পরদিন সকালে বেলা করে ঘুম ভাঙল কিশোরের। জানালা দিয়ে বাইরের উজ্জ্বল রোদের দিকে চেয়ে গত রাতের কথা মনে পড়ল, সব কিছু এখন হাস্যকর মনে হলো। কাপড় পরে নেমে পড়ল, এল নিচে রান্নাঘরে। মুসা আর রবিন খাচ্ছে। টেবিলের এক মাথায় বসে আছেন উইলসন। ভিকি গরম কেক নামিয়ে বেড়ে দিচ্ছে টেবিলে।

কিশোরকে দেখে হাত তুলল মুসা, এসেছ। ডাকতে যাচ্ছিলাম। জিনা গেছে ঘোড়া দৌড়াতে। কয়েক কামড় কেক চিবিয়ে নিয়ে বলল কিশোর।

রুচি বদল হবে, বলল কিশোর।

ইয়ার্ডে মালপত্র গোছানো একঘেয়ে হয়ে গিয়েছিল।

ও। গাছকাটা মনে হয় ভালই লাগবে তোমাদের, হাসলেন উইলসন। আমার তো লাগে। এর মাঝে শিল্প আছে, অনেকটা নিজ হাতে গড়ার মত মজা। বেয়াড়া রকম বেড়ে ওঠা গাছকে হেঁটে নিজের মত সাজিয়ে নেয়া। দিনটা ভালই কাটবে তোমাদের। কিন্তু পয়লা দিনেই বেশি খাটাখাটনি কোরো না। ঘণ্টাখানেক পর পর কিছুক্ষণ করে জিরিয়ে নিও।

নাস্তা সেরে গোলাঘর থেকে তিনটে ছুরি নিয়ে এলেন উইলসন। ছেলেদেরকে নিয়ে খেতে চললেন।

র‍্যাঞ্চ হাউস আর পথের মাঝের একটা খেতে এল ওরা। ছুরি দিয়ে কুপিয়ে কেটে দেখিয়ে দিলেন উইলসন, কিভাবে কতখানি হাঁটতে হয়। বললেন, গাছের বেশি কাছে যেও না। দূরে দাঁড়িয়ে পাশ থেকে কোপ দেবে, যাতে পায়ে এসে না লাগে।

কোপাতে শুরু করল তিন কিশোর। দাঁড়িয়ে থেকে দেখলেন খানিকক্ষণ উইলসন। যখন বুঝলেন, ছেলেরা শিখে গেছে, বাড়িতে ফিরে গেলেন। কয়েক মিনিট পর ভিকিকে নিয়ে স্টেশন ওয়াগনে করে চলে গেলেন কোথাও।

নীরবে কাজ করে চলল তিন গোয়েন্দা। ঘোড়ার খুরের শব্দে চোখ তুলে তাকাল। ম্যাকআরথারের সীমানার ওদিক থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে জিনা। খোয়াড়ে ঢুকল, অ্যাপলুসাটাকে ওখানে রেখে চলে গেল বাড়ির ভেতরে।

খানিক পরে এঞ্জিনের শব্দ কানে এল ছেলেদের। গোলাবাড়ির দিকে চেয়ে বলে উঠল মুসা, খাইছে? কাণ্ড দেখো।

পিকআপের ড্রাইভিং সীটে দেখা যাচ্ছে জিনাকে। গিয়ার দেয়ার শব্দ হলে। এলোমেলো ভাবে দুলতে দুলতে পথ ধরে ছুটে এল গাড়িটা।

চেঁচিয়ে বলল মুসা, জিনা, পাগল হয়ে গেছ নাকি! করছ কি?

ট্রাকের নাক সোজা রাখতে পারছে না জিনা.। ছুটে এল ছেলেদের দিকে, শেষ মুহূর্তে ব্রেক প্যাডালে পা রেখে প্রায় দাঁড়িয়ে গেল। জোর কাশি দিয়ে থেমে গেল এঞ্জিন। পারছি, শোনা গেল জিনার আনন্দিত কণ্ঠ, চালাতে পারছি। খোলা জায়গায় ঠিকই পারব।

চালাতে হলে আরও বড় হওয়া লাগবে তোমার, রবিন বলল।

লাইসেন্স পেতে বড় হওয়া লাগবে, জিনা জবাব দিল। কিন্তু সীটে বসে প্যাডাল যখন ছুঁতে পারছি, চালাতেও পারব।

আবার এঞ্জিন স্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করল, পারল না। হুঁ, গ্র্যাকটিস দরকার।

তোমার চাচা জানেন? জিজ্ঞেস করল মুসা।

নিশ্চই। চাচা বলে বড়রা যা করে, ছোটদেরও তা করতে পারা উচিত। আমার কোন কাজে চাচা বাধা দেয় না।

সেজন্যেই বুঝি চাচা আর ভিকি বেরিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলে? ওরা থাকতে সাহস পাওনি?

জানালা দিয়ে মুখ বের করল জিনা, চোখ উজ্জ্বল। মুসার কথার জবাব এড়িয়ে গিয়ে বলল, দুজনে বাজারে গেছে, ফিরতে দেরি হবে। ম্যাকআরথারও বাড়ি নেই, কুত্তাটাকে বেঁধে রেখে গেছে। চলো, এই সুযোগ।

খনিতে তো? একাই যাও, আমরা এর মাঝে নেই।

ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে চুপচাপ ভাবছে কিশোর। গতরাতে গুলির শব্দ কোথা থেকে এসেছিল, সে কথা।

ভীতুর ডিম, মুসার দিকে চেয়ে মুখ বাঁকাল জিনা। থাকো তোমরা, আমি চললাম। আবার চেষ্টা করল সে, এবার স্টার্ট নিল এঞ্জিন।

রাখো রাখো, হাত তুলল কিশোর, আমি যাব।

গুড, হাসল জিনা। ছুরিটা নিয়ে এসো। ম্যাকআরথার দেখে ফেললে তাড়াতাড়ি খেতে নেমে গাছ কাটার ভান করবে। কি, তোমরা দুজন যাবে না?

কিশোরের দিকে তাকাল মুসা, ভাবল কে জানে, কিন্তু আর আপত্তি না করে এসে উঠল গাড়িতে। রবিনও উঠল।

কাঁচা হাতে গিয়ার দিল জিনা। প্রচণ্ড প্রতিবাদ জানাল এঞ্জিন, ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল গাড়ি। এবড়োখেবড়ো মাঠের ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে ছুটে চলল ম্যাকআরথারের সীমানার দিকে।

দারুণ একখান গাড়ি, উল্লাসে ফেটে পড়ছে জিনা। গাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে বাকা হচ্ছে, সোজা হচ্ছে, এদিকে কাত হচ্ছে, ওদিকে কাত হচ্ছে। এরই মাঝে এক ফাঁকে মুসার দিকে চেয়ে বলল, খুব সহজ, বুঝলে? কোন ব্যাপারই না, শুধু গিয়ারগুলো ঠিকমত ফেলতে পারলেই হলো…

তা তো দেখতেই পাচ্ছি, মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল মুসা। গাড়ি উল্টে ঘাড় না মটকালেই বাঁচি এখন। আস্ত এক কৌটা বাতের মলম লাগবে আজ আমার।

বেশি ভয় পাও তুমি…আঁউউ। ক্যাঙারুর মত আচমকা এক লাফ দিল গাড়ি, আলের মত একটা জায়গায় হোঁচট খেয়ে। আপনা আপনি জিনার হাত থেকে স্টিয়ারিং ছুটে গেল, পা সরে এল ক্লাচ থেকে। জোরে আরেকটা ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি থেমে গেল, এঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে আগেই। যাক, জায়গামতই এনে রেখেছি, মুসার দিকে তাকাচ্ছে না সে। এখান থেকেই ম্যাকআরবারের সীমানা শুরু।

সামনে রুক্ষ, অসমতল ভোলা জায়গা, হঠাৎ করে গিয়ে শেষ হয়েছে যেন, পর্বতের গোড়ায়। এক ধারে কালো বেড়া, খনির কালো মুখ দেখা যাচ্ছে। বেড়ার ওপর দিয়ে খনির ভেতরটা দেখতে অসুবিধে হচ্ছে, তবু কয়েক ফুট পর্যন্ত নজর চলে। সুড়ঙ্গের মেঝেতে সাদা মিহি বালি, এখান থেকেও বোঝা যায়। খনির ডানে ম্যাকআরথারের নোংরা কেবিন।

আস্ত মেথর, নাক কোচকাল জিনা। পরিষ্কার করার সময় পায়নি হয়তো, বলল রবিন। কদ্দিন হলো এসেছে?

প্রায় এক মাস। এসেছে তো একটা ফকিরের মত, বিছানা, হাঁড়ি-কড়াই আর কয়েকটা বাসন-পেয়ালা, ব্যস। নতুন আর কিছু কিনেছে বলে মনে হয় না। একেবারে চামার।…ওই যে বিল্ডিংটা ওতে খনির কাজকর্ম হত। খনি থেকে আকরিক তুলে নিয়ে জমা করা হত ওখানে, তারপর রুপা আলাদা করা হত।

শেকলের শব্দ শোনা গেল, কেবিনের কোণ থেকে বেরিয়ে এল কুকুরটা। ছুটন্ত অবস্থায় যতখানি বিশাল মনে হয়েছিল সেদিন কিশোরের তত বড় নয়, তবে বড়। শিকারী-লাব্রাডর আর জার্মান ভেড়া-তাড়ানো কুকুরের শঙ্কর। আগন্তুকদের দেখে চাপা গর্জন করে উঠল।

চেনটা শক্ত কিছুঁতে বাঁধা তো? বিড়বিড় করল মুসা।

হ্যাঁ,মুসার ভয় দেখে হেসে ফেলল জিনা। তখন চেতিয়ে দিয়ে পরীক্ষা করে দেখে গেছি। টানাটানি অনেক করেছে, ছুটতে পারেনি।

কখন করলে? জিজ্ঞেস করল রবিন।

এই তো খানিক আগে, কমেটকে নিয়ে এলাম না।

এত সাহস যে দেখালে, যদি ছুটে তে।

গেলে যেত। কমেন্টের সঙ্গে দৌড়ে পারত নাকি? লাথি খেলেও বাপের নাম ভুলে যেত। ভিকি খালা তো গুলি ছুঁড়ে ভুল করে, কমেটকে ডেকে এনে একটা লাথি খাওয়ানো দরকার ছিল। জিন্দেগীতে আর মুরগীর দিকে চোখ তুলে তাকাত না।

তুমি না কুকুর ভালবাস, জিনা? মুসা বলল, এটাকে দেখতে পারো না কেন? রাফিয়ানকে তো…

চুপ। কার সঙ্গে তুলনা। কোথায় ভদ্রলোকের বাচ্চা, আর কোথায় চোরা ম্যাকআরবারের মুরগীচোর।

কুকুর ভদ্রলোকের বাচ্চা হয় কি করে? ফস করে জিজ্ঞেস করল মুসা।

ভদ্রলোকের না হোক ভদ্ৰকুকুরের তো?

তা বলতে পারো…

আরে কি বকবক শুরু করলে তোমরা? বিরক্ত হয়ে বলল কিশোর, গভীর মনযোগে খনি আর তার আশপাশের অঞ্চল দেখছিল। জিনা, নামো, পথ দেখাও।

খনিমুখের ভেতরে ঢুকে টর্চ জ্বালল জিনা। চালু হয়ে নিচে নেমে গেছে সুড়ঙ্গ। দুপাশের দেয়াল ঘেঁষে পোতা হয়েছে রেললাইনের সীপারের মত বড় বড় মজবুত তক্তা, তার ওপর বীম লাগিয়ে পাথুরে ছাত সহজে যাতে ধসে না পড়ে সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সুড়ঙ্গের ভেতরে স্তব্ধ নীরবতা। সব কিছু শান্ত, তবু পরিবেশটা এমন, অকারণেই গা ছমছম করে।

খুব ধীরে ধীরে অমসৃণ ঢাল রেয়ে নামতে শুরু করল ওরা।

পর্বতের ভেতরে পঞ্চাশ গজমত ঢুকে দূ-ভাগ হয়ে গেছে সুড়ঙ্গ, একটা সোজা এগিয়েছে, আরেকটা বায়ে সামান্য মোড় নিয়েছে। এক মুহূর্ত দ্বিধা করে বায়ের পথটাই ধরল জিনা। তাকে অনুসরণ করল ছেলেরা। ঘুটঘুটে অন্ধকার। সুড়ঙ্গমুখ দিয়ে যে আবছা আলো আসছিল এতক্ষণ, মোড় নেয়ায় সেটাও হারিয়ে গেল।

পাথুরে মেঝেতে নিজেদের জুতোর শব্দই কেমন যেন ভুতুড়ে শোনাচ্ছে।

মহিলা পড়েছিল যেন কোথায়? নিচু গলায় বলল জিনা। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।

জিনা, দাঁড়াও, হাত তুলল কিশোর। সামনে মেঝেতে কিছু একটা চোখে পড়েছে। এই যে, এদিকে, আলো ফেরাও?

আলো ফেলল জিনা। আলগা পাথর, নুড়ির ছোট একটা স্কুপ। দেয়াল আর হাত থেকে খসে পড়ে জমা হয়েছে বোধহয়।

এগিয়ে গিয়ে তুলে নেয়ার জন্যে ঝুঁকল কিশোর, এই সময় আলো সরে গেল।

আরে আরে, যাচ্ছ কোথায়? চেঁচিয়ে উঠল মুসা। টর্চটা…এই জিনা?

কিন্তু জিনা থামল না। টর্চের আলো নাচতে নাচতে সরে যাচ্ছে দূরে। পাশের একটা করিডরে ঢুকে গেল সে।

জিনা! চেঁচিয়ে ডাকল রবিন।

হঠাৎ পেছনে আলো দেখা গেল, উজ্জ্বল আলো যেন নগ্ন করে দিল তাদেরকে! বুঝল, হঠাৎ কেন ছুটে পালিয়েছে জিনা।

এই এই, কি করছ ওখানে? ম্যাকআরথারের কড়া গলা।

মরেছি! ফিরে তাকানোর সাহস হচ্ছে না মুসার।

জিনার হাত থেকে টর্চ খসে পড়ার শব্দ হলো। ঝনঝন করে উঠল পাথরে বাড়ি খেয়ে, কাচ ভাঙল।

অন্ধকার করিডরের শেষ মাথা থেকে ভেসে এল জিনার রহিম-করা চিৎকার।

চেঁচিয়েই চলল সে, একনাগাড়ে।

Share This