যখন ঘুম ভাঙল বেলা চড়ে গেছে। সূর্যের অবস্থান থেকে মনে হল আটটার বেশি হবে। ছায়ায় ঘাসের ওপর শুয়ে নানান চিন্তা এল মাথায়। বিশ্রামের পর বেশ হালকা আর ঝরঝরে লাগছে। চারদিকে বড় বড় গাছ, পাতার ফাঁক দিয়ে স্নান সূর্যের আলো এসে পড়েছে খানিকটা। মাটিতে ডালপালার ছায়াগুলো নড়ছে বাতাসে। ছোট্ট একটা ডালে বসে আছে একজোড়া কাঠবেড়াল। বেশ মিতালি ওদের মধ্যে। আমার দিকে তাকিয়ে কুট কুট করে কী যেন বলছে। আলসেমি লাগছে, উঠে গিয়ে নাস্তা বানাই ইচ্ছে করছে না। ঝিমুনি আসছে। হঠাৎ বুম্ বুম্ করে বিকট শব্দ ভেসে এল নদীর দিক থেকে। তন্দ্রার ভাবটা ছুটে গেল, কনুইয়ের ভরে কান পাতলাম। একটু বাদেই আবার ভেসে এল আওয়াজটা। ব্যাপার কী দেখার জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠল মন, লাফিয়ে এগিয়ে গেলাম সামনে। ডালপালার ফাঁক দিয়ে তাকালাম বাইরে। নদীর ওপর জায়গায় জায়গায় ধোঁয়ার মেঘ, যাত্রীবাহী একটা ফেরি নৌকো যাচ্ছে। বুঝলাম ঘটনাটা। ফের বুম্ করে শব্দ হল। ফেরির পাশ থেকে ভক্ করে বেরিয়ে এল খানিকটা সাদা ধোঁয়া। ওপর থেকে পানির ভেতর কামান দাগছে ওরা, যাতে আমার লাশ ভেসে ওঠে।

এদিকে দারুণ খিদে পেয়েছে আমার, কিন্তু আগুন জ্বালব তার উপায় নেই। ধোঁয়া দেখে ফেলবে ফেরির লোকেরা। তাই, বসে বসে কামান দাগা দেখতে লাগলাম। নদীটা ওখানে প্রায় মাইল খানেক চওড়া। ওদের খোঁজাখুঁজি বেশ উপভোগ করছিলাম আমি। আফসোস একটাই খাবার কিছু নেই। হঠাৎ একটা কথা। মনে পড়ল: আরে একটা রেওয়াজ আছে না কেউ ডুবে মরলে একটা পাউরুটির ভেতর পারদ পুরে ভাসিয়ে দেয়া হয় সেটা? লাশটা যেখানে ডুবে থাকে সেখানে গিয়ে থামে রুটি। দেখতে হয়, ভাবলাম মনে মনে, এরকম কোন রুটি ভেসে আসে কি-না। ভাগ্যপরীক্ষা করতে দ্বীপের যেদিকটায় ইলিনয়, সেদিকটায় গেলাম। নিরাশ হতে হল না। একটা বড় স্যান্ডউইচ ভেসে আসছে। লম্বা একটা লাঠি দিয়ে সেটাকে ধরবার চেষ্টা করছি, এমন সময়ে পা ফসকে গেল আমার। রুটিটাও ভেসে চলে গেল বেশ খানিকটা দূরে। এদিকটায় স্রোতের বেগ বেশি, আমি জানি। একটু বাদে আরও একটা রুটি ভেসে এল। এবার আমিই জিতলাম। ছিপি খুলে ঝাঁকিয়ে বের করে দিলাম ভেতরের পারদটুকু। তারপর খাওয়া শুরু করলাম। ভাল কারিগরের তৈরি রুটি, মজা লাগল খেতে।

খাওয়া শেষে পাইপ ধরালাম। ঠিক করলাম, ওই নৌকোয় কারা আছে দেখব। ফেরিটা ভাটি বেয়ে আমার দিকে আসার আগেই শুয়ে পড়লাম উপুড় হয়ে। ইতিমধ্যে নিবিয়ে ফেলেছি পাইপ।

আস্তে আস্তে স্রোতের তোড়ে পাড়ের কাছাকাছি চলে এল ফেরি। সাবধানে গলা বাড়িয়ে উঁকি দিলাম। সব চেনা মুখ বাবা, জাজ থ্যাচার, জো হারপার, টম সয়্যার। খুনের ব্যাপারেই আলোচনা করছে সবাই।

এই দেখ, হঠাৎ ওদের কথার মাঝখানে বলল ক্যাপ্টেন, স্রোতটা এখানে তীব্র। এমনও হতে পারে স্রোত ওর লাশটা ঠেলে পাড়ে এনে ফেলেছে, এবং সে হয়ত নদীতীরের গাছপালার ভেতর আটকে রয়েছে। অন্তত আমার তা-ই ধারণা।

ডেকে ভিড় জমাল সবাই, ঝুঁকে দেখতে লাগল রেলিংয়ের ওপর দিয়ে। কারো মুখে কথা নেই, দৃষ্টি যতটা সম্ভব প্রখর করে দেখছে। গুড়ির আড়াল থেকে ওদের স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমি, তবে ওরা দেখতে পেল না আমাকে।

পিছে হটো! সুর করে বলল ক্যাপ্টেন। পরক্ষণেই কামান দাগার শব্দে কানে তালা লেগে গেল আমার। ধোঁয়ায় অন্ধ হয়ে গেল চোখ। মনে হল বুঝি খতম হয়ে গেছি। ভাগ্যিস গোলার ভেতর বুলেট নেই, নইলে ওরা যে-লাশটা খুঁজছে, সেটাই পেয়ে যেত হয়ত। হাঁফ ছেড়ে শোকর আদায় করলাম। ধীরে ধীরে দ্বীপের ওপাশ দিয়ে ঘুরে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল ফেরি। দূর থেকে ভেসে আসছে তোপ দাগার আওয়াজ।

ক্রমে, এক ঘণ্টা পর, আর শুনতেই পেলাম না শব্দ। দ্বীপটা লম্বায় তিন মাইল। সম্ভবত শেষ মাথায় পৌঁছে গেছে ওরা, ভাবলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম, মিসৌরির দিকে যে-নালাটা বেরিয়ে গেছে, সেদিকে গোলা ফেলা হচ্ছে। তারপর এক সময় ক্ষান্ত দিয়ে সবাই ফিরে গেল যে যার বাসায়।

বুঝলাম, এবার আমি নিরাপদ। আর কেউ পিছু ধাওয়া করে আসবে না শিকারির মত। ডিঙি থেকে পোটলা-পুঁটলি নিয়ে এসে ঘন জঙ্গলে আস্তানা গাড়লাম। কম্বলগুলোকে তাঁবু বানিয়ে তার তলায় জিনিসপত্র রাখলাম। একটা ট্রাউট ধরে রান্না করে খেলাম। তারপর, সকালে নাস্তার জন্যে যদি কিছু মাছ মেলে এই আশায় একটা বড়শি পেতে রাখলাম নদীতে।

এইভাবে গেল তিনদিন আর তে-রাত্তির। কোন তফাত নেই, বাঁধা গৎ। চতুর্থ দিন নতুন কিছু আবিষ্কারের আশায় ঘুরে দেখতে লাগলাম দ্বীপের চারদিক। এখন এই দ্বীপের মালিক আমি। এর সবকিছুই ধরতে গেলে আমার। তাই ভাল করে ওয়াকিফহাল হতে চাইলাম দ্বীপটা সম্পর্কে। আসলে আমার উদ্দেশ্য সময় কাটানো। অসংখ্য স্ট্রবেরি চোখে পড়ল। পাকা, টসটসে। গ্রীষ্মকালের কাঁচা আঙুর দেখলাম। রাজবেরিও আছে কিছু, কালো কালো জাম ধরতে শুরু করেছে সবে। হিসেব করে দেখলাম দরকারমত এগুলো এক এক করে পাওয়া যাবে হাতের কাছে। উদ্দেশ্যহীনভাবে গভীর বনের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে এক সময় মনে হল দ্বীপের শেষ মাথায় এসে পৌঁছেছি। হাতে গাদা বন্দুকটা থাকলেও, কোন শিকার করিনি। এটা রেখেছিলাম, মূলত, আত্মরক্ষার জন্যে। ভাবলাম, তাঁবুর কাছাকাছি এসে কিছু শিকার করব। আরেকটু হলেই একটা সাপের ওপর পা পড়ত। আমার কপাল ভাল, সাপটা সরে গেল পেছনে, ঘাস আর ফুলের ভেতর দিয়ে চলে যেতে লাগল। আমিও সেটাকে গুলি করার জন্যে এগিয়ে গেলাম পেছন পেছন। শক্তহাতে বাগিয়ে ধরলাম বন্দুকটা। পুড়ে শেষ হয়ে যাওয়া একটা ক্যাম্পফায়ারের ছাইয়ের ওপর হঠাৎ পা পড়ল আমার। ছাইয়ের গাদা থেকে তখনও ধোঁয়া বের হচ্ছে একটু একটু। ধড়াস করে উঠল বুকটা। বন্দুকের সেফটি ক্যাচ নামিয়ে দ্রুত পা-টিপে পালিয়ে এলাম। মাঝে দুএক জায়গায় থামলাম কয়েক সেকেন্ডের জন্যে। কান পাতলাম কিছু শোনার আশায়। কিন্তু আমার বুকের ধুকপুকানি ছাড়া কিছুই শুনতে পেলাম না। গাছের কাটা গুঁড়ি দেখলেও মানুষ বলে ভুল হতে লাগল।

তাঁবুতে ফিরেও অস্বস্তির ভাবটা গেল না। পালাব, ঠিক করলাম মনে মনে। তাড়াতাড়ি মালপত্র ডিঙিতে তুললাম, যাতে সেগুলো চোখের আড়ালে থাকে। আমার জ্বালানো আগুনটা নিবিয়ে ছাইগুলো এমনভাবে চারদিকে ছড়িয়ে দিলাম যেন দেখে মনে হয় গত বছর কেউ এসে আস্তানা গেড়েছিল ওখানে। তারপর একটা গাছে চড়লাম। প্রায় দুঘন্টার মত কাটালাম সেখানে। কিছুই চোখে পড়ল না বা শুনলাম না। তবু মনে হল যেন শুনছি, দেখছি হাজারও জিনিস। এক সময় নেমে এলাম, ঝোপের আড়ালে বসে নজর রাখলাম চারপাশে।

সন্ধের ঠিক আগে চাগিয়ে উঠল খিদে। চাঁদ ওঠার আগেই কেটে পড়লাম সেখান থেকে। প্রায় পোয়া মাইল দূরে, ইলিনয় তীরের দিকে, বনের ভেতর ঢুকলাম। আগুন জ্বেলে খাবার তৈরি করলাম রাতের। ঠিক করলাম, ওখানেই কাটাব রাতটা। হঠাৎ কানে এল একটা খটর-খট শব্দ। ঘোড়া আসছে, সান্ত্বনা দিলাম মনকে। পরক্ষণেই মানুষের গলা শুনতে পেলাম। তাড়াতাড়ি সবকিছু ডিঙিতে নিয়ে রাখলাম। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে জঙ্গলের ভেতর দেখার চেষ্টা করলাম ব্যাপারটা কী। একটু যেতেই কানে এল একজন বলছে: আমরা এখানেই তাবু ফেলি। তারপর দেখব কোন ভাল জায়গা মেলে কি-না। ঘোড়াগুলোর দম তো প্রায় ফুরিয়ে গেছে।

আর অপেক্ষা করলাম না। ডিঙি নিয়ে ফিরে গেলাম সেই আগের জায়গায়, যেখানে প্রথম এসে নেমেছিলাম। ঠিক করলাম, নৌকোতেই ঘুমাব। কিন্তু কিছুতেই ঘুম এল না।

দেখা দরকার দ্বীপে আমার সাথে আর কে আছে, বললাম আপনমনে। বৈঠা মেরে রওনা হলাম আবার। জলের ওপর চাঁদের আলো পড়ে ভেঙে যাচ্ছে। ওপাশে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার বনানী। কোথাও কোন প্রাণের আভাস নেই, কেবল বৈঠা বাওয়ার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। ঝিরঝির বাতাস বইছে। দ্বীপের শেষ প্রান্তে এসে তীরে নামলাম, জঙ্গলের ভেতর ঢুকে বসলাম একটা গুড়ির ওপর। তারপর উঁকি দিলাম ঘন পাতার ভেতর দিয়ে। চাঁদের পাহারা দেবার পালা শেষ হয়ে এসেছে, নদীটাকে কম্বলের মত ঘিরে ফেলছে অন্ধকার। একটু বাদেই গাছপালার মাথার ওপর দেখা দিল মরাটে আলো। বুঝলাম, ভোর হতে চলেছে। যেখানে নিভন্ত আগুন দেখেছিলাম, বন্দুক হাতে দৌড়ে গেলাম সেদিকে। পথে প্রতি দুএক মিনিট অন্তর থেমে কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোন শব্দই কানে এল না। হঠাৎ গাছের ফঁকি দিয়ে চোখে পড়ল একটা মৃতপ্রায় আগুন। খুব সাবধানে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। একটা লোক মাটিতে শুয়ে আছে, মাথায় কম্বল জড়ান। দৃশ্যটা দেখে ভড়কে গেলাম। দেখে মনে হচ্ছে, আগুনের ভেতর পড়ে রয়েছে মাথাটা। ফুট দুই দূরে একটা ঝোপের আড়ালে গিয়ে বসলাম। ততক্ষণে দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে ইতি-উতি। একটু পরেই হাই তুলে হাত-পা ছড়াল লোকটা, মুখের ওপর থেকে সরিয়ে ফেলল কম্বল।

ওমা! এ যে দেখি মিস ওয়াটসনের চাকর, জিম! আরে, জিম? বলতে বলতে বেরিয়ে এলাম ঝোপের আড়াল থেকে।

তড়াক করে লাফিয়ে উঠল জিম, খ্যাপার মত চেয়ে রইল আমার দিকে। তারপর হাঁটু গেড়ে জোড়হাতে বলল, মেরো না আমাকে। কোন ভূতের ক্ষতি করিনি আমি। বরং মরা মানুষকে পছন্দ-ই করি। যাও, নদীতে ফিরে যাও তুমি।

আমি যে মরিনি, সেটা ওকে বোঝাতে সময় লাগল না বেশি। ওকে দেখে খুশিই হলাম বরং, দূর হয়ে গেল একলা ভাবটা। বললাম, আশা করি আমার কথা কাউকে বলবে না সে। নীরবে কথা শুনে যেতে লাগল ও।

কদ্দিন থেকে এখানে আছ, জিম? জিজ্ঞেস করলাম।

যেদিন তুমি খুন হলে তার পরের রাত থেকে। তুমি?

যেদিন খুন হলাম, সেই রাত থেকে।

এরপর নাস্তার জোগাড়ে বসলাম আমরা। একটা ট্রাউট ধরলাম আমি। জিম ভাজল। নাস্তা তৈরি হয়ে গেলে আধশোয়া অবস্থায় খেতে লাগলাম গরমগরম। গোগ্রাসে গিলতে লাগল জিম, ভীষণ ক্ষুধার্ত ছিল ও। খাওয়ার পর শুয়ে পড়লাম।

আচ্ছা, হাক, ওই রাতে তাহলে খুন হয়েছিল কে? প্রশ্ন করল জিম।

পুরো ব্যাপারটা খুলে বললাম ওকে। শুনে তারিফ করল। বলল, টম সয়্যারও নাকি এর চেয়ে ভাল ফন্দি আঁটতে পারত না।

তুমি এখানে এলে কেন, জিম? প্রশ্ন করলাম। আর এলেই-বা কীভাবে?

প্রশ্ন শুনে অস্বস্তিতে পড়ে গেল জিম। মিনিটখানেক চুপ করে থেকে মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, বলব, যদি কাউকে না বল। আগে কথা দাও, হাক।

বলব না।

বেশ, করলাম বিশ্বাস। আমি…আমি পালিয়ে এসেছি।

বল কী, জিম!

হ্যাঁ। কিন্তু মনে রেখ, হাক, কথা দিয়েছ তুমি, কাউকে কিছু বলবে না।

না, বলব না। সত্যি বলছি। জানি, দাসপ্রথার বিরোধিতা করছি বলে লোকে খারাপ বলবে আমাকে। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। তাছাড়া, আমি তো আর ফিরে যাচ্ছি না ওখানে। এবার বল, কীভাবে পালালে।

জিম জানাল, ওর মনিব, মিস ওয়াটসন, খুব খারাপ ব্যবহার করত ওর সাথে। একদিন রাতে বাড়ি ফিরে ও শোনে, এক দাস-ব্যবসায়ীর কাছে ওকে বিক্রি করার মতলব এটেছে বুড়ি। আটশ টাকায়, অরলিয়ন্সে। সে-রাতেই পালিয়েছে ও। রাতটা কাটিয়েছে নদীর পাড়ে যে-ভাঙা দোকানঘরটা আছে, সেখানে। পরের সকালটাও ওখানেই ছিল। পথচারীদের ভেসে আসা টুকরো টুকরো কথায় বুঝতে পেরেছে আমি খুন হয়েছি। খবরটা শুনে দারুণ দুঃখ পেয়েছিল ও। তবে এখন, আমি বেঁচে আছি দেখে, আর খারাপ লাগছে না। বেলা ডোবার পর মাইল দুই হেঁটে নদীতে নামে। একটা ভেলা চোখে পড়ায় সাঁতরে সেটায় গিয়ে ওঠে। ওর বরাত মন্দ, লোক ছিল ভেলাতে। সে পেছনে আসার উপক্রম করতেই চুপিসারে ফের পানিতে নেমে পড়ে ও। তারপর বহু কষ্টে সাঁতরে উঠেছে এখানে এসে। সেই থেকে ফলমূল খেয়ে আছে, আর কিছু পেটে পড়েনি।

কথা চলছে, এমন সময় উড়ে এল কয়েকটা পাখির বাচ্চা। বাচ্চাগুলো একবার উঠছে, একবার নামছে। জিম বলল বৃষ্টি হবে। এটা তারই চিহ্ন। যখন মুরগির বাচ্চা অমনভাবে ওড়ে, তখন নাকি বৃষ্টি হয়। সুতরাং পাখির বাচ্চা যখন ওভাবে উড়ছে তখন, ওর ধারণা, তা-ই হবে। পাখিগুলো ধরতে গেলাম আমি, বাধা দিল জিম। বলল, এর অর্থ মৃত্যু। ওর বাবা একবার খুব অসুখে পড়েছিল, সেসময় ওদের এক আত্মীয় নাকি একটা পাখি ধরেছিল। সেই দেখে ওর বুড়ি দাদি বলেছিল, জিমের বাবা মারা যাবে। আর সত্যি সত্যিই মারা যায় সে।

দ্বীপের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে একদিন গুহা আবিষ্কার করলাম আমরা। একটা পাহাড়ের ওপরে গুহাটা, আয়তনে তিন-চারটে বড় কামরার সমান। গুহার ভেতরটা ঠাণ্ডা। আমাদের মালপত্র সরাসরি ওখানে এনে রাখার পক্ষে মত দিল জিম। কিন্তু আমি রাজি হলাম না, কারণ সব সময় ওই রকম বেয়ে ওঠানামা সইবে না আমার ধাতে।

জিম যুক্তি দেখাল। বলল, এতে লাভ আছে। দ্বীপে কেউ এসে আমাদের খোঁজ করলে, ওখানে এসে লুকোতে পারব আমরা। তাছাড়া, সেই পাখির ছানাগুলো যেভাবে উড়ছিল তাতে ওর ধারণা, বৃষ্টি হবেই। সেক্ষেত্রে ভিজে যাবে জিনিসপত্র।

ফিরে গেল সে। বৈঠা মেরে ডিঙিটাকে এনে রাখল গুহা বরাবর। টেনে টেনে সব মাল নিয়ে এল গুহায়। তারপর নৌকোটা লুকিয়ে রাখতে উইলো ঝোপের ভেতর একটা জায়গা খুঁজে বের করলাম আমরা।

সন্ধে নাগাদ ঘোর হয়ে এল চারদিক। বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল ঘন ঘন। পাখির বাচ্চা ওড়ার ব্যাপারটা তো তাহলে ঠিক, ভাবলাম। একটু পরেই শুরু হল বৃষ্টি, ঝেঁপে। এত জোর-বাতাস কখনও দেখিনি আমি।

শুরু হল ঝড়ের মাতম। ক্রমশ গাঢ় হয়ে এল অন্ধকার, কালচে নীল হয়ে গেল আকাশ। ভারি সুন্দর লাগছে। পাহাড়ের গায়ে জোর ঝাপটা মারছে বৃষ্টি; আবছা দেখা যাচ্ছে অদূরের গাছপালা, যেন মাকড়সার জাল। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়ায় নুয়ে যাচ্ছে মাথাগুলো, তখন স্পষ্ট চোখে পড়ছে পাতার নিচের ফ্যাকাসে অংশ। পরক্ষণেই এক-একটা ঝটকা বাতাস এসে ডালপালা এমনভাবে ওলটপালট করছে যে মনে হচ্ছে, সেগুলো আকাশে হাতপা ছুঁড়ে নাচছে পাগলের মত।

জিম, দ্যাখ, কী সুন্দর! বললাম। আর কোথাও যাবার একটুও ইচ্ছে নেই আমার।

সারা রাত চলল বৃষ্টি। জোয়ারের পানিতে ফুসে উঠল নদী, পাড় ছাপিয়ে গেল। ভেসে গেল দ্বীপের নিম্নভাগ। তবে যে-দিকে মিসৌরি, সেদিকটা ডুবল না; পাড় সেখানে খাড়া, পাহাড়ের মত।

বানের পানিতে ভেসে এল নানা ধরনের জিনিস; পাখির ছানা, খরগোশও ছিল তার ভেতর। ওগুলো ধরে ধরে গুহার ভেতর পালতে লাগলাম।

একদিন রাতে একটা ভাঙা ভেলা ধরলাম—বেশ মজবুত, পাইনতক্তার তৈরি। বার ফুট চওড়া, পনের-ষোল ফুট লম্বা; সমতল মেঝে, পানি থেকে ছ-সাত ইঞ্চি উঁচু।

আরেক দিন, ভোরের আলো ফুটবার ঠিক আগে, দেখতে পেলাম পশ্চিম দিক থেকে ভেসে আসছে একটা কাঠের কুঁড়ে, ভাঙাচোরা। ডিঙি বেয়ে সেখানে গিয়ে উঠলাম আমরা। একটা খাট, টেবিল, খান দুয়েক পুরোন চেয়ার আর কিছু আজেবাজে জিনিস ছড়িয়ে আছে ঘরের ভেতর। এক কোণে পড়ে আছে একটা লোক।

লোকটার কাছে গেল জিম। আরে, এ দেখছি মারা গেছে, হাক, বলল ও। পেছন থেকে গুলি করে মারা হয়েছে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ো না। একটা পুরোন কাপড় দিয়ে লাশটা ঢেকে দিল ও। আমি তাকালাম না, ইচ্ছেও করছিল না।

ময়লা তেলচিটে অনেকগুলো তাস ছড়িয়ে আছে মেঝেতে। গড়াগড়ি খাচ্ছে কয়েকটা মদের বোতল। দেয়ালময় কয়লা দিয়ে হিজিবিজি কী সব লেখা। দুটো পুরোন ময়লা সুতি কাপড়ও আছে দেখলাম। রোদ থেকে বাঁচার জন্যে একটা টুপি, আর মেয়েদের কিছু কাপড় ঝুলছে হুঁকে। সেগুলো এনে ডিঙিতে তুললাম—সময়ে কোন কাজে লেগে যেতে পারে। শোলার টুপি ছিল একটা, নিলাম সেটাও। কাজে লাগতে পারে এমন সব খুঁটিনাটি জিনিস-লণ্ঠন, কসাইদের চাপাটি, লেপ-কিছুই বাদ রাখলাম না।

ওখান থেকে ফেরার সময়ে দেখলাম দ্বীপ থেকে প্রায় পৌনে এক মাইল দূরে সরে এসেছি। এদিকে ভোরও হয়ে এসেছে। জিমকে ডিঙিতে শুইয়ে লেপ দিয়ে ঢেকে দিলাম। কারণ বসে থাকলে দূর থেকেও নিগ্রো বলে চেনা যাবে ওকে। আমি বৈঠা মেরে এগিয়ে গেলাম ইলিনয় তীরের দিকে। প্রায় আধ মাইল ঘুরে পৌঁছুলাম দ্বীপে।

Share This