০৬. কোয়েলের ডাক শুনেই

কোয়েলের ডাক শুনেই এরিক বুঝতে পারল শিগগিরই অপেক্ষার পালা শেষ হয়ে যাবে, কারণ এই ডাকটা আসল নয়। ব্যাপারটা কীভাবে বুঝতে পারল ব্যাখ্যা করতে পারবে না, বুনো প্রকৃতিতে কাটানো জীবন থেকে এই ক্ষমতা আয়ত্ত করে নিয়েছে ও। এক ধরনের দৈব ক্ষমতা বা সহজাত প্রবৃত্তি। অন্ধকারে হারানো ট্রেইল খুঁজে পাওয়ার মত, কিংবা বহু প্রাচীন ইন্ডিয়ান ট্রেইলের অস্তিত্ব অনুভব করার অনুভূতি-চোখে দেখা যায় না, কিন্তু জানা আছে যে কোন একসময় সত্যি ট্রেইল ছিল।

রাতের বেলায় আক্রমণ করে না ইন্ডিয়ানরা, জানে এরিক, তবে নিশ্চিত করে বলাও যায় না। অ্যাপাচিদের ব্যাপারে শেষ কথা বলে কিছু নেই।

ইন্ডিয়ানদের মধ্যে কুসংস্কার রয়েছে রাতের বেলায় কোন যোদ্ধা মারা গেলে আজীবন ঘুরে বেড়ায় তার আত্মা, ইহ আর পরকালের মাঝখানে নারকীয় স্তরের অন্ধকারে হা-পিত্যেশ করতে থাকে।

সেক্ষেত্রে, সকালেই শেষ হয়ে যাবে ওদের বহু কাঙ্ক্ষিত অবকাশ।

তবে অন্তত একজন পাহারায় না থাকলেই নয়। চালাক-চতুর, সন্দেহপ্রবণ ও সাবধানী ইন্ডিয়ানও আছে, যারা পুরানো কুসংস্কারে বিশ্বাস করে না। অতি সতর্কতার জন্য একাধিকবার অন্যের কাছে হাসির পাত্র হয়েছে এরিক, কিন্তু অসতর্ক ছিল এমন বহু লোককে কবরও দিয়েছে। উন্মেষে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করবে ইন্ডিয়ানরা, জানে ও, ভোরের স্নান আলোকে কাজে লাগাবে। গোধূলির সময় মরুভূমিতে ধুলো উড়তে দেখেছে ও, অনুমান করে নিয়েছে আরও ইন্ডিয়ান চলে এসেছে। দূরের নীলচে পাহাড়ের অবয়বের বিপরীতে ধুলো উড়তে দেখেছে, দেখে মনে হয়েছে ধুলো আটকে আছে বাতাসে।

ভোরের উন্মেষে বুনো আক্রোশ নিয়ে হামলা করবে অ্যাপাচিরা, ওদের ধূলিমলিন বাদামি শরীর দেখে মনে হবে মাটি থেকে গজিয়ে উঠেছে; প্রয়োজনে চোখের পলকে উধাও হয়ে যাবে। আসলে মরুভূমির বালির বুকে সূর্যের প্রথম আলোকচ্ছটা দৃষ্টিভ্রম তৈরি করে-বালির সঙ্গে মিশে থাকা ইন্ডিয়ানদের পার্থক্য করা সম্ভব হয় না। সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় বালির রঙ আর রেডস্কিনদের বাদামি শরীর মিলেমিশে যায়। চোখের সামনে ইন্ডিয়ানদের উপস্থিতি, অথচ টের না পেয়ে এ পর্যন্ত মারা গেছে কত মানুষ। নিজের চোখে এক সৈনিককে মরতে দেখেছে এরিক, বিশ হাত দূরে খোলা মরুভূমিতে শুয়ে থাকা ইন্ডিয়ানকে দিনের আলোয়ও দেখতে পায়নি লোকটা।

আক্রমণ আসছে, অথচ বেকার থেকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, ব্যাপারটা অস্থিরতা আর অস্বস্তির জন্ম দিল ওর মনে। নিজের মালপত্রের কাছে এসে বুট বদলে মোকাসিন পরল এরিক। সকৌতূহলে ওকে দেখছে সার্জেন্ট হ্যালিগান।

চারপাশে রেকি করে আসি, তাকে বলল এরিক।

ঝুঁকি নিচ্ছ।

উপায় কী!

পাথরসারির কাছে চলে এল ও, আয়রনউড় ঝোঁপের কিনারা ধরে নেমে এল মরুভূমিতে। তাড়াহুড়ো করছে না এরিক, জানে যে সেটা বিপজ্জনক হতে পারে। ঝোঁপের আড়ালে বসে অপেক্ষায় থাকল, কান খাড়া। দীর্ঘক্ষণ পর সন্তর্পণে আড়াল থেকে বেরিয়ে এল, পাথরের উপর আলতো পা ফেলে নিঃশব্দে এগোল। কয়েকবার থেমে শব্দ শুনল, কিন্তু রাতের শব্দ ছাড়া কিছুই কানে এল না।

পাতার মর্মরধ্বনি, ছোট্ট পোকা বা গিরগিটির চলাফেরার ক্ষীণ শব্দ, ভূমিধসের কারণে নুড়িপাথর গড়ানোর আওয়াজ…মানুষের চলার শব্দ ছাড়াও কত রকমের আওয়াজ যে রয়েছে মরুভূমিতে!

মরুভূমি থেকে যখন বেরিয়ে এল এরিক, কয়েক মুহূর্তের জন্য আতঙ্কিত হয়ে পড়ল মেলানি। এত নিঃশব্দে এসেছে! প্রায় ভূতের মত উদয় হয়েছে, আচমকা। স্যাডলে রাখা পাইপ আনতে ঘোড়ার কাছে গেছে বেন ডেভিস, ক্যাম্পের কিনারে একাই ছিল মেলানি। দক্ষিণে পিনাকেটের জোড়া শৃঙ্গ রাতের আকাশের বুকে অস্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে।

ওহ, আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ তুমি! অস্ফুট স্বরে বলল মেলানি।

মেয়েটির পাশে এসে দাঁড়াল এরিক, রাতের মরুভূমির দিকে তাকাল। সুনসান নীরবতা, অস্বাভাবিক শান্ত; আলো না থাকায় দক্ষিণের অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকাকে নরক বলে মনে হচ্ছে। এত শান্ত, মৃদু স্বরে বলল এরিক। আসলে দারুণ বিপজ্জনক।

সত্যি কি আশপাশে লুকিয়ে আছে ইন্ডিয়ানরা?

হ্যাঁ।

কিন্তু সবকিছু তো শান্ত!

শান্ত বলেই তো এত নিশ্চিত। মরুভূমিতে হালকা ছোট ছোট শব্দ হয়, এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার; ওসব যখন থাকে না, তারমানে আশপাশে এমন কারও উপস্থিতি রয়েছে যে একেবারে চুপ মেরে গেছে ক্ষুদ্র প্রাণীরা।

ইন্ডিয়ানরা থাকার পরও বাইরে গেলে কেন?

কাভার হিসাবে ব্যবহার করবে ওরা, এমন জায়গাগুলো দেখার দরকার ছিল।

মারা যেতে পারতে তুমি। এটাকেই তো সেধে বিপদে পড়া বলে, তাই না?

হ্যাঁ, মারা যেতে পারতাম। এখন থেকে ইয়োমায় পৌঁছা’নো পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে আমাদের, এতটুকু কম নয় কারও। আমি কিন্তু সেধে বিপদে পড়তে চাইনি, কারণ ওই কাজটা করে নেহাত বোকা বা বাচ্চারা, কারণ কর্তব্য স্থির করার বুদ্ধি তাদের থাকে না। বিপদ সুখের বিষয় নয়, কিংবা উপভোগ্যও নয়; আসলে খুবই কুৎসিত, কষ্টকর এবং নৃশংস একটা পরিস্থিতি। যন্ত্রণা, উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠায় অতিষ্ঠ হওয়া।

বোকা বা নেহাত মাথাগরম বাচ্চা না হলে কেউই সেধে বিপদে জড়ায় না। অন্ধকার রাত্রিতে বিপদের মুখোমুখি হওয়া আর একই অভিজ্ঞতা বইয়ে পড়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। যারা অ্যাডভেঞ্চারের গল্প বলে বেড়ায়, বাস্তবে অ্যাডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতা তাদের নেই বললেই চলে, সেসব অন্যের মুখ থেকে শোনা।

সিগারেটের শেষাংশ ফেলে দিল এরিক। তোমার বাবা কিন্তু জানে এসব। এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করেই একটা সাম্রাজ্য গড়েছে সে, যেখানে নিরাপদে থাকতে পারবে তুমি।

আমার কোন কাজেই অনুমোদন নেই তোমার, তাই না?

অনুমোদন দেওয়ার মত কিছু আছে কি? স্বীকার করি, তুমি সুন্দরী, অথচ ভালভাবে বেঁচে থাকতে পারবে, এমন সুবিধাগুলো হেলায় ফেলে চলে যেতে চাইছ; তোমার বাবাকেও অবহেলা করছ। পুবের শিক্ষা দিয়ে তাকে বিচার করছ তুমি, ওর জীবনের উত্থান-পতন বা বাধাকে বিচার করছ। তুমি আসলে… মেলানির উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল এরিক। বীয়ারের ফেনার মত। দেখতে সুন্দর, কিন্তু কোন কাজে আসে না।

হেঁটে আগুনের কাছে চলে গেল এরিক, নিজের উপর রেগে গেছে। অধিকার নেই, এমন কতগুলো কথা বলেছে, অথচ এ-ধরনের অনধিকার চর্চায় অভ্যস্ত নয় ও। জিম রিওসকে চেনে না বটে, কিন্তু পশ্চিমে বসতি করতে আসা রিওসের মত মানুষদের সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানে। শূন্য থেকে শুরু করেছে এরা, যার যার অবস্থানে টিকে থেকেছে। ব্যক্তিত্ব, সামর্থ্য বা দৃঢ় মনোবল না থাকলে সম্ভব হত না; এরা প্রত্যেকেই লড়াকু, বিচক্ষণ মানুষ। অন্যরা যে সমীহ করবে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

আগুনের পাশে বসল ও। মিমি রজার্সের দেওয়া রুটি আর মাংস চিবাল নীরবে। ভুলেও আগুনের দিকে তাকাল না। আগুনের দিকে তাকায় বোকা কিংবা পুবের ভদ্রলোকেরা। আগুনের দিকে তাকানোর পরমুহূর্তে যদি অন্ধকারে তাকানোর প্রয়োজন পড়ে, ক্ষণিকের জন্য দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে মানুষ, যেটা তার মৃত্যুর কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মেলানির সঙ্গে পাথুরে চাতাল থেকে ক্যাম্পে নেমে এল বেন ডেভিস।

মেয়েটিকে দেখেই এরিক বুঝতে পারল খেপে বোম হয়ে আছে, রাগের কারণটাও জানে-ও নিজে। স্মিত হাসল ও।

দু’একটা রেডস্কিনকে পেয়েছ? তির্যক সুরে জানতে চাইল ডেভিস।

ইন্ডিয়ানদের খোঁজে যাইনি আমি।

ওদের সঙ্গে যোগ দিল সার্জেন্ট হ্যালিগান, আলো পড়ে উজ্জ্বল দেখাল তার ইতস্তত পাকা চুল। ক’জন আছে ওরা, ক্ৰেবেট? তোমার অনুমান-জানতে চাইছি।

বিশ থেকে চল্লিশজন পর্যন্ত হতে পারে। তবে কোনমতেই পঞ্চাশের বেশি হবে না।

কীভাবে হিসাব করলে? জানতে চাইল ডেভিস

অ্যাপাচিরা সবসময় ছোট ছোট দলে ঘুরে বেড়ায়। জীবন ধারণের জন্য মরুভূমির উপর নির্ভর করে ওরা। মরুভূমিতে যথেষ্ট খাবার বা পানি পাওয়া যায় না বলেই দল ছোট রাখে। দশটা ওঅর পার্টি যদি দেখো, নয়টার মধ্যে দেখবে সদস্য সংখ্যা দশ থেকে ত্রিশজন। চুরুতির দলে ষাটজনের বেশি থাকার কথা নয়, এত ইন্ডিয়ানকে পাবে সে। আমার ধারণা বড়জোর বিশ কি পঁচিশজন আছে আশপাশে।

আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে জেফ কেলার, মনোযোগ দিয়ে, শুনছে ওদের কথা। দানবের মত বিশাল লোমর্শ দেই তার, সারা মুখে ঘন দাড়ির জঙ্গল, ক্ষৌরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। হঠাৎ চ্যালেঞ্জের দৃষ্টিতে এরিকের দিকে তাকাল সে। এই ইন্ডিয়ানটার ব্যাপারে নিশ্চিত তুমি?

চিডল? ও তো পিমা

কাপের অবশিষ্ট কফি আগুনে ছুঁড়ে ফেলল কেলার, ভঙ্গিটা উস্কানিমূলক। ও তা হলে পিমা, রাগে কর্কশ শোনাল তার কণ্ঠ। কথাটা আগেও বলেছ। আমার কথাটা এবার শুনে নাওঃ আমি বলছি ও ইন্ডিয়ান, এবং সব ইন্ডিয়ানই এক, পিমা আর অ্যাপাচি হোক। ব্যাটাকে ধরে ঝুলিয়ে দেওয়া উচিত।

না, মৃদু স্বরে বলল এরিক। আমাদের মধ্যে সেরা একজন যোদ্ধা

সেটা তোমার ধারণা। আমার মতামত হচ্ছে এই ব্যাটাকে ফুটো করে লড়াই শুরু করা উচিত।

কেউ ওর দিকে একটা আঙুল তুলেছ তো, এখনও শান্ত এরিকের কণ্ঠ। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে জবাবদিহি করতে হবে তাকে।

কুৎসিত হয়ে গেছে কেলারের মুখ, ইতস্তত করছে। মুহূর্তের জন্য মনে হলো চ্যালেঞ্জটা নেবে সে। অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটার আগেই বাদ সাধল সার্জেন্ট হ্যালিগান।

যথেষ্ট হয়েছে, কেলার, তীক্ষ্ণ স্বরে বলল সে। সবাই মিলে ক্ৰেবেটকে নেতা বানিয়েছি আমরা, ওর নির্দেশ পালন করবে তুমি।

বলতে চাইছ ওর নির্দেশ না মানলে কোর্ট মার্শাল হবে আমার? যুগপৎ ঔদ্ধত্য ও তাচ্ছিল্য ঝরে পড়ল কেলারের স্বরে। বেকুব মনে করেছ আমাকে? এই ঝামেলা শেষে গল্পটা বলার জন্য খুব কম লোকই বেঁচে থাকবে। উঁহু, তোমার বা অন্য কারও সেই সুযোগ হবে না।

কথাগুলো বলে আর দাঁড়াল না সে, হনহন করে হেঁটে চলে গেল। অন্ধকারে মিশে যাওয়া পর্যন্ত তার বিশাল কাঠামোর দিকে তাকিয়ে থাকল সার্জেন্ট।

উপরে, পাথুরে চাতালের কিনারে এসে দাঁড়াল এড মিচেল। ক্রেবেট, পুবে গোলাগুলির শব্দ শুনলাম। বেশ দূরে।

পাথুরে চাতালে উঠে এল এরিক, আগুনের কাছে বিব্রতকর পরিবেশ ছেড়ে আসতে পেরে স্বস্তি বোধ করছে। মিচেলের পাশে এসে কান পাতল, কিন্তু আর কোন শব্দ শুনতে পেল না। চওড়া একটা পাথরের উপর বসে পড়ল ওরা, অপেক্ষায় থাকল-আশা করছে গুলির শব্দ শুনতে পাবে; কিন্তু অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পরও শুনতে পেল।

ত্যক্ত মনে নীচের পরিস্থিতি বিবেচনা করল এরিক। জেফ কেলার বিপজ্জনক চরিত্র, অন্যের কর্তৃত্ব মেনে নিতে অনিচ্ছুক; হুমকির সুরে সার্জেন্টের উদ্দেশে মন্তব্যটা করেছে সে। নিজেদের শত্রু নিজেরাই বনে গেছে ওরা, আশপাশে যেন ইন্ডিয়ানরা নেই।

পাসিবাহিনী তাড়া করেছে, ব্যাপারটা অস্বীকার না করেও বলা যায় এড মিচেল ভালমানুষ; খানিকটা বেপরোয়া কিম্ভ সমর্থ এবং নির্ভরযোগ্য। এ-ধরনের পরিস্থিতিতে মিচেলের মত মানুষ পাশে থাকা ভাগ্যের ব্যাপার। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এরিক জানে এড মিচেল কর্মঠ ও দক্ষ লোক, যে-কোন কাজে বা যে-কোন অস্ত্রে দক্ষ, কখনও অভিযোগ করবে না। পরিস্থিতি অনুকূল হলে সামর্থ্যের মধ্যে যে-কোন একটা কাজকে নিজের পেশা হিসাবে বেছে নেবে, বা থাকবে নিজেকে নিয়ে-টীমস্টার, কামার কিংবা ছোট র‍্যাঞ্চার বনে যাবে;

জীবনে সমৃদ্ধি অর্জন করবে না, কিন্তু খেটে যাবে সবসময়।

তুমি কীহবে? নিজেকে শুধাল এরিক। কোথায় যাবে, কী করবে?

কোন একদিন পিস্তলে ক্ষিপ্রতা কমে যাবে, কিংবা মরুভূমির কোথাও পা ভেঙে ফেলবে বা ক্যান্টিন হারিয়ে ফেলবে, পানির উৎস খুঁজে পাবে না। এমন ঘটনা বহু মানুষের ভাগ্যে ঘটেছে, ওর ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। উচ্ছল ঝর্না বা বয়স্ক ওকের ছায়াময় পরিবেশে ছোট্ট একটা বাথানের মালিক হওয়া সম্ভব হবে না, কিংবা অনেক বই পড়ার তৃষ্ণাও বোধহয় কখনও মিটবে না। ওর বাবাও পড়য়া লোক ছিল, এমনকী মৃত্যুর সময়ও বই পড়ছিল জর্ডান ক্রেবেট, বাইরে থেকে খোলা জানালা দিয়ে তাকে গুলি করে স্কট ওয়াইল্ডার নামে এক বন্দুকবাজ।

এরিকের তখন ষোলো চলছে। বয়স কম হলে কী হবে, ততদিনে পিস্তলে নিপুণ হয়ে গেছে ওর নিশানা। স্কট ওয়াইল্ডার ভেবেছিল কাজ শেষে নিরাপদে ফিরে যাবে, শিকারের তরুণ ছেলেকে আমলই দেয়নি। কিন্তু আঙিনা পেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়নি তার, এরিকের বুলেট তার কপাল ফুটো করে দেয়।

অবস্থা ভাল ঠেকছে না, মৃদু স্বরে বলল এড মিচেল। কেউ নিশ্চই বিপদে পড়েছে, নইলে এ-সময়ে গোলাগুলি হত না।

সত্যি সত্যি কেউ যদি বিপদে পড়েও থাকে, কিছুই করার নেই ওদের, তাই গাঁট হয়ে বসে থাকল; অপেক্ষায় রইল হয়তো আরও গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাবে, কিংবা কারও উপস্থিতির নমুনা টের পাবে। একটু পর চাতালে উঠে এল বেন ডেভিস, ঠিক পিছনে ড্যান কোয়ান।

মিনিট কয়েক কেটে গেল। তারপর আচমকা, ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের দূরাগত শব্দ শুনতে পেল…বেশ দূরে। সম্ভবত কোন একটা আশ্রয় খুঁজছে লোকগুলো, তুমুল গতিতে ছুটিয়েছে ঘোড়া।

হঠাৎ একটা গুলি হলো, অন্ধকারে কমলা আগুন স্পষ্ট দেখতে পেল ওরা, যতটা দূরে ভেবেছিল তারচেয়ে অনেক কাছে; পরপরই আরও কয়েকটা গুলি হলো।

তীব্র বেগে ছুটে এল ঘোড়াটা, লাফিয়ে উঠে পড়ল চাতালের উপর। ঠিক পিছনে আরেকটা ঘোড়া, তবে এটার স্যাডল খালি। আবছা অন্ধকারে ভূতুড়ে দেখাচ্ছে ঘোড়া আর সওয়ারীর গাঢ় কাঠামো। স্কিড করে পাথুরে চাতালের মাঝপথে থেমে গেল প্রথম ঘোড়া, ঝটিতি স্যাডল ছেড়ে মাটিতে পা রাখল এক মহিলা, হাতে মান্ধাতার আমলের একটা রেমিংটন পিস্তল।

বিশালদেহী মহিলা। দোহারা গড়ন। চর্বিবহুল দেহ। চওড়া মুখে মানানসই স্মিত হাসি, মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত এপাশ-ওপাশ দৃষ্টি চালাল। চাহনিতে ভয় বা স্বস্তি কোনটাই নেই, বরং পলকের চাহনিতে পরিস্থিতি বুঝে নিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল মহিলা। কণ্ঠটা কর্কশ, তীক্ষ্ণ এবং আমুদে। একেই বলে কপালের ফের! একেবারে জায়গামত পৌঁছে গেছি! অথচ দশ মিনিট আগেও ভেবেছি এইবারে আর চামড়া বাঁচাতে পারব না!

ফের চারপাশে দৃষ্টি চালাল মহিলা। বয়েজ, আমি হচ্ছি বিগ জুলিয়া। নামটা শুনেছ? ক্যান্সাস সিটি থেকে বেরিয়ে উইচিটা, অ্যাবিলিন আর এল পাসো হয়ে এখানে এসেছি। তোমাদের দেখে কী যে খুশি হয়েছি! কারও কাছে ড্রিঙ্ক আছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *