০৫. জীবনের পথে একা

জীবনের পথে একা

মার্ডস্টোন অ্যাণ্ড গ্রিনবির মালগুদামটি নদীর কিনারে। একটা সরু গলির একেবারে শেষ প্রান্তে। গুদামের পরেই গলিটা খাড়া নিচে নেমে শেষ হয়েছে। নদী পর্যন্ত গিয়ে। গুদামঘরটা জরাজীর্ণ। ইঁদুরে ভরা। শত বছরের ময়লা আর আবর্জনায় ভরা। প্রথম দিন সকালে কয়েকটি ছেলের সঙ্গে দেখা হলো। ওদের সাথে কাজ করতে হবে আমাকে। আমরা মদের বোতল ধােয়ামোছা করলাম। ভাঙাগুলোকে বাতিল করলাম। লেবেল এটে দিলাম ভালগুলোর গায়ে। ছিপি। লাগালাম। পিপের মধ্যে বোতলগুলোকে সাজিয়ে রাখলাম।

সাড়ে বারোটায় মি. গ্রিনবি আমাকে হাতের ইশারায় ডেকে নিয়ে গেলেন তার অফিসে। গিয়ে দেখলাম মোটাসোটা মাঝবয়েসী একজন লোক বসে আছেন। সেখানে। লোকটার মাথা ডিমের মত মসৃণ। চুলের নাম-গন্ধ নেই!

ইনি হলেন মি. মিকবার, বললেন মি. গ্রিনবি।

লোকটা বললেন, হ্যাঁ, ওটাই আমার নাম। তুমি বোধহয় ডেভিড কপারফিল্ড-আমার বাড়িতে যার থাকার কথা। পোশাক-আশাক মলিন হলেও তার কথাবার্তায় বেশ দিল-দরিয়া ভাব। লোকটি আরও বললেন যে সন্ধ্যায় তিনি আসবেন আমাকে নিতে। মালগুদাম থেকে খুব কম সময়ে তার বাড়ি যাবার পথটি আমাকে দেখিয়ে দেবেন।

যথাসময়ে তিনি এলেন। হাতমুখ ধুয়ে গেলাম তার সঙ্গে। বাড়িটা তারই মত মলিন। নিচতলায় কোন আসবাব নেই। জানালাগুলো বন্ধ। উদ্দেশ্য, প্রতিবেশী ও পাওনাদারদের ধােকা দেয়া। তারা যাতে মনে করে যে বাড়িতে কেউ নেই। মিসেস মিকবার এবং তাঁদের চারটি ছোট্ট ছেলেমেয়ের সাথে তিনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

ওখানে থাকতে লাগলাম। মিকবার পরিবার খুব সদয় ব্যবহার করতে লাগল আমার সঙ্গে। কিন্তু তবু এটা তো সত্য যে এই পৃথিবীতে আমার কেউ নেই। নেই কোন বন্ধু, বা মুরুব্বি। বিশাল ভীতিকর লণ্ডন শহরে আমি এক অপরিচিত ছোই বালক।

কাজ করি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। ক্লান্তি, হতাশা আর অবসাদে ভরে যায় মন। ভয় হয় স্কুলে যা কিছু শিখেছি সবই বুঝি ভুলে যাব। মদের বোতল ধােয়ার সময় পানির সাথে মিশে যায় আমার অশ্রু। চেষ্টা করি আমার কান্না যেন অন্য। ছেলেরা দেখতে না পায়।

মিকবাররা আমার প্রতি সদয়। সব সময় টাকা-পয়সার টানাটানি লেগে থাকলেও তারা আমাকে নিজেদের খাবারের ভাগ দিতে চান। শীতের রাতে তাদের সঙ্গে আগুনের পাশে বসতে ডাকেন। মিকবারদের দেনা অনেক। দিনের যে-কোন সময় পাওনাদাররা এসে হানা দেয়। কেউ কেউ রীতিমত চোটপাট করে। মিকবারদের একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায় তাদের যে গুটিকয়েক আসবাবপত্র আছে সেগুলো বন্ধক রাখা। তাই কাজ থেকে ফিরে একটা ছোট টেবিল বা খানকয় চেয়ার, কিংবা একটি কম্বল নিয়ে যাই বন্ধকী দোকানে এবং নিয়ে আসি কয়েকটা শিলিং। কিন্তু অবস্থা যত খারাপই হোক, মি. মিকবার সব সময় বলেন, উপায় কিছু একটা হবেই।

অদ্ভুত লোক এই মিকবাররা। মিসেস মিকবার একদিন বললেন, ওর পাওনাদারগুলো ওকে সময় দেবে না। না দিলে না দিক। যা হবার তাই হবে। পাথর থেকে তো রক্ত বের করা যাবে না! মি. মিকবারের কাছ থেকেও এখন ওরা কিছু বের করতে পারবে না।

বেচারী মিসেস মিকবার! স্বামীকে সাহায্যের চেষ্টা তিনি করেছেন। বাড়িতে ছোট্টমণিদের জন্য মিসেস মিকবারের বোর্ডিং হাউস লিখে একটা সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন। কিন্তু ছোট্টমণিরা কেউ আসেনি।

এক একদিন অবস্থা চরমে উঠত। সকাল সাতটায় এক পাওনাদার এসে হাজির হত। হিংস্র চেহারা। মুখে ময়লা লেগে আছে। লোকটা মুচি। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সে চিৎকার জুড়ে দিত, বেরিয়ে এসো। তুমি বাড়িতেই আছ। আমার পাওনা মিটিয়ে দাও। লুকিয়ে থেকো না। শুনছ? ছোটলোকের মত লুকিয়ে আছ। কেন? জোচ্চোর! ইতর! ডাকাত! এসময় মি. মিকবার দুঃখে অপমানে ভেঙে পড়তেন। আত্মহত্যার ভঙ্গি করতেন। এমন ভাব দেখাতেন যেন ক্ষুর দিয়ে। নিজের গলা কাটবেন। কিন্তু লোকটা বিদায় নেয়ার আধঘণ্টা পরেই দেখা যেত মি. মিকবার গুনগুন করে গান করতে করতে মনোযাগ দিয়ে নিজের জুতোয় রঙ লাগাচ্ছেন। মিসেস মিকবারকেও দেখা যেত বেশ হাসিখুশি। চায়ের চামচ বন্ধক রেখে আনা টাকায় খাসির মাংসের চপ আর মদ কিনে মনের সুখে গিলছেন।

অবশেষে মি. মিকবার গ্রেফতার হলেন। একদিন খুব ভোরে তাকে কিংসবেঞ্চ জেলে নিয়ে যাওয়া হলো। ঋণ শোধ করতে না পারা পর্যন্ত সেখানে বন্দী থাকবেন। তার পরিবারকে সঙ্গে থাকার অনুমতি দেয়া হলো।

আমি একটা দশ বছরের ছেলে। পেট ভরে খেতে পাই না। গায়ে ভাল জামাকাপড় নেই। এ অবস্থায় কেমন করে লণ্ডনে থাকব—এসব ভেবে ভয় পেলেন মিসেস মিকবার। তাই তিনি আমার জন্যে জেলের কাছেই সস্তায় একটা ঘর খুঁজে দিলেন। এতে কাজ থেকে ফিরে এসে তাদের সঙ্গে আমার দেখা করার সুবিধে হলো।

মি. মিকবার কিছু একটা উপায়ের অপেক্ষায় বসেছিলেন। অবশেষে সেই উপায়টা হলো। তার এক ধনী আত্মীয় মারা গেছেন অস্ট্রেলিয়ায়। কিছু টাকা রেখে গেছেন মি. মিকবারের জন্য। তিনি স্থির করলেন ধার-দেনা শোধ করে সপরিবারে চলে যাবেন অস্ট্রেলিয়ায়।

তারা না থাকলে লণ্ডনে থাকার ইচ্ছা আমার হলো না। হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল মা আর পেগোটির মুখে শোনা আমার খামখেয়ালী দাদীটির কথা। আমি মেয়ে না হয়ে ছেলে হয়ে জন্মেছি বলে রাগ করে যিনি ডাক্তারের মাথায় বনেট ছুঁড়ে মেরেছিলেন। সিদ্ধান্ত নিলাম, দুনিয়াতে তিনিই আমার একমাত্র প্রকৃত আত্মীয়। কাজেই তাকে খুঁজে বের করব। তার কাছে আশ্রয় চাইব। কিন্তু তিনি কোথায় থাকেন জানি না। তাই মিস বেটসি কোথায় থাকেন জানতে চেয়ে চিঠি লিখলাম পপগোটিকে।

সঙ্গে সঙ্গে জবাব এল পেগোটির। সে জানাল মিস বেটসি থাকেন ডোভারে। চিঠির সাথে পেলাম তার পাঠানো একটা আধ-গিনি।

ভাবলাম আধ-গিনিতে একটা একা গাড়ি ভাড়া করে আমার ছোট্ট জামাকাপড়ের বাক্সটি সহ চলে যাব ডোভারে। কিন্তু যে লোকটার গাড়ি ভাড়া করলাম সে আমার আধ-গিনি আর বাক্সটা সহ গাড়ি নিয়ে ছুটে চলে গেল।

আমি যত জোরে সম্ভব ছুটলাম তার পেছনে। কিন্তু ধরতে পারলাম না। কাদার মধ্যে পড়ে গেলাম হাঁপাতে হাঁপাতে, কাদতে কাদতে। হপ্তার মজুরি পাঁচ শিলিং ছাড়া আর কিছুই রইল না আমার কাছে। এই পয়সায় ডোভারের ভাড়া হবে না। অগত্যা পায়ে হেঁটেই চললাম। রাতগুলো কাটাতে লাগলাম কারও খড়ের গাদায়, কিংবা মাঠে।

ছয় দিনের শেষে পকেট একদম খালি হয়ে গেল। আমি তখন ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, পথের শ্রমে ক্লান্ত। আমার জুতোগুলো আর জুতোর মত নেই। লণ্ডন ছাড়ার পরে চুলে আর চিরুনির আঁচড় পড়েনি। যে সামান্য কাপড়-চোপড় ছিল গায়ে সেগুলো শতচ্ছিন্ন। ভাল কাপড় যা ছিল সব বন্ধক দিয়ে ফেলেছি।

অবসন্ন অবস্থায় পৌঁছলাম ডোভারে। এক গাড়োয়ান মিস বেটসির বাড়িটা দেখিয়ে দিল আমাকে। ছোট্ট পাহাড়-চূড়ায় সুন্দর ছিমছাম কটেজ।

আমার পোশাক আর চেহারা খুবই বিশ্রী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় দরজায় ঘা দিতেও ভয় হলো। তাই দাঁড়িয়ে রইলাম গেট-এর সামনে। কিছুক্ষণ পরে একজন লম্বা, ছিপছিপে, পাকাচুলো মহিলা বেরিয়ে এলেন দরজা খুলে। হাতে বাগানে কাজ করার দস্তানা আর খুরপি।

আমার ওপর নজর পড়তেই বললেন, ভাগো হিয়াসে! ছেলেদের এখানে ঢুকতে দেয়া হয় না। এরপর সোজা তিনি নেমে গেলেন বাগানে। নিচু হয়ে একটা শেকড় খুঁড়ে তুলতে লাগলেন।

দাদী বেটসি, শুনুন দয়া করে, বললাম আমি তার কাছে এগিয়ে গিয়ে। ভয়ে। কাঁপতে কাঁপতে। আমি আপনার নাতি, ডেভিড কপারফিল্ড।

ও গড! বলে তিনি ধপাস করে বসে পড়লেন বাগানের রাস্তার ওপর।

মা মারা যাবার আগে আপনার কথা বলতেন, বুঝিয়ে বললাম আমি। মায়ের মৃত্যুর পর থেকে আমাকে চরম অবহেলা করা হয়েছে। অন্যায় দুর্ব্যবহার করা হয়েছে আমার প্রতি। তাই পালিয়ে এসেছি আপনার কাছে। দিনের পর দিন হেঁটেছি। শোবার জন্যে বিছানা পাইনি… এ পর্যন্ত বলার পর আর কথা বেরুলো না আমার মুখ দিয়ে। একটি সপ্তাহের অসহায়তা, দুঃখ কষ্ট উন্মত্ত কান্না হয়ে ঝরে পড়ল আমার কণ্ঠ থেকে।

অত্যন্ত দ্রুতবেগে উঠে দাঁড়ালেন মিস বেটসি। আমাকে নিয়ে গেলেন ঘরের মধ্যে। সোফায় শুইয়ে একটা শাল গুঁজে দিলেন মাথার নিচে। গ্লাসে ভরে কি একটা এনে খাইয়ে দিলেন। তারপর হাঁক দিলেন, মি. ডিক, একটু আসুন এদিকে। আমি আপনার পরামর্শ চাই।

সঙ্গে সঙ্গে ঘরে এলেন এক সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক। মুখে বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত ধরনের উদাসী উজ্জ্বলতা। হাবভাব তার ছেলেমানুষী।

মি. ডিক, আমার কিছু ভাল পরামর্শ দরকার, বললেন মিস বেটসি। এই বাচ্চাটা হলো ডেভিড কপারফিল্ড। আমার মৃত ভাইপোর ছেলে। সে পালিয়ে এসেছে। আমি একে নিয়ে কি করব?

কেন, আমি হলে একে…গোসল করাব, বললেন মি. ডিক চটপট, তারপরে খাওয়াব।

গোসল করলাম। তারা আমাকে মি. ডিকের একটা শার্ট আর ট্রাউজার পরিয়ে গায়ে দুতিনটা শাল জড়িয়ে দিলেন। আমাকে কেমন পোটলার মত দেখাচ্ছিল জানি না, তবে খুব গরম লাগল। সোফায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুম ভাঙল ঘণ্টাকয়েক পরে। দাদীকে বললাম মি. মার্ডস্টোনের সঙ্গে মায়ের দুর্ভাগ্যজনক বিয়ে এবং আমার সঙ্গে তার দুর্ব্যবহারের কাহিনি।

ব্যাটা আস্ত খুনী! বললেন দাদী।

পরদিন দাদী আমাকে বললেন যে তিনি মি. মার্ডস্টোনকে, তাঁর ভাষায় মি, মার্ডারকে চিঠি লিখেছেন।

আতঙ্কিত হয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, উনি কি জানেন আমি কোথায় আছি?

আমি তাকে জানিয়ে দিয়েছি, জবাব দিলেন তিনি।

আমাকে কি ফিরে যেতে হবে তার কাছে?

জানি না। সেটা দেখা যাবে পরে, বললেন তিনি।

আমার নাস্তা খাওয়ার পরে মিস বেটসি বললেন, তুমি ওপর তলায় গিয়ে মি. ডিককে গুড মর্নিং বলে এসো। তার একটা লম্বা নাম আছে-রিচার্ড ব্যাবলি। কিন্তু ওই নামে তাকে ডেকো না। তিনি ওই নামটা সহ্য করতে পারেন না। কাজেই খুব সাবধান। তাকে মি. ডিক ছাড়া আর কিছু ডেকো না।

গেলাম দোতলায়। দেখলাম তিনি তার বই-কোন এক লর্ডের স্মৃতিকথারচনায় ব্যস্ত। বইটা তিনি লিখছেন দশ বছর ধরে। কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা পরে পরেই। রাজা চার্লস-এর হত্যাকাণ্ড বর্ণনা না করে বেশিদূর এগোতে পারেন না। দাদী আমাকে পরে বুঝিয়ে দেন যে এটা তার নির্দোষ অসুখের একটি লক্ষণ।

কলমটা রেখে দিয়ে তিনি বলে উঠলেন, হ্যা! চলছে কেমন দুনিয়াটা? আরে বোকা, এটা হচ্ছে পাগলা দুনিয়া! হেসে উঠলেন তিনি। হাসিটা একটু অদ্ভুত। এর পর তিনি আমাকে তার ঘুড়ি দেখালেন। মস্ত ঘুড়ি। অন্তত সাত ফুট উঁচু!

কেমন মনে হয় ঘুড়িটা? জিজ্ঞেস করলেন গর্বিত ভাবে।

জবাব দিলাম, সুন্দর ঘুড়ি।

আমি বানিয়েছি, বললেন মি. ডিক। আমরা, তুমি আর আমি, এটা ওড়াব।

কিন্তু আমার বাইরে যাবার মত কাপড় ছিল না। তাই সেদিন আমাদের ঘুড়ি ওড়ানো হলো না।

নিচে নেমে আসার পরে দাদীকে জিজ্ঞেস করলাম, মি. ডিকের মাথায়…কি কোন গোলমাল আছে?

গোলমাল ঠিক নয়! বললেন মিস বেটসি। মি. ডিক আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়। তাঁর পরিবার তাকে পাগল বলে। তার ভাই চেয়েছিল তাঁকে আজীবন পাগলা গারদে বন্দী করে রাখতে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম তিনি সুস্থ। দশ বছর আগে তাকে নিয়ে আসি আমার কাছে। সেই থেকে তিনি আমার। সেরা বন্ধু এবং বুদ্ধিদাতা।

পরের কয়েকটা দিন দাদী আর মি. ডিক খুব সদয় ব্যবহার করলেন আমার সঙ্গে। অনেকটা সময় আমরা একত্রে কাটালাম পরম সুখে। অতীতকে প্রায় ভুলে। গেলাম। তারপর মনে পড়ল যে দাদী মি. ও মিস মার্ডস্টোনকে তার সঙ্গে দেখা। করতে আসার জন্যে বলেছেন। আবার আতঙ্ক গ্রাস করল আমাকে।

অপেক্ষা করতে লাগলাম মি. ও মিস মার্ডস্টোনের ভয়ঙ্কর মুখ আবার দেখার।

একদিন দুপুরে দাদী বসে ছিলেন জানালার পাশে। দাদী অত্যন্ত রাশভারী ও কঠোর স্বভাবের মানুষ। হঠাৎ তিনি গাধা! গাধা! বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। চমকে। উঠে দেখলাম একটা গাধা ঢুকে পড়েছে বাগানে। বাড়ির সামনেকার ছোট্ট ঘাসেছাওয়া জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে। পরিচারিকা জানেট ধরার চেষ্টা করছে গাধাটাকে। এমন সময় মার্ডস্টোনরা ঘোড়া হাঁকিয়ে এসে ওই জায়গাটা মাড়িয়ে নামলেন বাড়ির সামনে।

ঘাসে-ছাওয়া ওই জায়গাটা দাদীর বড় প্রিয়। তিনি রেগে গেলেন। মুঠো ধরা হাত জানালার দিকে ছুঁড়ে তিনি বললেন, ভাগো হিয়াসে! কেন এসেছ এখানে? কোন সাহসে এসেছ বিনা হুকুমে?

আমি তাকে জানালাম কারা এসেছেন।

ওরা যে-ই হোক, পরোয়া করি না। অনধিকার প্রবেশ সহ্য করব না।

জানেট এসে জানাল যে মার্ডস্টোনরা এসেছেন।

কাঁপতে কাঁপতে বললাম, আমি চলে যাব, দাদী?

না, স্যার। নিশ্চয়ই না, বলে আমাকে তিনি ঠেলে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন তার কাছে, ঘরের কোনায়। ওখানে দাঁড়িয়ে দেখলাম মি. ও মিস মার্ডস্টোন ঘরে প্রবেশ করলেন।

ওহো, আপনারা? কার বিরুদ্ধে আপত্তি করছি তা প্রথমে খেয়াল করিনি। তবে ওই ঘাসটা মাড়াতে আমি কাউকে দিই না। সে যে-ই হোক, বললেন দাদী।

অপরিচিতদের জন্য নিয়মটা একটু অসুবিধাজনক, বললেন মিস মার্ডস্টোন।

তাই নাকি?

আবার ঝগড়া বেধে যাবে মনে করে মি. মার্ডস্টোন তাড়াতাড়ি বললেন, মিস ট্রটউড!

মাফ করুন, বললেন দাদী। আপনিই সেই মি. মার্ডস্টোন যিনি আমার ভাইপো ডেভিডের বিধবা বৌটাকে বিয়ে করেছিলেন?

হ্যাঁ, আমি, বললেন মি. মার্ডস্টোন।

মাফ করবেন, কথাটা বলতেই হচ্ছে, মন্তব্য করলেন দাদী। বেচারি মেয়েটিকে আপনি বিয়ে না করলেই অনেক ভাল হত। জানেট, মি. ডিককে আমার সালাম জানিয়ে বললা যে তিনি একটু নিচে এলে আমি খুশি হব।

মি. ডিক এলেন। পরিচয় করিয়ে দিলেন দাদী, মি. ডিক একজন পুরানো ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার বিচার বুদ্ধির ওপর আমি নির্ভর করি।

মিস ট্রটউড, আপনার চিঠি পেয়ে লিখিত জবাব না দিয়ে নিজেই এলাম। এই ছেলেটা তার বন্ধুদের কাছ থেকে এবং কাজ ছেড়ে পালিয়ে এসেছে।

ওর আচরণ অত্যন্ত কেলেঙ্কারিজনক, যোগ করলেন মিস মার্ডস্টোন।

ছেলেটি আমাদেরকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। ভীষণ একগুঁয়ে এবং বদমেজাজী।

হ্যাঁ, সায় দিয়ে বললেন মিস মার্ডস্টোন। দুনিয়ার সেরা পাজি ছেলে এটা।

হুম, তারপর? বললেন দাদী।

মিস্টার মার্ডস্টোন বললেন, আমি এসেছি ওকে নিয়ে যেতে। ওকে কিভাবে মানুষ করতে হবে সে বিষয়ে আমার নিজস্ব মতামত আছে। আমার সঙ্গতি কতটা তা-ও ভেবে দেখতে হবে। আমি ছেলেটাকে আমার এক বন্ধুর হেফাজতে একটা সম্মানজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়েছিলাম। সেটা ওর পছন্দ হয়নি। ও পালিয়ে যায়। ভবঘুরের মত ঘেঁড়া ন্যাকড়া পরে দুনিয়া ঘুরে আপনার কাছে এসে ধর্না দেয়। আপনি যদি প্রশ্রয় দেন তবে পরিণামের জন্য আমি দায়ী হব না।

আপনার আর কিছু বলার আছে? প্রশ্ন করলেন দাদী।

শুধু এটুকু, মিস ট্রটউড! ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। যেভাবে যা ঠিক মনে করব সেভাবে গড়ে তুলব। এখন আপনি যদি ওকে প্রশ্রয় দেন, তাহলে আমার দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।

রাবিশ! গর্জে উঠলেন মিস বেটসি। আপনাদের একটা কথাও আমার বিশ্বাস হয়নি। আপনারা দুজন খুনী ছাড়া আর কিছুই নন। মিষ্টি কথা বলে ভুলিয়ে ভালিয়ে বোেকা বিধবা মেয়েটাকে বিয়ে করেছেন। তারপর মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে, নিষ্ঠুরতা দিয়ে বেচারীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন। দশ বছরের একটা ছেলেকে জীবিকার জন্যে কাজ করতে পাঠিয়েছেন এক জঘন্য গুদামে। আর নিজেরা আরামে বাস করছেন ওদের বাড়িতে। মা-র মৃত্যুর পর বাড়িটার আসল। মালিক ডেভিড। ওটা ওর বাবার কেনা। এই অপরাধে শাস্তি হওয়া উচিত আপনাদের। তবে এ ব্যাপারে যা করার ডেভিডই করবে। আমি হস্তক্ষেপ করব না।

এবার আমার দিকে ফিরলেন দাদী। জিজ্ঞেস করলেন, ডেভিড, তুমি ফিরে যেতে চাও এদের সঙ্গে?

দাদী, আমাকে ফিরে যেতে বলবেন না, বললাম আমি। ওরা কেউ আমাকে পছন্দ করেনি। দয়া-মায়া দেখায়নি কোনদিন। ওরা আমার মা-কে সুখ দেয়নি। পেগোটিকে শান্তি দেয়নি। আমাকে চরম হেনস্তা করেছে। ওদের সঙ্গে যেতে বাধ্য করবেন না আমাকে।

চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল মি, মার্ডস্টোনের। ক্রদ্ধভাবে আমার দাদীর দিকে আঙুল তুলে বললেন, এখানে আমি এসেছি এই প্রথম ও শেষ বারের মত। হয় ডেভিডকে নিয়ে যাব, যেমন ভাল মনে করি সেরকম ব্যবহার করব, নতুবা তাকে রেখে যাব আপনার কাছে। আপনার সঙ্গে থেকে গেলে তার ব্যাপারে আমার আর কিছুই করার থাকবে না।

মি. ডিক, বললেন আমার দাদী, আমরা এই বাচ্চাটিকে নিয়ে কি করব?

মি. ডিক ভাবলেন। একটু দ্বিধা করলেন। তারপরে হেসে বললেন, নতুন সুট বানানোর জন্য ওর মাপ নেয়ার ব্যবস্থা করব।

ধন্যবাদ, মি. ডিক, বললেন দাদী। তারপর মি. ও মিস মার্ডস্টোনের দিকে ফিরে বললেন, শুভ দিন, স্যার। শুভ দিন, ম্যাডাম। আপনাদেরকে যদি আবার কখনও দেখি আমার দরজায়, ঘুসি মেরে আপনার বনেট ফেলে দিয়ে পায়ে মাড়িয়ে দেব!

ওরা চলে যেতেই আমি ছুটে গিয়ে দাদী বেটসির গলা জড়িয়ে ধরে তাকে চুমু দিলাম। তারপর মি. ডিকের সাথে হ্যাণ্ডশেক করে তাকে ধন্যবাদ দিলাম।

এইভাবে শুরু হলো আমার নতুন জীবন। নামও নতুন হলো। দাদী আমাকে ট্রটউড কপারফিল্ড নামে ডাকতে লাগলেন।

দুজন নতুন অভিভাবক হলো আমার। দুজনেরই মন খাঁটি সোনার!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *