০৬. খেতে খেতে অনেক কথাই হলো

খেতে খেতে অনেক কথাই হলো।

শেষে বিদায় নিয়ে যাওয়ার জন্যে উঠলো জ্যাক। তাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলো ছেলেমেয়েরা। টোগোকে নিয়ে ল্যারিও এলো তাদের সঙ্গে।

লম্বা লম্বা পায়ে পাহাড়ের মোড়ে হারিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইলো ওরা। তারপর আবার ফিরে এলো বাড়িতে।

ডিম, দুধ, রুটি, মাখন আর পনির ঝুড়িতে ভরে দিলেন মা। সেগুলো নিয়ে, তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার ক্যাম্পে ফিরে চললো তিন গোয়েন্দা আর জিনা।

জনি রয়ে গেল খামারে, তার কাজ আছে। পরদিন আবার যাবে ক্যাম্পে, বলে দিলো সে।

ঢাল বেয়ে উঠছে ওরা। আগে আগে চলেছে রাফি। এই সময় কোথা থেকে যেন উড়ে এসে ফুলের ওপর বসলো বড় একটা প্রজাপতি। এরকম প্রজাপতি আর কখনও দেখেনি ওরা।

খাইছে! কতোবড়! বলে উঠলো মুসা। কি প্রজাপতি?

মাথা নাড়লো রবিন। বলতে পারবো না। কিশোর, তুমি জানো?

নাহ, কিশোর বললো। চেহারা-সুরতে তো দুর্লভ জিনিস বলেই মনে হচ্ছে। ধরে নিয়ে যাবো নাকি ডাউসনের কাছে?

কিশোরের কথা শেষ হতে না হতেই পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল জিনা। হাত বাড়ালো প্রজাপতিটাকে ধরার জন্যে। শেষ মুহূর্তে উড়ে গেল ওটা। গিয়ে বসলো কাছেই আরেকটা ফুলে। আবার এগোলো জিনা। শেষ মুহূর্তে আবার উড়লো প্রজাপতি। গিয়ে বসলো আরেক ফলে।

রোখ চেপে গেল জিনার। ধরবেই ওটাকে। প্রজাপতিটাও চালাক। কিছুতেই ধরা পড়তে চাইলো না। গেলও না এলাকা ছেড়ে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে তিন গোয়েন্দা। কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে রাফিয়ান।জিনাকে সাহায্য করতে এগোবে কিনা ভাবছে বোধহয়।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য ধরা পড়তে হলো প্রজাপতিটাকে। সাবধানে ওটার দুই পাখা টিপে ধরে রেখে জিনা বললো, একটা পনিরের টিন খালি করে ফেলো, জলদি!

তাড়াতাড়ি টিনের পনির বের করে, একটা প্যাকেটের কাগজ ছিঁড়ে মুড়ে রাখলো রবিন। টিনটা দিলো জিনাকে। সাবধানে ওটার মধ্যে প্রজাপতিটাকে ভরলো জিনা। চেপে রাখা নিঃশ্বাসটা ফোঁস করে ছেড়ে বললো, থাকো এবার আরামসে! বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বললো, আমি শিওর, এটা দেখে খুব অবাক হবেন মিটার ডাউসন।

তখন না বললে আর যাবে না ওখানে? মুসা বললো। ডাইনী বুড়িটা আছে…

থাকুক। তবুও যাবো।

তোমার কখন যে কি মনে হয়, হাসতে হাসতে বললো কিশোর, ঠিকঠিকানা নেই।

কি বলছো, কিশোর? এতোবড় একটা প্রজাপতি ধরলাম। দুর্লভ কিনা, কি নাম, জানতে ইচ্ছে করছে না তোমার?

করছে। তবে তার চেয়েও বেশি ইচ্ছে করছে ডরি আর বুড়ির ছেলের সঙ্গে দেখা করতে। প্রজাপতিটা না ধরলেও ওদের সঙ্গে দেখা করতে যেতামই একবার।

ঝট করে কিশোরের দিকে তাকালো রবিন। তোমার কথায় রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি! কি ব্যাপার, কিশোর?

নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটলো একবার গোয়েন্দাপ্রধান। এখনও জানি না। তবে এখানে আসার পর থেকেই কতগুলো ব্যাপার বেশ অবাক করেছে আমাকে। তদন্ত করে দেখা দরকার।

নিজে থেকে কিছু না বললে হাজার চাপাচাপি করেও কিশোরের মুখ থেকে কোনো কথা আদায় করা যাবে না, একথা জানা আছে তিনজনেরই। কাজেই আপাতত আর কোনো প্রশ্ন করলো না। সময় হলে আপনা থেকেই সব বলবে কিশোর।

 

কাঁচের ঘরগুলোর কাছে মিস্টার ডাউসনের দেখা মিললো না, নেই তিনি ওখানে।

বোধহয় কটেজে, কিশোর বললো। ডেকে দেখি।

কটেজের কাছে এসে ডাক দিলো সে, মিস্টার ডাউসন। মিস্টার ডাউসন!

সাড়া দিলেন না প্রজাপতি মানব, বেরিয়ে এলেন না। তবে দোতলার একটা জানালার পর্দা ফাঁক হলো, উঁকি দিলো কেউ। সেদিকে হাত নেড়ে আবার ডাউসনের নাম ধরে ডাকলো কিশোর।

মুসা বললো, মিস্টার ডাউসন, আপনার জন্যে একটা দুর্লভ প্রজাপতি নিয়ে এসেছি।

জানালা খুলে গেল। বেরিয়ে এলো মিসেস ডেনভারের মুখ। জিনার মনে হলো, একেবারে কার্টুন ছবির ডাইনী, কোনো ভুল নেই।

মিস্টার ডাউসন নেই, জবাব দিলো মিসেস ডেনভার।

তার বন্ধু মিস্টার ডরি কোথায়? জিজ্ঞেস করলো কিশোর। তিনি আছেন?

ওদের দিকে তাকিয়ে কি বললো মহিলা, বোঝা গেল না। জানালার ভেতরে ঢুকে গেল আবার তার মুখ।

অবাক হয়ে কিশোরের দিকে তাকালো মুসা। এরকম করলো কেন? হ্যাঁচকা টান দিয়ে কেউ সরিয়ে নিলো বলে মনে হলো না?

ঘরে তার ছেলেটা নেই তো? নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলো রবিন।

কি জানি! গাল চুলকালো কিশোর। চলো, আশপাশটা ঘুরে দেখি ডাউসনকে পেয়েও যেতে পারি।

কটেজের একটা কোণ ঘুরে উঁকি দিতে একটা ছাউনি চোখে পড়লো। কেউ নেই। ঠিক ওই সময় পেছনে পদশব্দ শুনে ফিরে তাকালো ওরা। একজন লোক আসছে তাদের দিকে। খাটো, রোগাটে, লম্বা মুখ, নাকটা বাঁকা। চোখে কালো চশমা। হাতে একটা প্রজাপতি ধরার জাল। বললো, মিস্টার ডাউসন তো নেই। কি চাও তোমরা?

আপনি নিশ্চয় মিস্টার ডরি, কিশোর বললো। আমরা একটা দুর্লভ প্রজাপতি ধরে এনেছি। মিস্টার ডাউসনকে দেখাতে।

দেখি? হাত বাড়ালো ডরি।

টিনটা দিলো জিনা। সাবধানে টিনের ঢাকনা খুলে সামান্য ফাঁক করলো ডরি, যাতে প্রজাপতিটা উড়ে যেতে না পারে।

কালো কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখতে দেখতে মাথা ঝাঁকালো ডরি। হুঁ, ভালো। এক ডলার দিতে পারি।

এক পয়সাও দিতে হবে না, এমনিই নিন, জিনা বললো। শুধু বলুন, এটার নাম কি? কি জাতের?

কোনো ধরনের ফ্রিটিল্যারি? রবিন জিজ্ঞেস করলো।

হতে পারে, বলে, পকেট থেকে একটা ডলার বের করে তাড়াতাড়ি তার হাতে গুঁজে দিলো লোকটা। এই নাও। প্রজাপতি পেয়ে খুশি হলাম। মিস্টার ডাউসন এলে বলবো।

আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আচমকা ঘুরে দাঁড়ালো সে। এক হাতে টিন, আরেক হাতে জাল নিয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করলো।

অবাক হয়ে হাতের টাকাটার দিকে তাকালো একবার রবিন। তারপর আবার তাকালো লোকটার দিকে।

ডরি চলে গেলে মুসা বললো, আজব লোক! এই লোকের সঙ্গে বনিবনা হয় কিভাবে মিস্টার ডাউসনের? টাকাটা কি করবে? এটা দরকার নেই আমাদের।

মিসেস ডেনভারকে দিয়ে দেবো, চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো কিশোর। তার দরকার। ছেলে তাকে একটা পয়সাও দেয় বলে মনে হয় না।

আবার কটেজের সামনে এসে দাঁড়ালো ওরা। আশা করেছিলো মিসেস ডেনভারকে দেখতে পাবে। কিন্তু পেলো না। একমুহূর্ত দ্বিধা করে সামনের দরজায় গিয়ে টোকা দিলো রবিন।

দরজা খুলে গেল। বিড়বিড় করে কি বললো মহিলা, বোঝা গেল না। তারপর বললো, তোমরা চলে যাও। আমার ছেলে এসে দেখলে তোমাদের তো গালমন্দ করবেই, আমাকেও মারবে। চলে যাও তোমরা।

যাচ্ছি। এই নিন, বলে টাকাটা মহিলার হাতে গুঁজে দিলো রবিন।

হাতের তালুতে ডলারটা দেখে বিশ্বাসই করতে পারলো না মিসেস ডেনভার। তারপর হঠাৎ যেন সংবিৎ ফিরে পেয়ে তাড়াতাড়ি ছেড়া জুতোর ভেতরে ওটা লুকিয়ে ফেললো। আবার যখন সোজা হলো, দেখা গেল তার চোখে পানি টলমল করছে। তোমরা খুব ভালো! সে-জনন্যই বলছি, চলে যাও। আমার ছেলেটা মানুষ না! তোমাদেরকেও মেরে বসতে পারে। চলে যাও, প্লীজ!

নীরবে ওখান থেকে সরে এলো ওরা।

আজব এক জায়গা! হাঁটতে হাঁটতে বললো কিশোর। দুজন প্রজাপতি মানব, একসাথে থাকে, অথচ আচার ব্যবহারে একজনের সঙ্গে আরেকজনের আকাশ-পাতাল তফাৎ। একজন মহিলা, তার ব্যবহার আরও অদ্ভুত। ছেলের কথা যা শুনি, ওটা নিশ্চয় আরেক পাগল! বুঝতে পারছি, আবার আসতে হবে এখানে।

তারমানে রহস্যের ভূত ঘাড়ে চেপেছে তোমার, হেসে বললো মুসা।

কেন, তোমার কাছে রহস্যময় লাগছে না?

লাগছে।

আমি অবাক হচ্ছি, রবিন বললো, ডরি প্রজাপতিটা চিনতে পারলো না দেখে। প্রজাপতির ব্যবসা করে, অথচ…কি জানি, হয়তো খালি বেচাকেনা নিয়েই থাকে লোকটা। কোনটা কোন প্রজাপতি তার ধার ধারে না।

কিন্তু বেচাকেনা করতে গেলে জিনিস চিনতে হয় না? জিনা প্রশ্ন তুললো। লোকে যখন বলে এই জাতের প্রজাপতি দিন, ওই জাতের শুঁয়াপোকা দিন, না চিনলে কি করে দেয়?

তা-ও কথা ঠিক, মাথা দোলালো রবিন। নাহ, পুরো ব্যাপারটাই রহস্যময়!

ক্যাম্পে ফিরে এলো ওরা। এসেই সোজা ভাঁড়ারের দিকে রওনা হলো রাফিয়ান। হাত নেড়ে রবিন বললো, না না, রাফি, যাসনে। খাবার সময় হয়নি এখনও।

এখন কি করবো? শুয়ে পড়েছে মুসা। সুন্দর বিকেল।

তা ঠিক। কিন্তু রাতে আর সুন্দর থাকবে বলে মনে হয় না, কিশোর বললো পশ্চিম আকাশের দিকে তাকিয়ে। মেঘ জমছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি আসবে।

আমারও মনে হয়, জিনা বললো। সাগরের তীরে বাড়ি। কখন বৃষ্টি আসে না আসে মোটামুটি আঁচ করতে পারে। দূর! আর একটা হপ্তা অপেক্ষা করতে পারলো

আকাশ! এখন বৃষ্টি এলে উপায় আছে? সারাদিন তাবুতে বসে থাকতে হবে। ক্যাম্পিঙের আর কোনো মানে হবে না।

যখন আসে আসবে, রবিন বললো। এখন ওসব ভেবে লাভ নেই। বৃষ্টি এলে বসে থাকবো কেন? গুহাগুলো দেখতে চলে যাবো। এখন এসো, মিউজিক শুনি। আবহাওয়ার খবর খারাপ হলে তা-ও জানতে পারবো।

বেশ, চলো তাহলে মিউজিকই শুনি, জিনা বললো। আজ বিকেলে কোনো এক সময়ে প্যাসট্রোল সিমফনি বাজানোর কথা। ঘোষণা শুনেছি, তবে সময়টা ঠিক মনে নেই। এখানে, এই পাহাড়ী গাঁয়ে, ওই মিউজিক শুনতে দারুণ লাগবে। তবে অবশ্যই ভলিউম কমিয়ে শুনতে হবে। জোরে শুনতে ভালো লাগে না ওই বাজনা।

বাবারে, একেবারে কবি হয়ে যাচ্ছে দেখি আমাদের জিনা বেগম, হেসে ঠাট্টা করলো মুসা।

পানি-নিরোধক খাপ থেকে রেডিওটা বের করলো কিশোর। সুইচ টিপে স্টেশন টিউন করতেই শোনা গেল মোটা কণ্ঠ, সংবাদ এখনকার মতো শেষ হলো। ধন্যবাদ।

আহহা, শেষ হয়ে গেল, বললো কিশোর। আবহাওয়ার খবরটা শোনা উচিত ছিলো। যাকগে, পরের বার শুনবো।

শোনা গেল ঘোষকের গলা। হ্যাঁ, জিনা ঠিকই বলেছে, প্যাসট্রোল সিমফনিই শোনানো হবে। নরম, হালকা লয়ে শুরু হলো বাজনা। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো যেন পাহাড়ী প্রকৃতি জুড়ে। যেন এই পরিবেশে শোনার জন্যেই সৃষ্টি হয়েছে ওই মিউজিক। রেডিওটা সামনে রেখে আরাম করে জাঁকিয়ে বসলো চারজনে। কারো মুখে কথা নেই। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে পশ্চিম আকাশে অপরূপ রঙের খেলা। ধীরে ধীরে দিগন্তে নামছে সূর্য।

ওদিকে একই দিগন্তের কোল থেকে উঠে আসছে মেঘের স্তর। সূর্যটা হারিয়ে গেল তার ওপাশে। মন খারাপ হয়ে গেল ওদের।

ঠিক এই সময়, বাজনা ছাপিয়ে সোনা গেল আরেকটা শব্দ। বিমান।

এতো আচমকা আর এতো জোরে হলো শব্দটা, চমকে গেল শ্রোতারা। ঘেউ ঘেউ শুরু করলো রাফিয়ান।

কোথায় ওটা? দেখতে না পেয়ে অবাক হয়েছে মুসা। কাছেই মনে হচ্ছে,

অথচ দেখছি না! জনির ভাই জ্যাক ওড়াচ্ছে না তো?

ওই যে, কিশোর হাত তুললো।

পাহাড় পেরিয়ে উড়ে আসতে দেখা গেল হোট বিমানটাকে। ওদের মাথার ওপর একবার চক্কর দিয়ে চলে গেল এয়ারফীন্ডের দিকে।

ছন্দপতন ঘটালো এই বিকট আওয়াজ। বাজনা শুনতে আর ভালো লাগলো না ওদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *