০৫. চুপ করে আছে ওরা

চুপ করে আছে ওরা। হাইমাসের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

স্পীকারে ডাক শোনা গেল মেরিচাচীর, কিশোর, এই কিশোর? একটা ছেলে তোর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। মেকসিকো থেকে।

মেকসিকো থেকে!

একই সঙ্গে কথাটা মনে পড়ে তিনজনের : কাকাতুয়া বিক্রি করেছে যে ফেরিওলা, তার কথায় জোরাল মেকসিকান টান ছিল।

হুড়োহুড়ি করে দুই সুড়ঙ্গ দিয়ে বেরিয়ে এল ওরা।

এই যে ও, রবিনের সমান লম্বা রুগ্ন চেহারার একটা ছেলেকে দেখালেন মেরিচাচী। মলিন প্যান্ট, শার্টের কয়েক জায়গায় ছেড়া।

এখন কাজের সময়, তাড়াহুড়ো করে অফিসে চলে গেলেন আবার চাচী।

সিনর কিশোর? জানতে চাইল ছেলেটা।

আমি, বলল কিশোর।

আমি ডিয়েগো, কড়া মেকসিকান টান কথায়, রিনরিনে সুরেলা কণ্ঠস্বর। আউ-টোটা কোথায়? দেখাবেন?

আউ-টো? বুঝতে পারছে না কিশোর।

কিন্তু মুসা বুঝে ফেলল। রোলস-রয়েসটার কথা বলছে।

ও, ওটা? গ্যারেজে, বলল কিশোর।

সোনালি আউ-টো। নিশ্চয় খুব সুন্দর। দেখতে ভারি ইচ্ছে করছে, হাসতে গিয়েও হাসল না ছেলেটা, সহজ হতে পারছে না, চোখে ভয়। আমি সিনর কিশোর, আমি গাড়ি খুব ভালবাসি। সব গাড়ি। কোন সময়, কোন একদিন আমিও একটা কিনব।

গাড়ি? দূরে কাজ করছে বিশালদেহী দুই ব্যাভারিয়ান ভাই, বোরিস আর রোভার, ইয়ার্ডের ট্রাকটা ধুচ্ছে, সেদিকে চেয়ে ছেলেটাকে বলল কিশোর, এসো আমার সঙ্গে।

দ্বিধা করল ডিয়েগো। এক মিনিট, বলে ওয়ার্কশপের কোণের দিকে চলে গেল।

উঁকি দিয়ে দেখল মুসা, এই প্রথম দেখতে পেল গাধাটা। লোহার খুঁটির সঙ্গে বাঁধা, কাছেই একটা দু-চাকার গাড়ি।

আদর করে ধূসর জানোয়ারটার পিঠ চাপড়াল ডিয়েগো।

থাক এখানে, ডিংগো। আমি আসছি।

বাক্স, ছোট ড্রাম, যে যা পেল তার ওপরই বসল চারজনে, ওয়ার্কশপে। নানারকম লোভনীয় জিনিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, চোখ বড় বড় করে দেখছে ডিয়েগো।

ডিয়েগো, বলল কিশোর, কালো একটা রেঞ্জারের কথা বলতে এসেছ?

এত জোরে মাথা কঁকাল ডিয়েগো, মুসার ভয় হলো, গলা থেকে ছিড়ে না আলগা হয়ে যায়। সি, সি, সিনর কিশোর, কাল রাতে আমার বন্ধু টিরানো দেখা করতে এসেছিল। বলল, একজন সিনর কিশোর একটা কালো, রেঞ্জারের খোঁজ জানতে চান। শেষ দুটো নম্বর ওয়ানথ্রী।

রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে তিন গোয়েন্দা।

তাদের আগ্রহী চোখের দিকে চেয়ে আশা বাড়ল ডিয়েগোর। আরও বলল..পুরস্কার দেয়া হবে।

পুরস্কার! চেঁচিয়ে উঠল উত্তেজিত মুসা, ভয় পেয়ে গেল বেচারা ডিয়েগো। নিশ্চয়ই। গাড়িটা দেখেছ? কোথায়?

দেখেছি, তিন গোয়েন্দার মুখের দিকে তাকাচ্ছে ডিয়েগো। মোটা এক লোকের। কিন্তু সে যে এখন কোথায়… আঙুলে গুনলো, এক-দুই-তিন-চার…. সাত দিন আগে দেখেছি। তারপর আর দেখিনি।

সাত দিন? ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল মুসা, হতাশ হয়েছে। কোন লাভ হলো না। এতদিন মনে রাখলে কিভাবে?

গাড়ি সাংঘাতিক ভালবাসি আমি। গাড়ি আমার স্বপ্ন। কালো রেঞ্জারটা দারুণ এক গাড়ি। লাইসেন্স নম্বর মুখস্থ হয়ে গেছে : এ কে ফোর ফাইভ ওয়ান খ্রী। লাল চামড়ায় মোড়া গদি। সামনের বাম্পারের ডানদিকে ছোট একটা ঘষার দাগ আছে। পেছনের বাম্পারে এক জায়গায় টোল খাওয়া।

ছেলেটার ওপর ভক্তি এসে গেল তিন গোয়েন্দার। গাড়ির ব্যাপারে অনেক ছেলেরই অনেক রকম হবি আছে। কয়েক বছর পরেও একটা বিশেষ গাড়ির কথা মনে রাখতে পারে, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বড় জোর কি গাড়ি আর কি রঙ, এই পর্যন্ত। কিন্তু ডিয়েগো ঠিক মনে রেখেছে লাইসেন্স নম্বর, বাম্পারের কোথায় দাগ, কোথায় টোল খাওয়া, সব। এক হপ্তা পরেও এত খুঁটিনাটি মনে রাখা সত্যি কঠিন।

পুলিশকে জানালে সহজেই খুঁজে বের করে ফেলতে পারবে, নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর। কিন্তু আমরা কথা দিয়ে এসেছি, পুলিশকে কিছু জানাব না। ডিয়েগোর দিকে ফিরল। দু-এক দিনের মধ্যে আর দেখা হয়নি না?

মাথা নাড়ল মেকসিকান ছেলেটা। তার বাদামী চোখ দুটো বিষণ্ণ। পুরস্কার পাচ্ছি না তাহলে।…গাড়িতে চড়তে পারছি না। সোনালি আউ-টো কি সুন্দর…।

হয়তো চড়তে পারবে, আশ্বাস দিল কিশোর। ডিয়েগো, মোটা লোকটাকে কোথায় কিভাবে দেখলে, বলো তো?

আমার চাচা স্যানটিনোর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। কাকাতুয়াগুলোর জন্যে।

কাকাতুয়া? বলে উঠল মুসা। তোমার চাচাই তাহলে বিলি শেকসপীয়ার আর লিটল বো-পীপকে বিক্রি করেছে।

মাথা ঝাকাল ডিয়েগো। অন্যগুলোও। সব কটারই অদ্ভুত নাম।

অদ্ভুত নাম? দ্রুত রবিনের দিকে তাকাল একবার কিশোর। নামগুলো মনে আছে?

ঘন কালো চুলে আঙুল চালাল ডিয়েগো, ওর আবার মাথা ঝাকাল। আছে। শের-লক হোমস আর রবিন হুড।

নোট বই বের করে ফেলেছে রবিন। লিখতে লিখতে বিড়বিড় করল, শারলক হোমস, রবিন হুড।

ক্যাপ্টেন কিড আর স্কারফেস, যোগ করল ডিয়েগো। স্কারফেসের এক চোখ কানা।

নাম দুটো দ্রুত লিখে নিল রবিন। ছটা হলো। আর ছিল?।

মাথা নাড়তে গিয়েও নাড়ল না ডিয়েগো, উজ্জল হলো চোখ। হ্যাঁ, হ্যাঁ, ছিল। কালোটা। ব্লাকবিয়ার্ড দা পাইরেট। সুন্দর কথা বলে। ওই একটা ছাড়া বাকি ছ-টার মাথাই হলুদ। র্যাকবিয়ার্ডের কালো।

ব্ল্যাকবিয়ার্ড দা পাইরেট! লিখে নিল রবিন। ওটার কথা বলেছিলেন বটে মিস্টার ফোর্ড। কিশোর, কি মনে হয়? সাতটাই জড়িত?

পরে জানা যাবে, জবাব দিল কিশোর। ডিয়েগো, মোটা লোকটা ওই কাকাতুয়াগুলোর জন্যেই এসেছিল?

সি।

তোমার চাচা দিয়েছেন?

না, সিনর, বিষণ্ণ ছায়া নামল আবার ডিয়েগোর চেহারায়। তার আগেই বিক্রি করে দিয়েছে চাচা। লোকটা হাজার ডলার দিতে চাইল, কিন্তু পাখি কোথেকে দেবে চাচা? দিতে পারলে তো খুবই ভাল হত, এতগুলো টাকা। রেগে গিয়ে চাচাকে যাচ্ছেতাই গালাগাল করল লোকটা। কোথায় বিক্রি করেছে, ঠিকানা জিজ্ঞেস করল। চাচা তা-ও বলতে পারল না। কি করে বলবে, বলুন? চাচা তো আর লেখাপড়া জানে না। তাছাড়া কখন কোথায় কোন পাখি বিক্রি করেছে, সব কথা কি মনে থাকে ফেরিওলার?

তারমানে বাকি কাকাতুয়াগুলোরও খোজে রয়েছে হাইমাস, দুই সহকারীর দিকে চেয়ে বলল কিশোর। মূল্যবান তথ্য।

তা বলতে পারো, একমত হলো মুসা। একটা খুঁজতে গিয়ে দুটো হারানোর খবর পেলাম। যোগ হলো আরও পাঁচটা। সবগুলোই খুঁজব, না?

ঘুরিয়ে বলল কিশোর, যেহেতু সাতটা পাখিই এ-রহস্যের অংশ, খুঁজে তো বের করতেই হবে।

কিন্তু শুধু বিলি শেকসপীয়ার আর লিটল বো-পীপকে খুঁজে দেয়ার কথা বলেছি। আমরা। এ-রহস্যের মীমাংসার দায়িত্ব তো নিইনি।

রবিন বুঝতে পারছে, অযথা মুখ খরচ করছে মুসা। মুসাও জানে সেকথা। একবার যখন কিশোর পাশা রহস্যের গন্ধ পেয়েছে, ওটার সমাধান না করা পর্যন্ত তার আর স্বস্তি নেই। রক্তের গন্ধ পেয়েছে ব্লডহাউণ্ড, ডেকে তাকে আর ফেরানো যাবে না, শেষ মাথায় পৌছাবেই।

ডিয়েগোর দিকে ফিরল কিশোর। টেলিফোন করলেই তো পারতে? কষ্ট করে রকি বীচে এলে কেন?

ভেবেছি, পুরস্কার মিলবে। জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যাব, তাই গাড়ি নিয়ে এসেছি। তাছাড়া, সিনর, ফোন করার পয়সা তো নেই আমার কাছে।

একে অন্যের দিকে তাকাল তিন গোয়েন্দা। একটা ফোন করার মত পয়সা থাকে না, এমন লোকও আছে দুনিয়ায়, বিশ্বাস করতে পারছে না। তৃতীয় বিশ্বের কিছু দরিদ্র দেশের কথা মনে পড়ল কিশোরের, বাংলাদেশের কথা মনে পড়ল, করুণ কিছু ছবি দেখেছিল পত্রিকায়। দেখে বিশ্বাসই করতে পারেনি সে, এতখানি মানবেতর জীবন যাপন করে অনেক মানুষ, ভেবেছে অতিরঞ্জিত। কিন্তু আজ বিশ্বাস করল। বাংলাদেশ কেন? এই আমেরিকাতেও তো রয়েছে সে-রকম দৃষ্টান্ত। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আর বন্যাপীড়িত অসহায় বাংলাদেশীদের কথা ভেবে মন খারাপ হয়ে গেল তার। তাছাড়া, রোজই শুনছে, দুর্বিষহ রাজনৈতিক গোলমাল চলছে বাংলাদেশে। একে তো সাংঘাতিক দরিদ্র দেশ, তারপর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তার ওপর এই গণ্ডগোল কতখানি বিপর্যস্ত করে তুলছে দেশের মানুষকে, ভাবতেই রোম খাড়া হয়ে গেল। তার। কথা বলতে পারল না কয়েক মুহূর্ত।

কিশোরকে বার কয়েক ঢোক গিলতে দেখল রবিন, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। এই প্রথম ভাল করে তাকাল ডিয়েগোর শরীরের দিকে। অস্বাভাবিক রুগ্ন দেহ, হাড়িসর্বস্ব। বলল, তুমি, বেশ কিছু মূল্যবান তথ্য জানিয়েছ, পুরস্কার তোমার পাওনাই হয়েছে। গাড়িটা খুঁজছিলাম আমরা…আচ্ছা, মোটা লোকটা, হাইমাসকোথায় থাকে বলতে পারো কিছু?

মোটা লোকটার নাম হাইমাস? উজ্জল হলো ডিয়েগোর মুখ। ভোলা পকেট হাতড়ে বের করে আনল একটা কার্ড। লোকটা যাওয়ার সময় দিয়ে গেছে চাচাকে, কার্ডটা কিশোরের দিকে বাড়িয়ে দিল সে। বলে গেছে, কাকাতুয়ারগুলোর খোঁজ পেলে যেন এই ঠিকানায় জানাই।

গলা বাড়িয়ে কার্ডের ওপর ঝুঁকে এল তিন গোয়েন্দা।

এই সময় ছাপার মেশিনের ওপর ঝোলানো লাল আলোটা জুলতে-নিভতে শুরু করল, তারমানে হেডকোয়ার্টারে ফোন বাজছে।

ডিয়েগো, বলল কিশোর, ঘুরে বসে চোখ বন্ধ করো।

অবাক হলো ছেলেটা, কিন্তু যা বলা হলো করল।

মুসা, রবিন তোমরা থাকো। আমি দেখে আসি।

দুই সুড়ঙ্গের মুখের ঢাকনা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল কিশোর। আবার জায়গামত লাগিয়ে দিল ঢাকনাটা।

ফোন তুলতেই ভেসে এল এক মহিলা-কণ্ঠ, হালো, খুব নিচু গলায় বলল, যেন তার কাছাকাছি কেউ শুনে ফেলবে, তুমি কি কিশোর পাশা? মিস্টার হাইমাসের গাড়ি খুঁজছ?

হ্যাঁ, ম্যাডাম। বলতে পারেন কোথায় আছে?

এমন এক জায়গায় আছে, যেখানে কেউ খুঁজে পাবে না, রাগ বোঝা যাচ্ছে। তুমিও খোঁজার চেষ্টা কোরো না, শুনছ? উনি খুব বদরাগী, তাঁর কাজে বাধা দিলে বিপদে পড়বে। ওঁর কাজে নাক গলাবে না, ব্যস, এই বলে দিলাম।

কিশোর কিছু বলার আগেই লাইন কেটে গেল।

ওয়ার্কশপে ফিরে এল কিশোর। বলল, ডিয়েগোর পুরস্কার দিয়ে দেব আমরা। তার বাড়ি যাব, আঙ্কেল স্যানটিনোর সঙ্গে কথা বলব। ঠিক পথেই এগোচ্ছি আমরা, বোঝা যাচ্ছে, তার শেষকথাটা রহস্যময় মনে হলো অন্য দুই গোয়েন্দার কাছে।

 

দুই ঘণ্টা পর। দুটো গাড়ির বিচিত্র এক মিছিল দ্রুত এগিয়ে চলেছে উপকূলের মহাসড়ক ধরে, দক্ষিণে। আগেরটা কুচকুচে কালো, সোনালি অলঙ্করণ, রাজকীয় রোলস-রয়েস। অবশ্যই হ্যানসন চালাচ্ছে। পেছনের সীটে বসেছে কিশোর, মুসা আর ডিয়েগো। রবিন গেছে লাইব্রেরিতে, চাকরিতে।

উত্তেজনা চেপে রাখতে পারছে না ডিয়েগো। লাল হয়ে উঠেছে গাল। বার বার ছুঁয়ে দেখছে গাড়ির ভেতরের সোনালি প্লেটিং, পালিশ করা গদির চামড়া। সোনালি রঙের ওয়্যারলেস টেলিফোনটা দেখে এমন ভাব করল, যেন ওটা অপার্থিব, স্বপ্ন দেখছে, ধরার জন্যে হাত বাড়ালেই মিলিয়ে যাবে। বিড়বিড় করল, সোনালি আউ-টো। এত সুন্দর! চড়তে পারব কল্পনাই করিনি।

এক উচ্ছ্বসিত মুহূর্তে জানাল দুই গোয়েন্দাকে, বড় হয়ে সে গাড়ির মেকানিক হবে।

রোলস-রয়েসের পেছনে আসছে স্যালভিজ ইয়ার্ডের ঝরঝরে ঐতিহাসিক (মুসা নামটা রেখেছে। শব্দটা অনেক শুনেছে কিশোরের মুখে। বাংলাদেশে কিছু হলেই নাকি সেটা ঐতিহাসিক হয়ে যায়, তাহলে ট্রাকের ঐতিহাসিক হতে বাধা কোথায়?) ট্রাক, চালাচ্ছে বোরিস। তাতে বোঝাই করা হয়েছে ডিয়েগোর পুরস্কারের টাকায় কেনা মালপত্র। ইয়ার্ড থেকেই কিনেছে সে। কি জিনিস কিনতে চায় ডিয়েগো, শুনে অবাক হয়েছিল তিন গোয়েন্দা। কিছু শক্ত তক্তা, একটা পুরানো আস্ত দরজা, একটা জানালা, কিছু তারকাটা আর টুকিটার্কি আরও কিছু জিনিস, সবই ঘর মেরামতের কাজে লাগে। মেরিচাচীর কানে কানে তখন কি ফিসফিস করেছে। কিশোর। সব জিনিসের দাম অসম্ভব কমিয়ে ধরেছেন চাচা, কিন্তু সেটা বুঝতে দেননি ডিয়েগোকে। বলেছেন, পুরানো জিনিসের দাম ওরকমই। এতকিছু কেনার পরেও পুরস্কারের পাঁচ ডলার বেঁচে গেছে, পকেটে বার বার হাত ঢুকিয়ে দেখছে ডিয়েগো, তার জন্যে এটা এখন রাজার সম্পদ।

জিনিসপত্র সব ভোলার পর সমস্যা দেখা দিয়েছিল ডিয়েগোর গাধা আর গাড়িটা নিয়ে। কি ভাবে নেয়া হবে? সমাধান করে দিয়েছে বোরিস আর রোভার। ওই দুটোও তুলে দিয়েছে ট্রাকের পেছনে। রাস্তায় লোক হাঁ করে দাড়িয়ে যাচ্ছে, কৌতূহলী চোখে দেখছে বিচিত্র মিছিলটাকে।

একটা অত্যন্ত দরিদ্র পল্লীতে এসে ঢুকল রোলস-রয়েস। ছোট ছোট কুঁড়ে, ঠেকাইকা দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে কোনমতে, বেশির ভাগই ভাঙা। একপাশে ফসলের মাঠ, ছোট। এখানেই থাকে ডিয়েগো আর তার চাচা।

গাড়ি দেখে হই-চই করে এসে ঘিরে ধরল বাচ্চা ছেলেমেয়ের দল।

জানালা দিয়ে হাত বের করে ওদের উদ্দেশ্যে নাড়ল ডিয়েগো। রোসি! চেঁচিয়ে নাম ধরে ডাকল সে। টিরাননা! নোলিটা! আমি, আরে আমি, ডিয়েগো। সোনালি আউ-টোতে চড়ছি।

হাঁকডাক শুনে ঘর থেকে আরও ছেলেমেয়ে বেরিয়ে এল, পঙ্গপালের মত ছেকে ধরল। গাড়ি থামাতে বাধ্য হলো হ্যানসন, পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে বাচ্চারা।

সবাই ছুঁয়ে দেখতে চায় রোলস-রয়েস।

তীক্ষ্ণ কণ্ঠে হুশিয়ার করল ওদেরকে ডিয়েগো, স্প্যানিশ ভাষায় ধমক-ধামক দিল। পিছিয়ে গেল ওরা।

এগোব, মাস্টার পাশা? অনুমতি চাইল হ্যানসন। আশ্চর্য শান্ত মেজাজ। অন্য ড্রাইভার হলে রেগে বাচ্চার দলকে গালাগাল শুরু করত এতক্ষণে।

না, পেছনে তাকিয়ে রয়েছে ডিয়েগো। খানিকটা ভোলা জায়গার পর পড়ো পড়ো একটা কুঁড়ে, তার পেছনে ক্ষত-বিক্ষত একটা গ্রীন হাউস। ওটাই আমাদের ঘর। গাড়ি নেয়ার দরকার কি? হেঁটেই তো যেতে পারি। পথও খুব খারাপ। এত সুন্দর গাড়িটা চোট পাবে, গদিমোড়া দেয়ালে হাত বোলাল সে।

প্রস্তাবটা মনে ধরল কিশোরের। নেমে এল তিন কিশোর।

থ্যাংক ইউ, হ্যানসন, কিশোর বলল। গাড়ি আর লাগবে না। ট্রাকে করেই ফিরতে পারব। আপনার আয় কষ্ট করে লাভ নেই? চলে যান।

বোরিস ট্রাক নিয়ে পৌঁছেছে।

তাকে বলল কিশোর, আপনি ওই বাড়িটার সামনে যান। আমরা যাচ্ছি।

স্বভাব-খসখসে গলায় হোকে (ও-কে) বলে এগোল বোরিস।

গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল হ্যানসন।

মেকসিকো থেকে যখন এল চাচা, পকেট খালি, হাঁটতে হাঁটতে বলল ডিয়েগো। এখানেই এসে উঠল। ওই বাড়িটা মাত্র পাঁচ ডলারে ভাড়া নিয়েছে চাচা। মাস মাস সেটা দিতেই অবস্থা কাহিল। এখন একমাসের ভাড়া আছে আমার পকেটে। কিছুদিন আর খাটতে হবে না চাচাকে, শুয়ে থাকতে পারলে তার কাশি ভাল হয়ে যাবে। তখন আবার ভালমত কাজ করতে পারবে।

বাড়ির পেছন দিক দিয়ে এসেছে ওরা, তাই এতক্ষণ কালো গাড়িটা চোখে পড়েনি। সামনের দিকে রাস্তায় দাড়িয়ে আছে ওটা। না, রেঞ্জার নয়, সেডান।

ভ্রূকুটি করল ডিয়েগো। গাড়ি নিয়ে কে আবার এল? কণ্ঠস্বরেই বোঝা গেল, ব্যাপার সুবিধের লাগছে না তার। দৌড় দিল।

পেছনে ছুটল কিশোর আর মুসা। কুঁড়ের আরও কাছে আসতেই ধমক শোনা গেল।

হাইমাস, গতি বাড়াল মুসা।

বল, বলছে লোকটা, জলদি বল, শুয়োর কোথাকার, নইলে ঘাড় মটকে দেব!

চাচা! চেঁচিয়ে উঠল ডিয়েগো।

দরজার জায়গায় কিছুই নেই, খোলা। ছুটে ঢুকে পড়ল ডিয়েগো। পেছনে দুই গোয়েন্দা।

মলিন বিছানায় চিত হয়ে আছে একজন লোক, নিশ্চয় আঙ্কেল স্যানটিনো। তার ওপর ঝুকে রয়েছে মোটা হাইমাস।

মনে কর ব্যাটা! আবার চেঁচাল হাইমাস। কোথায় বেচেছিস? আরগুলোর কথা নাহয় বাদই দিলাম, কিন্তু ব্ল্যাকবিয়ার্ডের কথা তো মনে থাকার কথা। অনেক ঘুরেছিস ওটা নিয়ে, সবশেষে বেচেছিস। নিশ্চয় মনে আছে তোর, বলছিস না। সেফ শয়তানী। চারটে পেয়েছি। আরগুলো কোথায়?

শিকারী কুকুরের মত গিয়ে লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ডিয়েগো।

কিন্তু টলল না দানব। হাত দিয়ে ঝেড়ে ফেলে দিল রোগা ছেলেটাকে, যেন পোকা তাড়াল। তারপর ঘুরল ঝটকা দিয়ে।

আবার এসে ঝাপ দিল ডিয়েগো।

শার্টের কলার চেপে ধরে চোখের পলকে তাকে শূন্যে তুলে ফেলল হাইমাস। অসহায় ভঙ্গিতে ঝুলে থেকে হাত-পা ছুঁড়তে লাগল ছেলেটা। মুসা আর কিশোরের দিকে চেয়ে শাসাল, খবরদার! এগোবে না। পিচকিটার ঘাড় মটকে দেব তাহলে।

থেমে গেল মুসা। কিশোরও দাড়িয়ে পড়ল।

রাগে জ্বলছে হাইমাসের চোখ। জানোয়ারের মত ঘড়ঘড় আওয়াজ বেরোচ্ছে কণ্ঠ থেকে। কলার ধরে আঁকাচ্ছেডিয়েগোকে।

সইতে পারল না পুরানো কাপড়, শার্টের কলার ছিড়ে থুপ করে মাটিতে পড়ে গেল ডিয়েগো। পড়েই দু-হাতে পা জড়িয়ে ধরল হাইমাসের।

লাথি মেরে পা ছাড়ানোর চেষ্টা করল হাইমাস, পারল না। জোঁক হয়ে গেছে যেন ডিয়েগো।

এই সুযোগ। লাফিয়ে উঠল মুসা। মাথা নিচু করে ছুষ্টি এল সে। তার বিখ্যাত কৌশল প্রয়োগ করল হাইমাসের ভূঁড়িতে।

কেঁপে উঠল যেন পাহাড়। শক্ত খুলির প্রচণ্ড আঘাতে হাঁউক করে উঠল হাইমাস। টলমল করেও সামলে নিল কোনমতে, পড়ল না।

মুসার মাথার এক গুঁতো খেয়েই বুঝে গেছে হাইমাস, ব্যাপার সুবিধের নয়। প্রাণপণে লাথি মেরে ডিয়েগোকে ছাড়িয়েই দৌড় দিল দরজার দিকে। পথরোধ করল কিশোর। কিন্তু লোকটার তুলতুলে শরীরে মোষের শক্তি। এক ধাক্কায় তাকেও ফেলে দিয়ে বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে।

কিশোরকে টেনে তুলতে গিয়ে দেরি করে ফেলল মুসা।

ছুটে বাইরে বেরোল তিন কিশোর।

স্টার্ট নিয়েছে ততক্ষণে কালো সেডান।

বোরিসের ট্রাকাটাও এসে থামল। কিন্তু লাভ নেই। মাল বোঝাই ঝরঝরে ট্রাক নিয়ে অনুসরণ করার কোন মানে হয় না, ধরা যাবে না সেডানটাকে।

ইস, আফসোফ করল মুসা, বোরিস নামা পর্যন্ত যদি আটকে রাখা যেত ব্যাটাকে…

হ্যানসন থাকলেও হত, পিছু নিতে পারতাম, হাঁপাচ্ছে কিশোর। কি আর করা। তবে ব্যাটার কার্ড আছে আমাদের কাছে, নামধাম আছে। কদিন পালিয়ে থাকবে? দেখেছ, কেমন রেগে যায়?

হাইমাস না ওটা, হিপোপটেমাস, মাথা ডলছে মুসা। ভুড়ি তো না, মনে হলো রবারের ব্যাগের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিতা, ব্যাটা রাগলে আমাদের কি লাভ?

ভয় থেকেই জন্ম নেয় রাগ, ব্যাখ্যা করল কিশোর। ভয় পেয়েছে ব্যাটা। আর তোমার গুতো খাওয়ার পর তো আরও চমকে গেছে।

আমাদের ভয় পায় বলতে চাইছ? মুসা বলল। আর আমরা?

নারভাস, বাট কনফিডেন্ট, অন্যমনস্ক হয়ে গেছে কিশোর।

কি বললে এটা? ইংরেজি না গ্রীক?

জবাব না দিয়ে ঘুরল কিশোর।

চাচাকে পানি খাওয়াচ্ছে ডিয়েগো।

ঘরে একটা মাত্র নড়বড়ে চেয়ার, উল্টে পড়ে আছে। তুলে সোজা করে রাখল। ওটা মুসা।

তাদের দিকে ফিরে তাকাল স্যানটিনো। কাশল কয়েকবার। তারপর বলল, তোমরা আমাকে বাঁচিয়েছ। নইলে মেরেই ফেলত। আবার কাশতে শুরু করল।

থাক থাক, কথা বলবেন না, হাত তুলল কিশোর।

ব্ল্যাকবিয়ার্ডের খোঁজ নিতে এসেছিল মোটকাটা, বলল ডিয়েগো। মনেই রাখতে পারে না কিছু চাচা, বলবে কি? তবে সেদিন বলেছিল, কোন এলাকায় নাকি কোন একটা বাড়ি থেকে তিন-চার ব্লক দূরে এক মহিলার কাছে বিক্রি করেছে, পাঁচ ডলারে। আর কেউই কিনতে চায়নি, তাই এত কমে দিয়ে এসেছে।

মোটকা বেশি রেগে গিয়েছিল, বলল মুসা। কিছু একটা ব্যাপার আছে। পাখিগুলোর। ওই ব্যাটা জানে।

এবং ব্যাপারটা খুব জরুরী, যোগ করল কিশোর, খুব মূল্যবান তার কাছে। কিন্তু কি…

বাধা দিল বোরিস। দরজায় এসে দাড়িয়েছে। জিজ্ঞেস করল, মাল নামাব?

হ্যাঁ, নামান, বলল কিশোর। বোরিসের পেছনে এসে দাঁড়ালেন এক বয়স্ক মহিলা, হাতে কার্ডবোর্ডের একটা বাক্স, তাতে ঘোট ঘোট অসংখ্য ছিদ্র, ঝাঝরির মত।

পথে হাত তুললেন মহিলা, বলল বোরিস, এদিকেই আসছিলেন। তুলে নিলাম। সেজন্যেই আমার আসতে দেরি হয়েছে।

কই, সে ধোকাবাজটা কই? দুই গোয়েন্দার দিকে চেয়ে বললেন মহিলা। ফেরিওলার বাচ্চা, স্যানটিনো না ফ্যানটিনো?

মুসা আর কিশোরকে সরিয়ে এগিয়ে এল ডিয়েগো। চাচার শরীর খারাপ। কেন?

টাকা ফেরত চাই! কড়া গলায় বললেন মহিলা। পাখির ব্যবসা করে না ঠকবাজি করে? কাকাতুয়া বলে দিয়ে এসেছে একটা স্টারলিং। ভাগ্যিস আমার জামাই এসেছিল। পাখি চেনে। বলল এটা কাকাতুয়া না, হাতের বাক্সটা ডিয়েগোর হাতে ধরিয়ে দিলেন তিনি। দাও, আমার পাঁচ ডলার ফেরত দাও। নইলে পুলিশের কাছে যাব।

মুখ কালো হয়ে গেল ডিয়েগোর। বাক্সটা মুসার হাতে দিয়ে পকেট থেকে বের করল পাঁচ ডলার, দিয়ে দিল মহিলাকে। এই যে, নিন আপনার টাকা। যান এখন।

হুঁ, এবারের মত মাপ করে দিলাম, গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেলেন মহিলা।

দুই গোয়েন্দার দিকে ফিরল ডিয়েগো। নিশ্চয় ব্ল্যাকবিয়ার্ড। কি পাখি ওটা, আমিও চিনি না, চাচাও না। কোন ধরনের কাকাতুয়াই হবে।

মুসার কাছ থেকে নিয়ে বাক্সটা খুলল সে। ফুড়ুত করে বেরিয়ে সোজা গিয়ে মুসার কাধে বসল কালো পাখিটা, উজ্জ্বল হলদে ঠোর্ট।

স্টারলিং কোথায়? চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। জামাইও পাখি চেনে না। এটা ময়না। কাকাতুয়ার চেয়ে ভালভাবে কথা শেখে, বলতে পারে। ভাল ট্রেনিং পাওয়া ময়নার দাম কাকাতুয়ার চেয়ে বেশি।

আয়্যাম ব্ল্যাকবিয়ার্ড দা পাইরেট! খসখসে কঠিন কণ্ঠে বলে উঠল ময়না, যেন সত্যিই একজন জলদস্য।. আহ্যাভ বারিড মাই ট্রেজার হোয়্যার ডেড ম্যান গার্ড ইট এভার। ইয়ো-হো-হো অ্যাণ্ড অ্যা বটল অভ রাম! তারপর মুখ খারাপ করে গাল দিল কয়েকটা, যা জলদস্যুকেই মানায়।

ব্ল্যাকবিয়ার্ড! বলল উত্তেজিত কিশোর। এটার জন্যেই খেপে গিয়েছিল তখন হাইমাস।

খুব খিদে পেয়েছে যেন ময়নাটার, তাকাল এদিক ওদিক।

ধারেকাছে কোন খাবার নেই, মুসার কানটা খুব লোভনীয় মনে হলো তার কাছে। দিলে কষে এক ঠোকর, লতি ছিড়ে আনার জন্যে।

আউফ, মেরে ফেলেছেরে! বলে মুসা দিল চিৎকার।

ভয় পেয়ে উড়ে গেল ময়নাটা, বেরিয়ে গেল খোলা দরজা দিয়ে।

গেল, মাথা কাত করল কিশোর। মুসা, একটা মূল্যবান সূত্র তাড়ালে।

আমি কি করব? রুমাল দিয়ে কানের লতি চেপে ধরেছে মুসা। ফুটো করে ফেলেছে কান। এই দেখো না, রক্ত।

প্রায় ছুটে বাইরে বেরোল কিশোর।

কিন্তু কোথাও দেখা গেল না ময়নাটাকে। চলে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *