০৫. বিছানার কিনারে বসে

বিছানার কিনারে বসে পায়ে মোজা টেনে দিল কিশোর। লারসেনের বাড়িতে আজ পার্টির দাওয়াত। অস্বস্তি লাগছে তার। জটিল রহস্যের তদন্ত করতে হবে বলে ভয়টা, তা নয়, ভয় হলো এ ধরনের পার্টিতে অনেক ধরনের মানুষের সমাগম হয়। তাতেও খারাপ লাগত না। কিন্তু পার্টিটা একটা মেয়ের। তাতে ছেলেরা যেমন আসবে, তেমনি আসবে মেয়েরাও। ওদের সঙ্গে এমন সব কথা বলতে হবে ভদ্রতার খাতিরে, এমন আচরণ করতে হবে, যা সে করতে চায় না। মোটকথা ন্যাকামি এবং ভণিতা তার ভাল লাগে না।

উঠে গিয়ে ওয়ারড্রোব থেকে একটা উজ্জ্বল রঙের পোলো শার্ট বের করে গায়ে দিল। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের সুন্দর চেহারা এখন ওর জন্যে বিরক্তির কারণ। কোঁকড়া কালো চুল। গভীর কালো চোখে কেমন এক ধরনের মায়া, যেন স্বপ্ন ভরা। এই চোখের দিকে তাকিয়েই মেয়েরা… ধূর! আর ভাবতে চায় না!

আগে মোটামুটি সহজভাবেই মিশতে পারত মেয়েদের সঙ্গে। ইদানীং যতই বড় হচ্ছে, কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে ওর স্বভাব। ভাল অভিনেতা সে, তাতে কোনই সন্দেহ নেই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় শুরু করল। ধরা যাক, একটা মেয়ে এসে আলাপ জমানোর চেষ্টা করল ওর সঙ্গে। বলল, এই যে, কিশোর পাশা। তোমার সঙ্গে পরিচিতি হওয়ার সুযোগ পেয়ে খুশি হলাম। তুমি খেয়াল করোনি। কিন্তু গত আধ ঘণ্টা ধরে তোমাকে লক্ষ্য করছি আমি।

কে বলল লক্ষ্য করিনি? আমি সব দেখি। আমার চোখে কিছুই এড়ায় না, জবাব দেবে কিশোর।

একটা চিকেন নেবে? সৌজন্য দেখিয়ে কাগজের প্লেটে করে চিকেন লারসেনের একটা বিশেষ খাবার বাড়িয়ে ধরল মেয়েটা।

না, ধন্যবাদ, আয়নার দিকে তাকিয়ে কল্পিত মেয়েটাকে বলল কিশোর। আমি খাব না। আজেবাজে জিনিস খেতে মানা করে দিয়েছে ডাক্তার।

তাই নাকি? তোমার ওপর ভক্তি বেড়ে যাচ্ছে আমার, হাসি দিয়ে বলল মেয়েটা। এ রকম মনের জোরওয়ালা মানুষ আমার ভাল লাগে।

তার মানে কিশোরকেও ভাল লাগে, এটাই বোঝাতে চাইল মেয়েটা। ধরা যাক, তখন জিজ্ঞেস করল, তুমি কি জুনের বন্ধু?

আসলে, আমি এসেছি খাবারে বিষ মেশানোর একটা ঘটনার তদন্ত করতে।

চোখ বড় বড় হয়ে গেল মেয়েটার। মানে! উত্তেজিত কণ্ঠে বলল সে। তুমি গোয়েন্দা! কোন খাবারে বিষ মিশিয়েছে?

এখনও হয়তো মেশায়নি। হয়তো মেশানোর পরিকল্পনা করেছে। সম্ভবত মুরগীতে।

আরও অবাক হয়ে গেল মেয়েটা। সর্বনাশ! কঠিন একটা প্রশ্ন করে বসল, কেন মেশাবে? লক্ষ লক্ষ লোককে কে, কি কারণে মারতে চাইছে?

জবাবটা এখনও জানি না। হতে পারে হেনরি অগাসটাস লারসেনকে ব্যবসা থেকে তাড়াতে চাইছে। ওরকম আরও হাজারটা কারণ থাকতে পারে। কোনটা যে ঠিক, এখনও বলতে পারছি না।

তোমার অনেক বুদ্ধি, কিশোরের কল্পনায় বলল মেয়েটা।

জানি। অনেকেই বলে সে কথা।

গোয়েন্দাগিরি করতে গেলে তো অনেক বিপদে পড়তে হয়। পিস্তল চালাতে জানো? কারাতে, জুডো এসব…

কিছু কিছু আগ্নেয়াস্ত্র চালাতে পারি। জুডো শিখছি। পুরোপুরি শেখা হয়নি এখনও।

কিন্তু হয়ে তো যাবে, থেমে গেল মেয়েটা। দাঁত দিয়ে নখ কাটল। তারপর আসল কথাটা জিজ্ঞেস করল, তোমার কোন গার্লফ্রেন্ড আছে?

এই রে! সেরেছে! আমতা আমতা করে বলল কিশোর, ইয়ে…মানে…

কিশোর! তোমার হলো?

চমকে বাস্তবে ফিরে এল কিশোর। ফিরে তাকাল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে রবিন। নেভি ব্লু কাপড়ে লাল স্ট্রাইপ দেয়া পোলো শার্ট গায়ে। পরনে ধবধবে সাদা প্যান্ট। সুন্দর লাগছে ওকে।

কার সঙ্গে কথা বলছিলে? গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল রবিন।

কারও সঙ্গে না, জবাব দিল কিশোর। কেসটা পর্যালোচনা করছিলাম, লাল হয়ে গেছে মুখ।

কোন চিন্তা মাথায় থাকলে একা একা কথা বলে কিশোর, ভাবনাগুলোই বিড়বিড় করে ভাবে, জানা আছে রবিনের। তাই আর এ নিয়ে মাথা ঘামাল না।

বেল এয়ারে চিকেন লারসেনের বিরাট বাড়ি। আগেই হাজির হয়ে গেছে মুসা আর ফারিহা। কিশোরদের জন্যে অপেক্ষা করছে।

বাড়ি দেখেছ! দুই বন্ধুকে দেখেই বলে উঠল মুসা। গেট থেকে পুল পর্যন্ত যেতেই বাস লাগবে! আরিব্বাপরে বাপ!

তিনতলা বিশাল বাড়িটায় আটচল্লিশটা ঘর। আইভি লতায় ছাওয়া দেয়াল। কত কোটি কোটি ডলার কামিয়েছেন চিকেন কিং, বাড়িটা দেখলেই আন্দাজ করা যায়। আরেকটা জিনিস স্পষ্ট, কি ব্যবসা করে টাকা কামিয়েছেন তিনি। সর্বত্র মুরগীর ছবি। যেখানে সুযোগ মিলেছে, মুরগীর ছবি আঁকা হয়েছে। যেখানে আঁকার জায়গা নেই, যেমন লনে, সেখানে রবারের মুরগী বানিয়ে সাজিয়ে দেয়া হয়েছে।

বাড়ির পেছনে পুলের ধারে পার্টির আয়োজন করা হয়েছে। ছেলে-বুড়ো মিলিয়ে কম করে হলেও দুশো জন তো হবেই। পুলটার চেহারাও বিচিত্র। মুরগীর আকৃতিতে তৈরি। তার পাশে ফ্রাইড চিকেন খেতে খেতে হাসাহাসি করছে একদল ছেলেমেয়ে।

আমরা কিন্তু এখানে শুধু মজা করতে আসিনি, ফিসফিস করে বন্ধুদেরকে বলল কিশোর। ফারিহা, গোয়েন্দা হওয়ার খুব শখ তো তোমার। ট্রেনিং নিতে শুরু করো। যা বলব ঠিক তাই করবে। জুনের কাছ থেকে কাপড়গুলো নেবে না, ভুলে যাওয়ার ভান করে থাকবে। তাতে আরেকবার ওর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবে।

আচ্ছা, ঘাড় কাত করে বাধ্য মেয়ের মত বলল ফারিহা। চলো, জুনের কাছে যাই। তোমরা যে এসেছ দেখা করা দরকার।

ভিড়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল চারজনে। সবার হাতেই কাগজের প্লেট। এমন ভঙ্গিতে খাচ্ছে, যেন জীবনে এই প্রথম মুরগীর স্বাদ পেয়েছে। এই আরেকটা জিনিস বিরক্ত লাগে ওর। মানুষগুলো এমন করে কেন? পোশাক-আশাকে তো কাউকেই দরিদ্র বলে মনে হচ্ছে না। তার পরেও অন্যের বাড়ির খাবার পেলে এমন  হাংলামো করে! বিরক্তিতে নাক কুঁচকাল সে।

কিশোর, রবিন বলল। একটা অন্তত খাও। একটাতে তো আর মরে যাবে না।

রবিনের দিকে তাকিয়ে রইল কিশোর। ঠাট্টা করছে কিনা বোঝার চেষ্টা করল। মাথা নাড়ল, না, খাব না।

তুমি আসলেই একটা গোঁয়ার…

হাই, খানিক দূর থেকে বলে উঠল একটা মেয়ে। কিশোরদেরই সমবয়সী। খাটো করে ছাঁটা বাদামী চুল। এক হাতে মুরগীর প্লেট, আরেক হাতে খালি একটা কাপ, সোডা ওয়াটার ছিল, খেয়ে ফেলেছে। আঁতকে উঠেছিল কিশোর, তাকেই ডাকছে ভেবে। যখন দেখল রবিনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে মেয়েটা, হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।

তুমি আসার পর থেকেই তোমাকে দেখছি, রবিনের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল মেয়েটা।

রবিনও হাসল। তোমাকে তো চিনলাম না?

চোখ কপালে তুলল মেয়েটা। হায় হায়, বলো কি! আমাকে চেনো না? আরে আমি, আমি, ভাল করে দেখো তো চিনতে পারো নাকি?

ব্যস, শুরু হয়ে গেছে ন্যাকামি। বিরক্তিতে ভুরু কোঁচকাল কিশোর।

কিন্তু রবিন দিব্যি হেসে চলেছে। মেয়েটার কথার জবাব তার মত করেই দিচ্ছে।

মরুকগে! একটা লাউঞ্জ চেয়ারে বসে পড়ল কিশোর। চিকেন লারসেনকে দেখতে লাগল। নাইট ক্লাবের কমেডিয়ানের মত আচরণ করছেন বিশালদেহী মানুষটা। একটু পর পরই গমগম করে উঠছে তাঁর ভারি কণ্ঠ। হা হা করে হাসছেন। পুলের পানির ওপর দিয়ে যেন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে সে হাসি।

হঠাৎ আরেকটা কণ্ঠ কানে আসতেই ঝট করে সেদিকে ফিরল কিশোর। ঠিক তার পেছনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে লোকটা। সাদা স্যুট পরা একটা মানুষ, নিজের পরিচয় দিচ্ছে সোনালি চুলওয়ালা এক মহিলাকে। একটা বিজনেস কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আমি ফেলিক্স আরোলা।

নোরা অরলিজ, মহিলা নিজের নাম বলল।

ভালই হলো দেখা হয়েছে, লোকটা বলল।

যতই শুনছে ততই নিশ্চিত হচ্ছে কিশোর, এই কণ্ঠ সে শুনেছে। চিনতে পারছে।

কথায় কথায় নোরা জিজ্ঞেস করল, লোকটা কি করে।

মার্কেট রিসার্চ। কিছু বিশেষ খাবার চালানোর চেষ্টা করছি। খেয়ে দেখবেন? দেব? খুব ভাল লাগবে।

দিন। এতই যখন বলছেন। কাগজে মোড়ানো ছোট একটা ক্যান্ডি বের করে দিল আরোলা। ভাল করে দেখার জন্যে উঠে দাঁড়াল কিশোর।

অদ্ভুত নাম! মিরাকল টেস্ট! মোড়কে লেখা নাম পড়ে বলল মহিলা।

আমাদের কোম্পানির নতুন আবিষ্কার, আরোলা বলল হেসে।

মোড়ক খুলল নোরা। চকলেট রঙের একটুকরো মিষ্টি খাবার। তাতে মাখন মেশানো। দেখতে পাচ্ছে কিশোর।

কিন্তু ক্যান্ডি যে আমি খাই না? নোরা বলল।

ভয় নেই, অভয় দিয়ে বলল আরোলা। এতে ক্যালোরি বাড়বে না। জিরো ক্যালোরি। ওই যে মিরাকল কথাটা লেখা আছে না, খামোকা নয়। খেয়েই দেখুন।

মহিলার হাত ধরে প্রায় জোর করে ক্যান্ডিটা তার মুখে ঠেলে দিল আরোলা। খান। বুঝবেন, না খেলে কি স্বাদ মিস করতেন।

অবশেষে কামড় দিয়ে ছোট একটুকরো ভেঙে মুখে পুরল নোরা। বাহ! দারুণ তো!

খাবার লোভে নয়, কি এমন মজা সেটা বোঝার জন্যে জিভ প্রায় বেরিয়ে পড়ল কিশোরের। রহস্যময় লাগছে। ব্যাপারটা লক্ষ্য করল আরোলা। একটা বিজনেস কার্ড আর একটা ক্যান্ডি কিশোরের হাতেও গুঁজে দিল সে।

মোড়ক খুলে মুখে পুরে দিল কিশোর। মসৃণ, মাখন মাখন এক ধরনের স্বাদ।

কেমন লাগছে? ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল লোকটা।

তিন ধরনের স্বাদ একসঙ্গে, জবাব দিল কিশোর। চকলেট, মার্শম্যালো আর মিন্ট। সত্যিই ক্যালোরি নেই? কি করে সম্ভব?

সম্ভব। ফ্লেভারটাই আসল। মিরাকল টেস্ট কি আর সাধে বলা হয়েছে। ক্যালোরি ছাড়া ক্যান্ডি, সাংঘাতিক আবিষ্কার, কি বলো?

বড় বড় হয়ে গেছে কিশোরের চোখ। সত্যিই চমৎকার স্বাদ। তারপর বলছে ক্যালোরি ফ্রী। কি করে সম্ভব? এতই আগ্রহী হয়েছে সে, আরোলার কণ্ঠস্বরের কথাই ভুলে গেল ক্ষণিকের জন্যে।

ওর কোন সন্দেহ নেই, এই লোকই ফোন করেছিল হাসপাতালে। নার্সকে বিরক্ত করেছিল। বার বার জুনের খবর জানতে চেয়েছিল।

তোমার কার্ড নেই নিশ্চয়? কিশোরকে জিজ্ঞেস করল আরোলা। সমঝদার খানেওয়ালা তুমি, বুঝতে পারছি। তোমাকে টেস্ট করিয়ে ভাল করেছি। নাম ঠিকানা জানা থাকলে ভাল হত।

হেসে উঠল মহিলা। ওর আর কি কার্ড থাকবে? টিনএজার। হাই স্কুলে পড়ে বোধহয়। ব্যবসা-ট্যবসা কি আর করে?

কে বলেছে কার্ড নেই?—কথাটা প্রায় মুখে এসে গিয়েছিল কিশোরের। সামলে নিল সময়মত। আর যাকেই দিক, এই মুহূর্তে ফেলিক্স আরোলাকে তিন গোয়েন্দার কার্ড দেয়ার কোন ইচ্ছে তার নেই। সতর্ক হয়ে গেলে লোকটা তার কোন প্রশ্নেরই জবাব দেবে না। অনেকগুলো প্রশ্ন করার ইচ্ছে আছে কিশোরের। এই যেমন, কেন হাসপাতালে ফোন করেছিল? কেন রহস্যময় আচরণ করেছে ফোনে? জুন আর লারসেনের সঙ্গে তার কি সম্পর্ক?

এই সময় সেখানে এসে হাজির জুন। আরোলার হাত ধরল। আরেকটা ক্যান্ডি দিন। এত ভাল ভাবিইনি। একটার পর একটা যে খেতে চাইব, একথা কিন্তু একবারও বলেননি।

তাকে আরেকটা ক্যান্ডি দিল আরোলা। কিশোরকে দেখিয়ে বলল, ওরও ভাল লেগেছে। ও খুব সমঝদার, বুঝে গেছি…

থামুন থামুন, তাড়াতাড়ি হাত তুলল জুন। ওকে আপাতত পাবেন না। কাজে লাগাতে চান তো? হবে না। কারণ এখন ওকে আমি দখল করেছি। ওকে আর ওর দুই বন্ধুকে। ওরা তিন গোয়েন্দা। আমাকে সাহায্য করছে। অ্যাক্সিডেন্টের দিন কি কি ঘটেছিল আমার, বের করার চেষ্টা করছে।

ভেতরে ভেতরে চমকে গেলেও মুখটাকে স্বাভাবিক রাখল কিশোর। তার পরিচয় ফাঁস করে দিয়ে মস্ত ক্ষতি করেছে জুন।   তাই নাকি? কিশোরের দিকে তাকিয়ে চোখ সরু সরু হয়ে এল আরোলার। তোমাকে দেখে কিন্তু কিছুই মনে হয়নি।

মুসা আর রবিনকে এখন দরকার। জলদি। কোন ধরনের একটা সূত্র পেতে যাচ্ছে কিশোর, সেটা কি, এখনও বুঝতে পারছে না অবশ্য।

উঠে দাঁড়াল কিশোর। আবোলাকে এক্সকিউজ মি বলে রওনা হলো ভিড়ের ভেতর দিয়ে, দুই সহকারীর খোঁজে। মুরগী পুলের ঠোঁটের কাছে জটলা করছে কিছু লোক, তার মাঝখানে যেন কিং হয়েই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন চিকেন কিং লারসেন। সবার মাথার ওপর দিয়ে চোখে পড়ছে তার মাথা। পড়বেই। সাড়ে হয় ফুট লম্বা মানুষ খুব কমই আছে। চট করে চোখে পড়ার আরেকটা কারণ তার পোশাক। উজ্জ্বল কমলা রঙের জগিং স্যুট, বুকের কাছে এমব্রয়ডারি করে আঁকা রয়েছে একটা মুরগী।

বললাম তো জানি না, প্রায় চিৎকার করে কথা বলছেন লারসেন। ছাড়া পেলেই কেন যে রাস্তা পেরিয়ে আরেক দিকে দৌড় দিতে চায় মুরগীরা, এ রহস্য আমিও ভেদ করতে পারিনি, তারপর হা হাহ হা করে জোরে জোরে হাসলেন তিনি। কি মজা পেল শ্রোতারা ওরাই জানে, হো হো করে হাসতে লাগল।

মিস্টার চিকেন, একজন বলল। আচ্ছা বলুন তো, মাখন মাখানো মুরগীর মাংসের কেক নিয়ে কবে গোলমালটা হয়েছিল?

উনিশশো ছিয়াশিতে, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন লারসেন। ওরকম খাবার সহ্য করতে পারছিল না আসলে লোকে, বেশি রিচ…

ছিয়াশি নয়, পঁচাশি, ফস করে বলে বসল কিশোর। জবাবটা মুখে এসে গেছে, না বলে পারল না। আপনার ভুল হয়েছে, স্যার।

একসঙ্গে সবগুলো মুখ ঘুরে গেল কিশোরের দিকে। চিকেন লারসেন সহ।

আমার মনে আছে, আবার বলল কিশোর। সে বছরই আপনি একটা ফোয়ারা বানিয়েছিলেন। তার পাশে হোস পাইপের ব্যবস্থা করেছিলেন। আপনার রান্না করা মুরগী খাওয়ার পর বাচ্চারা যাতে পানি ছিটিয়ে মজা করতে পারে।

তুমি তো একটা জিনিয়াস হে! এগিয়ে এলেন লারসেন। ভালুকের থাবার মত বিশাল থাবায় চেপে ধরলেন কিশোরের হাত।

ঝাঁকাতে গিয়ে কিশোরের মনে হলো, ওই হাত নাড়ার সাধ্য তার নেই।

তোমার স্মৃতিশক্তি খুব ভাল, বুঝতে পারছি, লারসেন বললেন। এক কাজ করো না। আমি কি কি করেছি, সেই ইতিহাসগুলো তুমিই বলে দাও। সবাই শুনুক। আমিও শুনি। নিজের পুরানো দিনের কথা শুনতে ভালই লাগে মানুষের।

বেশ, ছোট্ট কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিল কিশোর। উনিশশো ছিয়াশি সালে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই অয়েলে চিনি মিশিয়েছিলেন আপনি। আপনার রেস্টুরেন্টের সামনে দিয়ে লম্বা একটা মুরগীর মিছিল পার করিয়েছিলেন। মুরগীগুলোর গলায় ঝুলছিল লাল রঙের মলাটের টুকরো। তাতে সোনালি অক্ষরে লেখা ছিলঃ চিকেন লারসেনের জন্যে আমি সব করতে রাজি।

নাহ, এই ছেলেটাকে আমি পালকপুত্র করে নেব! জনতার দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করলেন লারসেন। চেঁচিয়ে ডাকলেন মেয়েকে, জুন, তোর একটা নতুন ভাই জোগাড় করেছি!

মুরগীর ইতিহাস নিয়ে যখন আলোচনায় মগ্ন কিশোর আর লারসেন, মুসা আর ফারিহা তখন জুনের সঙ্গে আলাপ করছে। পুলের নিচু ডাইভিং বোর্ডের ওপাশে রয়েছে ওরা।

দারুণ পার্টি দিয়েছ, ফারিহা বলল। এত্তো লোক! কারা ওরা?

জানি না। কোথেকে দাওয়াত করে এনেছে বাবা, বাবাই জানে, জুতো খুলে পানিতে পা ডোবাল জুন। যাকে পায় তাকেই দাওয়াত করে বসে বাবা, কিংবা ফ্রী কুপন দিয়ে দেয়, স্বভাবই এরকম। আমি হয়েছি ঠিক উল্টো। ভালমত না জেনে না বুঝে কিছু করতে পারি না। এই স্মৃতিবিভ্রমের ব্যাপারটা খেপিয়ে দিচ্ছে আমাকে। কেবলই মনে হয়, কেন মনে করতে পারি না! লোকে এসে সান্ত্বনা দিয়ে বলেঃ তুমি ভাল হওয়ায় খুশি হয়েছি। যারা বলে তাদেরকে চিনতে পারি না। অসহ্য লাগতে থাকে!

লম্বা একটা লোককে দেখেছ কখনও, মনে পড়ে? মুসা জিজ্ঞেস করল। কুৎসিত চেহারা। আর্মি ক্যামোফ্লেজ জ্যাকেট পরে?

মাথা নাড়ল জুন। নাহ। কেন?

তোমাকে ওর কথা বলতেই ভুলে গেছি, ফারিহা বলল। আমরা ওর নাম রেখেছি মিস্টার এক্স। যে রাতে তোমার অ্যাক্সিডেন্ট হয়, সে রাতে হাসপাতালে তোমার ঘরে এসেছিল সে। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল, লোকটা তোমার অপরিচিত হওয়ার কারণ আছে। আর একটিবারও আসেনি সে এরপর।

ভুরু কুঁচকে গেল জুনের। চোখে ভয় দেখা দিল বলে মনে হলো মুসার।

থাক অসব কথা, হাত নেড়ে বলল সে। তোমার গাড়িটার কি অবস্থা, জুন? আমি ইঞ্জিনের কাজ জানি। চাইলে আমার সাহায্য নিতে পারো।

আমার গাড়ি? সোজা ওটাকে জাংকইয়ার্ডে পাঠিয়ে দিয়েছে বাবা। একবার চোখের দেখাও দেখতে দেয়নি আর আমাকে। তার ধারণা, অপয়া গাড়ি।

অ্যাক্সিডেন্টের দিন যা ঘটেছিল কিছুই মনে করতে পারছ না? ফারিহা জিজ্ঞেস করল।

না। দিন গেলে হয়তো মনে পড়বে। আগামী হপ্তায়ও পড়তে পারে।

সেদিন বিকেলে হেডকোয়ার্টারে ফিরে কিশোরের ওয়ার্কশপে আলোচনা করতে বসল তিন গোয়েন্দা। মুসা আর রবিন পিজ্জা চিবুচ্ছে। কিশোর এক টুকরো ফুটকেক নিয়ে এসেছে ফ্রিজ থেকে, মেরিচাচীর তৈরি। তাতে পেটের ক্ষতি হবে না।

হাসপাতালে ঘন ঘন ফোন না হয় করলই ফেলিক্স আরোলা, মুসা বলল একসময়। তাতে কি?

ওর বলার ধরনটাই পছন্দ হয় না আমার, সুইভেল চেয়ারে হেলান দিল কিশোর। সেজন্যেই সন্দেহটা জেগেছে।

বেশ, তার ব্যাপারে খোঁজখবর নেব আমরা, রবিন বলল। লম্বা চুমুক দিল। কোকাকোলার বোতলে। তো, কাল তাহলে যাচ্ছ চিকেন লারসেনের ওখানে?

যেতে তো বলেই দিয়েছে, কিশোর বলল। পালকপুত্রই প্রায় করে নিয়েছে পার্টিতে। আমিও যতটা সম্ভব খাতির জমিয়েছি। কায়দা করে অনুমতি আদায় করে নিয়েছি, তার রিসার্চ ল্যাব আর মেইন অফিসে ঢোকার।

কি পারে বলে মনে হয়? মুসার প্রশ্ন। বিষের বাক্স? আঙুলে লেগে থাকা মাখন চেটে খেতে লাগল সে।

কি পাব জানি না। সব নির্ভর করে কতটা গভীরে ঢোকার সুযোগ পাব আমরা, কতখানি দেখতে পারব, তার ওপর।

যেতে পারলে খুবই ভাল হত, রবিন আফসোস করল। কিন্তু…

পারছ না, এই তো? ট্যালেন্ট এজেন্সিতে যেতে হবে। তা যাও।

আজকাল আর আমাকে দিয়ে কিছু কাজ হচ্ছে না তিন গোয়েন্দার, জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলল রবিন। ভাবছি এজেন্সির চাকরিটা ছেড়েই দেব…

তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিয়ো না। দেখাই যাক না, কি হয়?

খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে এল তিনজনে। ওয়ার্কশপ বন্ধ করে দিল কিশোর। রবিন আর মুসাকে এগিয়ে দিতে চলল লোহার বিশাল গেটের দিকে। ওদের গাড়িগুলো পার্ক করা রয়েছে ওখানে। লালচে হয়ে এসেছে আকাশ। তবে বেশিক্ষণ সে রঙ থাকল না।

অ্যাই, দেখো, হাত তুলল মুসা। রাস্তার ওপারে! বুকের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো রঙের পোরশে কনভারটিবল। কম করে হলেও ষাট হাজার ডলার দাম। দুর্দান্ত জিনিস।

গাড়ি দেখছে না কিশোর, তাকিয়ে আছে লোকটার দিকে। বনেটের ওপর ঝুঁকে রয়েছে যে। শান্ত কণ্ঠে বলল, দেখেছ। আর্মি ক্যামোফ্লেজ জ্যাকেট। আমাদের মিস্টার এক্সও ওই পোশাকই পরেছিল…।

তাই তো! গাড়ির দিকেই নজর ছিল কেবল মুসার, আর কোনদিকে নয়। বরফের মত জমে গেল যেন সে। একটা মুহূর্ত। পরক্ষণেই দৌড় দিল সেদিকে।

পায়ের শব্দ শুনেই বোধহয় ফিরল লোকটা। মুসাকে দেখেই বনেট নামিয়ে গিয়ে টান দিয়ে খুলল ড্রাইভিং সীটের পাশের দরজা।

অ্যাই, শুনুন! দাঁড়ান! চেঁচিয়ে বলল মুসা।

কিশোর আর রবিনও ছুটতে শুরু করেছে তার পেছনে।

কিন্তু থামল না আর্মি জ্যাকেট পরা লোকটা। তাড়াতাড়ি গাড়িতে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে রওনা হয়ে গেল।

চোখের পলকে ঘুরে গেল মুসা। ছুটল তার নিজের গাড়ির দিকে। একটানে দরজা খুলে ভেতরে বসেই ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। সাঁই সাঁই করে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়িটাকে তুলে নিয়ে এল রাস্তায়। পিছু নিল পোরশের।

চল বেটা, জলদি কর, নিজের শিরোকোকে অনুরোধ করল মুসা। ওটাকে ধরা চাই। পালাতে না পারে।

কিন্তু মোড়ের কাছে পৌঁছে ব্রেক চেপেই বোকা হয়ে গেল সে। কিছুই হলো না। কাজ করছে না ব্রেক। প্যাডাল চেপে অযথাই পাম্প করে চলেছে সে, কিন্তু চাপ লাগছে না কোন কিছুতে।

পঞ্চাশ মাইল তুলে ফেলেছিল গতিবেগ। তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে গাড়ি সামনের চৌরাস্তার দিকে। ট্রাফিক পোস্টের লাল আলো জ্বলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *