০৫. তীক্ষ্ণ ট্রাম্পেটের আওয়াজ

হঠাৎ উত্তর দিকের তাঁবুগুলো থেকে ভেসে এলো তীক্ষ্ণ ট্রাম্পেটের আওয়াজ।

চমকে উঠলো দর্শকরা। ট্রাম্পেটের আওয়াজ মানে নতুন কোনো প্রতিযোগী আসছে। কে?

প্রতিটা চোখ তাকিয়ে আছে উত্তর প্রান্তের প্রবেশ পথের দিকে। তরুণ এক নাইট দুলকি চালে ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে এলো। বিশাল সুন্দর, তেজী একটা কালো ঘোড়ার পিঠে বসে আছে সে আবার জাগলো প্রশ্নটা দর্শকদের মনে, কে হতে পারে?

পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত বর্মে ঢাকা তরুণ নাইটের। সারা শরীর বর্মে ঢাকা থাকলেও টের পাওয়া যাচ্ছে মানুষটা খুব মোটা তাজা নয়। বরং একটু ক্ষীণদেহীই। হাতের ঢালে খোদাই করা একটা শিকড় সহ ওপড়ানো ওক গাছের ছবি। নিচে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা একটা মাত্র শব্দ: দেসদিচাদো দুটো, অর্থ হতে পারে শব্দটার-মূলোৎপাটিত বা উত্তরাধিকার-বঞ্চিত।

ঘেরা জায়গাটার মাঝখানে চলে এলো সে। রাজপুত্র জন ও মহিলাদের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বর্শা নিচু করে অভিবাদন জানালো। মাথাটা রহলো গর্বিত মোরগের মাথার মতোই খাড়া। দর্শকরা খুবই পছন্দ করলো তার এই ভঙ্গি। মহা উল্লাসে চিৎকার করে উঠলো তারা।

বোয়া-গিলবার্টের সাথে লেগো না!

ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ-এর সাথে না!

দ্য ভাইপন্টকে বেছে নাও! ওকে কাবু করা সহজ হবে।

দীর্ঘদেহী অজানা এই নাইটের সাহসে মুগ্ধ দর্শকরা। অদ্ভুত এক মায়াও অনুভব করছে তার জন্যে। তাই আন্তরিকভাবে পরামর্শ দিচ্ছে। তারা।

এগিয়ে গেল নাইট চ্যালেঞ্জারদের দিকে। এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে বর্শার ফলা ছোঁয়ালো ব্রায়ানের তালে। অর্থাৎ দুজনের একজন মারা না যাওয়া পর্যন্ত সে লড়বে। আতঙ্কের এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল দর্শকদের শিরা উপশিরা দিয়ে। করলো কি তরুণ নাইট! টেম্পলার ব্রায়ানের মতো দুর্ধর্ষ যোদ্ধার ঢাল স্পর্শ করলো বর্শার ফলা দিয়ে!

ব্রায়ান নিজেও কম বিস্মিত হয়নি। এগিয়ে এসে তরুণ নাইটকে সে বললো, তোমার সাহসের তারিফ না করে পারছি না, নাইট। এখানে আসার আগে শেষবারের মতো প্রার্থনা করে এসেছো তো? না করলে এখনই করে নাও, নইলে জীবনে আর কখনো করার সুযোগ পাবে না।

দেখুন, স্যার টেম্পলার, দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিলো তরুণ নাইট, মৃত্যুকে আমি আপনার চেয়ে কমই ভয় করি।

বেশ, তাহলে তৈরি হও, নাইট। সূর্যের দিকে, এই পৃথিবীর দিকে শেষবারের মতো একবার তাকিয়ে নাও। কাল আর এগুলো দেখার সৌভাগ্য তোমার হবে না।

আপনার পরামর্শের জন্যে অসংখ্য ধন্যবাদ। বিনিময়ে আপনাকেও একটা পরামর্শ দিচ্ছি, দয়া করে নতুন ঘোড়া আর নতুন বর্শা নিয়ে লড়াইয়ে নামুন। এখন যদি জেদ করে না-ও নেন, আমি বলছি, কিছুক্ষণের ভেতর আপনাকে নিতেই হবে।

আর অপেক্ষা করলো না নাইট। অদ্ভুত দক্ষতায় ঘোড়াটাকে ধীরে ধীরে পেছনে হাঁটিয়ে রণক্ষেত্রের উত্তর প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালো। ঘোড়া চালানোর এই নূতন কৌশল দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো দর্শকরা। করতালি আর উৎফুল্ল চিৎকারে মুখর হয়ে উঠলো চারদিক।

তরুণ নাইটের পরামর্শ শুনে প্রথমে খুব রেগে গেল ব্রায়ান। পরে ভেবে দেখলো, কথাটা নাইট ঠিকই বলেছে। এই ঘোড়া আর বর্শা নিয়েই একটু আগে তিন তিন জন যোদ্ধার মোকাবেলা করেছে সে। এখন আর এগুলোর ওপর ততটা নির্ভর করা ঠিক নয়। তাতে শত্রুকে খামোকা সুযোগ দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত সে তার তাঁবুতে গিয়ে ঢুকলো।

তরুণ নাইট অপেক্ষা করছে। দর্শকরা অপেক্ষা করছে। অবশেষে বেরিয়ে এলো স্যার ব্রায়ান তাঁবুর ভেতর থেকে। তার হাতে নতুন একটা বর্শা। দেখা গেল ঢালটাও বদলে নিয়েছে সে। এটার ওপর খোদাই করা মড়ার খুলি ঠোঁটে একটা উড়ন্ত দাঁড়কাকের ছবি। নিচে লেখা: সাবধান, দাঁড়কাক করে দেবে। ভৃত্য নতুন একটা ঘোড়া নিয়ে এলো। চড়ে বসলো ব্রায়ান। ধীর কদমে দক্ষিণ দিকের প্রবেশ পথ পেরিয়ে প্রতিযোগিতা স্থানে এসে দাঁড়ালো টেম্পলারের ঘোড়া।

ট্রাম্পেটের তীক্ষ্ণ আওয়াজ। প্রধান বিচারক চিৎকার করে উঠলেন:

লাইসে অ্যালের!

বিদ্যুৎচমকের মতো ছুটলো দুই নাইটের ঘোড়া একে অন্যের দিকে। মাঠের মাঝখানে মিলিত হলো দুজন। বজ্রগর্জন তুলে দুজনের ঢালে আঘাত হানলো দুজনের বর্শা। দুজনই এমন প্রচণ্ড শক্তিতে বর্শা চালিয়েছে যে দুজনেরটাই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। দুজনই ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়তে পড়তে সামলে নিলো কোনোমতে। হিংস্র চোখে তাকিয়ে আছে দুজন দুজনের দিকে।

দর্শকরা রুদ্ধশ্বাসে দেখছে। তাদের বেশির ভাগেরই ধারণা, যত নৈপুণ্যই দেখাক শেষ পর্যন্ত তরুণ মাইটকে হার স্বীকার করতেই হবে অভিজ্ঞ ব্রায়ানের কাছে। তবু তারা মুগ্ধ চোখে দেখছে তরুণের আক্রমণ।

বর্শা হারিয়ে দুই নাইটই ফিরে এসেছে যার যার জায়গায়। দুই প্রতিপক্ষ ও তাদের ঘোড়াদের বিশ্রাম দেয়ার জন্যে কয়েক মিনিটের বিরতি এখন।

বিরতি শেষ হলো রাজপুত্র জনের ইঙ্গিতে। নতুন বর্শা নিয়ে আবার দুই নাইট আক্রমণ করলো পরস্পরকে। আগের মতোই ভয়ঙ্কর বেগে ছুটলো ঘোড়াগুলো। এবার দুজনই সতর্ক আগের চেয়ে। তরুণ নাইটের ঢাল লক্ষ্য করে বর্শা চালালো ব্রায়ান। অচেনা নাইটও প্রতিদ্বন্দ্বীর ঢালে আঘাত করবে বলে বর্শা তুললো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মত বদলালো সে। বর্শা চালালো টেম্পলারের শিরোম্রাণ লক্ষ্য করে। দুজনের বর্শাই তীব্র বেগে আঘাত করলো যার যার লক্ষ্যে। অচেনা নাইট প্রস্তুত ছিলো, নিজের ঢালটাকে সামান্য ঘুরিয়ে দিয়ে আঘাতটা সামলে নিলো সে। কিন্তু ব্রায়ান স্বপ্নেও ভাবেনি তার শিরোম্রাণের ওপর আঘাত আসতে পারে। আক্রমণটা সে ঠেকাতে পারলো না। ঘোড়ার ওপর চিৎ হয়ে গেল তার শরীর। উল্টে পড়তে পড়তে সামলে নিলো কোনোমতে টেম্পলার। কিন্তু কপাল খারাপ, ঠিক সেই মুহূর্তে ছিঁড়ে গেল তার জিনের বাধন ঘোড়া সমেত মাটিতে আছড়ে পড়লো বোয়া-গিলবার্ট।

সারা শরীর বর্মে ঢাকা থাকা সত্ত্বেও আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায় উঠে দাঁড়ালো টেম্পলার। প্রতিহিংসায় পাগল হয়ে উঠেছে সে। দর্শকদের উৎফুল্ল চিৎকার আরো বাড়িয়ে দিয়েছে তার ক্রোধ। হ্যাচকা টানে বাপ থেকে তলোয়ার বের করে ছুটে গেল প্রতিপক্ষের দিকে। তরুণ নাইট তৈরিই ছিলো। ঘোড়া থেকে লাফিয়ে পড়ে তলোয়ার বের করলো সে-ও। দর্শকরা থমকে গেছে। এবার শুরু হবে আসল লড়াই। নিশ্চয়ই দুজনের একজন না মরা. পর্যন্ত তলোয়ার যুদ্ধ চলবে।

কিন্তু না, চিৎকার করে লড়াই বন্ধের নির্দেশ দিলেন প্রধান বিচারক। এ ধরনের টুর্নামেন্টে তলোয়ারের লড়াই নিষিদ্ধ। মার্শালরা এগিয়ে এলো দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিরস্ত করতে।

আবার আমাদের দেখা হবে, ক্রোধকম্পিত কণ্ঠে বললো বোয়াগিলবার্ট। এবং সেদিন আমাদের থামানোর জন্যে কেউ থাকবে না!

আমার কোনো আপত্তি নেই, জবাব দিলো অচেনা নাইট। আপনার যখন যেখানে ইচ্ছা আমার মুখোমুখি হতে পারেন। খালি আমাকে আগে থাকতে একটু সংবাদ দেবেন, আমি নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছে যাবো জায়গামতো। মাটিতে দাঁড়িয়ে বা ঘোড়ায় চড়ে; বর্শা, তলোয়ার বা কুঠার যা নিয়ে খুশি লড়তে চান, আমি রাজি। মনে রাখবেন, সেদিন আপনার মৃত্যু কেউ ঠেকাতে পারবে না।

দেখা যাবে কে কাকে শুরু করলো টেম্পলার, কিন্তু শেষ করতে পারলো না। বিচারকমণ্ডলীর নির্দেশে মার্শালরা তাকে জোর করে নিয়ে গেল তার তাবুতে। তরুণ নাইটকেও নিয়ে যাওয়া হলো উত্তর দিকের একটা তাঁবুতে।

তাবুতে ঢুকেই এক পাত্র মদ চাইলো সে। কে আগে তাকে সন্তুষ্ট করবে তাই নিয়ে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। শুধু ভৃত্য আর অনুচররাই নয় একটু আগে যেসব নাইট পরাজিত হয়ে ফিরে এসেছে তারাও ছুটে এলো মদের পাত্র হাতে। একজনের হাত থেকে এক পাত্র মদ তুলে নিলো নাইট। পাত্রটা মুখের সামনে ধরে বললো:

এখানে খাঁটি ইংরেজ যারা উপস্থিত আছেন তাদের সম্মানে আমি পান করছি! জয় হোক ইংরেজ জাতির! নিপাত যাক সেই সব বিদেশী অত্যাচারী যারা দখল করে আছে আমাদের মাতৃভূমি, বলে মদের পাত্রে চুমুক দিলো তরুণ নাইট। অনুচরকে ডেকে নির্দেশ দিলো, আবার শিঙা বাজাও।

নতুন করে ট্রাম্পেট বেজে উঠতেই দর্শকরা উল্লাসে ফেটে পড়লো। আবার ট্রাম্পেট বাজছে, মানে আবার লড়াই হবে।

কয়েকজন ঘোষককে যেতে দেখা গেল বিজয়ী নাইটের তাঁবুর দিকে। একটু পরেই ফিরে এসে তারা ঘোষণা করলো: এইমাত্র যে তরুণ নাইট বিজয়ী হয়েছেন তিনি আবার পড়বেন। এবার আর তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বাচন করবেন না। প্রতিপক্ষের যিনিই আসবেন তার সাথেই তিনি লড়তে রাজি। যদি অপরাজিত চার চ্যালেঞ্জার পালা করে আসেন তাছেও তিনি রাজি। সবার সাথেই তিনি লড়বেন!

দক্ষিণের তাঁবু থেকে প্রথমে এলো বিশালদেহী রেজিনাল্ড ট্র্যত দ্য বোয়েফ। কুচকুচে কালো বর্ম তার শরীরে। বেশ কিছুক্ষণ সমানে সমানে লড়লো সে তরুণ নাইটের সঙ্গে। তারপর ধীরে ধীরে কমে আসতে লাগলো তার আক্রমণের ধার। এবং শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়ে ফিরে গেল তাবুতে। এরপর একে একে এলো ম্যালভয়সিঁ, গ্র্যান্টমেনসিল এবং দ্য ভাইপন্ট। রেজিনান্ডের দশা হলো সবারই। ভাইপন্ট তো ঘোড়া থেকে পড়ে অজ্ঞানই হয়ে গেল। রক্ত পড়তে লাগলো তার নাক মুখ দিয়ে। কয়েকজন ভৃত্য ধরাধরি করে তাঁবুতে নিয়ে গেল অচেতন দেহটা।

রাজপুত্র জন উঠে দাঁড়ালেন অবশেষে। উত্তরাধিকার বঞ্চিত তরুণ নাইটকেই টুর্নামেন্টের প্রথম দিনের বিজয়ী বলে ঘোষণা করলেন।

দর্শকদের উল্লসিত চিৎকার আর করতালিতে মুখর হয়ে উঠলো আকাশ, বাতাস!

.

বিজয়ীকে অভিনন্দন জানানোর জন্যে এগিয়ে এলেন বিচারকরা। রাজপুত্রের কাছে নিয়ে যাওয়ার আগে আঁরা তাকে শিরোস্ত্রাণ খুলে ফেলার অনুরোধ জানালেন। সবিনয়ে অনুরোধটা প্রত্যাখ্যান করলো নাইট।

না, এক্ষুণি আমি শিয়োস্ত্রাণ খুলতে পারবো না, অসুবিধা আছে, বললো সে।

এ ধরনের প্রত্যাখ্যান অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। প্রায় প্রতি টুর্নামেন্টেই দুএকজন নাইট এমন করে থাকে। তবু রেগে গেলেন জন। পার্শ্বচরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন:

কে এই অহঙ্কারী নাইট?

মাথা নাড়লো পার্শ্বচর। কাছাকাছি যারা বসেছিলেন সবার দিকে একে একে তাকালেন রাজপুত্র। কিন্তু না, নাইটকে চেনে এমন কোনো আভাস দেখতে পেলেন না কারো চেহারায়। হঠাৎ ফিসফিস করে কে একজন বলে উঠলো:

সিংহ-হৃদয় রিচার্ড নন তো?

কথাটা কানে গেল রাজপুত্রের। শরীরের রক্ত তার হিম হয়ে আসতে চাইলো।

ওহ, ঈশ্বর! আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি। ওয়াল্ডেমার, দ্য ব্রেসি, আপনাদের প্রতিশ্রুতির কথা মনে আছে তো? আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না!

দুশ্চিন্তা করবেন না, রাজপুত্র, ওয়ান্ডেমার বললেন। এই নাইট আর যে-ই হোক, আপনার ভাই নন। রিচার্ড আকার আয়তনে কমপক্ষে এর দ্বিগুণ হবেন।

শুনলেন বটে, কিন্তু স্বস্তি পেলেন না জন। বিজয়ীর হাতে যখন পুরস্কারের ঘোড়া তুলে দিচ্ছেন তখনও–দুরু দুরু করছে তার বুকের ভেতরটা। প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কা করছেন, এই বুঝি শোনা গেল রিচার্ডের গভীর গম্ভীর ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর। সৌভাগ্য তার, তেমন কিছু ঘটলো না। উত্তরাধিকার বঞ্চিত নাইট মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালো কেবল। সদ্য পাওয়া ঘোড়াটায় চড়ে বসলো সে। বর্শা সোজা করে ধরে মাঠের চারপাশে চক্কর দিতে লাগলো ধীর কদমে। দর্শকরা তালি বাজিয়ে, চেঁচিয়ে অভিনন্দিত করতে লাগলো তাকে।

মাঠ প্রদক্ষিণ শেষে আবার রাজপুত্রের সামনে এসে দাঁড়ালো নাইট। জন হাত তুলে আরেকটু সামনে এগোনোর নির্দেশ দিলেন তাকে। বললেন, স্যার নাইট, এবার তোমার কর্তব্য হবে আগামীকালের টুর্নামেন্টের জন্যে সৌন্দর্য ও প্রেমের রানী নির্বাচন করা। তোমার বর্শাটা একটু এগিয়ে দাও।

নিঃশব্দে নির্দেশ পালন করলো নাইট। বর্শার ফলার ওপর সবুজ রেশম আর সোনার তৈরি একটা মুকুট বসিয়ে দিলেন রাজপুত্র।

তরুণ নাইট ধীর গতিতে ঘোড়া চালিয়ে এগিয়ে গেল মহিলাদের গ্যালারির দিকে। অপূর্ব একটা মুখ খুঁজছে তার দুচোখ। সে মুখ রোয়েনার। কিন্তু কোথায় রোয়েনা? অন্য মহিলাদের ওপর নাইটের দৃষ্টি পড়তেই অনেকের গাল লাল হয়ে উঠলো, অনেকে গর্বিত ভঙ্গিতে মুখ ঘুরিয়ে নিলো, অনেকে সলজ্জ হেসে নামিয়ে নিলো চোখ।

অবশেষে লেডি রোয়েনাকে দেখতে পেলো সে। সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নাইট। আস্তে আস্তে বর্শার মাথাটা নামিয়ে এনে মুকুটটা রাখলো রোয়েনার পায়ের কাছে।

বাজনা বেজে উঠলো। ট্রাম্পেটের আওয়াজ ছিঁড়ে ফেলতে চাইলো আকাশ। কয়েক মুহূর্ত মাত্র। তারপরই আবার সব চুপ। দুএকজন দর্শকের বিচ্ছিন্ন চিৎকার শোনা যাচ্ছে কেবল। ঘোষক এগিয়ে এসে সৌন্দর্য ও প্রেমের রানী হিশেবে ঘোষণা করলো রোয়েনাকে।

একজন স্যাক্সন তরুণীকে সৌন্দর্য ও প্রেমের রানী নির্বাচিত করায় ক্ষেপে গেলেন অনেক নরম্যান মহিলা। আর সাধারণ দর্শকরা স্রেফ বুনো হয়ে উঠলো খুশিতে।

রাজপুত্র জন আসন ছেড়ে এগিয়ে এলেন রোয়েনার কাছে।

এবার আপনি আপনার সম্মানিত আসন গ্রহণ করুন, বললেন তিনি।

ধন্যবাদ, রাজপুত্র, রোয়েনার হয়ে জবাব দিলেন সেড্রিক। কিন্তু আজ নয়, কাল রোয়েনা নিজেই তার আসনে গিয়ে বসবে।

সেড্রিকের কথায় ভয়ানক অপমানিত বোধ করলেন জন। চোখ মুখ লাল হয়ে উঠলো। তবু তিনি কিছু বললেন না। বলা ভালো, বলার সাহস পেলেন না। উপস্থিত হাজার হাজার দর্শকের বেশির ভাগই স্যাক্সন। স্যাক্সনদের জাদরেল নেতা সেড্রিককে কিছু বললে ওরা চুপ করে থাকবে বলে মনে হয় না। শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যে যে কজন রক্ষী আছে, জনতা ক্ষেপে উঠলে পাড়িয়েই মেরে ফেলবে তাদের।

নিঃশব্দে অপমানটা হজম করলেন জন। নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, প্রথম দিনের টুর্নামেন্ট শেষ হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *