০৫. খুব খারাপ অবস্থা আমার

খুব খারাপ অবস্থা আমার! রোজার বলল। প্রাস্টিকের টেবিলক্লথের ডিজাইনে আঙুল বোলাচ্ছে। উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে তাকাল তিন গোয়েন্দার দিকে। এই ডাকাতি কেসের মীমাংসা যতদিন না হবে, আমাকে কাজে যেতে মানা করে দিয়েছে ওরা। মুখ ফুটে ডাকাত বলে না, তবু বুঝতে তো পারি। আচ্ছা, তোমরাই বল, আমাকে কি ডাকাত মনে হয়? আমার ঘর দেখে মনে হয় এটা ডাকাতের আড্ডা?

ডাকাত কি না বোঝার জন্যেই যেন রোজারের দিকে তাকাল ছেলেরা, রান্নাঘরে চোখ বোলাল আরেকবার। হাসল কিশোর। না, লোকটাকে ডাকাত কিংবা ডাকাতের সহযোগী ভাবতে পারছে না সে। আর ঘরটাকেও ডাকাতের ঘর বলে মনে হচ্ছে না।

হায়, হায়! চেঁচিয়ে উঠল রক, আমার মাল ! মুদী…।

তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল সে। দড়াম করে বন্ধ হল পেছনের দরজার পাল্লা।

গোড়া থেকেই শুরু হোক, কি বলেন, মিস্টার রোজার? কিশোর বলল। সব খুলে বলুন আমাদের। নুতন কিছু হয়ত বেরিয়েও যেতে পারে। এমন কিছু, যা আগে আপনার মনে দাগ কাটেনি।

নিরাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল রোজার। মিস্টার সাইমন বলেছেন, কোন অ্যালিবাই না থাকলে, দোষী প্রমাণ করা যত সহজ, নির্দোষ প্রমাণ করা তারচে অনেক কঠিন।

আপনার কি সত্যিই কোন অ্যালিবাই নেই? ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখুন। আপনি ডাকাতদের একজন হলে, গত কয়েক দিনে আপনার বেশ কিছুটা সময় আলাপ-আলোচনা আর পরিকল্পনায় ব্যয় হওয়ার কথা। অন্য ডাকাতদের সঙ্গে চেনা-পরিচয় করতেও সময় লাগে। গত দুই হপ্তা আপনি কি কি করেছেন, মনে আছে? বলতে পারবেন ঠিকমত?

বিষণ্ণ হয়ে মাথা নাড়ল রোজার।

আপনার বন্ধু রকের কথা বলুন। এখানেই থাকেন? তিনি কি বলতে পারবেন, গত কিছুদিন আপনি কোথায় কোথায় গিয়েছেন, কি কি করেছেন?

আবার মাথা নাড়ল রোজার। এখানেই থাকে রক, তবে বাড়িতে বেশি সময় থাকে না। সিসটেম টি এক্স ফোর-এর ফিল্ড রিপ্রেজেন্ট্যাটিভ সে। ওটা একটা কম্পিউটার কোম্পানি। নানা অফিসে যায় সে, বোঝানোর চেষ্টা করে কম্পিউটার দিয়ে কাজের কত সুবিধে। বিজ্ঞাপন করে আরকি। গত পুরোটা হপ্তা, এমনকি উইকএণ্ডেও বাইরে ছিল রক। ফ্রেজনোর একটা ফার্ম টি এক্স বিলিং সিসটেম কিনছে, তাদের সঙ্গেই কাজ করেছে ওই কদিন। ফিরেছে এই খানিক আগে। আজকাল বাড়িতে ফিরেও খুব একটা কথা বলে না আমার সাথে। তবে টি এক্স ফোর-এ যখন একসঙ্গে কাজ করতাম, অবস্থা অন্যরকম ছিল তখন।

আপনি টি এক্স ফোর-এ কাজ করতেন?

করতাম। আগে ওটার নাম ছিল রিং-বার অফিস মেশিন কোম্পানি, পরে হাত বদল হয়, নামও। গর্বের আভাস দেখা গেল রোজারের চেহারায়, রিং-বারদের ওখানে তিরিশ বছরের বেশি চাকরি করেছি আমি। প্রথমে ছিলাম ওদের ডাক বিভাগে, তারপর চলে গেলাম ক্রয় বিভাগে। ধীরে ধীরে চাকরিতে উন্নতি হল। ডিপার্টমেন্টের বারোজনের মধ্যে আমি হলাম দ্বিতীয়, অর্থাৎ বিভাগীয় প্রধানের পরেই আমার স্থান। সে-সময় আমার ছেলেরা বড় হচ্ছে। বাসা ভাল, ছেলেরা আরামেই থাকত। বাসা বদলের দরকার হয়নি।

উঠে লিভিং রুমে চলে গেল রোজার। ফিরে এল একটা বাঁধানো ফটোগ্রাফ নিয়ে। তাতে তার যুবক বয়েসের ছবি, ঘন কালো চুল। পাশে দাঁড়ানো গোলগাল, চেহারার মোটামুটি সুন্দরী এক মহিলা। দুজনের পাশে দাঁড়ানো দুটো বাচ্চা।

আমার স্ত্রী, নীনা, মহিলার ছবির ওপর আঙুল রেখে বলল রোজার। বিশ্বযুদ্ধের কিছুদিন পর বিয়ে করেছিলাম আমরা। হার্টফেল করে মারা গেছে বছর কয়েক আগে… গলা ধরে এল তার।

সমবেদনা জানাল কিশোর।

বড় এলা লাগে এখন, রোজার বলল। বাচ্চারাও বড় হয়ে যার যার মত চলে গেছে। সানিডেল-এর এক ইলেকট্রোনিক কোম্পানিতে চাকরি করে ছেলেটা, প্রােডাকশন কো-অরডিনেটর। মেয়েটা বিয়ে করেছে। স্বামী কাজ করে বীমা কোম্পানিতে। বেকারসফিল্ডে থাকে, দুটো বাচ্চা।

ভাল আছে দুজনেই। কিন্তু আমার কাছ থেকে অনেক দূরে। আরও কাছাকছি থাকত যদি! ওরা চলে গেল, খালি হয়ে গেল বাড়িটা। একা একা খুব খারাপ লাগত। শেষে আরেকজনকে ভাড়া দেব ঠিক করলাম। কিছু পয়সাও আসবে, সঙ্গীও পাব। রককে বললাম। বলতেই রাজি হয়ে গেল সে। উঠে এল এখানে…।

দরজা খুলে গেল। একটা থলেতে কতগুলো প্যাকেট নিয়ে ঢুকল রক। থলে থেকে খুলে প্যাকেটগুলো গুছিয়ে রাখতে লাগল রেফ্রিজারেটরে।

কাল রাতে কি কি ঘটেছে, খুলে বলবেন? অনুরোধ করল কিশোর।

বেশ, যদি তাতে কোন কাজ হয়, বলছি। অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়নি প্রথমে। প্রায় বছরখানেক ধরে চাকরি করছি ব্যাংকে। দুপুরে যাই, দুচারটা টুকিটাকি কাজ সারি, তেমন ইমপরট্যান্ট কিছু নয়। কাজটা নিয়েছিই আসলে সময় কাটে না বলে…টি এক্স ফোর থেকে রিটায়ার করার পর। নইলে কম্পিউটার কোম্পানির একজন অফিসার ব্যাংকের দারোয়ান হয়?

যা-ই হোক, অফিস ছুটি হওয়ার পর ঝাড়ুদার আসে, আমি দেখাশোনা করি। বেশিক্ষণ লাগে না ওদের। ছটার মধ্যে সেরে ফেলে। ওরা বেরিয়ে গেলে তালা লাগাই, আরেকবার চেক করে দেখি সব ঠিক আছে কিনা। তারপর বাড়ি যাই। নাইট গার্ড নেই ওই ব্যাংকের ভল্টে টাইম লক লাগানো, কাজেই গার্ডের দরকার পড়ে না। জোর করে কেউ খুলতে গেলেই পুলিশ স্টেশনে অ্যালার্ম বেজে উঠবে।

সেজন্যেই আপনাকে আটক করেছিল ডাকাতেরা, রবিন বলল। নইলে টাইম লকের জন্যে কিছু করতে পারত না ওরা। ভেতরে ঢুকলেই, ঘন্টা।

হ্যাঁ। তিনজন এসেছিল, টাইম লক সিসটেমের কথা ভাল করেই জানত। নিশ্চয় কোথাও লুকিয়ে থেকে চোখ রাখছিল। ঝাড়ুদারেরা কাজ শেষ করে বেরিয়ে গিয়ে এলিভেটরে উঠল। তারপর এল এক ডাকাত। দরজা ধাক্কা দিল। লবিতে তখন আলো খুব সামান্য। দেখলাম ওভারঅল পরা একজন দাঁড়িয়ে আছে, টুপির নিচে ধূসর চুল। টুপিটা চোখের ওপর টানা। ভাবলাম জ্যাকই বুঝি ফিরে এসেছে। কোন দরকারে। দরজা খুললাম। ও ভেতরে ঢোকার পর চিনলাম, জ্যাক নয়। হাতে পিস্তল। আর কিছু করার নেই তখন আমার।

ওর পর পরই ঢুকল আরও দুজন। মাথায় পরচুলা, নকল দাড়ি, নকল গোঁফ। ব্যের্ড রুমে ঢুকতে বাধ্য করল আমাকে। রাস্তা থেকে ঘরটা দেখা যায় না। আমাকে সরািরাত আটকে রাখল। ভল্টের ধারেকাছেও ঘেষল না। সকালে স্টাফরা আসতে লাগল। একজন করে ঢোকে, আর ধরে এনে তাকে বোর্ডরুমে আটকায়। তারপর এলেন মার্ক জনসন, ভল্টের লক কম্বিনেশন তিনি জানেন। বোঝা গেল, ডাকাতেরা তাকে চেনে টাইম লক অফ করিয়ে ভল্ট খুলতে তাকে বাধ্য করল ওরা।

মুসার পাশের চেয়ারে এসে বসল রক রেনাল্ড। নিশ্চয় তোমার ওপর চোখ রেখেছে কেউ। ব্যাংকের কাছাকাছিই থাকে সে, বা থাকত। কিংবা তোমার পরিচিত কেউ।

পরিচিত কেউ হলে চিনতাম, রোজার বলল। তিনজনের একজনকেও চিনি। দেখিইনি কখনও।

উঠে গিয়ে চলায় কেটলি বসাল রক। আমাদের পড়শীদের কেউও হতে পারে। নিশ্চয় ছদ্মবেশে গিয়েছিল। পড়শীদের ওপর চোখ রাখতে বল ছেলেগুলোকে।

রাখাটা কি জরুরি?

সামনে ঝুঁকল কিশোর। পড়শী কিংবা বন্ধু-বান্ধবকে সন্দেহ করা কঠিন। কিন্তু মিস্টার রোজার, বোঝা যাচ্ছে, ডাকাতেরা আপনাকে চেনে, ব্যাংকে আপনার কখন কি কাজ ভালমত জানে। গত কদিন ধরে কেউ নজর রেখেছে আপনার ওপর, টের পেয়েছেন? আপনার কাজকর্ম সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন কেউ?

না, একেবারে মুষড়ে পড়েছে রোজার।

কেটলিতে কফি ফুটছে। একটা কাপে ইনসট্যান্ট কফি রেখে তাতে গরম পানি ঢালল রক। টেবিলের কাছে বসে চুমুক দিল কাপে। কিশোরের দিক থেকে রোজারের দিকে ফিরল, আবার তাকাল কিশোরের দিকে।

আপনাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হলে আসল অপরাধীকে খুঁজে বের করতে হবে আগে, কিশোর বলল। সেজন্যে সূত্র দরকার।

সূত্র? সূত্র কোথায় পাবে?

জানি না। তবে আশা করছি, পাওয়া যাবে। এখন এ-ব্যাপারে আলোচনা করছি না আপনার সঙ্গে। তদন্ত চালিয়ে যাব আমরা। দুএক দিনের মধ্যেই খবর জানাব আপনাকে। ইতিমধ্যে, অস্বাভাবিক কোন কিছু আপনার চোখে পড়লে জানাবেন। আমাদের কার্ডের পেছনে টেলিফোন নাম্বার আছে।

জানাব।

বেরিয়ে এল ছেলেরা। পেছনে দরজা বন্ধ হয়ে গেলে রবিন বলল, সূত্র? ওই মানিব্যাগের কথা ভাবছ?

খুবই সামান্য, তবু সূত্র তো বটে, জবাব দিল কিশোর। আপাতত ওটা ধরেই তদন্ত চালাতে হবে আমাদের। আর একটা ব্যাপারে শিওর হয়ে গেলাম, রোজার কিংবা মিস্টার সাইমন অপরাধী নন। তবে, অন্ধ লোকটা ডাকাতদের কেউ হলে, মানিব্যাগ ধরে তদন্ত করে লাভ হবে না আমাদের।

হোক বা না হোক, হাত নাড়ল মুসা। কথায় কথায় পিস্তল বের করে, এমন – লোকের সামনে না পড়লেই আমি খুশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *