০৬. ছুটতে শুরু করল মুসা

কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই ছুটতে শুরু করল মুসা। ঠিক তার পেছনেই রবিন। প্রায় উড়ে চলে এল যেন সুড়ঙ্গমুখের কাছে। পাথরে হোচট খেল মুসা। হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তার গায়ে পা বেধে গিয়ে গোয়েন্দা সহকারীর ওপরই পড়ল নথি। দুই সহকারীর গায়ে হোচট খেতে গিয়েও কোনমতে নিজেকে সামলে নিল গোয়েন্দাপ্রধান।

হাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে দুই সহকারী। ফিরে চাইল একবার কিশোর। না, তাড়া করে আসছে না খুলি। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল আবার। নিচু হয়ে তুলে নিল টৰ্চটা। ভয়ে হাত থেকে খসে পড়েছিল।

মড়ার খুলি কথা বলতে পারে না, সময় পেয়ে সামলে নিয়েছে আবার কিশোর। উঠে দাঁড়িয়েছে দুই সহকারী, পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের দিকে ফিরে বলল, কথা বলতে হলে জিহবা দরকার, কণ্ঠনালী দরকার। খুলির ওসব কিছুই নেই।

হা হা করে হেসে উঠল খুলি। চমকে আবার দৌড় দিতে যাচ্ছিল দুই সহকারী, থেমে গেল খাঁজের পেছনে চোখ পড়তেই। না, খুলি হাসেনি। একটা মাথা দেখা যাচ্ছে। কোঁকড়া চুল। খুলি হাতে নিয়ে লাফিয়ে নেমে এল মাথার মালিক। আবার হাসল জোরে জোরে। নিম্পাপ। কালো দুটো চোখের মণি জ্বলজ্বল করছে টর্চের আলোয়।

তারপর? খুলিটা পেছনে ছুড়েঁ ফেলে দিল পাপালো হারকুস। চিনতে পার?

নিশ্চয়, জবাব দিল কিশোর। প্ৰথমে দৌড় দিয়েছিলাম, তারপরই মনে হল গলাটা কেমন চেনা চেনা। টর্চ তুলে নিতে আসার সাহস করেছি সেজন্যেই।

তারমানে, ভয় পাইয়ে দিতে পেরেছি। তোমাদের? আবার হাসল পাপালো। জলদস্যুর ভূত ভেবে কি একখান কান্ডই না করলে! মুসা আর রবিনের গোমড়া মুখের দিকে চেয়ে আবার হা হা করে হেসে উঠল সে।

আমি ভয় পাইনি, গম্ভীর গলায় বলল কিশোর। শুধু চমকে গিয়েছিলাম। মুসা আর রবিন… দুই সহকারীর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে থমকে গেল সে। ভেড়া বনে গেছে যেন মুসা আর রবিন।

আমিও ভয় পাইনি, বিড়বিড় করে বলল রবিন। পা দুটো কথা শুনল না, কি করব! খালি ভাগিয়ে নিয়ে যেতে চাইল…

আমারও একই ব্যাপারা বলল মুসা। খুলির ওদিক থেকে কথা শোনা যেতেই পা দুটো চনমান করে উঠল। ছুটিয়ে বের করে নিয়ে যেতে চাইল গুহার বাইরে। তাই, ইচ্ছে করেই তো হোচট খেলাম…

হো হো করে হেসে উঠল পাপালো। দারুণ কৌতুক! হাঃ হাঃ হাঃ…

কিশোরও হেসে ফেলল। হাসিটা সংক্রমিত হল মুসা আর রবিনের মাঝেও ।

চল, বাইরে যাই, হাসি থামিয়ে বলল কিশোর। খোলা হাওয়ায় বসে আলাপ করি।

বাইরে বেরিয়ে এল। চার কিশোর। পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসল।

এখানে কখন এলে? পাপালোকে জিজ্ঞেস করল কিশোর। কি করে জানলে, আমরা গুহায় ঢুকব?

সহজ, বলল পাপালো। নৌকা নিয়ে ঘোরাফেরা করছিলাম। তোমাদের বোট চোখে পড়ল। কোথায় যাবে, বুঝতে পারলাম। দ্বীপের উল্টো দিকে বোট ভিড়িয়ে নেমে পড়লাম। গাছপালার আড়ালে আড়ালে চলে গেলাম ক্যাম্পের কাছে। দেখলাম, পার্কের দিকে যাচ্ছি। নাগরদোলাটার কাছেই একটা ঝোপের ভেতর লুকিয়ে বসে রইলাম। জানলাম, গুহায় ঢুকবে তোমরা। চট করে ঝোপ থেকে বেরিয়ে গাছের আড়ালে আড়ালে চলে এলাম এখানে। লুকিয়ে বসে রইলাম খাঁজের আড়ালে। খুলিটা ছিল অন্য একটা তাকে। খাঁজে নিয়ে গেছি। আমিই।

কিন্তু লুকিয়ে দ্বীপে নামতে গেলে কেন?? জানতে চাইল রবিন। জেটিতে নৌকা বেঁধে এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করলেই পারতে? এতসব লুকোচুরি কেন?

গার্ড শান্ত গলায় বলল পাপালো। জিম রিভানের ভয়ে। দেখলেই তাড়া করে। এখানকার সবাই তাড়া করে আমাকে। উজ্জ্বল চোখ দুটোতে বিষণ্ণতা।

কেন? জিজ্ঞেস করল মুসা।

লোকের ধারণা, আমি খারাপ, ধীরে ধীরে বলল পাপালো। আমরা গরীব, তারওপর বিদেশী, কাজেই চোর। ফিশিংপোর্টে অনেক লোক আছে, যারা সত্যিই খারাপ। ওরাই চুরি করে, নাম দেয়। আমার। বলেঃ ওই গ্রেশান কুত্তাটার কাজ।

পাপালোর জন্যে দুঃখ হল তিন গোয়েন্দার।

আমরা তোমাকে অবিশ্বাস করি না, পাপু, বলল মুসা। কত রকমের লোক আছে দুনিয়ায়। মানুষকে কষ্ট দিয়ে মজা পায়। ওদের কথায় কান দিও না… আচ্ছা, গতরাতে এত তাড়াতাড়ি আমাদেরকে খুঁজে পেলে কি করে, বল তো?

সেটাই সহজ, উজ্জ্বল হয়ে উঠল আবার কালো চোখজোড়া। হাক স্টিভেনের রেস্তোরাঁয় ঝাড় দিই। আমি। বাসনপেয়ালা মেজে দিই। দুডলার করে পাই রোজ। খুব ভাল লোক হাক। ও সাহায্য না করলে না খেয়েই মরতে হত…

দুডলারে দুজন মানুষের খাওয়া হয়। চোখ কপালে উঠল। রবিনের। বেঁচে আছ কি করে?

আছি, কোনমতে, সহজ গলায় বলল পাপালো। পুরানো ভাঙা একটা কুড়ে ঘরে ঘুমাই। এক সময় ঝিনুক রাখত। ওখানে জেলেরা। কাজে লাগে না এখন, ফেলে রেখেছে। ভাড়া দিতে হয় না। আমাকে। সীম আর রুটি কিনতেই খরচ হয়ে যায় দুডলার। মাছ ধরতে জানি, তাই বেঁচে আছি। বাবা অসুস্থ। ভাল খাওয়া দরকার। কিন্তু কোথায় পাব? মাঝে মাঝে বাবার কষ্ট দেখলে আর সইতে পারি না। ছুটে বেরিয়ে আসি কুড়ে থেকে। পাগলের মত ঘুরে বেড়াই উপসাগরে, খুঁজে ফিরি সোনার মোহর। মানুষের দয়া আমি চাই না, ঈশ্বর আমাকে সাহায্য করলেই যথেষ্ট।

অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলতে পারল না। আর। নোনাপানি ছুয়ে ছয়ে আসছে। হাওয়া, শই শই শব্দ, সাগরের দীর্ঘশ্বাস যেন।

কোমরের বেল্টে গোঁজা ছুরি খুলে নিয়ে খামোখাই মাটিতে গাঁথছে পাপালো। থমথমে পরিবেশ হালকা করার জন্যে হাসল। নিজের দুঃখের সাতকাহনই গেয়ে চলেছি। আসল কথা থেকে দূরে সরে গেছি। অনেক। হ্যাঁ, কি যেন জিজ্ঞেস করছিলে?

গতরাতে এত তাড়াতাড়ি আমাদেরকে খুঁজে পেলে কি করে? মনে করিয়ে দিল মুসা।

সকালে হাক স্টিভেনের ওখানে বাসন মাজছিলাম। হঠাৎ কানে এলো, হাসাহাসি করছে কয়েকজন লোক। একজন বললঃ গোয়েন্দা, না! গোয়েন্দা আনাচ্ছে। আসুক না আগে হাত দেখিয়ে ছাড়ব ব্যাটাদের!

নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে কাটতে হঠাৎ থেমে গেল কিশোর। হাতা শব্দটা কোন বিশেষ ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেছিল?

তুমি কি করে বুঝলে ভুরু কোঁচকাল পাপালো। জবাবের অপেক্ষা না করেই বলল, ওই শব্দটা বলার সময় জোর দেয় সে। ঝড়ের সময়ই তোমাদের নিরুদ্দেশের খবর ছড়িয়ে পড়ল। বুঝে গেলাম, কোথায় পাওয়া যাবে তোমাদেরকে।

দ্যা হ্যানড…হস্ত…হাত, বিড়বিড় করল কিশোর। চিমটি কাটছে ঠোঁটে।

পুরানো গলাবন্ধ শার্টের তলায় হাত ঢোকাল পাপালো। আমাকে যখন বিশ্বাস কর তোমরা…একটা জিনিস দেখাচ্ছি… ছুরিটি মাটিতে রেখে চামড়ার তেল চিটচিটে একটা থলে বের করে আনল সে। প্লাস্টিকের সুতোয় বাঁধা মুখ।

বাঁধন খুলল পাপালো। চোখ বন্ধ করা সবাই, হাসি হাসি গলায় বলল। হাত বাড়াও।

হাসল তিন গোয়েন্দা। চোখ বন্ধ করে হাত সামনে বাড়াল। সবার ডান হাতের তালুতে একটা করে বস্তু রাখল পাপালো। এবার চোখ খোল!

অবাক হয়ে দেখল তিন গোয়েন্দা, তিনটে পুরানো সোনার মোহর।

বুড়ো আঙুলের সাহায্যে চকচকে মুদ্রার ধারটা পরীক্ষা করল রবিন। ক্ষয়ে গেছে। লেখা পড়ল। ষোলোশো পনেরো! চোখ বড়বড় হয়ে গেছে তার। এত পুরানো।

স্প্যানিশ ডাবলুন! হাতের মোহরটার দিকে চেয়ে আছে কিশোর। জলদস্যুদের গুপ্তধন!

ইয়াল্লা! কোথায়, কোথায় পেয়েছ এগুলো?

সাগরের তলায়, বালিতে পড়েছিল, বলল পাপালো। খুঁজলে আরও পাওয়া যেতে পারে। সিন্দুক কোথাও লুকিয়ে রাখেনি ওয়ান-ইয়ার, নৌকা থেকে পানিতে ফেলে দিয়েছিল। অনেক আগের ঘটনা। সিন্দুকটা নিশ্চয় পাচে ভেঙে নষ্ট হয়ে গেছে। মোহরগুলো ছড়িয়ে পড়েছে বালিতে। ঢেউয়ের জন্যে এক জায়গায় নেই। আর এখন। একটা পেয়েছি স্কেলিটন আইল্যান্ডের দক্ষিণে, একটা ড়ুবে যাওয়া ইয়টের কাছে। সুন্দর ইয়ট ছিল। এককালে, ধ্বংস হয়ে গেছে এখন। কয়েকদিন পরেই দুটো মোহর পেয়েছি আরেক জায়গায়। মনে হয়। ওখানে আরও…

জোরে গাল দিয়ে উঠল। কেউ, এই হারামজাদা, শুয়োরের বাচ্চা, এখানে কি করছিস!

চমকে ফিরে তাকাল তিন গোয়েন্দা। বিনয়ী জিম রিভানের এ-কি। মূর্তিা রাগে কাঁপছে। চোখ মুখ লাল। ছুটে আসছে। বেকায়দা ভঙ্গিতে পাশে ঝুলছে অকেজো হাতটা। হারামজাদা আবার গাল দিয়ে উঠল। সে। একবার না বলেছি, এদিক মাড়াবি না। আজ অ্যায়সা ধোলাই দেব… থেমে গোল সে।

জিমের দৃষ্টি অনুসরণ করে ফিরে তাকাল তিন গোয়েন্দা। তাদের পাশে নেই পাপালো। ছায়ার মত নিঃশব্দে উঠে চলে গেছে ওখান থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *