০৫. ঘুরেই গুলি করেছে স্যাভি

ঘুরেই গুলি করেছে স্যাভি। তাড়াহুড়ো করে গুলিটা করেছে সে। একটু আগে জাভেদ যেখানে ছিল সেখানে গিয়ে লাগল গুলিটা

একেবারে বোকা বনে গেছে জাভেদ! এমনটা কখনও আশা করেনি সে। ওর ধারণা ছিল ওদের মারার আগে অন্তত কয়েক মিনিট বড় বড় কথা বলবে আর বাহাদুরি দেখাবে স্যান্ডি। কিন্তু সেসব কিছু না করে ঘুরেই সোজা গুলি করেছে সে। ক্ষিপ্রতার সাথে গুলি করলেও ঠিক জায়গা মতই গেছে ওটা।

আগুনে কাঠের জোগান দেওয়ার জন্য উবু হয়ে বসেছিল জাভেদ। বুলেটটা ওর মাথার উপর দিয়ে চলে গেল।

ডাইভ দিয়ে পড়ে জেনির হাত থেকে বাড়িয়ে ধরা পিস্তলটা নিয়ে একপাক গড়িয়েই গুলি করল জাভেদ।

লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।

এত কাছে থেকে গুলি করেও স্যান্ডির মতই তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে মিস করল জাভেদ। কিন্তু তার দ্বিতীয় গুলিটা স্যান্ডির গলা ফুড়ে ঢুকে কানের একটু উপর দিয়ে ছিড়ে বেরিয়ে গেল।

নিজের সফলতা সম্পর্কে একেবারে নিশ্চিত ছিল স্যান্ডি। জাভেদকে শেষ করে তার মুখের বর্তমান অবস্থার জন্য জেনির উপর নির্যাতন চালিয়ে তার শোধ নেবে ভেবে ঘুরেই গুলি করেছিল সে। আর একমুহূর্ত পরেই এখন তার মুখ দিয়েই গলগল করে রক্ত পড়ছে, মরতে বসেছে ও। বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে চেহারা, কী ঘটছে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না স্যান্ডি।

যন্ত্রচালিতের মতই দ্বিতীয়বার গুলি করল সে। সোজা গিয়ে আগুনে ঢুকল বুলেট, চারদিকে আগুনের ফুলকি ছিটে পড়ল। তারপরেই তার হাতের আঙুল ফসকে পড়ে গেল পিস্তলটা। জাভেদের দিকে চেয়ে ভীত সন্ত্রস্ত চোখে কী যেন বলার চেষ্টা করল-মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে তার বুঝে ফেলেছে সে।

হাটু ভাজ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল স্যান্ডি। মাথাটা আগুনের দিকে, পা দুটো রইল গুহার বাইরে তুষারের মধ্যে। তৈরি হয়ে পিস্তল হাতে ফিরল জাভেদ। সামনেই, বার্ট পড়ে আছে মাটিতে, মাথা থেকে রক্ত চুয়ে পড়ছে। একটা জ্বালানি কাঠ তুলে নিয়ে ওর মাথায় আঘাত করেছে জিকো

ফ্যাকাসে হয়ে গেছে জেনির মুখ। স্যান্ডির মৃতদেহের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল সে। কিছু গরম গরম খাবার দরকার আমাদের, বলতে বলতে কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে গেল মেয়েটা। আমি

জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবে বুঝতে পেরে জাভেদ চট করে এগিয়ে গিয়ে ধরে ফেলল ওকে। কয়েক মুহূর্ত জাভেদের বুকে সেঁটে থেকে নিজেকে জোর করে সামলে নিল জেনি। আর একটু হলেই ঝামেলা বাধিয়েছিলাম, বলল সে একটু অপ্রস্তুত ভাবে। এখন ঠিক হয়ে গেছে।

এরই মধ্যে উইঞ্চেস্টারটা হাতে তুলে নিয়েছে জিকো। বলে উঠল, তোমার কি মনে হয় ম্যাট গোলাগুলির শব্দ পেয়েছে, জাভেদ?

পেয়েছে, তবে সে আর ফিরে আসবে বলে মনে হয় না আমার।

এগিয়ে গিয়ে স্যান্ডির মৃতদেহটা পা ধরে টেনে বাইরে নিয়ে তুষার দিয়ে ঢেকে দিল জিকো। ফিরে এসে যাবার জন্য যা যা নেওয়া দরকার সব একে একে গুছাতে আরম্ভ করল সে।

বার্টের দিকে দেখিয়ে জাভেদ বলল, ওর জন্যে কিছু খাবার রেখে দাও। আমাদের কোন ক্ষতি করেনি ও। আমরা গুপ্ত ক্যাম্পে পৌঁছে অনেক খাবার পাব।

নিজের জিনিসপত্রও গুছিয়ে নিয়ে রাইফেল আর পিস্তলের ম্যাগাজিনে গুলি ভরে নিল জাভেদ। তারপর তার বাওই ছুরিটা হাতে করে বাইরে বেরিয়ে গেল গাছের কয়টা ডাল কাটতে।

চারটা ডাল কেটে নিয়ে আরও দুটো আনার জন্য আর একটা গাছের দিকে গেল জাভেদ। প্রত্যেকটা ডালই প্রায় সাতফুট লম্বা, মোটা থেকে ধীরে ধীরে একেবারে সরু হয়ে গেছে মাথার দিকে-ঠিক চাবুকের মত। ডালগুলো থেকে ছোট ছোট শাখাগুলো হেঁটে ফেলে দিয়ে সাবধানে একে একে সেগুলোকে আগুনে গরম করল সে। সবগুলো গরম করা হলে চিকন দিকটা ঘুরিয়ে এনে গোড়ার সাথে বাধল। ওগুলো দেখতে অনেকটা গোল আকৃতির হলো।

কাঠামোটার উপর চামড়ার দড়ি দিয়ে বুনে মাকড়সার জালের মত তৈরি করল সে। জিকোও তার দেখাদেখি লেগে গেল কাজে। জেনি ব্যস্ত রইল রান্নার কাজে। খাবার তৈরি হতেই ওরা সবাই খেয়ে নিয়ে আবার কাজে লাগল। কিছুক্ষণ পরেই বার্টের জ্ঞান ফিরে এল।

চোখ খুলে গুহার ছাদটার দিকে চেয়ে রইল সে একমুহূর্ত। তারপরে ঝট করে উঠে বসেই দুহাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে বোকার মত এদিক ওদিক চাইল। বার্ট। মাথার ভিতরটা দপদপ করছে।

জাভেদের উপর এসে ওর দৃষ্টি স্থির হলো।

ঝামেলা করলে তোমাকেও ওখানে তোমার সঙ্গীর পাশে শুইয়ে রাখা হবে, স্যান্ডির কবরটা দেখিয়ে বলল জাভেদ। আর সুবোধ বালকের মত চললে যাওয়ার সময়ে তোমার জন্যে দুদিনের খাবার রেখে যাব আমরা। জ্বালানি কাঠও প্রচুর আছে এখানে, সুতরাং অসুবিধা হবে না তোমার। এই তুষারের মধ্যে এ জায়গা। ছেড়ে যেতে চাইলে বুঝব তোমার মাথায় দোষ আছে।

ওকে আমার কোনদিনই পছন্দ হত না, মাথা ঝাঁকিয়ে কবরের দিকে ইঙ্গিত করে বলল বার্ট।

ঠিক আছে, বলল জাভেদ। তোমার সাথে আমাদের কোন বিরোধ নেই, তুমি ভাল থাকলে আমাদেরও ভালই পাবে।

কোন জবাব না দিয়ে বার্ট আবার শুয়ে দেয়ালের দিকে মুখ ফেরাল।

বিকেলের দিকে বেরিয়ে পড়ল ওরা। জাভেদ পথ দেখিয়ে আগে আগে চলেছে। সোজা দক্ষিণ দিকে এগুচ্ছে ওরা। স্নো-শুগুলো, ওদের কেবিনের ধারে মেসার গুপ্ত-ক্যাম্প পর্যন্ত টিকলেই রক্ষা।

সহজ গতিতে চলেছে ওরা। শীতের দেশে ঠাণ্ডায় দিন কাটাতে গিয়ে মানুষকে অনেক কিছুই শিখতে হয়-জাভেদও শিখেছে। প্রথম কথা হচ্ছে কখনও ঠাণ্ডার মাঝে পথ চলতে গিয়ে ঘামতে নেই। কারণ ঘামলে সেই ঘাম কাপড়ের নীচেই বরফে পরিণত হবে গতি কমালে বা থামলে। ভিতরে যদি একবার বরফ জমে তবে তাড়াতাড়ি কোন আশ্রয়ে যেতে না পারলে মারা পড়বে নির্ঘাত।

এটাও শিখেছে যে খুব বেশি জামা-কাপড় পরতে নেই। ঢিলা পোশাক পরাই বাঞ্ছনীয়। এতে চামড়ার উপরে একটা গরম বাতাসের পরত আটকে থাকে, তাতে ঠাণ্ডা অনেক কম লাগে। এস্কিমোরা অনেক আগে থেকেই জানে এই চালাকি, উত্তরের ইন্ডিয়ানদেরও একথা অজানা নেই। মানুষ যে-কোন দেশেই সফল ভাবে বেঁচে থাকতে পারে যদি সে তার সাধারণ জ্ঞান আর শিক্ষাকে কাজে লাগায়।

খুব ঠাণ্ডা পড়েছে। বাতাসটা নির্মল। সমুদ্র থেকে আট হাজার ফুট উপরে আছে ওরা। এই অবস্থায় বহু মাইল দূরের শব্দও বেশ পরিষ্কার শোনা যাবে। জাভেদ জানে, শীতই এই লড়াইয়ে তার সবচেয়ে বড় সহায়

তাদের অনেক নীচে দিয়ে গভীর তুষারের সাথে লড়তে লড়তে কেবিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ম্যাট। এতক্ষণে নিশ্চয়ই তার বোঝা হয়ে গেছে জাভেদ যে সব কথা বলেছিল তার প্রত্যেকটি সত্য। ওই ছোট টাট্ট ঘোড়াটা আর বেশিক্ষণ ম্যাটের মত ভারি ওজনের মানুষকে এই তুষারের ভিতর বইতে পারবে না। এরই মধ্যে পায়ে হেঁটে এগুতে বাধ্য না হলেও ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই যে তার তাই করতে হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

ভাল আবহাওয়া থাকলে ওই আট মাইল পার হতে দুই ঘণ্টার বেশি কোনমতেই লাগত না তার। কিন্তু বরফের মধ্যে তাকে যেদিকে তুষার কম গভীর সেই সব জায়গা বেছে নিয়ে এগুতে হবে। অনেক মাইল ঘুরে যেতে হবে। কপাল খুব ভাল হলে সে হয়তো রাত হবার আগে র‍্যাঞ্চে পৌঁছতে পারবে।

হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। ধীর গতিতে আগে বাড়ছে জাভেদ ইচ্ছে করেই। কিছুদূর চলার ফলে শরীর কিছুটা গরম হওয়ায় এখন সহজ গতিতে চলতে আর কোন কষ্ট হচ্ছে না ওদের। এই এলাকাটা জাভেদের খুব পরিচিত, বেছে বেছে যে-সব জায়গায় তুষার কম জমেছে সেই সব উঁচু এলাকা দিয়ে সে সবাইকে দক্ষিণে নিয়ে চলেছে।

বাতাসের বেগ অনেকটা বেড়েছে এখন। আকাশটা এখনও মেঘাচ্ছন্ন ধূসর। আকাশ দেখে কিছুই বোঝার উপায় নেই। উঁচু ঢিবি এলাকা ছেড়ে এবার নিচু এলাকায় ঘন জঙ্গলে ঢুকল ওরা। বাতাস আরও জোরে বইতে আরম্ভ করেছে।

কতদূর এসেছে ওরা? পাচ, কি ছয় মাইল? এখন দিন অনেক ছোট, অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে আর বেশি বাকি নেই। তিন ঘণ্টা যাবৎ পথ চলছে ওরা।

ঝামেলা হবে মনে হচ্ছে, জাভেদ, হঠাৎ থেমে দাড়িয়ে বলে উঠল জিকো। দেখেছ কেমন বাতাস উঠেছে?

শুধু শুধু কষ্ট করে লাভ নেই, জবাব দিল জাভেদ। আমরা একটা ভাল জায়গা বেছে নিয়ে রাতের জন্যে আস্তানা গাড়ব।

এগিয়ে চলল ওরা আবার

বাতাস আরও বাড়ছে। ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাঁপটায় ওদের মুখ লাল হয়ে উঠল। মনে হচ্ছে যেন নাক আর কান শীতে জমে পথে কোথাও পড়ে গেছে। ওগুলো আছে বলে মালুমই হচ্ছে না।

একটা বিশাল মরা গাছ উপড়ে পড়ে আছে দেখে আবার থেমে দাড়াল জিকো। গাছের গুড়িটা প্রায় সাত-আট ফুট চওড়া হবে। ওটা উপড়ে পড়ায় একটা উঁচু দেয়ালের মত সৃষ্টি হয়েছে।

বিনা বাক্যব্যয়ে জাভেদ আর জিকো জঙ্গল থেকে ছুরি দিয়ে ডালপালা কেটে এনে গাছের গায়ে একটা আশ্রয় তৈরি করে নেওয়ার কাজে লেগে গেল। মোটা মোটা কয়টা কাঠের টুকরো এনে আগুন জ্বালাবার একটা জায়গা করে নিল তুষারের উপরেই।

আর কয়মাইলই বা বাকি ছিল? বলে উঠল জেনি। একবারে ওখানে পৌঁছে নিলেই তো হত?

সেখানেও ঠাণ্ডার মধ্যেই ঘুমাতে হত আমাদের। অযথা ক্লান্ত হয়ে কী লাভ? ক্লান্ত মানুষই সাধারণত মারা পড়ে ঠাণ্ডায়। ঠাণ্ডার যাত্রীরা যদি সবাই এইকথা মেনে চলত তবে খুব কম লোকই মারা পড়ত।

কিন্তু ঠাণ্ডার মধ্যে ঘুমালে মানুষ জমে যাবে না?

একেবারে অবসন্ন দেহ না হলে সে সম্ভাবনা কম। শরীরের সব তাপ যদি চলার কাজেই খরচ হয়ে যায় তখন আর ঠাণ্ডার সাথে যুঝবার মত তাপ অবশিষ্ট থাকে না। তাই বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ার আগেই থামা উচিত। এমনও সময় গেছে যখন শূন্যেরও পঞ্চাশ ডিগ্রী নীচের তাপমাত্রায় বাইরে ঘুমিয়েছি আমি।

আগুনের চারপাশে বসে ফুটন্ত গরম কফির সাথে মাংস খেলো ওরা। ডাল পাতার তৈরি ছাদের উপর তুষার পড়ে বাতাস আর ঠাণ্ডা থেকে কিছুটা আড়াল করেছে ওদের। ক্যাম্পের বাইরে বাতাস মাটি থেকে তুষার তুলে উড়িয়ে নিয়ে চলেছে। আর এক কাপ করে কফি খেয়ে শেষ করার আগেই বাতাস ঝড়ের আকার নিল। সময় মত আশ্রয় নিয়েছে ওরা।

.

জাভেদের র‍্যাঞ্চে কেবিনের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে চেয়ে আছে নীনা পেজ। ভীষণ ঠাণ্ডা। ভয় পেয়েছে নীনা। বাইরের চেয়ে বেশি ঠাণ্ডা ওর ভিতরে। কেবিনটা আরামদায়ক আর গরুম, কিন্তু ওর ভিতরের ঠাণ্ডা দূর হচ্ছে না। রাগ, ঘৃণা আর ভয়, সব মিলে ভিতরটা ঠাণ্ডা হয়ে জমে গেছে যেন।

অ্যালেক বসে আছে তার পিছন দিকের টেবিলে। ম্যাট বসে আছে অ্যালেকের উল্টো দিকে। মাত্র কয়েক মিনিট আগেই এসে পৌঁছেচে বিশাল মানুষটা। ক্লান্তি আর অবসাদে প্রায় ভেঙে পড়েছে সে। পথ হারিয়ে সারারাত ধরে ঘুরেছে ও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তুষারের মধ্যে চলার পর ঘোড়াটা পথেই মারা গেছে। কপালগুণে কয়েকটা গাছ পেয়ে তার আড়ালে আগুন জ্বেলে রাত কাটিয়েছে ও। ক্লান্তিতে টলতে টলতে কোনমতে র‍্যাঞ্চে এসে পৌঁছেচে ম্যাট। কীভাবে যে ঝড়ের রাতটা কেটেছে আর কেমন করেই বা সে শেষ পর্যন্ত খামারে পৌঁছেচে তা সে নিজেও জানে না।

তা হলে খতম হয়েছে ব্যাটা, অ্যালেকের সন্তুষ্ট কণ্ঠস্বর কানে গেল নীনার। কেন যেন ওর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। অকারণেই রেগে গেল সে।

বিশ্বাস করি না আমি, বলে উঠল নীনা। ওর লাশ না দেখা পর্যন্ত আমি কিছুতেই বিশ্বাস করব না জাভেদ মারা গেছে।

বোকার মত কথ বোলো না, চোখ তুলে ওর দিকে চাইল অ্যালেক। ওর চোখ দুটো জানালা দিয়ে আসা আলো পড়ে চকচকে সাদাটে দেখাচ্ছে। স্যান্ডি নিজের হাতে মারতে চেয়েছিল ওকে-সুযোগ সে পেয়েছে। এরচেয়ে বেশি আর কী প্রমাণ দরকার?

উঠে দাড়িয়ে জানালার ধারে এগিয়ে গেল অ্যালেক। এবার র‍্যাঞ্চ করা ছাড়া আর কোন কাজ থাকল না তোমার, ম্যাট। গরু-মহিষ দেখাশোনা করার জন্যে চারজন লোক দেয়া হবে তোমাকে।

অবাক হয়ে ম্যাট ফিরে চাইল অ্যালেকের দিকে।

আর অন্যেরা?

ওদের ব্যবস্থা আমি করব। তুমি চোখ কান বুজে থাকলেই চলবে।

কথাটা নিজের মনে উল্টেপাল্টে ভেবে দেখল ম্যাট। বানান করে বলে দেওয়ার দরকার নেই-ইঙ্গিতটা ঠিকই বুঝেছে সে। অবশ্য অ্যালেকের মত লোকের কাছ থেকে এই রকমই একটা কিছু আশা করেছিল ও

সময় খুব খারাপ, শান্ত ভাবেই বলল ম্যাট। তোমার ওই ফন্দি কাজে লাগালে বিপদ হতে পারে।

মৃদু হেসে নায়কের মত জ্যাকেট সরিয়ে বেল্টের ফাঁকে দুই বুড়ো আঙুল ঢুকিয়ে দাঁড়াল সে। বলল, তুমি বুঝতে পারছ না, ম্যাট। এই র‍্যাঞ্চটা লোকালয় থেকে অনেক দূরে। উত্তরে রয়েছে অনেক ইন্ডিয়ান ট্রেইল-এখান থেকে সহজেই ডেনভার, লেডভিল বা অন্য ডজনখানেক জায়গার যে-কোনখানে যাওয়া যাবে। এই পথে যাতায়াতও করে না কেউ।

মোট কথা একেবারে নিখুঁত। চট করে যে-কোন একটা মাইনিং শহরে গিয়ে সোনা লুট করে ঘুর পথে ফিরে আসতে পারব আমরা। একবার দেখেই আমি চিনেছি, আমাদের জন্যে একেবারে আদর্শ জায়গা এটা। সোনা হাতে নিয়ে বসে আছে ওরা আমাদের জন্যে। টাকা কামানোর এর চেয়ে সহজ উপায় আর নেই।

তোমার এই বুদ্ধি কাজে লাগবে না, জাভেদের কথা যদি সত্যি হয়, তবে একটা সরকারী অনুসন্ধান অবশ্যই চালানো হবে।

কাঁধ ঝাঁকাল সে। বয়েই যাবে আমাদের, জানো তো জোর যার মুল্লুক তার। আমাদের সাথে কেউ লাগতে আসার সাহস পাবে না। জাভেদ নেই, আমরাও সময় মত খাজনা দিয়ে সৎ লোকের মত র‍্যাঞ্চার সেজে থাকব, চিন্তা কি আমাদের?

না।

হঠাৎ নীনার গলা শুনে দুজনেই ফিরে তাকাল। অ্যালেক কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু নীনাই আবার বাধা দিল তাকে।

না, অ্যালেক, আমি এতে রাজি নই।

তবে কী করবে তুমি? কোন বারে বার-মেইড় হবে, নাকি রেস্তোরাঁর ওয়েট্রেস হবে? তোমার জন্যে তো আর কোন কাজ দেখি না আমি।

চুপ করে রইল নীনা। তুষারের মধ্যে তার পশুর দল এদিক ওদিক চলে গেছে বেশ কিছু মারাও পড়েছে সন্দেহ নেই। জাভেদের কথাই সত্যি। ওর কথাগুলো এমনভাবে অক্ষরে অক্ষরে ফলতে দেখে লোকটার উপর রাগই ধরেছে তার।

জাভেদের অনুপস্থিতিতে এখন সব রাগ গিয়ে পড়ল অ্যালেকের উপর। সে যে তাকে এতদিন বোকা বানিয়ে এসেছে তা বুঝতে আর বাকি নেই নীনার। অ্যালেকের এই র‍্যাঞ্চ দখল করা, জাভেদকে হত্যা করা, এসবে যে তার আপত্তি ছিল তা নয়, কিন্তু এখন সে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে সব কিছুর পিছনেই অ্যালেকের নিজস্ব আলাদা প্ল্যান ছিল। নীনার সাথে জড়িয়ে আসলে নিজের মতলব হাসিল করার তালেই ছিল অ্যালেক।

আগেও কয়েকবার নীনার মনে নানা সন্দেহ জেগেছে অ্যালেকের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া দিনগুলো সম্বন্ধে। এখন সে নিশ্চিত। উপায় নেই তার, হয়তো অ্যালেকের প্ল্যানে কাজ হতেও পারে। সবাই জানে, কলোরাডো আর নেভাডার মাইনি? শহরগুলো অনেক সোনা আছে। তা ছাড়া এটা একটা সম্পূর্ণ নিরাপদ আস্তানা। কেউ এদিকে আসলে বহুদূর থেকেই দেখা যাবে তাকে। হ্যাঁ, কাজ হতে পারে। খুব জলসি বড়লোক হবার খুব সুন্দর উপায়। ঝুঁকিও র‍্যাঞ্চ চালাবার প্রায় সমানই।

জাভেদ মরে গেছে। ওর উপর রাগ ছিল-ওকে ভয়ও ছিল নীনার। কিন্তু মরে গেছে সে। ভিতবটা কেমন যেন খালি খালি মনে হচ্ছে নীনার। অদ্ভুত অজানা একটা অনুভূতি। কারও সম্বন্ধে এমন করে ভাবেনি সে, অথচ সে নিজেই প্রথম জাভেদকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু এখন কেন যেন অন্তরের অন্তস্তল থেকে অনুশোচনা আসছে, মনে হচ্ছে যেন তার জীবন থেকে অমূল্য কিছু খোয়া গেছে।

জানালার ধার থেকে ওদের কথা শুনতে শুনতে ম্যাটের গররাজি ভাব বুঝতে পেরে নীনার নতুন করে মনে পড়ল, আগেও সে অনেকবার ওর ব্যাপারে অ্যালেককে সাবধান করেছে। আজ আরও ভাল করে উপলব্ধি করল, ম্যাটের উপর র‍্যাঞ্চের কাজ ছাড়া এদিক ওদিক অন্য কোন কাজ চাপালেই সে বিগড়ে যাবে।

কী হয়েছে নীনার? গত কয়েকদিনে কেমন করে যেন ধীরে ধীরে দলের নেতৃত্ব ওর হাত থেকে অ্যালেকের হাতে চলে গেছে। তার মানসিক অনিশ্চয়তার সুযোগে নীরবে চতুরতার সাথে কর্তৃত্ব নিয়ে নিয়েছে অ্যালেক। ওকে ঘৃণা করে নীনা। ওকে হাতের মুঠোয় রেখে ইচ্ছে মত চালিয়ে নিজের কাজ করিয়ে নিতে পারবে ভেবেছিল সে। এখন দেখা যাচ্ছে সে-ই উল্টো নীনাকে ব্যবহার করছে নিজের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসাবে। যাই হোক, একটা কিছু করা দরকার।

কিছু করারই বা দরকার কী?

চুপচাপ থেকে ওকে ডাকাতিগুলো করার সুযোগ দিলেও মন্দ হয় না। যখন যথেষ্ট টাকা জমবে তখন ওর ব্যবস্থা করার জন্য একজন বন্দুকবাজ ভাড়া করলেই চলবে। তারপর স্যান ফ্রানসিসকো, নিউ ইয়র্ক, প্যারিস, ভিয়েনা-আর অফুরন্ত টাকা।

এতে তার কোন ঝুঁকি নেই। যদি ধরা পড়ে চোটটা ম্যালেকের উপর দিয়েই যাবে। সে স্রেফ মানা করে দেবে যে এসবের ৫ ই জানে না…নির্ঝঞ্ঝাট র‍্যাঞ্চার সে, আর ম্যাট তার ফোরম্যান…তার সলতার সুযোগ নিয়েই অ্যালেক এইসব করেছে। হ্যাঁ, কাজ হবে এতে। গুছিয়ে কাজ সারতে পারলে সবকিছুই তার স্বপক্ষে চলে আসবে।

ম্যাট, এখন থেকেই তার প্রস্তুতি নিতে হবে। ঝড় থেমে গেলেই দুজন লোক নিয়ে আমাদের স্টক কী আছে না আছে ভাল মত খবর নেবে। তা যাদের আবার নতুন করে গড়ে তুলতে হবে সব।

ম্যাট চলে গেলে পর নীনা এগিয়ে এসে টেবিলে বসল। অ্যালেক তার দাঁতে কামড়ে ধরা চুরুটটা রোল করে ঠোঁটের ডান কোণে এনে নীনার দিকে চেয়ে হাসল। আজ ওর মনটা খুব খুশি। অনেক দিন অপেক্ষাব পর আজ সে বিজয়ী। এখন থেকে সে-ই চালাবে সবকিছু, হাবভাবে সে বুঝে নিয়েছে যে নীনাও মনে মনে তার কর্তৃত্ব স্বীকার করে নিয়েছে।

সামনের মাসের পাঁচ তারিখে সোনার একটা চালান যাবে লেডভিল থেকে ডেনভারে, বলল সে। কিন্তু চালানটা ডেনভারে পৌঁছবে না।

বুলেটটা ঠিক টেবিলের মাঝখানে আঘাত করে ঝনঝন শব্দে একটা গ্লাস ভেঙে বেরিয়ে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে টেবিলের উপর গুলির দাগটার দিকে বড় বড় চোখে চেয়ে রইল নীনা।

দ্বিতীয় বুলেটটা বাতিতে লেগে ওটা উল্টে পড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ল ঘরটাতে। চট করে উঠে একটা কম্বল দিয়ে কয়েকটা বাড়ি দিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলল অ্যালেক।

অন্ধকারে মেঝেতে উবু হয়ে বসল ওরা। ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে নীনার। ঘনঘন নিঃশ্বাস পড়ছে ওদের দুজনেরই। ধোয়া, তেল আর কম্বলের পশম পোড়া গয়ে বাতাসটা ভারি হয়ে উঠেছে।

খুব বেশি চালাক তুমি, ব্যঙ্গ করে বলে উঠল নীনা। অনেক মুরোদ তোমার, অ্যালেক! গর্দভ কোথাকার! জাভেদ বেঁচে আছে এখনও-আবারও ব্যর্থ হয়েছ তুমি। মরেনি জাভেদ!

সাথে সাথে কোন জবাব এল না অ্যালেকের মুখে। অন্ধকারে হামাগুড়ির ভঙ্গিতে বসে রাগে আর অপমানে বুদ্ধি লোপ পেল তার। লাফিয়ে বেরিয়ে পড়ে ওকে পিটিয়ে মেরে ঠাণ্ডা করতে ইচ্ছে করছে ওর। কিন্তু শত্রু ওর নাগালের বাইরে অন্ধকার কোথায় আছে জানে না সে।

হতেই পারে না! প্রতিবাদ করল অ্যালেক। নিশ্চয়ই অন্য কেউ হবে। এ একেবারেই অসম্ভব!

কী চমৎকার তোমার প্ল্যানিং, কত নিখুঁত! কী করে যে তুমি পারো, ভেবে অবাক হই আমি।

চুপ করো! নিচু ভয়ঙ্কর স্বরে ধমক দিল অ্যালেক। এর আগে কখনও ওর এমন বুক-কাঁপানো গলা শোনেনি নীনা। আমি বলছি ও ব্যাটা মরেছে। ওটা হয়তো ওর সাথের দো-আঁশলা জিকো বা অন্য কেউ হবে

অন্ধকারে অপেক্ষা করছে নানা, দুরুদুরু বুকে আরও গুলির আশঙ্কা করছে সে। নিজের অবস্থাটা ভাল করে ভেবে দেখার অবকাশ হলো তার। অ্যালেকজান্ডারকে যে সে দুচোখে দেখতে পারে না তা এই প্রথম স্পষ্ট অনুভব করল ও। এর আগে সে কোনদিন এমন করে ভেবে দেখেনি, কারণ, সবকিছুই লেখা ছিল তার নামে-কত্রীর আসন ছিল তার। অ্যালেকের ধার ধারবার কোন দরকারই ছিল না ওর। কিন্তু এখন ওর কথা মত চলতে গিয়ে তুষার ঝড়ে প্রায়। সব স্টক হারিয়েছে সে-র‍্যাঞ্চটাও শেষ পর্যন্ত পাওয়া যাবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা নেই। এখন সরাসরি অ্যালেকের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে সে। এখন একমাত্র ম্যাটই আছে, যে একমাত্র তার প্রতি অনুগত। এখন তার টাকা পয়সার অবস্থা খুব কাহিল, তাই অ্যালেকের সোনা হাতানো পর্যন্ত তার চুপচাপ থাকাই ভাল হবে। সে জানে স্টেজ-ডাকাতির সাথে তাকে কেউ কোনদিন জড়াবে না। আর ওই সব ডাকাতিতে তার প্রত্যক্ষ কোন হাত থাকছে না।

অন্ধকারে অপেক্ষা করছে ওরা। অ্যালেক এতক্ষণ দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসেছিল। অন্ধকারে বানানো সিগারেটটা এবার ধরাল সে।

আমাদের করার কিছুই নেই, বলে উঠল সে। লোকটা ওখানে ঠাণ্ডার মধ্যে চিরকাল কাটাতে পারবে না-ম্যাটের একদিনেই ঠাণ্ডার মধ্যে থেকে কী অবস্থা হয়েছিল তা তো নিজেই দেখেছ তুমি। ওর ফেরার পথ আটকে রেখে ওকে আমরা আজ না হলেও কাল মারার সুযোগ পাবই।

তুমি যে সব ইন্ডিয়ান ট্রেইল ব্যবহার করবে বলছিলে ডাকাতির জন্যে সেগুলো যদি ওর চেনা থাকে?

সেগুলো সব তুষারে ঢেকে গেছে এখন।

তা হলে তোমরাই বা ডাকাতি করার পর পথ চিনে পালাবে কী করে?

কয়েক মিনিট চুপ করে রল সে। তারপর বিরক্তির সাথে জবাব দিল, সে ব্যবস্থা আমরা করব।

অ্যালেক খুব সতর্ক ভাবে প্ল্যান করে, কিন্তু কেউ তার প্ল্যানের দোষ ধরুক এটা সে চায় না। নিজের ভুল স্বীকার করতে সে একেবারেই নারাজ। তা ছাড়া লোক হিসাবে খুবই আশাবাদী সে-তার ধারণা ভাগ্য তাকে সব সময়েই সহায়তা করবে।

তবু, সাময়িক ভাবে সে হয়তো জিতবে। নীনা উঠে জানালার উপর একটা কম্বল ঝুলিয়ে দিয়ে মোমবাতি জ্বালাল। তারপর একটা ঝড় এনে ভাঙা কাঁচের টুকরোর সাথে নষ্ট বাতিটাও বাইরে ফেল।

নীনা বসার ঘরে ফিরে এসে দেখল অ্যালেক নেই। জাভেদের চিন্তা আবার ঘিরে ধরল তাকে।

সে কি সত্যিই মারা গেছে? যতই চিন্তা করছে নীনা ততই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে এটা তার কাছে। খুব চতুর যোদ্ধা জাভেদ। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না স্যান্ডির মত লোক তাকে মারতে পারবে।

.

কয়েকদিন কিছুই ঘটল না। সূর্যের তাপে কিছু কিছু জায়গা থেকে তুষার গলে সরে গেল। খুব খাটছে ম্যাট। ঘুরে ঘুরে সব জায়গা থেকে সে রিপোর্ট নিয়ে ফিরল। প্রথমে যতটা বিপর্যয় হয়েছে ভেবেছিল নীনা আসলে ওদের স্টকের ততটা ক্ষতি হয়নি। মাত্র কয়েকশো গরু-মহিষ মারা পড়েছে। কিন্তু তা হলেও পুরো শীতটা এখনও পড়েই আছে সামনে। তুষারপাত চলতে থাকলে হয়তো পুরো স্টকই হারাতে হত ওদের, কিন্তু কয়েকদিন ভাল আবহাওয়া থাকায় এখন কিছুটা রেহাই পাওয়া গেছে।

যে কয়জন লোককে অ্যালেক র‍্যাঞ্চের কাজের জন্য নীনার কাছে রেখেছে, গিরিপথ আর ট্রেইলগুলো বরফে আটকা পড়ায় তাদের এদিক ওদিক যাওয়া বন্ধ রয়েছে। সাধারণ র‍্যাঞ্চেই সবটুকু এলাকা একজনের পক্ষে চেন দুষ্কর, আর জাভেদের র‍্যাঞ্চের তো কথাই ওঠে না। এরই মধ্যে কোথাও জাভেদ তার স্টক লুকিয়ে রেখেছে। সেখানে পশুর শীতের খাবারও জমা করা আছে।

অ্যালেক তার প্ল্যান নিয়ে ব্যস্ত। বাকি লোকদের সে তিনটে ভাগে ভাগ করে নিয়েছে। প্রত্যেক দলে ছয়জন করে লোক। তিনটে দলই এক সাথে আঘাত হানবে নিজ নিজ এলাকায়। তিনটে ভিন্ন এলাকা থেকে তারপর দ্রুত নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে ওরা। অনেক উত্তরের এলাকা ঠিক করা হয়েছে ওদের জন্য। তবে পথে দুটো র‍্যাঞ্চ পড়বে, যেখান থেকে ওরা নিজেদের ঘোড়াগুলো বদলে তাজা ঘোড়া সগ্রহ করতে পারবে। র‍্যাঞ্চগুলোর মালিকেরা দুজনেই আইনভঙ্গকারী লোক। উত্তরে যতদূর সম্ভব লোক পাঠিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে ট্রেইলগুলো খোলাই আছে। সুতরাং আবার নতুন করে তুষার না পড়লে ওদের ডাকাতি করে পালানো খুব একটা কঠিন হবে না।

ম্যাটকে চারজন লোক দেওয়া হয়েছে কাজের জন্য। নীনা ঘোড়ায় উঠতে যাবে এমন সময়ে ম্যাট এসে হাজির হলো তার কাছে।

আমরা প্রায় সব জায়গা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেছি, মিস পেজ, বলল সে। কিন্তু কোথাও জাভেদের মার্কার একটা পশুও চোখে পড়েনি আমাদের। আর ওর পশুর খাবার যে কোথায় লুকানো আছে তারও খোঁজ পাওয়া যায়নি।

তোমরা মনে হয় কেবল কাছাকাছিই খুঁজেছ, বলল নীনা। একটা উপত্যকা বা মালভূমি থাকতেই হবে যেখানে গরু-মহিষ রেখেছে ও।

দক্ষিণ আর পশ্চিম দিক নদীর ওপার পর্যন্ত ভাল করে খুঁজে দেখেছি আমরা। ঠিক আছে, উত্তর আর পুবেই এবার খুঁজে দেখব।

তোমরা কোন চিহ্নই দেখতে পাওনি? জিনের পেটি আর একটু শক্ত করে বেঁধে নিল নীনা। মানে লোকজনের পায়ের চিহ্ন?

একটু ইতস্তত করল ম্যাট। বুঝতে পারছি আপনি কীসের কথা জিজ্ঞেস করছেন। আমি নিজেই আপনাকে বলব ভাবছিলাম, সেদিন কেবিনে যে লোকটা গুলি করেছিল তার পায়ের ছাপ খুঁজে বের করেছে বাড়।

আগ্রহ নিয়ে ম্যাটের দিকে ফিরে দাঁড়াল নীনা। শোনার আগেই বুঝে নিয়েছে। সে ম্যান্ট কী বলবে, তবু অপেক্ষা করল সে।

জাভেদই ছিল ওখানে। দক্ষিণের ওই পাহাড়ের মাথায় এসেছিল সে। কিন্তু ও যে কীভাবে সবার অলক্ষ্যে ওখানে পৌঁছল সেটা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছি না। আমি। ওর পায়ের ছাপ চিনি আমি-পায়ের ছাপ অনুসরণ করে মাইল দুই পশ্চিমে ওদের ক্যাম্প দেখে এসেছি আমি। খুব সুন্দর জায়গা-প্রচুর খাবারও আছে ওদের ওখানে।

ওর, মানে?

ওরা তিনজন আছে। জাভেদ, জিকো আর সেই মেয়েটা।

তা হলে স্যান্ডি ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু বার্টের কী খবর?

মনে মনে খুশিই হয়েছে সে জাভেদ বেঁচে থাকার খবর শুনে। জাভেদের মৃত্যু আসলে চায়নি সে। কিন্তু তাই কি? নাকি অ্যালেক ব্যর্থ হয়েছে বলেই খুশি হয়েছে সে?

ম্যাট, তুমি বলছিলে ওদিকে একটা মাঠে আমাদের কিছু গরু চরতে দেখেছ তুমি। আরও পাঁচশো গরু-মহিষ তাড়িয়ে নিয়ে ওখানে রেখে এসো ঘাস খাবার জন্যে।

মুখ তুলে নীনার দিকে চাইল ম্যাট। সে ঠিকই বুঝেছে নীনা কেন তাকে এই নির্দেশ দিয়েছে। নীনার পরবর্তী কথায় সে বুঝল ঠিকই আন্দাজ করেছিল সে।

আমরা হয়তো আমাদের সবগুলো পশু বাঁচাতে পারব না এই শীতে, কিন্তু অন্য কোথাও নতুন করে শুরু করতে হলে কিছু পশু আমাদের বাঁচিয়ে রাখতেই হবে।

ঠিক আছে, পকেট থেকে তামাক বের করে সিগারেট বানাতে শুরু করল ম্যাট। আর কথাটা গোপন রাখতে হবে, এই তো?

ঠিক তাই।

শেরিফ বব কিন্তু ঘটে অনেক বুদ্ধি রাখে, অ্যালেক ওকে কেয়ার না করলে ভুল করবে।

অ্যালেকও ধুরন্ধর কম না, এই প্রথম নীনা অন্য কারও কাছে অ্যালেক সম্বন্ধে নিজের মতামত ব্যক্ত করল। কিন্তু আমার ধারণা, এবার ঘোল খেয়ে যাবে। ও জাভেদের কাছে।

আমার ওপর আস্থা রাখতে পারেন আপনি, বলল ম্যাট। গরুগুলো তাড়িয়ে নেয়ার ব্যবস্থা এখনই করছি আমি।

ম্যাটের উপর আস্থা আছে নীনার। তার বিশাল কাধ ফিরিয়ে ঘোড়ায় চড়ে চলে গেল ম্যাট। সেদিকে চেয়ে নীন ভাবল কারও উপর নির্ভর না করে কেবল নিজের উপর আস্থা রাখাই হয়তো সবচেয়ে ভাল। জাভেদ আর অ্যালেক পরস্পর মারামারি করে মরুক গিয়ে, সে মাঝখান থেকে নিজের স্বার্থ গুছিয়ে নেবে।

বার্ট এসে হাজির হলো। ঘোড়াটা প্রায় আধমরা দেখাচ্ছে, তার অবস্থাও তথৈবচ। র‍্যাঞ্চে নীনা একাই ছিল সে-ই প্রথম গল্পটা শুনল ওর কাছে। কীভাবে স্যান্ডি মারা গেছে আর কীভাবেই বা সে ভাগ্যক্রমে একটা হরিণ শিকার করে গত তিন-চারদিন লবণ ছাড়া সেই মাংস খেয়ে কাটিয়েছে, তার বিশদ বিবরণ দিল সে।

কেবিনে বসে গরম খাবার পেট ভরে খেয়ে কফিতে চুমুক দিতে দিতে সে বলল, একটা কথা না বলে পারছি না। ওই জাভেদ লোকটা! বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি সে। জিত হবেই এ বিষয়ে যেন সে নিশ্চিত। আমার ধারণা সে লোমা কয়োটিতে গেছে সাহায্যের জন্যে।

এরপর ম্যাটের কাছ থেকে নীনা আগেই যা শুনেছে তাই আবার নতুন করে শুনল বার্টের মুখে। লোমা কয়োটির লুইস, চার্লি, জিম, সবার কথাই মনোযোগ দিয়ে শুনল সে।

.

ঠাণ্ডার মধ্যে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কম্বলের বিছানার আরাম ছেড়ে রাতের আগুনটাকে উস্কে দিয়ে আরও কাঠ চাপাতে উঠল জাভেদ। শীতে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে কয়টা কাঠ আগুনে চাপিয়ে দিয়েই ঝট করে আবার কম্বলের তলায় ঢুকল সে। পাশের বিছানার দিকে চাইতেই দেখল জেনি ওর দিকে চেয়ে হাসছে।

ঠাণ্ডা! কৈফিয়ত দিল সে।

বুঝতেই পারছি! হাসতে হাসতেই বলল সে। যেমন ঠকঠক করে দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাচ্ছিল তোমার তাতে তো আমার ভয়ই হচ্ছিল তোমার দাঁতগুলো বুঝি ভেঙে যাবে।

ঠাট্টা করছ? ঠিক আছে, আগামীকা-। আগুন জ্বালাবার ভার থাকল তোমার ওপর-তখন দেখা যাবে!

রাতের বেলাই ওগুলো হাতের কাছে তৈরি রেখে ঘুমাব আমি। সকালে বিছানায় শুয়ে শুয়েই কাজ সারব।

ফাঁকিবাজি বুদ্ধির তো কমতি নেই দেখছি!

অল্পক্ষণের মধ্যেই আগুন থেকে লকলকে শিখা উঠে মেসার উপরের গুহাটা গরম করে তুলল। আসলে র‍্যাঞ্চ থেকে মাত্র মাইল খানেক দূরে এই গুহাটা। মেসার উপর থেকেই কেবল ঢোকা যায় গুহায়। জাভেদ নিজের হাতে খুঁড়ে বড় করে নিয়েছে ওটাকে। জাভেদের হাতের ছোঁয়ায় দুটো কামরা মত তৈরি হয়েছে-একটা বিরাট, অন্যটা সেই তুলনায় অনেক ছোট। আগুনের ধোয়া একটা চিমনির সাহায্যে গাছের শিকড় আর লতাপাতার ভিতর এমন ভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে কয়েক গজ দূর থেকেও সহজে ধোয়া দেখা যায় না।

গুহাটা মোটামুটি গরম হয়ে উঠতেই বিছানা ছেড়ে উঠে দ্রুত জামা-কাপড় পরে বাইরে যাবার জন্য তৈরি হলো জাভেদ

উত্তরের ট্রেইলটার খবর কী? জিকোকে জিজ্ঞেস করল সে। তোমার কি মনে হয় লোমা কয়োটির রাস্তা খোলা আছে?

কখন যেতে বলো আমাকে।

তুমি না, আমি। এগিয়ে গিয়ে জাভেদ জানালার মত ঘুলঘুলিটার ভিতর দিয়ে বাইরেটা ভাল করে দেখে নিল। খুব খাড়া ধরণের পেঁচিয়ে ওঠা একটা পথ দিয়েই কেবল মেসার মাথায় ওঠা সম্ভব। কিন্তু ওটা দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে এটাই উপরে ওঠার পথ। জানালাটা দিয়ে ওই পথের বেশ কিছুটা দেখা যায়। তোমরা এখানেই থাকো-আমি যাব, বলল জাভেদ।

কিন্তু লোমা কয়োটির ওরা আমাকে চেনে, প্রতিবাদ করল জিকো

লুইস চেনে আমাকে! চার্লিও চেনে। অন্যদের সাথে আলাপ করে নিতে পারব আমি। তা ছাড়া জেনির সাথে আমার এখানে একা থাকাটা ঠিক হবে না।

ভয় পাও? প্রশ্ন করল জেনি।

আমি? ওর দিকে চেয়ে হেসে জাভেদ বলল, না আমি ভয় পাচ্ছি না, কিন্তু তোমার পাওয়া উচিত। আমরা দুজনে এখানে একা থাকলে কী ঘটবে তার কি কিছু ঠিক আছে?

কিছুই ঘটবে না, জবাব দিল জেনি। অন্তত আমি না চাইলে ঘটবে না।

চোখে কৌতুক নিয়ে ওর দিকে চাইল জাভেদ। হয়তো তোমার কথাই ঠিক, হয়তো না। লোভ দেখিয়ো না, তবে হয়তো থেকেই যাব!

বাইরের বড় ঘরটায় চলে এল জাভেদ। ঘোড়াগুলোকে খাওয়াল। খড়ের গাদার দিকে চেয়ে দেখল খড় আর বেশি নেই, তবে চানা অনেকই আছে। গোলা বারুদ যা আছে এখানে তাতে গেটিসবার্গের যুদ্ধ আবার নতুন করে লড়া সম্ভব।

ঘোড়ায় জিন চাপিয়ে জাভেদ তার অন্যান্য জিনিস-পত্র আনতে গেল ছোট ঘরটায়। জেনি বিছানা ছেড়ে উঠে কফি চাপিয়েছে আগুনে।

অনেকদিন হলো আমাদের স্যান অ্যান্টোনিয়োর স্টকের কোন খোঁজখবর নেয়া হয়নি-চাও তো আমি খোঁজ নিতে পারি, প্রস্তাব দিল জিকো।

জেনির দিকে চাইল জাভেদ। তা হলে তো জেনিকে একা থাকতে হয় এখানে, তুমি কি একা থাকতে পারবে, জেনি?

পারব, প্লেটে করে এক টুকরো মাংস বেড়ে এগিয়ে দিতে দিতে বলল জেনি। একা থাকতে পারব-আর কেউ যদি জায়গাটা খুঁজে বের করেও ফেলে, তাকে ঠেকাতেও পারব।

পথ থেকে তুষার সরে গেছে, মন্তব্য করল জিকো। আমরা কোন চিহ্ন না রেখেই নামতে পারব। আমার মনে হয় না কেউ এই জায়গাটা খুঁজে পাবে।

দুটো ঘোড়া হাটিয়ে বাইরে বের করল ওরা। জাভেদ আবার ফিরে এল জেনির কাছে। ওর হাত থেকে খাবারের পোটলাটা নিয়ে ঘোড়ার পিঠে ঝোলানো ব্যাগে রাখল। সাবধানে থেকো, নারীসুলভ সাবধানণী শোনাল জেনি।

ফিরে চাইল জাভেদ। এতসব অসুবিধার মধ্যে দিন কাটিয়েও জেনির সুন্দর চেহারাটা বিন্দুমাত্র মলিন হয়নি। বলল, তুমিও সাবধানে থেকো, জেনি। গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ো না, যদি বেরুতেই হয় তবে খাড়ির ধারে যেয়ো না। আর রাতের বেলা কোনরকম রান্না কোরো না।

হ্যাঁ, সে-ব্যাপারে তুমি আগেও সাবধান করেছ আমাকে, রাতে খাবারের গন্ধ অনেক দূর থেকেও পাওয়া যায়।

ঠিক তাই। ধোয়ার গন্ধে কিছু আসে যায় না কারণ ওদের আগুন থেকেও একই গন্ধ পাবে ওরা। কিন্তু খাবারের গন্ধ ঠিকই টের পাবে।

ভয় নেই, রাতে রান্না করব না আমি।

ঘোড়ার পিঠে ওঠার জন্য তৈরি হলো জাভেদ। হাত বাড়িয়ে আলতো ভাবে ওর জ্যাকেটের হাতা ছুঁয়ে জেনি আবার বলল, সাবধানে থেকো, জাভেদ।

জাভেদ চেয়ে দেখল ওর চোখ ছলছল করছে। চট করে অন্যদিকে মুখ ফিরাল। কাঁদছে কেন মেয়েটা? সত্যিই মেয়েদের বোঝা ভার। এমনও না যে সে তার ঘনিষ্ঠ কোন আত্মীয়। ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে গেল সে নীচে নামার রাস্তার দিকে। ঘোড়াটা অভ্যস্ত পায়ে প্রায় নিঃশব্দেই নীচে নামতে শুরু করল।

নীচে পৌঁছে চারদিক আবার ভাল করে দেখে নিয়ে ফাঁকা জায়গাটা পার হয়ে গাছপালার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। একটু পরে জিকোও একই ভাবে জঙ্গলে ঢুকল। কেউ দেখেনি আমাদের, উৎফুল্ল সুরে বলল জিকো।

মাথা ঝাঁকাল জাভেদ। অনিচ্ছাসত্ত্বেও গাছের ভিতর দিয়ে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে চলল সে। জেনিকে একা ফেলে যেতে মন সরছে না ওর। কতদিন যে মেয়েটাকে একা একা কাটাতে হবে তার কোন ঠিকঠিকানা নেই। অন্যান্য অনেক মেয়ের চেয়ে জেনির সাহস অনেক বেশি তার প্রমাণ পেয়েছে জাভেদ। অবাক লাগে তার ভাবতে, এত ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে জেনিকে অথচ প্রতিবাদে টু শব্দটি করেনি সে। শক্ত ভাবেই সে তার কাজ করে গেছে।

ভাচে ক্রীকের থেকে যেখানে উত্তরের আর স্যান অ্যান্টোনিয়োর রাস্তা দুদিকে চলে গেছে সেখানেই জিকোর কাছ থেকে বিদায় নিল জাভেদ।

মহিষের চামড়ার ওভারকোট পরে জিকোকে বিশাল দেখাচ্ছে। বিদায় নেওয়ার সময়ে সে বলল, খুব সাবধান, জাভেদ, লোমা কয়োটির সব লোক কিন্তু বন্ধু নয়।

ঠিক আছে।

বিশেষ করে প্যাডি ম্যাকর্নি সম্পর্কে সাবধান-ব্যাটা আইরিশ, নিজেকে পিস্তলে ওস্তাদ বলে বড়াই করে। একটু মাতব্বরি ভাব আছে ওর।

তাই নাকি? হাসল জাভেদ। তা হলে ওকে হয়তো লুইস এতদিনে ঠাণ্ডা করে ফেলেছে। লাগাম হাতে তুলে নিল সে। লুইস কাউকে ছেড়ে কথা বলে না, একটু মেজাজীও।

সেররো জারোসিটোর ধার ঘেঁষে উত্তর দিকে রওনা হলো জাভেদ। পুব দিকে মাত্র মাইল ছয়েক দূরে আছে একটা ঝর্ণা। ঝর্ণা পার হয়ে কয়েটি ক্রীক আরও তিন মাইল। তারপরে সেখান থেকে সোজা উত্তরে আরও মাইল সাতেক গিয়ে তবে লোমা কয়োটি। মোট প্রায় সতেরো আঠারো মাইল। পাঁচ ছয় ঘণ্টা লাগবে কপাল ভাল থাকলে।

উত্তরের হাওয়া বইছে, আকাশটা স্লেট রঙের হয়ে রয়েছে। জাভেদের ধারণা আবার তুষার পড়বে। কিন্তু তার ধারণাই ঠিক হোক, এটা চাইছে না। ঝড়ের পরে আর কেউ এই পথ ধরে যায়নি বোঝা যাচ্ছে। কিছু কিছু জায়গায় তুষার মে শক্ত হয়ে রয়েছে। দুপুর হবার আগেই তার অন্তত দশ মাইল চলা উচিত ছিল কিন্তু সে ছয় মাইলও এসেছে কিনা সন্দেহ। একবার সে ঘন জঙ্গলে সহজ চলার পথ পাবে মনে করে তিন মাইল বেশি ঘুরেছে।

ঝর্ণায় ঘোড়াকে পানি খাইয়ে নিয়ে কয়েটি ক্রীকে পৌঁছে সে দেখল সেখানে অনেকখানেই পানি জমে বরফ হয়ে রয়েছে। পার হওয়া কঠিন হয়ে উঠল কারণ পার হতে গেলেই তাদের ভারে বরফের পাতলা স্তর ভেঙে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তরের ঠাণ্ডা বাতাসে তার মুখ আড়ষ্ট হয়ে গেছে, হাতও অবশ হয়ে এসেছে।

বিকেলের দিকে শহরে পৌঁছল সে। সরু রাস্তাগুলো একেবারে জনশূন্য। উতে সেলুনে আর হোটেলটায় আলো জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। একটা রেস্তোরাঁয়ও আলো জ্বলছে।

লোমা কয়োটিকে ঠিক শহর বলা যায় না। আইনের হাত থেকে বাঁচার জন্য পালিয়ে আসা লোকজনের কারণেই এই শহরের উৎপত্তি। কোন আনন্দ উৎসবের আয়োজন কখনও হয় না এখানে। দুজন প্রসপেক্টর আছে এই শহরে, কিন্তু পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে প্রসপেক্টিং করার চেয়ে উতে সেলুনেই বেশির ভাগ সময় কাটে ওদের

এখানকার লোকসংখ্যা তিরিশের বেশি কখনও ওঠে না। তিন-চারজন ছাড়া বাকি সবাই পুরুষ। একবারই মাত্র ওদের সংখ্যা পঞ্চান্নতে গড়িয়েছিল, কিন্তু তা উতে যুদ্ধের সময়ে।

রাস্তার শেষ মাথায় একটা বিরাট ছাউনি। পড়া যায় না, এমন একটা নোটিশ ঝুলছে বাইরে। ওতে লেখা আছে এটা একটা আস্তাবল-ঘোড়াকে খাবার দেওয়া আর দেখাশোনা করা হয় ওখানে।

ওরই সাথে লাগানো বাড়িটায় টিমটিম করে একটা বাতি জ্বলছে। আর কোন আলো নেই সেখানে।

জাভেদ ঢুকতেই অন্ধকার থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে বলল, খড় চাইলে নিজেই নিয়ে যাও, অনেক আছে। কিন্তু ঘোড়াকে দানা খাওয়াতে হলে পঞ্চাশ সেন্ট খরচ পড়বে।

এত দাম চাইছ কেন?

দাম পঞ্চাশ সেন্টই পড়বে, ইচ্ছা হলে কেনো নইলে রাস্তা মাপো। ঝামেলা করতে চাইলে শটগান দিয়ে খুঁড়ি ফুটো করে দেব।

অফিস ঘর থেকে মাথা কেটে ফেলা শটগান হাতে করে বুড়োটা বেরিয়ে এল। লণ্ঠনটা তুলে ধরে জাভেদকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলল, সা ধানের মার নেই, বুঝলে না? ঘোড়াকে খড় খাওয়াও কোন পয়সা লাগবে না তোমার-কিন্তু চানা খাওয়াতে চাইলে একটু বেশি পয়সা দাবি করি আমি, কারণ যারা তাড়া খেয়ে পালাচ্ছে তারাই ঘোড়াকে চানা খাইয়ে নিতে চায়। সাধারণত বেশি পয়সা দেয়ার ক্ষমতাও তাদের থাকে।

আমি কারও কাছ থেকে পালাচ্ছি না। আমার বন্ধু লুইস ডিকেনসনের খোঁজে এসেছি আমি।

কোনদিন ওই নাম শুনেছি বলে মনে পড়ে না। অবশ্য নাম আমার খুব একটা মনেও থাকে না-তা ছাড়া নাম দিয়ে এই এলাকায় চেনা যায় না মানুষকে। এখানকার লোকজন প্রায় রোজই একবার করে নাম আর ঠিকানা বদলায়।

দক্ষিণের র‍্যাঞ্চের মালিক আমি। আমার নাম জাভেদ।

চোখ ছোট কবে ভাল করে জাভেদকে আবার দেখল বুড়ো। হয়তো র‍্যাঞ্চ আছে তোমার, হয়তো নেই, জানি না আমি, কিন্তু লোকের মুখে যা শুনেছি তাতে মনে হয় না বেশিদিন তোমার মালিকানা থাকবে।

আমি এখনও ওই র‍্যাঞ্চের মালিক, দশ বছর পরেও তাই থাকব, ঘোড়ার জিন খুলে নামাতে নামাতে বলল জাভেদ। তুমি যদি কোন গোলমাল পাকাবার চেষ্টা করো তবে ফিরে এসে তোমাকেই আস্তাবলে ঘোড়ার জায়গায় বেঁধে গুন ধরিয়ে দেব।

সভয়ে একটু পিছু হটে গেল বুড়ো। এটা আবার কী ধরনের কথা হলো? তোমার ঘোড়াই তো রাখছি আমি। বললামই তো আমি তোমার ঘোড়ার জন্যে যা চানা লাগে নিয়ে নাও। বলিনি আমি? কথার সুর সম্পূর্ণ পালটে গেছে বুড়োর। তুমিই কি সেই লোক যার ওখানে জিকো কাজ করে?

হা, জিকো আমার সাথেই থাকে।

ঠিক আছে, আমি তোমার ঘোড়াকে ভাল করে দলাই-মালাই করে চানা খাওয়াচ্ছি। নতুন কাউকে খুঁজলে তাকে দুই সেলুনের একটাতে পেয়ে যাবে মনে হয়। তবে এই বুড়োর উপদেশ যদি শোনো, ভেগে যাও। সেলুনের ধারে কাছেও যেয়ো না আর-প্যাডিম্যাকনির আজ মেজাজ খুব খারাপ

দরজার সামনে এসে মাথা নিচু করে রেস্তোরাঁর ভিতর ঢুকতে হলো জাভেদকে। কাউন্টারে মোটাসোটা কঠিন চেহারার এক মহিলা দাঁড়িয়ে। জাভেদকে ঢুকতে দেখেই এক কাপ কফি এগিয়ে দিল সে। বলল, চাইলে খাওয়া পেতে পারো, কিন্তু আর কিছু চাইলে আগে থেকেই জানিয়ে রাখছি আজ রাতে আর তা পাওয়া যাবে না।

খেতেই এসেছি আমি।

ওর দিকে চাইল মহিলা। আপাতত তাই চাইবে জানি। দেহ থেকে ঠাণ্ডা নেমে যেতে ঘণ্টাখানেক লাগবে, তখনই মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে অন্য চিন্তা।

মোটা একচাক মাংস হলেই আমি খুশি।

ভালুকের মাংসই খেতে হবে তোমাকে, আর কিছুই নেই। ঝড়ের পর থেকে আর গরুর মাংস এদিকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ট্রেইল বন্ধ।

নীরবে খাওয়া সারল জাভেদ। মহিলা সারাক্ষণ বকবক করেই চলল, জাভেদ মাঝে মধ্যে হুঁ হাঁ করে তা দিয়ে গেল।

খাওয়া শেষ করে দাম মিটিয়ে দিল জাভেদ। মাথায় টুপি পরে নিয়ে বেরিয়ে যাবার আগে মহিলা বলল, খুব তো সাধু পুরুষ সেজে বেরিয়ে যাচ্ছ, জানি তোমাকে আবার আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। তিনটে মেয়ে আছে-একজনের বয়স ষোলো আর দুজনের উনিশ।

রাস্তা পার হয়ে উতে সেলুনে ঢুকল জাভেদ।

বারটা দশফুটের বেশি লম্বা হবে না। বড় বড় তক্তা পেতে বেঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। বারের পিছনের লোকটা প্রায় বারের সমানই লম্বা। দুজন লোক বারে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে, আরও কয়েকজন বসে আছে টেবিলে। জাভেদ ঢোকার সাথে সাথেই সবাই একবার করে চাইল ওর দিকে। নতুন লোক দেখে আবার ফিরে চাইল ওরা জাভেদের দিকে।

হুইস্কি, বারটেন্ডারকে অর্ডার দিল সে। অর্থাৎ, ওই নামে যা তোমরা বিক্রি করছ তাই!

বিশাল লোকটা বারের পিছন থেকে ঝুঁকে বলল, আমাদের ড্রিঙ্ক তোমার পন্দ না হলে খেয়ে কাজ নেই তোমার।

দাও, চেখে দেখি পছন্দ হয় কিনা?

না আগে বলতে হবে, গোঁ ধরল বারের মালিক।

ঠিক আছে, বারে বসা লোকদের দেখিয়ে বলল। এই ভদ্রলোকেরা যখন পছন্দ করছে তখন ধরে নিলাম আমারও পছন্দ হবে। দাও।

দেখো, ভাল হচ্ছে না কিন্তু! আবারও তুমি আমার মাল সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করছ। এটা আমিও পছন্দ করি না!

জ্বলন্ত দৃষ্টিতে জাভেদের দিকে চেয়ে গ্লাস ভরতে গেল সে। গ্লাস ভর্তি করে জাভেদের সামনে এগিয়ে দিল।

গ্লাসে চুমুক দিল জাভেদ। মনে হলো আগুন গিলে ফেলেছে। গ্লাসটা নামিয়ে রাখল সে। এক ব্যারেল গাছের ডাল ভেজানো পানি, দুই আউন্স তামাক, একটু ফেনা তোলার জন্যে একটা সাবান, তিন গ্যালন অ্যালকোহল আর রঙ করার জন্যে কিছু গ্রী-উড, এই ফরমুলায় তৈরি। বিচ্ছিরি স্বাদ তো হবেই। উতেদের কাছে বিক্রি করার জন্যে তৈরি। এগুলো খেয়েই তো এমন তিরিক্ষি হয়েছে ওদের মেজাজ।

গোলমাল পাকাবার চেষ্টা করছ তুমি, সাবধান করল মালিক।

গোলমাল মোটেও পছন্দ করি না আমি। বারের তলা থেকে ওই জগটা বের করে ঢেলে দাও ড্রিঙ্ক–কোন আপত্তিই আর করব না আমি।

বেজার মুখে বিড়বিড় করতে করতে জগ বের করে সার্ভ করল বারের মালিক। জাভেদের আদেশে বারে উপস্থিত সবার জন্যই এক গ্লাস করে মদ ঢালল সে।

আমার নাম জাভেদ, বলল সে। দক্ষিণের র‍্যাঞ্চের মালিক। কোন না কোন সময়ে আমার মার্কা দেয়া গরুর মাংস নিশ্চয়ই খেয়েছ তোমরা।

গোল মুখের একটা লোক তার গ্লাসের অর্ধেক হুইস্কি ফেলে দিয়ে উদ্ধত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি বলতে চাও আমরা গরু চোর?

সত্যি কথাই বলছি আমি, জবাব দিল জাভেদ। মাঝে মধ্যে একটা দুটো গরু ধরে খেলে তাতে দোষ ধরার মানুষ আমি ন!। তবে তোমরা মিছেই আমার ঘোট স্টকের দিকে নজর দিচ্ছ যখন তিন হাজারের একটা দল অন্যায় ভাবে রয়েছে ওখানে।

আমাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছ?

আমি কেবল খবরটা জানালাম। তোমরা কি করবে না করবে সেটা সম্পূর্ণ তোমাদের ব্যাপার। বর্তমানে ওদের সাথে র‍্যাঞ্চ নিয়ে লড়াই চলেছে আমার।

দরজা খুলে গেল। ঠাণ্ডা হাওয়া ভিতরে ঢুকছে। সেই সাথে ছিপিছপে গড়নের একটা লোক ঢুকল ভিতরে। চোখ দুটো কোটরে ঢোকা, ভুরুগুলো সোজা সোজা, মুখটা লম্বাটে। জ্যাকেটের মত ভেড়ার চামড়ার ওভারকোট পরেছে লোকটা। পিস্তলটা বেশ নিচুতে ঝুলছে, ওভারকোট পরেও ওটা বের করতে ওর কোন অসুবিধাই হবে না। ছোট মাথার উপর বীভারের টুপি চেপে বসে আছে।

এই সময়ে বাইরে কয়েকটা ঘোড়ার খুরের শব্দ পাওয়া গেল। জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে জাভেদ দেখল অ্যালেক আসছে ঘোড়ায় চড়ে, ওর সাথে রয়েছে। ওরই দলের বারো-চোদ্দ জন লোক।

চট করে গায়ে ওভারকোট চাপিয়ে নিল জাভেদ। নতুন আগন্তুক ওর দিকে চেয়ে দেখছিল। তোমাকে চিনলাম না, বলে উঠল সে। আমি প্যাডি ম্যাকনি।

আমি উইল হ্যাভ টুয়েট, হাসতে হাসতে জবাব দিল জাভেদ।

কী বললে? কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল সে।

উইল হ্যাভ টুয়েট, অর্থাৎ অপেক্ষা করতে হবে তোমাকে। র‍্যাঞ্চ লড়াই এর কথা বলতে বলতেই ওরা এসে হাজির হয়েছে।

প্যাডি জানালা দিয়ে চেয়ে দেখল। ও তো বিল শার্প। ওর সাথে তোমার বিরোধ থাকলে ওর পক্ষ হয়ে তোমাকে এখানে আটকে রাখব আমি।

ছেড়ে দাও ওকে, বারের মালিক বলে উঠল। কেউ কাউকে কারও জন্যে আটকাবে না এখানে।

তুমি চুপ করো

পিছনের দরজাটা শব্দ করে বন্ধ হলো। প্যাডি ঘুরে দেখল জাভেদ অদৃশ্য হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *