০৫. ট্রিনিটি আল্পস ওয়াইল্ডারনেস আর রুট থ্রি

রাত্রি। ট্রিনিটি আল্পস ওয়াইল্ডারনেস আর রুট থ্রি এই দুটো পথের সঙ্গমস্থলে ক্যাম্প ফেলেছে অসকার গোল্ডম্যানের লোকেরা। হেলিকপ্টারে করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে অস্টিন আর ইভান বেকিকে। ইভানের দেখাশোনা করছেন এয়ার ফোর্সের একজন ডাক্তার। ভীষণ ক্লান্ত মনে হচ্ছে ভূতত্ত্ববিদকে।

ছোট্ট এক চিলতে খোলা জায়গা, চারপাশটা এর জঙ্গলে ঘিরে আছে। এই খোলা জায়গাটুকুতেই ক্যাম্প ফেলা হয়েছে। উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে তিনটে কোলম্যানল্যাম্প। রাইফেল কাঁধে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিচ্ছে সান্ত্রীরা। খোলা জায়গাটুকুর কেন্দ্রস্থলে আগুন জ্বালান হয়েছে, ক্যাম্পফায়ার। স্থির হয়ে আছে। পাহাড়ী বাতাস। সরলরেখা সৃষ্টি করে খাড়া আকাশে উঠে যাচ্ছে ক্যাম্পফায়ারের হালকা ধোয়া।

আগুনের কাছে শুইয়ে রাখা হয়েছে ইভানকে। নীল পিপিং ব্যাগটার বাইরে শুধু মাথাটা বেরিয়ে আছে তার। বালিশের অভাবে মাথার নিচে দেয়া হয়েছে একটা দোমড়ান জ্যাকেট। আগুনের পাশে বসে আছে অস্টিন। একটু দূরে রেডিও নিয়ে বসেছেন গোল্ডম্যান। বেসক্যাম্পে অধীনস্থ কোন কর্মচারীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছেন রেডিওতে। চেয়ে চেয়ে তাই দেখছে অস্টিন।

শোন, কাটা কাটা শোনাল গোল্ডম্যানের কণ্ঠস্বর, তোমাদের অসুবিধে বুঝতে পারছি আমি, কিন্তু আমার অসুবিধেটাও বোঝার চেষ্টা কর। একজন মহিলা নিখোঁজ হয়েছেন এখান থেকে। একটা অতি মূল্যবান যন্ত্রও গেছে তার সঙ্গে। কাজেই রাতের বেলা অনুসন্ধান কাজ চালানোর জন্যে নাইট-ভিশন। ইকুইপমেন্টগুলো আমার চাই, এবং জলদি!

ইয়েস, স্যার, উত্তর দিল একটা হাল ছেড়ে দেয়া কণ্ঠ। বেস ক্যাম্পে তো ওগুলো নেই এখন, হাতে পাবার সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দেব আপনার ওখানে।

মনে থাকে যেন কথাটা… যোগাযোগ কেটে দিলেন গোল্ডম্যান।

মনে হচ্ছে জিনিসগুলো পৌছুতে কিছুটা দেরি হবে। বলল অস্টিন।

হুঁ… চিন্তিত দেখাচ্ছে গোল্ডম্যানকে।

ঘুমের মধ্যেই নড়েচড়ে উঠল ইভান। গোল্ডম্যান এবং অস্টিন দুজনেই তাকাল একবার সেদিকে।

হ্যাঁ, ভাল কথা, আবার কথা বলল অস্টিন। আবার ওই পর্বতে চড়ব আমি। ইভানকে যেখানে পেয়েছি, জায়গাটা আরেকবার ভালমত দেখতে চাই।

ঠিকই বলেছ। ভুলেই গিয়েছিলাম একেবারে। হ্যাঁ, রেডিওতে বলেছিলে কি একটা জীব দেখেছ? কি ওটা?

চিনি না। তা ছাড়া দূর থেকে দেখেছি তো, চেহারাটা ভালমত খেয়াল করতে পারিনি।

কি ধরনের জীব?

দুপেয়ে। বিশাল একটা গ্রিজলী ভালুক যেন হঠাৎ করেই শিখে গেছে কি করে দুপায়ে ভর দিয়ে ছুটতে হয়।

কতটা বিশাল?

কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল অস্টিন, হঠাৎ সেখানে এসে হাজির হল টম রেনট্রি। হাতে কাপড়ে জড়ান একটা কি যেন। বিজ্ঞানীর দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালেন গোল্ডম্যান, কি, টম?

ধীরে ধীরে কাপড়ের মোড়ক খুলল রেনট্রি। প্লাস্টার কাস্ট, বলল সে। মাটিতে বসে যাওয়া সাসকোয়াচের পায়ের ছাপ থেকে করেছি।

সাদা প্লাস্টিকে তৈরি বড়সড়, ভারি পায়ের ছাপের ছাঁচটা মাটিতে নামিয়ে রাখল, রেনটি। অবাক হয়ে ছাঁচটার দিকে তাকালেন গোল্ডম্যান।

বিশাল পা, মৃদু মাথা নেড়ে বলল অস্টিন, অবিশ্বাস্য!

কিন্তু রেনট্রি, ধরে নিলাম বিশালদেহী একটা আজব জানোয়ার এই এলাকার পাহাড়ে-পর্বতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বললেন গোল্ডম্যান, সেক্ষেত্রে অনেকেরই চোখে পড়তে বাধ্য ওটা। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে ওটার কথা শোনা যাচ্ছে যখন।

কেউ কেউ তো দেখেছেই, বলল রেনট্রি। এবং তার… হঠাৎ থেমে গেল সে। ঘাড় ফিরিয়ে ইভানের দিকে তাকাল। চোখ মেলেছে ইভান। পায়ের ছাঁচটার দিকেই তাকিয়ে আছে।

দৈহিক, মানসিক দুটো শক্তিই রেনট্রির অসাধারণ। বনে-জঙ্গলে-পাহাড়ে অসংখ্য প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়ে মানুষ হয়েছে। সহজে ভয় পেতে জানে না। কিন্তু ইভান বেকির অবস্থায় ভয় পেয়েছে।

ও…ওর চোখ দুটো দেখেছ? প্রায় ফিসফিস করে কথা বলছে রেনট্রি, ঠিক আমার দাদা বনের ভেতরে কুড়িয়ে পাওয়া লোকটার কথা যেমন বলেছিলেন…আসলে, আসলে ইভান সাসকোয়াচকে দেখেছে, অসকার!

ইভানের দিকে তাকিয়ে আছে অস্টিন। দেহটা পিপিং ব্যাগের ভেতরে, কিন্তু মুখ দেখেই বুঝতে পারছে সে সাংঘাতিক কাঁপছে ইভান। চোখ দুটো স্থির নিবদ্ধ পায়ের ছাঁচটার ওপর।

জঙ্গলের ভেতর দিয়ে নিঃশব্দে কিন্তু দ্রুত এগিয়ে আসছে পায়ের ছাঁচের মালিক। লক্ষ্য সুভোন স্ট্যান্ডে বসান দুটো উজ্জ্বল ইলেকট্রিক আলো।

বেস ক্যাম্পের একেবারে কাছে এসে দাঁড়াল সাসকোয়াচ। একটা গাছের আড়াল থেকে চেয়ে বোঝার চেষ্টা করল, কোন্ দিক থেকে এগোলে সুবিধে হবে।

ক্যাম্পের পাশে পথের ধারে আগের মতই দাঁড়িয়ে আছে টেলিমেট্রি ভ্যানটা, তার পাশেই জেনারেটর ট্রাক। একটানা চাপা গুঞ্জন করছে জেনারেটর। ট্রাকের কয়েক গজ দূরে টেবিলটা। বিচিত্র সেন্সরগুলো নেই এখন ওটার ওপর, সরিয়ে রেখে গেছে অস্টিন। কিন্তু ট্র্যানসিভারটা আছে। আর আছে কন্টেইনার সহ কফি বানানোর অন্যান্য সরঞ্জাম। মৃদু আলো বেরুচ্ছে ট্রানসিভারের ডায়ালে বসান ক্ষুদে বালব থেকে। ক্যাম্প থেকে একটু দূরে জঙ্গলের কিনারায় রাখা হয়েছে পিকআপ আর গোল্ডম্যানের জীপটা।

ক্যাম্পের সীমানায় পাহারা দিচ্ছে এখন একজন গার্ড। হাতে একটা ছোট লাঠি। কোমরে গোঁজা .৩৮ কোল্ট অটোমেটিক।

গাছের আড়ালে স্থির হয়ে থাকল সাসকোয়াচ। দুটো বাতির আলোক সীমানার একেবারে শেষ প্রান্তে আছে সে। আর এক কদম এগোলেই ভেতরে এসে পড়বে।

আগুনের কাছ থেকে দূরে বসে বসে তাস খেলছে আরও ছয়জন গার্ড। ডিউটি অফ ওদের। চক্কর মারতে মারতে সঙ্গীদের কাছে এসে প্রতিবারেই অন্তত পনের সেকেন্ড করে ওদের খেলা দেখে যায় কর্তব্যরত গার্ড।

আস্তে করে খোলা জায়গায় বেরিয়ে এল সাসকোয়াচ। সোজা হেঁটে এগিয়ে এল তার সবচেয়ে কাছের আলোর স্ট্যান্ডটার কাছে। বিশাল একটা রোমশ হাত বাড়িয়ে আলতো করে ঠেলা দিল স্ট্যান্ডের গায়ে। আলোসহ কাত হয়ে পড়ে গেল ওটা।।

চমকে ফিরে তাকাল গার্ডরা। আতংকিত চোখে দেখল বিশালদেহী রোমশ একটা জানোয়ার ঝড়ের গতিতে ছুটে যাচ্ছে দ্বিতীয় লাইটস্ট্যান্ডটার দিকে।

এক ধাক্কায় লাইট স্ট্যান্ডটা ফেলে দিল সাসকোয়াচ। ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেল ক্যাম্প এলাকা। এক মুহূর্ত দ্বিধা করল কর্তব্যরত গার্ড। তারপর সাহসে বুক বাধল। লাঠিটা কোমরের বেল্টে গুঁজে রেখে টান মেরে খাপ থেকে রিভলভার বের করে আনল। পা টিপে টিপে এগিয়ে চলল দ্বিতীয় লাইটস্ট্যান্ডটার দিকে। তাস ফেলে উঠে দাঁড়াল তার সঙ্গীরাও। সার বেঁধে এগোল তার পিছু পিছু।

ওদিকে জেনারেটর ট্রাকের কাছে এগিয়ে গেছে সাসকোয়াচ। অন্ধকারেও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সে। এগিয়ে আসা গার্ডদের দিকে একবার তাকাল। তারপর ঝুঁকে ট্রাকের পেছনে তলার দিকের কিনারা চেপে ধরল। পরক্ষণেই ভয়ংকর এক গর্জন ছেড়ে হাঁচকা টান মারল উপর দিকে। ঝাকুনি খেয়ে শূন্যে উঠে গেল ভারি ট্রাকের পেছনটা। একেবারে সাসকোয়াচের মাথা ছাড়িয়ে গেল। হাতের দুই তালু ট্রাকের পেছন দিকের তলায় ঠেকিয়ে জোরে ঠেলে দিল সাসকোয়াচ। নাকের ওপর খাড়া হয়ে গেল ট্রাকটা। আধসেকেন্ড স্থির থাকল। তারপরই ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে পড়ল দড়াম করে। জেনারেটরের সঙ্গে যুক্ত তারগুলো ছিড়ে যেতেই ছেড়া মাথা থেকে তীব্র নীল স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে গেল। ওদিকে ট্যাংক থেকে গল গল করে মাটিতে পড়ছে পেট্রল। এতে বৈদ্যুতিক ফুলিঙ্গের ছোঁয়া লাগতেই দপ করে জ্বলে উঠল আগুন।

দেখতে দেখতে জেনারেটর ট্রাকটাকে গ্রাস করল আগুন। অন্ধকার দূর হয়ে গেল ক্যাম্প এলাকা থেকে। দাউ দাউ জ্বলছে লাল আগুন।

পালাচ্ছে গার্ডের দল! পড়িমরি করে গিয়ে ঢুকছে জঙ্গলের ভেতরে। সবার পেছনে হাতে .৩৮ নিয়ে কর্তব্যরত গার্ড। পিছু নিল সাসকোয়াচ। ছোঁ মেরে অবলীলায় তুলে নিল পিস্তলধারীকে। মাথার ওপর তুলে ছুঁড়ে দিল জঙ্গলের দিকে, যেন একটা হালকা ছোট্ট পুতুল ছুঁড়ল।

ফিরে দাঁড়াল সাসকোয়াচ। দ্রুত এগিয়ে এল। তাঁবু দুটো লক্ষ্য। টেনে খুঁটিসুদ্ধ উপড়ে আনল একটা তাঁবু। কাগজ ভেঁড়ার মত ফড়ফড় করে টেনে ছিড়ল অতি সহজে। দ্বিতীয় তাঁবুটারও একই গতি করে এগিয়ে গেল টেলিমেট্রি ভ্যানের দিকে।

বনের ভেতর থেকে জ্বলন্ত জেনারেটর ভ্যানের আলোয় আতংকিত চোখে এই ধ্বংসলীলা দেখছে ছয়জন গার্ড। একটা ঝোপের ভেতরে বেহুশ হয়ে পড়ে আছে হতভাগ্য গার্ডটা। তার হাতের পিস্তল ছিটকে গিয়ে পড়েছে আরও দশ হাত দূরে মাটিতে।

টেলিমেট্রি ট্রাকটা ধবংস করে দিয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল সাসকোয়াচ। এক ধার খামচে ধরে শূন্যে তুলে ফেলল ভারি টেবিলটা। ঝন ঝন শব্দে মাটিতে পড়ে ভাঙল কফি কন্টেইনার, আর যন্ত্রপাতি। টেবিলটা মাটিতে আছড়ে ফেলল সাসকোয়াচ। তারপর চারপাশে একবার চোখ বুলাল। জীপ আর পিকআপটা দেখতে পেয়েই এগিয়ে গেল ওদিকে। এক এক করে উল্টে দেখল দুটোই। আর কিছু ভাঙার নেই। নিজের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে যেদিক থেকে বেরিয়েছিল আবার সেদিক দিয়েই বনের ভেতরে ঢুকে গেল সে।

ধীরে ধীরে নিভে আসছে জ্বলন্ত ট্রাকের আগুন। পায়ে পায়ে এগিয়ে এল গার্ডেরা। গাছপালার আড়াল থেকে বাইরে বেরোতে যাবে, হঠাৎ এক বিস্ফোরণে চমকে উঠে আবার দ্রুত গিয়ে ঢুকল বনের ভেতরে। পেট্রল ট্রাংক ফেটেছে। আবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন! প্রচন্ড হয়ে উঠছে উত্তাপ। বিস্ফোরণের ফলে ধাতু আর কাঠের ছোট বড় অসংখ্য টুকরো ছিটকে পড়েছে এদিক ওদিক। কয়েকটা জ্বলন্ত টুকরো গিয়ে পড়ল মাটিতে পড়ে থাকা ছেড়াখোড়া তাঁবুর কাপড়ে। সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে গেল ওগুলোতেও। সাংঘাতিক উত্তাপ সইতে না পেরে বনের আরও গভীরে ঢুকে গেল গার্ডের দল।

ওদিকে দ্রুত ব্যাটল মাউনটেনের দিকে ছুটছে সাসকোয়াচ। নিজের কাজ ভালমতই সমাধা করেছে সে। যথেষ্ট খোঁচান হয়েছে স্টিভ অস্টিনকে, এতে কোন সন্দেহ নেই তার।

সবে ভোর হয়েছে। সূর্য উঠতে দেরি এখনো। ধূসর ছায়াটুকু সরি সরি করেও সরছে না বনভূমির ওপর থেকে। বেস ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে চলেছে অস্টিন, সঙ্গে গোল্ডম্যান আর রেন্ট্রি। রাতের ধ্বংসলীলার খবর পেয়েছে তারা মাত্র ঘন্টা দেড়েক আগে। রাতের বেলায়ই একজন গার্ড খবর দিয়েছে ফরেস্ট রেঞ্জার অফিসে। অফিসের ফায়ার ডিভিশনের লোকেরা এসে বেস ক্যাম্পের আগুন নিভিয়েছে। আশেপাশে শুকনো গাছপালা নেই তাই রক্ষা, নইলে দাবানল লেগে যেত।

যে গার্ডটাকে ছুঁড়ে ফেলেছিল সাসকোয়াচ, অজ্ঞান অবস্থায় তুলে এনেছে তাকে তার সঙ্গীরা। কপাল ভাল লোকটার, একটা ঘন ঝোপের ওপর গিয়ে পড়েছিল। শরীরে বেশ কিছু কাটাছেড়া আর মেরুদন্ডে সামান্য চোট লাগা ছাড়া তেমন কোন মারাত্মক আঘাত পায়নি সে। সেরে উঠতে সাত দিনও লাগবে না।

পুরো ধ্বংস হয়ে গেছে জেনারেটর ট্রাকটা। ওয়র্ক টেবিলে রাখা যন্ত্রপাতিগুলোও আর কোন কাজে আসবে না, বেঁকেচুরে ভেঙে শেষ। এখনও অল্প অল্প ধোঁয়া উড়ছে পোড়া ট্রাকটার শরীর থেকে।

ধ্বংস হয়ে যাওয়া বেস ক্যাম্পের আঙিনায় এসে দাঁড়ালেন গোল্ডম্যান। তাঁর একটু তফাতে অস্টিন আর রেনট্রি।

আশ্চর্য! ভুরু কুঁচকে পোড়া ট্রাকটার দিকে তাকিয়ে আছেন গোল্ডম্যান।

জেনারেটর ট্রাকটার ওপাশে সামান্য একটু জায়গায় জমাট কাদা। হাঁড়ি পাতিল আর বাসনপেয়ালা ধুয়েছে ওখানে বাবুর্চি (গার্ডদেরই একজন), গত কয়েক দিনে অনেকখানি পানি ঢেলেছে, তাই কাদা হয়ে গেছে একেবারে। প্যাচপ্যাচেই হয়ে গিয়েছিল, আগুনের প্রচন্ড উত্তাপে জমে এসেছে।

কি ভেবে ওই কাদাটুকুর কাছেই এগিয়ে গেল অস্টিন। যা ভেবেছিল, ঠিকই। কাদায় বসে আছে সাসকোয়াচের পায়ের ছাপ।

এদিকে আসুন, হাত তুলে ডাকল অস্টিন।

তিন লাফে পৌঁছে গেলেন গোল্ডম্যান। কি?

দেখুন, আঙ্গুল তুলে সাসকোয়াচের পায়ের ছাপ দেখাল অস্টিন। সাসকোয়াচ ইন্ডিয়ানদের অলীক কল্পনা নয়, বাস্তব সত্য।

ঝুঁকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পায়ের ছাপগুলো দেখলেন গোল্ডম্যান। ঈশ্বরই জানেন, কেমন দানবের পায়ের ছাপ ওগুলো!

পেছনের গভীর জঙ্গল দেখিয়ে বলল অস্টিন, ওই পায়ের ছাপের মালিকই তুলে নিয়ে গিয়েছে ইভান আর মার্লিনকে। ইভানকে আবার ওই-ই ফিরিয়ে দিয়ে গেছে, কেন, কে জানে! মার্লিনকে আটকে রেখেছে কেন তাই বা কে জানে! ও জ্যান্ত আছে কি নেই তাও জানি না।

অস্টিনের স্বর অদ্ভুত রকম বদলে গেছে। এই স্বর চেনেন গোল্ডম্যান। কোন একটা ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে ভয়ংকর বিপদে এগিয়ে যাবার আগে অমন হয় এই যন্ত্র-মানবের। খপ করে অস্টিনের হাত চেপে ধরলেন গোল্ডম্যান।

কি বলতে চাইছো?

গোল্ডম্যানের চোখে চোখে তাকাল একবার অস্টিন। তারপর আবার ঘাড় ফেরাল বনের দিকে। আপন মনেই বলল, চলার পথে নিজের চিহ্ন রেখে যেতে বাধ্য অতবড় দানব! ঝটিতি মুখ ফেরাল আবার গোল্ডম্যানের দিকে, আমি নিশ্চিত, সাসকোয়াচকে অনুসরণ করলেই মার্লিনের খোঁজ পাব। এবং এটাই একমাত্র উপায়।

অস্টিনের কব্জিতে গোল্ডম্যানের হাতের চাপ বাড়ল। আস্তে করে হাতটা ছাড়িয়ে নিল অস্টিন। ঘুরে দাঁড়াল। পরক্ষণেই রওনা হয়ে গেল বনের দিকে।

স্টিভ, চেঁচিয়ে ডাকলেন গোল্ডম্যান। কিন্তু বৃথা। বায়োনিক গতিতে ছুটেছে অস্টিন। নিমেশে অদৃশ্য হয়ে গেছে বনের ভেতর।

পরিষ্কার চিহ্ন রেখে গেছে সাসকোয়াচ। জায়গায় জায়গায় গাছের ছোট ঘোট ডাল ভেঙে আছে, পায়ের তলায় ঘাস মাটি মাড়ান। বায়োনিক চোখটা ব্যবহার করছে অস্টিন। এতে আশেপাশের অতি সামান্য অস্বাভাবিকতাও নজর এড়াচ্ছে না তার। দ্রুত গতিতে সাসকোয়াচের গতিপথ অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছে সে।

ভিডিও সেন্সর ব্যবহার করছে ওরা তিনজনে। অস্টিনের গতিবিধির ওপর পরিষ্কার নজর রাখছে। বিশেষ টেলিভিশনের পর্দায় দেখছে, সাসকোয়াচের ফেলে আসা চিহ্ন অনুসরণ করে এগিয়ে আসছে বায়োনিক ম্যান। ওরা কিন্তু জানে না, অস্টিন যন্ত্রমানব।

ওরেব্বাবা, লোকটার টেলিফটো ভিশন পর্যন্ত আছে! বলল একজন পুরুষ।

হ্যাঁ, বলল মেয়েটা, দেখছ না, দুশো গজ দূরে থেকেও অতি হালকা পায়ের ছাপ চোখ এড়াচ্ছে না ওর! এমন কি ডাল পাতায় লেগে থাকা সূক্ষ্মতম আঁচড়টুকু পর্যন্ত ঠিক দেখছে পাচ্ছে!

ওর দেহের ভেতরে কোন ধরনের থার্মাল সেন্সর আছে মনে হচ্ছে! স্পীড দেখেছ? তা ছাড়া খালি চোখে এভাবে চিহ্ন দেখতে পাওয়ার কথা নয়। তা সে যত উন্নত মানের টেলিফটোভিশনই থাকুক না কেন।

ইনফ্রারেড? জিজ্ঞেস করল মেয়েটা।

তা তো আছেই মনে হচ্ছে।

অতি উন্নতমানের প্রায় সমস্ত রকম যন্ত্রের সংমিশ্রণ নাকি ও। নিজেকেই যেন প্রশ্ন করল দ্বিতীয় পুরুষ।

তার কথার কোন জবাব দিল না কেউ।

কোন ধরনের সৃষ্টি? প্রথম লোক জিজ্ঞেস করল মেয়েটাকে, নায়োসিনথেটিক?

জানি না, বলল মেয়েটা। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে টেলিভিশনের পর্দার দিকে।

অর্থাৎ, ওকে পরীক্ষা করে দেখা একান্ত কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমারও তাই মত, বলল মেয়েটা, পরীক্ষাই করতে হবে ওকে।

তাহলে আর দেরি কেন? সাসকোয়াচকে পাঠাই? এক মুহূর্ত কি ভাবল মেয়েটা। হারাব না তো ওটাকে?

শ্রাগ করল প্রথম লোকটা, সেটাও দেখা উচিত।

সোজা ব্যাটল মাউনটেনের দিকে এগিয়ে গেছে সাসকোয়াচ। জীবটাকে অনুসরণ করে যতই এগোচ্ছে, হালকা অস্বস্তি জোরদার হচ্ছে অস্টিনের মনে। ওখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে একবার গিয়েছে সে, সাসকোয়াচকে দেখেছে, এখন আবার যাচ্ছে জীবটার নিজের এলাকায় হয়ত তার সঙ্গে লাগতেই। চলার গতি ধীর করে আনল অস্টিন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আশেপাশের জঙ্গলের দিকে নজর রাখতে রাখতে এগোল। ক্রমেই আরও বেশি আদিম হয়ে আসছে জঙ্গল। আরও কয়েক সেকেন্ড পরে হঠাৎই থমকে দাঁড়াল সে।

ইনফ্রারেডে কোন কিছুর অস্তিত্ব টের পায়নি এখন অস্টিন। কিন্তু সেন্সরের সাহায্যে একটা বিরাট জন্তুর উপস্থিতি টের পাচ্ছে। আশেপাশে গভীর জঙ্গল। ঝোপঝাড়গুলো ঘন লতায় আচ্ছন্ন। তলার দিকটা আবার লম্বা শ্যাওলার আস্তরণে ঢাকা। এই অঞ্চলে তেমন একটা কাজ করবে না ইনফ্রারেড। কাজেই এটাকে আর এখন চালু রাখার কোন মানে হয় না। সুইচ অফ করে দিল সে।

অতি তীক্ষ্ণ বায়োনিক শ্রবণ যন্ত্রে মৃদুভাবে একটা শব্দ ধরা পড়ছে এখন। ডাল ভাঙছে কেউ। পাতায় গা ঘষছে। এগিয়ে আসছে কোন বড় জানোয়ার।

কান পেতে শুনছে অস্টিন। ক্রমেই আওয়াজ স্পষ্ট হচ্ছে। শব্দের উৎস বরাবর তাকাল সে। কিন্তু চোখের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অতি ঘন জঙ্গল। টেলিফটো ভিশন পর্যন্ত সুবিধে করতে পারছে না।

হঠাৎ থেমে গেল শব্দ। একটা ঘন ঝোপের আড়ালে এসে দাঁড়িয়েছে সাসকোয়াচ। সামনের দিকে আর দুপাশে একবার তাকিয়েই আস্তে করে বসে পড়ল। অপেক্ষা করবে।

বাড়তে বাড়তে আওয়াজ হঠাৎ থেমে যাওয়ায় কৌতূহলী হয়ে পড়ল অস্টিন। অতি ধীরে এগিয়ে গেল কয়েক পা। উঁকিঝুঁকি মারল। কিন্তু কিছুই নজরে পড়ল না। এগিয়ে গেল আরও খানিকটা। বিশাল ঝোপটার ওপর চোখ পড়তেই থেমে গেল। সন্দেহ হচ্ছে। এক সেকেন্ড কি ভাবল, তারপর এগিয়ে গেল ঝোপটার দিকে। কয়েক পা এগিয়েই আবার থেমে গেল। কি ভেবে পিছিয়ে আসতে লাগল আবার। তারপর ঘুরে রওনা দিল ঝোপটার দিকে। গজ দশেক গিয়ে থেমে পড়ল। অপেক্ষা করে দেখতে চায় কি ঘটে।

মিনিট দশেক পর আর অপেক্ষা করতে তাকাল না সাসকোয়াচ। উঠে পড়ে রওনা হল আবার। ডালপাতা ভাঙার আওয়াজ উঠল। ঝোপটার ডান পাশে ছোট্ট এক চিলতে জায়গায় গাছপালা আশেপাশের চাইতে হালকা হয়ে জন্মেছে। এক ছুটে এই জায়গাটুকুতে এসে দাঁড়াল অস্টিন। সাসকোয়াচের সঙ্গে লাগতে হলে এখানে লাগাই ভাল।

আধ সেকেন্ড থেমে গিয়েছিল শব্দ, আবার শুরু হল। মোড় নিয়ে অস্টিনের দিকেই এগোচ্ছে সাসকোয়াচ। দুই কি তিন সেকেন্ড পরই ঝোপঝাড় ঠেলে বেরিয়ে এল সে। ভয়ংকর শব্দে গর্জন করে উঠল আচমকা। পর্বতের গায়ে ধ্বনিপ্রতিধ্বনি উঠল। কেঁপে উঠল বনভূমি।

স্থির দৃষ্টিতে সাসকোয়াচের দিকে তাকিয়ে আছে অস্টিন। আট ফুট লম্বা দানবটার সাদা চোখ দুটো জ্বলছে দপ দপ করে, ইলেকট্রিক বালবের মত। এই মাত্র যেন নরক থেকে উঠে এসেছে সাক্ষাৎ শয়তান। বড় করে একবার শ্বাস নিল অস্টিন।

আরেকবার প্রচন্ড গর্জন করেই তীব্র গতিতে ছুটে এল সাসকোয়াচ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *