০৬. জোর ঠাণ্ডা বাতাস বইছে

জোর ঠাণ্ডা বাতাস বইছে বাইরে। পিছনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কান পেতে ভিতরের শব্দ শোনার চেষ্টা করল মাভেদ। অস্পষ্ট গুঞ্জন ছাড়া কথা কিছুই বুঝতে পারল না। সে। সামনের দরজা খোলার শব্দটা শোনা পর্যন্ত অপেক্ষা করল জাভেদ, তারপর নীচে নেমে দ্রুত হেঁটে আস্তাবলের কাছে চলে এল সে।

আস্তাবলের দেয়ালের সাথে সেঁটে দাঁড়িয়ে দ্রুত চিন্তা করে নিল সে। শহরে মোটে কয়েকটা বাড়িই আছে, আর সেগুলোর সবকটাতেই তল্লাশী চালানো হবে, সুতরাং ওগুলোর কোনটায় আশ্রয় নেওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না।

অ্যালেক হঠাৎ এখানে হাজির হওয়ায় খুব অবাক হয়েছে জাভেদ। সে যে এখানে এসেছে তা জানার কথা নয় ওর। হয়তো ওরা লুইস আর চার্লিকে খুঁজতে এসেছে-কিন্তু ওদের সাথে তো অ্যালেকের কোন বিরোধ নেই? অর্থাৎ সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোন কারণে এখানে ওদের আগমন হয়েছে।

প্যাডি ওকে বিল শার্প নামে চেনে। এর মানে কী? ভুল করেছে প্যাভি? কিন্তু মনে হয় প্যাডি ওকে অনেক আগে থেকেই চেনে। হতে পারে অ্যালেকই আগে। অন্য নাম ব্যবহার করত।

এখানে দাড়িয়ে থাকলে কোন লাভ হবে না। কিছু একটা করা দরকার তার। ওখান থেকেই সে লক্ষ করল চারদিকে লোকজন খুঁজতে বেরুল। প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি খোঁজ করছে ওরা। ধীরে ধীরে পিছু হটে জঙ্গলের দিকে চলে গেল জাভেদ। ওরা মোটেও আশা করবে না এই শীতে বাইরে রয়েছে সে।

কিছুক্ষণ পরে অ্যালেককে দেখা গেল পিছনের দরজায়। চেঁচিয়ে তার লোকজনকে ডাকল সে। আর সময় নেই এখন আমাদের হাতে, আমরা ফেরার পথে ওর ব্যবস্থা করব, জোরে জোরেই অ্যালেককে কথাটা ঘোষণা করতে শুনল জাভেদ।

কোথায় যাচ্ছে ওরা? এত তাড়া কেন ওদের?

খানিক বাদেই ঘোড়ায় চেপে ওদের শহর ছেড়ে যেতে দেখল। এই শীতের রাতে যাত্রা শুরু করেছে, অর্থাৎ অনেক দূরে কোথাও যাচ্ছে ওরা।

জাভেদকে আবার বারে ফিরে যেতে দেখেও কেউ কোন মন্তব্য করল না। বারের মালিক নিজেই হাত বাড়িয়ে ভাল হুইস্কির জগ থেকে এক গ্লাস মদ ঢেলে বাড়িয়ে দিল জাভেদের দিকে। এটা আমার তরফ থেকে, বলা সে।

বাইরে খুব ঠাণ্ডা, মন্তব্য করল জাভেদ

ভয়ে যাদের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে তাদের জন্যে বাইরে ঠাণ্ডা আরও বেশি, সবাইকে শুনিয়ে জোর গলায় বলে উঠল প্যাডি।

জাভেদ তার গ্লাসটা নিয়ে ধীর স্থির ভাবে সবটুকু পান করে গ্লাসটা নামিয়ে রেখে ঘুরে দাঁড়িয়ে চাইল প্যাডির দিকে। পুরো এক মিনিট সে চেয়ে রইল ওর দিকে। চুপ হয়ে গেছে বারের সবাই। কেউ একজন বোতল খুলে গ্লাসে মদ ঢালছে-নীরব ঘরটাতে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে হুইস্কি ঢালার শব্দ।

হ্যাঁ, বলে উঠল জাভেদ। ঘোড়ায় চড়ে অনেক দূর পথ চলে আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়েই ছিল। আর তা ছাড়া বাইরের এতজনকে একসাথে সামলানোর ইচ্ছাও আমার ছিল না।

তাই নাকি? চেয়ারে হেলান দিয়ে আরাম করে বসে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছে প্যাডি

এখন তোমার সাথে আর কেউ নেই?

বাজ পড়ল প্যাডির মাথায়। আর যাই হোক তাকে কেউ এভাবে চ্যালেঞ্জ করে বসতে পারে স্বপ্নেও ভাবেনি ও। বেকায়দায় পড়েছে সে, মুহূর্তে বুঝে নিল এইরকম বসা অবস্থায় তার পক্ষে পিস্তল বের করা অসম্ভব। অথচ সামান্য নড়াচড়া করলেও সেটাকে পিস্তল বের করার চেষ্টা মনে করে গুলি করতে পারে প্রতিপক্ষ। লোকটা অল্পকিছু পিস্তল চালানো জানলেও তার মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু এখনও মরার জন্য প্রস্তুত নয় সে।

একেবারে স্থির হয়ে বসে রয়েছে প্যাডি। গুলি খাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে কোন উপায়ে নড়েচড়ে সুবিধা মত অবস্থায় আসা যায় কিনা ভাবছে সে।

ওর মাথার মধ্যে কীসের ভাবনা চলছে অজানা নেই জাভেদের। সহজে নিস্তার দেবে না ওকে জাভেদ। সে বলল, আমি তৈরি, যে কোন মুহূর্তে তুমি চেষ্টা করে দেখতে পারো। কিন্তু এটা জেনো, পিস্তলে হাত দিতে গেলেই মরবে তুমি।

মুখের ভিতরটা শুকিয়ে গেছে প্যাডির। বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে তার। একটু নড়তে খুব ইচ্ছা করছে। একই ভাবে বসে থাকতে থাকতে আড়ষ্ট হয়ে গেছে তার দেহ। কিg Tড়ার সাহস পাচ্ছে না সে, জাভেদ যে মিথ্যা হুমকি দেয়নি বুঝতে পারছে পরিষ্কার।

জাভেদ লক্ষ করছে লোকটাকে, তার চোখের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। লোকটাকে মারতে চায় না জাভেদ। কিন্তু দরকার পড়লে মারতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না সে।

যে লোকটাকে বিল শার্প বলছিলে তাকে চেনো তুমি?

ভাল করেই চিনি-কেন?

তোমার মতই সাহসের অভাব আছে লোকটার। নিজের লড়াই নিজে না লড়ে কে ভাড়া করে।

হেসে উঠল প্যাডি। তুমি তোক চিনতে ভুল করেছ। নিজেরটা নিজেই সামলাবার ক্ষমতা সে রাখে।

তবে আমাকে মাতে শাইনি ডিককে কেন ভাড়া করেছিল?

কথাটার পরিপূর্ণ তাৎপর্য উপলব্ধি করে প্যাডির চোখ দুটো ঈষৎ বিস্ফারিত হতে দেখল জাভেদ।

তুমিই কি জাভেদ বকু?

হ্যাঁ, ওটাই আমার নাম।

এতদিনে শাইনি। ডিকের মৃত্যুর খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিমের রীতি অনুযায়ী যেখানেই লোকজন জড়ো হয়েছে সেখানেই ওই গল্প হয়েছে। তাশের টেবিলে, ক্যাম্প ফায়ারের ধারে লোকের মুখে মুখে ছড়িয়েছে গল্পটা।

দরজা খুলে তিনজন লোক ঢুকল ঘরে। প্রথমজন চওড়া কাধওয়ালা লম্বা লোক। লালচে লম্বা চুল কাধ পর্যন্ত ঝুলছে, গোঁফটাও একই রঙের। দ্বিতীয়জন লম্বায় একটু ছোট, চৌকো মুখ, শক্ত-সমর্থ গড়ন। তৃতীয়জন সবার চেয়ে লম্বা, ছিপছিপে চেহারা, ছোট্ট মাথাটা লম্বা গলার উপর বসানো। নাকটা বেঢপ রকম লম্বা।

এসো, এসো, বলে উঠল জাভেদ। কিন্তু চোখ মুহূর্তের জন্যও প্যাডির উপর থেকে সরায়নি সে। নাচের টিকিট বিক্রি করাছি আমি। নিজেদের সাথী বেছে নাও তোমরা।

এটা যদি তোমার লড়াই হয়, আমরা তৈরিই আছি, জবাব দিল লুইস। মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতিটা আঁচ করে নিয়েছে সে।

চার্লি আর জিম হারভি এগিয়ে গিয়ে বারের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল জাভেদের পাশে। ওরা দুজনই তাকিয়ে আছে প্যাডির দিকে।

এই লোকটা কি তোমার সাথে লড়াই করার উপযুক্ত মানুষ হলো? শান্ত গলায় প্যাডিকে দেখিয়ে প্রশ্ন করল লুইস।

এটা খিদে বাড়াবার জন্যে বোরহানীর মত। আসল খানা আসছে পরে বিল শার্প বা অ্যালেকজান্ডার শার্পের সাথে।

আরও আড়ষ্ট হয়ে গেছে প্যাডি ম্যাকনি। জাভেদ এগিয়ে গেল তার টেবিলের কাছে। তোমার হাত কেউ বেঁধে রাখেনি, প্যাডি, কথার ছলে বলল জাভেদ। তুমি যেন কী বলছিলে আমাকে বিলের জন্যে আটকে রাখবে না কি? সে-চেষ্টা কি এখনই কবে?

জাভেদের দিকে চোখ তুলে চেয়ে আছে প্যাডি। ওর দৃষ্টি জাভেদের বুকের উপর নিবদ্ধ। সে ভাবছে পিস্তল বের করতে গেলে তা টেবিলে বেধে যাবে না তো? আর লাফিয়ে টেবিল থেকে পিছনে সরে যেতে চাইলে পিস্তল তোলার আগেই গুলি খাবে সে।

মনে হচ্ছে একটু অসুবিধার মধ্যে রয়েছ তুবি, বলল জাভেদ। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াও, তোমাকে সমান সুযোগ দেয়া হবে। হঠাৎ কিছু করতে যেয়ো না, ধীরে সুস্থেই ওঠো।

নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না প্যাডি। পুরো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে তাকে! ধীরে চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে জাভেদের চোখে চোখে চাইল সে। ঘুসি মারল জাভেদ।

ঘুসিটা যে কোথা থেকে এল বুঝতেই পারেনি প্যাডি। ঘুসির জন্য প্রস্তুত ছিল না সে। মারটা তার চোয়ালের উপর পড়তেই মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ চমকে উঠল ওর। টাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেল। মাথার ভিতরটা ঝাঝা করছে। মুখের ভিতর কেমন একটা ধোয়াটে স্বাদ। শক্ত দুটো হাত ওর বুকে জামা ধরে টেনে দাঁড় করাল। একটা সিধে আর একটা উল্টো হাতের চড় পড়ল ওর গালে।

জীবনে ঘুসাঘুসি করেনি প্যাডি। সব রকম বিরোধ সে পিস্তল দিয়ে মেটাতেই অভ্যস্ত। রাগে অন্ধ হয়ে পিস্তল বের করার চেষ্টা করল সে। বাম হাতে ঘুসি বসাল জাভেদ ওর মুখে ঠোঁট কেটে দরদর করে রক্ত বেরিয়ে এল।

প্যাডি ম্যাকনি, কোন রাগ প্রকাশ পেল না জাভেদের গলায়। আমি এসেছিলাম লোমা কয়োটিতে আমার কাজে। তোমাকে জ্বালাতে যাইনি আমি, তুমিই গায়ে পড়ে লাগতে এলে আমার সাথে

শোনো, বলে চলল জাভেদ তোমার ভালর জন্যেই বলাছ আমি, এই শহরের দক্ষিণে পা বাড়িও না। উত্তরে যেখানে খুশি যাও আপত্তি নেই আমার, কিন্তু দক্ষিণে আমার র‍্যাঞ্চের ধারে কাছে তোমাকে দেখলে তোমার ঠ্যাঙ ভেঙে দেব। কথাটা মনে রেখো।

ঘুরে বারের কাছে দাঁড়ানো তিনজনের কাছে ফিরে এল জাভেদ। লরেন্সকে সে বলল, গোলাগুলিতে হাত ভাল এমন কিছু লোকের দরকার আমার।

.

প্রথম দিনটা জেনির গুহা পরিষ্কার করে আর উপরে ওঠার রাস্তার উপর নজর রেখেই কাটল। রান্নার ধারে-কাছেও গেল না সে। কেবল কফি আর শুকনো মাংস খেয়েই কাটল তার দিনটা। একা একা থাকতে ভয় লাগছে ওর, অপকার করার উপায় নেই।

দ্বিতীয় দিনে জোর বাতাস বইতে শুরু করল র‍্যাঞ্চের দিক থেকে। খাবার তৈরির গন্থ র‍্যাঞ্চের দিকে যাবার সম্ভাবনা নেই দেখে কিছু শুকনো আপেল বের করে পানিতে ভিজিয়ে অপেল পাই বানাতে লেগে গেল জেনি। ওরা দুজন ফিরে এলে অভ্যর্থনা করবে লে বিভিন্ন আয়োজন করল সে।

জেনি জানে না যে তে দর গরু-মহিষের খোঁজে র‍্যাঞ্চ থেকে অনেক পশ্চিমে ঘোরাঘুরি করছে বাট। ফেরার পথে পাই বেক করার গন্ধ হঠাৎ করে গেল। তার নাকে।

অসম্ভব! সে জানে এটা নিতান্তই অসম্ভব। কিন্তু তবু পরিচিত সুস্বাদু খাবারের গন্ধে জিভে পানি এসে গেল তার। তাড়াতাড়ি ঘোড়া থামিয়ে টেনে টেনে শ্বাস নিয়ে সে বোঝার চেষ্টা করল গন্ধটা কোনদিক থেকে আসছে, কিন্তু গন্ধটা বাতাসে হারিয়ে ফেলেছে সে। ওটাকে নিছক তার মনের কল্পনা বিলাস বলে উড়িয়ে দিয়ে রওনা হতে যাবে, এমন সময়ে আবার গন্ধটা নাকে এল।

এক ঘণ্টা পুরো ঘোড়া ছুটিয়ে এদিক ওদিক গিয়ে ঘাণের উৎসটা আন্দাজ করার চেষ্টা করল বার্ট। কিন্তু র‍্যাঞ্চের কাছাকাছি এসে পড়েও কিছু বুঝে উঠতে পারল না সে। অবশেষে অন্ধকার হয়ে আসছে দেখে ক্ষান্ত দিল

সম্ভবত র‍্যাঞ্চেই কেউ পাই বা কেক বেক করছে। জাভেদ যদি আশেপাশে কোথাও আস্তানা নিয়েও থাকে, সে এমন সুগন্ধ ছড়িয়ে কিছু বেক করবে শা করা যায় না। অত্যন্ত সাবধানী লোক সে।

র‍্যাঞ্চে ফিরে কেবিনে ম্যাটের কাছে দিনের কাজের রিপোর্ট দিতে গেল বার্ট। ভিতরে নীনা পেজ আর ম্যাট বসে গল্প করছে। বাট আশা করেছিল দরজা খুলতেই সদ্য বেক করার সুব্ধ নাকে আসবে তার। দরজা খুলে খুব অবাক হলো সে। ভিতরে কাঠের আগুন আর কফির গন্ধ ছাড়া অন্য কোন গন্ধ পেল না ও।

সতর্ক লোক বার্ট। সবই রিপোর্ট করল সে কিন্তু ওই গন্ধ সমার্কে কোন উচ্চবাচ্য করল না। তাদের পশুগুলোর অবস্থা খুব খারাপ। যেটুকু জমিতে ঘাস ছিল তা শেকড় পর্যন্ত খেয়ে শেষ করে ফেলেছে ওরা। খুর দিয়ে তুষার সরিয়ে ঘাস খাওয়ায় অভ্যস্ত নয় এই পশুগুলো। ম্যাটের চেহারা চিন্তিত হতে দেখল বার্ট, নীনার মুখও গম্ভীব।

লোমা কয়োটি থেকে একজন লোক ফিরে এসে খবর দিল জাভেদকে ওখানে দেখা গেছে। রাতে বাড সিগারেট ধরাতে ধরাতে জানাল, এখান থেকে পুব দিকে একটা সদ্য তৈরি ঘোড়ার পায়ের ছাপ দেখলাম আজ। আমি হলপ কবে বলতে পারি ওটা ওই আধা ইন্ডিয়ানটারই ঘোড়ার ছাপ।

তাই নাকি?

হ্যাঁ, দেখে মনে হয় হয়ত গতকালের ছাপ হবে। আড়াআড়িভাবে অনেক এলাকা জুড়ে খেয়াল রেখেছি আমি, ফিরে আসেনি সে।

চোখ দুটো ছোট করে ভাবছে বর্ট। ওর পায়ের কাছে ওর প্রিয় অ্যালসেশিয়ান কুকুরটা শুয়ে আছে।

ওরা একজন লোমা কয়োটিতে, আর অন্যজন পুবদিকে গেছে, ফেরেনি এখনও। অর্থাৎ-চোখ দুটো আরও ছোট হলো তার-জেনি একেবারে একাই রয়েছে কোথাও।

আকর্ষণীয়া নারী জেনি। মেয়েদের পিছনে বার্ট ঘোরে না বটে, কিন্তু গত চার মাসে কোন নারীসঙ্গ লাভ করেনি সে।

ভোর হতেই রওনা হবার জন্য তৈরি হলো বার্ট। ওর কুকুরটাও পিছন পিছন ঘুরছে-সাথে যাবে। কয়েকবার ধমক দিল সে, কিন্তু কুকুরটা নাছোড়বান্দা। ঘোড়া নিয়ে বের হবার পরও ওর পিছন পিছন আসতে লাগল অ্যালসেশিয়ানটা। ঘোড়া থেকে নেমে বার্ট একটা পাথর ছুঁড়ে মারল ওকে। আজকে ওকে সাথে নেওয়ার কোন ইচ্ছে নেই তার।

পাথরের আঘাতে কুকুরটা থেমে দাঁড়াল। করুণ মিনতি ভরা আহত চোখে একদৃষ্টে চেয়ে রইল সে বার্টের দিকে। মনিবের কাছ থেকে এমন ব্যবহার আশা করেনি সে। অনেকক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে থেকে হঠাৎ করেই ঘুরে ফিরে চলল ও আবার র‍্যাঞ্চের দিকে।

যাত্রাতেই খারাপ হয়ে গেল বার্টের মন। আজ পর্যন্ত কোনদিন মন্টির গায়ে হাত তোলেনি সে। আবার ঘোড়ায় চড়ে জেনির কথা ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলল ও-কিন্তু তার মনটা কেমন যেন খচ খচ্ করতে লাগল।

মেসাটাকে ডান হাতে রেখে প্রাচীন একটা আবছা ট্রেইল ধরে পশ্চিমে এগিয়ে চলল বার্ট। জাভেদের গুপ্ত ক্যাম্পটা খুঁজে বের করার উদ্দেশ্য নিয়েই আজ বেরিয়েছে সে। প্রথম দেখার পর থেকেই মেয়েটাকে আর ভুলতে পারেনি বার্ট। ওর উন্নত বুক, শরীরের সুন্দর বাঁধুনি, চলা, বলা সবই নিভৃতে তার মনে কামনার আগুনে ইন্ধন জুগিয়েছে।

মেয়েটার কথা ভাবতে ভাবতেই চলেছে বার্ট। ঘোড়াটাকে হটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে পশ্চিম দিকে। জাভেদ যদি র‍্যাঞ্চের ধারে কাছে কোথাও ক্যাম্প করে থাকে তবে তা এই মেসার ধারেই কোথাও হবে। তামাক-দণ্ড থেকে একখণ্ড তামাক দাঁতে কেটে নিল বার্ট।

পুরোনো ট্রেইলটা এক জায়গায় এসে মেসার দেয়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। লাগাম টেনে ঘোড়া থামিয়ে মুখ থেকে খয়েরী রঙের লালা ফেলল তুষারের উপর। বাতাসে রান্নার গন্ধ পাওয়ার চেষ্টা করল সে বুক ভরা শ্বাস নিয়ে, কিন্তু না, পাইন বনের তাজা গন্ধ ছাড়া আর কোন গন্ধ নেই বাতাসে।

.

খুশি মনে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে অ্যালেক। জাভেদকে শেষ করার সময় পায়নি সে লোমা কয়োটিতে। কিন্তু লোকটাকে একবার যখন ভিটে ছাড়া করা গেছে তখন বেশিদিন আর ওর পক্ষে পালিয়ে পালিয়ে থাকা সম্ভব হবে না, শেষ পর্যন্ত মারা সে পড়বেই। আর কয়েক মাইল গেলেই সত্তর হাজার ডলার মূল্যের সোনা এসে যাবে ওর হাতের মুঠোয়। র‍্যাঞ্চ করার চেয়ে এই ব্যবসা অনেক বেশি লাভজনক।

ক্লান্ত শরীর জাভেদের। পরপর কতগুলো লম্বা যাত্রা সেরে লোমা কয়োটিতে একটু বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। জেনির জন্য বিশেষ চিন্তা নেই, কারণ জিকো আজ রাতেই পৌঁছে যাবে জেনির কাছে।

কিন্তু সে জানে না যে জিকো পুবের রাস্তায় বারো মাইল দূরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। হঠাৎ ঝোঁপের ভিতর থেকে এক ঝাঁক পাখি শব্দ করে উড়াল দিতেই জিকোর ঘোড়াটা ভয় পেয়ে লাফিয়ে ওঠে। সামলাতে না পেরে জিকো ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট লেগে জ্ঞান হারায়।

তৃতীয় দিন সকালে জেনির ঘুম ভাঙল একাকীত্বের অস্বস্তি নিয়ে। তাড়াতাড়ি জামা পরে নিয়ে জানালার কাছে গিয়ে উঁকি দিল সে। অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ল না ওর। জাভেদের তৈরি দ্বিতীয় ঘুলঘুলিটা দিয়ে আরও ভাল করে বাইরেটা দেখে নেওয়ার জন্য উঁকি দিতেই একজন ঘোড়সওয়ার চোখে পড়ল জেনির।

নিছক পথচারী নয় লোকটা। অ্যাপাচির মতই সতর্কভাবে চিহ্ন লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে সে। ইন্ডিয়ানদের সাথে বেশ কিছুকাল কাটিয়েছে জেনি। চিহ্ন লক্ষ্য করে শিকারী নির্দিষ্ট শিকারের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে তার কেমন প্রতিক্রিয়া হয় তা অজানা নেই ওর। ভীত চোখে লোকটার কার্যকলাপ লক্ষ্য করতে লাগল জেনি। প্রথমেই জিকো আর জাভেদের জন্য দুশ্চিন্তা হলো তার। ওরা কেউ যদি ফিরে আসে এখন, আর লোকটা যদি আগেই দেখে ফেলে, কী উপায় হবে?

অন্য কামরায় যেখানে ঘোড়া রাখা রয়েছে সেখানে গিয়ে একটা পিস্তল কোমরে বেঁধে নিল সে। তারপর একটা রাইফেল হাতে তুলে নিল। গুলি ছোঁড়ায় ওর হাত খারাপ নয়। আজ পর্যন্ত কোন মানুষকে গুলি করেনি বটে, কিন্তু জেনি যাদের ভালবাসে তাদের ক্ষতি চায় ওই লোকটা। ওকে গুলি করতে হাত কাঁপবে না তার।

ঘোড়াগুলোকে খাবার দিয়ে সে প্রবেশ পথের কাছে গিয়ে নীচের দিকে চাইল। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। জাভেদ ওকে একটা পাথর দেখিয়ে দিয়ে গেছে পাহাড়ের মাথায়। ইচ্ছে করলে সহজেই ওটাকে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে দিতে পারবে জেনি। পাথরটা নেড়েচেড়ে দেখল সে-হা, জোরে ধাক্কা দিলেই গড়িয়ে নীচে নামবে ওটা।

কিন্তু লোকটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। জাভেদ আর জিকোর ফেরার সময় হয়ে এসেছে, এইজন্যই তার ভয় করছে আরও বেশি। হঠাৎ নীচে একটা গাছের আড়ালে নড়তে দেখল সে লোকটাকে। সে কি ট্রেইল খুঁজছে? নাকি টের পেয়ে গেছে যে কেউ তাকে লক্ষ করছে? উপরে ওঠার জন্য রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করবে কি লোকটা?

ধীরে সময় পেরিয়ে যেতে লাগল। কিছুই ঘটল না। ওদের ফেরার পর সে যে পার্টি দেবে বলে ঠিক করেছিল তার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল জেনি। তার ছোট পোস্টলার ভিতর একটা সুন্দর জামা লুকিয়ে রেখেছিল। সেটা বের করে ঝুলিয়ে দিল সে কুঁকড়ে যাওয়া ভাজ সমান হওয়ার জন্য। তারপর জানালার ধারে গিয়ে দেখল-কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।

রাইফেল হাতে মেসার উপর বেরিয়ে এসে হামাগুড়ি দিয়ে ধারের কাছে চলে এল সে। নীচে ঘোড়ার পিঠে দেখা যাচ্ছে লোকটাকে, র‍্যাঞ্চের দিকে ফিরে যাচ্ছে সে। কিন্তু তাই বলে সে যে আবার ফিরে আসবে না এমন কোন নিশ্চয়তা নেই।

লোকটা যদি ফিরে আসে তবে অলক্ষ্যে থেকে তাকে হত্যা করতে হবে। ঘাপটি মেরে জাভেদ আর জিকোর জন্য পথের ধারে লুকিয়ে বসে থেকে ওদের বিপদ ঘটাতে কিছুতেই দেবে না জেনি।

মেসার উপরটায় কিছুটা ঘুরে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে গুহায় ফিরে এল জেনি। কফি তৈরি করে খেল। আবার লাফিয়ে উঠে জানালার কাছে গিয়ে বাইরেটা দেখল+না, কেউ নেই। তবু কেমন যেন ভয় ভয় করছে ওর। মেসার উপর ফিরে গিয়ে উত্তর আর পুবের দিকে যতদূর দৃষ্টি যায়, খুব খেয়াল করে অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে দেখল সে। ওদিক দিয়েই জাভেদ আর জিকোর ফেরার কথা, কিন্তু ওদের ফেরার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আবার ফিরে এল সে গুহায়।

ওরা কেউ যদি ফিরে না আসে? ওরা যদি কোন বিপদে পড়ে থাকে? যদি অ্যামবুশ করে হত্যা করে থাকে ওদের নীনার দলের লোক? তা হলে একেবারে এতিম হয়ে যাবে সে। এই পৃথিবীতে তার আর যাবার কোন জায়গাই থাকবে না।

অশুভ চিন্তাগুলোকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা জামাটা নামিয়ে আনল সে। সময় হলে ঠিকই ফিরে আসবে ওরা। অধীর আগ্রহে জামাটা পরে নিল জেনি। তার ছোট আয়নায় একবারে কেবল নিজের একটু অংশ দেখতে পাচ্ছে সে। চুল ছেড়ে দিয়ে চুল আঁচড়ে নিল ভাল করে। তারপর চুল বেঁধে নিয়ে আবার আয়নায় নিজের চেহারা দেখল সে। সত্যিই সুন্দর লাগছে তাকে দেখতে, মনে মনে স্বীকার করল সে নিজেই। জাভেদ ফিরে ওকে এইরূপেই দেখুক, এটাই চায় জেনি।

ঠিক বৌ-এর মতই লাগছে, চেয়ে থাকতে থাকতে নিজেই বলে উঠল জেনি।

পিছন থেকে কেউ বলে উঠল, ঠিক তাই-অপূর্ব!

আড়ষ্ট হয়ে গেল জেনি। একেবারে জমে পাথর হয়ে গেছে সে। বিন্দুমাত্র নড়ছে না। দ্রুত চিন্তা চলেছে তার মাথায়। পরিষ্কার চিন্তা করছে ও। ভীষণ রকম বিপদের মধ্যে পড়েছে সে, উদ্ধার পাবার কোন আশা নেই। একমাত্ৰ-কিন্তু ওদের ঠিক এই সময়ে ফেরা, খুব বেশি আশা করা হবে সেটা।

ধীরে ধীরে বড়-গুহার মুখের দিকে ঘুরে তাকাল সে। বার্ট-মুহূর্তে চিনতে পারল সে গুহার মুখে দাড়ানো বার্টকে। স্টেজ থেকে নামার সময়ে সে দেখেছে এই লোকটাকে

হ্যাংলা চেহারার লম্বাটে নোংরা লোকটা। দাড়ি কামানো নেই, তামাকের বাদামী রঙ কিছুটা লেগে রয়েছে গোফে।

ভাবছিলাম আর কত দেরি হবে তোমার পৌঁছতে, বলল জেনি। অনেক আগেই তোমাকে আশা করেছিলাম।

বড় রকমের একটা হোঁচট খেল বার্ট। আশা করেছিল মেয়েটা ভয় পাবে, চ্যাঁচাবে, প্রতিবাদ করবে; কিন্তু তাকে এমন স্থির আর শান্ত দেখে বেশ হকচকিয়ে গেল বার্ট। এরপরে যে তার করণীয় কী তা ভেবে পাচ্ছে না। এমন সুন্দরী আল সংযত মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে অস্বস্তি বোধ করছে ও। মেয়েটার শুভ্র কাঁধের দিবে চেয়ে মুখের ভিতরটা শুকিয়ে আসছে তার কামনা আর উৎকণ্ঠায়। ওর শান্ত ভাবভঙ্গিতে মনে মনে রেগে উঠছে বার্ট। সামান্য একটা মেয়ে বৈতো নয়, তাও আবার একলা রয়েছে-এত দম্ভ কীসের ওর?

যাক, এসে গেছি আমি, একটু রাগের ভাব নিয়েই বলল সে। তুমি নিশ্চয়ই জানো আমি কেন এসেছি?

নীচে তোমাকে চিহ্ন খুঁজতে দেখেছি আমি। কয়েকদিন থেকেই তোমাকে খেয়াল করছি, বলতে হঠাৎ সরাসরি চোখেচোখে চাইল জেনি। ইচ্ছা করলে যে কোন সময়ে আমি শেষ করতে পারতাম তোমাকে।

মেয়েটার দিকে চেয়ে রয়েছে বার্ট। ওর শান্ত ঠাণ্ডা ব্যবহারে অস্বস্তি তো বোধ করছেই, তা ছাড়া গত কয়দিন এরই রাইফেলের নলের তলায় সে ঘুরে বেড়িয়েছে ভাবতে কেমন যেন লাগছে ওর।

এখন আর সে-কথা বলে লাভ নেই, জবাব দিল বার্ট। তোমার সুযোগ তুমি হারিয়েছ।

কফি বানাচ্ছিলাম আমি, তোমাকে দেব এক কাপ?

জেনি ওকে যেটুকু দেরি করাতে পারে সেটুকুই তার লাভ। তাকে কথায় ব্যস্ত রাখতে পারলে জাভেদ বা জিকো এর মধ্যে ফিরে আসতে পারে। কিংবা কথার ফাঁকে সে নিজেও হয়তো একটা কিছু করার সুযোগ পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু তা সে যাই করুক, প্রথমবারেই সফল হতে হবে তাকে-কারণ দ্বিতীয় সুযোগ আর পাওয়া যাবে না।

হুম! এক কাপ কফি হলে নেহাত মন্দ হয় না, সম্মতি দিল বার্ট।

মন্দ কি? একটু গরম হয়ে নেওয়া যাবে। বাইরে বেশ ঠাণ্ডা। গুহার চারপাশে চোখ বুলাল সে। যতই দেখছে জাভেদের প্রতি শ্রদ্ধা মনে মনে বেড়েই চলেছে তার। চমৎকার জায়গা বেছে নিয়েছে সে এখানে এই মেসার উপর। যথেষ্ট খাবার এনে রেখেছে, বৃষ্টি বাদলের ভয় নেই, আগুন জ্বালাবার জন্য যথেষ্ট কাঠ আর ঘোড়ার জন্য প্রচুর খাবার-সবই রয়েছে। দরকার পড়লে সারা শীতকালটাই এখানে আরামে কাটিয়ে দিতে পারবে জাভেদ।

একেবারে বার্টের গা ঘেঁষে এগিয়ে গেল জেনি। একমুহূর্ত আগেও সে ভাবতে পারেনি এটা তার দ্বারা সম্ভব। পাশ দিয়ে যাবার সময়ে ভয়ে তার গা কাঁটা দিয়ে উঠলেও ওর পাশ দিয়েই গেল সে।

সুন্দর জামা, জেনির পরনের কাপড়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলল বার্ট। এটা কি তোমার নাচে যাবার পোশাক?

পার্টি ড্রেস এটা, জবাব দিল জেনি। মেক্সিকোতে অনেক পার্টিতেই আমি এই পোশাক পরে গেছি। কনভেন্টে পড়তাম আমি ওখানে।

তুমি কনভেন্টে ছিলে? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল সে।

কেন, এতে অবাক হবার কী আছে? সতেরো বৎসর বয়স আমার, রীতিমত ভদ্রমহিলা!

নাক সিটকাল বার্ট। ভদ্রমহিলা না ছাই! দু’দুটো মিনসের সাথে থেকে আবার বড়াই করছ?

জিকো ওয়াইল্ড আমার পালক পিতা, তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রীকে আমি নিজের বাপ-মার মতই জানি। মাংস কাটার বাওই ছুরিটা তার চোখে পড়ল। তার মত মানুষ হয় না, আর জাভেদ সাহেবও নিতান্তই ভদ্রলোক।

বিরক্ত চোখে জেনির দিকে চাইল বার্ট। কোন কিছুই আজ আর তার প্ল্যান মাফিক চলছে না। কফিতে চুমুক দিতে দিতে মেয়েটার দিকে চেয়ে সে বুঝে ওঠার চেষ্টা করছে মেয়েটা সত্যি কথাই বলছে, নাকি সে যা ধারণা করেছে মেয়েটা তাই? শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিল, মিথ্যা কথাই বলছে মেয়েটা।

কফি পটের নীচে আগুনটা খুঁচিয়ে একটু উস্কে দিয়ে দুটো কাপ বের করল জেনি। ছুরির হাতলটা সামান্য দেখা যাচ্ছে আজ সকালে ব্যবহার করা পুরোনো কাপড়ের টুকরোটার তলায়। হয়তো বার্টের চোখে পড়ে যাবে ছুরিটা এই ভয়ে সে ওটার ধারে কাছেও গেল না। জেনির রাইফেল আর পিস্তলটার পাশেই বসেছে বার্ট। ওগুলো আর কাজে লাগাতে পারবে না সে।

জেনির হাত ছুঁয়ে কফির কাপটা নিয়ে ওর দিকে চেয়ে অর্থপূর্ণ হাসি হাসল সে। দেখেও না দেখার ভান করল বটে, কিন্তু ভিতরটা ভয়ে একেবারে কুঁকড়ে গেছে জেনির।

ওরা কেউ এখন ফিরে আসতে পারে মনে করে থাকলে সে আশা ছাড়ো–ওরা এখন আর ফিরছে না। জাভেদ গেছে উত্তরে আর জিকো পুবে। এর পরে আর ওদের কোন পাত্তা পাওয়া যায়নি।

ওরা তা হলে সবই জানে: ভাবছে জেনি।

ওখানে জাভেদের বেশিদিন টেকার প্রশ্নই ওঠে না, প্যাডি ম্যাকনি আছে লোমা কয়োটিতে। আর সে যদি ওকে সামলাতে না পারে তবে বস্ সে ব্যবস্থা করবে ফেরার পথে।

অ্যালেকজান্ডার সাহেব কি বাইরে কোথায়ও গেছেন নাকি?

হ্যাঁ, বিশেষ একটা কাজে গেছে, অত্যন্ত গরম কফিতে চুমুক দিয়ে কোনমতে সেটা গিলল বার্ট। ওই আধা ইন্ডিয়ানটাও বোধ হয় মারাই গেছে। ওর ঘোড়াটা র‍্যাঞ্চে ফিরে এসেছে। ঘোড়ার পায়ের ছাপ লক্ষ্য করে গিয়ে ওরা ঘটনাস্থলে জিকোকে পায়নি বটে তবে তুষারের মধ্যে রক্তের দাগ দেখে এসেছে। পায়ে হেঁটে ঠাণ্ডার মধ্যে জখম অবস্থায় ব্যাটা নিশ্চয়ই মরবে।

বার্টের কঠিন চোখে একটু ব্যঙ্গাত্মক হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল। ওদের কাছ থেকে সাহায্য আসবে আশা করে বসে থেকে কোন লাভ নেই। তোমাকে উদ্ধার করতে আর আসবে না ওরা। পায়ের উপর পা চড়িয়ে বসল বার্ট। এই কঠিন দেশে কোন মেয়ের পক্ষে একা চলা অসম্ভব। তাই বলছি, আমাকে খুশি রাখতে পারলে তোমার কোন চিন্তা নেই।

ঝপ করে বাওই ছুরিটা তুলে নিয়েই হাত লম্বা করে সমস্ত শক্তি দিয়ে কোপ মারল জেনি। আগুন পুহিয়ে গরম হয়ে নিশ্চিন্তে বসে ছিল বার্ট। এই সুযোগে আঘাত হেনেছে মেয়েটা। হাতের সাথে সাথে নিজেও ঘুরল সে। আরও কাছে গিয়ে আঘাত করা উচিত ছিল ওর। ছুরির মাথাটা শার্ট আর হাতের পেশী কেটে পেটের উপর আঁচড়ের লম্বা দাগ রেখে বেরিয়ে এল। হাত থেকে কফির কাপটা পড়ে গেল ওর। মুহূর্তে বুঝে নিল জেনি, ব্যর্থ হয়েছে সে। কোন সন্দেহ নেই-লোকটা এবার তাকে খুন করবে।

দৌড়ে ছুটে পালাল জেনি। কিন্তু যাবার আগে নিজের রাইফেলটা হাতে তুলে নিল সে। বড় গুহাটা পেরিয়ে মেসার উপর উঠে এল জেনি। ঠাণ্ডা বাতাসটা একেবারে শরীর কেটে ভিতরে ঢুকছে। মরিয়া হয়ে ছুটছে জেনি। পিছনে ধুপধাপ শব্দ তুলে ছুটে আসছে বাট। মেসার উপরে গাছপালার ভিতর ঢুকে গেল সে।

ইন্ডিয়ানদের সাথে ছেলেবেলা কাটানো বৃথা যায়নি তার। চট করে মাটিতে শুয়ে পড়ে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে থাকা পাথরগুলোর আড়ালে চলে গেল। হামাগুড়ি দিয়ে। ওর এক হাতে এখনও বাওই ছুরি আর অন্য হাতে রাইফেলটা ধরা।

ব্যর্থ হয়েছে জেনি। এবারে লোকটা তাকে শিকার-খোজা করে খুঁজে বের করে হত্যা করবে। রক্তপাত ঘটিয়েছে সে। হাতের কাটাটা বেশ গভীর। পেটের সামান্য আঁচড়টা নিয়ে মাথা ঘামাবে না লোকটা, তার হাতের জন্য একটা ব্যবস্থা করেই ফিরে আসবে সে জেনির খোঁজে।

রাইফেলটা পরীক্ষা করে দেখল জেনি। চেম্বারে একটা আর ম্যাগাজিনে তিনটে গুলি রয়েছে ওতে। কিন্তু মোটে চারটে গুলি ওর জন্য নিতান্তই কম। ক্যালামিটি জেনের মত অব্যর্থ নয় তার লক্ষ্য। স্বভাবতই দূর থেকে গুলি তার মিস হবে-কিন্তু বেশি মিস করার উপায় নেই তার।

অল্প পরেই দূরে বার্টকে দেখতে পেল জেনি! গুলি করল সে। ওর গায়ে লাগাতে পারবে ভেবে গুলি করেনি ও, করেছে ওর কাছে যে রাইফেল আছে সে কথা বার্টকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য। গুলির সাথে সাথেই বার্ট মাটিতে শুয়ে পড়ে ওর দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। ইন্ডিয়ান চিন্তাধারা অনুসরণ করেই জেনি নিজের জায়গা থেকে সরে পিছন দিকে মেসার আরও নিরাপদ একটা জায়গায় চলে এল। ওখানে বসেই বার্টের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করছে সে। কিন্তু অনেকক্ষণ পর্যন্ত কোন দেখাই মিলল না তার।

দিন শেষ হয়ে এসেছে। রাত নামলে কনকনে ঠাণ্ডা পড়বে মেসার উপর। প্রচণ্ড বাতাসও বইবে সেই সাথে, অথচ সাহস করে আগুন জ্বালাবার উপায় নেই। তার।

ইন্ডিয়ান শিক্ষা এবার পুরোপুরি কাজে লাগবে ওর। যদিও খুব বেশিদিন ওদের সাথে কাটায়নি সে তবু তার মধ্যেই সে শিখেছে মিছে ভাগ্যকে দোষারোপ করে কীভাবে ক্ষুধা, শীত, আর প্রবল বাতাসের ঝাঁপটা সহ্য করে টিকে থাকতে হয়।

জেনি জানে তার গায়ে যে জামাটা আছে সেটা পরে থাকাটা তার ভীষণ ভুল হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ওটা খুবই অসুবিধার সৃষ্টি করবে। ধবধবে সাদা রঙ এই মেসার উপরে রাতের বেলাও পরিষ্কার দেখা যাবে। কিন্তু এটাই তার একমাত্র সুন্দর মেয়েলী জামা। এই জামা পরেই পরিপূর্ণ নারী হয়ে বাঁচতে চায় সে-আর মরলেও এই জামা পরেই মরবে ও।

মরতে বসে বারবারই কেবল জাভেদের কথা মনে পড়ছে জেনির। জাভেদ জানে না, ওকে বলা হয়নি সে তাকে ভালবাসে। জেনির বড় খারাপ লাগছে ভাবতে যে তার মনের কথাটা জাভেদ কোনদিনই জানবে না। ওকে সে-কথা বলার সুযোগ আসার আগেই মরে যেতে হচ্ছে তাকে। নিজের দেহ-মন সে জাভেদকেই সঁপে দিয়েছিল। শেষ গুলিটা সে নিজের জন্য তুলে রাখবে না, বার্টের জন্যই রাখবে সে ওটা; বার্টকে সামনাসামনি একেবারে কাছে থেকে গুলি করে ওর পেট ফুটো করবে সে নিজে মরার আগে। আর কাউকে ভোগ করতে দেবে না সে তার দেহ।

ফাঁদে পড়া সিংহীর মত ঝোঁপ আর পাথরের আড়ালে বসে অপেক্ষা করছে। জেনি। লোকটাকে খুন করবে সে, একটুও বুক কাঁপবে না তার, একটু দুঃখও হবে তার বার্টের জন্য।

হঠাৎ খেপে উঠল জেনি। শব্দ তুলে রাইফেলের চেম্বারে গুলি ভরল সে। অনেক দূর পর্যন্ত গেল শব্দটা। বন্য চিৎকার দিয়ে সে বলে উঠল, কোথায় তুমি, বার্ট? আমাকে ভোগ করতে চাও, এগিয়ে এসো। তুমি আমার হাতে মারা না পড়লেও জাভেদ তোমাকে ঠিকই শেষ করবে।’

দুশো গজ দূরে বার্ট তে পেল বাতাসে বয়ে আনা জেনির কণ্ঠস্বর। গলার স্বরের ভাবটা পছন্দ হলো না তার, পাথরের আড়ালে আরও গেড়ে বসল সে। মেয়েটার শব্দ তুলে উইনচেস্টারে গুলি ভরার আওয়াজটাও কানে এসেছে তার। আপন মনেই সে ভাবল আবোল-তাবোল বকছে মেয়েটা। মাথা খারাপ হয়নি তো চুড়ীর?

কিন্তু মেয়েটাকে পেতেই হবে তার। ভাল করে নড়েচড়ে আরাম করে পাথরের আড়ালে অপেক্ষা করতে বল বার্ট। মেসার উপর ঠাণ্ডার মধ্যে মেয়েটা কতক্ষণ বাইরে থাকতে পারে দেখতে চায় সে।

ফিনফিনে পাতলা পোশাক ওর পরনে, তার উপর কাঁধ দুটো প্রায় সম্পূর্ণই খোলা। এখন সে যতই তেজ দেখাক, রাত নামলে ঠাণ্ডায় যে তার তেজ ধীরে ধীরে মজে আসবে, এতে বার্টের কোন সন্দেহ নেই। অপেক্ষা অনেক করেছে, আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে পারবে সে।

.

উত্তর দিকের গাছগুলোর ভিতর থেকে বেরিয়ে এল জাভেদ। সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে সে চারদিকে। ওর পিছন দিক থেকে বাতাস বইছে তবু তার মনে হলো যেন মেসার দিক থেকে অস্পষ্ট একটা গুলির আওয়াজ কানে এল।

আরও কয়েক মাইল পুবে লুইস, চার্লি আর জিম ছড়িয়ে পড়ে এগিয়ে যাচ্ছে খামারের দিকে। নীনা পেজের লোকজনের জন্য চারদিকে সতর্ক নজর রেখেই এগুচ্ছে ওরা। আগামীকাল দুপুরের আগেই প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে একটা কিছু হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে। জাভেদ জানে ওরা ফিরে যাবার আগে প্রচুর রক্ত ঝরবে পাহাড়ের বুকে।

গুলির শব্দ শুনে অত্যন্ত সতর্ক ভাবে পশ্চিমে এগুলো জাভেদ। পড়ন্ত বিকেল, তবু বহুদূর পর্যন্ত পরিষ্কার নজর চলে। হঠাৎ তার মনে হলো মেসার উপর সাদা মত কিছু নড়তে দেখল সে। দুই ঘণ্টা পরে চক্কর দিয়ে ঘুরে দক্ষিণ দিক দিয়ে আসার সময়ে ঘোড়ার পায়ের ছাপ দেখল জাভেদ।

বুকের ভিতরটা কেমন হিম হয়ে আসছে, ঘোড়া নিয়ে মেসার উপর উঠতে আরম্ভ করল জাভেদ। কিন্তু মাঝ পথেই ঘোড়া থেকে নেমে গেল। সাবধানে আগে বাড়তে হবে তাকে, কারণ মেসার উপরে যে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে তার কোন ধারণা নেই ওর।

একটা চিৎকারের অস্পষ্ট শব্দ তার কানে পৌঁছল সন্ধ্যার একটু আগে। কিন্তু শব্দটা দ্রুত মিলিয়ে গেল বাতাসে। উপরে উঠার ঢালের মাথায় গড়িয়ে নীচে ফেলার জন্য রাখা পাথরটা যথাস্থানে রয়েছে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করল জাভেদ। থেমে দাঁড়িয়ে বুট জুতো খুলে মোকাসিনের নরম নিঃশব্দ জুতো জোড়া পরে নিল সে। জুতো জোড়া সে সব সময়ই ঘোড়ার পিঠে সাথে নিয়ে চলে। রাইফেলটা বের করে নিয়ে সাবধানে আবার উপরে উঠতে আরম্ভ করল জাভেদ।

কয়েক পা এগিয়েই গুলির শব্দ শুনল সে। বাতাসে স্পষ্ট শোনা গেল শব্দটা। প্রায় একই সাথে বিভিন্ন দিক থেকে প্রতিধ্বনি শুনতে পেল সে। মেসার উপর থেকেই শব্দটা এসেছে বটে, কিন্তু ঠিক কোনখান থেকে তা বোঝার কোন উপায় নেই। সন্তর্পণে উপরে উঠে এল জাভেদ।

মেসার উপরে বসে নিজের গোঁফের ডগা চিবাচ্ছে বার্ট। মেয়েটা তাড়াহুড়োর মধ্যে তার রাইফেলটাই তুলে নিয়ে ছুট দিয়েছিল। সে জানে ঠিক আর কয়টা কার্তুজ আছে ওই রাইফেলটায়। বাঁচতে হলে সবাইকেই নিজের রাইফেলের খবর রাখতে হয়।

গতটা ছিল তিন নম্বর গুলি। আর একটাই মোটে বুলেট রয়েছে এখন। রাইফেলে। এই গত গুলিটার সময়ে সে বেশ বড় রকমের একটা ঝুঁকি নিয়েছিল। জেনিকে গুলি করতে আগ্রহী করার জন্য পুরোপুরি বাইরে বেরিয়ে দেখা দিয়েছিল। রাইফেল চালাতে জানলেও মেয়েটার হাত যে খুব ভাল নয় তা বুঝে ফেলেছে ও। গুলি চালাতে জেনি সামান্য একটু দেরি করে ফেলায় অল্পের জন্য বেঁচে গেছে সে। লোভ দেখিয়ে শেষ গুলিতে এনে ঠেকাতে পেরেছে বার্ট। যদি মেয়েটাকে তার পেতে হয় তবে আর একবার ঝুঁকি তাকে নিতেই হবে।

ঝাল এখনও মজেনি মেয়েটার, তবে একটু তেজওয়ালা মেয়েই সে বাগে আনতে বেশি মজা পায়। শব্দ তুলে বাতাস বয়ে চলেছে বার্টের আস্তানার পাশ দিয়ে।

তামাকের টুকরোটা মুখের মধ্যে নাড়াচাড়া করতে করতে বার্ট ভাবছে মেয়েটার কিছু বুদ্ধিশুদ্ধি ছে, অর্থাৎ তার শেষ গুলিটা দূর থেকে গুলি করে আর নষ্ট করবে না জেনি। সুতরাং অনেক কাছে গেলেও খুব একটা ভয়ের কিছু নেই। একটু ঝুঁকি নিয়ে ওর হাত থেকে রাইফেলটা ছিনিয়ে নিতে হবে।

পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে বিশ ফুট দৌড়ে একটা গাছের আড়ালে চলে এল বার্ট। কিছুই ঘটল না। আর একছুটে ত্রিশ গজ দূরে বড় পাথরটার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল সে। এবারেও কিছু ঘটল না। আর সামান্য কিছুটা গেলেই জেনির কাছে পৌঁছে যাবে সে।

বড় পাথরটার পাশ দিয়ে ঘুরে পা টিপেটিপে এগুচ্ছ বার্ট। ওপাশের পাথরের উপর দিয়ে সাদা মত একটা জিনিস নজরে পড়ল ওর। জেনি যদি ওই পাথরের আড়ালে থাকে তবে তাকে কায়দা মতই পেয়েছে বার্ট। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সে-সাদা কাপড়টার উপর সতর্ক নজর তার। ফাঁকায় বেরিয়ে আসতেই একটা রাইফেল গর্জে উঠল।

গরম বুলেটের ছ্যাকা খেয়ে লাফিয়ে পিছনে চলে এল বার্ট। শব্দ লক্ষ্য করে চেয়ে দেখল পঞ্চাশ গজ বামে অন্য এক জায়গায় দাড়িয়ে আছে মেয়েটা।

হাড়-হারামী মেয়ে। ঠকিয়েছে তাকে। ছেলে ভুলানোর মতই তাকে সে ভুলিয়েছে স্কার্টের নীচের কিছুটা অংশ ছিড়ে।

তাক করা রাইফেলটা নামিয়ে নিল বার্ট।

মেয়েটা তাকে ঠকিয়েছে বটে কিন্তু মিস করেছে। মারতে পারেনি তাকে। কাঁধের কাছ থেকে কিছুটা মাংস উড়ে গেলেও বেঁচে গেছে সে। রক্ত মাংসের যুবতী নারীকে উপভোগ করার সুযোগ এসেছে

বার্ট!

পুরুষের গলা শুনতে পেল সে তার পিছন দিকে। বিড়ালের মত লাফিয়ে ঘুরে দাঁড়াল বার্ট। পা মাটি ছোঁয়ার সাথে সাথেই গুলি ছুটল তার রাইফেল থেকে। হোঁচট খেল সে, পেটে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মেরেছে কেউ। দুপাশে দু’পা ছড়িয়ে টলতে টলতে দাড়িয়ে পড়ল সে। দেখল তার সামনে সিধে হয়ে দাড়িয়ে আছে জাভেদ। যেন ডুয়েল লড়ার জন্য প্রস্তুত।

উইনচেস্টার তুলে গুলি করল বার্ট। তার হাতে রাইফেলটা লাফিয়ে উঠল। রাইফেল থেকে গুলি ছোড়ার ধাক্কা, নাকি অন্য কোন ধাক্কা খেল সে? বিভ্রান্ত চোখে নিজের গুলিটাকে দুজনের মাঝখানে একটা পাথরের গায়ে ধুলো উড়িয়ে ধাক্কা খেতে দেখল সে। হায় খোদা, কিছুই বুঝতে পারছে না, পড়ে যাচ্ছে সে…ঠাণ্ডা পাথরের উপর মুখ রেখে পড়ল বার্ট। জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে তার, মুখের কাছ থেকে তুষার সরে গেছে শ্বাসের তোড়ে। হাটু ভাজ করে বসে ওঠার চেষ্টা করল সে।

মেসার উপর এত রক্ত দেখে অবাক হচ্ছে বার্ট। কেউ একজন সাংঘাতিক রকম জখম হয়েছে তা বোঝাই যাচ্ছে রক্ত দেখে। সে যেখানে পড়েছিল ঠিক সেখানেই দেখা যাচ্ছে রক্ত। গুলিটা তা হলে তারই পেটে লেগেছে!

পেটে গুলি করে মেরেছিল সে একজন লোককে; অনেক সময় লেগেছিল তার মরতে।

রাইফেলটাকে লাঠির মত করে তাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল বার্ট। পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে জাভেদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জেনি, দেখতে পেল সে। ঠিক স্বর্গের অপ্সরীর মতই লাগছে ওকে ওর ধবধবে সাদা পোশাকে।

মরে যাচ্ছে সে। দুই পায়ে দাঁড়িয়ে রীতিমত টলছে। জাভেদ আর ওই মেয়েটাকে গুলি করতে খুব ইচ্ছে করছে তার, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ইচ্ছে করছে নিজের মাথায় একটা গুলি করতে। মনের অনেক জোর আছে তার, কিন্তু পেটে গুলি খেয়ে অসহায় বাচ্চার মত কেঁদে ভাসিয়ে তিলে তিলে মরার মত মনের জোর তার নেই।

রাইফেল তুলল সে। গলার পাশটা হঠাৎ অবশ হয়ে গেল তার। গলা বেয়ে একটা ভিজে গরম স্রোত নামছে নীচের দিকে। গলায় গুলি লেগেছে-জিতেছে সে! আর তাকে ধুকে ধুকে কষ্ট পেয়ে মরতে হবে না।

তার মনে আছে মায়ের অনুরোধে বাবার মৃত্যুর পরে সে নিজের হাতে বাবার দাড়ি কামিয়ে দিয়েছিল। মা তার প্রশ্নের জবাবে বলেছিল, তোমার বাবা স্বর্গের দরজায় মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে হাজির হোক এ আমি চাই না। সবারই সেখানে ফিটফাট হয়ে পৌঁছা’নো উচিত।

তার তো কোন ছেলে নেই, তাকে কে দাড়ি কামিয়ে দেবে? কে তাকে কবরের জন্য উপযুক্ত ভাবে সাজাবে?

সবারই একটা অন্তত ছেলে থাকা উচিত।

চোখের কয়েক ইঞ্চি দূরেই নিজের রক্তাক্ত হাতটা দেখতে পাচ্ছে সে। ঠাণ্ডা বাতাসে রক্ত শুকিয়ে জমে গেছে এর মধ্যেই। কী যেন বলার চেষ্টা করল সে, কিন্তু স্বর বেরুল না।

দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল জেনি জাভেদের কাছে।

কী হয়েছিল, তুমি ঠিক আছ তো? উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করল জাভেদ

ঠিকই আছি আমি, জবাব দিল জেনি। আমি মনে মনে জানতাম তুমি আসবে।

আসতে একটু দেরিই হয়ে গেল আমার।

না, তুমি ঠিক সময় মতই এসেছ।

.

ভোর বেলা রাত থাকতেই কেবিনের দরজায় এসে হাজির হলো ম্যাট। মাটিতে পা ঠুকে জুতো থেকে তুষার ঝরিয়ে নিয়ে নীনার ডাকে কেবিনে ঢুকল সে।

মিস পেজ, বলল ম্যাট। আমার কথা যদি শোনেন, তবে বলব আমাদের আজই সকালে এখান থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ভেগে যাওয়া উচিত।

কথাটা শুনে নীনার ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কেন, কী হয়েছে?

এখনও কিছু হয়নি, অর্থাৎ আমার জানা মতে কিছু হয়নি-তবে বার্ট গতরাতে আর ফিরে আসেনি। ওর ফিরে না আসার একটাই মানে হতে পারে, সেটা হচ্ছে আর বেঁচে নেই লোকটা।

এইটুকুতেই ঘাবড়ে গেছ তুমি?

না, সরাসরি জবাব দিল ম্যাট। সব কিছুতেই শালার প্যাঁচ লেগে যাচ্ছে এখন।

ম্যাটের আগের কথাগুলোকে কোন গুরুত্ব না দিলেও এবার একটু চকিত হলো নীনা। এর আগে কোনদিন নীনার সামনে গাল বকেনি ম্যাট।

এটুকুই সব নয়। খবর পাওয়া গেছে বাইরের কিছু লোকজন এসে হাজির হয়েছে এই এলাকায়। তিন চারজন লোককে দেখে এসেছে বাড। সব কয়জনই ভীষণ লোক। বাডের সাথে কোন কথাই বলেনি ওরা। ঘোড়ার পর থেকে ওরা কেবল নীরবে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। বাডও ওদের ভাল করে চেয়ে দেখে ফিরে এসে কাজে ইস্তফা দিয়েছে।

আর কিছু? জিজ্ঞেস করল নীনা।

হ্যাঁ, অ্যালেকের প্ল্যানে আমি কিছুতেই মত দিতে পারিনি। ওকে আমি বিশ্বাসও করি না, পছন্দও করি না, আমি বুঝি না আপনি বা বড় কর্তা কী দেখেছিলেন ওর মধ্যে। আজ পর্যন্ত এই দলের জন্যে কেবল একের পর এক বিপদই ডেকে এনেছে সে।

আমার মনে হয় ওই লোকগুলো অ্যালেকের জন্যেই অপেক্ষা করছে ওই জঙ্গলে। ফেরার পথে ঘোড়ার পিঠেই ওকে শেষ করবে তারা।

শুধু তাই না, স্যান সিদ্রোয় পৌঁছেচে শেরিফ। ববের বস্ হাজির হয়েছে শহরে, তার সাথে আছে আরও তিনজন ডেপুটি। ওদের একজন ডেপুটির ঘোড়ায় আবার টেক্সাসের মার্কা দেখা গেছে। অনেক ধরনের প্রশ্ন নাকি জিজ্ঞেস করছে ওরা।

আগুনের ধারে গিয়ে কফির পটটা হাতে তুলে নিল নীনা। মেয়েদের স্বভাবই এই, বিপদের দেখা পেলেই খাবারের আয়োজন করে ওরা।

পালাবার কি উপয় নেই আমাদের?

এই প্রথমবারের মত ম্যাটের চোখে নিরাপত্তার আভাস লক্ষ করল নীনা। মনে হয় সম্ভব। সাথে হয়তো কিছু নিতে পারব না, তবে আমার মনে হয় আমরা চলে গেলে আপত্তি করবে না ওরা-বরং আপদ বিদায় হলো দেখে খুশিই হবে, মিস পেজ।

মিস পেজ, মিস পেজ, করো না আমাকে, বিরক্ত হয়ে বলে উঠল সে, আমার নাম নীনা।

নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা শিশি বের করে নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল সে।

.

ভাচে ক্রীক ধরে ফিরে আসছে ওরা ছয়জন। একজনের মাথায় রক্তাক্ত পট্টি বাঁধা, আর একজনের হাত ফিতে দিয়ে গলার সাথে ঝুলানোনা। ঘোড়াগুলো ক্লান্ত পায়ে চলছে। আরোহীরাও সবাই ক্লান্ত, অবসন্ন।

সারা পথই ঠাণ্ডায় কষ্ট পেয়েছে ওরা। দলবল নিয়ে সোনা ছিনিয়ে আনতে গেছিল অ্যালেক। স্টেজ কোচটাও ঠিক সময় মতই দেখা দিয়েছিল। পুরো আত্মবিশ্বাস নিয়ে ওরা এগিয়ে গিয়ে থামিয়েছিল গাড়ি।

কিন্তু স্টেজ ড্রাইভারটাই বেয়াড়ার মত অ্যালেকের প্ল্যান অনুযায়ী হাত তুলে আত্মসমর্পণ না করে গুলি ছুঁড়ে বসল। ওর শটগানের প্রথম গুলিতে একজনের মুখ ছিড়ে উড়ে গেল, দ্বিতীয় গুলিতে আর একজন চিৎকার করে ধরাশায়ী হলো। ঘোড়ার লাফালাফি আর এলোপাতাড়ি গোলাগুলির মাঝে লোকটা ঠাণ্ডা ভাবেই তার রাইফেলটা বের করে গুলি ছোড়া আরম্ভ করল। গাড়ির ভিতর থেকেও কয়েকজন গুলি ছুঁড়তে আরম্ভ করল। ধপাধপ ঘোড়া আর মানুষ পড়তে আরম্ভ করল। অ্যালেকই সবচেয়ে প্রথম ঘোড়া ঘুরিয়ে নিয়ে পিঠটান দিল। মাইলখানেক দূরে সবাই মিলিত হয়ে নীরবেই ফিরতি পথে রওনা হলো।

বাকি সবার ভাগ্যে যে কী ঘটেছে তা কোনদিন জানতে পারবে না অ্যালেক। এমন ঘটার কোন কথা ছিল না। অ্যালেক আশা করেছিল স্টেজের সবাই ওদের বন্দুক দেখেই ভয় পাবে, কিন্তু বাস্তবে তা হলো না। গুলি খেয়ে প্রথম লোকটার মাথা রক্তের আড়ালে মিলিয়ে যেতে দেখেই সব সাহস হারিয়ে ফেলেছিল সে।

র‍্যাঞ্চের উঠানে উঠে এল ওরা। কেউ একজন ওর নাম ধরে ডেকে উঠল।

অ্যালেক! লোকটা তার দলের কেউ নয়।

ডাক শুনে সে মুখ তুলে পেয়ে দেখল উঠানের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। জাভেদ। খালি হাতেই দাঁড়িয়ে আছে সে। লুইস রয়েছে গুদাম ঘরের দরজার কাছে। আস্তাবলের কোণায় চালি, কেবিনের দরজায় হেলান দিয়ে রয়েছে জিম, তার একটু দূরেই দেখা যাচ্ছে জিকোকে। সবার হাতেই একটা করে রাইফেল রয়েছে। কেবিনের জানালা দিয়েও দেখা যাচ্ছে একটা রাইফেলের নল। জেনি। রয়েছে জানালায়। ওদের দাঁড়ানোর ভঙ্গি আর তৈরি হাবভাব দেখে উদ্দেশ্য বুঝতে অ্যালেকের দলের কারও আর বাকি রইল না।

অ্যালেকের পিছনের লোকটা বলে উঠল, মারপিট যথেষ্ট হয়েছে, আমি আর এর মধ্যে নেই। তার রাইফেল আর পিস্তল মাটিতে পড়ার আওয়াজ পেল অ্যালেক। পিছনে আরও রাইফেল মাটিতে পড়ার শব্দ উঠল।

জাভেদের দিকে চেয়ে অ্যালেকের ভিতরটা রাগে আর হিংসায় একেবারে জ্বলে উঠল। স্টেজ কোচের ধারে কাছেও ছিল না সে, কিন্তু অ্যালেকের মনে হচ্ছে তার সব ব্যর্থতার মূলে রয়েছে ওই লোকটাই।

হেরে গেছে অ্যালেক। সব দিক দিয়েই হেরেছে সে, কিন্তু হেরেও সে এখন জয়ী হতে পারে জাভেদকে হত্যা করে। মৃত জাভেদ তার জয়ের ফল ভোগ করতে পারবে না-কিছুই পাবে না সে।

নীনা কোথায়? প্রশ্ন করল অ্যালেক।

চলে গেছে, জবাব দিল জাভেদ। আজ সকালেই, একটা গাধার পিঠে তার নিজস্ব কিছু মাল নিয়ে ম্যাটের সাথে চলে গেছে সে ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে।

তা হলে ওই পর্বও শেষ

তার পিছন থেকে তাকে একা ফেলে তার সঙ্গীরা একে একে সবাই ঘোড়া নিয়ে সরে যাচ্ছে। ঘোড়ার খুরের শব্দ কানে আসছে তার। সামনে জাভেদ অপেক্ষা করে দাড়িয়ে রয়েছে। কী ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পেরেই ওর সঙ্গীরা সবাই ওর পিছন থেকে সরে গেছে। কেউ অস্ত্র ত্যাগ করতে বলেনি, আত্মসমর্পণ করতেও বলেনি।

কয়েকদিনের মধ্যেই কলোরাডোতে কী ঘটেছিল তা জানাজানি হয়ে যাবে সবখানে। লোকজন তাকে খুঁজবে-ফেরারী আসামী সে এখন! আশ্চর্য, প্ল্যান করার সময়ে কেবল সাফল্যের দিকটাই ভেবেছে সে, এদিকটা কখনও ভেবে দেখেনি।

ইচ্ছা করলে লোকগুলো তাকে ফাঁসি দিতে পারে। হয়তো করবেও তাই।

পা দুটো কিছুটা ফাঁক করে তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জাভেদ। অ্যালেক পিস্তল বের করার চেষ্টা করলেই নিজের পিস্তল বের করে গুলি করবে সে।

তোমরা সবাই আমার পিস্তল বের করার অপেক্ষায় আছ, রাগে চিৎকার করে বলল অ্যালেক। সেটা করলেই আমাকে মারবে! কিন্তু ভুল ধারণা করেছ তোমরা। সে-সুযোগ আমি তোমাদের দেব না। আত্মসমর্পণ করব আমি। ভেবেছ ওরা ফাঁসিতে ঝুলাবে আমাকে। কিন্তু দেখে নিয়ে ফাঁসির দড়ি ঠিকই এড়িয়ে যাব আমি। আমার জিত হবেই। এই দেখো আমি আত্মসমর্পণ করছি। হাতের রাইফেলটা মাটিতে ফেলে দিয়ে কোমর থেকে পিস্তলটাও মাটিতে ফেলার জন্য। হাত বাড়াল সে।

কিন্তু পিস্তলটা বের করে মাটিতে না ফেলে ঝট করে সেটা উঁচিয়ে ধরল জাভেদের দিকে। সে নিজে মরবে এটা নিশ্চিত, তবে জাভেদকেও সেই সাথে নিয়ে যাবে সে।

বিদ্যুৎবেগে নিজের পিস্তল বের করে নিয়েই ডান দিকে ঝাঁপ দিল জাভেদ। অ্যালেকের গুলিটা একমুহূর্ত আগে সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেই জায়গাটা ভেদ করে চলে গেল।

মাটি ছোঁয়ার আগেই উড়ন্ত অবস্থায় গুলি করল জাভেদ। মাটিতে পড়ে একটা গড়ান দিয়েই আবার গুলি করল সে। অ্যালেকের দ্বিতীয় গুলিটা জাভেদ প্রথমে যেখানে পড়েছিল সেখানে মাটিতে গিয়ে ঢুকল।

জাভেদের দুটো গুলিই অব্যর্থ ভাবে অ্যালেকের বুকে গিয়ে বিধেছে। হাত থেকে ওর পিস্তলটা খসে পড়ল মাটিতে। গোলাগুলির শব্দে ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠে ঘোড়াটা পিছন দিকে ছুটল। অ্যালেকের অসাড় দেহটা ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ল নীচে।

.

সেই দিনই দুপুর বেলায় জাভেদ, জেনি আর জিকো বসে গল্প করছে কেবিনে। লরেন্স, চার্লি আর জিম ফিরে গেছে লোমা কয়োটিতে-অন্যান্যরা যে যার পথে যাবার জন্য স্যান সিদ্রোর দিকে গেছে।

আবার সেই আগের মত করে ফিরে পেয়েছে ওরা কেবিনটা। খাওয়া শেষ করে কফিতে চুমুক দিতে দিতে গল্প করছে ওরা। হঠাৎ কী মনে পড়তেই জেনি রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকল। একটু পরেই তিনটে প্লেটে করে পাই নিয়ে ফিরল।

এগুলো আবার কখন তৈরি করলে? প্রশ্ন করল জাভেদ।

আমি করিনি, এগুলো তৈরি করাই ছিল।

জিকো অনেকক্ষণ কোন কথা বলেনি। অনেক ধকল গেছে ওর উপর দিয়ে। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পরে ঠাণ্ডার মধ্যে বেচারা পায়ে হেঁটে জ্বর নিয়ে ফিরেছে ক্যাম্পে।

জেনি মাত্র কামড় দিতে যাচ্ছিল ওর পাই-এ। সবাইকে অবাক করে লাফিয়ে উঠে জাভেদ ওর হাত থেকে পাইটা ছিনিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল বাইরে।

নিশ্চয়ই নীনা রেখে গেছে ওগুলো? তুমিও ওটা খেয়ো না, জিকো। ওই পাতকীকে বিশ্বাস নেই।

বাইরে এতক্ষণ বার্টের কুকুর মন্টি ঘেউ ঘেউ করে চিৎকার করছিল। ওর চিৎকার থেমে গেল। বার্ট আর ফিরে আসেনি, কেউ ওকে মনে করে খেতেও দেয়নি আর। কাল থেকেই ভুখা আছে মন্টি।

জানালার কাছে এসে দাঁড়াল জাভেদ। কুকুরটা পাই মুখে করে নিয়ে গিয়ে একটু দূরে গিয়ে বসেছে। দুই থাবার মাঝখানে রয়েছে পাইটা। জাভেদকে জানালায় দাঁড়াতে দেখে মন্টি একবার মুখ তুলে চাইল। জাভেদ ওর মুখের গ্রাস কেড়ে নেবে না বুঝতে পেরে নিশ্চিন্ত হয়ে গোগ্রাসে গিলতে আরম্ভ করল সে।

জানালার ধারে জাভেদের পাশে এসে দাড়াল জেনি।

মিছেই তুমি সন্দেহ করেছ নীনাকে।

কোন জবাব না দিয়ে কুকুরটার দিকে চেয়ে রইল জাভেদ।

খাওয়া শেষ করে একটু অস্থিরভাবে উঠে দাঁড়াল মন্টি। আধপাক ঘুরে তিড়িং করে লাফিয়ে শূন্যে উঠে ডিগবাজি খেয়ে আছড়ে পড়ল মাটিতে। ঘেউ ঘেউ-এর বদলে কুকুরটার গলা দিয়ে করুণ কেঁউ কেউ শব্দ বেরুল। মাটিতে শুয়ে অস্থির ভাবে দাপাচ্ছে ও। আবার উঠে দাড়াল মন্টি। ছুটে দশজ এগিয়ে গেল। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েই তেরছা ভাবে লাফ দিল। কাত অবস্থায় ধপাস করে মাটিতে পড়ল কুকুরটা। শোওয়া অবস্থাতেই পা ছুঁড়ে কয়েক পাক ঘুরল সে, তারপর দুবার পা খিচুনি দিয়ে আবার উঠে দাঁড়াল। দেহ বাঁকিয়ে লেজের দিকে মুখ নিয়ে বনবন করে পাক খেতে লাগল মন্টি, যেন দ্রুত ছুটে লেজটাকে ধরার চেষ্টা করছে সে। কিন্তু যতই এগুচ্ছে সে লেজটা ততই সরে যাচ্ছে। একটু পরে পরিশ্রান্ত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল আবার 1 সমস্ত শরীর ঝাঁকিয়ে দুবার কাশি দিল, তারপর পিছনের বাম পায়ে একবার শেষ একটা খিচুনি দিয়ে স্থির হয়ে গেল।

বড় বড় চোখ করে এতক্ষণ দেখছিল জেনি।

পাইটা খেলে আমারও ওই অবস্থা হত!

ঠিক। মৃদু হাসল জাভেদ

কিন্তু হাসির ছিটেফোঁটাও নেই জেনির মুখে আয়ত দুই চোখে দু’ফোঁটা টলটলে জল।

তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ, জাভেদ।

এ ছাড়া আমার উপায় ছিল না, জেনি। হাসছে এখনও জাভেদ।

মানে?

মানে, তা নইলে আমার মস্ত ক্ষতি হয়ে যেত!

অবাক চোখে কয়েক সেকেন্ড জাভেদের মুখের দিকে চেয়ে রইল জেনি। তারপর মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, সত্যি?

সত্যি।

কাছে সরে এসে জাভেদের প্রশস্ত বুকে মাথা রাখল জেনি।

সস্নেহ চোখে ওদের এতক্ষণ দেখছিল জিকো। ঝট করে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল সে। মনে মনে বলল, দুটোকে মানিয়েছে বেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *