০৬-১০. একজন স্টোরকীপার

একজন স্টোরকীপার কোন পার্সেলের মোড়ক হিসেবে যেমন দুমড়ানো বাজে কাগজ ব্যবহার করে ঠিক তেমনি একটা কাগজে পেনসিল দিয়ে বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে একটা মেসেজ:

তুমি যদি স্কাল ক্যানিয়নের ভিতর দিয়ে এক্স টির জন্যে গরু নেয়ার চেষ্টা করো তবে তুমি
গরুগুলো হারাবে।
একজন বন্ধু।

কাগজটা এরফান তার কামরায় দরজার তলা দিয়ে ঢুকানো অবস্থায় পেল। এটা ফিলের ডেজার্ট এজ থেকে ফেরার পর দ্বিতীয় দিনের ঘটনা। কৌতুক মিশ্রিত অবজ্ঞার সাথে সে ভাবছে তার এই অজানা বন্ধুটা কে হতে পারে। এটা ডেলিভারি দেরি করানোর একটা ফন্দিও হতে পারে। নোর্টটা পকেটে ভরে সে বাঙ্কহাউসে হেনডনের খোঁজে গেল।

স্কাল ক্যানিয়ন কি এক্স টি র‍্যাঞ্চে যাওয়ার পথেই পড়ে? হেনডনের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রেখে প্রশ্ন করল ফোরম্যান।

নিশ্চয়, জবাব দিল সে। মাঝামাঝি একটা জায়গায় বাঁক নিয়ে ট্রেইলটা ঘুরে, কিছু রুক্ষ জমি পার হয়ে চূড়ার নিচের ঢাল বেয়ে এগিয়েছে। কিন্তু তা হলেও পথ চলার জন্যে যথেষ্ট ভাল।

সবাইকে জানিয়ে দাও যে আমরা আজকের বদলে কালকে রওনা হব, নির্দেশ দিল জেমস।

আজ রওনা হওয়ার বদলে কাল যাওয়া একই কথা, মন্তব্য করল হেনান।

নড করে বেরিয়ে এসে নিজের ঘোড়া নিয়ে উত্তরে রওনা হলো এরফান। টমি ওর পিছু নিল। ট্রেইলটা এরফান আগে থেকেই দেখে রেখে পরিচিত হয়ে নিতে চাইছে। প্রায় অর্ধেক পথ খোলা জমির ওপর দিয়েই এগিয়েছে ওটা। তারপর হেনডনের কথা মত ট্রেইলটা ঠিকই বাঁক নিয়ে উঁচুনিচু জংলা জমির ভিতর দিয়ে এগোল। টি আর এম র‍্যাঞ্চের মধ্যে মোট দূরত্ব বিশ মাইল। তবে এই ট্রেইলটাও পরিষ্কার ভাবে চিহ্নিত, কারণ ডেজার্ট এজে গরু নেয়ার জন্যে এক্স টি ওই ট্রেইলই ব্যবহার করে।

এরফান খোলা এলাকা ছেড়ে একটা অগভীর ঢালু পথ ধরে এগোচ্ছে, এই সময়ে উপরের রিম থেকে রাইফেলের গর্জনের সাথে বাতাস কেটে একটা বুলেট ওর কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। ও সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া ঘুরিয়ে বিপরীত ঢালের দিকে ছুটল–আরও একটা বুলেট ওর হ্যাটের কার্নিস ফুটো করে বেরিয়ে গেল। ঘোড়া থেকে নেমে ওটাকে একটা গাছের আড়ালে বেধে কুকুরটাকে বসে থাকার। আদেশ দিয়ে রাইফেল হাতে, খোলা জায়গায় বেরিয়ে সে একটা অগভীর গর্ত মত জায়গায় আশ্রয় নিল। ওর চেহারা কঠিন হয়ে উঠেছে, গুপ্তহত্যাকারীর জন্য কোন ক্ষমাই ওর কাছে নেই। রাইফেল তুলে যেদিক থেকে গুলি এসেছে সেই জায়গায় গুলি ছুঁড়ল সে। দশ গজ দূর থেকে জবাব আসায় জেসাপ বুবিল লোকটা ঝুঁকি না নিয়ে আগের জায়গা থেকে সরে গেছে।

তাহলে পালাওনি, এখনও আছ, নিজের মনেই বিড়বিড় করল সে। ভাল, এবার আমি একটা চালাকি খাটাব। হয়ত নিজেকে যত চালাক মনে করছ ততটা চালাক তুমি নও।

ধীরে ধীরে পিছনে সরে ঝোঁপ না নড়িয়ে উঠে দাঁড়াল ও। ঘোড়ার পিঠ থেকে দড়ির গোছাটা নামিয়ে একটা ছোট ঝোঁপের গোড়ায় বেঁধে দূরে সরে গিয়ে দড়ির অন্য প্রান্ত টেনে ঝোপে নাড়া দেয়ার সঙ্গেসঙ্গে ওপাশ থেকে একটা গুলি এলো। ধোয়া লক্ষ্য করে পরপর তিনটে গুলি ছুঁড়ল এরফান। প্রতিটা আগেরটার চেয়ে একটু বায়ে। এবার আর ওদিক থেকে পাল্টা কোন গুলি এলো না। কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে থেকে আবার ঝোপে নাড়া দিল, কিন্তু ওদিক থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেল না। এবার আর একটা গুলি ছুঁড়ল, কিন্তু ওদিক থেকে। কোন সাড়া এলো না। হয় লোকটা মারা পড়েছে, অথবা পালিয়েছে, টমিকে জানাল। উঠে দাঁড়িয়ে দড়ি খুলে নিয়ে ওটা পেঁচিয়ে ঘোড়ার পিঠে ঝুলিয়ে রেখে, ঘোড়াটাকে ঝোঁপের আড়াল দিয়ে হাঁটিয়ে বেসিন ঘুরে ওপাশের রিমে যেখান থেকে গুলি আসছিল, সেখানে পৌঁছল এরফান। ওদের আসতে দেখে গাছের সাথে বাঁধা একটা ঘোড়া ডেকে উঠল। অদূরেই হাত-পা ছড়িয়ে উপুড় হয়ে পড়ে। থাকা লোকটাকে পা দিয়ে ঠেলে চিৎ করে দেখল ওটা মারিও, সেই মেক্সিকান শয়তানটা। গুলিতে ওর গলা ফুটো হয়ে গেছে।

মাস্টারসন ঠিকই সন্দেহ করেছিল, আমারও তা-ই ধারণা ছিল, বিড়বিড় করল এরফান। ভাল, তোমার ব্যাটল স্নেক ধরার দিন শেষ হয়েছে।

লোকটাকে সার্চ করে বিশেষ কিছুই পাওয়া গেল না, কয়েকটা কয়েন, একটা তামাকের থলি, আর একটা অর্ধেক ভেঁড়া কাগজের টুকরা। ওটার শেষ কয়েকটা কথা হচ্ছে:

…তোমার শেষ সুযোগ। কাজ পণ্ড করা আমি সহ্য করি না।
        কালো মাস্ক।

হাহ্, আমি হয়ত নিজের অজান্তেই ওদের পা মাড়িয়ে দিয়েছি, মন্তব্য করল এরফান। কাগজটা যত্ন করে পকেটে রেখে দিল সে।

এবার আততায়ীর রাইফেলটা তুলে নিল। একটা উইনচেস্টার রিপিটার রাইফেল। বাঁটের একপাশে রূপার ছোট ছোট পেরেক গেঁথে দুটো অক্ষর লেখা রয়েছে; জে.এম.।

জ্যাক মাস্টারসন, বিড়বিড় করে বলল সে। এটা এই লোকের কাছে কিভাবে এলো?

মৃত লোকটার পিস্তুল পরীক্ষা করে দেখল ওটা ৪, কিন্তু সে জানে জ্যাক •৪৪ ব্যবহার করত। ওই কার্তুজ উইনচেস্টারেও ব্যবহার করা যায়। সন্দিগ্ধভাবে মাথা নাড়ল এরফান; ব্যস্পারটা ওর ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। ঘোড়ার পিঠে উঠে স্কাল ক্যানিয়নের উদ্দেশে রওনা হলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই ওটা। চিনতে পারল; সরু আর গভীর একটা গালশ (Gulch)। দ্রুত ঢালু হয়ে ওটা নিচে নেমে গেছে। দুপাশের পাথুরে দেয়াল ছোট ছোট আগাছায় ভরা। এক নজর দেখাই ওর জন্যে যথেষ্ট হলো। ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে সে ফিরতি পথ ধরল।

সন্ধ্যায় নিজের কামরায় নিভৃতে বসে লরিকে দিনের সব ঘটনা খুলে বলল ফোরম্যান। কেবল কে যে ওকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল সেটা চেপে গেল। লরির মন্তব্যটা কাউবয়সুলভ হলো।

সে বলল, শুনেছি বোকারা নাকি লাকি হয়।

কথাটা খুবই খাঁটি, নইলে বহু আগেই তোমাকে ডানা পরতে হত, পাল্টা জবাব দিল এরফান।

তোমাকে খোলা জায়গায় পেয়ে দুবার গুলি করেও লাগাতে পারল না, বলে চলল সানসেট। অবশ্য দ্বিতীয় গুলি করার সময়ে তুমি পুরোদমে ছুটছিলে।

অবশ্যই, ফুল তোলার জন্যেও দাঁড়াইনি আমি, হেসে জবাব দিল সে। ওখানে গুপ্তহত্যার শিকার হওয়ার কোন ইচ্ছাই আমার ছিল না।

তাহলে তুমি বলছ স্টিভ আর মাস্টারসন মরতে চেয়েছিল? লরি খোঁচা দিয়ে প্রশ্ন করল।

মাস্টারসন আবার এসে হাজির হতে পারে, নিজের মত প্রকাশ করল ফোরম্যান, যদিও ওর স্বরে তেমন প্রত্যয় নেই।

তুমি ওই বুশওয়্যাকারকে চিনতে পেরেছিলে?

হ্যাঁ, মেক্সিকান মারিও, জবাব দিল সে।

তুমি নিশ্চয় ওকে ওখানেই ফেলে এসেছ? বলল লরি।

না, ওকে আমি গাছে ঝুলিয়ে দিয়ে এসেছি; যেভাবে তোমার বাবাকে ওরা ফেলে গেছিল। ওই গাছে আমি দুটো আঁচড়ের দাগও কেটে এসেছি, ওটা নিয়ে ওরা একটু চিন্তায় পড়বে।

ফোর বির বিরুদ্ধে ভাল প্রতিশোধ, বলল যুবক। তোমাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি, জেমস।

ধন্যবাদের কোন প্রয়োজন নেই; ওই ব্যাটা আমাকে মারার জন্যে গুলি ছুঁড়ছিল, মনে করিয়ে দিল সে। এই আউটফিটের কি খবর?

আমার ধারণা কেবল একজন ছাড়া বাকি আর সবাই ভাল। যে লোকটা সম্প্রতি লাইন ক্যাম্প থেকে ফিরেছে সে বার্টের লোক, ওকে আমি আগেও দেখেছি। ওর নাম গেভার? এরফান মাথা ঝাঁকাল। আগামীকাল তুমি কতজনকে সাথে নিচ্ছে?

আমি সহ ছয়জন, জানাল এরফান। ছোট একটা গরুর দল তাড়িয়ে নিতে এই কয়জনই যথেষ্ট হওয়া উচিত।

কালকে খুব ভোরেই রওনা হতে হবে জানিয়ে লরিকে ঘুমাতে পাঠিয়ে দিল সে।

বার্ট লোকটা সাড়ে হারামজাদা। আমার বিশ্বাস ওর হাতে কোন বিশেষ তুরুপের তাস আছে, বলে বেরিয়ে গেল লরি।

ভোর হওয়ার সাথেই গরু নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ওরা। এরফান ওদের নির্দেশ দিল গরুগুলোকে দাবড়ে নেয়ার কোন প্রয়োজন নেই, ওদের নিজস্ব গতিতেই চলতে দেয়া হবে। হয়ত এক্স টি র‍্যাঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছে ওদের দ্রুত চলার দরকার হতে পারে।

মাইলের পর মাইল অতিক্রম করে চলেছে ওরা। অর্ধেক পথ পার হওয়া। পর্যন্ত কিছুই ঘটল না। স্কাল ক্যানিয়ন থেকে দুমাইল দূরে একটু বিশ্রাম আর খাওয়ার জন্যে ওদের থামাল এরফান। অল্প কিছু খেয়ে নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করার সময়ে ফোরম্যানই লীড দিল। কিন্তু কিছুদূর এগিয়ে ট্রেইল আড়াআড়ি একটা গিরিখাতে মোড় নিল। গেভার বাম দিক থেকে তাড়াতাড়ি ঘোড়া ছুটিয়ে ওর পাশে চলে এলো।

বস, এটা এক্স টি র‍্যাঞ্চে যাওয়ার পথ নয়, চেঁচিয়ে উঠল সে, ওখানে যাওয়ার পথ সোজা স্কাল ক্যানিয়নের ভিতর দিয়ে।

আমি তা জানি, কিন্তু আমার ধারণা এটা বেশি নিরাপদ, ফোরম্যান জবাব দিল। সে এটাও লক্ষ করল যে গেভার তার চতুর চোখ দুটো চট করে নামিয়ে নিল।

ভাল, এটা তোমার মত হতে পারে, কিন্তু এই পথে গরু নিয়ে যাওয়া খুব কঠিন হবে, বেজার চেহারায় বলল সে।

তুমি ভাবছ স্কাল ক্যানিয়ন দিয়ে যাওয়াটাই সহজ হত, না? উদ্দেশ্যমূলক ভাবে প্রশ্ন করল এরফান।

লোকটা বিড়বিড় করে মন্তব্য করল এই ট্রেইলটা খোলা আর নিচু। পরের কয়েক মাইল পথে ওর বক্তব্যই ঠিক প্রমাণিত হলো। অনেক ঝোঁপঝাড় আর বাধা কাটিয়ে ওদের এগোতে হচ্ছে। বেশ খারাপ পথ পেরিয়ে শেষে ওরা একটা খোলা ঘেসো জমিতে এসে পৌঁছল। হঠাৎ পরপর দুটো গুলির শব্দে পিছন ফিরে এরফান দেখল গেভার বোকার মত ওর ধূমায়িত পিস্তলের দিকে চেয়ে আছে। রেগে ঘোড়া ছুটিয়ে ওর কাছে এগিয়ে গেল এরফান।

বিষয়টা কি? প্রশ্ন করল সে। গরুগুলোকে কি স্ট্যামপিড় করাবার চেষ্টা করছ তুমি?

পিস্তলটা পথ চলায় অসুবিধা ঘটাচ্ছিল, তাই ওটা বের করে পরীক্ষা করতে গিয়ে কিভাবে যে গুলি ছুটে গেল তা আমি নিজেও বলতে পারব না, ব্যাখ্যা করল কাউবয়।

ফোরম্যানকে ওই ব্যাখ্যাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো। কিন্তু সে নিশ্চিত যে ইচছা করেই কাজটা করেছে গেভার। লোকটা কি দস্যু দলের সাথে জড়িত? সেটার সম্ভাবনাই বেশি। লোকটার ওপর কড়া নজর রাখল সে এবং সাথে। সাথেই লক্ষ করল ওর গোড়াটা খোড়াচ্ছে।

ঘোড়াটা খোঁড়া হয়ে গেছে; আমি তোমাদের পিছন পিছন পরে আসছি, বিষণ্ণ মুখে বলল রাইডার।

এরফানের মুখ দিয়ে একটা গালি বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে কঠিন স্বরে বলল, না, তুমি আমাদের সাথেই যাবে। ঘোড়ার হাঁটুর ভাঁজ থেকে তোমার বুটের মাথাটা সরিয়ে নিলেই ঘোড়াটার খোঁড়ানো বন্ধ হয়ে যাবে।

আমি মোটেও–

সিধে নও-সেটা আমি জানি, বলে উঠল ফোরম্যান। কাজ সেরে র‍্যাঞ্চে ফেরার পর তুমি যেখানে খুশি যেতে পারো, কিন্তু আপাতত তোমাকে গরুর। সাথেই থাকতে হবে।

আবার সে তার চোখ নামিয়ে নিল।

তিন মাইল ঘুরে তারা ট্রেইলে ফিরে এলো। আমি মিছেই হয়ত বেশি সাবধানতা অবলম্বন করেছিলাম, কিন্তু তোমরা সবাই মিলে আমার সাথে সহযোগিতা করেছ সে-জন্যে ধন্যবাদ। এক্স টিতে পৌঁছা’নোর পরে সে তার লোকজনকে ঘোরা পথ নেয়ার আসল কারণ খুলে বলল। বাকি পথে ওদের আর কোন ঝামেলা পোহাতে হলো না।

এক্স টি র‍্যাঞ্চের টিম একজন মোটাসোটা মাঝবয়সী লোক। সে নিজেই খালি করালের সামনে ওদের স্বাগত জানাল। গরু গুনে করালে ঢুকানোর পর এরফানকে টিম তার র‍্যাঞ্চহাউসে নিয়ে গেল। যাওয়ার আগে সে তার দুজন। কাউহ্যান্ডকে বাকি আর সবার দেখাশোনা করার নির্দেশ দিয়ে গেল।

তোমাদের খাওয়া শেষ হলে তোমরা র‍্যাঞ্চে ফিরে যেয়ো, আমি পরে আসছি, বলল ফোরম্যান। তারপর লরিকে বলল, তোমরা যখন যাওয়ার জন্যে তৈরি হবে আমাকে খবর দিয়ো।

খাওয়া শেষ হলে ওরা দুজন বৈঠকখানায় এসে বসল লেনদেনের কাজটা সারতে। টাকা গুনে নেয়া মাত্র শেষ হয়েছে, এই সময়ে লরি এসে বলল, তোমার লোকজন সবাই যাওয়ার জন্যে তৈরি। কিন্তু আমি থাকছি, টাকা-পয়সা নিয়ে এই এলাকায় তোমার একা যাওয়া ঠিক হবে না।

আমি যেমন আদেশ দিয়েছি সেভাবেই কাজ হবে, জবাব দিল এরফান। আমাকে যখন দেখাশোনার দরকার হবে তখন আমি নিজেই তোমাকে জানাব। গেভার কোন সময়ে গেছে?

লরি অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, তোমাকে কে বলল? যদি আন্দাজ করে থাকো তাহলে বলতেই হবে ভাল আঁচ করেছ তুমি। প্রায় আধঘণ্টা আগে এক ফাঁকে সটকে পড়েছে সে। এরপর আর ওকে আমরা দেখিনি।

লরিকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে গরু বিক্রির টাকার বান্ডিলটা ওর হাতে তুলে দিয়ে ফোরম্যান বলল, এটা দেখাশোনার ভার তোমার ওপর দিলাম। সাবধানে সামলে রেখো।

টাকাটা পকেটে ভরে রাখল যুবক। তারপর শান্ত স্বরে বলল, জেমস তুমি একটা বড় ঝুঁকি নিচ্ছ।

মানুষের জীবনটাই ঝুঁকিতে ভরা, হালকা সুরে বলল সে। যাও, এবার তুমি ওদের সাথেই রওনা হয়ে যাও। কিন্তু সাবধান এই টাকা সম্বন্ধে কারও কাছেই মুখ খোলা চলবে না।

ঘণ্টাখানেক পরে ট্রেইল ধরল এরফান। কিন্তু এবার ঘুরে না গিয়ে সোজা স্কাল ক্যানিয়নের ভিতর দিয়েই এগোল। টিমের সাথে কথা বলার পর ওর মনটা এখন অনেক হালকা ঠেকছে। এই এলাকায় বার্টের যতটা আধিপত্য আছে বলে। ধারণা করেছিল সে, টিমের সাথে কথা বলে বুঝেছে যে আসলে সেটা ঠিক নয়। যদিও এক্স টি র‍্যাঞ্চের মালিককে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় বলেই সে অনুভব করেছে, তবু মারিওকে হত্যা করা বা জ্যাকের রাইফেল পাওয়ার কথা সে টিমকে। জানায়নি। একটা ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় নেমেছে সে, তাই প্রতিটা পদক্ষেপই ওকে। হিসেব করে ফেলতে হচ্ছে। পরে অবশ্য তার মনে হয়েছে আরও খোলাখুলি আলাপ করাই হয়ত ভাল ছিল।

যেন কোন তাড়াই নেই এমন ভাব দেখিয়ে সে ধীর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রায় অন্ধকার হয়ে আসছে, এই সময়ে ক্যানিয়নের সবথেকে সরু এলাকায়। পৌঁছল সে। হঠাৎ একটা বড় পাথরের আড়াল থেকে দুটো ছায়ামূর্তি নড়ে উঠল। হেঁড়ে গলায় একটা আদেশ এলো:

হাত তুলে দাঁড়াও! প্রন্তো! তারপর ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে দাঁড়াও!

অন্ধকার জায়গায় তীক্ষ্ণ নজরে চেয়ে সে দেখল কালো মুখোশ পরা দুটো লোক ওর দিকেই পিস্তল তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। সে হাত তুলে পাদানি থেকে পা ছাড়িয়ে নিয়ে নিচে নেমে পড়ল। ওদের একজন সঙ্গে সঙ্গে এক পা এগিয়ে এসে বলল, মাল বের করো।

তার মানে? জিজ্ঞেস করল এরফান।

এক্স টির টিম নিশ্চয় তোমাকে গরু বিক্রির টাকা দিয়েছে, লোকটা জবাব দিল।

লেজি এমের ফোরম্যান হো হো করে হেসে উঠল। ওটা আমার কাছে নেই, বন্ধু, শান্ত স্বরে বলল সে। আমার এক কর্মচারীর হাতে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি আমি। তোমরা হয়ত ওদের যেতে দেখেছ।

দূর, ব্যাটা মিথ্যে কথা বলছে; ওকে সার্চ করে দেখো, গিল।

তোমার কি কোন বুদ্ধিশুদ্ধি নেই? খেপে উঠল গিল।

আমি বলেছি ওর তল্লাশী নাও-তার মানে সময় নষ্ট কোরো না, তাড়াতাড়ি বলে উঠল অন্যজন। আবার হেসে উঠল এরফান।

চালাক লোক, ব্যঙ্গ করল বন্দি। তোমাকে কে বলেছে যে আমার কাছে ওই টাকা আছে, গেভার?

লোকটা রাগে দাঁত কিড়মিড় করে একটা গালি দিয়ে পিস্তল খাপে ভরে এগিয়ে এসে ওকে ভাল করে সার্চ করে দেখল; এই পুরো সময়টা তার সঙ্গী পিস্তল তাক করে বন্দিকৈ কাভার করে থাকল। টাকা না পেয়ে ওকে ছেড়ে সে এবার ঘোড়ার স্যাডলব্যাগ খুঁজেও কিছুই পেল না।

ওটা এখানেও নেই, বিরক্তির সাথে বলল লোকটা।

সেটা তোমাকে আমি আগেই বলেছিলাম, মিস্টার, হয়ত সত্যবাদী লোকের সাথে তোমার চলাফেরা নেই।

রাগে উন্মত্ত হয়ে লোকটা তার পিস্তল বের করে এরফানের মুখে ঠেসে ধরল। ওইরকম আর একটা মন্তব্য করলে তোমার মাথা চুর করে ছাতু করে দেব আমি।

কিন্তু এখানেই সে ভুলটা করল। মার্চ চালাবার সময়ে জেসাপ যে তার কনুই খুব ধীরে ওদের অজান্তেই কিছুটা নিচে নামিয়েছে, এটা ওদের কেউই খেয়াল করেনি। এবার বাম হাতের ঝটকায় সে ওর পিস্তলের নলটার মুখ একটু দূরে সরিয়ে একই সাথে ডান হাতে প্রচণ্ড একটা ঘুসি বসাল লোকটার সোলার প্লেক্সাসের ওপর। ওই নার্ভ অবশকারী আঘাতে লোকটা দুভাজ হয়ে গেল। তার। সঙ্গী একটা গুলি করে মিস করল। ততক্ষণে এরফান নিজের পিস্তল বের করে তাকে গেঁথে ফেলল। দ্বিতীয় গুলি করার সুযোগ লোকটা আর পেল না। দস্যুরা কি ঘটছে কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক লাফে ঘোড়ার পিঠে উঠে ক্যানিয়ন ধরে দ্রুতবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে অদৃশ্য হলো এরফান।

সেই সন্ধ্যায় লরি যখন ওকে টাকা ফেরত দিতে এলো, তখন এরফান ব্যাখ্যা করল, বুঝলে, লরি, গেভারের স্কাল ক্যানিয়ন দিয়ে আমাদের নিয়ে যাওয়ার অতি মাত্রায় আগ্রহ দেখানোই আমাকে সন্দিগ্ধ করে তোলে। এরপর ওর পিস্তল ঘটনাক্রমে পরপর দুবার অসাবধানে ফুটতে শুনে আমার সন্দেহ হলো ওটা একটা সঙ্কেত। তারপর ওর ঘোড়া খোড়া হলো যেন পিছিয়ে পড়ে ওর সাথীদের সে খবর দিতে পারে। তখন আমি নিশ্চিত হলাম। বুঝলাম আমি একা ফিরব শুনলে সে ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের খবর দিতে আগেই রওনা হবে। গরুগুলো কেড়ে নিতে না পেরে বিক্রির টাকা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা নিশ্চয়ই করবে। ওরা ভাবতেই পারেনি কাউবয়দের কাউকে বিশ্বাস করে আমি টাকা দিতে পারি। তাই ওরা তোমাদের যেতে দেখেও বাধা দেয়নি। ঠিক আমার প্ল্যান অনুযায়ীই সবকিছু ঘটেছে।

ফোরম্যান আর কাউকেই ওর এই অ্যাডভেঞ্চারের কোন কথা জানায়নি, কিন্তু কেউ নিশ্চয় কথা বলেছে, কারণ আউটফিটের সবাই ঘটনাটা জেনে গেছে। তবে এতে ফোরম্যান হিসেবে ওর যোগ্যতায় কোন ঘাটতি পড়েনি।

পরদিন সকালে এরফান দেখল গেভার মিস মাস্টারসনের সাথে কথা বলছে।

গত রাতে তোমার কি হয়েছিল, গেভার? প্রশ্ন করল সে।

আমি এই জুনে সবার আগে রওনা হয়েছিলাম, কারণ আমার ভয় ছিল যে ঘোড়াটা হয়ত আবার খোড়া হয়ে যেতে পারে। ঠিক তাই ঘটল, এই কারণেই আমি আর গতকাল র‍্যাঞ্চে ফিরতে পারিনি।

আমার কামরায় এসে তোমার পাওনা টাকা বুঝে নাও, এরফান এমন সুরে কথাটা বলল, ওর কথা যে সে বিশ্বাস করেনি তা স্পষ্ট বোঝা গেল।

তুমি গেভারকে কেন বরখাস্ত করছ? তীক্ষ্ণ স্বরে জানতে চাইল ফিল। ওর ঘোড়া খোড়া হয়ে গেলে সে কি করবে?

ওকে বিদায় দেয়া হচ্ছে কারণ এমন কয়েকটা কাজ করেছে ট্রেইলে যে আর সবার কাছে তার মুখ দেখাতেও এখন লজ্জা পাবে, কি ঠিক বলিনি, গেভার?

ওর প্রশ্নে মুখ কাঁচুমাচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে শেষে সে নিষ্ঠুর সুরে বলল, যেখানে আমি সবার অপ্রিয়, সেখানে আমিও থাকতে চাই

তোমার যেমন ইচ্ছে, সমর্থন করল এরফান। তবে তুমি লেজি এম থেকে দূরে থেকো, নইলে তোমাকে স্থায়ীভাবেই এখানে থাকতে, হতে পারে-মাটির তলায়।

এক ঝলক আড়চোখে এরফানকে দেখে মেয়েটা বাড়ির ভিতর সোজা নিজের কামরায় ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ওর মনে হচ্ছে সারা দুনিয়ায় যেন কোন বন্ধু নেই।

০৭.

বার বির মালিক তার চেয়ারে বসে একটা চুরুট ধরিয়ে বিতৃষ্ণার সাথে চারপাশের পরিবেশ এক নজর তাকিয়ে দেখল। কামরাটা মূলত পুরুষের একটা ঘর। এলোমেলো আসবাব, নগ্ন মেঝের চার পাশেই ঘোড়ার জিন, রাইফেল, দড়ি, ইত্যাদি অগোছাল ভাবে পড়ে আছে। এর চেয়ে লেজি এমের পরিবেশ অনেক সুন্দর। কিন্তু সংসার গুছানোর প্রতি বার্টের মোটেও মনোযোগ নেই। বিয়ের পর সে লেজি এমেই থাকবে; কিন্তু এখন তার কাছে সেই সুযোগ সুদূর পরাহত বলে মনে হচ্ছে। যে-কাজটা সে খুব সহজ হবে বলে মনে করেছিল, সেটাই জেমসের চালাকিতে পুরো পণ্ড হয়ে গেল। তাছাড়া জ্যাকের হঠাৎ অদৃশ্য হওয়াও নতুন জটিলতার সৃষ্টি করেছে।

ডোভারের আবির্ভাবে ওর গভীর চিন্তায় ছেদ পড়ল। ওই একটা লোকেরই অবাধে র‍্যাঞ্চহাউসে প্রবেশ করার অধিকার আছে। বেজার চেহারার চোখা লোকটা কম কথা বললেও সে তার খুদে চোখে বার্টকে এক নজর দেখেই ওর মৃড় বুঝে নিল। হ্যাটটা টেবিলের ওপর ছুঁড়ে রেখে একটা চেয়ার টেনে বসল সে।

এত দুশ্চিন্তা কিসের, বার্ট? পরে আবার যোগ করল, আমি সেদিন মাস্টারমনের মেয়েকে ডেজার্ট এজে দেখলাম।

সে এমারির সাথে দেখা করতে গেছিল; তার বাবার কাগজপত্র ঘেঁটে দেখতে গিয়ে সে জেনেছিল তাকে ওইরকম নির্দেশই দেয়া হয়েছে, ব্যাখ্যা কাল র‍্যাঞ্চার। বুড়ো গাধাটা জাজ এমারিকেই ওর, অভিভাবক করে গেছে; এখন মেয়েটার তার অনুমতি ছাড়া কোনকিছুই করার উপায় নেই।

শিস দিয়ে উঠল ডোভার। এতে করে তোমাদের বিয়ের ব্যাপারটা বেশ পিছিয়ে গেল। কিন্তু মেয়েটা যদি ওর কথা না শোনে?

তাহলে র‍্যাঞ্চটা সে হারাবে, রাগের সাথে বলল বার্ট।

চতুর বুড়ো কয়োটি, মন্তব্য করল গানম্যান। মেয়েটা যদিও অত্যন্ত সুন্দরী, তবু র‍্যাঞ্চ এমের ফ্রেমে আঁটা অবস্থায় ওকে আরও সুন্দরী দেখাবে।

বার্টের দুশ্চিন্তাটাই যেন ডোভার কথায় প্রকাশ করল। বার্ট মাথা ঝাঁকিয়ে তার সমর্থন জানাল। জ্যাকের কোন খবর পেলে? প্রশ্ন করল র‍্যাঞ্চার।

নাহ্, ওর কোন খবরই নেই। খোঁজ নিয়ে কেবল এটুকু জেনেছি-যে এমারি তোমাকে মোটেও পছন্দ করে না। জানাল সে।

ওটা কি নতুন কোন খবর হলো? রেগে উঠল বার্ট। তুমি আবার কাউকে জানতে দাওনি তো যে আমিই তোমাকে পাঠিয়েছি?

দরকার পড়েনি-সে আগেই জানত। জেমসের কথা জিজ্ঞেস করতেই সে বলল, বাড়ির কাছে খোদ জেমসের কাছ থেকেই আমি ওর সব খবর জানতে পারি-একটা বাও করে হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল।

সমঝদারের মত মাথা ঝাঁকাল বার্ট। কয়েকবারই তার ওই জাজের সাথে আলাপ হয়েছে। ওই হাসি তার পরিচিত।

জেমস গ্রীন ডেজার্ট এজে তেমন পরিচিত নয়। তবে কয়েকবার সে জাজের সাথে দেখা করতে এসেছে-কিন্তু সে যে কোথাকার লোক তা ওরা কেউ বলতে পারল না, বলে চলল ওর গানম্যান। তোমার মনে আছে, ফ্যালান। একজন স্ট্রেঞ্জারের হাতে মারা পড়েছিল? সেই স্ট্রেঞ্জারই হচ্ছে জেমস। ওহ্, এতে কারও কিছু বলার ছিল না, কারণ ওতে ফ্যালানকে সমান সমানেরও বেশি সুযোগ দেয়া হয়েছিল। তাছাড়া মৃত ব্যক্তি ওখানে জনপ্রিয় ছিল না। ওই মৃত্যুতে কেবল ওর পাওনাদাররাই দুঃখিত হয়েছিল।

অর্থাৎ তুমি কি বোঝাতে চাইছ? প্রশ্ন করল বার্ট, কিন্তু ডোভার তার নিজস্ব ভঙ্গিতেই তার পুরো কথা শেষ করল।

কেন যেন ফেরার পথে আমি হার্ভি বোলটনের বাড়ির পাশ দিয়ে সেই পুরোনো ট্রেইল ধরেই আসছিলাম, বলে চলল সে। ওই বড় কটনউড গাছে দেখলাম আবার ফুল ধরেছে-ওই একই ডাল থেকে একটা লাশ ঝুলছে। লাশটাকে নামিয়ে দেখলাম লোকটা মারিও। গলায় গুলি করে লাশটাকে ওখানে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ওই গাছে আঁকা হার্ভির ফোর বি ব্র্যান্ডের মাঝে দিয়ে লম্বা। দুটো দাগও সদ্য কাটা হয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না?

ঘটনা শুনে উত্তেজিত হয়ে বার্ট একটা গালি দিল।

এখন, ফ্যালান আর ওই মেক্সিকান মারিও দুজনই আমাদের সাথে হার্ভিকে ওই গাছে ঝুলানোর কাজে জড়িত ছিল। বাকি রইলাম আমরা পাঁচজন। তুমি, আমি, হেনডন, বুল আর গেভার। এখন এর পরে খাজটা আমাদের মধ্যে কার জন্যে কাটা হবে তাই ভাবছি আমি।

রুক্ষভাবে হেসে উঠল র‍্যাঞ্চার।

এসব হিসেব করে তুমি কি সাহস হারিয়ে আজেবাজে দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু করেছ নাকি, ডোভার? ঠাট্টা করল বার্ট। ওটা দশ বছর আগের ঘটনা; এতদিনে আমাদের কেউ না কেউ যে মারা পড়ব এটাই তো স্বাভাবিক। ওই গ্রীজার (মেক্সিকানদের অবজ্ঞা করে আমেরিকানরা গ্রীজার বলে সম্বোধন করে; তবে এর জবাবে ওরা আমেরিকানদের গ্রিংগো বলে ডাকে। মারিও যে মোটেও জনপ্রিয় ছিল না, একথা সবাই জানে। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, যে লোকটা ওকে মেরেছে সে মারিওকে ঝুলাবার জন্যে.. ওই গাছটাই কেন বেছে। নিল, সেটা সত্যিই মনে কৌতূহল জাগায়। এখন শোনো, ওটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে, আরও জরুরী একটা বিষয় নিয়ে আমাদের ভাবা দরকার। আমি শুনলাম জেমস তার গরু এক্স টিতে পৌঁছে দিয়ে নিরাপদেই টাকা নিয়ে ফিরে গেছে। তাছাড়া সে লেজি এমেও শক্ত হয়ে জমে বসেছে। এই মুহূর্তে তার হাতে র‍্যাঞ্চ চালাবার মত টাকাও আছে। এখন আমরা কি করতে পারি?

ডোভার কিছুক্ষণ সাপের মত অপলক চোখে দেয়ালের দিকে চেয়ে নির্বিকার ভাবে বসে থাকল। ওর চেহারা দেখে কেউ বুঝবে না যে সে ঠাণ্ডা মাথায় কাউকে খুন করার কথা ভাবছে। যখন সে কথা বলল তখনও তার স্বরে তেমন কোন আভাস পাওয়া গেল না।

শেডিকে কাজে লাগাও। পিস্তলে লোকটা ওস্তাদ, তাছাড়া ওকে হোপের কেউ চেনে না। এতে আমাদের কোন হাত আছে তা কেউ বলতে পারবে না।

লোকটার হাত ঠিকই চালু, কিন্তু সে সামনা-সামনি মোকাবেলায় জেমসকে হারাতে পাবে বলে মনে হয় না, মন্তব্য করল বার্ট।

সামনা-সামনি লড়ার কথা কে বলেছে? শেডি ওকে ঠিকই শেষ করতে পারবে, এবং শহরে আমাদের যেমন দখল আছে তাতে আমরা সহজেই ওর নিরাপদে ফেরার ব্যবস্থা করতে পারব।

ওর প্রস্তাবটা ভেবে দেখছে বার্ট। ওর চেহারায় একটা নৃশংস ভাব ফুটে উঠেছে। সিদ্ধান্ত নিতে বেশি দেরি করল না সে।

মনে হচ্ছে তোমার কথাই ঠিক, বলল বার্ট। আমি এর ব্যবস্থা করছি, তাছাড়া জ্যাকের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে জেমসই দায়ীএমন একটা ইঙ্গিত দেয়াতেও কোন ক্ষতি নেই।

ওকে মেরে ফেলাটাই আমাদের জন্যে সবদিক থেকে ভাল হবে, মন্তব্য করল ডোভার। ও এখানে একজন স্ট্রেঞ্জার, তাই সে মারা পড়লে কেউ ওকে নিয়ে মাথা ঘামাবে না। আমি বলছি, লোকটা আমাদের দুজনের জন্যেই একটা অভিশাপ। লোকটা শকুনের খাবারে পরিণত হলে আমি অনেক স্বস্তি পাব।

ট্রেইলের পথে কোন একটা খাঁজে ফেলে দিলে কেউ আর ওকে খুঁজে পাবে না। এই ব্যাপারে কোনরকম বিচার বসানো হোক তা আমি মোটেও চাই না, বলল র‍্যাঞ্চার।

শেষ বিকেলে এগেইন শহরে পৌঁছে এরফান আর লরি হোপ ব্যাঙ্কের সামনে ঘোড়া থামাল। ফোরম্যান দুহাজারের মত ডলার বয়ে বেড়ানোর দায়িত্বটা এড়াতে চাইছে। ব্যাঙ্কের স্টাফ বলতে কেবল ম্যানেজার আর একজন ক্লার্ক। মিস্টার রাস্টন পুবের মানুষ তাই চেষ্টা করেও সে এখানকার পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি। ক্লার্ক একটা কাজে বাইরে যাওয়ায় সে নিজেই ওদের অভ্যর্থনা করতে এগিয়ে এলো। লোকটা বেঁটে আর মোটা, চকচকে টাক আর গোল রিমের চশমা দেখে ওর দিনকাল বিশেষ ভাল যাচ্ছে বলে মনে হয় না। টাকা জমা দেয়া শেষ করে এরফান শহর সম্পর্কে আলাপ শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাঙ্কার নিজের অবস্থান ব্যক্ত করল।

মিস্টার গ্রীন, ব্যবসায়ী হিসেবে আমি নিয়ম করে নিয়েছি, কোন স্থানীয় বিরোধে আমি পক্ষ নিই না, বলল সে। এই ব্যাঙ্ক যে-কোন সম্মানীত ব্যক্তিকেই সমান চোখে দেখে। এই নীতিটাই আমরা মেনে চলি।

বুক ফুলিয়ে কথাটা বলে সে অত্যন্ত আনন্দ পেল। লরি বেশ কষ্ট করে তার হাসি চাপল। এই ধরনের কথা সে বইয়ের বুলি বলেই মনে করে। এরফান ওর কথার জবাবে কি বলে শোনার জন্যে সে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। কিন্তু ওকে খুব নিরাশ হতে হলো।

আমার ধারণা তোমার কথাই ঠিক, স্যার, জবাব দিল সে। বাইরে বেরিয়ে একটা গালি দিল সে। বোঝা মুশকিল লোকটা কি করতে পারে।

যদি কথাটা ওই মোটা লোকটার উদ্দেশে বলে থাকো তবে তুমি ভুল বলেছ, ফোরম্যান বলল। সে যে প্রতিবারই নিরাপদ পথে চলবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

লরি আর কথা না বাড়িয়ে এরুফানের পিছন পিছন ফেনটনের সেলুনে গিয়ে ঢুকল। সেলুনটা পুরোই খালি, কিন্তু বারের পিছন থেকে মালিক আন্তরিক হাসি দিয়ে ওদের অভ্যর্থনা জানাল।

আমি আবার তোমার দেখা পেয়ে সত্যিই খুশি হলাম, বলে সে হাত বাড়িয়ে পিছনের শেলফ থেকে একটা বোতল বের করল। আমি নিজেও এই ব্র্যান্ডের মদ খাই; আশা করি তোমারও স্বাদটা ভাল লাগবে। লেজি এমে তোমার দিন কেমন চলছে?

প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে গ্লাসে চুমুক দিয়ে চেখে দেখে সে জানাল মদটা সত্যিই ভাল। বেশ ভালই কাটছে, অন্তত এখন পর্যন্ত বড় কোন ঝামেলা হয়নি, জানাল সে।

খুশি হয়ে নিজের ঊরুতে একটা চাপড় মেরে আনন্দ প্রকাশ করল ফেনটন। আমি তোমার মত একটা লোকের অপেক্ষাতেই দিন গুনছিলাম-এই শহরে তোমার মত একজন লোকেরই খুব দরকার, বলল সে।

একজন লোক বিশজনের বিরুদ্ধে জিততে পারবে না, চোখে কৌতুক নিয়ে বলল এয়ফান।

ঠিক আছে, কথাটা আমি বলেছি এবং ফিরিয়েও নিচ্ছি না, দাঁত বের করে হেসে বলল সে। কিন্তু উপযুক্ত একটা লোকের পিছনে যদি ভাল কিছু লোক থাকে, তবে বিশজন কেন, চল্লিশজন লোককেও হারানো সম্ভব, বুঝলে?

নিশ্চয়, ওকে সমর্থন করল এরফান। এক্স টি র‍্যাঞ্চের টিম কি ওদের। একজন হতে পারে?

অবশ্যই, ওর মত সৎ লোক আজকাল কমই দেখা যায়; তাছাড়া তার কিছু ভাল বন্ধুবান্ধবও আছে। ওর সাথে তোমার কথা হয়েছে? আরে, আমি তো ভুলেই গেছিলাম-তুমি তোমার গরুর পাল নিয়ে নিরাপদেই এক্স টিতে পৌঁছে দিয়েছিলে। তুমি তা পারবে না মনে করে হোপে সবাই এক ডলারে তিন ডলার দেয়ার বাজি ধরেছিল।

খবরটা নীরবেই হজম করল এরফান। কালো মুখোশ দলের কেউ কেউ যারা প্রায়ই শহরে আসে তারা কি আগে থেকেই জানত যে ডাকাত দল গরু ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে? নাকি এটা নিছক বাজি ধরার একটা সুযোগ পেয়েই ঝুঁকি নেয়া? একটা ব্যাপার এতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, কেউ লেজি এমে কি কি ঘটছে তার ওপর কড়া নজর রাখছে।

চূড়ার কাছে যে ডাকাতের দলটা রয়েছে, তাদের কেউ ঘাটাতে চায় না। বলে মনে হচ্ছে, কথার ছলে বলল এরফান।

হোপের কাউকে ওরা কখনও উত্যক্ত করেনি; তাছাড়া এই শহরের শেরিফ কখনও কাজের খোঁজে নিজের চোখ খারাপ করতে নারাজ, জবাব দিল সেলুন মালিক।

আমাকে ভাল মানুষ খুঁজে দেয়ার ভার তোমাকেই দিলাম, বলে ফেনটন বার ছেড়ে বেরিয়ে এলো ফোরম্যান।

তোমার যখনই প্রয়োজন তখনই ওদের তুমি যুদ্ধের জন্যে তৈরি পাবে, আশ্বাস দিল ফেনটন। 

রাস্তায় বেরিয়ে র‍্যাঞ্চের রসদের জন্যে পাশের দোকানেই ঢুকল এরফান। শুকনো পাতলা আইরিশ মালিক চোখ পিটপিট করে ওদের দেখল।

হ্যাঁ, এই দোকান থেকেই মিস্টার মাস্টারসন সব সময়ে মাল কিনত, এরফানের একটা প্রশ্নের জবাবে জানাল সে। কিন্তু তোমার কাছে কোন মাল বিক্রি করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে।

তাহলে আমাকে বাধ্য হয়ে রবার্টসের দোকানেই যেতে হবে, রাগের স্বরে বলল ফোরম্যান।

হেসে উঠল, দোকানি। ওখানে গিয়েও তোমার কোন লাভ হবে না। লোকটার সবকিছুর মালিক হচ্ছে বার্ট। ওকেও নিশ্চয় একই নির্দেশ দিয়েছে বার্ট।

তাহলে ডেজার্ট এজের ব্যবসায়ীরাই আমার ব্যবসা পাবে, সে জবাব দিল।

আরে, শান্ত হও, হেসে বলল আইরিশম্যান! আমাকে ওরা আদেশ দিয়েছে বটে, কিন্তু সেটা মানা না মানা আমার ওপর। পাশের বারের ফেনটন আমার বন্ধু। আর বার্টের থেকে এই প্রথম আমি এই ধরনের কোন নির্দেশ পেলাম। ওর আদেশ আমি মানি না-এখন বলো তোমার কি কি প্রয়োজন।

দরকারী জিনিসের লিস্ট দিয়ে পরদিন মাল নেয়ার জন্যে লোক আর, গাড়ি পাঠাবে জানিয়ে বিদায় নিল এরফান।

এই শহরবাসীদের আমি যতটা পোষা মনে করেছিলাম এখন দেখছি সেটা ঠিক নয়; এখানেও কিছু মানুষের মেরুদণ্ড আছে।

না, এখানেও কিছু শক্ত মানুষ আছে, স্বীকার করল লরি।

গুণ্ডাদের আস্তানা, কাম এগেইন সেলুনটা এই ছোট শহরের তুলনায় অনেক বড় আর বিলাসী। বার এবং ডান্স-ইল, দুটোই বড় বড় গিল্টি করা আয়না বসিয়ে সুসজ্জিত করা হয়েছে। আসবাবপত্রও বেশ উন্নত মানের। লম্বা বারে হরেক রকম, মদের সমাবেশ রয়েছে। সদর দরজার বিপরীতেই বার। মাঝের অংশে বেশ কিছু টেবিল আর চেয়ার বসানো হয়েছে। এরফান যখন একা। ভিতরে ঢুকল তখন চেয়ারগুলো বেশিরভাগই দখল হয়ে গেছে। ধীর পায়ে এগিয়ে বারে দাঁড়িয়ে সে একটা ড্রিঙ্কের অর্ডার দিল। অলস ভাবে গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে লোকগুলোর দিকে নজর দিল সে।

বুঝল তার ওখানে উপস্থিতিতে বিভিন্ন মন্তব্যের ফিসফিসানি চলছে ওদের মধ্যে। কেউ কেউ আড়চোখে ওর দিকে তাকাচ্ছে। কেবল একটা লালচে মুখের কাউহ্যান্ড, যে ঠিক তার পরপরই বারে ঢুকেছে, তারই যেন ওর প্রতি কোন আগ্রহ নেই। লোকটা বারের অন্য মাথায় দাঁড়িয়ে মদের গ্লাটাকে দুহাতে। জড়িয়ে এমন আদর করছে যেন বহুদিন পরে সে তার হারানো প্রেমিকাকে খুঁজে পেয়েছে। অথচ তার চেহারা দেখে মনে হয় না বেশিক্ষণ ওদের ছাড়াছাড়ি হয়েছে। বারের অন্য মাথায় পাগলা মার্টি আর ডোভার বার্টের সাথে কথা বলছিল। কিন্তু প্রায় সাথে সাথেই মার্টি বিদায় নিল।

হঠাৎ এরফানের মাথায় চিন্তা এলো, ফেনটনের “ভাল লোক” এখানে। কতজন উপস্থিত আছে। সে নিজেও জানে না তার মাথায় বার্টের প্রধান, আস্তানায় এভাবে হানা দেয়ার ইচ্ছা কেন জাগল। এতে শুধু ওকে উপেক্ষাই দেখানো হলো না, এটা নাটকের চূড়ান্ত উত্তেজনাময় একটা দৃশ্যও বটে। তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটবে বলে আশা করছে না ও, কিন্তু ওর ধারণা জরুরী কিছু তথ্য হয়ত এখানে পাওয়া যেতে পারে। তুমুল বাকবিতণ্ডার পর লরি এখানে ঢুকতে অস্বীকার করেছিল। ওকে চুপিচুপি দরজা দিয়ে ঢুকতে দেখে নিজের মনেই একটু হাসল এরফান।

যেসব লোক তাদের সারাটা জীবন বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে কাটিয়েছে, সহজাত প্রবৃত্তি আসন্ন বিপদ সম্পর্কে তাদের আগেই সাবধান করে দেয়। সেলুনে ঢোকার পর বেশিক্ষণ কাটেনি, এরই মধ্যে এরফান টের পেল একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। মার্টির চট করে ওভাবে সরে পড়া সবাই কাপুরুষতার লক্ষণ বলেই মনে করবে। তাই নেহাত জরুরী কোন ব্যাপার না হলে সে নিজের সম্মান ক্ষুণ্ণ করে সটকে পড়ত না। বারে হেলান দিয়ে তর্করত দুজন বার বি লোকের ওপর নজর রাখল এরফান। কোন ঝামেলা এলে ওদিক থেকেই আসবে। কিন্তু বার্ট আর ডোভারের ওপর নজর রাখতে গিয়ে সে নতুন একজন খদ্দেরের সেলুনে ঢোকা খেয়াল করল না। লোকটা আর কোন দিকে খেয়াল না করে সোজা এগিয়ে লেজি এমের ফোরম্যান থেকে মাত্র দুই গজ দূরে পিছনে এসে দাঁড়াল।

নতুন লোকটা লক্ষ করার অযোগ্য মোটেও নয়। চওড়া আর পুষ্ট হওয়ায় ওকে যতটা নয় তার চেয়ে খাটো দেখায়। পরনে রেঞ্জে কাজ করার পোশাক, কিন্তু দুপাশে ঊরুর সাথে ফিতে দিয়ে বাঁধা দুটো পিস্তল ঝুলছে। ডান হাতের লম্বা আঙুলগুলো রোদে পুড়ে বাদামী হয়েছে। এরফান লক্ষ না করলেও লরি ওকে তীক্ষ্ণ চোখে খুঁটিয়ে দেখছে।

লোকটাকে আমি আগেও কোথায় যেন দেখেছি, ভাবছে লরি, ও যে একজন খুনী পিস্তলবাজ তাতে কোন সন্দেহ নেই। ও ডান হাতে কখনও গ্লাভস পরে না এটা ওর হাতের রং দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু লোকটা এখানে কি করছে?

লোকটার ভারী চেহারা, চৌকো চোয়াল, নোংরা হলুদ চামড়া, নিচের দিকে নামানো গোঁফ, আর সাদাটে ঠাণ্ডা চোখ, এসব দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় সে। এককথায় নিষ্ঠুর একটা মানুষ।

লরি বারে গিয়ে একটা চুরুট কিনে ধরিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বারে উপস্থিত সবার ওপর একবার চোখ বুলাল।

লোকটা কার পিছনে লাগতে এসেছে? আমি বাজি ধরে বলতে পারি এখানে শীঘ্রি একটা কিছু ঘটবে, ভাবল সে।

এই সময়ে শেরিফকে ঢুকতে দেখে আবার ভাবল হয়ত শেরিফ এসে পড়ায় লোকটা আর ঝামেলা করতে সাহস পাবে না। শেরিফের পিছনে মাটিও বারে ঢুকে সোজা বার বির দুজনের দিকে এগিয়ে ওদের সাথে মিলিত হলো। ব্ল্যাক বার্ট এবার বারে এসে বলল, ফ্রেড, আমাদের জন্যে ড্রিঙ্ক ঢেলে দাও।

ওদের জন্যে জায়গা ছেড়ে দিতে এরফানকে বাধ্য হয়ে কিছুটা সরতে হলো। এতে যার উপস্থিতি সম্পর্কে সে সচেতন ছিল না তার কাছাকাছি পৌঁছে গেল এরফান। এরপরেই একটা গ্লাস ভাঙার শব্দ শোনা গেল।

ড্যাম ইউ, আনাড়ি কাউপাঞ্চার। আমার পা মাড়িয়ে দেয়ার জন্যে তোমাকে আমি উচিত শিক্ষা দেব, ওর পিছন থেকে কেউ রুক্ষ স্বরে বলে উঠল। এবং একই সাথে একটা শক্ত গোল কিছুর স্পর্শ অনুভব করল সে তার শিরদাঁড়ার ওপর। একটু নড়লেই তোমাকে আমি দুটুকরো করে ফেলব! হুমকি দিল লোকটা।

আড়ষ্ট হলো এরফান। শক্ত গোলাকার জিনিসটা যে কি জানে ও। এবং লোকটার কর্কশ স্বর শুনে সে এটাও টের পেয়েছে যে ওকে নিছক ভয় দেখাবার জন্যে কথাটা বলা হয়নি। একটু নড়লেই ওর মরণ অনিবার্য। বার্টের ওপর ওর চোখ পড়ল, দেখল লোকটার চোখ আনন্দে আর কৌতুকে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। পুরো কামরাটা এখন একটা নীরব উত্তেজনায় ভরা। তাস ফেঁটা আর বাজি ধরাও এখন বন্ধ।

খবরদার! আরেকটা স্বর শোনা গেল। আমি তিন গোনার আগে পিস্তল ফেলে না দিলে তুমিই মরবে। এক…দুই…

লোকটা কাঁধের ওপর দিয়ে আড়চোখে এক নজর চেয়ে দেখল বক্তা একজন তরুণ কাউবয়। সে-ই কথাটা বলেছে। নেশা ছুটে গেল তার। কারণ তরুণ হলেও কাউবয়ের নীল চোখদুটো কঠিন ইস্পাতের মত কঠিন আর ঠাণ্ডা; আর ঠোঁটের চুরুটটা চেহারায় এমন একটা ভাব এনেছে যাতে ওকে বয়সের তুলনায় অনেক বেশি অভিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। লোকটার পিস্তল শব্দ তুলে মেঝের ওপর পড়ল।

ঠিক আছে, জেমস, ওর বিষদাঁত আমি তুলে দিয়েছি, বাকিটা এখন তুমি সামলাও।

লরির পিস্তলের তাক অবিচল রয়েছে। বিদ্যুৎ গতিতে ঘুরে হুমকি প্রদানকারীর বাম চোয়ালে দেহের সব শক্তি নিয়োগ করে একটা প্রচণ্ড ঘুসি বসাল এরফান। ওই জোরালো ঘুসি খেয়ে লোকটা মাটি ছেড়ে শূন্যে উড়ে একটা জুয়ার টেবিল ভেঙে নিচে পড়ল। দুজন লোক লাফিয়ে উল্টো ডিগবাজি দিয়ে চমৎকার ভাবে চেয়ার ছেড়ে সরে গেল। শেরিফ টেলরের ফোলা মুখ আর খুদে চোখ দেখে বোঝাই যায় না লোকটা এমন তর্জন-গর্জন করুতে পারে।

তোমার মতলবটা কি? হুঙ্কার দিল সে। এখানে এসে শান্তি ভঙ্গ করে সম্মানিত খদ্দেরের সাথে মারপিট করছ! আমার তো ইচ্ছা করছে।

তুমি অযথা বড়াই করছ, শেরিফ। আমার তো মনে হয় না তোমার এতটা সাহস আছে, পাল্টা জবাব দিল এরফান। দর্শকের মধ্যে খিকখিক করে হাসির শব্দ উঠল যেটা শেরিফকে আরও খেপিয়ে তুলল। অবশ্য আমি জানতাম না ওই লোকটা তোমার বন্ধু।

বন্ধু না ছাই-ওকে আগে কখনও দেখিনি আমি, জবাব দিল শেরিফ। কিন্তু আমিই এই শহরের আইন রক্ষক-

তুমি কি তোমার কাজে একটু বেশি দেরি করে ফেললে না? ব্যঙ্গ করে বলল লেজি এম ফোরম্যান। ওই লোকটা যখন আমার পিঠে পিস্তল ঠেসে ধরেছিল তখন কি তুমি চোখে ঠুলি পরে ছিলে?

আমি দেখেছি তুমি ইচ্ছে করে ওর পা মাড়িয়ে ওর ড্রিঙ্ক ফেলে দিয়েছ, খেপে উঠে বলল,শেরিফ। তোমাকে সে যদি মেরে ফেলুত তবে তোমার উচিত সাজাই হত।

দর্শকের চক্রের দিকে চেয়ে হাসল এরফান।

তোমার চোখ পরীক্ষা করিয়ে নেয়া দরকার, শেরিফ, বলল সে। নইলে ওটাই একদিন তোমার কাল হয়ে দাঁড়াবে। তারপর ওর চেহারা থেকে হাসিটা মুছে গেল। আমি জীবনে অনেক শেরিফ আর মার্শাল দেখেছি, কিন্তু অযোগ্যতার দিক দিয়ে তুমিই সবার শীর্ষে, তিক্ত স্বরে বলল সে। এই শহরের লোকেরা কি আর মানুষ খুঁজে পেল না যে মরুভূমি থেকে একটা বিষাক্ত ব্যাঙ ধরে এনে তার বুকেই একটা স্টার ঝুলিয়ে দিল?

রাগে শেরিফের গাল দুটো আরও ফুলে উঠল, চেহারা ফেকাসে হলো, এবং খুদে চোখ দুটো আরও ছোট হয়ে গিয়ে তাকে এখন অনেকটা ব্যাঙের মতই দেখাচ্ছে।

তুমি আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়ে আইনকে অপমান করছ! চেঁচিয়ে উঠল টেলর।

মরিয়া হয়ে সে পিস্তলের বাঁটে হাত রেখে স্বরটাকে যতটা সম্ভব বিশ্বাসযোগ্য রাখার চেষ্টা করে সে বলল, হাত তুলে দাঁড়াও, আমি তোমাকে গ্রেপ্তার করছি।

সহজ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ওর মুখের ওপর হাসল এরফান। তুমি ওই কামানটা বের করার আগেই তোমাকে আমি গুলিতে ঝাঁঝরা করে ফেলতে পারি, তা জানো? উল্লসিত স্বরে বলল সে। শোনো শেরিফ, আমি তোমাকে একটা ভাল প্রস্তাব দিচ্ছি। এক প্যাকেট নতুন তাস আনাও, আমরা দুজনেই একবার করে কাটার সুযোগ পাব। যার তাসটা বড় সেই প্রথমে গুলি করার সুযোগ পাবে। তুমি জিতলে মাত্র দুই কদম দূর থেকে গুলি ছুঁড়বে। ওই দূরত্ব থেকে তোমার মত মানুষও মিস করতে পারবে না। ওটা তোমাকে সমান সমান সুযোগ দেবে। তুমি কি বলো?

শেরিফের চেহারা ওই অদ্ভুত প্রস্তাবে দৃশ্যত পার হলো। সে ধাপ্পা দিতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে। চট করে দর্শকদের ওপর তার চোখ একবার ঘুরে গেল, ওদের চেহারায় কৌতূহল ছাড়া আর কিছু দেখতে পেল না সে। সে যদি জেমসকে গ্রেপ্তার করার জন্যে ওদের সাহায্য চায় তাহলে আরও জলদি মৃত্যু হবে তার-এটা সে গ্রীনের চোখ দেখে স্পষ্ট আঁচ করতে পারছে। কিন্তু অন্যদিকে নিছক তাস কাটার ভাগ্যের ওপর তার বাঁচা-মরা নির্ভর করছে। এরফানের নির্ভীক চেহারার দিকে চেয়ে বুঝতে পারছে যে সে-ই হারবে। হঠাৎ তার মাথায় একটা ফাঁক ধরা পড়ল; সে বলে উঠল, তুমি ভাল করেই জানো যে এটা পরে থাকা অবস্থায় তোমার বিরুদ্ধে ওই শর্তে আমি আইনত লড়তে পারি না, ব্যাজ স্পর্শ করে দেখাল টেলর।

ওটা কি তোমার, চামড়ার সাথে সেলাই করা আছে? এরফান প্রশ্ন করল। তারপর আবার বলল, ভাল, আমি জানতাম তুমি ওই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে নিজেকে বাচাবার জন্যে কোন গর্তে ঢুকবে। কিন্তু আমি যে ভাওতা দিইনি সেটা প্রমাণ করার জন্যে আমার শর্তটা তোমার যেকোন বন্ধুর জন্যেও জারি থাকল।

আক্রমণকারীর অচেতন দেহটার দিকে ইঙ্গিত করল, এরফান। কিন্তু ওর চোখ বার্টের ওপর স্থির হয়ে আছে। বার বির মালিক কাঁধ উঁচিয়ে বলল, ওই লোকটা আমার কাছে স্ট্রেঞ্জার। নিজের লড়াই আমার নিজস্ব পদ্ধতিতে আমি নিজেই লড়ি।

সেটা আমিও শুনেছি, মন্তব্য করল এরফান। কিন্তু ওর অবজ্ঞা প্রকটভাবে প্রকাশিত হলো হাসিতে। ওই লোকটার জ্ঞান ফিরে এলে ওকে জানিয়ে আমাকে কোথায় পাওয়া যাবে, বার রক্ষককে কথাটা বলে সোজা পিছন ফিরে ঘুরে সে বাইরে বেরিয়ে এলো।

শহর ছেড়ে অল্প এগিয়ে লরির জন্যে অপেক্ষায় থাকল এরফান। ওকে বেশি দেরি করতে হলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে জোরে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে হাজির হলো। এরফান ওকে ধন্যবাদ জানালে সে লজ্জা পেয়ে বলল, ধন্যবাদের কোন প্রয়োজন নেই। আমি পুরো ব্যাপারটা লক্ষ করেছি, ওটা ছিল তোমাকে ফাঁদে ফেলার একটা কৌশল। তুমি ওকে স্পর্শও করোনি, সে ইচ্ছে করেই নিজের গ্লাস ভেঙে তোমার ওপর পা মাড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ এনেছিল ওরা সবাই মিলে যুক্তি করেই এটা করেছে। ওকে দেখে চেনাচেনা মনে হলেও প্রথমে চিনতে পারিনি আমি। ও একজন পেশাদার গানম্যান। ওর পুরো নাম শ্যাডওয়ার্থ, কিন্তু সে শেডি নামেই বেশি পরিচিত। তুমি বোকার মত তাস কাটার বাজি ধরেছিলে কেন? যদি শেরিফ তাতে রাজি হত তাহলে তুমি হারলে কি করতে?

হেসে উঠল ফোরম্যান। আমি জানতাম লোকটার মেরুদণ্ড বলতে কিছু নেই। বারের সবাই জানে আমার চ্যালেঞ্জটার উদ্দেশ্য ছিল বার্ট। আমি জানতাম। তাস কাটায় আমার হারার কোনই সম্ভাবনা নেই-তাই আমি নতুন প্যাকেট তাস। আনাতে চেয়েছি। নতুন প্যাকেট তাসের টেক্কাগুলো বেশি পিছল থাকে। তাই টেক্কা চিনতে পিছন দিক থেকেও আমার কোন অসুবিধা হত না।

ঠিক আছে, প্রফেসর, আজ আমি তোমার কাছ থেকে নতুন কিছু শিখলাম।

০৮.

লেজি এম রাঞ্চে ফিলের দিন দুঃসহ ভাবে কাটছে। একের পর এক যতই দিন যাচ্ছে, বাবাকে আবার খুঁজে পাওয়ার আশা ততই কমে আসছে ওর।

কিন্তু ব্ল্যাঙ্কের সব কাজ স্বাভাবিক ভাবেই চলছে। কিছুটা তিক্ততার সাথে মেয়েটা স্বীকার করতে বাধ্য হলো যে মালিকের অনুপস্থিতিতেও র‍্যাঞ্চের কাজে কোন ক্ষতি হচ্ছে না; জেমস তার লোকজনকে নিয়ে বেশ সুষ্ঠু ভাবেই কাজ চালাচ্ছে।

ফোরম্যানের কামরা পার হওয়ার সময়ে নেহাত মেয়েলি কৌতূহল বশেই একটু ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখার লোভ হলো ওর। কামরাটা খালি, কিন্তু দেয়ালের সাথে একটা উইনচেস্টার ঠেস দিয়ে রাখা আছে। ওটা দেখামাত্র সে থমকে দাড়াল, যেন ওই রাইফেলের একটা বুলেট ওকে আঘাত করেছে। একটু ভাল করে রাইফেলটা পরীক্ষা করে দেখার জন্যে মেয়েটা কামরায় ঢুকল। এই সময়ে গলার ভিতর থেকে নির্গত একটা নিচু গরগর শব্দ ওর কানে পৌঁছল। চেয়ে দেখল টমি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ইতস্তত করছে ফিল, পিছন থেকে একটা পায়ের শব্দে সে ঘুরে ফোরম্যানের মুখোমুখি হলো।

তুমি কি আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলে? প্রশ্ন করল সে।

হ্যাঁ, কিন্তু তোমার কুকুরের সেটা ঠিক পছন্দ হচ্ছে না, জবাব দিল ফিল।

এরফান ওকে ডাকতেই টমি লাফিয়ে এসে ওর পাশে বসল। এই অল্প সময়ের মধ্যেই কুকুরটা বেশ বড়সড় হয়ে উঠেছে। এরফান এ-সম্পর্কে একটা মন্তব্যও করল।

ভাল খাবার আর বিশ্রাম ওদের ওপর অদ্ভুত প্রভাব ফেলে। যদি তুমি ওর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও তবে সে বুঝবে তুমি ওর বন্ধু, এবং তা মনেও রাখবে।

মেয়েটা সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে এরফানের দিকে একবার চেয়ে ওর কথা মতই কাজ করল। টমি নীরবেই ওর আদর গ্রহণ করল। হঠাৎ মেয়েটার মনে টমির প্রভুর সবার ওপর নিজের ইচ্ছা শক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতার প্রতি তীব্র একটা বিদ্রোহের ভাব ফুটে উঠল। সবাইকেই সে নিজের ইচ্ছা মত চালায়-এমন কি তাকেও। হঠাৎ সে এরফানের ওপর চড়াও হলো।

ওটা আমার বাবার রাইফেল, আঙুল তুলে দেখাল সে। ওটা এখানে। কিভাবে এলো?

এরফান ইতস্তত করছে, সে জানে মেয়েটা তাকে খুঁটিয়ে লক্ষ করছে, কিন্তু তার চেহারায় কোনরকম ভাবই প্রকাশ পেল না। যদিও সে মনেমনে নিজেকে গালি দিচ্ছে ওটা এমন বোকামি করে সহজেই চোখে পড়ার মত জায়গায় রাখায়। ওটা আমি খুঁজে পেয়েছি, বলল সে। ওর পরবর্তী প্রশ্ন আঁচ করে আবার বলল, ওটা এক্স টি ব্যাঙ্কে গরু নিয়ে যাওয়ার আগের দিনের ঘটনা। আমি ওদিক দিয়ে যাওয়ার সময়ে একজন আড়াল থেকে আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। বাধ্য হয়েই আমাকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হলো। রাইফেলটা। ওর দেহের পাশেই পড়ে ছিল।

তুমি ওকে মেরে ফেলেছ?

নিশ্চয়, ওকে না মারলে আমাকে মরতে হত।

লোকটা কে ছিল? জিজ্ঞেস করল ফিল। ওর চোখে পরিষ্কার আতঙ্কের চিহ্ন ফুটে উঠেছে।

ও ছিল সেই মেক্সিকান-মারিও, জানাল সে।

মারিও? তুমি বলতে চাও সে-ই আমার বাবাকে খুন করেছে?

এতে কিছুই প্রমাণ হয় না-ওই গ্রীজার হয়ত ওটা পেয়েছে অথবা চুরি করে থাকতে পারে, যুক্তি দেখাল এরফান। আমি মিছে তোমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চাইনি। জ্যাকের লাশ না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত ভাবে কিছুই বলা যায় না।

মেয়েটার চেহারা ফেকাসে আর আড়ষ্ট হলো, মুঠো পাকানো হাতের। গাঁটগুলো সাদা দেখাচ্ছে। ওর বড় বড় বাদামী চোখে ঝড়ের পূর্বাভাস। ফোরম্যানের অজুহাতে ফিলের ঠোঁট জোড়া বাঁকা হয়ে বিকৃত হলো।

ওর লাশটা এখন কোথায়? পরবর্তী প্রশ্ন এলো।

তা আমি জানি না, জবাব দিল এরফান। আমি যেখানে রেখে এসেছিলাম সেখান থেকে ওটা অদৃশ্য হয়েছে।

তুমি কি আশা করো এই বানোয়াট গল্প আমি বিশ্বাস করব? বাঁকা স্বরে প্রশ্ন করল ফিল।

না, শক্ত অকম্পিত স্বরে জবাব দিল এরফান। তা আমি আশা করছি না, আমার কোন কথাই তুমি বিশ্বাস করবে না সেটা আমি জানি; কারণ তোমাকে অন্যরকম বোঝানো হয়েছে। কিন্তু আমি সত্যি কথাই বলছি। তোমার অবিশ্বাসে সত্য বদলাবে না।

এরফানের প্রতি সরাসরি অবজ্ঞার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মেয়েটা ঘুরে চলে গেল। ফিলের দিকে চেয়ে থাকল এরফান; ওর চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠেছে, কিন্তু চোখে সমবেদনা।

মেয়েটা আমাদের মোটেও সহ্য করতে পারছে না, টমিকে বলল সে, সে এখন ভাবছে আমিই ওর বাবাকে হত্যা করেছি, ওকে অবশ্য দোষ দেয়া যায় না; বেচারির খুব কঠিন সময় যাচ্ছে এখন।

র‍্যাঞ্চহাউসে ঢোকার আগে মেয়েটা পিছন ফিরে দেখল টমি পিছনের দুপায়ে দাঁড়িয়ে আদর করে এরফানের মুখ চেটে দেয়ার চেষ্টা করছে। এতে ওর রাগ আরও বাড়ল।

একটা বর্বর পশু! রাগে ফেটে পড়ল সে। তবে পশু বলতে সে কুকুরটাকে বোঝায়নি। বার্ট ঠিকই বলেছিল-এর পিছনে কোন বড় একটা ষড়যন্ত্র আছে। ওই, আমার বাবাকে যে খুন করেছে তাকে যদি আমি ধরতে পারি তাহলে তাকে ফাঁসিতে না ঝুলানো পর্যন্ত আমার শান্তি নেই।

*

দ্বিতীয় বিপদ সঙ্কেতটাও প্রথমটার মত রহস্যজনক ভাবেই এলো এরফানের হোপে টাকা জমা দেয়ার কয়েকদিন পর। ওতে লেখা:

ব্যাঙ্কে তোমার টাকা জমা থাকলে ওটা তুমি হারাবে।
        তোমার বন্ধু।

এটাও একই ধরনের কাগজে আগের মতই বড় হরফে লেখা।

ছোট নোটটা হাতে নিয়ে এরফান ভাবছে তার এই অচেনা বন্ধু কে হতে পারে। লোকটা যে এই র‍্যাঞ্চেরই কোন কর্মচারী এতে কোন সন্দেহ সেই। কিন্তু সে কে? একমাত্র হেনডন ছাড়া আর কারও কথা ওর মাথায় আসছে না। লোকটাকে যে বার্টের চর হিসেবে এই র‍্যাঞ্চে কাজে পাঠানো হয়েছে তা সে জানে। তবে কি-না, আর চিন্তা করার সময় নেই, ঘোড়া নিয়ে হোপের পথে দ্রুত গতিতে রওনা হয়ে গেল এরফান। সকাল এগারোটার আগেই সে গন্তব্যে পৌঁছে গেল।

ব্যাঙ্ক ম্যানেজারকে কোন কৈফিয়ত না দিয়েই সব টাকা তুলে নিয়ে সে সোজা ফেনটনের সেলুনে ঢুকল। টিমকে ওখানে দেখে অবাক হয়ে গেল ও। লোকটা ফেনটনের কোন কথায় চড়া স্বরে হাসছে।

জেমস, আমি তোমার সাথে হাত মেলাচ্ছি, বলে সে তার হাত বাড়িয়ে দিল। এইমাত্র আমি ফেনটনের কাছে শুনলাম তুমি কিভাবে বার্টকে জব্দ করেছ।

ওর থলথলে হাতটা গ্রহণ করে সে হেসে বলল, আমার পাঁজরে কারও পিস্তল ঠেকানোকে আমি খুব অপছন্দ করি। হয়ত এতটা করা আমার ঠিক হয়নি, কিন্তু এটা আমার জন্মগত অভ্যাস।

এতে বার্টের যা ক্ষতি হয়েছে সেটা সবার সামনে মার খাওয়ার চেয়েও বেশি, বলল ফেনটন। শহরের সবার মুখে ওই একই কথা। টেলরের কারও কাছে মুখ দেখাবার জো নেই, সবাই কেবল ওকে তাস কাটতে বলছে। এত জলদি তোমার আবার শহরে ফিরে আসার কি কারণ, জেমস?

লেজি এমের ফোরম্যান তার পকেট থেকে তাকে সতর্ক করে লেখা কাগজটা বের করে দেখাল, অন্য নোটার কথাও ওদের জানাল। যে খেলায়, নেমেছি তাতে কোন ঝুঁকিই আমি নিতে রাজি নই। বলতে পারো ওই ব্যাঙ্কের পিছনে কে আছে?

নামে ওটা পাইওনিয়ার ব্যাঙ্কিং করপোরেশন হলেও আমার ধারণা ওটা নিছক একটা পোশাকী নাম; আসল মালিক হলো ওটার ম্যানেজার রাস্টন, বলল ফেনটন। ও বেশ কিছুদিন এখানে আছে। ওকে সৎ বলেই মনে হয়। আমারও বেশ কিছু টাকা আছে ওখানে, যেটা আমি খোয়াতে চাই না।

আমারও তাই। আমিও তোমার আশঙ্কাই অনুসরণ করব। তাহলে ব্ল্যাক মাস্ক তোমার ওপর একটা চান্স নিয়েছিল, জেমস?

দুজন কালো মুখোশ পরা লোক হামলা করেছিল, খালি হাতেই ওদের ফিরতে হয়েছে, জানাল সে। আচ্ছা কি নামে এখানে কেউ আছে?

স্লিক রেমন্ড নামে একটা লোক বার্টের র‍্যাঞ্চে কাজ করত বটে, কিন্তু বছরখানেক আগে কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে, বলল ফেনটন, এরফানও ওর। সম্পর্কে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে অন্য প্রসঙ্গ ধরল।

আচ্ছা, ক্ৰীকের উজানে যে পুরোনো পোড়া কেবিনটা আছে, ওটা কার, প্রশ্ন করল সে। এলাকাটা ভালই মনে হলো।

হ্যাঁ, হার্ভি বোলটন নামে একজন নেস্টার, ওটা খোলা রেঞ্জ মনে করে কেবিনটা তৈরি করেছিল। কিন্তু সে ভুল করেছিল-বার্ট মনে করে ওটা ওরই রেঞ্জের মধ্যে পড়ে।

কি ঘটেছে ওর?

বার্টের কথা অনুযায়ী, লোকটা নিজেই রাগ করে ওটা পুড়িয়ে দিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে। কিন্তু আমাদের কিছু লোকের ধারণা অন্যরকম, বলল সেলুনের মালিক। কিছু বোকা লোক মনে করে ওটা ভুতুড়ে এলাকা। এই তো কয়েকদিন আগেই একটা লোক অত্যন্ত উত্তেজিত অবস্থায় শহরে এসে বলছিল। ওই পথে আসার সময়ে সে দেখেছে একটা ছায়া আরেকটা ছায়াকে ক্ৰীকের ধারে বড় কটনউড় গাছে ঝুলাচ্ছে। কিন্তু লোকটা রাই মদ খেয়ে মাঝারি গোছের মাতাল অবস্থায় কি দেখতে কি দেখেছে তা বলা মুশকিল।

প্রচলিত নিয়মে আরও এক রাউন্ড ড্রিঙ্ক খাওয়ার পর ওরা পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিল। শহরে আর কোন কাজ না থাকায় এরফান র‍্যাঞ্চে ফেরার ট্রেইল ধরল। কিন্তু র‍্যাঞ্চ থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে থাকতেই সে কি মনে করে ট্রেইল ছেড়ে রেঞ্জের দক্ষিণ সীমানার দিকে রওনা হলো। এদিকটা কাজের চাপে আগৈ তার দেখা হয়ে ওঠেনি। দেখল মরুভূমির কাছে হওয়ায় এদিকের ঘাস ক্রমেই কমে এসেছে। কিছু গরু দেখা যাচ্ছে বটে, কিন্তু ওগুলো একটাও লেজি এম ব্র্যান্ডের না। ঘোড়াটা ক্লান্ত বুকে ধীর গতিতে পথ চলছে সে। সন্ধ্যা নাগাদ র‍্যাঞ্চে ফিরে দেখল তার লোকজন করালের কাছে ঘোড়ার পিঠ থেকে জিন নামাচ্ছে। হঠাৎ দূর থেকে প্রচণ্ড বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে কারও আসার শব্দ শোনা গেল। ট্রেইলের ওপর কালো একটা বিন্দু ক্রমশই বড় হচ্ছে। সামনে এসে থামল।

আরে, এ-তো আমাদের জেন্টল অ্যানি! কাউবয়দের একজন মন্তব্য করল। কেউ কি তোমাকে তাড়া করছে, অ্যানি?

ওকে মাথা নাড়তে দেখে বান্ডি বলল, তাহলে তোমার এত তাড়ার কোন প্রয়োজন ছিল না, সাপার এখনও তৈরি হয়নি।

তোমরা চমৎকার একদল মানুষ বটে, তাই না? ওদের সবাইকে দাঁত বের করে হাসতে দেখে রুষ্ট স্বরে বলল ল্যাঙ্কি।

এরফান বুঝতে পারছে ল্যাঙ্কি জরুরী কোন খবর এনেছে।

খবরটা দিয়েই ফেলো, জেন্টল, নইলে ওরা তোমার পেটে গুতো মেরে কথাটা আদায় করবে, বলল এরফান।

ল্যাঙ্কি ফোরম্যানের দিকে চেয়ে হেসে নাটকীয় ভাবে খবরটা আকস্মিক ভাবেই পরিবেশন করল।

হোপের ব্যাঙ্কে আজ একটা দুর্ধর্ষ ডাকাতি ঘটে গেছে। রাস্টনকে খুন করে ডাকাতরা ব্যাঙ্কের সব টাকা লুট করে নিয়ে গেছে, জানাল সে।

কাউবয়দের মুখ থেকে বিস্ময়সূচক শব্দ বের হলো ওর ঘোষণা শুনে। সমস্বরে বিভিন্ন প্রশ্ন এসে ল্যাঙ্কিকে অতিষ্ঠ করে তুলল। এরই মাঝে রাঁধুনীর টিনের থালায় ঘন্টার সাথে খাবার প্রস্তুতের সংবাদ প্রচারিত হলো।

সবাই এসো, বায়েজ, বলল এরফান, খেতে বসে ধীরেসুস্থে ওর সব কথা শোনা যাবে।

সবার বিভিন্ন প্রশ্নের মাঝে ওর কথা থেকে যেটুকু উদ্ধার করা গেল সেটা হচ্ছে: দুপুরের অল্প পরেই তিনজন স্ট্রেঞ্জার ঘোড়ার পিঠে ব্যাঙ্কের সামনে এসে থামে। ওদের সবার পরনেই ছিল রেঞ্জ পোশাক, হাটের কার্নিস খুব নিচু করে টানা ছিল বলে কারও চোখ দেখা যায়নি। প্রত্যেকেই ছিল সশস্ত্র। ওদের মুখের নিচের অংশ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল। ওদের দুজন ব্যাঙ্কে ঢুকে কোন সময় নষ্ট করেনি। ক্লার্ক লাঞ্চে যাওয়ায় ম্যানেজার ওখানে একাই ছিল।

তোমরা কি চাও? তোতলাল রাস্টন।

যা আছে সব, জবাব দিল ওদের একজন। প্রোন্তো।

রূঢ় স্বর আর বাগিয়ে ধরা অস্ত্র দেখেই ম্যানেজার বুঝে নিয়েছে ওদের কথা মত কাজ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। বাধ্য হয়েই ওকে সিন্দুক খুলতে হলো। অন্য ডাকতটা চামড়ার একটা ব্যাগ বের করে দ্রুতহাতে ব্যাঙ্কে যা টাকা ছিল সব ওতে ভরে নিল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজের সর্বনাশ চোখের সামনে হতে দেখে মরিয়া হয়ে সে ড্রয়ার থেকে গুলি ভরা পিস্তলটা বের করে গুলি ছোঁড়ার চেষ্টা করল। হয়ত সে ভেবেছিল গুলির শব্দে আকৃষ্ট হয়ে কেউ ওকে সাহায্য করতে আসবে।

বেপরোয়া ডাকাতরা কেউ ওর ওপর কড়া নজর রাখেনি। হাত মাথার ওপর তুলে রেখেই রাস্টন ধীরে ধীরে পিস্তল রাখা ড্রয়ারের দিকে এগোচ্ছিল। হঠাৎ বাইরে একটা শব্দ শুনে যেই ওরা পিছন ফিরেছে সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ বুঝে এক। টানে ড্রয়ার খুলে ম্যানেজার পিস্তল বের করে তাক না করেই ট্রিগার টেনে দিল। ওর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বিপদ সঙ্কেত দেয়া। ডাকাতদের একজন ওর দিকে ফিরে দাঁড়াল।

পাজি কুকুর! চিৎকার করে উঠেই সরাসরি ওকে গুলি করল লোকটা।

ককিয়ে উঠে পড়ে গেল রাস্টন। ডাকাত দুজন এক লাফে দরজার কাছে পৌঁছে চট করে বেরিয়ে গেল। গুলির শব্দে বাইরে দাঁড়ানো লোকটা ততক্ষণে তার রাইফেল বের করে ফেলেছে। এক কৌতূহলী দর্শক গুলির শব্দে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়েছিল বটে, রাইফেলের গুলি ওর গালের পাশে লাগায় মুহূর্তে তার কৌতূহলের সমাপ্তি ঘটল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ডাকাত তিনজন ঘোড়া নিয়ে কাঠের ব্রিজটা পার হয়ে পুবের ট্রেইল ধরে অদৃশ্য হলো।

আমি বাজি ধরে বলতে পারি, রকি মাউন্টিনের এপাশে হোপের মত বুনো। শহর আর নেই, ল্যাঙ্কি কথা শেষ করল। না, রাস্টন মরেনি, কিন্তু মারাত্মক রকম জখম হয়েছে, বান্ডির প্রশ্নের জবাবে বলল সে। ওর অবস্থা যে কেমন তা। ডেজার্ট এজ থেকে ডাক্তার না আসা পর্যন্ত জানা যাবে না।

ব্ল্যাক বার্ট কি শহরে ছিল? জানতে চাইল এরফান।

না, এই ঘটনার আধঘণ্টা পরে সে শহরে পৌঁছে টেলরকে ব্ল্যাক মাস্ককে। এতদিনেও গ্রেপ্তার করতে না পারার জন্যে এমন বকা বকল যে সেটা দেখার মত একটা দৃশ্য। বার্টের কথা অনুযায়ী ওই ব্যাঙ্কে ওর পাঁচ হাজার ডলার জমা ছিল। আমি যখন ফিরি তখন সে বড় একটা পাসির দল গঠনে ব্যস্ত ছিল। সে জোর গলায় বলছিল যে ডাকাতদের ধরে এনে জীবন্ত অবস্থাতেই পিঠের ছাল তুলে নেবে সে।

উত্তেজিত কথাবার্তার মাঝে ফোরম্যান নীরবে বসে ভাবছে, ওই রহস্যময় অচেনা বন্ধুর সাবধানবাণীর কথা। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে ডাকাতি হওয়ার কথা ওই লোকটা আগে থেকেই জানত। লোকটা কে হতে পারে? নিজের কামরায় ফিরে এই সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করছে, এই সময়ে লরি ওর ঘরে ঢুকল।

বাঙ্কহাউসে কাউবয়রা সবাই আলাপ-আলোচনা করে ঠিক করেছে যে গরু বিক্রির টাকাটা হারিয়ে তুমি যদি বেশি ঝামেলায় পড়ে থাকো তাহলে ওরা বেতনের জন্যে অপেক্ষা করতে রাজি আছে; যখন তোমার সম্ভব হয় তখন টাকা দিলেই ওরা খুশি। এই কথা জানাতেই আমি এলাম।

এরফান হাসল, কিন্তু চেহারায় বোঝা গেল ওদের এই সিদ্ধান্ত সত্যি ওর মনকে বেশ নাড়া দিয়েছে। স্বীকার করতেই হবে যে ওরা সত্যিই সাদা মনের লোক, বলল সে। তবে ওদের চিন্তার কিছু নেই, কারণ আজ সকালেই আমি সব টাকা তুলে এনেছি।

সব টাকা তুলে এনেছ তুমি? অবাক বিস্ময়ে পুনরাবৃত্তি করল লরি। বলতে হবে তোমার কপাল দরুণ ভাল

না, এটা কপালের কোন ব্যাপার নয়, বলল এরফান। এগুলো দেখো। পকেট থেকে সতর্কবাণী দুটো বের করল সে। ১২-সেই এরফান

ওগুলো পড়ে শিস দিয়ে উঠল লরি।

অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না? নিশ্চয় তোমার ওপর কোন ভাল জিন-পরীর আশীর্বাদ আছে, জেমস। তোমার কোন ধারণা আছে লোকটা কে হতে পারে?

এটা হেনডনের কাজ হতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করল এরফান, কিন্তু লরি এক কথায় নাকচ করে দিল।

সে বলল, ধরে নিলাম সে বার্টের হয়ে কাজ করছে, কিন্তু ওর সাথে ব্ল্যাক মাস্কের কোন সম্পর্ক থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

যাহোক, ওই লোকটার কাছে আমি সত্যিই ঋণী। আর ঋণী থাকাটা আমার নীতি নয়।

হয়ত একদিন তুমি ঋণ শোধ করার সুযোগ পাবে, মন্তব্য করল লরি। তবে তোমার এখন একটু সাবধান হওয়া উচিত; এই গার্ডিয়ান এইঞ্জেল যদি কোন মানুষ হয় তবে হয়ত মাঝেমধ্যে তার ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে।

জিতি বা হারি, যে তাস বাঁটা হবে তা নিয়েই খেলতে হবে আমার। ওকে বিদায় দেয়ার আগে এরফান বলল, তুমি আমার পক্ষ থেকে ওদের জানিয়ো যে এমন একটা সিদ্ধান্ত ওরা নেয়ায় আমি কৃতজ্ঞ। আমার জন্যে ওদের এই ত্যাগ মেনে নেয়ার কথা আমি কোনদিন ভুলব না।

০৯.

পরদিন সকালেই ক্লান্ত ঘোড়া এবং চেহারা নিয়ে লেজি এম র‍্যাঞ্চে পৌঁছল বার্ট। সে নিজেই ছিল পাসির প্রকৃত লীডার। হেনডনকে যা বলা হলো তাতে সে বুঝল স্টোনি রিভারের কাছে পৌঁছে ওরা ডাকাতদের ট্রেইল হারিয়ে ফেলেছে। কয়েকঘণ্টা খুঁজেও ওদের কোন ট্রেইল আর ওরা খুঁজে পায়নি।

তোমাকে ইদানীং আর বার বিতে দেখিনি, বলল সে। কি ব্যাপার? ওখানে তোমার বেশ কিছু টাকা পাওনা হয়ে আছে।

ওই টাকা সংগ্রহ করার ইচ্ছে আমার নেই জবাব দিল সে। বার বির মালিক ভুরু উঁচাল। কারণ? তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন করল সে।

ওই টাকা অর্জন করার ইচ্ছে আর আমার নেই। ব্যাখ্যা দিল সে।

দল পাল্টে বিপক্ষ দলে যোগ দিচ্ছ, না? আমাকে উপেক্ষা? দাঁত খিচিয়ে বলল র‍্যাঞ্চার।

না, সেটা আমার রীতি নয়-আমি যা জানি সেটা আমি ঠিকই গোপন রাখব, শান্ত স্বরে জবাব দিল কাউবয়। আমি যে কাজটা ছাড়ছি তা আমার ঠিক পছন্দের ছিল না। আমি যার থেকে বেতন নিচ্ছি তাকে আমি ঠকাতে পারব না। সৎ ভাবেই চলব।

অর্থাৎ গ্রীনের সাথে?

হেনডন নড় করল। চেহারা ফেকাসে দেখাচ্ছে, কিন্তু ঠোঁটজোড়া অটল প্রতিজ্ঞায় শক্তভাবে আঁটা। এভাবে প্রত্যাখ্যান করায় যে সে তার নিজের জীবন বিপন্ন করছে এটা সে জানে; কিন্তু বার্ট স্পষ্ট বুঝতে পারছে ওকে আর টলানো যাবে না। বার্টের চেহারা রাগে কঠিন হয়ে উঠল।

ঠিক আছে, হেনডন, বলল সে। এটা স্বাধীন দেশ, কিন্তু এটা ভাল ভাবে শুনে রাখো, যে আমার সাথে নেই, সে বিপক্ষে। তারা আর আমার নিরাপত্তা পাবে না।

তুমি আমার বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলেই আমি মুখ খুলব-এটা তুমিও জেনে রাখো, পাল্টা হুমকি দিল সে।

হেসে ওর কথা উড়িয়ে দিয়ে র‍্যাঞ্চহাউসের দিকে এগোল বার্ট। বারান্দাতেই ফিলের দেখা পেল র‍্যাঞ্চার। ওর এমন বিধ্বস্ত চেহারা দেখে মেয়েটার দৃষ্টি নরম হলো। মুখ দিয়ে সন্তুষ্টির একটা শব্দ বের করে ধপ করে নরম সোফায় বসে দাঁত বের করে হেসে ওর দিকে ফিরল বার্ট।

আমি অত্যন্ত ক্লান্ত, ফিল, আমাকে অনেক দূর পথ পেরিয়ে এখানে আবার আসতে হয়েছে।

একটু হেসে ভিতরে ঢুকে একটা গ্লাস আর বোতল নিয়ে ফিরে এলো ফিল। লোকটা চারপাশে, দেখে নিজের কামরার সাথে এটাকে মনেমনে যাচাই করল চোয়াল দুটো দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় শক্ত হয়ে উঠল তার; নিজের জন্যে একটা ড্রিঙ্ক টেলে নিয়ে সে সিদ্ধান্ত নিল, যেভাবেই হোক এই র‍্যাঞ্চটা ওকে পেতেই হবে। গ্লাস উঁচিয়ে ফিলকে সম্মান দেখাল বার্ট।

এই হলো অবস্থা, বলল সে, একটা খড়ের গাদায় সুঁই খুঁজে পাওয়ার চেয়েও কঠিন। তুমি নিশ্চয় ব্যাঙ্কে ডাকাতি হওয়ার কথা শুনেছ?

হ্যাঁ, সম্ভবত এটা ব্ল্যাক মাস্ক দলের কাজ?

আমি তাই ধরে নিচ্ছি, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই ব্ল্যাক মাস্কের নেতৃা কে? এই ডাকাতির সাথে কিছু আশ্চর্য ঘটনাও জড়িত আছে; দুতিনজন লোক এই ডাকাতির অল্পক্ষণ আগেই তাদের সব টাকা তুলে নিয়েছিল; ওদের মধ্যে প্রথম। ব্যক্তি হচ্ছে জেমস। অবশ্য এটা দৈবাত কোন ঘটনাও হতে পারে; আবার তা না–ও হতে পারে।

রাস্টন কি মারাত্মক রকম জখম হয়েছে?

ওকে দেখে তো তাই মনে হলো। সে কেবল টাকা তুলে নেয়ার ব্যাপারটইি আমাকে বলতে পেরেছে। ডাকাতদের চেহারা পুরোপুরি মুখোশে ঢাকা ছিল বলে ওদের সে আবার দেখলেও চিনতে পারবে কিনা সন্দেহ। এটুকু বলেই সে আবার জ্ঞান হারাল।…তোমার কাছে নতুন কোন খবর আছে?

ফিল বাবার রাইফেলটা দেখা আর জেমসের ব্যাখ্যার কথা জানাল। শোনার সময়ে বার্টের চেহারা অবিশ্বাসে বিকৃত হলো। মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সংবাদটাকে নিজের সুবিধা মত কিভাবে ব্যবহার করবে।

তুমি কি ওর ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট, ফিল? প্রশ্ন করল সে। ওকে ওই মেক্সিকানের লাশ দেখাতে হবে ওর কথা সত্যি প্রমাণ করতে হলে। এটা স্বীকার করতেই হবে যে লোকটার মিথ্যে কথা বানিয়ে বলার ক্ষমতা অসাধারণ। আমি বাজি ধরে বলতে পারি সে ওই লাশ হাজির করতে পারবে না। আমি জানি মারিও এই এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। এখন আমার কথা শোনো, কথাটা তুমি আর কাউকে জানিয়ো না। ও যেন ফাঁসির দড়িতে ঝোলে তার ব্যবস্থা আমিই করব।

তোমার ধারণা সে-ই আমার বাবাকে হত্যা করেছে? ভাঙা গলায় প্রশ্ন করল মেয়েটা।

এ ব্যাপারে আমার নিজের কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের প্রমাণ দরকার, বলল সে। এটাও আমাদের জানা খুব দরকার এর সাথে এমারিও জড়িত আছে কিনা। তারপর এই ব্ল্যাক মাস্কের ব্যাপারটা; ব্যাঙ্কে যখন ডাকাতি হয় তখন কি জেমস এই র‍্যাঞ্চে হাজির ছিল?

না, সে সাপারের ঠিক আগে এসে হাজির হয়, জবাব দিল মেয়েটা। আমি নিজে ওকে ফিরতে দেখেছি।

হাহ, এতেই বোঝা যাচ্ছে বন্ধুদের সাথে মিলিত হয়ে কাজ সেরে ফেরার জন্যে সে প্রচুর সময় পেয়েছে। রাস্টনের বর্ণনায় যে লোকটা ওকে গুলি করেছে সে উচ্চতা আর গড়নে জেমসের মতই ছিল। কিন্তু এর সবই আন্দাজের কথা-নিশ্চিত না হয়ে আমরা কোন কিছুই করব না। উঠে দাঁড়িয়ে ফিলের পিঠ চাপড়ে দিয়ে সে বলল, তুমি কোন দুশ্চিন্তা কোরো না, সব কিছু গুছিয়ে নেয়ার পর তোমাকে আমি এমন খবর শোনাব, শুনে তুমি খুব খুশি হবে।

ওর আচরণ আর চাহনি দেখে মেয়েটা একটু লাল হলো, লোকটা কি বোঝাতে চাইছে তা সে বুঝেছে। কিন্তু কেন যেন তার মনটা ঠিক সেভাবে সাড়া দিতে পারছে না। বার্ট যেন তার সেই আগের আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে। তাই র‍্যাঞ্চার বিদায় নেয়ায় সে মোটেও ব্যথিত হলো না।

কিন্তু অত্যন্ত খুশি মনেই বার্ট নিজের র‍্যাঞ্চে ফিরল। সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে সে।

খুব ভোরে কয়েকজন কাউবয়কে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় বার্টের লেজি এমে আসার কথা জানল না এরফান। র‍্যাঞ্চে গরুর সংখ্যা যে কত, তার মোটামুটি একটা হিসেব নেয়াই ছিল ওর উদ্দেশ্য। বিকেলের শেষের দিকে সে র‍্যাঞ্চে নিজের ঘরে পৌঁছল। ওর তীক্ষ্ণ চোখে সাথে সাথেই ধরা পড়ল যে কেউ তার কামরায় ঢুকে তার জিনিসপত্র ঘাটাঘাটি করেছে। বাঙ্কহাউসে গিয়ে রাঁধুনী ড্যানিয়েলকে প্রশ্ন করল, আজ র‍্যাঞ্চে কোন অতিথি এসেছিল?

হ্যাঁ, স্যার, ওই অপদার্থ কাউবয় গেভার আবার এখানে জ্বালাতে এসেছিল, হাসি মুখে জবাব দিল সে। তুমি র‍্যাঞ্চে নেই তা ওকে আমি বলা সত্ত্বেও সে তোমার ঘরে গিয়ে অনেকক্ষণ সময় কাটিয়েছে।

চিন্তান্বিত চেহারায় নিজের ঘরে ফিরল ফোরম্যান। প্রথমে সে ফিলকে সন্দেহ করেছিল-ভেবেছিল মেয়েটা হয়ত তার বাবার বিষয়ে আরও কোন তথ্য বা প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায় কিনা দেখতে এসেছিল; যদিও মেয়েটা এমন জঘন্য একটা কাজ করতে পারে এটা বিশ্বাস করা কঠিন।

সন্ধ্যায় আর নতুন কিছুই ঘটল না। অবশ্য গেভারের আবার এখানে আসা নিয়ে কাউবয়দের মধ্যে অনেক জল্পনা-কল্পনা হলেও জেমস লোকটার এখানে আসার আসল কারণ কাউকে জানাল না। এক্স টি র‍্যাঞ্চের একজন রাইডার এসে জানিয়ে গেল ডেজাট এজের ডাক্তার এসে রাস্টনকে পরীক্ষা করে দেখে বলেছে যে ওর বাঁচার সম্ভাবনা দশ ভাগের এক ভাগ। সে এখনও এতই দুর্বল যে বিবৃতি দিতে সক্ষম হয়নি। এদিকে নিরর্থক বুঝে ডাকাতদের ধরার সব চেষ্টাই ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

নিজেদের মধ্যে কাউবয়রা সর্বোচ্চ দশ সেন্ট বাজির যে তাস খেলে সেটার নাম ওরা দিয়েছে “কিড পোকার”। ওরা সবাই বসে গেল খেলায়। কিন্তু এরফান ওতে যোগ দিল না; ঘরে ফিরে একটা সিগারেট ধরিয়ে খোলা দরজা দিয়ে তারায় ভরা আকাশের দিকে চেয়ে সে গভীর চিন্তায় মগ্ন হলো।

মিস্টার বন্ধু হচ্ছে তাসের প্যাকেটের তুরুপ, ভাবছে সে। আমি যদি ওর খোঁজ পেতাম তাহলে সত্যিই খুব ভাল হত।

কিন্তু নিজের কামরায় বসে একঘণ্টা চিন্তা করেও এই সমস্যার কোন সমাধান খুঁজে পেল না এরফান। শেষে ঘুমিয়ে পড়ল।

প্রায় মাঝরাতে টমির গরগর শব্দের বিপদ সঙ্কেতে ওর ঘুম ভেঙে গেল। অন্ধকার রাত, কিন্তু তারার আলোয় কিছুটা দেখা যায়; নিঃশব্দে বিছানা থেকে নেমে বুট পরে নিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে সে বাইরের দিকে চাইল। তার কাছে মনে হলো যেন একটা আবছা ছায়ামূর্তি খুব সাবধানে র‍্যাঞ্চহাউসের দিকে এগোচ্ছে। দ্রুত কাপড়-জামা আর গানবেল্ট পরে নিয়ে বেরিয়ে এলো সে। কুকুরটাকে সাথে না নিয়েই হালকা পায়ে এগোল। সাথে আরও লোক আছে কিনা দেখার জন্যে সতর্ক নজর রেখেছে। এরফান নিশ্চিত, কাউকে আসতে দেখেছে, অথচ কাউকেই এখন দেখতে পাচ্ছে না।

ঘুরে বাড়ির পিছন দিকে চলে এলো সে; একটা জানালা খোলা আছে দেখে ওদিক দিয়েই ভিতরে ঢুকল। বুঝল লোকটা রান্নাঘরে আছে। দরজা দিয়ে। বেরিয়ে একটা করিডর দেখতে পেল; ওখান থেকে একটা সিঁড়ি দোতালায় উঠে গেছে। সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় ভাবছে সে, জানালাটা হয়ত অসাবধানতায় খোলা থাকতে পারে, কিন্তু তার আবছা দেখাটা যদি চোখের ভুল হয়ে থাকে? এই মাঝরাতে তাকে বাড়ির মধ্যে ঘুরে বেড়াতে দেখলে মিস মাস্টারসন কি ভাববে? তার চোখের ঘৃণা ভরা তিরস্কারের চাহনি, সে কল্পনায়

স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। ফিরে যাওয়ার জন্যে ঘুরতে যাচ্ছে, এই সময়ে নিচু একটা কর্কশ কথার আওয়াজ ওর কানে এলো। কি বলা হয়েছে তা সে ঠিক শুনতে। পায়নি বটে, কিন্তু ওটা যে একটা পুরুষের স্বর তাতে কোন সন্দেহ নেই। দোতালা থেকে এসেছে শব্দটা। থমকে দাড়িয়ে নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল সে। শব্দটা কোন ঘর থেকে আসছে বোঝার চেষ্টায় কান পাতল।

ফিল গভীর ঘুম থেকে জেগে বিছানার পাশে একটা লোককে কুঁজো ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভয়ানক রকম আতঙ্কিত হলো। ও কিছু বলার আগেই লোকটা বলল, একেবারে চুপ করে থাকলে তোমাকে কোন ব্যথা দেয়া হবে না।

গেভার! স্বর শুনে লোকটাকে চিনতে পেরে চেঁচিয়ে উঠল সে, তুমি এখানে কি করছ? কোন সাহসে-

চুপ! হস্পিতম্পি করে কোন লাভ হবে না, নিশ্চিন্ত স্বরে বলল সে। আমাকে বলো টাকাটা কোথায় আছে, ওটা নিয়েই আমি বিদায় হব। তারপর ফিলের চেহারায় কথাটা না বোঝর আভাস দেখে সে আবার বলল, আমি সেই দুহাজার ডলারের কথা বলছি যেটা জেমস এক্স টি র‍্যাঞ্চে গরু বিক্রি করে পেয়েছে, এবং ব্যাঙ্ক ডাকাতির আগেই তুলে এনেছে। লোকটা যে কিভাবে টের পেল সেটা কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকছে না।

এই ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না, বলল ফিল। সে যদি টাকাটা তুলে থাকে তবে ওটা ওর কাছেই আছে। ওর স্বরে এখন কিছুটা আত্মপ্রত্যয় ফিরে এসেছে।

টাকাটা ওর ঘরে নেই, আমি ওর কামরা ভাল মত খুঁজে দেখেছি। নিশ্চয়ই এত টাকা সাথে নিয়ে সে ঘুরবে না। ওটা এখানেই কোথাও আছে, জোর দিয়ে বলল গেভার।

জঘন্য একটা ইতর তুমি, রাগের সাথে বলল সে। আমি জানি না ওটা কোথায়। জানলেও তোমাকে বলতাম না।

সেটা দেখা যাবে। কথা বের করার অনেক উপায়ই আমার জানা আছে। হঠাৎ থাবার মত দুহাত বাড়িয়ে মেয়েটার কাধ চেপে ধরল। ওর বড় বড় নখের খামচিতে ফিলের পাতলা নরম রাতের পোশাক ছিঁড়ে নগ্ন কাঁধ বেরিয়ে পড়ল। গেভারের লোভাতুর চোখদুটো এই দৃশ্যে পাশবিক আনন্দে জ্বলে উঠল।

মেয়েটা ওকে দুহাতে কিল মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু লোহার মত শক্ত মুঠোয় ওকে আরও জোরে আঁকড়ে ধরে নিজের দিকে টানতে শুরু করল গেভার। গেভারের ঠোঁট জোড়া ওর মুখের কাছে চলে এসেছে। শ্বাসের গন্ধেই ফিল টের পেল লোকটা প্রচুর মদ খেয়েছে।

এর জন্যে বাৰ্ট তোমাকে ফাঁসিতে ঝোলাবে, ফিল হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। খামচি মেরে বসল গেভারের মুখে।

হঠাৎ ব্যথা পেয়ে রাগে একটা গালি বকে পিছিয়ে গেল গেভার। হারামি বিড়াল! গর্জে উঠল, তোর মুখ আমি জন্মের মত বন্ধ করে দেব।

কামনার আতিশয্যে লোকটা নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল। মেয়েটার ধারাল নখের খামচিতে গেভারের গাল কেটে রক্ত ঝরছে। হাত তুলে গাল ছুঁয়ে রক্ত দেখে সে এখন কামনা ভুলে রক্তের নেশায় পাগল হয়ে উঠল। কোমর থেকে ছুরি বের করে অন্তিম আঘাত হানার জন্যে মাথার ওপর ছুরি তুলল। মেয়েটার চোখ এখন অসহায় অবস্থায় ওর ছুরির ঝিলিক আর কালো মুখোশের ওপর ঘোরাফেরা করছে। ভয়ে ফিলের জ্ঞান হারাবার মত অবস্থা। যেকোন মুহূর্তে ছুরিটা নেমে এলেই ওর মৃত্যু অনিবার্য। একটা অস্ফুট ভয়ার্ত চিৎকার দিয়ে প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় সে বিছানার ওপর পড়ল। আর এক সেকেন্ড দেরি হলেই ছুরিটা ওর বুকে আমূল ঢুকে যেত। কামরার ভিতর পা রেখে দরজার কাছ থেকেই গুলি করল এরফান। বিস্ময়ে বিস্ফারিত চোখে আধপাক ঘুরে চিৎ হয়ে পড়ার আগেই মারা গেল গেভার। দ্রুত পায়ে ভিতরে ঢুকে মেয়েটার দিকে কোন নজর না দিয়ে গেভারের লাশ টেনে বাইরের ল্যান্ডিঙে নিয়ে রেখে এলো এরফান। মেয়েটাকে যে সুযোগ দিয়েছে তার পুরো সদ্ব্যবহার করে ছেড়া কাপড়ের ওপর সে একটা ড্রেসিং গাউন চাপিয়ে নিয়েছে।

লোকটা তোমাকে জখম করেনি তো? প্রশ্ন করল এরফান, ফিলকে মাথা নাড়তে দেখে বলল, তোমার দুশ্চিন্তা করার আর কোন প্রয়োজন নেই। আমার ধারণা সে একাই কাজ করছিল, তবু নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্যে এই বাড়ির ওপর নজর রাখার ব্যবস্থা আমি করব।

মেঝের ওপর পড়া ছুরির ফলাটা মৃদু আলোয় ঝিলিক দিচ্ছে। ওটা তুলে নিয়ে ওর জবাবের জন্যে অপেক্ষা না করেই কামরা ছেড়ে সোজা বেরিয়ে এলো এরফান। সিঁড়ির মাথাতেই সে দেখল আতঙ্কিত চোখে লাশটার দিকে চেয়ে দাড়িয়ে আছে ড্যানিয়েলের স্ত্রী ডিনা। গুলির শব্দে রান্নাঘরের পাশে ওর কামরা থেকে বেরিয়ে এসেছে সে।

ঈশ্বরের দোহাই- শুরু করেছিল ডিনা, কিন্তু ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল ফোরম্যান।

তোমার মালিকা একটা বড় ধরনের শক পেয়েছে, যাও, তাকে সঙ্গ দিয়ে কিছুটা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করো, ওকে নির্দেশ দিয়ে লাশটাকে কাঁধে তুলে নিয়ে যে-পথে ঢুকেছে সেই পথেই আবার বেরিয়ে এলো এরফান।

পরদিন সকালে নাস্তা সেরে ফিরে দেখল দরজার কাছেই ওর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে ফিল। আগে যতবারই ওদের দেখা হয়েছে সেই কঠিন ভাব ওর চোখে আর এখন নেই।

গত রাতে আমার জীবন বাঁচানোর জন্যে আমি তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে এসেছি, বলল মেয়েটা।

এরফানের চেহারা অস্বস্তিতে একটু রাঙা হলো। ওটা উল্লেখ করার কোন প্রয়োজন নেই; ওটাও আমার কাজেরই একটা অঙ্গ, জবাব দিল সে।

আমি বুঝতে পারছি না ঠিক সময় মত তুমি কিভাবে ওখানে পৌঁছলে, বলল সে।

টমির গরগর শব্দে আমি দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম কে যেন চুপিচুপি র‍্যাঞ্চহাউসের দিকে এগোচ্ছে। আমিও ওর পিছু নিলাম, ব্যাখ্যা করল এরফান। এই সময় কুকুরটা ছুটে এসে ওর ঠাণ্ডা নাক মেয়েটার হাতে ঘষে ওকে আদর জানাল। ও-ই আসলে তোমার ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য পাত্র।

তাহলে তো তুমি ওকে নিয়ে আসায় আমার খুশি হওয়াই উচিত, লজ্জিতভাবে বলল ফিল।

একটু হাসল ফোরম্যান, যে হাসিটা একেবারে নিষ্পাপ শিশুর মত সরল-ফিলের সামনে থাকাকালীন ওর আগের সেই নিষ্ঠুর আর কঠিন চেহারার সঙ্গে কোন মিলই নেই।

ওর এখানে উপস্থিতির জন্যে আমাদের দুজনেরই খুশি হওয়া উচিত, কারণ এটাই ওর প্রথম ভাল কাজ নয়। এর আগেও টমি একবার আমার জীবন বাঁচিয়েছে, বলে র্যাটল স্নেকের ব্যাপারটা ওকে জানাল সে।

শুনতে শুনতে মেয়েটার আতঙ্কিত চোখ বিস্ফারিত হলো।

জঘন্য ব্যাপার, বলল সে। এই কাজ কার জানো তুমি?

হ্যাঁ, কাজটা করেছিল ওই মেক্সিকান মারিও।

ভুরু উঁচাল ফিল, এবং তার চেহারায় সেই আগের ঠাণ্ডা ভাব আবার ফিরে এলো। সে বলল, আমি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জেনেছি সে এই দেশ ছেড়ে চলে গেছে।

কথাটা ঠিক, কিন্তু তোমাকে সে পুরোটা বলেনি। একেবারে দুনিয়া ছেড়েই চলে গেছে সে। যেমন তোমাকে বলেছি।

কিন্তু তুমি কি কথাটা প্রমাণ করতে পারো? প্রতিবাদ জানাল মেয়েটা।

না, গম্ভীর স্বরে বলল সে। প্রমাণ না থাকলেও, আমার কথাটাই সত্যি।

কয়েকটা মুহূর্ত অস্বস্তিকর নীরবতার মধ্যে কাটল। এরফান বুঝতে পারছে ফিলের মনে আবার সন্দেহ জেগে উঠছে। গত রাতের ঘটনায় ওর মনে যে সামান্য একটু প্রীতির মরূদ্যান জেগে উঠেছিল সেটা আবার সন্দেহের মরুভূমিতে ছেয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছা করেই সে কথা পাল্টে অন্য কথা পাড়ল। ওই বাসায় তোমার একা থাকাটা ঠিক হবে না।

ওখানে রাঁধুনী ড্যানিয়েলের বউ ডিনা থাকে, জানাল ফিল। ওর স্বামীও ওর সাথেই থাকে, কেবল গত রাতেই সে রান্নাঘরের পাশে বাঙ্কহাউসে শুয়েছিল।

আমি টমিকে ওখানে থাকতে দিতে পারতাম, কিন্তু ও যেমন অস্থির তাতে তোমার ঘর লণ্ডভণ্ড করে ছাড়বে।

সে একটা কিছু বলতে যাচ্ছিল এই সময়ে লক্ষ করল এরফানের চেহারায় আবার সেই আগের কঠিন ভাবটা ফিরে এসেছে। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখল বার্ট ঘোড়ার পিঠ থেকে নামছে।

আবার তোমাকে আর টমিকে ধন্যবাদ, বলে ঘুরে চলে গেল ফিল।

১০.

যদিও একা রাইডে না গিয়ে বস্টনকে সাথে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবে মোটেও খুশি হতে পারেনি ফিল, কিন্তু শীঘ্রি সে আবিষ্কার করল ফোরম্যানের প্রস্তাব মেনে নিয়ে ভালই করেছে ও। সাথে সঙ্গী থাকায় ওর সকালের রাইড অনেক আনন্দময় হয়ে উঠেছে। ফিলের সাথে প্রথম রাইডের সকালে লরি হাঁটু উপর আড়াআড়ি রাইফেল রেখে একটা সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রেখেই ওর পিছন পিছন আসছিল। কিন্তু পিছন ফিরে চেয়ে রাইফেলটা খাপে ভরে রেখে ওকে পাশাপাশি রাইড করতে বলল ফিল।

আগ্রহী কাউবয়কে আর দ্বিতীয়বার সাধতে হলো না, সাথে সাথে অস্ত্রটা খাপে ভরে মেয়েটার পাশাপাশি চলে এলো সে। আর মেয়েটার কাছে ওর বালকসুলভ লজ্জা এবং ওর আনন্দোজ্জ্বল চোখ ভাল লেগেছে। এটা যেন যৌবনকে যৌবনের ডাক।

লরি নিজের সম্পর্কে কিছুই বলছে না। তাই ফিল নিজেই ওকে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে জেনে নিল যে আত্মীয়স্বজন বলতে তার কেউ নেই। এই পৃথিবীতে সে সম্পূর্ণ একা। ঘোড়ার পিঠে জিন চাপাতে সক্ষম হওয়ার বয়স থেকেই ও গরুর সব রকম কাজ করে আসছে। এই কাজে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়েছে ওকে। আরও অনুসন্ধানে জানা গেল বেশ কয়েক হাজার মাইল ঘুরে সে দেশের বিভিন্ন এলাকা দেখেছে। একটা ব্যাপার লক্ষ করে ফিল বেশ মজা পেল, সেটা হচ্ছে যখনই ওরা বিশ্রাম নিতে অথবা কোন দৃশ্য উপভোগ করতে থেমেছে, প্রতিবারই লরি খাপ থেকে তার রাইফেল বের করে হাতে নিয়েছে।

আমার মনে হয় না এদিকে আমাদের কোন বিপদ হতে পারে, তৃতীয়বারের মত কিছুই ঘটল না দেখে মন্তব্য করল ফিল। এখানে একা এলেও আমার কোন বিপদ ঘটত না; মিছেই তুমি তোমার সময় নষ্ট করছ।

আমি না আসি সেটাই কি তুমি চাও? প্রশ্ন করল সে।

ওর কথায় আন্তরিক সুর আর চাহনি ফিলের গালে রক্ত প্রবাহ একটু বাড়িয়ে তুলল। নিজের উত্তেজনা আর আনন্দ সম্পর্কেও ও পুরোপুরি সচেতন। যখন হাত বাড়িয়ে হঠাৎ ফিলের লাগাম টেনে ধরল লরি, তখন মেয়েটা ভাবল কিভাবে এই বেপরোয়া যুবককে একটা ভাল শিক্ষা দেয়া যায়। কিন্তু পর মুহূর্তেই ফিল টের পেল যুবক কেন ওকে থামিয়েছে। মাইলখানেক দূরেই একটা বাঁক ঘুরে ছয়জন কালো মুখোশধারী ঘোড়সওয়ার বেরিয়ে এসেছে দেখতে পেল। লোকগুলোকে দেখামাত্রই ফিরতি পথ ধরে নিজেদের ঘোড়ার গতি বাড়াল ওরা।

ব্ল্যাক মাস্কের লোক, ফুপিয়ে উঠল ফিল।

দেখে তো তাই মনে হচ্ছে, স্বীকার করল লরি। হয়ত ওরা আমাদের খোঁজে আসেনি, কিন্তু সেটা পরখ করে দেখার ইচ্ছা নেই আমার। বাতাসের বেগে ছুটব আমরা।

ক্লান্ত ঘোড়া নিয়ে যতটা সম্ভব দ্রুত ছুটল ওরা। পিছন থেকে উল্লসিত একটা চিৎকারে লরি ঘুরে দেখল ওরাও ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে পিছু নিয়েছে। কিছুদূর পর্যন্ত ওরা দূরত্ব বজায় রাখতে পারল বটে, কিন্তু ক্রমেই এটা পরিষ্কার হয়ে উঠল যে ডাকাতদের ফ্রেশ ঘোড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে ক্লান্ত ঘোড়াদুটো কিছুতেই পারবে না। ওদের মাঝে দূরত্ব ক্রমশ কমে আসছে।

আমরা কিছুতেই নিরাপদে পৌঁছতে পারব না-ওদের ঘোড়া অনেক বেশি তেজী, ভাবল লরি, কিন্তু ফিলকে কিছু জানাল না।

পাশাপাশি ছোট কাউ-পোনি নিয়ে ছুটে চলেছে ওরা; ঘোড়া দুটো প্রাণ। থাকা পর্যন্ত উধ্বশ্বাসেই ছুটবে। চমৎকার দক্ষতার সাথে ঘোড়া চালাচ্ছে ফিল। একটা বুলেট বাতাস কেটে শব্দ তুলে ওদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। পরক্ষণেই রাইফেলের গর্জন ওদের কানে পৌঁছল। আবার পিছন ফিরে চেয়ে শঙ্কিত চোখে লরি দেখল পিছনের দলটা অনেক দূর এগিয়ে এসেছে।

ওর মনে এখন আর কোন সন্দেহ নেই যে মেয়েটাই ওদের লক্ষ্য। আরও একটা গুলির শব্দের সাথে লরির ঘোড়া হোঁচট খেলো, ওটা হুমড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ার আগেই কাউবয় লাফিয়ে নিচে নেমে পড়েছে। মেয়েটা হতভম্ব হয়ে লাগাম টেনে থেমে দাঁড়াল। লরির ঘোড়াটা থরথর করে একটু কেঁপে স্থির হয়ে পড়ে রইল।

তুমি র‍্যাঞ্চের দিকে এগিয়ে যাও, চিৎকার করে বলল লরি। আমি ওদের কিছুক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারব।

কিন্তু ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে, লরি, প্রতিবাদ জানাল ফিল। তুমি লাফিয়ে আমার পিছনে উঠে বসো।

একটা ঘোড়া আমাদের দুজনকে নিয়ে ছুটতে পারবে না; ওরা আমাকে নয়, তোমাকে ধরতে চায়। তুমি আমাদের লোকের উদ্দেশে ছুটে এগোও জেমসকে বৈলো আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম।

আমার মনে থাকবে লরি-তোমার কথা আমি কোনদিন ভুলব না। মেয়েটার চোখ ছলছল করছে।

আর কথা না বাড়িয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘোড়া ছোটাল ফিল। খাপ থেকে রাইফেল বের করে নিয়ে কাউবয় মৃত ঘোড়াটার পিছনেই আড়াল নিয়ে লড়ার জন্যে তৈরি হলো। ডাকাতের দলটা ছয়শো গজ দূরে জটলা করে থেমে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু লরির গুলিতে ওদের একটা ঘোড়া মারা পড়ায় ওরা অর্ধচক্রাকারে আরও দূরে সরে গেল। পাল্টা জবাবে দুটো গুলি এলো, কিন্তু দুটোই মিস হলো। একটা ব্যাপার লক্ষ করে সে অবাক হলো যে ওদের দলের কেউই মেয়েটার পিছু নেয়ার চেষ্টা করল না। সবথেকে ডানের এবং বামের দুজন করে লোক ঘোরা পথ ধরে। ধীর গতিতে অদৃশ্য হলো। বাকি দুজন মরা ঘোড়াটার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকল। তবে তারা রাইফেল রেঞ্জের অনেক বাইরে রয়েছে।

ওরা চুপিসারে আমাকে পিছন থেকে আক্রমণ করতে চাইছে, আন্দাজ করল লরি। চারপাশে তাকিয়ে সে দেখল তার ঠিক পিছনেই একটা রিজ রয়েছে; ওটা ওদের কাজ অত্যন্ত সহজ করে তুলবে। আমার কাছে একটা ঘোড়া থাকলে খুব ভাল হত, ভাবল সে। কিন্তু যা নেই, তার কথা ভেবে কি লাভ?

একটা সিগারেট তৈরি করে ওটা ফুকতে ফুকতে দার্শনিক ভাবে নিজের নিয়তির কথাই ভাবল ও। প্রায় আধঘণ্টা পর রিজের ওপর থেকে কঠিন স্বরে একটা নির্দেশ এলো।

রাইফেল ফেলে দিয়ে গানবেল্ট খুলে হাত উপরে তুলে দাঁড়াও! আমরা দুজন তোমাকে কাভার করে আছি!

মুখ তুলে চেয়ে দেখল রিজের ওপর দুজন মুখোশধারী লোক দাঁড়িয়ে আছে। ওদের নির্দেশ মত রাইফেল ফেলে বেল্ট খুলে ফেলল সে। কিন্তু হাত উপরে না তুলে নিশ্চিন্ত মনে আরেকটা সিগারেট তৈরি করা শুরু করল।

এগিয়ে এসো, শান্ত স্বরে বলল সে।

আমি তোমাকে হাত তুলে দাঁড়াতে বলেছি, বলে দুজন লোক রাইফেল বাগিয়ে ধরে, ওর দিকে এগিয়ে এলো।

আমি ভুলে গেছি, এমন ভুল আমার হতেই থাকবে, হেসে জবাব দিল বন্দি। তোমরা কি করবে?

লোকটা দাঁতে দাঁত চেপে একটা অশ্রাব্য গালি দিল। প্রায় একই সাথে বাকি চারজনও রিজের উপর উঠে এলো। ওদের দুজন একই ঘোড়ার পিঠে রয়েছে। যাকে ওদের লীডার বলে মনে হলো সে ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নিচে নেমে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে কাঠিতে গেথে মাটিতে পুতে রাখল। তার কাজকর্ম অবাক চোখে দেখছে লরি।

তুমি যদি আমার ঘোড়ার কবরের স্মৃতিচিহ্ন রাখতে চাও, ওর নামটা ছিল বাউন্সার, নিজে থেকেই জানাল সে।

ওর কথার কোন জবাব না দিয়ে লোকটা সঙ্গীদের নির্দেশ দিল,..ওকে বেঁধে কোন ঘোড়ার পিঠে তুলে নাও। এখন দুজনকে ডাবল-রাইড করতে হবে।

লরিকে একটা ঘোড়ার পিঠে তুলে ঘোড়ার পেটের তলায় পা আর পিছমোড়া করে হাত বেঁধে তারা সোজা চূড়া লক্ষ্য করে রওনা হলো। সে জানে না ওর ভাগ্যে কি ঘটবে-কিন্তু এখন আর ওর মনে কোন দুঃখ নেই। ফিল এখন নিরাপদ। মেয়েটার শেষ কথাগুলোই ওর জন্যে একমাত্র সান্ত্বনা।

ফিলকে ক্লান্ত ঘোড়ার পিঠে ওভাবে একা ফিরতে দেখে এরফান আর অন্যান্য কাউবয়রা ছুটে ওর দিকে এগিয়ে গেল। অল্প কথায় কি ঘটেছে তা ওদের জানাল মেয়েটা। ফোরম্যান একটুও সময় নষ্ট করল না।

ঘোড়া আর রাইফেল, আদেশ দিল সে।

আমার জন্যেও একটা, হেনডন, বলে উঠল ফিল।

ফোরম্যান ওর দিকে তাকাল। তুমি এখন ক্লান্ত বলেই মনে হচ্ছে- শুরু করেছিল এরফান।

কিন্তু ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে মেয়েটা জোর দিয়ে বলল, আমি যাচ্ছি। আমাকে বাঁচাবার জন্যেই ও গলা বুজে আসায় মুখ ফিরিয়ে নিল ফিল।

এরফান, আর কোন আপত্তি তুলল না, কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছয়জন কাউবয় আর ফিলকে সাথে নিয়ে রওনা হয়ে গেল সে। ওরা নীরবেই রাইড করছে আক্রমণস্থলের উদ্দেশে। এতক্ষণ ওরা ঊর্ধ্বশ্বাসেই ঘোড়া ছোটাচ্ছিল, ফিল যখন সাবধান করল ঘটনার প্রায় কাছাকাছি জায়গায় পৌঁছে গেছে, কেবল তখনই ঘোড়ার গতি কমানো হলো। রিজটা চোখে পড়তেই সবাইকে থামার নির্দেশ দিল ফোরম্যান। ফিলের মনে পড়ল ওই রিজের ওপাশেই সে লরিকে ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল।

তোমরা এখানেই অপেক্ষা করো, বয়েজ, বলল এরফান। ওরা হয়ত আমাদের জন্যে নিজের ওপাশেই অপেক্ষা করছে। অন্ধের মত ওদের অ্যামবুশে পা দেয়ার কোন অর্থ নেই।

একাই এগিয়ে রিজ পেরিয়ে ওপাশে অদৃশ্য হলো এরফান।

ওর জায়গায় ব্ল্যাক বার্ট হলে নিজে ঝুঁকি না নিয়ে আমাদের কাউকেই সে পাঠাত, হেনডনকে বলতে শুনল ফিল।

কেন যেন তার মনে হলো লোকটা ঠিকই বলেছে। এতে ওই সাহসী ফোরম্যানের প্রতি ওর শ্রদ্ধা অনেক বেড়ে গেল। নিজের জীবনের ওপর এই অহেতুক ঝুঁকি সে না নিলেও পারত। কিন্তু পর মুহূর্তই বার্টের ঢুকানো বিষ তাকে সন্দিগ্ধ করে তুলল। সত্যিই কি সে ঝুঁকি নিয়েছে-নাকি এটাও তার নাটকেরই একটা সাজানো অঙ্কঃ

একটু পরেই চিৎকার করে ফোরম্যান সবাইকে এগিয়ে আসার নির্দেশ দিল। সবার আগে ফিলই রিজের মাথায় উঠল।

ওর ঘোড়াটাকে শকুনে খাওয়ার পর যেটুকু বাকি রেখেছে তা এখানে রয়েছে, জানাল এফান। তবে ঘোড়ার জিন আর মাথার সাজ অদৃশ্য হয়েছে। লরির কোন চিহ্নই এখানে নেই। কেবল এই কাগজটা একটা কাঠির মাথায় গাঁথা ছিল। লেখা আছে:

‘তোমার লোক এখন আমাদের হাতে, জেমস। ওকে যদি তুমি ফেরত চাও তবে
আগামীকাল গরু বিক্রির দুহাজার ডলার সহ দুপুর বেলা স্কাল ক্যানিয়নে হাজির হয়ো। তুমি না
এলে, বা কোন চালাকি করার চেষ্টা করলে ওকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে।
        দা, ব্ল্যাক মাস্ক।‘

ফিলের আতঙ্কিত চিৎকার আর কাউবয়দের বিড়বিড় করে বকা গালির শব্দ, পেনসিল দিয়ে লেখা মেসেজের প্রতিবাদে ওদের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট ব্যক্ত করল। এরফান লক্ষ করল মারিওর পকেটে পাওয়া লেখাটার সাথে এই লেখার হুবহু মিল রয়েছে। জেসাপ কাউবয়দের দিকে ফিরে ওদের র‍্যাঞ্চে ফেরার নির্দেশ দিল। ঝট করে ঘুরে ফোরম্যানের মুখোমুখি দাড়াল ফিল।

তুমি কি ওকে বাঁচাবার কোন চেষ্টাই করবে না? বলে উঠল মেয়েটা। তুমি নিশ্চয়ই ওর মৃত্যু চাও না?

এখন আর আমাদের কিছুই করার নেই, জবাব দিল সে। ওরা এতক্ষণে ওদের সব ট্র্যাক ঢেকে ফেলেছে। আমরা যদি এখন ওদের অনুসরণ করার চেষ্টা করি, তাহলে নিঃসন্দেহে আমরা অ্যামবুশের শিকার হব।

ওর দিকে চেয়ে থাকল ফিল; চোখে ঝড়ের পূর্বাভাস।

আমি বলব তুমি একটা কাপুরুষ, বলল সে। তুমি ওদের লীড় না করলে আমি নিজেই ওদের নিয়ে এগিয়ে যাব।

ওর কথার কোন জবাব দিল না এরফান। কিন্তু কাউবয়দের দিকে চেয়ে সে বুঝল ওরা কেউই ফিলের আদেশ মানবে না। শেষে হেনডনের থেকেই জবাবটা এলো।

ফোরম্যানের কথাই ঠিক, মিস মাস্টারসন, বলল সে। মিছে এভাবে পাথরে মাথা ঠুকে কোন লাভ নেই। ধরো আমরা যদি ওকে ওই দুর্গম উঁচু এলাকায় খুঁজেও পাই, আমাদের দেখামাত্র ওরা লরিকে কোন গাছে ঝুলিয়ে দিয়ে সরে পড়বে। আমাদের ওরা বগা-চিপিতেই আটকেছে।

কাউবয়দের দিকে রোষের দৃষ্টিতে একবার চেয়ে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে ফিরতি পথ ধরল ফিল। নীরবেই পথ চলছে মেয়েটা; ওর চোখের সামনে লরির হাসিখুশি চেহারাটা ভাসছে। সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না কিভাবে বিষণ্ণ চেহারায় কঠিন স্বরে যুবক, ওকে যত দ্রুত সম্ভব র‍্যাঞ্চে পৌঁছে খবর দিতে বলেছিল। সম্ভবত ওর জন্যেই যুবক নিজের জীবন নির্দ্বিধায় বিসর্জন দিল। হেঁট মাথায় ওকে অনুসরণ করছে নিরুপায় কাউবয়রা।

প্রায় বিনিদ্র একটা রাত কাটিয়ে পরদিন ফিল নিচে নেমে দেখল ফোরম্যান ওর সাথে দেখা করার জন্যে অপেক্ষা করছে। সে নোটের একটা বান্ডিল মেয়েটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, এটা সেই গরু বিক্রির টাকা। অবশ্য এর থেকে কাউবয়দের বেতন দিতে কিছু টাকা আমি খরচ করেছি। বাকি টাকাটা তুমি কোথাও নিরাপদে সামলে রাখো।

এটা তুমি আমাকে রাখতে দিচ্ছ কেন? প্রশ্ন করল ফিল।

তুমি ভুলে যাচ্ছ যে আজ দুপুরে আমাকে স্কাল ক্যানিয়নে হাজির থাকতে। হবে, মনে করিয়ে দিল সে।

তুমি কি সত্যিই স্কাল ক্যানিয়নে যাচ্ছ? বিস্মিত স্বরে বলল সে। কিন্তু তাহলে তো টাকাটাও তোমাকে সাথে নিতে হবে।

অবশ্যই আমি যাচ্ছি, কিন্তু কোন টাকা আমি সাথে নিচ্ছি না, জবাব দিল সে। আমি কচি খোকা নই।

কিন্তু টাকা ছাড়া তুমি ওকে কিভাবে বাঁচাবে?

তা আমি এখনও ঠিক করিনি; যেমন তাস পাব তার ওপর নির্ভর করবে খেলাটা আমি কিভাবে খেলব।

হালকা স্বরেই কথাটা বলল সে। কিন্তু ওর চোখের কোণে যে কৌতুকের আভাস ঝিলিক দিচ্ছে তা ফিলের নজর এড়াল না। তবু লোকটা মরিয়া একটা ঝুঁকি নিতে যাচ্ছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? ফিলের মনোভাব কিছুটা প্রসন্ন হলেও আবার সেই পুরোনো সন্দেহটা মনে চাড়া দিয়ে উঠল।

ব্যাপারটা যতটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে হয়ত আসলে তা নয়, ঠাণ্ডা স্বরে মন্তব্য করল ফিল। ওখানে তোমার কিছু বন্ধু-বান্ধব থাকতে পারে।

কথাটা শুনে রাগে এরফানের চোখদুটো কঠিন হয়ে উঠল; ঠোঁটও পরস্পরের ওপর চেপে বসল।

শোনো মেয়ে, কঠিন স্বরে বলল এরফান। ঈশ্বর তোমার কাঁধের ওপর। একটা সুন্দর মুখ বসিয়েছে বটে, কিন্তু সে তোমার মাথার ভিতর কোন মগজ ঢুকাতে কেন ভুলে গেল সেটাই আমার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকছে। যদি সত্যিই তোমার কোন বুদ্ধি থাকে তবে যৎসামান্য যা আছে সেটুকু ব্যবহার কোরো।

আর একটা কথাও না বলে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে এলো সে। তারপর। বাইরে অপেক্ষমাণ ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে উঠে দ্রুতবেগে অদৃশ্য হলো। তার। মন্তব্য এরফানকে কি পরিমাণ খেপিয়ে তুলেছে দেখে মেয়েটা স্তম্ভিত হলো। কিন্তু স্কাল ক্যানিয়নের ট্রেইল ধরার আগে হাত তুলে লোকটাকে তার। আউটফিটের লোকজনের কাছ থেকে বিদায় নিতে দেখল সে। এবার ধপাস। করে পাশের চেয়ারে বসে মেয়েটা শূন্য দৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে চেয়ে রইল। এটা তার জন্যে একটা নতুন অভিজ্ঞতা-মানুষকে সে আগেও রাগতে দেখছে, কিন্তু তাকে উদ্দেশ্য করে কেউ কখনও এতটা রাগ দেখায়নি। সারাটা দিন সে সন্দেহ আর অশান্তির মধ্যেই কাটাল। তার চোখ ঘুরে ফিরে উত্তরের ট্রেইলের ওপরই পড়ছে; সে জানে লরিকে দেখার আশাতেই ওর চোখ বারবার ওদিকে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *