০৫. সামুদ্রিক তাজা হাওয়া

দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে আসা সামুদ্রিক তাজা হাওয়ায় সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে গেল আমাদের। বাঁচার আনন্দের মোহময় ভাবটা কেটে যেতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমরা পাচজন বেঁচে থেকেই বা কি লাভ? পরিচিত পৃথিবীর আর সবাই তো মরে গেছে।

নিষ্ঠুর নির্মম সত্যটা স্পষ্ট, নিখুঁতভাবে ফুটে উঠল মনের পর্দায়। নীরব আতঙ্কে পাশের বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সবার চোখেই অসহায়তা, দ্বিধা, ভয়। বিশ্বের জীবিত প্রাণী কেবল আমরা কয়জন। আনন্দ-উল্লাস করতে পারছি।, বরং ভেসে গেলাম বিমর্ষতার বন্যায়। মুষড়ে পড়েছি নিবিড় নৈরাশ্যে। পৃথিবীতে যা কিছু ছিল, যা কিছু ভালবেসেছিলাম, তার বেশির ভাগই নেই, ভেসে গেছে ইথারের বিষ বলয়ের ধ্বংসাত্মক মহাসমুদ্রে। আমরা কয়জন রয়ে গেছি এক বিশ্ব-মরুদ্বীপে, যেখানে আশা নেই, ভরসা নেই, নেই খেয়ে-পরে বাঁচার কোন প্রত্যাশা। মানুষের লাশের বিশ্ব-শুশানে ক্ষুধার্ত শেয়ালের মত হন্যে হয়ে ঘোরার পর আমাদের ভাগ্যে জুটবে বিলম্বিত, নিষ্ঠুর, ভয়াবহ মৃত্যু। আপাতত বেঁচে থাকাটা হবে আরেক মানসিক যন্ত্রণা।

ককিয়ে উঠলেন মিসেস চ্যালেঞ্জার, জর্জ, কেন বাঁচালে এ ভাবে? সবার সঙ্গে মরে যাওয়াটাই ছিল অনেক ভাল! এখন যে তিলে তিলে ধুকে মরব!

গভীর চিন্তায় মগ্ন চ্যালেঞ্জার। বিশাল দুই ভুরু কুঁচকে উঠেছে। প্রকাণ্ড রোমশ থাবায় খ্রীর হাত চেপে ধরলেন। নীরবে সান্তনা দিচ্ছেন তাকে। ভারি গলায় বললেন, বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারলে মনের যন্ত্রণা অনেকখানি কমে।

কিন্তু আমি মানতে পারছি না, সামারলি প্রতিবাদ করলেন।

না মেনে কি করবেন? বললেন লর্ড জন। বেঁচে গেছি আমরা, এটাই এখন বাস্তবতা।

কিন্তু বেঁচে থেকে আর কি লাভ? ভোতা স্বরে বললাম। খবরের কাগজ যেখানে নেই, সেখানে বাঁচব কি নিয়ে?

একটা শিকারও নেই আর এত্তবড় দুনিয়াটায়, ঘাড় গুঁজে বললেন লর্ড জন। তারমানে আমার অস্তিত্বও বৃথা।

ছাত্র নেই, বায়োলজি নেই, আমারও কোন প্রয়োজন নেই আর, বললেন সামারলি।

তবে আমার কিছুই হারায়নি, অনেকখানি সামলে নিয়েছেন মিসেস চ্যালেঞ্জার। স্বামী আছে, ঘর আছে, সংসার আছে। বাঁচতে আমার অসুবিধে হবে না।

আমারও না, বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন চ্যালেঞ্জার। বিজ্ঞান তো মরেনি। আমার বেঁচে থাকার জন্যে বিজ্ঞানই যথেষ্ট। বিপর্যয়ের পর দুরূহ সমস্যা তৈরি করে ব্রেনকে বাঁচিয়ে রাখার খোরাক আরও বেশি করে জুগিয়ে যাবে এই মরা পৃথিবী। আমার জন্যে বরং ভালই হলো।

জানালা খুলে দিলেন তিনি।

নিস্পন্দ, নীরব, নিথর পৃথিবীর দিকে নিস্পলকে তাকিয়ে রইলাম আমরা।

গতকাল বিকেল ঠিক তিনটের পর বিশ্ববলয়ে ঢুকেছিল পৃথিবী, চ্যালেঞ্জার বললেন। এখন বাজে নয়টা। ঠিক কখন বেরিয়েছি বিষের ভেতর থেকে, সেটাই প্রশ্ন!

ভোরের দিকেও বাতাস ভীষণ ভারি লাগছিল, বললাম।

সকাল আটটায় শ্বাস নিতে খারাপ লেগেছে আমার, বললেন মিসেস।

তারমানে, ধরা যেতে পারে আটটার পরে বিষবলয় থেকে বেরিয়েছে পৃথিবী, বললেন চ্যালেঞ্জার। ঝাড়া সতেরো ঘণ্টা বিষাক্ত ইথারে ডুবে ছিল। ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা মানুষকে সতেরো ঘণ্টা ধরে মেরে শেষ করেছেন বিশ্বকর্তা। প্রাণশূন্য করেছেন পৃথিবীটাকে। কিন্তু সত্যি কি সব মারতে পেরেছেন?

আমাদের মত হতভাগা কি আর নেই পৃথিবীর কোথাও?

আমিও তাই ভাবছি, বললেন লর্ড জন। আর কেউ কি নেই?

না, নেই, জোর দিয়ে বললেন সামারলি। থাকা সম্ভব নয়। আমাদের মত অক্সিজেন নিয়ে ঘরে আবদ্ধ থাকার চিন্তাটা নিশ্চয় আর কারও মাথায় আসেনি।

কি করে শিওর হছেন?

কারণ অন্য কেউ আগে থেকেই আবিষ্কার করতে পারেনি পৃথিবীর বিষবলয়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে পৃথিবী।

মুচকি হাসলেন চ্যালেঞ্জার, তাহলে স্বীকার করছেন, পৃথিবীর সেরা বেন একমাত্র আমারই আছে?

চুপ করে ভাবলেন সামারলি। দ্বিধা করলেন। মাথা নাড়লেন। না, করছি না। যতক্ষণ নিশ্চিতভাবে প্রমাণ না পাব যে এই পদ্ধতিতে আর কেউ বেঁচে নেই, ততক্ষণ করব না।

ইথারের বিষও আপনার মাথাটাকে ধোলাই করতে পারেনি। অযথা তর্ক করার ভূতটা দূর আর হবে না কোনদিন।

মাথায় আমার কোনকালেই ভূত ছিল না। যেটা সত্যি, প্রমাণ পাব, সেটা মানতে আমার আপত্তি নেই।

তর্ক থাক, বিরক্ত হয়ে হাত নাড়লেন লর্ড জন। এ সব আলোচনা ভাল্লাগছে। এখন। বরং জবাব দিন, আমাদের ভোগান্তির কি শেষ হলো? নাকি আবার আঘাত হানবে ইথারের বিষ।

সারসের মত গলা বাড়িয়ে আকাশ আর দিগন্ত দেখলেন সামারলি। অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বললেন, আকাশের রঙ গতকালও ঠিক এমনই ছিল। ভোগান্তির শেষ কিনা, বলা যায় না এখনও। দেখা গেছে ভূমিকম্পের একটা ধাক্কা শেষ হতে না হতেই আরেক ধাক্কা এসে হাজির। প্রথমটার চেয়ে আরও ভয়াবহ। আবার যে গিয়ে আরও দীর্ঘ আরেকটা বিষাক্ত বলয়ে ঢুকবে না পৃথিবী, তা কে বলতে পারে!

যা হয় হবে, চ্যালেঞ্জার বললেন। আপাতত বেঁচে আছি, এটাই যথেষ্ট। অহেতুক তর্কাতর্কি না করে বরং নিচে গিয়ে অস্টিনের লাশের একটা ব্যবস্থা করা যাক।

বেরোলাম সবাই বদ্ধ ঘর থেকে। কাটিয়েছি চব্বিশ ঘণ্টারও কম সময়। অথচ মনে হলো কত যুগ পর ঘর থেকে বেরোলাম।

অস্টিনকে ধরাধরি করে নিয়ে এলাম। কপালে কাটা একটা দাগ। রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে। শক্ত হয়ে গেছে শরীর। বয়ে আনতে বেশ কষ্ট হলে। মাটিতে রাখতে মন চাইল না। শুইয়ে দিলাম তার বিছানায়।

গত একটা দিন ভয়াবহ মানসিক উত্তেজনা গেছে। ক্লান্তিতে ভেঙে, আসছে শরীর। খিদেও পেয়েছে খুব। খাবার ঘরে ঢুকলাম। টেবিলে প্রচুর খাবার সাজানো। খেতে বসে গেলাম।

লর্ড জন বসলেন না। অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগলেন। আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।

কেন? জানতে চাইলেন চ্যালেঞ্জার।

চারদিকে এত লাশের ছড়াছড়ি। গলা দিয়ে খাবার নামে নাকি এ অবস্থায়? তাহলে কি করতে চান?

চলুন, বরং বেরিয়ে পড়ি। দেখা যাক আর কেউ বেঁচে আছে কিনা।

ভাল প্রস্তাব। কিন্তু ঘুরতে হলে গায়ে শক্তি দরকার। খাবার ছাড়া শক্তি পাবেন না।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও খাবার টেবিলে বসলেন লর্ড। রুটি চিবাতে চিবাতে বললেন, লন্ডনে গেলে কেমন হয়?

ভালই হয়, সামারলি বললেন, কিন্তু চল্লিশ মাইল হাঁটবেন কিভাবে?

হাঁটব কেন? প্রফেসরের গাড়ি আছে না।

কে চালাবে সেটা, শুনি? অস্টিন তো লাশ।

চ্যালেঞ্জার বললেন, পৃথিবীতে আর উে যদি বেঁচে না থাকে এখন আমাদের পাচজনকেই বেঁচে থাকার জন্যে অনেক রকম কাজ করতে হবে। গাড়িটা নাহয় আমিই চালানোর চেষ্টা করব।

আঁতকে উঠলেন তার মিসেস, ওকাজও করতে যেয়ো না! আমি তোমাকে কিছুতেই গাড়ি চালাতে দেব না। সেবারের কথা মনে নেই, শিখতে গিয়ে যে পয়লা চোটেই গেটটা উড়িয়ে দিয়েছিলে?

একবার উড়িয়েছি বলে যে বার বার ওড়াব, এমন কোন কথা নেই। ছড়াটা মনে নেই: ঘোড়ায় চড়িল, আছাড় খাইল, আবার চড়িল…

ছড়া বাদ দিন, হাত নেড়ে বললেন সামারলি, আপনি ড্রাইভার হলে আমি গাড়িতে বসছি না। ইথারের বিষ থেকে বেঁচে গিয়ে এখন শরীরটাকে ভর্তা করে মরতে চাই না।

তাহলে বসে থাকুন এখানেই। মৃত লন্ডন আর দেখা হবে না।

চ্যালেঞ্জারের দিকে তাকিয়ে বললেন লর্ড জন, ড্রাইভার একজন দিতে পারি আমি।

চমকে উঠলাম। দিতে পারেন মানে? আরও কেউ বেঁচে আছে নাকি, যে গাড়ি চালাতে পারে।

আছে। আমি। ড্রাইভিং যেদিন শিখেছিলাম, সেদিন কি ভাবতে পেরেছিলাম গোটা মানুষ জাতটার ড্রাইভার হতে হবে আমাকে!

ঠিক দশটায় রওনা হলাম আমরা। ড্রাইভিং সীটে লর্ড জন। পাশে আমি। পেছনের সীটের মাঝখানে মিসেস চ্যালেঞ্জার, দুপাশে দুই প্রফেসর। বসার এই ব্যবস্থাটা মিসেসই করেছেন। আশঙ্কা, দুই প্রফেসর পাশাপাশি বসলে তর্কাতর্কি করে শেষে হাতাহাতি না বাধিয়ে দেন। কোন বিশ্বাস নেই ওঁদের।

শুরু হলো এক আজব মোটর চালনা! সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহ পৃথিবীতে মানুষ নামক জীবটির আবির্ভাবের পর এমন বিচিত্র পরিস্থিতিতে আর কেউ

কোনদিন মোটর-অভিযানে বেরোয়নি।

দিনটা সুন্দর। আগস্টের সোনাঝরা সকাল। সাগরের ফুরফুরে হাওয়া গায়ে লাগছে। ঝকঝকে নীল পরিষ্কার আকাশ। সবুজে ছাওয়া সাসেক্সের বনানী। প্রকৃতির এ রূপ দেখলে বিশ্বাস হতে চায় না গোটা পৃথিবী জুড়ে এমন একটা বিপর্যয় ঘটে গেছে। বোঝা যায় না, এই পৃথিবী আমাদের চির পরিচিত সেই আগের পৃথিবী নয়। অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ চারদিক। শব্দ বলতে গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ। বিকট হয়ে কানে বাজছে।

খুব খারাপ লাগছে আমার। গ্রামাঞ্চলের চির পরিচিত সেই পরিবেশ আর নেই। পাখি ডাকছে না। পোকামাকড়ের গুঞ্জন, মানুষের কথা, গরু-ভেড়ার ডাক, কুকুরের ঘেউ ঘেউ, কিছু নেই। এ যেন মৃত্যুপুরীর ভয়াবহ নিঃশব্দতা।

হেলেদুলে আকাশে উঠে যাচ্ছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। এখনও পুড়ছে বাড়িঘর। মনটা যে কেমন করছে এ সব দেখে, ভাষায় বোঝনোর ক্ষমতা নেই।

ছড়িয়ে ছিটিয়ে এদিক ওদিক পড়ে আছে জন্তু-জানোয়ার মানুষের অগুনতি লাশ। দাঁত খিচিয়ে, বীভৎস নীল মুখে বিদ্রুপের হাসি নিয়ে সবাই যেন আমাদের দেখছে। গায়ের রক্ত হিম-করা সে-দৃশ্য।

মাঠের ধারে পাশাপাশি পড়ে আছে ছয়জন চাষী। নিপ্রাণ দৃষ্টি আকাশের দিকে।

একটা স্কুলের পাশ দিয়ে যাবার সময় ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন মিসেস চ্যালেঞ্জার। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের এত লাশ দেখে আমারই চোখে পানি এসে গেল, আর মিসেস তো মেয়েমানুষ। বাস্তবিক, ঈশ্বর বড় নিষ্ঠুর!

পাকা হাতে গাড়ি চালাচ্ছেন লর্ড জন। তবে গতি মন্থর। ইচ্ছে করেই আস্তে চালাচ্ছেন। দেখতে দেখতে চলেছেন। যেদিকে তাকানো যায় শুধু লাশ আর লাশ। বাড়িঘরের সামনে লাশ, রাস্তায় লাশ। একজায়গায় তো এত বেশি লাশ পড়ে আছে, রাস্তাই বন্ধ করে দিয়েছে। তোক মৃত, ওদের মাড়িয়ে তো আর যাওয়া যায় না। নেমে গিয়ে ধরাধরি করে লাশ সরিয়ে রাস্তা সাফ করলাম। আবার এগোল গাড়ি।

সাসেক্স আর কেন্টের হাইওয়ে ধরে চলার সময় পথের ওপর আর দুপাশে অনেক মর্মান্তিক দৃশ্য চোখে পড়ল। কয়েকটা বিশেষ চিত্র মনে গেঁথে গেন্স। সাউথ বোরো গ্রামে সরাইখানার সামনে একটা ঝকঝকে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। দামী, বিশাল গাড়ি। ব্রাইটন কিংবা ইস্টবোনের দিক থেকে এসেছে। সামনের সীটে তিনজন যুবক। পেছনের সীটে তিনজন রূপসী তরুণী। একজনের পাশে কালো একটা পিকিং স্প্যানিয়েল। সব মরা। ধনী-নির্ধন, মানুষ-জন্তু একাকার হয়ে গেছে মৃত্যুর মহিমায়।

আরেকটা মর্মান্তিক দৃশ্য দেখলাম সেতেনোক্সে। রাস্তার বাঁ দিকে এক বিরাট কনভেন্ট। সামনের আঙিনা সবুজ ঘাসে ছাওয়া। ঘাসের ওপর পড়ে আছে সারি সারি বাচ্চা ছেলেমেয়ে, স্কুলের ছাত্র ছিল ওরা। সামনের কাতারে পড়ে আছে সাদা পোশাক পরা দশ-বারোজন মহিলা। নান। সবার সামনে একজন বয়স্কা মহিলা। বেশভূষা আর চেহারায় বোঝা যায় ইনি ছিলেন মাদার সুপিরিয়র। মৃত্যু আসছে বুঝতে পেরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল সবাই ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার জন্যে।

এমনি সব রোমহর্ষক, মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম। চ্যালেঞ্জার আর সামারলিও তর্ক ভুলে গেছেন। মিসেস চ্যালেঞ্জার নীরবে কাঁদছেন। গাড়ি চালানোয় মগ্ন লর্ড জন। চেহারা দেখে তার মনের অবস্থা ঠাহর করতে পারছি না, তবে ভাল যে নয় সেটা অনুমান করা যায় স্টয়ারিং হুইলে চেপে বসা আঙুল দেখে। রক্ত সরে গেছে। সাদা দেখাচ্ছে আঙুলগুলো।

লুইসহ্যাম পেরিয়েছি, ওন্ডকেটও পেরোতে যাচ্ছি, এমন সময় পাশের একটা বাডির বন্ধ জানালার কাঁচের ওপারে একজন মানুষের ছায়া চোখে পড়ল। কনুইয়ের খোঁচায় লর্ডকে দেখালাম। গাড়ি থামিয়ে দিলেন জন। আমাদের দাঁড়াতে দেখে জানালার ওপাশ থেকে হাত নাড়ল ছায়াটা। এক ঝটকায় গাড়ির দরজা খুলে ফেলে বাড়ির দরজার দিকে ছুটলাম আমি। আমার পিছনে এলেন লর্ড জন। গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন অন্য তিনজনও।

চোখের পলকে ফুটপাথ পেরিয়ে খোলা সদর দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে একটা বদ্ধ দরজার সামনে দাঁড়ালাম। একবার ধাক্কা দিতে খুলে গেল দরজা। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা। চেহারা দেখে সঠিক বয়স অনুমান করার উপায় নেই, তবে একশোর নিচে নয় কিছুতেই। ভারি লেন্সের চশমা পরা অতি শীর্ণ মুখ।

আমাদের ঘরে ঢোকার জন্যে তাড়া দিলেন। আমরা ঢুকতে দ্রুত আবার দরজা লাগিয়ে দিলেন। জানালার কাছে চেয়ারে বসে ছিলেন তিনি। দেয়ালের গা ঘেঁষে রাখা একটা অক্সিজেন সিলিণ্ডার। ভীষণ অবাক হলাম। ইথারের বিষকে ঠেকাতে পারে অক্সিজেন, কি করে জানলেন তিনি?

একটা বিশেষ দৃষ্টিতে চ্যালেঞ্জারের দিকে তাকালেন সামারলি। বুঝিয়ে দিলেন, পৃথিবীতে তার ব্রেনটাই একমাত্র ব্রেন নয়, যেটা বুঝতে পেরেছিল ইথারে বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে।

কিন্তু নির্বিকার মুখ করে রইলেন চ্যালেঞ্জার।

আমাদের চেয়ারে বসতে বলে বৃদ্ধা বললেন, আর সহ্য হয় না এ ভাবে ঘরে বসে কাটানো। কিন্তু কি করব, বাইরের বাতাস বড় খারাপ…

এখন আর খারাপ নেই, লর্ড জন বললেন। বিষ কেটে গেছে। দেখছেন না আমরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সতেরো ঘণ্টা বেঁচেছি বদ্ধ ঘরে, সিলিন্ডারে করে অক্সিজেন নিয়ে গিয়ে। আপনার মত।

মুখ দেখে মনে হচ্ছে সর্ডের কথা ঠিক বুঝতে পারছেন না বৃদ্ধা। জিজ্ঞেস করলেন, মানুষগুলো এ ভাবে মরে গেল কেন বলুন তো? কি রোগ? মহামারীই তো মনে হচ্ছে।

বাতাস বিষাক্ত হয়ে গেছে..

তাই নাকি! উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়লেন বৃদ্ধা। বড় ভাবনার কথা..তাতে লন্ডন অ্যান্ড নর্থওয়েস্টার্ন রেলওয়ের শেয়ারের দর পড়ে যাবে না তো?

অন্য সময় হলে হাসতাম। এ মুহূর্তে পারলাম না। বোঝা গেল বৃদ্ধা এখনও ধারণাই করতে পারেননি কি ভয়ঙ্কর অবস্থা ঘটে গেছে পৃথিবীতে।

কথা বলে জানা গেল মহিলার নাম মিসেস বাসটন। বিধবা। এ বাড়িতে ভাড়া থাকেন। সামান্য কিছু শেয়ার রেখে গেছেন স্বামী। ওগুলোর লাভ থেকে কোনমতে খাওয়া-পরা জোটে। শেয়ারের দর নিয়ে ভাবনা কেন বোঝা গেল।

বুঝিয়ে বললাম, শেয়ারের দাম নিয়ে মাথা ঘামানোর আর কোন প্রয়োজন নেই। ইচ্ছে করলে এখন দুনিয়ার সমস্ত টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদের মালিক হতে পারেন তিনি। বেরিয়ে গিয়ে কেবল নিয়ে এলেই হয়। কি ওসব সম্পদ এনেও তা থেকে আর কোন সুবিধে পাবেন না।

পরিস্থিতি কিছুতে বোঝানো গেল না তাকে। হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। বিলাপ শুরু করলেন, হায় হায়, শেয়ারেরই যদি দাম না থাকে, কি খেয়ে বাঁচব আমি! ওই কটা শেয়ার ছাড়া যে আর কিছুই নেই আমার…

অনেক কষ্টে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে চুপ করালাম বৃদ্ধাকে। জিজ্ঞেস করলাম, অক্সিজেন নিয়ে বসে থাকার চিন্তা কিভাবে মাথায় এল তার

বললেন, চিন্তাটা তার মাথায় আসেনি, ডাক্তার এই ব্যবস্থা দিয়েছেন। হাঁপানী আছে। সে জন্যে সারাক্ষণ অক্সিজেন রাখেন ঘরে। শুকতে হয় একটু পর পর। ঠাণ্ডা লাগলেই বাড়ে। সেজন্যে দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখেন। বিষাক্ত ইথারের কথা কিছুই জানেন না।

কাজকর্ম কিছু নেই। যতক্ষণ জেগে থাকেন, বেশির ভাগ সময় কাটান জানালার ধারে বসে। রাস্তায় পটাপট পড়ে গিয়ে মরে যেতে দেখেছেন অনেক মানুষকে। ভেবেছেন কোন মারাত্মক রোগের শিকার হয়েছে ওরা। এমনিতেই জানালা কম খোসেন! মানুষকে ওভাবে মরতে দেখে রোগটা ছোঁয়াচে ভেবে ভয়ে আর একটিবারের জন্যেও খোলেননি জানালা। পুরো পৃথিবীটাই যে এখন মৃত, কল্পনাও করতে পারছেন না। অনেকবার বললাম, বিশ্বাস করাতে পারলাম না। থেকে থেকে শুধু একটি কথাই বলতে লাগলেন, শেয়ারের দর যদি পড়ে যায়, কি খেয়ে বাঁচবেন…

আর বসে থাকার কোন মানে হয় না। বৃদ্ধার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আবার গাড়িতে চাপলাম।

টেমস নদীর দিকে যতই এগোচ্ছি, রাস্তায় লাশের পরিমাণ বাড়ছে। বাধার পর বাধা। লাশ সরানোর জন্যে বার বার নামতে হচ্ছে। লন্ডন ব্রিজ পেরোতে রীতিমত ঘাম ছুটে গেল। মিডলসেক্সের কাছাকাছি রাস্তায় এলোপাতাড়ি দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ফাকে পথ করে নিতে গিয়ে সর্ড জনের অবস্থা কাহিল। ব্রিজের তলায় নদীতে একটা জাহাজ জ্বলছে। ধোঁয়ায় আকাশ অন্ধকার। কয়লা আর তেলাপোড়া গন্ধে বাতাস ভারি। পার্লামেন্ট হাউসের কাছাকাছিও জ্বলছে কিছু। দূর থেকে বোঝা গেল না কি পুড়ছে। ধোঁয়া উঠছে আকাশে।

এঞ্জিন বন্ধ করে গাড়ি থামিয়ে দিলেন লর্ড জন। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, মৃত লন্ডন শহরের চেয়ে গ্রাম অনেক ভাল। অনেক শান্তির। আপনাদের কেমন লাগছে জানি না, আপনারা কি করবেন তা-ও জানি না; তবে আমার দেখা শেষ হয়েছে। আর সহ্য করতে পারছি না। আমি এখন রোদারফিল্ডে ফিরে যেতে চাই।

আমারও ভাল লাগছে না, তিক্তকণ্ঠ সামারলির। এত্ত লাশ! চলুন, চলে যাই?

আমি যেতে চাই না, গমগম করে উঠল চ্যালেঞ্জারের অস্বাভাবিক মোটা গলা। ওই বৃদ্ধার মত আরও কেউ বেঁচে থাকতে পারে। দেখা দরকার।

থাকলেও খুঁজে বের করবে কিভাবে? জানতে চাইলেন মিসেস। লাশের মধ্যে গাড়িই চালানো যাচ্ছে না। ঘুরবে কি করে?

চলো, হাঁটি।

এই মৃত নগরীতে ঘুরতে ইচ্ছে করল না। তবু চ্যালেঞ্জারের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে হলো। গাড়ি থেকে নামলাম আমরা। ঘুরতে শুরু করলাম। কিং উইলিয়াম স্ট্রীটের ফুটপাথে লাশের স্তুপ। পা ফেলার জায়গা নেই। কোনমতে লাফিয়ে ডিঙিয়ে পার হয়ে এসে একটা বিরাট ইনশিওরেন্স বিল্ডিঙে ঢুকলাম। ওপরতলার বারান্দা কিংবা দুত থেকে শহরটা ভালমত দেখার জন্যে।

ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে সবচেয়ে ওপরের ঘরটায় উঠে এলাম। মস্ত গোল টেবিলের চারধারে কার্পেটের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছেন আটজন প্রৌঢ়। চেহারা আর বেশভূষা দেখে বোঝা যায় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন এঁরা। নিশ্চয় কোন জরুরী মীটিঙে ছিলেন। শেষ করতে পারেননি। তার আগেই মৃত্যু এসে হানা দিয়েছে।

ঘর পেরিয়ে দল খুলে বারান্দায় বেরোলাম। এখান থেকে লন্ডন শহরের অনেকখানি চোখে পড়ে। যেদিকে চোখ যায়-ফুটপাথে, রাস্তায়, বাড়ির আঙিনায় শুধু মানুষের। ধরে মধ্যে দমবন্ধ লাগায় তাজা হাওয়ার জন্যে অনেকে বেরিয়ে গিয়েছিল শাইরে। রাস্তায় যানবাহনের ভিড় বুঝিয়ে দিচেছ লন্ডন ছেড়ে পালাতে চেয়েছিল সবাই : ভেবেছিল, শহরটা ছেড়ে যেতে পারলেই বুঝি বাঁচা যাবে।

গির্জা চোখে পড়ল। বিশাল ঘণ্টাটা দেখে একটা বুদ্ধি এল মাথায়। বাজালে কেমন হয়? জ্যান্ত কেউ বের হলে ঘণ্টা শুনে ছুটে আসতে পারে।

চ্যালেঞ্জারকে বলার সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন তিনি।

ছুটে বেরোলাম ঘর থেকে। লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে লাগলাম সিঁড়ি বেয়ে।

অনেক বড় ঘণ্টা। এত ভারি যে একা শেকল টেনে নড়াতেই পারলাম না। লর্ড জনও এসে হাত লাগালেন। তাতেও ঘণ্টা অনড়। শেষে চ্যালেঞ্জার আর সামারলিও এগিয়ে এলেন। চারজনের মিলিত শক্তিকে আর উপেক্ষা করতে পারল না ঘণ্টা। এত জোরে শব্দ হলো যেন কানের পর্দা ফাটিয়ে দেবে। থামলাম না আমরা। বাজিয়ে চললাম। প্রচণ্ড আওয়াজে ডেকে ডেকে যেন বলতে লাগল ওটা, বেঁচে আছ নাকি কেউ? জলদি এসো! এখানে তোমাদের মত আরও কয়জন আছে!

গম্ভীর, প্রচণ্ড শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে বহুদূর। নিস্তব্ধতার মাঝে সে-শব্দকে লাগছে কামানের গর্জনের মত। ভয় লাগছে রীতিমত। কাপছে বুকের ভেতরটা।

ঝাড়া আধঘণ্টা শেকল টেনে ঘণ্টা বাজালাম আমরা। চ্যালেঞ্জার তো রীতিমত আসুরিক নাচ নাচলেন। সে-দশ্য ভুলতে পারব না কোনদিন। বেঁটে মানুষ। শেকল টানতে গিয়ে লাফিয়ে উঠতে হচ্ছে। শেকল ধরে রেখেই ঝুলে ঝুলে নেমে আসছেন। বাঁদর যেমন লতা ধরে ঝোলে, সেরকম। অন্য সময় হলে এ দৃশ্য দেখে হেসে কুটিকুটি হতাম।

পরিশ্রমে ঘেমে গেলাম। বার বার তাকাচ্ছি সদর দরজার দিকে। তাকিয়ে তাকিয়ে চোখ ব্যথা হয়ে গেল। কিন্তু কেউ এল না। কেউ সাড়া দিল না। নিঃসীম হতাশায় হাহাকার করে উঠল বুকের ভেতর। নেই, কেউ বেঁচে নেই!

আর এক মুহূর্তও এখানে নয়, জর্জ! আচমকা চেঁচিয়ে উঠলেন মিসেস চ্যালেঞ্জার। অসহ্য লাগছে তার। জলদি রোদারফিল্ডে চলো! নইলে পাগল হয়ে যাব! দুহাতে মুখ ঢাকলেন তিনি। ঈশ্বর! এ কি করলে!

গির্জা থেকে বেরিয়ে এলাম।

চুপচাপ হেঁটে গেলাম গাড়ির কাছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *