০৫. ভোরের উন্মেষে

ভোরের উন্মেষে, লুকআউট থেকে দূরে ধুলো উড়তে দেখতে পেল এরিক ক্ৰেবেট। মরুভূমি আসলে মায়ার সমুদ্র, কতরকম ভেল্কি যে দেখায়! জানে বলেই অপেক্ষায় থাকল ও, যাচাই করতে চায়, আসলেই ঠিক দেখেছে, নাকি দৃষ্টিভ্রম। ধুলো উড়তে দেখার একটু আগে রাইফেলের দূরাগত শব্দ শুনেছে, কিন্তু এখানেও ভুল হতে পারে-হয়তো ভুল শুনেছে।

এত ভোরে আগন্তুকদের আসার দুটো তাৎপর্য-সারারাত চলার মধ্যে ছিল, এবং সেক্ষেত্রে, মোটামুটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে এরা ইন্ডিয়ান নয়।

হালকা বাতাস বইছে, পরিবেশ ঠাণ্ডা…দক্ষিণে লাভার তৈরি বোল্ডারের আড়ালে ডেকে উঠল একটা, কোয়েল। এরিক নিশ্চিত যে এটা আসল কোয়েলের ডাক। দু’দিন আগের রাতে এমনই ডাক শুনেছিল, তবে আসল কি-না, এ-নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান ছিল ও।

বিস্তীর্ণ লাভার চাঙড়ের দিকে তাকাল এরিক। দিগন্ত ছাড়িয়ে চলে গেছে লাভাভূমি, ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরের তীর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। মেক্সিকানরা এটাকে বলে সিঁদুরের সাগর! যথার্থ নাম।

ক্লান্তিহীনভাবে লাভার চাঙড় আর বালিয়াড়ি খুঁটিয়ে দেখছে এরিক, খুঁটিনাটি কোন জায়গা বাদ দিচ্ছে না, একই জায়গা জরিপ করছে বারবার। একটা ব্যাপারে নিঃসন্দেহ ও, অদৃশ্য কেউ নজর রাখছে ওদের উপর। সমস্যার কথা হচ্ছে, প্রতিপক্ষের অবস্থান ওর জানা নেই।

কোথায় লুকিয়ে আছে তারা?

খুবই ধীর গতিতে এগিয়ে আসছে আগন্তুকরা, উড়ন্ত ধুলো প্রায় আটকে আছে বাতাসে, থিতিয়ে আসতে সময় লাগছে। এত ধীর গতির কারণ একটাই হতে পারে-দলে সবাই অশ্বারোহী নয়, কেউ কেউ হাঁটছে নিশ্চই। ধুলোর মেঘের মাঝখানে নীল রঙের ঝিলিক দেখেছে মনে হলো ওর। ফিল্ডগ্লাস দিয়ে খুঁটিয়ে দেখল আবার, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারল না।

পিছনে পাথরে বুটের সংঘর্ষে হালকা শব্দ হলো, ছায়া পড়ল ওর পাশে। ছায়াটা মেলানি রিওসের, দেখে চিনতে পারল এরিক। কপালে হাত ঠেকিয়ে চোখ কুঁচকে দূরের ধুলোর স্তম্ভটা দেখছে মেয়েটি।

বগলে রাইফেল গুঁজে উঠে দাঁড়াল এরিক। আমার মনে হচ্ছে ওরা সেনাবাহিনী, বলল ও। তবে বিপর্যস্ত অবস্থায় আছে।

একটা মেয়ে আছে ওদের সঙ্গে।

ব্যাপারটা ওর মাথাব্যথা নয় জেনেও অজানা কারণে হঠাৎ প্রশ্নটা করে বসল এরিক। সত্যি কি ওকে বিয়ে করবে তুমি?

ধীরে ধীরে পাশ ফিরল মেলানি, ঠাণ্ডা নির্লিপ্ত ও সরাসরি দৃষ্টিতে দেখল ওকে। এটা পুরোপুরি আমার ব্যক্তিগত বিষয়, মি. ক্ৰেবেট।

নিশ্চই।

নিপাট ভদ্রলোক ও, যোগ করল মেলানি, পরমুহূর্তে সাফাই গাইছে বলে নিজের উপর রেগে গেল। দ্রুত সবকিছু শিখে নিচ্ছে ও।

ওর ঘোড়াটাও শিখছে। কী জানো, এই এলাকায় রাইড করার জন্য সঙ্গী হিসাবে কখনোই ওকে বেছে নেব না আমি।

এখানে থাকার ইচ্ছে নেই আমার।

মেলানির মন্তব্যে ত্যক্ত বোধ করছে এরিক। থাকতে চাইছ না কেন? প্রথম থেকে বসতি করেছে যারা, দেশটাকে নিজের হাতে গড়ে নিয়েছে, তোমার বাবা তাদেরই একজন। এলাকাটাকে রীতিমত ভালবাসে সে।

হ্যাঁ, এখানে কীভাবে বসতি করতে হয়, সেটা নিজের চোখে দেখেছি আমি। বিশ্বাস করো, পদ্ধতিটা একটুও ভাল লাগেনি। কেমন লেগেছে, মনে হয় না আমার অনুভূতি বুঝতে পারবে তুমি, মি. ক্ৰেবেট। সরাসরি এরিকের চোখে চোখ রাখল মেলানি। তুমি কী ধরনের লোক, সেটাও ভাল করে জানা আছে আমার।

তাই? চোখ কুঁচকে লাভা আর বালির সমুদ্র নিরীখ করছে এরিক। উঁহু, মনে হয় না আমার মত মানুষদের বা এই এলাকা সম্পর্কে জানা আছে তোমার। বুনো এলাকায় বসতি করতে হলে মনের জোর থাকতে হয়, মিস্ রিওস, দৃঢ়চেতা এবং একইসঙ্গে ভালমানুষ না হলে টিকে থাকা যায় না। তোমার বাবা ওই ধরনের লোক। তুমি ঠিক উল্টো প্রকৃতির, এখান থেকে চলে গেলেই বোধহয় ভাল হবে তোমার জন্য। হটহাউসের একটা ফুল তুমি, খুব কোমল, আদুরে, আকর্ষণীয় কিন্তু অকেজো।

তোমার মুখে দেখছি কিছুই আটকায় না।

রাখঢাকের কি কোন দরকার আছে? সিগারেটের শেষ প্রান্তের দিকে তাকাল এরিক, চোখের কোণে ক্ষীণ নড়াচড়া ধরা পড়তে একেবারে নিশ্চল হয়ে গেল ও। টানটান হয়ে গেছে শরীর, যে-কোন, পরিস্থিতির জন্য তৈরি। ঝোঁপের কিনারে একটা পোকার সঙ্গে ক্ষীণকায় এক গিরগিটিকে ধস্তাধস্তি করতে দেখে পেশিতে ঢিল পড়ল ওর। যেখানে যেতে চাইছ, সেখানে সুন্দরী কিন্তু অকেজো মেয়েদের চায় পুরুষরা। ক্ষণিকের প্রমোদের জন্য খেলনা চায় ওরা। এখানেও ওই ধরনের মেয়ে আছে, তবে তাদের ভিন্ন নামে ডাকি আমরা। বাড়ির কাজকর্ম সামলাবে, প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে তুলে নেবে, এমন মেয়ে চাই আমরা।

তোমার কি ধারণা আমি সেটা পারি না?

হয়তো পারো। তুমি কি ছেড়ে চলে যাচ্ছ না? পালাচ্ছ না? আমাকে ছাড়াই চলে যাবে বাবার। বহু বছর চলে এসেছে যখন, ভবিষ্যতেও চলবে তার।

সম্ভবত এই বহু বছরে সে প্রত্যাশা করেছে কোন একদিন ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াবে তুমি। কী মনে হয় তোমার, কেন এমন বেগার খাটছে তোমার বাবা? তোমার জন্য, তোমার বাচ্চাদের জন্য…যদি আদৌ কখনও বাচ্চার মা হও তুমি।

নিজের অজান্তে রেগে গেছে এরিক, উপলব্ধি করতে পারছে এসব বলা ঠিক হচ্ছে না। অনধিকার চর্চা হয়ে যাচ্ছে। ওর ব্যাপারে কী বলবে? বুড়ো আঙুল বাঁকিয়ে ঘুমন্ত বেন ডেভিসকে দেখাল ও। ও-ও কি পালাচ্ছে না? থেকে গিয়ে তোমার বাবার মুখোমুখি হলো না কেন? মুখের উপর বলে দিলেই পারত তোমাকে বিয়ে করবে, সে মেনে না নিলে নিজের ব্যবস্থা নিজেই করবে ও?

আমার বাবাকে তো চেনো না!

মেলানির নির্লিপ্ততাই ওর রাগের কারণ, ব্যাপারটা অনুধাবন করে স্মিত হাসল এরিক। হ্যাঁ, ব্যক্তিগতভাবে চিনি না, কিন্তু তোমার বাবার ধাতটা জানি আমি। এও জানি যে হাজারবার জন্মালেও ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে না বেন ডেভিস, অতটা বুকের পাটা নেই তার। ওর সম্পর্কে আমার ধারণাটা শুনবে? বোধহয় তুমিও একই ধারণা পোষণ করছ।

রাগে আড়ষ্ট হয়ে গেছে মেলানির দেহ। ইচ্ছে করছে চলে যায় এখান থেকে, কিন্তু তা হলে নিজের পরাজয় স্বীকার করা হয়; উপরন্তু, এরিক ক্রেবেটের প্রতিটি ধারণা সত্যি বলে প্রমাণিত হবে। কড়া একটা কছু বলা দরকার, মরিয়া হয়ে চিন্তা করল ও, কিন্তু মাথায় আসছে না।

কাছে চলে এসেছে সৈন্যরা, খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে এখন। হঠাৎ মুখ থুবড়ে পড়ে গেল একজন, নিজের চেষ্টায় খাড়া হলো আবার।

নিজেকে যদি এতই করিকর্মা আর চৌকস ভেবে থাকো, এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন, নীচে গিয়ে ওদের সাহায্য করলেই পারো?

ছোট্ট একটা গল্প বলি, ম্যাম। সত্য ঘটনা। নীল পোশাক পরা সৈন্যদের আসতে দেখে দেখা করতে এগিয়ে গিয়েছিল আমার দাদা, কাছে গিয়ে দেখে ওরা আসলে ইন্ডিয়ান। মৃত সৈন্যদের পোশাক নিজেরাই গায়ে চাপিয়েছে। উঁহু, ওদের সাদা চামড়া দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করব আমি।

পাথুরে লাভার উপর সিগারেটের শেষাংশ ফেলে বুটের ডগা দিয়ে মাড়িয়ে নিভিয়ে ফেলল এরিক।

ব্যাপারটা খেয়াল করল মেলানি। একই ঢঙে, অবিকল একই উপায়ে বাবাকে এভাবে সিগারেট নেভাতে দেখেছে ও, ব্যাপারটা খেপিয়ে তুলল ওকে।

বোল্ডারের উপর উইনচেস্টারের ব্যারেল রাখল এরিক। বেশ, এবার থামো! তোমরা কে? ওর কণ্ঠ চড়া না হলেও শুনতে পেল সৈন্যরা, আচমকা থমকে দাঁড়াল সবাই।

ধুলো থিতিয়ে আসছে। গাট্টাগোট্টা শরীরের একজন অন্যদের ছেড়ে এগিয়ে এল দুই কদম। আমি সার্জেন্ট টমাস হ্যালিগান, ইউনাইটেড স্টেটস ক্যাভালরি। আমার সঙ্গে চারজন সৈন্য আর দু’জন সাধারণ নাগরিক। তোমাদের পরিচয় কী?

চলে এসো, সার্জেন্ট! আমাদের পরিবারে স্বাগতম!

ঘুম থেকে জেগে গেছে ড্যান, চিডল আর ডেভিস। সৈন্যদের ক্যাম্পে ঢুকতে দেখল ওরা।

সবার শেষে, নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে বিছানা ছাল ডেভিস, খেয়াল করল মেলানি। এরিকও দেখেছে ঘটনাটা, বুঝতে পেরে খেপে গেল ও, জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। কিন্তু গ্রাহ্যই করল না সে, স্মিত হেসে অন্য দিকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।

যেখানে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকল এরিক, মনোযোগ দিয়ে সৈন্যদের সঙ্গে অন্যদের উত্তেজিত আলাপ শুনছে। ঠিক কী ঘটেছে, জানার জন্য সার্জেন্টের দলের সঙ্গে আলাপ করার প্রয়োজন বোধ করছে না ও, সৈন্যদের দশা দেখে দিব্যি বুঝতে পারছে। অলস আলাপে মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, অথচ দারুণ বিপজ্জনক পরিস্থিতি এটা-যে-কোন সময়ে হামলা করতে পারে ইন্ডিয়ানরা। সত্যি যদি তাই হয়, ভরাডুবি ঠেকানো যাবে না, কারণ সৈন্যদের দলভুক্তির উত্তেজনায় মনোযোগ ছিন্ন হয়ে গেছে ওদের।

স্বস্তির বিষয়, তেমন কিছু ঘটল না। মরুভূমিতে দৃষ্টি রাখল ও, মনে মনে ভাবছে জিম রিওসের কথা।

খ্যাতি শুনে প্রতাপশালী এই র‍্যাঞ্চারকে চেনে এরিক। তবে রুক্ষ এবং নিষ্ঠুর মানুষ হিসাবেও কুখ্যাতি রয়েছে জিম রিওসের। সব মিলিয়ে ভালমানুষই বলা চলে। অহঙ্কারী হতে পারে, কিন্তু দাম্ভিক নয়। অকপট, শান্তিপ্রিয় ও স্পষ্টভাষী। এ-ধরনের মানুষের ধাত জানা আছে ওর। এরিকের ধারণা জিম রিওস মানুষ হিসাবে প্রায় ওরই মত।

নির্জন, বুনো অঞ্চলে বসতি করা চাট্টিখানি কথা নয়-দুর্দান্ত সাহসের সঙ্গে প্রয়োজন দৃঢ় মনোবল, দুর্জয় মানসিকতা; অ্যাপাচি আর ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে লড়তে হয় বেপরোয়া ঔদ্ধত্য, জেদ ও সহিষ্ণুতা নিয়ে; এখানে জীবন হয় নিঃসঙ্গ, কঠিন-মেয়েলি সামাজিকতা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বাড়ির আরাম-আয়েশ, নিরাপত্তা বা খুঁটিনাটি জিনিস, কোনটাই পাওয়া যায় না মরুভূমিতে; তবে ঘরে একজন নারীর উপস্থিতিতে এর সবই যোগাড় করতে প্রেরণা পায় পুরুষরা। ঘরে একজন নারীর উপস্থিতিই মূল ব্যাপার।

মেলানি রিওসকে যা বলেছে, সেসব সত্য বলে বিশ্বাস করে এরিক। নিঃসন্দেহে মেয়ের জন্য বহুদিন ধরে অপেক্ষা করেছে জিম রিওস, ভেবেছে মেয়ের ছোঁয়ায় বদলে যাবে তার বাড়ি; মেয়ে বিয়ে করবে, নাতি-নাতনি হবে-বুড়ো একজন মানুষের জন্য এটাই সবচেয়ে স্বস্তি ও আনন্দের উপলক্ষ্য। জিম রিওসের মত এমন বহু মানুষ দেখেছে এরিক, যাদের এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি।

ওর বদলি হিসাবে পাহারা দিতে চলে এসেছে ড্যান কোয়ান। কোন বাক্য বিনিময় হলো না দু’জনের মধ্যে। নীচে নেমে এল এরিক, এবং পড়বি তো পড় একেবারে ঝামেলার মধ্যে!

একপাশে দাঁড়িয়ে আছে এড মিচেল, কোমরের পাশে স্থির হয়ে আছে দু’হাত, ড্র করার জন্য তৈরি। মুখটা কঠিন দেখাচ্ছে, নাছোড়বান্দা টাইপের মানুষ সে।

কয়েক গজ দূরে, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে মার্ক ডুগান।

এভাবেই যদি মরার ইচ্ছে থাকে তোমার, আমার কী করার আছে! নিস্পৃহ স্বরে বলল ডুগান, পিস্তলের বাঁট ছুঁইছুঁই করছে তার হাত।

থামো! চাবুকের মত তীক্ষ্ণ শোনাল এরিকের কণ্ঠ। বোকার হদ্দ! নিজেদের বিপদের কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে বসে আছ?

এই ব্যাটা ফেরারী! একগুঁয়ে স্বরে বলল ডুগান। একেই তাড়া করছিলাম আমরা।

বুলেটের অপচয় করার দরকার নেই, উপদেশ দিল এরিক। এখান থেকে বেরোনোর আগেই দেখবে একে অন্যের প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করছ তোমরা।

বেজন্মা আউটলটার পক্ষ নিচ্ছ তুমি?

না। বিপদ কেটে গেলে, নিরাপদে যদি বেরিয়ে যেতে পারি সবাই, তখন ফয়সালা করে নিয়ে তোমরা, একটুও আপত্তি করবে না কেউ। এবার মন দিয়ে আমার কথা শোনো।

নিজেকে কী মনে করো তুমি, আঁ?

মি. ডুগান, মুখ খুলল সার্জেন্ট হ্যালিগান। তোমার জায়গায় থাকলে ওর কথা শুনতাম আমি। অযথা ঝামেলায় জড়ানোর কী দরকার? কষ্ট করে এতদূর এসেছি, সবাই মিলে চেষ্টা করলে হয়তো লোকালয়ে ফিরে যেতে পারব আমরা। নিজেদের মধ্যে গণ্ডগোল করে সম্ভাবনাটা নষ্ট করা উচিত হবে না।

সার্জেন্টের কথায় কোন লাভ হয়েছে বলে মনে হলো না। ভীষণ জেদী মানুষ মার্ক ডুগান। ইয়োমা থেকে বেরোনোর আগে ডেপুটি হিসাবে শপথ করেছে, নির্দিষ্ট একটা মিশন ছিল, কাজটা শেষ করাই তার লক্ষ্য। পাসি বাহিনীর মধ্যে কেবল সে-ই বেঁচে আছে, এটাও আমল দিচ্ছে না ডুগান। বেঠিক কিছু বলিনি আমি, কিংবা বেআইনী কাজও করছি না। এড মিচেল নামের এই লোকটা ফেরারী, আইন খুঁজছে ওকে।

আইনী দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে খুন হয়ে যাবে তুমি, ঠাণ্ডা স্বরে বলল মিচেল।

হিমশীতল চাহনিতে তাকে দেখল এরিক। চুপ করো! কর্কশ হয়ে গেল ওর কণ্ঠ। ডুগান, এক কাপ কফি গিলে চাঙা হয়ে নিলেই পারো তুমি।

রাগে লালচে হয়ে গেল মার্ক ডুগানের মুখ, আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়ে আগুনের কাছে চলে গেল সে।

ডুগানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এড মিচেল, চাহনি বা মুখ দেখে বোঝা গেল না মনে, কী ভাবনা চলছে। তামাকের দলা। থেকে এক টুকরো কামড়ে মুখে পুরল সে। ধন্যবাদ, ক্ৰেবেট। কী জানো, ইয়োমার লোকজন যদি ওদের ঝামেলাবাজ ছেলেদের লাইনে রাখত, তা হলে কোন বিপত্তিই ঘটত না। স্রেফ অচেনা বলে আমাদের উপর চড়াও হয়েছিল ওরা, ধরে নিয়েছিল সহজে শিকার করতে পারবে।

সেটা তোমার সমস্যা, নিস্পৃহ স্বরে বলল এরিক। যতক্ষণ একসঙ্গে আছি আর বিপদ না কাটছে, ডুগানের কাছ থেকে দূরে থেকো।

পাথরের কাছে চলে এল এরিক। সবে মাত্র শুরু হয়েছে, আনমনে ভাবল ও। ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে লড়াই শুরু হলে সব ভুলে যাবে এরা, কিন্তু তার আগ পর্যন্ত কামড়াকামড়ি লেগেই থাকবে।

আগুনের ধারে গোড়ালির উপর ভর দিয়ে বসল সার্জেন্ট। মাথামোটা বোকার হদ্দ ওরা। ধন্যবাদ, ক্ৰেবেট, সময়মত ওদের থামিয়েছ তুমি।

ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে গেল এরিক, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে। ঘোড়ার দিকে খেয়াল রাখতে হবে সবসময়, বলল ও। ইন্ডিয়ানরা স্ট্যাম্পিউ করতে পারে, যাতে পায়ে হাঁটতে বাধ্য হই আমরা। নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটা করাল তৈরি করতে হবে আমাদের। ইন্ডিয়ানরা থাকুক বা না-থাকুক, ঘোড়া না থাকলে কখনোই ইয়োমায় পৌঁছতে পারব না আমরা।

চিন্তিত মনে সায় জানাল সার্জেন্ট। ঠিকই বলেছ। ভাবছি পাহারা দেব কীভাবে। আমার লোকজন এত ক্লান্ত…

উঠে দাঁড়াল এরিক, চড়া স্বরে কথা বলল যাতে সবাই শুনতে পায়। ঘোড়াগুলোকে রাখার জন্য একটা করাল তৈরি করতে হবে আমাদের। স্বেচ্ছায় কাজ করতে চাও কেউ?

সবার আগে উঠে দাঁড়াল এড মিচেল। মিচেলকে চোখের আড়াল করতে নারাজ ডুগান, তাই সঙ্গে সঙ্গে সেও উঠে দাঁড়াল। একে একে উঠে দাঁড়াল ডেভিস, ডাফি এবং কেলার। সবাইকে নিয়ে অ্যালোয়য়ায় নেমে এল এরিক। ঘন ঝোঁপের একটা দেয়াল খুঁজে পেয়ে, ওকটিয়ার লম্বা ডাল জুড়ে দিল ঝোঁপের সঙ্গে। ঝোঁপের শাখাপ্রশাখা বাঁধল পরস্পরের সঙ্গে। এরিকরা কী করছে, দেখে এগিয়ে এসে হাত লাগাল অন্যরা।

গভীর অ্যারোয়োর তলা উনুনের মত তেতে আছে। প্রচণ্ড গরম লাগছে। ধীরে-সুস্থে টানা কাজ করে চলল ওরা, সবার মিলিত চেষ্টায় টেকসই একটা দেয়াল দাঁড়িয়ে গেল, এমনকী কোন ষড়ও ভাঙতে পারবে না ওটা। দু’একটা ফাঁকফোকর ছিল, সেগুলো ভরাট করল পাথর বসিয়ে।

কাজ শেষ হতে, এরিকের পাশে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল সার্জেন্ট হ্যালিগান। দম বন্ধ করা গরম পড়ছে। কখনও আর্মিতে ছিলে নাকি?

একবার, খুব অল্প সময়ের জন্য।

যা পরিস্থিতি, একজন নেতা না হলে চলছে না।

ডেভিস বোধহয় কনফেডারেট বাহিনীতে ছিল, প্রস্তাব করল এরিক। সে-ই তো নেতা হতে পারে।

উঁহু, ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে লড়াইয়ে অভিজ্ঞ এমন একজন লোক দরকার আমাদের, দৃষ্টি নিচু করে নিজের হাতের দিকে তাকাল সার্জেন্ট। এক ক্রেবেটকে মনে পড়ছে, কর্নেল কুকের সঙ্গে কাজ করত, স্কাউটদের চীফ ছিল সে। তুমি নাকি?

খুব অল্প দিনের জন্য।

যথেষ্ট। ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে অভিজ্ঞ-যোদ্ধাদের চিনতে ভুল করত না কুক। যোগ্যতা আছে বলেই তোমাকে বেছে নিয়েছিল সে।

তেমন কিছুই করতে হয়নি। সীমান্ত ধরে মেক্সিকোয় অভিযানে গেছি একুঙ্কাজে সেরা ভিটি করে সিদ্ধান্ত একজন নেতা দিতেও

এই কাজে সেরা ছিল কুক। উঠে দাঁড়াল সার্জেন্ট। যাকগে, তোমার যখন অনীহা, ভোটাভুটি করে সিদ্ধান্ত নিতে পারি আমরা।

আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব করল সার্জেন্ট। যোগ্য একজন নেতা দরকার ওদের, যে ইন্ডিয়ানদের সম্পর্কে জানে, একইসঙ্গে নেতৃত্ব দিতেও সক্ষম। এরিক ক্রেবেটের নাম প্রস্তাব করল সে।

বেন ডেভিস, ঘোষণা করল মেলানি। আমার তো মনে হয় ওই যোগ্য নেতা হতে পারে। কনফেডারেট বাহিনীতে কর্নেল ছিল ও।

ক্রেবেটের পক্ষে আমি, বলল মিচেল।

ঝট করে মাথা তুলল ডুগান। ডেভিস।

প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল টেরিল ডাফি, চোখ মেলে একে একে সবার উপর দৃষ্টি চালাল সে। ক্রেবেট, নামটা ঘোষণা করে চোখ বন্ধ করে ফেলল আবার।

ডেভিসের পক্ষে ভোট দিল কেলার, কিন্তু ইশারায় এরিককে দেখিয়ে দিল মিমি রজার্স।

ইউনিয়ন আর কনফেডারেট যাই হোক, আমি আর্মির পক্ষে, জানাল টম হার্শ।

আড়চোখে এরিকের দিকে তাকাল ডেভিস, ঠোঁটে মৃদু হাসি। তো?

উঠে দাঁড়িয়ে গা থেকে ধুলো ঝাড়ল সার্জেন্ট হ্যালিগান। ওই ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি, ঘুরে পাথরসারির দিকে তাকাল সে। এই যে, ছেলে! নেতা নির্বাচন করার জন্য ভোটাভুটি করছি আমরা। ডেভিস অথবা ক্ৰেবেট। তুমি কার পক্ষে?

মরুভূমির উপর থেকে মুহূর্তের জন্যও দৃষ্টি সরাল না ড্যান কোয়ান। ক্ৰেবেট, জানিয়ে দিল সে।

সমান সমান, শ্রাগ করে বলল ডেভিস।

মাথা ঝাঁকিয়ে চুপচাপ বসে থাকা দোআঁশলার দিকে ইঙ্গিত করল এড মিচেল। ওর মতামতটা জেনে নাও। ও তো ভোট দেয়নি।

ইনজুনটার মতামত নেব? বিহ্বল শোনাল ডুগানের কণ্ঠ। ইনজুনরা আবার ভোট দেওয়ার অধিকার পেল কবে থেকে?

গুলি যে করতে পারে, সে ভোটও দিতে পারবে, বলল সার্জেন্ট।

আমার আপত্তি নেই, জানাল ডেভিস। তোমার কী মত, চিডল?

আঙুল চালিয়ে বালিতে একটা গর্ত করছিল টনি চিডল। মুখ তুলে তাকাল সে, কালো চোখে নিপ্রাণ চাহনি। আমি ওর পক্ষে, এরিককে দেখাল সে। আমার ধারণা ইন্ডিয়ানদের সম্পর্কে যথেষ্ট জানে ও।

এরিকের দিকে ফিরল ডেভিস, মুখ নির্বিকার, মনে কী ভাবনা চলছে বোঝা গেল না। শ্রাগ করল সে। বেশ, ক্যাপ্টেন, এবার তোমার নির্দেশ শুনি?

সর্বক্ষণ ঘোড়ার সঙ্গে থাকবে দু’জন। প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর লোক বদল হবে লুকআউটে। বৃত্তাকার একটা জায়গাকে সীমানা নির্দিষ্ট করব আমরা, অনুমতি ছাড়া এর বাইরে যেতে পারবে না কেউ। হ্যালিগানের দিকে ফিরল এরিক। সার্জেন্ট, খাবার আর অ্যামুনিশন চেক করবে তুমি। অনুমান নয়, সঠিক তথ্য জানতে চাই আমি।

ইয়েস, স্যার।

পাহারা দিতে কোয়ানের জায়গায় চলে গেল এড মিচেল, ছেলেটা লুকআউট থেকে নেমে আসতে তাকে ডাকল এরিক। সুযোগ পেলে কথা বোলো মেয়েটার সঙ্গে, বলল ও। এখনও ভয় কাটেনি ওর।

খাইছে! এ-কাজটা সবচেয়ে কঠিন মনে হয় আমার। তুমি বরং অন্য কিছু করতে বলে। এ-ব্যাপারে আনাড়ি আমি।

তোমার কথা শুনবে ও, সামান্য দ্বিধা করল এরিক, শেষে খেই ধরল। বাচ্চা মেয়ে ও, ড্যান, কিন্তু পরিণত মহিলার মত আচরণ করার চেষ্টা করছে। একটু বেশিই চেষ্টা করছে। বুঝিয়ে-শুনিয়ে মানা কোরো ওকে। কথাবার্তা চালিয়ে যাও কিছুক্ষণ, দেখবে কাজ হয়ে গেছে। নির্দিষ্ট কোন বিষয় লাগবে না…স্রেফ কথা বললেই হবে। ভয় বা আতঙ্ক কেটে যাবে ওর। ইন্ডিয়ানরা আশেপাশে রয়েছে, স্বভাবতই এখনও আতঙ্কে আছে ও। মনে রেখো, ভুলেও ওর বা ইন্ডিয়ানদের ব্যাপারে কথা বলতে যেয়ো না।

জীবনে কখনও কোন মেয়ের সঙ্গে কথা বলিনি, জানিও না কী বলতে হবে!

আতঙ্কে ভিতরে ভিতরে কুঁকড়ে গেছে ও। একটা কিছু নিয়ে কথা বললেই হবে, পরে ভেবে নিয়ো। ওর কাছাকাছি তোমার বয়স, নাচের অনুষ্ঠানে তোমার বয়সী ছেলেদের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ওর। আমাদের মধ্যে একমাত্র তুমিই পারবে ওর ভয় কাটাতে।

বেশ…চেষ্টা করব।

পাথরের উপর উঠে এসে মরুভূমিতে দৃষ্টি চালাল এরিক। এড মিচেলের তামাকের অফার প্রত্যাখ্যান করল।

ডুগানকে হটিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, বলল মিচেল। বিশ্বাস করো, ইয়োমার ঘটনাটা ফেয়ার ফাইট ছিল।

ওর কাছ থেকে দূরে থেকো।

অনেকের মত ডুগানও মনে করে অভিযুক্ত মানুষ মানেই দোষী ধ্যেৎ, ওকে খুন করার ইচ্ছে নেই আমার, কিন্তু ওভাবে চড়াও হয়ে এলে কী করব আমি? দাঁড়িয়ে থেকে বুকে বুলেট নিতে তো পারি না মনে হয় না সহজে হাল ছাড়বে ও।

ওর মুখোমুখি তোমার হতেই হবে।

এ-ব্যাপারে একরকম নিশ্চিত এরিক। প্রচণ্ড একগুঁয়ে লোক মার্ক ডুগান, নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুনিশ্চিত, অটল থাকতে অভ্যস্ত; কিংবা বিপদ বা ঝামেলার ভয়েও পিছিয়ে আসার মানুষ নয়। লোকটার সৎ গুণগুলোই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়াবে।

*

ক্যাম্পের চারপাশের এলাকা পরিদর্শন করল এরিক ক্রেবেট। ভিতরে ভিতরে অস্থির বোধ করছে ও। অ্যারোয়োতে তিন কূপের অবস্থান, ঢালের কারণে পর্যায়ক্রমে নিচু হয়ে গেছে জমি। প্রথম দুই কূপের দূরত্ব বা উচ্চতার পার্থক্য বেশি নয়; কিন্তু তৃতীয়টা বেশ দূরে, মাঝখানে প্রায় একশো ফুটের মত বিস্তৃতি পেয়েছে অ্যারোয়োটা। তৃতীয় কূপ ছাড়িয়ে, ঢালু জমি আর অ্যারোয়োর কিনারে ঘন ঝোঁপ জন্মেছে। সবচেয়ে উঁচু এবং ছোট কূপটার ঠিক উপরের জায়গাটা লুকআউট হিসাবে পছন্দ করেছে, ওরালাভার চাঙড় আর বোল্ডারে ভরা। চারপাশে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় ওখান থেকে, গোলাগুলির সময়ও বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে। একটু নীচে ওকটিয়া আর ঝোঁপের তৈরি বেড়া, ঘোড়ার করালকে ঘিরে রেখেছে। খোলামেলা, বড়সড় জায়গা হলেও আক্রান্ত হলে সহজে প্রতিরোধ করা যাবে; কারণ প্রয়োজনে বাইরে থেকে চট করে ভিতরে ঢোকার জন্য বেড়ায় কয়েকটা ফাঁক রাখা হয়েছে, এবং বেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি না দিয়েই দূর থেকে ভিতরে চোখ রাখা সম্ভব। কিন্তু তারপরও, আশপাশে অনেক আড়াল রয়েছে যেগুলো ব্যবহার করতে পারে শক্ররা, এ-ব্যাপারে ইন্ডিয়ানদের দক্ষতা ঈর্ষণীয়।

তবে পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব নয়। এতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে ওদের।

সন্ধ্যার একটু আগে মিমি রজার্সের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেল ড্যান কোয়ান। কূপের পাশে অগভীর একটা পাথরের গর্ত রয়েছে, বেসিন হিসাবে ব্যবহার করা যায়, ওটায় পানি জমিয়ে চুল ধুয়েছে মেয়েটি। এ-মুহূর্তে চুল শুকাচ্ছে।

তুমি আসায় বোধহয় খুশি হয়েছে মিস্ মেলানি, আড়ষ্ট স্বরে শুরু করল ড্যান, বুঝতে পারছে না প্রসঙ্গটা সঠিক হলো কি-না। মন খুলে কথা বলার মত একজন তো পেয়েছে। সম্ভবত নিঃসঙ্গ বোধ করছিল

চুল নিয়ে ব্যস্ত থাকল মিমি, কিছু বলল না, এমনকী তাকালও না ড্যানের দিকে। কূপের পানিতে ছায়া ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে, দেখতে পেল ড্যান।

জায়গাটা সুন্দর, নীরবও।

কূপের পানিতে প্রতিবিম্ব দেখে আয়নার কাজ চালিয়ে নিচ্ছে মিমি, তবে প্রতিবিম্বটা অস্পষ্ট দেখাচ্ছে।

শুনেছি নতুনভাবে জীবন শুরু করার জন্য ক্যালিফোর্নিয়া আদর্শ জায়গা, একতরফা আলাপ চালিয়ে গেল ড্যান। খনিতে কাজ করা যায়, চাইলে এক টুকরো জমি দিয়েও শুরু করা সম্ভব।

গোড়ালির উপর ভর দিয়ে বসল মিমি, তবে তাকাল না ভ্যানের দিকে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে এরিক ক্ৰেবেট, ও নিশ্চিত উদাসীন দেখালেও আসলে ভ্যানের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছে মিমি।

বাড়িতে এমন কেউ নেই যে ফিরে যাব, খেই ধরল ড্যান। একেবারে ঝাড়া হাত-পা আমার, চাইলে এখানেও থেকে যেতে পারি। ভাবছি সম্ভব হলে কোন একদিন ছোট্ট একটা জমির মালিক হব, গরু পালব, ফলের বাগান করব। জায়গাটা বড় না হলেও চলবে, তবে পর্যাপ্ত পানির যোগান থাকতে হবে। বাড়িটা আমি নিজেই তৈরি করব। অন্যদের সঙ্গে দু’-তিনটা বাড়ি তৈরি করেছি, আমার তো মনে হয় একা নিজের জন্য একটা তৈরি করতে পারব আমি।

পানিতে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল মিমি, কিন্তু অস্পষ্ট কাঠামোটা বিলীন হয়ে গেছে অন্ধকারে। নিজেকে একই পরিস্থিতির শিকার মনে হলো ওর-অন্ধকারে হারিয়ে গেছে, পথ খুঁজে পাচ্ছে না। লাভার তৈরি ক্লিফের কিনারার উপর, আকাশে নিঃসন্তু একটা তারা দেখা যাচ্ছে, আর ড্যান কোয়ানের কণ্ঠ-এই হচ্ছে অন্ধকার সমুদ্রে একমাত্র সাড়া। কিংবা আশার আলো!

পাহাড়ে হয়তো একটা জমি খুঁজে পাব, বলে চলেছে ড্যান। গাছ আর ঘাস আছে, এমন জায়গা থাকার কথা। অমন একটা জমি খুঁজে পেলে সত্যি খুশি হব আমি। থেমে নিঃসঙ্গ তারাটার দিকে তাকিয়ে থাকল সে। পেলে…রেগার খাটতে হবে। একা বলে অনেক কাজ পড়ে যাবে হাতে।

মিনিট কয়েক নীরব থাকল সে। কী জানো, এখানে একটা জিনিসের অভাবই অনুভব করছি আমি। জ্যাম আর জেলি। আমাদের বাড়িতে জিনিসগুলো সবসময়ই থাকত। মা নিজ হাতে তৈরি করতেন। জারে ভরে সেলারে রেখে দিতেন শীতের জন্য। তুষারপাত শুরু হলে বের করতেন। সারা বছর ধরে ধুলো জমত জারের গায়ে। ছোটবেলায় প্রায়ই সেলারে চলে যেতাম আমি, পীচ আর চেরিতে ভরা জারের উপর প্রদীপের আলো ফেলতাম। কাঁচের জারে আলো ঠিকরে পড়তে দেখতে এত ভাল লাগত! ওরকম জ্যাম বা জেলি কখনও দেখতে পাব বলে মনে হয় না।

আঙুল চালিয়ে শুকনো চুল ঘাড়ের পিছনে তুলে দিল মিমি, তারপর টেনেটুনে ঠিক করল পরনের পোশাক।

গরম গরম বিস্কুটের সঙ্গে জেলি! আহ, জিভে স্বাদ লেগে আছে। এখনও! চিন্তা করলেই খিদে পেয়ে যায় আমার।

মরুভূমির দিকে দৃষ্টি চালাল এরিক ক্ৰেবেট, ক্রমশ ঠাণ্ডা ও উপভোগ্য হয়ে আসছে পরিবেশ, ছোটবেলায় গরম বিস্কুট খাওয়ার অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য ঘটনা মনে পড়ল..ওর। সময়ের স্রোতে মানুষ বড় হয়, বয়স বাড়ে, কিন্তু একইসঙ্গে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলে, যা আর কখনোই ফিরে পায় না। আনমনে মাথা নাড়ল ও, হঠাৎ নিজের গভীরে এক ধরনের শূন্যতা এবং বিষাদ অনুভব করল।

মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে পারি না আমি, শেষপর্যন্ত পরাজয় মেনে নিল ড্যান কোয়ান। জানিই না কী বলা উচিত! ভালই তো চালাচ্ছিলে, মৃদু স্বরে বলল মিমি রজার্স।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *