০৬. রোদারফিল্ডে ফিরেছি

রোদারফিল্ডে ফিরেছি।

চ্যালেঞ্জারের পড়ার ঘরটা নিস্তব্ধ নিঝঝুম। শুধু দেয়াল ঘড়িটার টিকটিক শব্দ প্রচণ্ড জোরে কানে বাজছে। বিষাদের পাহাড়ে যেন চাপা পড়েছে আমার সমস্ত সত্তা। ভয়ঙ্কর দৃশ্যগুলো কিছুতে তাড়াতে পারছি না মন থেকে। ভেঙে পড়েছি। মন থেকে নামাতে পারছি না বিষণ্ণতার বোঝ।

খোলা জানালার পাশে চেয়ারে একা বসে গালে হাত দিয়ে ভাবছি আর ভাবছি। বন্ধুরা সব নিচে। হলঘরে। আর কদিন বাঁচব?-ঘুরেফিরে এই একটা প্রশ্নই মনে আসছে বার বার! মৃত পৃথিবীতে এ ভাবে বেঁচে থাকা মৃত্যুর চেয়ে ভয়ঙ্কর। পদার্থ বিদ্যায় আছে, বৃহত্তর বস্তু ক্ষুদ্রতম বস্তুকে কাছে টানে। মানুষ জাতটার বৃহত্তর অংশটাই চলে গেছে, বেঁচে আছি শুধু আমরা গুটি কয়েক হতভাগ্য জীব, নিজেদের মহামূর্ষতার কারণে। বৃহৎ অংশের টানে আমরা যাব কবে? কিভাবে? নতুন করে আবার হানা দেবে না তো মহাবিষ? পৃথিবীর তাবৎ মড়াগুলো পচে-গলে নতুন বিষ ছড়িয়ে দেবে বাতাসে, পানিতে। তাতেও দৃষিত হবে বাতাস। বায়ু আর পানি দূষণের কারণেও মারা যেতে পারি। আর তাতেও যদি না মরি, তো পাগল হয়ে যাব নির্ঘাত। কিংবা আত্মহত্যা করব। ভয়াবহ এই মরা পৃথিবীতে বেশিদিন মনের ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব নয় কোনমতেই।

হঠাৎ চমকে উঠলাম। ঘোড়ার পায়ের শব্দ! তাকিয়ে দেখি উঠে দাঁড়িয়েছে ছ্যাকরা গাড়ির ঘোড়াগুলো। গাড়ি টেনে নিয়ে উঠে আসছে। সাইসাই চাবুক হাঁকাচ্ছে কোচোয়ান। বুঝলাম, পাগল হয়ে গেছি। মাথার ঠিক নেই, তাই আবলতাবল দেখছি।

সাঁঝের গান গেয়ে উঠল পাখির দল। নিচের উঠানে কাশির শব্দ শুনলাম। অসম্ভব দৃশ্য। ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে অস্টিন। টলতে টলতে এগিয়ে যাচ্ছে গাড়ির দিকে।

পাহাড়ের ঢালে আবার পেরামবুলেটর ঠেলছে আয়াটা। গলফ-ফীন্ডে উঠে দাঁড়িয়েছে খেলোয়াড়েরা। চাষীরাও জীবন্ত! একি কাণ্ড! চিমটি কাটলাম নিজের হাতে। ব্যথা পেলাম। না, জেগেই তো আছি।

নিচের হলঘরে যাওয়ার জন্যে দৌড় দিলাম।

সেখানে আরেক বিচিত্র দৃশ্য। আনন্দের বন্যা বইছে। সবার সঙ্গে আন্তরিকভাবে হাত মেলাচ্ছেন মিসেস চ্যালেঞ্জার। আমাকে দেখে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন চ্যালেঞ্জার। মনে হলো ভালুকের আলিঙ্গন।

তারস্বরে চেঁচাতে লাগলেন লর্ড জন, প্রফেসর, ঘটনাটা কি বলুন তো? সত্যি দেখছি, না পাগল হয়ে গেছি!

মৃদু মৃদু হাসছেন চ্যালেঞ্জার। মাথা নেড়ে বললেন, না, সত্যি দেখছেন।

বাইরের উঠানে বেরিয়ে এলাম। গাড়ির বনেট তুলে গজগজ করছে অস্টিন। পাজী, বজ্জাত, ছুঁচো! দেখাব মজা!

কি হয়েছে, অস্টিন? জিজ্ঞেস করলেন চ্যালের।

লুব্রিকেটর খুলে ধুয়ে গেছে। নিশ্চয় মালীর ছেলেটার কাজ! আবার হাত দিয়েছে গাড়িতে!

লর্ড জনের দিকে তাকালেন চ্যালেঞ্জার। চোখ দুটো মিটিমিটি হাসছে। অপরাধীর মত হাত কচলাতে লাগলেন লর্ড। মালীর ছেলে নয়, অস্টিন, অপরাধটা আমার।

অবাক চোখে লর্ডের দিকে তাকাল অস্টিন। কিছু বুঝল না। চ্যালেঞ্জারের দিকে তাকিয়ে বলল, শরীরটা খুব খারাপ লাগছিল, স্যার। দম আটকে আসছিল। হোসপাইপ দিয়ে গাড়ি ধুতে ধুতে মাথা ঘুরে উঠেছিল হঠাৎ। আপনি বললেন, সন্ধ্যার মধ্যে পৃথিবীর সব প্রাণী মারা পড়বে। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ঘরে কখন গেছি, কি করে গেছি, জানি না। কপাল কেটে গেছে কি করে যেন!

অল্প কথায় সব বুঝিয়ে বললেন চ্যালেঞ্জার।

হাঁ হয়ে গেল অস্টিন। মনিবের প্রতিটি কথা নির্ধিধায় বিশ্বাস করল। জিজ্ঞেস করল, ব্যাংক অভ ইংল্যান্ডের সামনে গিয়েছিলেন?

হ্যাঁ!

ভেতরে ঢুকেছিলেন?

না।

আমি হলে ঢুকতাম। বস্তা বস্তা টাকা নিয়ে আসতে পারতাম। কেউ বাধা দেয়ার ছিল না। ইস, কেন যে আপনার কথামত আগেই ঘরে গিয়ে বসে থাকলাম না! বলেই ঠোঁট ওস্টাল। থাকগে, এখন আর আফসোস করে লাভ নেই।

গেটের কাছে এসে দাঁড়াল ঘোড়ার গাড়িটা। লাফ দিয়ে নামল ভেতরের আরোহী। ঘণ্টা বাজাল। এগিয়ে গেল অস্টিন আগন্তকের পরিচয় জিজ্ঞেস করল। তারপর একটা কার্ড হাতে নিয়ে ফিরে এল। বাড়িয়ে ধরল চ্যালেঞ্জারের দিকে। আগন্তকের ভিজিটিং কার্ড।

এক পলক দেখেই ফোঁস করে উঠলেন চ্যালেঞ্জার। জেগে উঠল যেন ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি। রাগে মাথার চুল খাড়া হয়ে গেল। ভয়ঙ্কর চিৎকার করে উঠলেন, রিপোর্টার! এখন কি? আগে তো আমার কথা বিশ্বাস হয়নি…ভেবেছ পাগলের প্রলাপ… অস্টিনকে বললেন, যাও, গেট আউট করে দিয়ে এসো! যেতে না চাইলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে।

দেখা করলে দোষ কি? নিরীহ মুখভঙ্গি করে বললাম।

খেঁকিয়ে উঠলেন প্রফেসর, দেখা করব মানে? ও ব্যাটা সাংবাদিক! খবরের কাগজের লোক। আস্ত শয়তান। আর নামের কি ছিরি! জেমস বাক্সটার!

আমিও তো খবরের কাগজের লোক…

তুমিও একটা… শয়তান বলতে গিয়েও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে। গেলেন চ্যালেঞ্জার। না, তুমি অবশ্য ব্যতিক্রম।

তাহলে দেখা করবেন না? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম আবার।

ঘোৎ-ঘোৎ আওয়াজ বেরোচ্ছে চ্যালেঞ্জারের গলা দিয়ে। গোয়ারের মত মাথা নেড়ে বললেন, রিপোর্টার জাতটাই খারাপ। বিষাক্ত পেশা। এর হাতে ক্ষমত থাকলে ভদ্রলোকদের জন্যে কাজ করা মুশকিল হয়ে পড়ে। তুমিও তো সংবাদিক,

তুমিই বলো, কোনদিন এরা আমার কোন কাজের প্রশংসা করেছে?

আপনিও তো কোনদিন ওদের প্রশংসা করেননি, সাহস করে মুখের ওপর খোঁচাটা দিয়ে দিলাম। চেঁচামেচি না করে নিজে যে একজন ভদ্রলোক সেটা অন্তত বুঝিয়ে দিন ওকে। এতটা পথ কষ্ট করে এসেছে শুধু আপনার সঙ্গে দেখা করার আশায়। সেটা কি আপনাকে সম্মান দেয়া হলো না?

আমার যুক্তি খণ্ডন করতে না পেরে গজগজ করতে লাগলেম চ্যালেঞ্জার, বেশ, করব দেখা। তবে তোমাকেও আসতে হবে সঙ্গে। যা বলার তুমি বলবে,। শুধু তুমি বলাতে কথাটা রাখলাম, এরপর যদি কেউ আসে আর সহ্য করব না বলে দিচ্ছি!

আমার পেছন পেছন মুখ কালো করে গেটের কাছে এলেন তিনি।

চ্যালেঞ্জারের চরিত্র জেনেশুনে তৈরি হয়েই এসেছে বাক্সটার। চালাক লোক। তাড়াতাড়ি নোটবুক বের করল। তোয়াজ করে নরম গলায় বলল, আমি লন্ডনের কেউ নই। পৃথিবীর আসন্ন বিপদ সম্পর্কে আমেরিকার মানুষ আপনার মুখ থেকে কিছু শুনতে চায়। আমি তাদের প্রতিনিধি।

তোয়াজ, নরম কথা, কোন কিছুতেই মন টলল না চ্যালেঞ্জারের। আমেরিকারই হোক আর যে দেশেরই হোক, লোকটা সাংবাদিক। আর প্রফেসরের কাছে সব সাংবাদিকই এক। আমাকে মুখ খোলারও সুযোগ দিলেন না। গম্ভীর স্বরে বললেন, পৃথিবীর আর কোন আসন্ন বিপদ আছে বলে আমার জানা নেই।

বোকার মত হাঁ করে চ্যালেঞ্জারের দিকে তাকিয়ে রইল বাক্সটার। বিষাক্ত ইথারের বলয়ে পৃথিবীর ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা আছে, আপনিই তো বলেছিলেন?

বলেছিলাম। কিন্তু সে-ধরনের কোন বিপদের সম্ভাবনা এখন আর নেই।

ঘাবড়ে গেল সাংবাদিক। ভুল লোকের কাছে চলে এসেছে ভেবে জিজ্ঞেস করল, কিছু মনে করবেন না। আপনি কি প্রফেসর চ্যালেঞ্জার?

আপনার কি মনে হয়? বাড়ির গেটে তো এই নামই দেখলাম!

চোখ তাহলে ঠিকই আছে। আপনার অবগতির জন্যে জানিয়ে রাখছি, বাড়িটা আমার। গেটের নেমপ্লেটটাও আমারই নামে।

সরি, স্যার। তাহলে আপনি বলছেন আর কোন বিপদ নেই? আজকের টাইমস পত্রিকায় ছাপা আপনার চিঠিতে কিন্তু অন্য কথা বলেছেন।

ওটা আজকের নয়, কালকের, শুধরে দিলেন চ্যালেঞ্জার।

কালকের! চোখ বড় বড় হয়ে গেল সাংবাদিকের।

চিঠি পড়েই কি ছুটে এসেছেন?

হ্যাঁ।

আসার পথে অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ করেছেন?

করেছি। ইংরেজন্তুদের এমন পাগল হয়ে যেতে এর আগে কখনও দেখিনি।

আর কিছু?

না তো! আর কিছু তো তেমন মনে পড়ছে না!

ভিক্টোরিয়া থেকে কটায় বেরিয়েছিলেন?

সোয়া দুটো। কিন্তু এ সব প্রশ্ন…

ট্রেন থেকে নেমেই ঘোড়ার গাড়ি নিয়েছিলেন? বাক্সটারকে কথা বলতে না দিয়ে আবার প্রশ্ন করলেন চ্যালেঞ্জার।

হ্যাঁ।

এখান থেকে স্টেশন কদ্দূর?

মাইল দুয়েক তো হবেই।

দুই মাইল আসতে কতক্ষণ লাগল? এখন কটা বাজে?

চমকে উঠল সাংবাদিক। তাই তো, এটা তো খেয়াল করেনি! এখন যে সন্ধে সোয়া ছটা। দুমাইল পথ আসতে ঘোড়ার গাড়িতে বড়জোর পৌনে এক ঘণ্টা লাগার কথা।

প্রফেসর, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না…

আবার বাধা দিলেন চ্যালেঞ্জার, পাহাড়ে ওঠার সময় শরীর খারাপ লাগছিল? মনে করে দেখুন তো?

এক মুহূর্ত ভাবল বাক্সটার। তারপর মাথা দুলিয়ে বলল, হ্যাঁ, ভীষণ ঘুম পাচ্ছিল। আর বুকে অদ্ভুত একটা চাপ! মাথা ঘুরে উঠেছিল…

এবং তারপর এক ঘুমে আটাশ ঘণ্টা পার করে দিয়েছেন। আজকের টাইমসে নয়, গতকাল আমার চিঠি পত্রিকায় পড়েছিলেন, জনাব। বুঝতে পারছেন? আত্মতৃপ্তির হাসি হাসলেন চ্যালেঞ্জার। তা বুঝবেনই বা কি করে? সবাই তো আর প্রফেসর চ্যালেঞ্জার নয়…

.

পরদিন ফলাও করে দুনিয়ার সমস্ত পত্রিকায় রিপোর্ট বেরোল! চমকপ্রদ সব শিরোনাম:

আটাশ ঘণ্টা ধরে দুনিয়া সংজ্ঞাহীন!
 প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের যুক্তিই ঠিক!
আবার ঘটবে নাকি ইথার বিপর্যয়?

আরও নানা রকম মজার মজার সব হেডিং।

আমাদের পত্রিকাতেও আমার লেখা একটি বিশেষ প্রবন্ধ বেরোল: এটা এক স্বতঃসিদ্ধ সত্য যে অসংখ্য, অনন্ত, সুপ্ত শক্তি বেষ্টিত হয়ে নেহাতই সঙ্গীন অবস্থায় রয়েছি আমরা মানুষ জাতটা। সেকাল এ কালের দূরদর্শী দার্শনিকেরা বার বার এই সত্য সম্পর্কে হুঁশিয়ারি জানিয়েছেন। কিন্তু তবু ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারিনি আমরা এতদিন। এবারে, এই দারুণ বিপর্যয়ে পড়েও যদি মানুষ জাতটার শিক্ষা না হয়, তো আর কোনদিনই হবে না…

দীর্ঘ প্রবন্ধে অনেক কথাই বললাম। অগ্নিকাণ্ড, ট্রেন দুর্ঘটনা, ইথার-বিষ সংক্রান্ত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির বিরাট ফিরিস্তি সহ লিখলাম আমাদের অক্সিজেন-কক্ষ আর রোমহর্ষক মোটর অভিযানের কথা। বিস্তারিত, সব। কোন কথা বাদ না দিয়ে।

.

সে-রাতে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের পড়ার ঘরে সমবেত হলাম আমরা। চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম আমি, চ্যালেঞ্জার, সামারলি এবং লর্ড জন। কফি সরবরাহ করলেন মিসেস চ্যালেঞ্জার।

কফির কাপে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, প্রফেসর, একটা কথা কিন্তু এখনও বুঝলাম না। মরে যাওয়া মানুষগুলো আবার বেঁচে উঠল কিভাবে?

আসলে মরেইনি ওরা, বললেন চ্যালোর। ইথারের বিষক্রিয়ায় অসাড় হয়ে গিয়েছিল শুধু। মৃত্যুর সমস্ত লক্ষণ ফুটে উঠেছিল চেহারায়। এ ধরনের সাময়িক মৃত্যু ঘটতে পারে, মেডিক্যাল সাইলে আছে। এতে রোগীর টেম্পারেচার নেমে যায়, শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, নাড়ির গতি এত ক্ষীণ হয়ে যায় যে ধরাই যায় না। কয়েক ঘণ্টার জন্যে এই সাময়িক মৃত্যুই ঘটেছিল সবার। অল্প সময়ের মধ্যে বিষ বলয় থেকে পৃথিবী বেরিয়ে যাওয়াতে বেঁচে গেছে। আরও বেশি সময় থাকলে… কি ঘটত ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন প্রফেসার।

শীত করতে লাগল। খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। চাঁদ উঠেছে। আগের রাতের মত। তবে আজ আর ফ্যাকাসে লাগল না রূপালী আলোটা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *