০৭. ডিসইনটিগ্রেশন মেশিন

ডিসইনটিগ্রেশন মেশিন

মেজাজ একেবারেই ঠিক নেই আজ প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের। রিডিং রূমের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলাম তার বাড়ি-কাঁপানো শুরু গম্ভীর কণ্ঠস্বর:কি পেয়েছেন শুনি? দুবার বললাম রঙ নাম্বার। তারপরেও করছেন। কি ভেবেছেন আপনি? আমার মত একজন বিজ্ঞানীর গবেষণায় এ রকম বাধা আসতেই থাকবে, আর মুখ বুজে তাই সহ্য করব ভেবেছেন? কিছুতেই না! ডাকুন আপনার ম্যানেজারকে। শিক্ষা আজ দিয়েই ছাড়ব।…আপনিই ম্যানেজার? তো ম্যানেজ করা শেখেননি কেন? আপনার গোবরপোরা মাথায় যে বিষয় কস্মিনকালেও ঢুকবে না, সে-রকম একটা গবেষণা থেকে আমাকে তুলে এনে বিরক্ত করা তো শিখেছেন খুব! বুঝেছি, আপনাকে দিয়ে হবে না। ডাকুন, আপনার সুপারিনটেনডেন্টকে।…নেই? না থাকুক। মরুক গিয়ে যেখানে খুশি। কিন্তু শেষবারের মত হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি আপনাকে, ফের যদি আমাকে জ্বালিয়েছেন তো সোজা আদালত দেখিয়ে ছাড়ব। জানেন, পড়শীর মুরগীর কোকর-কো কানের ওপর অত্যাচার, এই রায় দিয়েছে আদালত? টেলিফোনের ক্রিং ক্রিং যে আরও কত বেশি ভয়ানক এই সহজ কথাটা অন্তত নিশ্চয় আপনার মোটা মাথায় ঢুকবে। আর একটিবার যদি আমাকে জ্বালাতন করেছেন তো সোজা আপনার নামে মামলা ঠুকে দেব। তারপর বুঝবেন ঠেলা। দ্বিতীয়বার আর সাবধান করা হবে না, মনে থাকে যেন।

ঠকাস করে ক্রেডলে রিসিভার আছড়ে রাখলেন চ্যালেঞ্জার।

যা থাকে কপালে, ভেবে ঢুকে পড়লাম। ঢুকেই বুঝলাম মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে। রিসিভার রেখে ভয়ঙ্কর গতিতে ঘুরে দাঁড়ালেন চ্যালেঞ্জার। আমাকে দেখে আরও খেপে গেলেন। খাড়া হয়ে উঠল চুল। হাপরের মত ওঠানামা করতে লাগল বিশাল রোমশ বুক। কটমটে, ক্রুদ্ধ, উদ্ধত, ধূসর চোখে আমার আপাদমস্তক একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। প্রমাদ গুণলাম।

শয়তানের গোষ্ঠী! শুরু হয়ে গেল কড়িকাঠ কাঁপানো চিৎকার, কষ্ট করে কামাই করা টাকা ট্যাক্সের পেছনে যাচ্ছে লোকের, আর সেই টাকার কিনা এ ভাবে শ্রাদ্ধ। গাদা গাদা মাইনে নিচ্ছে ব্যাটারা, কাজের বেলায় ঠনঠন, বুড়ো আঙুল নাড়লেন চ্যালেঞ্জার আমার দিকে করে! আর কি বেলাজ, বেহায়া! গালাগাল দিচ্ছি তাও হাসে! গেল আজ সকালটা! গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত আবার এসে হাজির হয়েছ তুমি। মাথামোটা বসটা পাঠিয়েছে বুঝি? ইন্টারভিউ নেয়ার মতলব? দেখো ছেলে, বন্ধুর মত একশোবার এসো এ বাড়িতে, কিছু বলব না। খাতির যত্ন করব। কিন্তু খবরের কাগজের কাজ নিয়ে এলে দূর দূর করে তাড়াব।বোঝা গেছে?

পাগলের মত পকেট হাতড়াচ্ছি আমি। অনেক কাগজের ভিড়ে ম্যাকারডলের চিঠিটা আর হাতে ঠেকছে না কিছুতেই।

আচমকা আরেকটা কি কথা যেন মনে পড়ে গেল চ্যালেঞ্জারের। চেহারা দেখেই বুঝলাম, আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে তার মেজাজ। ভালুকের মত লাফাতে লাফাতে বিরাট সেক্রেটারিয়েট টেবিলটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। পেপার ওয়েট চাপা দেয়া এক টুকরো খবরের কাগজের কাটিং ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে এগিয়ে এলেন। আমার নাকের নিচে কাটিংটা নাড়তে নাড়তে চাপা ভয়ঙ্কর গলায় বললেন, রাত জেগে লিখেছ নিশ্চয়? কষ্ট করে আমার নামটা ঢুকিয়ে দেয়ার জন্যে অজস্র ধন্যবাদ। তোমার চেয়ে বড় গাধা সৃষ্টি হয়েছে আজ পর্যন্ত? যা জানো না সেটা নিয়ে পণ্ডিতি! সোলেন হোফেন শ্লেটসে সম্প্রতি আবিষ্কৃত সরীসৃপদের জীবাশ্ম সম্পর্কে তুমি কি জানো? প্যারাগ্রাফটার শুরু থেকেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে আমার। আহা, কি লেখা! নোবেল প্রাইজ দিয়ে দেয়া  উচিত। প্রফেসর জি. ই. চ্যালেঞ্জার যিনি কিনা এ যুগের শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিকদের অন্যতম…

ঠিকই তো লিখেছি! আপনি কি শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক নন?

আবার মুখে মুখে কথা! চেঁচিয়ে বাড়ি ফাটিয়ে ফেলার অবস্থা করলেন চ্যালেঞ্জার। মুখ ভেংচে বললেন, ঠিকই তো লিখেছি! আমাকে খাটো করে দেখানোর স্পর্ধা কোথায় পেলে? অন্যতম বিজ্ঞানী, হুহ! তা আমার সমকক্ষ আরও দুএকজন বিজ্ঞানীর নাম শুনি তো? সামারলি নিশ্চয় একজন?।

আরে না না, কি যে বলেন, হাত কচলাতে কচলাতে বললাম, উনি বিজ্ঞানী হলেন কবে থেকে?

উনি?

নাহ, শব্দচয়নে কেবলই ভুল হচ্ছে দেখছি! অন্যতম কথাটা লেখা একেবারেই উচিত হয়নি আমার! আসলেই আমি একটা গাধা, ঠিকই বলেছেন।

মন জোগানো কথায় কাজ হলো। খাড়া চুল আবার স্বাভাবিক হয়ে এলো চ্যালেঞ্জারের। কিন্তু নিঃশ্বাসের দ্রুতো কমেনি এখনও।

মাই ডিয়ার, গায়ের জোরে সম্মান আদায় করার জন্যে এমন করছি ভেবো, চেঁচানো বন্ধ হয়েছে চ্যালেঞ্জারের। হুঁশিয়ার থাকতে হয় আমাকে। ব্যাটারা তো সারাক্ষণই আমার পেছনে লেগে আছে, যদি একটু খুঁত বের করতে পারে, দোষ পায়, কেবল এই চেষ্টা। কিন্তু পাবে কোথায়? আমি কি ওদের মত হাদারাম নাকি? দাঁড়িয়ে রইলে কেন? বসো।

এমন আস্তে করে বসলাম চেয়ারটায় যেন কাঁচের তৈরি, ভেঙে যাবে। রাগ পড়েছে চ্যালেঞ্জারের। কোন কারণে এখন যদি আবার রেগে যান তো তোষামোদেও কাজ হবে না। রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আসবেন আমাকে।

চিঠিটা পেয়েছি। অতি সন্তর্পণে খুলতে খুলতে বললাম, মিস্টার ম্যাকারডলের চিঠি। পড়ব? পড়ি?

মিস্টার…মানে সেই ম্যাকারডল? সম্পাদক? মনে পড়েছে, খুব একটা খারাপ না। বজ্জাতদের মধ্যে এ লোকটাই একটু ভাল।

তেল দিতে লাগলাম, আপনার সম্পর্কে তার ধারণা খুব উঁচু। ভীষণ শ্রদ্ধা। কোন কাজে আটকে গেলে, উদ্ধারের অন্য কোনও উপায় না দেখলে, আপনার শরণাপন্ন হন। এটাও তেমন একটা কাজ।

মেজাজ একেবারে নরম হয়ে গেল চ্যালেঞ্জারের। টেবিলে কনুই রেখে, গরিলার মত হাত দুটো ছড়িয়ে দিয়ে, দাড়িতে-ছাওয়া খুঁতনি সামান্য ওপরে তুলে, রোমশ ভুরুর নিচের চোখ দুটো আধবোজা করে এক বিশেষ দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে।

অনেক কষ্টে পেঠফাটা হাসি রোধ করে পড়তে শুরু করলাম:

মিস্টার ম্যালোন,

এক্ষুণি রওনা হয়ে যান। শ্রদ্ধেয় বন্ধু প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে দেখা করে তার সহযোগিতা প্রার্থনা করুন। হ্যাম্পসটেডের হোয়াইট ফ্রায়ার্স ম্যানসনে থিয়োডোর নেমর নামে একজন লাটভিয়ান থাকেন।

ভদ্রলোক বলে বেড়াচ্ছেন একটা অদ্ভুত মেশিন নাকি আবিষ্কার করেছেন। অসাধারণ মেশিন। রেঞ্জের ভেতর থাকলে যে কোন পদার্থকে চোখের নিমেষে উড়িয়ে দিতে পারে। যে কোন পদার্থকে অণু-পরমাণুতে বিশ্লিষ্ট করে দিতে পারে। আবার ফিরিয়ে আনতে পারে আগের অবস্থায়।

মেশিনটার ভয়াবহতা ভেবে দেখুন একবার। এ যুগের চেহারা পাল্টে দিতে পারে। মারাত্মক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। সাময়িকভাবে যে কোন যুদ্ধ জাহাজ বা সৈন্যদলকে অ্যাটম বানিয়ে রেখে দেয়া যাবে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্যে। যে রাষ্ট্রের হাতে থাকবে এই অস্ত্র, পৃথিবীর মালিক হয়ে যাবে তারা। আবিষ্কারটা বিক্রি করতে আগ্রহী নেমর। প্রচার করে বেড়াচ্ছেন। দেখা পেতে অসুবিধে হবে না। সঙ্গে একটা কার্ড দিলাম, বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে এটা দেখালেই নেমরের দেখা পাওয়া যাবে। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, পৃথিবীর স্বার্থে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারকে নিয়ে দেখা করুন তার সাথে। যে লোক এমন মেশিন আবিষ্কার করতে পারেন, তিনি সোজা লোক নন। তাঁকে জব্দ করতে হলে কিংবা বোঝাতে হলে শ্রদ্ধেয় প্রফেসর চ্যালেঞ্জার ছাড়া আর কোন দ্বিতীয় ব্যক্তির কথা মনে পড়ছে না আমার। কিছু করতে পারলেন কিনা আজ রাতেই খবর চাই।

চিঠিটা আবার ভাজ করে রাখতে রাখতে বললাম, আপনাকে ছাড়া কোন উপায় নেই। প্লীজ, প্রফেসর, চলুন!

ঠিকই উপায় নেই। কারণ এমন মেশিনম্যানের বিরোধিতা করা যার-তার কর্ম নয়, প্রসন্ন উদার কণ্ঠে বললেন চ্যালেঞ্জার। বয়েসে কাঁচা হলেও সব সময় দেখে আসছি তোমার বুদ্ধিটা বেশ পাকা। এমনিতেই তো সকালটা মাটি করে দিল টেলিফোন। ব্যাটাদের অত্যাচারে কাজটা আর শেষ করতে পারলাম না। কি কাজ জানো? ইটালির ওই যে জোচ্চোর, নাম-কা-ওয়াস্তে-বিজ্ঞানী ম্যাজোটি, কড়া করে লিখছিলাম তাকে। নিরক্ষীয় উইপোকার শুককীট বৃদ্ধি নিয়ে ওরভুলভাল কেচ্ছার বারোটা বাজাচ্ছিলাম, বাগড়া দিল হতচ্ছাড়া টেলিফোন। তা যাক, রাতে ঝাড়ব ভওটাকে। তা বলো এখন, তোমাকে নিয়ে কি করতে হবে?

আপাতত আমার সঙ্গে থিয়োডোর নেমরের ওখানে গেলেই ধন্য হব, বললাম।

অক্টোবরের সুন্দর সকালে নেমে এলাম মাটির নিচে, সুড়ঙ্গে। চেপে বসলাম টিউব-ট্রেনে। ছুটলাম উত্তর লন্ডনের উদ্দেশে।

পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটা বাড়িতে থাকে থিয়োডোর নেমর। বেল টিপতে দরজা খুলে দিল পুরুষ সেক্রেটারি। সুসজ্জিত ড্রইংরুমে বসাল। আমার দেয়া কার্ডটা নিয়ে ভেতরে চলে গেল।

অপেক্ষা করতে লাগলাম। আধঘণ্টা পেরিয়ে গেল, তবু সেক্রেটারির দেখা নেই। খেপে যাচ্ছেন চ্যালেঞ্জার। শঙ্কিত হয়ে পড়ছি ক্রমেই। আরও দেরি হলে কোন্ কাণ্ড ঘটিয়ে বসেন ঈশ্বরই জানেন। আড়চোখে দেখলাম, চুল খাড়া হয়ে উঠছে তার। আর বোধহয় দুর্ঘটনা ঠেকানো গেল না। ঠিক এই সময় দরজা খুলে ঘরে ঢুকল সেক্রেটারি। ডাকল, আসুন। স্যার দেখা করবেন এবার আপনাদের সাথে।

একটা কড়া কথা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন চ্যালেঞ্জার।

সেক্রেটারির দেখানো পথে এগোলাম।

নেমরের অফিস রূমে ঢোকার সময় আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেল একজন লোক। চকচকে টপহ্যাট মাথায়, ঘন কুঁচকানো ভেড়ার লোমে তৈরি আস্ত্রাখান কোট। সম্পন্ন, বুদ্ধিমান চেহারা দেখে অনুমান করলাম রাজকর্মচারী হবে। সম্ভবত রাশিয়ান।!

আমরা ঘরে ঢুকতে পেছনে দরজা বন্ধ করে দিয়ে সেক্রেটারি চলে গেল। ঘরের ঠিক মাঝখানে বিশাল টেবিলের ওপাশে চেয়ারে বসে আছে নেমর। মোটাসোটা, ভারি শরীর। বিশাল মুখটা দেখলে মাখানো ময়দার তালের কথা মনে পড়ে। রঙও অনেকটা ওরকম। তেলতেলে চামড়া। সারা মুখে ব্রন আর মেচেতার দাগ। চোখের মণি সাদাটে, বেড়ালের চোখের মত। কাটা-কাটা খাড়া কিছু নোম রয়েছে ওপরের ঠোঁটে, নাকের নিচে। গোঁফ। ঠোঁটের কোণ থেকে লালা গড়াচ্ছে। গেরুয়া রঙের সুরুজোড়ার ওপর থেকে আরম্ভ হয়েছে করোটি। এ রকম চওড়া কপাল জীবনে দেখিনি আমি। বিশাল মাথা। সব মিলিয়ে বীভৎস চেহারা।

জেন্টেলমেন, আমাদের সম্বোধন করল নেমর। বসুন। নেমর ডিসইনটিগ্রেটর সম্পর্কে জানতে এসেছেন নিশ্চয়?

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকালাম।

ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে?

না। আমি গেজেট পত্রিকার রিপোর্টার। ইনি বিশ্ববিখ্যাত প্রফেসর চ্যালেঞ্জার।

হ্যাঁ, সত্যি বিখ্যাত, স্বীকার করল নেমর। ইউরোপের সবাই জানে। যাই হোক, যদি মেশিনের ফর্মুলা কিনতে এসে থাকেন, তো বলতেই হবে দেরি করে ফেলেছেন। ঠিক করেছিলাম, আগে যে আসবে তার কাছেই বিক্রি করব। দেরি করে ফেলেছে ব্রিটিশ সরকার। তার দেশে তৈরি হলো যন্ত্রটা, অথচ হাত ফসকে চলে যাচ্ছে অন্যদেশে। যারা নিচ্ছে, তাদেরকে আপনাদের পছন্দ হবে না। কিন্তু কি করব। আপনারা আগে আসেননি।

ফর্মুলা বিক্রি করে দিয়েছেন?

দিয়েছি।

সর্বস্বত্ব প্রথম ক্রেতার?

অবশ্যই।

ফর্মুলাটা আর কেউ জানে না?

আমি আবিষ্কারক। আমি যখন বলিনি, জানার প্রশ্নই ওঠে না।

ক্রেতা নিয়ে গেছে ফর্মুলাটা?

না। পুরো টাকা পরিশোধ করার পর দেয়া হবে, দুআঙুলে চুটকি বাজিয়ে কুৎসিত হাসি হাসল নেমর। তারপর একাধিক যন্ত্র বানিয়ে যা খুশি করুকগে তারা, আমার বলার কিছু নেই। আমি টাকা পেলেই খুশি।

চুপচাপ বসেছিলেন চ্যালেঞ্জার! তীব্র ঘৃণা ফুটে বেরোচ্ছে চোখমুখ থেকে। আর চুপ থাকতে পারলেন না, এক্সকিউজ মি. মিস্টার নেমর। আপনার যন্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ আছে আমার। কেন যেন মনে হচ্ছে, সত্যি কথা বলছেন না। এই তো সেদিন লম্বা লম্বা কথা বলেছে এক ইটালিয়ান জোচ্চোর। অনেক দূর থেকে মাইন ফাটিয়ে দেয়ার চাবিকাঠি নাকি তার হাতের মুঠোয়। গেলাম দেখতে। পরীক্ষা করে দেখা গেল, নাম্বার ওয়ান ফটকাবাজ ব্যাটা। পুনরাবৃত্তির ইতিহাস ভূরি ভূরি আছে। আমি একজন বিজ্ঞানী, জানা আছে আপনার। শুকনো কথা বলে আমাকে গেলানো একটু মুশকিল। প্রমাণ না দেখে কোন কথা বিশ্বাস করি না আমি।

বেড়াল-চোখের বিষদৃষ্টি নিক্ষেপ করল নেমর। কিন্তু বিনয়ে বিগলিত হাসিটা ধরে রাখল খে। ঠোঁটের কোণ থেকে আরও বেশি পরিমাণে লালা গড়াতে লাগল। বলল, আপনার উপযুক্ত কথাই বলেছেন, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার। শুনেছি, আপনাকে ঠকানো যায় না। দুনিয়ার সবাই ঠকলেও আপনাকে ঠকানো অসম্ভব। বুঝতে পারছি, ঠিকই শুনেছি। ঠিক আছে, প্রমাণ দেখাব। আগে যন্ত্রটা সম্পর্কে দুচারটে কথা বলে নিই।

পরীক্ষামূলক মডেল বানিয়েছি এটা। আকারে ছোট। তবে শর্ট রেঞ্জে দারুণ কাজ দেয়। ইচ্ছে করলেই আপনাকে অ্যাটমে পরিণত করতে পারে এই যন্ত্র, নিমেষে আবার ফিরিয়ে আনতেও সক্ষম। কিন্তু যারা এই যন্ত্র কিনছে, তাদের অন্য রকম ইচ্ছে। দুএকজনকে অ্যাটম বানিয়ে মন ভরবে না তাদের। কোটি কোটি টাকা খরচ করবে। বানাবে বিশাল আকারের যন্ত্র। হাতের মুঠোয় পুরবে দুনিয়ার সব মানুষকে।

দেখতে পারি মডেলটা? জানতে চাইলেন চ্যালেঞ্জার।

অবশ্যই। ইচ্ছে করলে নিজের ওপর প্রয়োগ করেও দেখতে পারেন, যদি অবশ্য তেমন সাহস থাকে আপনার।

বাজে কথা বলবেন না! গর্জে উঠলেন চ্যালেঞ্জার। ফালতু কথা শুনতে একদম অভ্যস্ত নই আমি। আমার সাহস নেই তো কি আপনার আছে?

আরে আরে, রাগ করছেন কেন? আমি কি তাই বলেছি নাকি? নিজের শরীরের ওপর যন্ত্রটার কার্যকারিতা যাচাই করার সুযোগ আপনাকে দেব আমি। কিন্তু আরও কয়েকটা কথা শুনে নিন।

জলদি শেষ করুন। আমার সময় কম।

বুঝতে পারছি, যন্ত্রটা দেখার জন্যে অধীর হয়ে উঠেছেন। কিন্তু কি জিনিসে তৈরি এটা, কি উপায়ে কাজ করে, জেনে রাখা ভাল, বিনয়ের অবতার যেন নেমর। দুহাত কচলাচ্ছে। লবণ কিংবা চিনি জাতীয় পদার্থ পানিতে গুলে যায়, এমনকি গুলে যাবার পর ওই পানি দেখে বোঝাও কষ্টকর, সত্যি কিছু মেশানো হয়েছে। আবার ওই পানিকে বাস্পীভূত করে উড়িয়ে দিলে চিনি কিংবা লবণ ফিরে পাওয়া যায়…

এ সব বাচ্চা ছেলের বিজ্ঞান আমাকে শুনিয়ে লাভ নেই, চোখ দুটো কুঁচকে গেছে চ্যালেঞ্জারের। বুঝতে পারলাম, বিপদ আসন্ন।

এত বাধা দিলে কি করে বলি? আগে শুনুনই না, ডান হাতের তর্জনী নাকের ফুটোয় ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ খোঁচাল নেমর। আঙুলটা চোখের সামনে এনে কি বের করেছে দেখতে দেখতে বলল, লবণ আর চিনির এই বিশেষ গুণ দেখেই ভাবতে লাগলাম, মানুষের দেহকে বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে কি আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব?

আপনার ওই আঙুল সরান। বমি করে ফেলব। অত নোংরা মানুষ জীবনে দেখিনি আমি! খসখসে গলায় বললেন চ্যালেঞ্জার। এক হিসেবে আপনার যুক্তি মন্দ নয়। দেহের পরমাণুকে বাতাসে উড়িয়ে দেয়া যেতে পারে হয় তো, কিন্তু আবার ওগুলো ফেরত এনে আস্ত দেহ গঠন একেবারেই অসম্ভব। আমার অন্তত তা-ই মনে হচ্ছে।

এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছি আমি। হাসছেন? হাসুন। কিন্তু এখুনি হাসি মিলিয়ে যাবে আপনার।

সেটাই দেখতে চাইছি।

দেখাচ্ছি। তার আগে আরও একটা কথা জাদুবিদ্যায় অ্যাপোর্ট বলে একটা শব্দ আছে। অলৌকিকভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পদার্থকে ট্রান্সফার করাকে অ্যাপোর্ট বলে। অণু-পরমাণুতে বিশ্নিষ্ট হয়ে পদার্থ ইথারের ভেতর দিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যায়, তারপর আবার আগের অবয়বে ফিরিয়ে আনা হয় ওগুলোকে।

একটা অবাস্তবকে আরেকটা অবাস্তব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, মিস্টার নেমর। অ্যাপোর্টে আমি বিশ্বাস করি না। আমার সময়ের অনেক দাম। আপনার সৃষ্টিছাড়া তত্ত্ব শোনার ধৈর্য বা আগ্রহও আমার নেই। সত্যি সত্যি বানিয়ে থাকলে যন্ত্রটা দেখান, নইলে চললাম, ওঠার উপক্রম করলেন চ্যালেঞ্জার।

অহমিকায় ঘা লাগল থিওডোর নেমরের। তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে ডাকল, আসুন।

ঘরের উল্টোদিকের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল নেমর। চ্যালেঞ্জারের পিছু পিছু আমিও গিয়ে ঢুকলাম। একটা সিড়ির গোড়ায় এসে দাঁড়ালাম। কয়েক ধাপ নেমে শেষ হয়ে গেছে সিড়ি। গোড়ায় আরেকটা দরজা। বন্ধ। বিশাল এক তালা ঝুলছে তাতে। পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুলল নেমর। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।

পেছন পেছন আমরাও ঢুকলাম।

উজ্জ্বল আলো জ্বলছে মস্ত ঘরে। সাদা চুনকাম করা। তামার তারের জন্যে কড়িকাঠ দেখার উপায় নেই। ঝালরের মত ঝুলছে অগুনতি তার। এককোণে মোটা একটা কাটা থামের মাথায় বসানো বিশাল এক প্রিজম। চওড়ায় কাঁচটা এক ফুট, লম্বা তিন ফুট। ডানে দস্তার মঞ্চে বসানো একটা চেয়ার। চেয়ারের হেলানের সঙ্গে কি এক অজানা ধাতুর খুঁটিতে বসানো একটা ধাতব টুপি। অসংখ্য তার বেরিয়ে আছে টুপিটা থেকে। চেয়ারের পাশে একটা ছোট টেবিলে কন্ট্রোল প্যানেল। মিটারের মত একটা জিনিস, তার পাশে হাতল। শূন্যের কোঠায় ঠেকে আছে রাবার-মোড়া হাতলের চিহ্নিত দাগ।

পুরো সেটটা দেখিয়ে বলল নোমর, এটাই নেমর ডিসইনটিগ্রেটর। আর কদিন পরেই পৃথিবী বিখ্যাত হতে চলেছে। কাঁপিয়ে দেবে বহু সিংহাসন, পতন ঘটাবে বহু সরকারের, সারা দুনিয়ায় উল্টে যাবে শক্তির ভারসাম্য। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, আমার সম্পর্কে আমার মেশিন সম্পর্কে অনেক অশোভন উক্তি আপনি করেছেন, সৌজন্যের ধার ধারেননি। আমার রেগে যাওয়াটা স্বাভাবিক। আপনাকে অদৃশ্য করে দিয়ে আর না-ও ফিরিয়ে আনতে পারি। এটা জানার পরও মেশিনের ক্ষমতা নিজের ওপর যাচাই করতে চান? সত্যি সাহস আছে?

সাংঘাতিক খেপে গেলেন চ্যালেঞ্জার। চেয়ারে বসার জন্যে ছুটে গেলেন।

জাপটে ধরে কোনমতে আটকালাম। না, আপনি যেতে পারবেন না! চিৎকার করে বললাম, আপনার জীবনের অনেক দাম। ভয়ঙ্কর ঝুঁকি নিতে যাচ্ছেন। ফিরিয়ে যে আনতে পারবে ওই মেশিন, কি গ্যারান্টি আছে তার? চেয়ার দেখে তো মনে হচ্ছে ডেথচেয়ার!

আমি যাব। তুমি সাক্ষী রইলে। যদি না ফিরিয়ে আনতে পারে ও, তো টুটি টিপে ধরবে। প্রথমে কিলিয়ে ভর্তা বানাবে। তারপর কলার ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাবে আদালতে।

কিন্তু তাতে তো আপনাকে আর ফিরে পাব না। না, আপনি যেতে পারবেন না। অপরিসীম ক্ষতি হয়ে যাবে বিজ্ঞানের। বরং আমি যাচ্ছি।

নিজের বিপদ নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই চ্যালেঞ্জারের। কিন্তু বিজ্ঞানের কথায় একটু দ্বিধায় পড়লেন। এই ফাকে ছুটে গেলাম আমি। সোজা গিয়ে বসে পড়লাম চেয়ারে। হাতলে চাপ দিয়ে ফেলেছে নেমর। কটু করে ছোট্ট একটু আওয়াজ হলো। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে উঠল মাথাটা। পলকের জন্যে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে গেলাম যেন। পরক্ষণে চোখের সামনে থেকে কুয়াশা কেটে গেল। দেখলাম গর্বের হাসিতে কুৎসিত দাঁত বেরিয়ে পড়েছে নেমরের।

চ্যালেঞ্জারের দৃষ্টি উদভ্রান্ত। ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।

কি হলো, চালান মেশিন? তাড়া দিলাম।

চালানো হয়ে গেছে, অমায়িক হাসি হাসল নেমর। খুব ভাল ফল পাওয়া গেছে আপনার ওপর। মিনিট দুই ইথার ভ্রমণ করে আবার ফিরেছেন। এবার প্রফেসর যদি রাজি থাকেন তো তাকেও ঘুরিয়ে আনতে পারি। চ্যালেঞ্জারের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল নেমর।

দারুণ বিচলিত হয়ে পড়েছেন প্রফেসর। তাঁকে এ ভাবে বিচলিত হতে দেখিনি কখনও। লৌহকঠিন স্নায়ু খুঁড়িয়ে গেছে যেন। কাঁপতে কাঁপতে আমার হাত ধরে বললেন, কি সাংঘাতিক, ম্যালোন। অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলে তুমি! যন্ত্রের ওপরের আকাশে কুয়াশার মত কি যেন ভাসছিল!

সত্যিই অদৃশ্য হয়েছিলাম?

ছিলে। সত্যি বলছি, দারুণ ভয় পেয়েছিলাম। হাত-পা একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। তোমাকে ফিরে পাবার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু এলে শেষ পর্যন্ত! যাক… পকেট থেকে রুমাল বের করে রোমশ কপালের ঘাম মুছলেন চ্যালেঞ্জার।

হা-হা করে অট্টহাসি হাসল নেমর। একফোঁটা লালা টপ করে পড়ল শার্টের বুকের কাছটায়। কি হলো, স্যার? এটুকুতেই হাল ছেড়ে দিলেন? চেয়ারে বসবেন না?

জোর করে ভয় তাড়ালেন চ্যালেঞ্জার। আত-তাবটা চোখে লেগেই রইল। কিন্তু তবু সামনে পা বাড়ালেন। হাত বাড়িয়ে দিয়ে আটকালাম। আমার হাত ঠেলে সরিয়ে দিলেন। চেয়ারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। এক মুহূর্ত দ্বিধা করে বসে পড়লেন চেয়ারে। কন্ট্রোল প্যানেলের হাতল ৩-এর ঘরে ঠেলে দিল নেমর। অদৃশ্য হয়ে গেলেন চ্যালেঞ্জার।

ব্যাপারটা ঘটবে, জানা না থাকলে চিঙ্কার দিয়ে উঠতাম।

ইন্টারেস্টিং, না? আমার দিকে তাকিয়ে বলল মের। এ মুহূর্তে ঘরের কোনও এক জায়গায় ইথারে ভাসছে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের দেহ, পরমাণুতে বিশিষ্ট হয়ে। প্রচও ক্ষমতাশালী ওই লোকের জীবন এখন নির্ভর করছে আমার হাতে। ইচ্ছে করলে এই অবস্থায় রেখে দিতে পারি চিরকাল। পৃথিবীর এমন কোন শক্তি নেই তাকে ফিরিয়ে আনতে পারে, আমি ছাড়া।

আমি আপনাকে বাধ্য করতে পারি।

আমার কথাকে পাত্তাই দিল না নেমর। খিকখিক করে শয়তানি হাসি হাসল। জিভ দিয়ে চুকচুক শব্দ করে বলল, আহারে, শূন্যে মিলিয়ে গেলেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার। কি সাংঘাতিক! আহা, যাবার সময়ও যদি একটু ভাল ব্যবহার করে যেতেন, ফিরিয়ে আনার কথা চিন্তা করতাম। তা যাকগে, ওরকম বদমেজাজী মানুষের ফিরে না আসাই ভাল…

খবরদার! চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। একটা লোহার ডাণ্ডা দেখে তুলে নিলাম। জলদি আনুন। নইলে একবাড়িতে মাথা ছাত্ করে দেব! ফাজলামি করার আর জায়গা পাননি!

আহহা, অত চটছেন কেন? ভয় পেল নেমর। তাড়াতাড়ি বলল, একটু মজা করছিলাম। আসলে কি আর আনব না, অতবড় বিজ্ঞানী, কত ক্ষতি হয়ে যাবে দুনিয়ার…সে যাকগে, মেশিনের ক্ষমতা আরও দেখাচ্ছি আপনাকে। কাগজে লেখার প্রচুর মাল পাবেন। আমি পরীক্ষা করে দেখেছি চুল আর দেহের কম্প তরঙ্গ আলাদা। ইচ্ছে করলে জ্যান্ত দেহে চুল লাগাতে পারি, ইচ্ছে করলে বাদ দিতে পারি। গরিলাটাকে লোম ছাড়া দেখতে কেমন লাগে বঙড় দেখতে ইচ্ছে করছে। এটুকু করার সুযোগ অন্তত আমাকে দিন।

হাতলে চাপ দিতে শব্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এলেন চ্যালেঞ্জার। কিন্তু এ কাকে দেখছি! রাগব না হাসব বুঝতে পারলাম না। পেটফাটা হাসি ঠেকাতে পারলাম না কিছুতে। বিশাল মাথায় একটা চুলও নেই! বেটপ খুলিটা দেখলে অ্যালুমিনিয়মের তোড়ানো ঘটির কথা মনে পড়ে। মসৃণ চোয়াল। দাড়ি উধাও হয়ে যাওয়ায় চওড়া চোয়ালটাকে লাগছে বুলউগের চোয়ালের মত।

কন্ট্রোল প্যানেলের হাতল ছেড়ে দিয়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল নেমর।

আমাদের হাসির কারণ বুঝলেন না চ্যালেঞ্জার। ফিরে আসার ধাক্কা সামলাতে পারেননি এখনও। অভ্যাসবশে দাড়িতে হাত বুলাতে গিয়ে দেখেন নেই। চকিতে হাত দিলেন মাথায়। চুল নেই। দুই বাহুর দিকে তাকালেন একেবারে নির্লোম। বুঝে ফেললেন ব্যাপারটা। ভয়ঙ্কর হুঙ্কার ছেড়ে লাফ দিয়ে নেমে এলেন চেয়ার থেকে। দুহাতে নেমরের টুটি টিপে ধরলেন। ওই গরিলা-বাহুর শক্তি আমার জানা। শঙ্কিত হয়ে উঠলাম। নির্ঘাত দম বন্ধ হয়ে মরবে নেমর।

ওকি করছেন, প্রফেসর! প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠলাম, ওকে মেরে ফেললে জীবনে আর চুলদাড়ি ফিরে পাবেন না।

প্রচণ্ড রেগে গেলেও মগজ ঠিকই কাজ করে চ্যালেঞ্জারের। নেমরকে ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়ালেন। ঘরে যন্ত্রপাতির অভাব নেই। বড় একটা রেঞ্চ তুলে নিলেন হাতে। চিলের মত তীক্ষকণ্ঠে চেঁচিয়ে বললেন, ওঠো! পাঁচ মিনিট সময় দিলাম। এর মধ্যে আমার চুলদাড়ি ফেরত না পেলে একটা একটা করে হাড় ভাঙব।

এমনিতেই ভীষণ কুৎসিত চেহারা নেমরের। তার ওপর প্রফেসরের ভয়ঙ্কর চিৎকারে রীতিমত ঘাবড়ে গিয়ে আরও বিকৃত হয়ে গেল। ভয়ে একেবারে কেঁচো। কাঁপতে কাপতে উঠে দাঁড়াল। দ্বিগুণ লালা গড়াচ্ছে এখন ঠোঁটের কোণ বেয়ে।

কেমন লোক আপনি, প্রফেসর! গলায় হাত বুলিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল নেমর। ঠাট্টাও বোঝেন না। মেশিনের ক্ষমতা দেখতে চেয়েছেন, দেখিয়েছি। আপনাকে • শায়েস্তা করার কোন ইচ্ছে আমার ছিল না, বিশ্বাস করুন।

অত ভাল কথা শুনতে চাই না, রেঞ্চ নাচালেন চ্যালেঞ্জার। আমার চুলদাড়ি! আবার গিয়ে চেয়ারে বসলেন। আমার দিকে রেঞ্চটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, নাও, রাখো। একটু এদিক ওদিক দেখলেই সোজা মাথায় বসিয়ে দেবে। একটা ইবলিস কমবে পৃথিবী থেকে।

রেঞ্চটা হাতে নিলাম। তৈরি হয়ে দাঁড়ালাম নেমরের পেছনে।

দেরি কেন? নেমরের দিকে তাকিয়ে ধমকে উঠলেন চ্যালেঞ্জার।

কাঁপা হাতে হাত চেপে ধরল নেমর। চাপ দিতে কটু করে আওয়াজ হলো।

মুহূর্তের জন্যে নেই হয়ে গেলেন চ্যালেঞ্জার। ভাবলাম আবার তাকে অদৃশ্য করে দিয়েছে নেমর। নাকি অন্য কোন ফন্দি? রেঞ্চটা দেব নাকি মাথায় বসিয়ে? আর কয়েক সেকেন্ড দেরি হলে তাই দিতাম। হঠাৎ আবার চেয়ারে দেখা গেল চ্যালেঞ্জারকে। আগের চেহারা। যথাস্থানে ফিরে এসেছে চুলদাড়ি।

দাড়ির জঙ্গল আর চুলের বোঝায় হাত বুলিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে নিলেন চ্যালেঞ্জার। নেমরের দিকে তাকিয়ে মোলায়েম হাসি হাসলেন। বললেন, রসিকতার মাত্রা ছাড়াবেন না আমার সঙ্গে। বেঘোরে প্রাণটা খোয়াবেন। যাই হোক, মেশিনটা যে কাজের, তাতে কোন সন্দেহ নেই আর। কয়েকটা প্রশ্ন করব। জবাব দেবার ইচ্ছে আছে?

মেশিনের শক্তির উৎস কি, এটা বাদে সব প্রশ্নেরই জবাব পাবেন।

ফর্মুলাটা আপনি ছাড়া আর কেউ জানে না, ঠিক বলছেন?

হান্ড্রেড পার্সেন্ট।

অ্যাসিস্ট্যান্টদের কেউ?

কোন অ্যাসিস্ট্যান্ট নেই আমার। একা কাজ করেছি।

হুঁ, চেহারাটা জঘন্য হলে কি হবে, ক্ষমতা আছে আপনার, স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু আপনি ছাড়া তো এ মেশিন আর কেউ চালাতে পারবে না। কাউকে শেখাননি। এর কমার্শিয়াল প্রয়োগ হবে কেমন করে?

বলেছি তো এটা একটা মডেল। একই নক্সায় বড় জিনিস বানানো যাবে। বিদ্যুতের সাহায্যে এমন একটা সার্কিট তৈরি করেছি, যেটা মেশিনের মাঝে নতুন তরঙ্গ সৃষ্টি করছে। এই তরঙ্গের ধাক্কায় ভেঙে পরমাণুতে পরিণত হচ্ছে পদার্থ, আবার উল্টো প্রক্রিয়ায় জোড়া লাগাচ্ছে। মেশিনটায় তরঙ্গ-প্রবাহ ওপরে নিচে প্রবাহিত হয়। এই প্রবাহ পাশাপাশি চালানোও সম্ভব।

যেমন?

যন্ত্রটার দুটো মেরু আছে। বিপরীতধর্মী। ধরা যাক, মেরু দুটো আলাদা করে সাগরে দুটো জাহাজে তুলে দেয়া হলো। মেশিন চালু করে ওই দুটো জাহাজের মাঝে যদি তৃতীয় আরেকটা জাহাজ নিয়ে আসা হয় সঙ্গে সঙ্গে অ্যাটম হয়ে মিলিয়ে যাবে ওটা! যত বড় সৈন্যদলই হোক, এই মেশিনের সাহায্যে তাদেরকে মুহূর্তে উড়িয়ে দেয়া সম্ভব।

এই ফর্মুলা শুধু একটি রাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করছেন? শুধু ওরাই এর মালিক হবে?.

হ্যাঁ। কথা পাকাঁপাকি হয়ে গেছে। টাকাটা হাতে পেলেই ফর্মুলাটা দিয়ে দেব। যোগ্য হাতে পড়লে এ যন্ত্র কি খেল দেখাবে, আশা করি কল্পনা করতে পারছেন? অস্ত্র ব্যবহারে যারা কোন রকম দ্বিধা করে না তাদের কাছেই বিক্রি করেছি এটা। ফলটা হবে সাংঘাতিক, তাই না!

কুৎসিত হাসিতে চকচক করছে নেমরের চোখ। সারা মুখে ছড়িয়ে পড়েছে হাসিটা। কল্পনা করুন, লন্ডন শহরের দুদিকে বসানো আছে বিশাল একটা যন্ত্রের দুই মেরু। বিপুল হারে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে সার্কিটটা চালু করে দেয়া হলো। এর পরের অবস্থা কল্পনা করতে পারেন? টপ করে এক ফোটা লালা গড়িয়ে পড়ল মুখ থেকে। আরও পড়তে যাচ্ছিল, হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে সেটা মুছে হাসতে হাসতে বলল, টেমসের উপত্যকা মসৃণ হয়ে যাবে দাড়ি শেভ করার মত। বিশাল শহরটা হয়ে যাবে ধু-ধু মরু প্রান্তর। কোথাও একটা ঘরবাড়ি, কোন প্রাণী থাকবে না! দারুণ এক দৃশ্য হবে, তাই না?

গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল আমার। এ কি মানুষ না পিশাচ! ঠাণ্ডা ভয়ের স্রোত শিরশির করে নেমে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। আশ্চর্য হলাম দেখে, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার একেবারে নির্বিকার। নেমরের কথায় যেন মজা পাচ্ছেন তিনি। মুচকি মুচকি হাসছেন। আমাকে আরও অবাক করে দিয়ে হাত মেলালেন নেমরের সঙ্গে। মেশিনের পাল্লায় পড়ে পাগল হয়ে গেলেন নাকি চ্যালেঞ্জার!

আপনাকে অভিনন্দন, প্রফেসর থিওডোর মের, ভাব গদগদ গলায় বললেন তিনি। একটা দুর্দান্ত আবিষ্কার করেছেন আপনি! আমার মতে শেষ করে দেয়াই উচিত। এত মানুষ দুনিয়ায় বেঁচে থেকে কি করবে? যত বেশি তত ঝামেলা। কমিয়ে ফেললে আরামে বাস করা যাবে। এই মেশিন পেলে আমি নিজেই মারা শুরু করে দেব।

তারের গোলক-ধাধায় কয়েক সেকেন্ড হাত বোলালেন চ্যালেঞ্জার। আপনমনে বিড়বিড় করলেন, এত সূক্ষ্ম যন্ত্র জীবনে দেখিনি। হঠাৎ কি ভেবে গিয়ে উঠে বসলেন চেয়ারটায়।

খিকখিক করে হাসল মের। আবার ইথার-ভ্রমণের সখ হলো নাকি?

হ্যাঁ।

নেমর হাতলে হাত দিতে যেতেই বাধা দিলেন চ্যালেঞ্জার। এক মিনিট, প্রফেসর। মনে হয় ইলেকট্রিসিটি লীক করছে! কেমন একটা শিরশিরানি ভাব।

থমকে গেল নেমর, অসম্ভব! স্পেশাল ইনসুলেটরে মোড়া প্রতিটি তার। লীক করার প্রশ্নই ওঠে না!

আপনি যা-ই বলেন, করছে, তাড়াতাড়ি চেয়ার থেকে নেমে এলেন চ্যালেঞ্জার। জলদি মেরামত করুন। নইলে বিগড়ে যাবে মেশিন।

উদ্বিগ্ন হলো নেম; তাড়াতাড়ি চেয়ারে গিয়ে বসল। হেলানে পিঠ রেখে চাপ দিয়ে বলল, কই, আমি তো কিছু টের পাচ্ছি না!

কি বলছেন? অবাক হয়ে নেমরের দিকে তাকালেন চ্যালেঞ্জার, পিঠের কাছটায় দেখুন। করছে না শিরশির?

নাহ্, কিচ্ছু টের পাচ্ছি না! পেছন ফিরে তাকাল নেমর। পিঠ ফাঁক করে হেলানের মাঝখানটায় হাত বোলাল।

কট করে আওয়াজ হলো।

উধাও হয়ে গেল নেমর। চেয়ার খালি।

ফিরে তাকালাম চ্যালেঞ্জারের দিকে। মিটিমিটি হাসছেন।

চিৎকার করে উঠলাম, কন্ট্রোল প্যানেলে হাত দিয়েছিলেন নাকি?

হ্যাঁ, শান্তকণ্ঠে বললেন চ্যালেঞ্জার, বোকার মত চাপও দিয়ে ফেলেছি, হাতলে। অ্যাক্সিডেন্ট। হাসিটা লেগেই আছে তার মুখে।

তাকিয়ে দেখলাম, তিন নম্বর খাজে আটকে আছে হাতল।

আমি কি দেখছি বুঝতে পারলেন প্রফেসর। তোমাকে উধাও করার সময় লক্ষ করেছি ওই খাজে হাতল ঠেলে দিয়েছিল মেমর।

ফিরিয়ে এনেছে কয় নম্বরে দিয়ে?

ভুলে গেছি।

বলেন কি! ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম, তাহলে ফেরাবেন কি করে ওকে?

ফেরানোর কি কোন দরকার আছে? আবার হাসলেন চ্যালেঞ্জার।

দরকার আছে মানে!…আ-আপনি…

আমার কথার জবাব দিলেন না প্রফেসর। বিশাল এক হাতুড়ি তুলে নিয়ে এগিয়ে গেলেন। ভ্রাম করে বাড়ি মারলেন যন্ত্রের ধাতব চেয়ারটায়। থামলেন না। পিটিয়ে ভাঙতে ভাঙতে বললেন, এক ভয়ঙ্কর পিশাচের হাত থেকে রক্ষা পেল পৃথিবী। সকালটা শেষ পর্যন্ত ভালই কাটল। নেমরের অদৃশ্য হওয়ার রহস্যটা অমীমাংসিত থেকে যাবে।…জীবনটা বড়ই নীরস। মাঝেমধ্যে এমন টুকরো আনন্দ পাওয়া গেলে মন্দ হয় না।

হাতঘড়ির দিকে তাকালেন চ্যালেঞ্জার। অনেক বেলা হলো। যাওয়া দরকার। ধাপ্পাবাজ ম্যাজোটির গোষ্ঠী উদ্ধার করতে হবে। নইলে মানুষকে বোকা বানাতেই থাকবে। এ সব বাদরদের সুযোগ দেয়া উচিত নয় মোটেও।

বিমূঢ়ের মত রওনা হলাম তার পিছু পিছু। দরজার কাছে গিয়ে ফিরে তাকালাম। ভাঙা চেয়ারের ওপর শূন্যে ভাসছে অতি হালকা কুয়াশার মত কি যেন!

পিশাচই বলুন আর যাই বলুন, আপনি কিন্তু মানুষ খুন করলেন…

না, মানুষ খুন ঠেকিয়েছি। কোটি কোটি লোকের অকালমৃত্যু বন্ধ করেছি। মানবজাতির মস্ত বড় একটা উপকারের জন্যে বরং আমাকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *