০৫. পামেলার ঘুম ভাঙল খুব ভোরে

পামেলার ঘুম ভাঙল খুব ভোরে। চোখ মেলার পর বিস্ময়ের একটা ধাক্কা খেলো সে, ঝট করে বিছানায় উঠে বসল। কাল কি কাণ্ড করেছে মনে পড়ে গেল সব। স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে এসেছে সে, আশ্রয় নিয়েছে বহুকাল পর দেখা অন্য এক পুরুষের হোটেল স্যুইটে। তারপর পামেলা ভাবল, এ এমন এক পুরুষ, যার সঙ্গে এক ছাদের নিচে থাকা যায়, ভয় পেতে হয় না। কাল রাতে রানার বেডরুমে ঢুকে দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়েছিল ও, তালা দেয়নি। শোবার আগে কাপড়চোপড় ছেড়ে চাঁদরের তলায় ঢোকার সময়ও কোন ভয় বা দ্বিধা ছিল না মনে, জানত সে না ডাকলে ভুলেও বেডরুমে ঢুকবে না রানা। এতটা বিশ্বাস করা যায় এমন পুরুষ দুনিয়াতে খুব বেশি নেই।

সাত বছর আগে নিউ ইয়র্কে ওদের দেখা হয়েছিল। তখন সে ছিল মিস পামেলা ক্যাম্পবেল, ফ্যাশন জগতের নতুন স্টার। ওর বাবা ধনী স্টকব্রোকার ছিলেন, লেখাপড়া শেষ করে মেয়ে মডেলিং শুরু করায় তিনি কোন আপত্তি তোলেননি। রানার সঙ্গে ওর পরিচয় হয় একটা মডেল ওয়াচ অনুষ্ঠানে। রানার সঙ্গে অন্য একটা মেয়ে ছিল, সেটাকেই এক ধরনের সতর্ক-সঙ্কেত হিসেবে গণ্য করা উচিত ছিল পামেলার। কিন্তু না, শুধু চোখের দেখায় মাথা ঘুরে যায় ওর। তারপর যেচে পড়ে কথা বলল, আর সেই সঙ্গে মজে গেল। তখন কিন্তু ব্যাপারটাকে একতরফা বলেও মনে। হয়নি। রানাও পামেলার রূপ-সৌন্দর্য আর ভাবাবেগ লক্ষ্য করে মুগ্ধ হয়ে পড়ে, আরও বেশি প্রভাবিত হয় মেয়েটা নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করছে দেখে। বিদায় নেয়ার সময় আবার দেখা হবে কিনা সে আভাস কেউ কাউকে দেয়নি, তবে রানা পরদিনই ওকে ফোন করে। এরপর দুটো মাস রোজ তারা এক হয়েছে, এখানে-সেখানে বেড়িয়েছে, দামী রেস্তোরায় খেয়েছে, পরস্পরকে এটাসেটা প্রেজেন্ট করেছে। রোমান্স যখন তুঙ্গে, পামেলা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ওদের বিয়ে হবে। রানাকে পাগলের মত ভালবাসে ও, রানাকে ছাড়া বাচবে না, এ-সব অনুভূতির কথা বান্ধবীদের বলতে শুরু করল। ব্যাপারটা টের পেয়ে যায় রানা, সাবধানও করে দেয়, কিন্তু এ-সব রানার রসিকতা ভেবে কোন গুরুত্বই দেয়নি। তারপর একদিন কোন ব্যাখ্যা না দিয়েই গায়েব হয়ে যায় রানা। একেবারে কোন কারণ ছাড়াই, তা হয়তো নয়। কোন ফ্যাশন ম্যাগাজিনে পামেলার সঙ্গে রানার ছবি ছাপা যাবে না, এ-কথা বার বার মনে করিয়ে দেয়া সত্ত্বেও খেয়াল বশত একটা ম্যাগাজিনে নিজেদের একটা ছবি পাঠিয়ে দেয় পামেলা। পরদিনই ওর জীবন থেকে হারিয়ে গেল রানা। পামেলা ভেবেছিল রানাকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবে না, কিন্তু কাল আবার দেখা হতে উপলব্ধি করে, তা সত্যি নয়।

রানা অদৃশ্য হবার কয়েক বছর পর ম্যাডকের সঙ্গে পরিচয় হয় পামেলার। সেটা ছিল এক ককটেল পার্টি। তখনই একজন সেলিব্রিটি হয়ে উঠেছে ম্যাডক, পৃথিবী নামক গ্রহের অন্যতম এক ধনী ব্যক্তি, বয়েস একটু বেশি হলেও দেখতে অত্যন্ত সুদর্শন ও সুপুরুক্ষ। প্রথমে ব্যাপারটা ছিল এক তরফা ভালবাসা, পরে পামেলাও তাকে ভালবাসে। তিন মাস পর তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর মডেলিং ছেড়ে দেয় পামেলা।

বিছানা থেকে নেমে কাপড় পরল পামেলা, তারপর দরজা খুলে সিটিংরুমে ঢুকল। শোল্ডার হোলষ্টার পরেছে রানা, পিস্তলটা হাতে নিয়ে মেকানিজম চেক করছে। এক্সট্রা ক্লিপগুলো জ্যাকেটের পকেটে  ঢুকিয়ে রাখল। খুব কম ব্যাংকারই সঙ্গে অস্ত্র রাখে, তাই না? রানার পিছনে এসে দাঁড়াল পামেলা।

ব্যাংকিংও আজকাল বিপজ্জনক পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে, বলল রানা, ঘুরে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসল।

আচ্ছা বলতে পারো, শুধু তোমার মত পুরুষরা কেন আমাকে আকৃষ্ট করে? নিন্দা করছি না, তবে কথাটা সত্যি–তুমি অনেকটাই আমার স্বামীর মত–নির্লিপ্ত, ঠাণ্ডা, খানিকটা নিষ্ঠুর, সব সময় মনে হয় অনেক দূরে আছ, কেমন যেন রহস্যময়।

হ্যাঁ, কথাটা সত্যি।

এত সকাল সকাল কোথায় যাচ্ছ বলো তো?

তোমার স্বামীর কমপ্লেক্সটা ঘুরেফিরে দেখতে হবে। খবরের কাগজের অফিসে সকালের দিকে সবাই খুব ব্যস্ত থাকে, এটাই আদর্শ সময়।

ওখানকার সিকিউরিটি সম্পর্কে তোমার কোন ধারণা আছে? তোমাকে ওরা খুঁজছে, রানা।

তবু, কাজটা না করলেও নয়।

তুমি আমার মনে অপরাধবোধ জাগাতে চেষ্টা করছ, অভিযোগ করল পামেলা। আমাকে দিয়ে এমন কিছু বলাতে চাইছ  যা বললে তোমার খুন হবার আশঙ্কা বাড়বে।

এ তোমার ভুল ধারণা। তবে যেতে আমাকে হবেই।

নিউজরূমের ঠিক বাইরে লবিটার কথা মনে আছে? বড় একটা স্যাটেলাইট আছে যেখানে?

আছে।

ওটার পিছনে অফিস ছিল, কিন্তু পাচিল তুলে দিয়েছে ওরা। কোন ধরনের ল্যাব বা অন্য কিছু আছে ওখানে। মানে সন্দেহ করছি আর কি। তবে কিভাবে ওরা ভেতরে ঢোকে জানি না। দুই বিল্ডিঙের মাঝখানে প্ল্যান্ট মেইনটেন্যান্স লেভেল আছে, যতদূর মনে পড়ছে অফিসটা ছিল সরাসরি তার নিচে। অফিস আর ওই লেভেলের মাঝখানে সিড়ি থাকার কথা।

ধন্যবাদ, পামেলা।

এগিয়ে এসে রানার কপালে হালকা চুমো খেলো পামেলা। তারপর দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল, তোমাকে আমি দেবতা হিসেবে পেয়েছি, কিন্তু চেয়েছিলাম প্রেমিক হিসেবে–দুঃখটা রয়েই গেল।

রানা কথা বলছে না।

চেষ্টা করলেও আমি বোধহয় তোমার যাওয়াটা বন্ধ করতে পারি না, না?

রানা জবাব দিল, চিন্তা কোরো না। কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসব।

ঘুরে দরজার দিকে এগোল ও। রানা চলে যাবার পর দরজা বন্ধ করে দিল পামেলা। বিড়বিড় করে আপন মনে বলল, সাত বছর আগেও এই একই কথা বলেছিলে তুমি।

এফএমজিএন কমপ্লেক্সে সিকিউরিটি আজ খুব কড়া। নতুন। হেডকোয়ার্টারে জয়েন করেছে কর্মচারীরা, খবর সংগ্রহ ও সাজানোর কাজে ব্যস্ত সবাই, প্রেস সেকশনে প্রথম সংস্করণ ছাপার কাজও শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। এখনও প্রতি মুহুর্তে নতুন নতুন খবর আসছে স্যাটেলাইট থেকে, সবগুলো মনিটর জ্যান্ত। অন্যান্য দিনের সঙ্গে পার্থক্য শুধু এইটুকু যে আজ চারদিকে সিকিউরিটি গার্ড গিজগিজ করছে। কর্মচারীদের মধ্যে একটা কথা ছড়িয়ে পড়েছে, কাল সন্ধ্যার ফলস অ্যালার্ম ছিল ম্যাডক ফাউলারের বিরুদ্ধে এক ধরনের স্যাবোটাজ।

বিল্ডিংগুলোর প্রতিটি তলায় টহল দিচ্ছে গার্ডরা, তবে কেউ তারা একবারও ভাবেনি যে ছাদ থেকে অনধিকার প্রবেশের ঘটনা ঘটতে পারে। প্রিন্টিং রুম থেকে বেরিয়ে দুই বিল্ডিঙের মাঝখানের সেতুতে দাঁড়াল দুজন গার্ড, জানে না তাদের মাথার ওপর স্কাইলাইটের পাশে একটা ছায়ামূর্তি লুকিয়ে আছে। একজন গার্ড সিগারেট ধরাবার জন্যে থামল, খেয়াল করল না, ছাদের গম্বুজ আকৃতির চূড়া থেকে নিঃশব্দে সরে গেল মাসুদ রানা।

ছাদে উঠতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি রানাকে। তিন চারটে বিল্ডিং নিয়ে কমপ্লেক্সটাতার মধ্যে দুটো বিল্ডিং এখনও নির্মাণাধীন। সকাল সকাল পৌছেছে রানা, শ্রমিকদের জন্যে নির্ধারিত লিফটে চড়ার সময় কেউ ওকে দেখতে পায়নি। লিফটে ওঠার আগে লোহার একটা হ্যাট তুলে নিয়ে মাথায় পরতে ভোলেনি, কেউ দেখলে যাতে ফোরম্যান বলে মনে করে। লিফট ওকে একটা বিল্ডিঙের টপ ফ্লোরে পৌছে দেয়, সেখান থেকে। একটা ঝুল-বারান্দায় চলে আসে ও, তারপর মই বেয়ে উঠে পড়ে পাশের বিল্ডিঙের ছাদে। আরেকটা মই বেয়ে স্কাইলাইট থেকে ছাদের নিচে প্ল্যান্ট ও মেইনটেন্যান্স এরিয়ায় চলে এল, পাশ কাটাল একটা ঢাকা হ্যাচকে। হ্যাচের কন্ট্রোল তালা দেয়া আলাদা একটা ঢাকনির ভেতর। পকেট থেকে সেল ফোন বের করল রানা, অ্যান্টেনাটা লম্বা করল টেনে। অ্যান্টেনার ডগায় যে ডিভাইসটা আছে সেটাকে লকপিক হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। ঢাকনি খুলে হ্যাচের কন্ট্রোল উন্মুক্ত করতে মাত্র সাত সেকেন্ড সময় লাগল। সবুজ একটা বোতামে চাপ দিতেই ঝাকি খেয়ে খুলে গেল হ্যাচ। এক প্রস্থ সিঁড়ি দেখা গেল, নিচের দিকে নেমে গেছে। পামেলার স্মৃতিশক্তি খুবই ভাল।

সিড়ি বেয়ে একটা ল্যাবরেটরিতে নেমে এল রানা। ভেতরে ড্রাফটিং ও কমপিউটর টেবিল রয়েছে। সবগুলো খালি। কামরার মাঝখানে ফাউলারের ডুপ্লিকেট স্যাটেলাইট দেখা গেল। আরেক দরজা দিয়ে পাশের অফিসে যাওয়া যায়।

চারদিকে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিয়ে স্যাটেলাইটটার দিকে মনোযোগ দিল রানা। এটা নিশ্চয়ই টেস্ট মডেল, পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্যে ব্যবহার করা হয়। সার্কিট প্যানেল দেখতে যাবে, পায়ের আওয়াজ শুনতে পেয়ে স্যাটেলাইটের পিছনে লুকিয়ে পড়তে হলো। প্রাইভেট অফিসের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল  কেউ।

খায়রুল কবির, সঙ্গে তিনজন বডিগার্ড। এই তিনজনকেও আফগানিস্তানে দেখেছে রানা, কবিরের সঙ্গে ছিল। স্যাটেলাইটের সোলার প্যানেলের ফাঁক দিয়ে ওদেরকে দেখতে পাচ্ছে ও। এটার কাজ শেষ হয়েছে, কাজেই লঞ্চ সাইটে পাঠিয়ে দিতে হবে, লোকগুলোকে বলল কবির। ব্যাপারটা বুঝি না, অফিসে কোন খাবার নেই কেন? আমি নাস্তা খেতে চললাম। ল্যাবরেটরির পিছন দিকে ভারী একটা ইস্পাতের দরজা রয়েছে, সেটা খুলে ভেতরে ঢুকল সে, পিছু নিল বাকি তিনজন।

স্যাটেলাইটের পিছন থেকে বেরিয়ে প্রাইভেট অফিসের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল রানা। দরজাটা সুরক্ষিত করা হয়েছে। একটা ইলেকট্রনিক কার্ড লক-এর সাহায্যে। সেল ফোনটা আবার বের করল, লকের ইলেকট্রিক আর্ক-এ স্টান গান টার্মিনাল ঠেকিয়ে চাপ দিল বোতামে। জোরাল একটা আওয়াজ হলো, লকের ইন্ডিকেটর  মুহুর্তের জন্যে সবুজ আলো ছড়াল, শেষ হয়ে গেল পুড়ে। কবাটে কাধ ঠেকিয়ে ঠেলা দিতে খুলে গেল দরজা।

কবিরের প্রাইভেট অফিস খালি বললেই হয়। তবে রিফিউজ বিন ভর্তি হয়ে আছে সফট ড্রিঙ্কের ক্যান আর পটেটো চিপস-এর খালি ব্যাগে। ডেস্কের ওপর একটা কমপিউটর দেখা গেল, দেয়াল ঘেষে কয়েকটা ফাইলিং কেবিনেটও রয়েছে। একটা দেরাজ খুলে ভেতরে ডিস্ক আর প্রোগ্রাম দেখল রানা। আরেকটা দেরাজে পাওয়া গেল কয়েক ডজন স্যাটেলাইট রেফারেন্স ম্যাটেরিয়াল, মোটা টেকনিকাল বই-পত্র; বইগুলো গ্লোবাল পজিশনিং, রেডার ও কমপজিট রেজিন টেকনলজি সম্পর্কিত। নাহু, ওকে আগ্রহী করার মত কিছু নেই।

তারপর দেয়ালে লটকানো একটা ছবির ওপর চোখ পড়ল। ফ্রেমটা ইস্পাতের, আকারে খুব বড়–ফাউলারের একটা স্যাটেলাইটের ছবি, মহাশূন্যে রয়েছে। রানার তীক্ষ দৃষ্টিতে অদ্ভুত একটা খুঁত ধরা পড়ল। ফ্রেমের একটা পাশ অন্য পাশের চেয়ে সামান্য একটু বেশি পুরু। কিনারায় আঙুল বোলাল ও, লুকানো ক্যাচটা স্পর্শ করল। টান দিতেই খুলে গেল ফ্রেমটা।

ফ্রেমের পিছনে একটা ওয়াল সেফ রয়েছে, থাম প্রিন্ট স্ক্যানার-এর সাহায্যে লক করা। রানা ধারণা করল, কবিরের ফিঙ্গার প্রিন্ট ছাড়া লকটা খোলা যাবে না।

সেল ফোনের সামনের অংশে লেযার আছে, সেটা অ্যাকটিভেট করল রানা। সেফের গায়ে একটা জানালা আছে, সেফ খোলার সময় ওখানে আঙুল ছোয়ানো হয়। জানালা স্ক্যান করার জন্যে লেযার ব্যবহার করল ও। দুই সেকেন্ড পরই কবিরের আঙুলের ছাপ ফুটে উঠল সেল ফোনের ডাটা স্ক্রীনে। ফোনটা এবার উল্টো করে থাম প্রিন্ট উইন্ডোয় ঠেকাল রানা, সঙ্গে সঙ্গে ক্লিক শব্দে খুলে গেল সেফ। ফোনটা পকেটে রেখে দিয়ে সেফের ভেতরে তাকাল ও।

আফগানিস্তান থেকে কেনা কবিরের লাল বাক্সটা দেখতে পেয়ে বের করে আনল রানা। কাজ হয়েছে! লাল বাক্সের ভেতর হারানো অ্যাকসেস ডিভাইসটা রয়েছে। তাড়াতাড়ি বাক্সটা বন্ধ করল, ভরে ফেলল পকেটে। সেফ বন্ধ করে বেরিয়ে এল প্রাইভেট অফিস থেকে।

ইস্পাতের ভারী দরজার দিকে এগোল রানা। এই পথে কমপ্লেক্সের বাকি অংশে যাওয়া যায়। দরজার কবাটে কান ঠেকিয়ে অপেক্ষা করল। কোন শব্দ হচ্ছে না। সাবধানে খুলল সেটা।

পা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো ড্রেস পরা লীনা ওয়াং ঠিক বাইরেই দাঁড়িয়ে। বাইরে থেকে দরজার তালায় কিছু একটা ঢুকিয়েছিল সে, অর্থাৎ দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার ইচ্ছে ছিল।

হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে উঠল। অমনি চারদিক থেকে হৈ-চৈ শুরু করল টহলরত গার্ডরা।

সর্বনাশ করেছেন!আঁতকে উঠল রানা। এখন কি হবে?

আমার কথা ভাববেন না, নিজের জান বাঁচান! লাফ দিয়ে পিছু হটল লীনা, ডুব দিল সিড়ির নিচে। এরইমধ্যে করিডরে বেরিয়ে এসেছে গার্ডরা।

ইস্পাতের দরজা বন্ধ করল রানা, জায়গা মত বসিয়ে দিল বোল্টটা। ধাতব আওয়াজ তখনও বাতাসে মিলিয়ে যায়নি, এক ঝাক বুলেট এসে লাগল কবাটে, রানার কানে তালা লেগে গেল। ধোয়ার পর মাথার সব চুল তোয়ালেতে জড়াল পামেলা, তারপর হোটেল থেকে পাওয়া ঢোলা ও নরম একটা রোব পরল। স্বামীর সামনে রানাকে চড় মেরেছে, সেজন্যে এখন অনুতপ্ত ও। ওর এই আচরণ স্বামীকে উত্তেজিত ও সন্দেহপ্রবণ করে তোলার জন্যে যথেষ্ট ছিল। সে যাই হোক, ওই লোকের ঘর করা তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। রানা ফিরে আসুক, ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে সে। তারপর বোনের কাছে নিউইয়র্কে চলে যাবে।

সিটিংক্রমে ঢুকে একটা ম্যাগাজিন নিয়ে সোফায় বসল পামেলা। এক মিনিট পরই মৃদু নক হলো দরজায়। হাসল ও। সোফা ছেড়ে দরজা খোলার সময় বলল, এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলে…

হৃৎপিণ্ড যেন গলায় উঠে। পাশে মেনাচিমকে নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে ম্যাডক ফাউলার। ওদের মুখের ওপর কবাট বন্ধ করতে চাইল পামেলা। কিন্তু পারল না, ভেতরে একটা পা গলিয়ে দিয়েছে মেনাচিম। কবাট পুরোপুরি খুলে ভেতরে ঢুকল সে, তার পিছু নিয়ে ফাউলার। ফাউলারই ধাক্কা দিয়ে স্ত্রীকে মেঝেতে ফেলে দিল। ঘুরে দরজাটা বন্ধ করে দিল মেনাচিম। এগিয়ে এল ফাউলার, পামেলার গলাটা এক হাতে ধরে দাড় করাল। পামেলার পিছনে চলে এল মেনাচিম, ওর হাত দুটো পিছমোড়া করে ধরে রাখল। স্ত্রীর গলা ছেড়ে দিয়ে কষে দুটো চড় মারল ফাউলার।

ম্যাডক, প্লীজ!আতঙ্কে নীল হয়ে গেছে পামেলা। তুমি বুঝতে পারছ না.. তুমি যা ভাবছ তা নয়…

নয়? তাহলে বলো আসল ব্যাপারটা কি?

কাল রাতে তুমি আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ। যাবার আর কোন জায়গা নেই বলে এখানে আমি পালিয়ে এসেছি…

কাল রাতে কি বলেছিলাম তোমাকে? কোন্ জিনিসকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই আমি?

বহুকষ্টে একটা ঢোক গিলল পামেলা।

আনুগত্য ডার্লিং, তিক্ত হেসে বলল ফাউলার। আনুগত্য।

সিড়ির দিকে ছুটছে রানা। ওর পিছনে ইস্পাতের দরজা ভেঙে পড়ল। গুলি ছুড়তে ছুড়তে কামরার ভেতর ঢুকে পড়ল গার্ডরা। পা দিয়ে স্যাটেলাইটটা সরিয়ে ওদের পথে একটা বাধা তৈরি করল রানা।  সিড়ি বেয়ে উঠে এল ছাদে, ঢাকনিটা টেনে এনে হ্যাচের মুখ বন্ধ করে দিল। ছাদ ধরে ছুটছে ও, যাচ্ছে মইটার দিকে। তারপর দেখল, মইয়ের অপরপ্রান্তে ওর জন্যে একজন গার্ড অপেক্ষা করছে। গুলি করল লোকটা। বাধ্য হয়ে পিছিয়ে আসতে হলো ওকে, পিঠ ঠেকল ইমার্জেন্সি ফায়ার ডোরের গায়ে। আর কোন উপায় নেই দেখে লাথি মেরে খুলে ফেলল দরজাটা, স্যাৎ করে ঢুকে পড়ল ভেতরে।

একটা হলওয়েতে রয়েছে রানা। এখান থেকে দুই বিল্ডিঙের মাঝখানের খোলা হলরুমে যাওয়া যায়। ছুটল ও, টপ লেভেল ব্রিজে উঠে এল। অপরপ্রান্তে লিনাকে দেখা গেল, দেয়ালের দিকে পিঠ, চেষ্টা করছে কারও চোখে ধরা না পড়ার। মেয়েটার চোখের দৃষ্টিই রানাকে বলে দিল, বিপদের মধ্যে আছে সে। অকস্মাৎ নিচের তলায় দুজন গার্ডকে দেখতে পেয়ে লাফ দিয়ে সরে গেল রানা। পরক্ষণে এক ঝাক বুলেট এসে লাগল রেইলিঙের গায়ে।

গার্ডদের দৃষ্টি রানার ওপর, এই ফাঁকে কোমরে আটকানো ব্যান্ড থেকে একটা তার খুলল লীনা। রেইলিঙে আটকাল সেটা তারপর রেইলিং টপকে লাফ দিল নিচে। শুরু হলো পতন, কোমরের ব্যান্ড থেকে লম্বা হচ্ছে তার। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকল রানা, চোখাচোখি হতে হাত নাড়ল লীনা। গার্ডদের পিছনে ধীর গতিতে নামল সে, পরমুহুর্তে একটা প্যাসেজে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। এখনও গার্ডরা রানার দিকে গুলি করছে।

ব্ৰিজ ধরে ছুটল রানা। বুলেটগুলো পিছু নিল ওর। দৈত্যাকার প্রেস রুমে ঢুকে পড়ল। বিকট শব্দে মেশিন চলছে, রানার জন্যে সুবিধেই হলো। কয়েকজন গার্ড পিছু ধাওয়া করল, লম্বা ঝুল-বারান্দায় বেরিয়ে এসে ছুটছে ও। শেষ প্রান্তের একটা দরজা খুলে গেল, ঝুল-বারান্দায় বেরিয়ে এল তিনজন গার্ড। আর কোন উপায় নেই, রেইলিঙে উঠে পড়ল রানা, লাফ দিল নিচে, পড়ল প্রকাণ্ড এক ওভারহেড ক্রেনের মাথায়।

ক্রেনের একটা সচল বাহুর ওপর পড়েছে রানা, ওকে নিয়ে নিচে নেমে এল সেটা। নিচে ছাপাখানা, মেশিনের বিকট আওয়াজে কানের পর্দা মনে হলো ফেটে যাবে। এক মেশিন থেকে আরেক মেশিনে কাগজ টুকছে, সেই কাগজের নিচে দিয়ে ছুটল রানা, প্ৰকাণ্ড এক গেট দেখতে পেয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে। জায়গাটা বিশাল হ্যাঙ্গারের মত, তবে ভেতরে প্লেন নয়, রোল করা কাগজ সাজানো রয়েছে। প্রতিটি কাগজের রোল এক টন ওজন, একটার ওপর একটা সাজানো। ছোট আকৃতির কয়েকটা ট্রাকও আছে, একটা করে রোল নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। হ্যাঙ্গারের ভেতর ঢুকে ছুটে আসছে গার্ডরা। রানাকে দেখতে পেয়ে গুলি করল। ট্রাক থামিয়ে নিচে লাফিয়ে পড়ল কয়েকজন ড্রাইভার, যে যেদিকে পারল ছুটছে। কোণঠাসা হয়ে পড়েছে রানা, অনেকটা বাধ্য হয়েই কাছাকাছি একটা ট্রাকের ক্যাবে উঠে পড়ল। এই সময় একটা বুদ্ধি ঢুকল মাথায়। ট্রাক নিয়ে প্রথমে একশো আশি ডিগ্রী ঘূরল, তারপর পিছু হটল বেশ খানিকটা। এরপর সামনে ছোটাল ট্রাক, পাহাড়ের মত উঁচু করে সাজানো রোলগুলোর গায়ে ধাক্কা মারবে। ট্রাকের পিছনে এক টনের একটা রোল আছে, অকস্মাৎ ব্রেক করায় ক্যাবের ওপর দিয়ে লাফ দিল সেটা, ধাক্কা খেলো রোলগুলোর স্তুপে। সাজানো স্তুপটা ভেঙে গেল, চূড়া থেকে খসে পড়ছে এক টনী রোলগুলো।

স্তুপের পিছনে ছিল গার্ডরা, জান বাঁচানোর জন্যে ঝেড়ে দৌড় দিল তারা। কামান দাগার মত বিকট আওয়াজ তুলে একটা করে রোল মেঝেতে পড়ছে, পড়েই গড়াতে শুরু করছে। একটা রোল চিড়ে চ্যাপ্টা করে দিল একজন গার্ডকে। ওই একই রোল ধাক্ক খেলো আরেকটা সিলিং ছোয়া কাগজের স্তুপে।

দ্বিতীয় স্তুপটা সরাসরি রানার ওপর নেমে আসছে। ট্রাক নিয়ে সরে যাবার চেষ্টা করল রানা, কিন্তু সময়ে কুলাবে না বুঝতে পেরে ক্যাব থেকে লাফ দিল ও, ছুটে চলে এল একটা পিলারের আড়ালে। খালি একটা ট্রাক, গতি খুব বেশি, গেটের দিকে ছুটছে, দেখতে পেয়ে ওটার পিছনের কিনারা ধরে ঝুলে পড়ল রানা। ট্রাকটা বেরিয়ে এল লোডিং ডকে, তারপরও থামল না, রানাকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে কমপ্লেক্সের বাইরে। রাস্তার ওপার থেকে বিল্ডিঙের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিল লীনা ওয়াং, রানার পলায়ন চাক্ষুষ করে আপনমনে হাসল। ছুটোছুটি আর গোলযোগের মাঝখানে কারও চোখে ধরা না পড়েই মাত্র এক মিনিট আগে বেরিয়ে এসেছে সে।

হামবুর্গে লীনার কাজ শেষ হয়েছে। চুরি যাওয়া রেডার ডিভাইসটা সে উদ্ধার করতে পারেনি বটে, তবে এখন সে জানে কিভাবে ওটা ব্যবহার করা হয়েছে। অবশ্য ফাউলার আর এফএমজিএন-এর দিকে আঙুল তাক করার আগে আরও প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে তাকে।

নিজের হোটেলে ফিরে এসে বেইজিঙে, নিজে বসের কাছে রিপোর্ট করল লীনা। বস তাকে গোপন একটা তথ্য দিলেন, যা শুধু চীনা সামরিক বাহিনী জানে। সময় খুবই কম হাতে, কারণ ব্রিটিশ যুদ্ধ জাহাজের একটা বহর চীনা উপকূলের দিকে ছুটে আসছে।

নিজের জিনিস-পত্র গুছিয়ে নিয়ে একটা ট্যাক্সি ডাকল লীনা। এয়ারপোর্টে এসে চড়ে বসল একটা প্লেনে। প্লেনটা দূর-প্রাচ্যের দিকে যাবে। প্লেনে বসে রানার কথা ভাবল লীনা। একজন চীনা হিসেবে সে বিশ্বাস করে, মানুষের নিয়তি পূর্বনির্ধারিত। কোন কারণ নেই, তারপরও অনুভূতিটা প্রবল, ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে আবার তার দেখা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *