্ছি ইয়ারমাউথে পেগোটিদের কাছে, বললাম ওকে। তার পরে নিজের ভবিষ্যৎ কাজকর্ম সম্পর্কে পরিকল্পনা করব। আমার সাথে চলো না। ইয়ারমাউথে? দারুণ মজা হবে।

চমৎকার প্রস্তাব! বলল স্টিয়ারফোর্থ। তবে তোমার যদি তাড়া না থাকে, আগে চলো না হাইগেটে আমার বাড়িতে দুএক দিনের জন্যে?

যেতে পারলে খুশিই হব, জবাব দিলাম।

পৌঁছলাম হাইগেটে। একজন বয়স্কা মহিলার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো। মহিলার সুন্দর মুখে গর্বিত ভাব। তিনি স্টিয়ারফোর্থের মা। তার সঙ্গে একজন সহচরী, মিস রোসা ডার্টল। পাতলা, কালো চুলঅলা তরুণী। ঠোঁটে একটা কাটা দাগ। আমি আশ্চর্য হলাম যখন স্টিয়ারফোর্থ বলল যে ওই কাটা দাগটার জন্যে সে-ই দায়ী।

ছোট থাকতে সে একদিন আমাকে খ্যাপায়। আমি একটা হাতুড়ি ছুঁড়ে মারি। দুষ্ট্র একখানা ছিলাম বটে! কিন্তু এসব সত্ত্বেও আমাকে ভালবাসে ও, বলে হাসতে হাসতে মদের গ্লাসটি তুলে ধরল স্টিয়ারফোর্থ। এসো, কপারফিল্ড, অতীতের কথা এখন থাক। এস, আমরা আমাদের যৌথ সফরের উদ্দেশ্যে পান করি।

স্টিয়ারফোর্ধের চাকর লিটিমার একজন ভদ্র-চেহারার লোক। স্টিয়ারফোর্ধের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো থেকেই কাজ করে আসছে। আমার। ওখানে থাকাকালে আমাদের দুজনের ফুট-ফরমাশ পালন করেছে সে। স্টিয়ারফোর্থ আমাকে ঘোড়ায় চড়তে শেখাবে-লিটিমার ঘোড় নিয়ে এল। তরবারি এনে দিল তরবারি চালনা শেখাবার জন্যে। গ্লাক্স এনে দিল স্টিয়ারফোর্থ আমাকে বক্সিং শেখাবে বলে।

ইয়ারমাউথ শহরে পৌঁছে আমরা রাতটা কাটালাম এক হোটেলে। পরদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙার আগেই স্টিয়ারফোর্থ চলে গেল সাগর-তীরে। দেখা করে ভাব জমিয়ে ফেলল শহরের সব নৌকাঅলাদের সঙ্গে, জেলেদের সঙ্গে।

আমি সবে নাস্তা খেতে বসছি-এমন সময় ছুটতে ছুটতে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলল, আমি মি. পেপগাটির জাহাজ-বাড়ি দেখেছি! তুমি যেমন বলেছিলে ঠিক ওই রকম। লোভ হচ্ছিল ভেতরে গিয়ে বলি যে আমি ডেডিভ কপারফিল্ড। এখন বড় হয়ে গেছি বলে চেনা যাচ্ছে না। তারপরে ঠিক করলাম, আগে তোমাকেই যেতে দেয়া উচিত। পুরানো নার্সের সাথে প্রথমে দেখা করা দরকার তোমার। কাজেই যাও এখন পেগোটির বাড়ি। আমি পরে ওখানে তোমার সঙ্গে একত্র হব। তারপর দুজনে মিলে যাব মি, পেগোটির জাহাজ-বাড়িতে।

সাত বছর পেগোটি আমাকে দেখেনি। তবে চিঠিপত্র আমি বরাবরই লিখে এসেছি। তাই যখন ঘা দিলাম তার দরজায়, সে দরজা খুলে দিয়ে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি চান, স্যার?

গলার স্বর যথাসম্ভব পুরুষালি করে জবাব দিলাম, ব্লাণ্ডারস্টোনের এক বাড়ি-কপারফিল্ডদের বাড়ি সম্পর্কে কিছু খবর জানতে চাই। আমাকে চিনতে পারছ না, পেগোটি?

এক পা পিছিয়ে গিয়ে দুহাতে মুখ চেপে কেঁদে উঠল পেগোটি, আমার আদরের খোকা!

আমার পেগোটি! বলে উঠলাম আমি। দুজনে দুজনের বাহু জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম আমরা।

মি. বার্কিস বাতের ব্যথায় কাতর হয়ে পড়ে আছেন বিছানায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও পেগোটির মতই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে তিনি স্বাগত জানালেন আমাকে। কয়েক ঘণ্টা ধরে আমরা অতীতের দিনের কথা—সেই বার্কিস ইচ্ছুক বার্তা পাঠানোর সময়কার কথা বলাবলি করলাম।

কিছুক্ষণ পরে স্টিয়ারফোর্থ এসে যোগ দিল আমাদের সঙ্গে। তার সহজ, প্রাণখোলা হাসি, রসিকতা, শিষ্ট ব্যবহার ও সুন্দর মুখশ্রী মিনিট কয়েকের মধ্যেই পোেটির হৃদয় জয় করল।

আটটায় আমরা চললাম জাহাজ-বাড়িতে মি. পেগোটি, এমিলি এবং হ্যামের সঙ্গে দেখা করতে।

দরজার তালা খোলাই ছিল। তাই নিঃশব্দে প্রবেশ করলাম আমরা। দেখলাম, মি. পেগোটি বসে আছেন আগুনের পাশে। তার সামনে হাতে হাত ধরে বসে এমিলি আর হ্যাম উত্তেজিতভাবে কিছু একটা বলছে। ওদের কথা শুনে হাসি ফুটে উঠেছে বুড়োর মুখে। মিসেস গামিজ হাততালি দিচ্ছেন আনন্দে।

পরমুহূর্তে লাফ দিয়ে দাঁড়াল হ্যাম। চেঁচিয়ে উঠল, মাস্টার ডেভি এসেছে!

ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল সবাই। শুরু হলো হ্যাণ্ডশেক কথা বলা, হাসাহাসি। আমরাও বসে পড়লাম ওদের সঙ্গে আগুনের পাশে। হ্যাম লজ্জায় লাল হয়ে আমাদেরকে বলল যে সে আর এমিলি বিয়ে করতে যাচ্ছে। আমরা অভিনন্দন জানালাম ওদেরকে। তারপর শুরু হলো কথা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। স্টিয়ারফোর্থের গল্প শুনে হাসলাম। স্টিয়ারফোর্থ কথা বলার সময় এমিলি তাকিয়ে রইল তার দিকে। শেষ পর্যন্ত সাহস সঞ্চয় করে এমিলিও আলাপে যোগ দিল আমাদের সঙ্গে।

পরিবারটির, বিশেষভাবে এমিলির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ল স্টিয়ারফোর্থ। এবং পরে এক সময় সে আমাকে বলল যে বর হিসেবে হ্যাম এমিলির উপযুক্ত নয়, তাকে বড় বেশি মাথামোটা মনে হয়।

এই কঠোর মন্তব্যে বিস্মিত হলাম আমি। তবে তার চোখে হাসির ঝিলিক লক্ষ্য করে ধরে নিলাম যে ঠাট্টা করছে সে।

এক পক্ষকালের বেশি কাটালাম আমরা ইয়ার-মাউথে। স্টিয়ারফোর্থ নৌকায় চড়ে প্রায়ই চলে যেত সাগরে মি. পেগোটির সঙ্গে। আমি কয়েকবার ব্লাণ্ডারস্টোনে আমার শৈশবের বাড়িটা দেখে এসেছি। অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে ওখানে। মার্ডস্টোনরা এখন আর ওই বাড়িতে থাকে না। বাগানটা আগাছায় ভরে গেছে। গাছের নিচে মা-বাবা আর খুদে সৎ ভাইটির কবর দেখে বিষাদে ভরে গেছে। আমার মনটা।

একদিন সন্ধ্যায় ব্লাণ্ডারস্টোন থেকে ফিরে স্টিয়ার-ফোর্থকে একা পেলাম মি. পেগোটির বাড়িতে। আগুনের দিকে চেয়ে বসে আছে মুখটা কালো করে।

আমাকে দেখে হাসি ফিরে এল তার মুখে। বলল, আমি একটা নৌকা কিনেছি। আমি না থাকলে মি. পেগোটি ওটা চালাবেন। লিটিমার এসে নতুন পাল লাগিয়ে দেবে এবং নৌকার নতুন নাম দেবে। নামটা হবে ছোট্ট এমিলি।

বুঝলাম না এমন একটি ভাল খবর নিয়ে স্টিয়ার-ফোর্থ অমন মুখ-গোমড়া করে কেন বসে ছিল আগুনের পাশে…তাছাড়া, নৌকার নামই বা কেন দিতে যাচ্ছে ছোট্ট এমিলি!

সেই রাতের পরে পেগোটির বাড়িতে এমিলির এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা হয় আমার। ওর নাম মার্থা। শৈশব থেকে মার্থা আর এমিলি জানে একে অন্যকে। মার্থা কি এক গোলমাল বা বিপদে পড়েছে। এমিলির কাছে এসেছে সাহায্যের আশায়। মাথার কাহিনি শুনে কেঁদে ফেলে এমিলি। নিজের কাছে টাকাকড়ি যা ছিল সব দিয়ে দেয় বেচারি মেয়েটাকে। যাতে, মার্থা লণ্ডনে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *