০৬. আজ মুক্তো নেই

আজ মুক্তো নেই, সাইকেল চালাতে চালাতে আনমনে বিড়বিড় করল কিশোর। তার পাশে পাশে চলেছে রবিন আর মুসা।

সকাল বেলায়ই বেরিয়ে পড়েছিল ওরা। রবিনের পরিচিত একজন জাপানী, ভদ্রলোকের বাড়ি গিয়েছিল। লাইব্রেরিতে বই নিতে আসেন তিনি প্রায়ই। তাকে দিয়ে মেসেজটা পড়িয়েছে, মর্মোদ্ধার করেছে। তিনটে শব্দ শুধু লেখা : আজ মুক্তো নেই।

ভাবনার ঝড় বইছে গোয়েন্দাপ্রধানের মাথায়। মুক্তো। কবুতর। মৃত দোয়েল। মৃত বাজ পাখি। আর রিচার্ড হ্যারিস।

স্যালভিজ ইয়ার্ডে পৌঁছে দেখা গেল, উত্তেজিত হয়ে আছেন মেরিচাচী। ভারি ভারি অনেক মালপত্র নিয়ে এসেছেন, রাশেদ চাচা। সেগুলো গোছাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে ইয়ার্ডের দুই বিশালদেহী কর্মচারী, দুই ব্যাভারিয়ান ভাই, বোরিস ও রোভার।

তিন কিশোরকে দেখে এগিয়ে এলেন মেরিচাচী। এই যে, তোরা এসেছিস। ভালই হয়েছে। তোর চাচার কাণ্ড দেখ কিশোর, কি সব নিয়ে এসেছে। বাকাচোরা এসব লোহার পাইপ দিয়ে হবেটা কি? বিক্রি হবে ওজন দরে ছাড়া? আর তাতে লাভ তো কিছু হবেই না, লোকসান যাবে প্রচুর।

ভেব না চাচী, লোকসান যাবে না, আশ্বাস দিল কিশোর। কোন একটা উপায় হয়ে যাবেই।

অফিসের বাইরে ছায়ায় বসে পাইপ টানছিলেন রাশেদ পাশা, মুখ থেকে সরিয়ে খুকখুক করে কাশলেন, মস্ত গোঁফের ডগার আলতো মোচড় দিয়ে উঠে এলেন। বোঝা তুই, কিশোর, আমি তো পারলাম না। তখন থেকে চেঁচামেচি করছে।

কি করে বিক্রি হবে শুনি? কোমরে দু-হাত রেখে দাঁড়ালেন মেরিচাচী।

হবে হবে, আবার পাইপ মুখে দিলেন রাশেদ পাশা, কিশোরের দিকে তাকালেন, ইচ্ছে, বুদ্ধিটা বাতলে দিক কিশোর।

হবে হবে তো বলছই শুধু, কি করে হবে?

এই কিশোর, বলে দে না, ভাতিজার ওপর গভীর আস্থা রাশেদ চাচার, হার স্থির বিশ্বাস আইনস্টাইন কিংবা নিউটনের চেয়ে কোন অংশে কম যায় না কিশোর, একটা উপায় বের করে ফেলবেই।

চাচী, তুমি খামোকা ভাবছ। বাজারে পাইপের যা দাম এখন, বলল কিশোর, ডবল দামে বিক্রি করতে পারব। গত বছর পাইপ ঢালাইয়ের একটা বাতিল মেশিন এনেছিল না চাচা, যেটা পড়ে আছে এখনও, সেটা মেরামত করে নেব। তারপর মুক্তোশিকার জনা দুই ঢালাই মিস্ত্রিকে ভাড়া করে নিয়ে এলেই হবে। এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়ে যাবে। মেশিনটাও বিক্রি হবে, পাইপগুলোও ডবল দর…

হো হো হো, মুখ থেকে পাইপ খসে পড়ল রাশেদ পাশার তোলার চেষ্টা করলেন না, হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠলেন বাচ্চা ছেলের মত। মেরি বেগম, এবার কি বলবে? আঞ্চলিক বাংলায় টেনে টেনে বললেন, কইছিলাম না, আমাগো কিশোর থাকতে কোন চিন্তা নাই। অই মিয়ারা, খাড়া খাড়ায়া কি দেখছো, তোলো তোলো, তুইল্লা রাখো পাইপলান। শেষ কথাগুলো দুই ব্যাভারিয়ান ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, কিন্তু কিছুই বুঝল না ওরা, হাঁ করে চেয়ে আছে রাশেদ পাশার মুখের দিকে।

হাসি ছড়িয়ে পড়েছে মেরিচাচীর সারা মুখে। কিশোর, আজ তোদের আমি ফুট কেক খাওয়াব।

কেক না চাচী, আইসক্রীম…

দুটোই বানাতে যাচ্ছি, হেলেদুলে আনন্দে প্রায় নাচতে নাচতে বাড়ির দিকে রওনা হলেন মেরিচাচী।

পুরো দুই ঘণ্টা লাগল পাইপগুলো গোছগাছ করতে। কাজ শেষ করে হাতমুখ ধুয়ে, খৈয়ের, ওয়ার্কশপে চলে এল তিন গোয়েন্দা।

দুই সুড়ঙ্গের মুখের ধাতব পাত সরিয়ে প্রথমে ঢুকল কিশোর, তার পেছনে রবিন, সব শেষে মুসা।

পাইপের অন্য মুখের ঢাকনা সরিয়ে ট্রেলারের ভেতরে উঁকি দিল কিশোর। প্রথমেই তাকাল জবাব-দেওয়া মেশিনটার দিকে। আলো জ্বলছে না, তানে কোন ফোন আসেনি। হতাশ হলো। উঠে এসে বসল নিজের চেয়ারে।

পুরানো একটা রকিং চেয়ারে বসে ফাইলিং কেবিনেটের ড্রয়ারে পা তুলে দিল মুসা। রবিন কাল একটা টুলে, দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে।

চিরাচরিত নিয়মে আলোচনার সূত্রপাত করল কিশোর। মুক্তা। এই কেসের প্রধান রহস্য।

কবুতরও, খাঁচার ভেতরে বসা পায়রাটাকে দেখিয়ে বলল মুসা। দু-আঙুলে কবুতর, তিন আঙুলে কবুতর, জ্যান্ত কবুতর, মরা কবুতর।

মুক্তো, আবার বলল কিশোর। মেসেজ লেখা : আজ মুক্তো নেই। মিসকোরিন কারমাইকেলের মুক্তোপ্রীতি। তার একটা দোয়েল ছিল, যেটা মুক্তো এনে দিত।

হীরা, মাথা ঝোঁকাল রবিন, নোট বই বের করছে পকেট থেকে। ঠোঁটে করে মুক্তো নিয়ে এল। মিস কারমাইকেল বললেন? এই নিয়ে তিনটে হলো।

তারপর কেউ খুন করল হীরাকে, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে চলল কিশোর। হতে পারে রিচার্ড হ্যারিস। তার গহনার দোকান আছে, মুক্তো বিক্রি করে। এই রহস্যের প্রধান বিষয়ব যদি মুক্তো হয় মাঝে মাঝে দুর্বোধ করে কথা বলা তার স্বভাব, আসলে মনে মনে না ভেবে জোরে জোরে ভাবে সে তখন, তাই এমন মনে হয় কথাগুলো, মুক্তোই যদি আসল কথা হয়, তাহলে এর মাঝে কবুতর আসছে কি, করে? কবুতর ডিম পাড়ে, মতো পাড়ে না। যোগাযোগটা কোথায়?

হয়তো পাড়ে। সোনার ডিম-পাড়া রাজহাঁসের কিচ্ছা পড়নি… বাধা পেয়ে থেমে গেল মুসা।

ফোন বেজে উঠেছে।

লাইনের সঙ্গে যুক্ত স্পীকারের সুইচ অন করে দিয়ে রিসিভার তুলে নিল কিশোর। হ্যালো তিন গোৱেন্দা।

হ্যালো, কিশোর পাশা? পরিচিত কণ্ঠ, উদ্বিগ্ন। কিশোরকে চাই।

বলছি।

কিশোর, এক মুহূর্ত নীরবতা, থমকে গেছে বোধহয় লোকটা, কিংবা দ্বিধা করছে, আমাকে চিনতে পারছ? আমি, আমি, ওই যে দুই দিন আগে রেস্টুরেন্টে দেখা হয়েছিল। ভূলে বাক্সটা ফেলে গেছিলাম। পরে ফিরে গিয়ে ওয়েইট্রেসকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, তোমরা নিয়ে গেছ। নানা ঝামেলায় আর খোঁজ নিতে পারিনি।

মাউথ পীসে হাত চাপা দিল কিশোর, ফিসফিস করে উত্তেজিত গলায় বলল, ক্লিকি।

হ্যালো? নার্ভাস মনে হচ্ছে ওপাশের লোকটাকে। হ্যালো। শুনছ?

শুনছি, বলুন, জবাব দিল কিশোর। বাক্সটা নিয়ে এসেছি আমরা, ঠিকই বলেছে ওয়েইট্রেস।

দীর্ঘ আরেক মুহূর্ত নীরবতা। হ্যালো, আছে তো এখন তোমাদের কাছে? আমার বাক্সটা?

আছে। চারকোণা বাক্স, চীজথে মোড়া, সেভাবেই আছে। আপনি ফেলে গেছেন দেখে নিয়ে এসেছিলাম, জানি ফোন করবেনই।

খুব ভাল করেছ, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল স্লেটার। তোমাদের একটা পুরস্কার পাওনা হয়েছে। বাক্সটা যদি নিয়ে আসো, পঞ্চাশ ডলার পাবে।

থ্যাংক ইউ। কোথায় আনব?

আমি জানি তুমি কোথায় থাকো.মানে অনুমান করেছি আরকি। রকি বীচ, না? তাহলে ট্রাসটি ব্যাঙ্কের পারকিং লটে সুবিধে বেশি।

ঠিক আছে। কখন আসব?

আজ রাত নটার দিকে? ঠিক আছে।

তাহলে রাত নটায় দেখা হচ্ছে, আবার নার্ভাস হয়ে পড়েছে লোকটা, কণ্ঠস্বরে সেটা স্পষ্ট।

লাইন কেটে গেল।

রিসিভার নামিয়ে রাখল কিশোর।

খাইছে বলে উঠল মুসা, একটা কবুতরের জন্যে পঞ্চাশ ডলার!

জবাব দিল না কিশোর। জোরে জোরে চিমটি কাটছে নিচের ঠোঁটে, গভীর ভাবনায় মগ্ন।

চীজক্লথটা রেখে দিয়েছি, বলতে বলতে ফাইলিং কেবিনেট খুলল রবিন। টমকে ছোট খাঁচায় ভরে আবার মোড়াবে?

পুরো এক মিনিট কোন কথা বলল না কিশোর, তারপর মাথা নাড়ল।

ব্লিংকির করাগুলো পর্যালোচনা করে দেখি আগে, জোরে জোরে ভাবতে শুরু করল সে, বলল, আমি জানি তুমি কোথায় থাকো…তারপর শুধরে নিয়ে বলল, মানে অনুমান করেছি আরকি। রকি বীচ, না? এটা জানা আর অনুমানের মধ্যে তফাতটা কোথায়? আমাদের কার্ডে তো রয়েছে কোন নম্বর, ঠিকানা জেনে নেয়াটা কোন ব্যাপারই না। দ্বিধা করেছে, তারমানে মিথ্যে কথা বলেছে, খুব ভালমতই জান, আমরা কোথায় থাকি, অনুমান-টমান কিছু না!

তাহলে সেই কবুতর বদল করেছে, বলল রবিন।

তাই তো মনে হয়। আমি মিছে কথা বলেছি, জানে সে। কিন্তু চেপে গেছে। আবার চীজথে মুড়ে যদি খাঁচাটা নিয়ে যাই, হাতে নিয়ে বলবে, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ…

এবং পঞ্চাশ ডলার দেবে মনে করিয়ে দিল মুসা।

এবং ভাব দেখাবে, খাঁচার ভেতরে আগের কবুতরটাই আছে, সেভাবেই নিয়ে চলে যাবে। তারপর আর কোন দিন তার দেখা পাব না আমরা। এই কেসের মহামূল্যবান একটি মাত্র সূত্রও হাতছাড়া হয়ে যাবে।

কি করতে বলে তাহলে? জিজ্ঞেস করল রবিন।

চূড়ান্ত কিছু একটা করতে হবে। না মুড়েই খাঁচা নিয়ে তার সামনে হাজির হব, তাকে আমাদের কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য করব। তোমার কি মনে হয় মুসা?

মাথা চুলকাল সহকারী-গোয়েন্দা। ঠিক আছে, যা ভাল বোঝে। পঞ্চাশ ডলার, হারাতে রাজি নই আমি। মেলা টাকা। তবে একটা কথা ঠিকই বলেই, এই রহস্যের সমাধান করতে চাইলে রিংকির মুখ খুলতে হবে আমাদের।

আরও কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনার পর বাড়ি রওনা হলো মুসা আর রবিন। সেই সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, মা-বাবা নিশ্চয় দুশ্চিন্তা করছেন, রাতে আবার বেরোনোর আগে তাদের সঙ্গে অন্তত একবার দেখা করে আসা দরকার। ইয়ার্ডে আর ফিরবে না। ট্রাসটি ব্যাংকে পারকিংলটে চলে যাবে যার যার মত, নটার মিনিট দশেক আগে মিলিত হবে ওখানে।

সাড়ে আটটায় টমকে ছোট খাঁচায় ভরে সাইকেলের ক্যারিয়ারে খাঁচাটা বেঁধে নিল কিশোর। শহরের দিকে রওনা হলো।

ব্যাংকটা মেইন স্ট্রীটে, হ্যারিসের দোকান থেকে দূরে নয়। বিশাল সাদা বাড়িটার পেছনে পার্কিংলটে সাইকেল নিয়ে ঢুকে পড়ল কিশোর। ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেছে, অল্প কয়েকটা গাড়ি আছে এখন টে। পারকিঙের জায়গাটাকে তিন দিক থেকে ঘিরে রেখেছে বিল্ডিং। আধো অন্ধকার সেখানে।

দেয়াল ঘেঁষে সাইকেলটা রেখে আলো নিভিয়ে দিল কিশোর, ক্যারিয়ার থেকে খুলে নিল খাঁচা।

চারপাশে তাকাল। অন্ধকারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ছয়-সাতটা গাড়ি। কোনটাতেই প্রাণের সাড়া নেই।

ঘড়ি দেখল কিশোর। পৌনে নটা। আর পনেরো মিনিট পরে প্রংকির আসার কথা। মুসা আর রবিন আসতে আর পাঁচ মিনিট। পার্কিংলটের প্রবেশ মুখে ওদের অপেক্ষায় থাকার সিদ্ধান্ত নিল সে। ওখানে আলো আছে যথেষ্ট, রর লাইটের আলো। পা বাড়াল।

এই ছেলে, থামো, পেছনের অন্ধকার ছায়া থেকে বলে উঠকেউ।

যা বলা হলো করল কিশোর। যেখানে ছিল সেখানেই অনড় হয়ে গেল, খাচটা দুহাতে পেটের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরেছে।

আস্তে করে ঘোরো, আবার আদেশ হলো।

যতখানি আস্তে পারল ঘুরল কিশোর।

বিষণ্ণ ছায়া থেকে বেরিয়ে এল লোকটা। সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে ডাক হাত। কিছু একটা ধরে রেখেছে। আধো অন্ধকারেও চমকাচ্ছে জিনিসটা।

আগ্নেয়াস্ত্রের ধাতব নল, চিনতে কোন অসুবিধে হলো না কিশোরের। চেঞ্জ সরাতে পারল না ওটার ওপর থেকে।

খাঁচাটা রাখো তোমার সামনে, মাটিতে, আদেশ দিল লেকট। ঝুঁকে রাখল কিশোর।

আরেকটু কাছে এল লোকটা। কিশোরের দিক থেকে নল না সরিয়েই উবু হলো, পরীক্ষা করে নিশ্চিত হলো কবুতরটা রয়েছে খাঁচার ভেতরে।

গুড।

সোজা হলো লোকটা। চকিতের জন্যে তার চেহাব স্পষ্ট দেখতে পেল কিশোর। উজ্জল কালো অয়েলস্কিন পরনে, চোখে কালো চশম, মুখ ঢেকে আছে দাড়িগোফ। রিচার্ড হ্যারিস।

ঘোরে, বলল লোকটা। উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ো মাটিতে।

লোকটার কণ্ঠস্বর অবাক করল কিশোরকে। নিচু পর্দ, কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে, যেন জোর করে বলছে। আমার চেয়ে কম ভয় পাচ্ছে না ব্যাটা-ভাবল কিশোর, এবং সেটা লুকাতে চাইছে।

শাসানোর ভঙ্গিতে নল নড়ল লোকটা।

আর দ্বিধা করল না কিশোর, যা বলা হলো, করল। শুয়ে পড়ল।

দুই হাত পেছনে, পিঠের ওপর তুলে আনো।

তুলল কিশোর। কানে এল হেঁড়ার শব্দ, টেনে কাপড় ঘেঁড় হচ্ছে নাকি, রোল থেকে অ্যাঢেসিভ টেপ হ্যাঁচকা টান দিয়ে ছাড়াচ্ছে? মুহূর্ত পরেই বুঝল, কি জিনিস। টেপ দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধা হলো তার হাত, দড়ি কিংবা কাপড়ের ফালির চেয়ে অনেক শক্ত বাঁধন।

নড়ল না কিশোর। চমকে নলের চেহারাটা মনের পর্দায় উজ্জ্বল। চুপচাপ শুয়ে অনুভব করল, পা-ও বাধা হচ্ছে।

শুনল, চলে যাচ্ছে লোকটার পদশব্দ। পেছনে কোথাও গুঞ্জন তুলল গাড়ির এঞ্জিন, হেড লাইট জ্বলল। হাত-পা এমনভাবে বাঁধা, মাথা তুলতেও অসুবিধে হচ্ছে। তবু যতখানি পারল তুলল, সাবধানে, ঘুরে তাকাল।

চলতে শুরু করেছে গাড়ি। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না গাড়ির বডি, চেনা না অচেনা বোঝা যাচ্ছে না। বিশগজ দূর দিয়ে চলে গেল গাড়ি, টায়ারের কর্কশ শব্দ তুলে মোড় নিয়ে নামল রাস্তায়, অদৃশ্য হয়ে গেল।

শুয়ে শুয়ে নিজেকে দোষারোপ করছে কিশোর। পারকিংলটে ঢোকার আগে মুসা আর রবিনের জন্যে অপেক্ষা করা উচিত ছিল। অন্ধকারে বোকর মত ঢুকে পড়েছে একা একা, লোকটাকে সুযোগ দিয়েছে।

গেটের দিক থেকে পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে। সাইকেলের লাইট দেখা গেল।

মুসা, ডাকল কিশোর। রবিন।

দুপাশ থেকে কিশোরের ওপর ঝুঁকে বসল দুই সহকারী গোয়েন্দা। কজি আর গোড়ালি থেকে টেপ তুলতে শুরু করল। চড়চড় করে রোম ছিড়ে নিয়ে উঠে আসছে টেপ, জ্বালা করছে, চামড়ায়।

আহত জায়গা ডলতে ডলতে জানাল কিশোর কি ঘটেছে।

নরম শিস দিয়ে উঠল মুসা, পিস্তল

তাই তো মনে হলো, উঠে দাঁড়াল কিশোর। গুলি ভরা ছিল কিনা জিজ্ঞেস করিনি, যদি আমার ওপরই প্রমাণ করে দেখাতে চায়। প্যান্টের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে ঝলল, তোমরা কিছু দেখেছ?।

মাথা ঝেকাল রবিন। গাড়ি দেখলাম একটা, কালো। ক্লিংকিরটার মতই মনে হলো। লাইসেন্স প্লেটে দেখলাম এম ওকে লেখা। ঠিক

রিংকির গাড়ির প্লেটে যে রকম লেখা ছিল বলল কিশোর। যেটাতে করে স্ন্যাকস রেস্টুরেন্টে গিয়েছিল। যেটা… নিশ্চিত নয়, তাই বাক্যটা শেষ করল না সে। রিচার্ড হ্যারিসের অলঙ্কারের দোকান থেকে বেরিয়ে সেদিন যে গাড়িটা দেখেছে, সেটার কথাই বলতে যাচ্ছিল। লাইসেন্স প্লেটের নাম্বার পুরোটা পড়তে পারেনি, তবে শুরুতে এম লেখাটা দেখেছে বলে মনে পড়ছে।

তো, এখন কি করা? মুসা বলল। টমকে নিয়ে গেছে হ্যারিস, রিংকি…

হ্যাঁ, মুসার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল রবিন, রিংকি এলে তাকে কি জবাব দেব?

ঘড়ি দেখল কিশোর। নটা বাজতে দুই মিনিট বাকি। কিছুই না, কারণ তার জন্যে.আর অপেক্ষাই করছি না আমরা। চলো কেটে পড়ি। যার যার বাড়ি চলে যাব। সকালে হেডকোয়ার্টারে আলোচনা হবে।

সাইকেল নিয়ে তাড়াতাড়ি পারকিংলট থেকে বেরিয়ে এল তিন গোয়েন্দা। সে রাতে ভাল ঘুম হলো না কিশোরের। মনে ভাবনার বোঝা। টমকে হারিয়েছে ওরা, চূড়ান্ত কিছু একটা করা সম্ভব হয়নি রংকির সঙ্গে, তাকে প্রশ্ন করা যায়নি। মিস, কারমাইকেলকে বলার কিছু নেই। তাঁকে গিয়ে বলা যাবে না; তাঁর বন্ধু রিচার্ড হ্যারিস পাখিগুলোকে খুন করেছে। প্রমাণ করতে পারবে না সেটা। যদি মিস কারমাইকেল জিজ্ঞেস করেন, সাধারণ দুটো পাখিকে খুন করে রিচার্ডের কি লাভ, জবাব দিতে পারবে না কিশোর। জবাব তার নিজেরই জানা নেই। আর সত্যি কি রিচার্ডই খুন করেছে পাখিগুলোকে?

এবারের কেসটায় বিশেষ সুবিধে করতে পারছে না তিন গোয়েন্দা। সূত্র একটা যা-ও ছিল হাতে, তা-ও খুইয়ে এসেছে। এখন একমাত্র ভরসা রিংকি, যদি সকালে ফোন করে কৈফিয়ত চায়। অর্থাৎ যদি সে যোগাযোগ করে। তাহলে তাকে কয়েকটা প্রশ্ন করা যেতে পারে, যদিও ফোন করার সুবনাটা খুবই ক্ষীণ।

পারকিংলটে অপেক্ষা করাই বোধহয় উচিত ছিল, চলে এসে ভুল করলাম না তো? মনে একগাদা প্রশ্ন নিয়ে ঘুম ভাঙল কিশোরের। যতগুলো প্রশ্ন মনে নিয়ে ঘুমিয়েছিল, একটারও জবাব মেলেনি।

ইদানীং তার হয়েছে আরেক বিপদ, মেরিচাচীর হঠাৎ করেই খেয়াল হয়েছে, আজকাল খাওয়ার প্রতি কিশোরের বিশেষ আগ্রহ নেই। ফলে সকালে উঠেই গাদা গাদা গিলতে হয়। মেরিচাচী সামনে বসে থাকেন, ফাঁকি দেয়ার উপায় মেই। কিশোরের ধারণা, এতে তার চিন্তাশক্তি ব্যাহত হচ্ছে।

ঘুম থেকে উঠেই দেখল কিশোর, নাস্তা রেডি। টেবিলে বসে কাগজ পড়ছেন চাচী, কিশোরকে দেখেই কাগজটা সরিয়ে রেখে প্লেট.চামচ টানাটানি শুরু করলেন।

ডিম, মাংস, মাখন, পনির, রুটি, আপেল আর দুই গ্লাস দুধ খাঙ্খার পর মনে। হলো কিশোরের, আগামী এক বছর আর কিছু খাওয়ার দরকার হবে না। এরপরও যখন কয়েকটা আঙুল মুখে দেয়ার জন্যে চাপাচাপি শুরু করলেন চাচী, রেগে গেল কিশোর। মুখের ওপর বলে দিল, যদি এরকম করে, হলে সোজা গিয়ে শুয়ে পড়বে বিছানায়, বাকাচোরা পাইপের ব্যাপারে কোন সহযোগিতা করবে না। এত ভারি পেট নিয়ে না নড়তে পারে মানুষ, না কাজ করতে পারে?

ঠিক আছে ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি হাত তুলে বললেন চাচী, এখন থাক। ঘণ্টাখানেক পরেই খাস।

গটমট করে বাইরে বেরিয়ে এল কিশোর। সোজা রওনা হলো ওয়ার্কশপে। ঢুকেই থমকে গেল। একটা বাক্সের ওপর বেশ আরাম করে বসে আছে পাখিটা। তাকে দেখেই চোখ ফিরিয়ে তাকাল।

কাছে গিয়ে পাখিটাকে তুলে নিল কিশোর। ডানা আর লেজের চকচকে পালকগুলো দেখল। না, কোন ভুল নেই। সাদা ফুটকিগুলো অবিকল এক। তাছাড়া পাখিটাও চিনতে পেরেছে তাকে, নইলে ধরা দিত না।

টম। ফিরে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *