০৫. কিনো দরজায় দাঁড়িয়ে

কিনো দরজায় দাঁড়িয়ে, লক্ষ্য করল দুজন লোক এদিকেই আসছে। একজনের হাতে একটা টর্চ, মাটি আর লোকটির দুপাআলোকিত ওটার আলোয়। কিনোর কাঠের বেড়ার ফাঁক গলে ঢুকে দরজার কাছে চলে এল ওরা। কিনো এবার দেখতে পেল দুজনের একজন হচ্ছে সেই ডাক্তার আর অপরজন তার ভৃত্য।

তুমি সকালে যখন গেছিলে আমি তখন বাসায় ছিলাম না, ফ্যাকাসে হেসে বলল ডাক্তার। তোমার বাচ্চার খবর শুনে আর দেরি করিনি, ছুটতে ছুটতে চলে এসেছি।

কিনো দরজায় ঠায় দাঁড়িয়ে, ঘৃণায় জ্বলছে দুচোখ ওর। আবারও ভয় লেগে উঠল কিনোর। ভয় পাওয়ার কারণ, ডাক্তারের গোত্র শত শত বছর ধরে অত্যাচার-নিপীড়ন চালিয়েছে ওর পূর্বপুরুষদের ওপর।

আমার বাচ্চা সেরে গেছে প্রায়, ফট করে বলে বসল কিনো।

মুচকি হাসল ডাক্তার, হাসিটা যদিও তার চোখ স্পর্শ করল না।

মাঝে মাঝে হয় কি, বলল লোকটা, বিছের কামড় খাওয়া বাচ্চাকে দেখলে মনে হয় বাহ, সেরে গেছে বুঝি, কিন্তু তারপর হঠাৎ করে…

ঠোঁটে মৃদু শব্দ করল ডাক্তার, দেখাল মৃত্যু কত অতর্কিতে হানা দিতে পারে।

কখনও কখনও, কথার খেই ধরে ডাক্তার, পা শুকিয়ে যায়, চোখ অন্ধ হয়ে যায়, পিঠ বাঁকা হয়ে যায়। আমি ডাক্তার, আমি তো জানি, বন্ধু, বিছের কামড় কী জিনিস। চিন্তা কোরো না, আমি তোমার বাচ্চাকে সারিয়ে দেব।

ভয়টা আরও জেঁকে বসল কিনোর বুকে। বিছের কামড় সম্পর্কে তার কোন অভিজ্ঞতা নেই। ডাক্তার লোকটা কত শত বই পড়েছে। ও হয়তো ঠিকই বলছে। নিজের ওপর তো বটেই, ডাক্তারের ওপরও রেগে উঠছে কিনো। কেন বই পড়তে শেখেনি সেজন্য নিজের প্রতি রাগ। আর ডাক্তার ব্যাটা বেশি জানে কেন, সেজন্যে তার ওপর চাপা ক্ষোভ।

ইতিকর্তব্য ঠিক করতে পারছে না কিনো। ও স্থিরনিশ্চিত ডাক্তারটা মিছে কথা বলছে। কিন্তু ছেলের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে এমন কিছু তো করতে পারে না সে বাপ হয়ে। পিছু হটে লোক দুটোকে তার ছোট্ট বাড়িটার ভেতর ঢুকতে দিল।

হুয়ানা ডাক্তারকে দেখে সিধে উঠে দাঁড়াল। শাল দিয়ে মুখ ঢেকে দিল বাচ্চাটার। ডাক্তার ওর সামনে গিয়ে দুহাত বাড়িয়ে দিতে, বাচ্চাকে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরল ভীতা মা। কিনোর দিকে চাইল হুয়ান। আগুনের ছায়া নেচে বেড়াচ্ছে স্বামীর মুখের ওপর। কিনো মাথা নাড়তে ডাক্তারের হাতে বাচ্চাকে ছাড়ল মা।

টর্চটা ধরো, বলল ডাক্তার। চাকর লোকটা টর্চ উচিয়ে ধরতে রোগীর কাঁধের ক্ষতটা পরখ করে দেখল ডাক্তার। এক মুহূর্ত কি যেন ভেবে, কয়োটিটোর চোখের পাতা টেনে চোখ নিরীখ করল। বাচ্চাটা তার হাতে ছটফট করে উঠতে মাথা ঝাঁকাল ডাক্তার।

এমনটাই ভেবেছিলাম, বলল ডাক্তার। বিষ ভেতরে চলে গেছে। এর অবস্থা খারাপ হতে থাকবে। এসো, দেখে যাও!

বাচ্চাটার চোখে চোখ রাখল ডাক্তার। কিনো লক্ষ্য করল চোখটা ঈষৎ নীলচে। এটাই কয়েটিটোর চোখের স্বাভাবিক রং কিনা জানা নেই কিনোর। ডাক্তারকে বিশ্বাস করবে কি না বুঝে উঠতে পারছে না সে। এখন আর কিছু করারও তো নেই।

ব্যাগ থেকে বড়ি ভর্তি পিচ্চি এক শিশি বের করল ডাক্তার। এবার কয়োটিটোকে কোলে নিয়ে ওর ঠোঁটজোড়া চেপে ধরে রইল, বাচ্চাটা যতক্ষণ না মুখ খোলে। মুখ খুলতেই, ডাক্তারের গোদা গোদা দুটো আঙুল, রোগীর জিভের যতটা গভীরে পারে ফেলে দিল একটা বড়ি। কয়েটিটো এখন আর উগরে দিতে পারবে না ওষুধ। ডাক্তার এরপর জগ থেকে খানিকটা পানি ঢেলে দিল কয়েটিটোর মুখের ভেতর। বাচ্চাটার চোখ আরেকবার পরীক্ষা করে ওকে এবার মার কোলে ফিরিয়ে দিল।

ঘন্টা খানেকের মধ্যে বিষক্রিয়া শুরু হবে, ডাক্তার বলল। ওষুধটা হয়তো এ যাত্রা বাঁচিয়ে দিতে পারে বাচ্চাটাকে। আমি এক ঘণ্টার মধ্যে আবার আসছি। ভাগ্যিস সময় মত এসেছিলাম।

ডাক্তার গভীর করে শ্বাস টেনে ঘরত্যাগ করল। টর্চ হাতে অনুসরণ করল তার ভৃত্য।

কয়েটিটোকে শালের নিচে গুঁজে দিল হুয়ানা। বাচ্চাটার জন্য উদ্বেগ আর আতঙ্ক অনুভব করছে ও। কিনো এগিয়ে এল। শাল তুলে বাচ্চাকে দেখল। চোখের পাতার নিচেটা দেখার জন্যে হাত বাড়াল কিনো। এবার খেয়াল হলো মুক্তোটা তখনও হাতে ওর। দেয়াল লাগোয়া এক বাক্স থেকে এক টুকরো কাপড় বের করল ও, মুক্তোটা মুড়িয়ে রাখল ওতে। এরপর ছোট্ট বাসাটার এক কোণে গিয়ে, মেঝেতে আঙুল দিয়ে খুদে এক গর্ত তৈরি করল। মুক্তোটা ভেতরে রেখে, ধুলো-বালি দিয়ে গর্তের মুখ বুজিয়ে দিল। চুলোর কাছে বসে থাকা স্ত্রীর দিকে এগিয়ে গেল এবার।

ওদিকে বাড়িতে, চেয়ারে আরাম করে বসে, হাতঘড়িতে নজর বুলাল ডাক্তার। কাজের লোকটা চকোলেট আর কেক নিয়ে এল। খাবারের দিকে একবার মাত্র দৃষ্টি দিল ডাক্তার, খিদে নেই তার।

পড়শীরা যার যার বাসায়, কিনোর মুক্তোর আলোচনায় ব্যস্ত। একে অপরকে মুক্তোর আকার দেখাচ্ছে তারা। পরস্পরকে বলছে রত্নটার অনিন্দ্যসুন্দর সৌন্দর্যের কথা। পড়শীরা আগ্রহ ভরে অপেক্ষা করছে, মুক্তোটা কিনো আর হুয়ানাকে কতখানি বদলে দেয় নিজের চোখে দেখবে। প্রতিবেশীরা ভাল করেই জানে, মুক্তোর লোভেই ডাক্তারটা এসেছে কিনোর বাসায়।

বড্ড গরম পড়েছে আজ রাতে। লিকলিকে কুকুরটা কিনোর দরজায় এসে ভেতরে উঁকি দিল। কিনো ওটার দিকে চাইতে গা ঝাড়া দিল। কিনে চোখ ফেরাতে, কুকুরটা শুয়ে পড়ল মাটিতে। ঘরের মধ্যে ঢুকল না জানোয়ারটা, কিনো খাবার খাচ্ছে লক্ষ্য করছে।

খাওয়ার পর্ব সারা হলে, হুয়ানা হঠাৎ কথা বলে উঠল।

কিনো, বলল সে।

 

হুয়ানার দিকে চাইল কিনো, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ত্বরিত ওর কাছে চলে এল। হুয়ানা আতঙ্কিত, লক্ষ্য করল ও। নিচের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে দাঁড়িয়ে রইল কিনো। আলো কম, কিছু দেখতে পেল না। লাথি মেরে আগুনে খড়ি ফেলে আগুন উস্কে দিল কিনো। পরমুহূর্তে বাচ্চার মুখটা চোখে পড়ল ওর। মুখ আর ঠোঁটজোড়া লাল হয়ে গেছে কয়েটিটোর। হঠাৎ, কয়োটিটোর গলা আর পেট নড়ে উঠল। বোঝা যাচ্ছে ভয়ানক অসুস্থ বাচ্চাটা।

ডাক্তার জানত ও অসুস্থ হয়ে পড়বে, বলল কিনো।

ওষুধের কথা মনে পড়ল ওর। কোন সন্দেহ নেই, ডাক্তারটাই কয়োটিটোকে অসুস্থ বানিয়েছে। এপাশ-ওপশি দুলে একটা গান ধরল হুয়ানা। ওর বিশ্বাস, গানটা বিপদ-আপদ দূরে সরিয়ে রাখবে। মার কোলে দুলছে কয়েটিটো, নাভিশ্বাস উঠে গেছে তার।

চকোলেট আর কেকগুলো সাবাড় করল ডাক্তার। আঙুল থেকে কেকের গুড়ো ঝেড়ে ঘড়ি দেখল। এবার উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা তুলে নিল।

বাচ্চাটার অসুস্থতার খবর ঘরে ঘরে জানাজানি হয়ে গেছে। অসুখবিসুখ, খিদের জ্বালার মতই, গরীব মানুষের চিরশত্রু।

কেউ কেউ মৃদু সুরে বলল, সৌভাগ্যের সঙ্গে সঙ্গে খারাপ বন্ধু-বান্ধবও জুটে পড়ে। সবাই মাথা নাড়ল এবং রওনা দিল কিনোর বাসার উদ্দেশে। রাতের আঁধারে দ্রুত পা চালিয়ে, আবারও কিনোর বাড়িতে এসে হাজির হলো পড়শীরা। সবার মুখে এক কথা, সুখ আর দুঃখ হাত ধরাধরি করে চলে। বৃদ্ধা মহিলারা হুয়ানার পাশে বসে তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছে।

সবই আল্লার ইচ্ছা, বলছে তারা।

চাকরটাকে পেছনে নিয়ে, ডাক্তার এসে ঘরে ঢুকল। বৃদ্ধা মহিলার সঙ্গে সঙ্গে পিছু হটে গেল। ডাক্তার এবার বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল। গভীর মনোযোগে কয়েটিটোকে পরীক্ষা করে রোগীর মাথায় হাত রাখল ডাক্তার।

বিষটা এখনও এখানে আছে, বলল লোকটা। তবে আমি মনে হয় নামিয়ে দিতে পারব। সাধ্যমত চেষ্টা করব আমি।

কাপে করে খানিকটা পানি আনতে বলল সে। সামান্য ওষুধ ওতে গুলে বাচ্চাটার মুখে ঢেলে দিল। কয়েটিটো কেশে উঠে কান্না জুড়ে দিল। ভীতিমাখা চোখে চেয়ে রয়েছে কাতর মা। কাজের ফাঁকে অল্প স্বল্প কথাবার্তাও বলল ডাক্তার।

এই রোগের চিকিৎসা আগেও করেছি আমি, বলল সে।

ধীরে ধীরে, ডাক্তারের বাহুতে ছটফটানি বন্ধ করল বাচ্চাটা। গভীর করে শ্বাস টেনে ঘুমিয়ে পড়ল ক্লান্ত, ছোট্ট রোগী। মার কোলে বাচ্চাকে ফিরিয়ে দিল ডাক্তার।

ও এখন ভাল হয়ে যাবে, বলল লোকটা। আমার চিকিৎসায় কাজ হয়েছে।

ব্যাগ বন্ধ করে ডাক্তার কথা বলল অাবারও।

ফীটা কখন দিতে পারবে?

মুক্তা বেচে নিই, তারপর, জবাব দিল কিনো।

ও, মুক্তো আছে বুঝি তোমার কাছে? তা কেমন সেটা, কি জাতের? ডাক্তারের সে কি উৎসাহ।

এবার সবকজন প্রতিবেশী একসাথে কথা বলে উঠল।

দুনিয়ার সেরা মুক্তাটা খুঁজে পেয়েছে ও, জানাল ওরা, সবকটা আঙুল গোল করে আকারটা দেখাল।

কিনো বেজায় ধনী হয়ে যাবে, বলল পড়শীরা। কেউ কখনও ওরকম মুক্তা চোখে দেখেনি।

তাই নাকি, জানতাম না তো? সাধু সাজল ডাক্তার। নিরাপদ জায়গায় রেখেছ তো জিনিসটা? চাইলে আমার কাছে আমানত রাখতে পারো।

আধ বোজা চোখে ডাক্তারের দিকে তাকাল কিনো।

ওটা নিরাপদ জায়গাতেই আছে, বলল। কাল ওটা বেচে আপনার ফী মিটিয়ে দেব।

কিনোর চোখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল ডাক্তার। মুক্তোটা এবাড়িরই কোথাও না কোথাও লুকানো আছে জানে সে। তার মনে আশা, কোথায় লুকিয়েছে সেদিকে একবার না একবার চাইবেই কিনো।

বেচতে পারার আগেই চুরি গেলে খুব দুঃখজনক হবে ব্যাপারটা, বলল ডাক্তার। ঘরের কোণে, মেঝের দিকে ঝট করে দৃষ্টি চলে গেল কিনোর, নজর এড়াল না ডাক্তারের।

ডাক্তার আর পড়শীর বিদায় নিলে পর, চুলোর পাশে বসে কান পেতে রাতের গুঞ্জন শুনতে লাগল কিনো। ছোট ছোট ঢেউ ভাঙছে সৈকতে, কোথায় যেন হাঁক-ডাক ছাড়ছে কুকুরের পাল। ছাদের ফোকর গলে বাতাস চলাচল করছে, কানে আসে প্রতিবেশীদের কথাবার্তার টুকরো শব্দ। ডুবুরিরা সারা রাত একটানা ঘুমোয় না। মাঝে মাঝেই ঘুম ভেঙে, খানিক গল্প-গুজব করে, তারপর আবার ঘুম দেয়।

একটু পরে উঠে পড়ে দরজার কাছে এল কিনো। রাতের বাতাসের ঘ্রাণ নিয়ে, কান খাড়া করল কেউ আসে কিনা শোনার জন্যে। আঁধারে দৃষ্টি চলে গেল। মনে মনে ভয় পাচ্ছে সে। কেন জানি মনে হচ্ছে, মুক্তোটা চুরি করতে লোক আসতে পারে আজ রাতে। ঘরের প্রান্তে, গুপ্তস্থানটার কাছে এসে দাঁড়াল কিনা। রত্নটা তুলে নিয়ে মাদুরের কাছে এল। মেঝেতে আরেকটা খুদে গর্ত করল ও। গর্তের ভেতর মুক্তোটা রেখে ওটাকে ঢেকে দিল। অবারও।

হুয়ানা, চুলোর পাশে বসে ছিল, সাবধানী দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছে কিনোকে।

কাকে ভয় পাচ্ছ তুমি? জানতে চাইল।

সবাইকে, জবাব দিল কিনো।

একটু পরে, মাদুরে গা এলিয়ে দিল স্বামী-স্ত্রী। সে রাতে দোলনায় শোয়াল না হুয়ানা কয়োটিটোকে। বুকের ওপর উপুড় করে ফেলে বাচ্চার মুখ ঢেকে রাখল শাল দিয়ে। নিভন্ত আগুনটা এক সময় ধীরে ধীরে মরে গেল।

ঘুমের মধ্যেও মাথায় চিন্তা পাক খাচ্ছে কিনোর। স্বপ্ন দেখছে কয়োটিটো পড়তে পারে। আরও দেখল এই বাড়ির সমান মস্ত এক বই নিয়ে বসেছে তার ছেলে। বইটার অক্ষরগুলো একেকটা ইয়া বড় বড় কুকুরের সমান। স্বপ্ন যখন ফুরাল আঁধার তখনও কাটেনি। মাদুরে ছটফট করছে কিনো। ও নড়াচড়া করতে, হুয়ানার চোখ খুলে গেল। কিনো এবার সজাগ হয়ে আঁধারে কান পেতে শুয়ে রইল।

ঘরের ওই কোণটা থেকে মৃদু একটা শব্দ হলো না? কে যেন নড়াচড়া করছে আওয়াজ পেল কিনো। শ্বাস বন্ধ করে শুনতে চেষ্টা করল ও। অনাহুত আগন্তুকটিও দম আটকে রয়েছে, জানা আছে ওর। কিনোর একবার মনে হলো সে স্বপ্ন দেখছে না তো? কিন্তু হুয়ানার হাত ওর গা স্পর্শ করতে উৎকর্ণ হলো আবারও। শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ কানে এল ওর। শুকনো মাটি খামচাচ্ছে কার যেন আঙুল স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

হঠাৎই মাথায় রাগ উঠে গেল কিনোর। ছোরায় আস্তে করে হাতটা চলে গেল ওর। এবার রাগী বেড়ালের মত শব্দ লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে, হাতে উদ্যত ছোরা। কার যেন জামার ছোঁয়া লাগতে সবেগে ছোরা চালিয়ে দিল। তবে কারও গায়ে লাগেনি। আবারও ঘাই মারতে জামা চিরে ছোরা চলে গেছে টের পেল। মাথায় এবার প্রতিপক্ষের বাড়ি পড়ল কিনোর। দপ করে আগুন ধরে গেল যেন জায়গাটায়। ওই যে, লোকটা ছুটে পালাচ্ছে। পদশব্দ মিলিয়ে যেতে ফের নিস্তব্ধ চারদিক। উষ্ণ রক্ত গড়িয়ে নামছে মুখ বেয়ে, হুয়ানা ডাকছে ওকে খেয়াল হলো কিনোর।

কিনো! কিনো! আকুল স্বরে ডাকছে হুয়ানা। ভীষণ ভয় পেয়েছে সে।

আমি ঠিক আছি, বলল কিনো। ব্যাটা পালিয়েছে।

আস্তে আস্তে শয্যার কাছে ফিরে এল কিনো। চুলোয় এরমধ্যেই অাগুন ধরাতে ব্যস্ত হুয়ানী। একটুকরো জ্বলন্ত অঙ্গার আর কিছু ছোটখাট খড়ি খুঁজে পেয়েছে। ফুঁ দিয়ে দিয়ে আগুনটা উস্কে দিতে লাগল ও। শীঘ্রিই অল্প একটুখানি আলো ঘরের ভেতর নাচতে লাগল। হুয়ানা এবার একটা মোমবাতি নিয়ে, অগ্নিশিখা থেকে ওটা ধরিয়ে, চুলোর কাছে বসিয়ে দিল। ত্ৰস্ত হাতে কাজ সারছে হুয়ানা, আর তারই ফাঁকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। শালের খুঁটি পানিতে ভিজিয়ে স্বামীর মাথা থেকে রক্ত মুছে দিল।

কিছু হয়নি, বলল কিনো, কিন্তু কণ্ঠস্বর কঠোর আর শীতল ওর। হঠাৎ ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠল হুয়ানা।

ওগো, মুক্তাটা অলক্ষুণে! চেঁচিয়ে উঠল। ওটা আমাদের সর্বনাশ করে ছাড়বে। তুমি ওটা ফেলে দাও! পাথর দিয়ে, এসো, ওটাকে ভেঙে চুরমার করে দিই। মুক্তোটা সাগরে ছুঁড়ে ফেলে দাও তুমি।

আগুনের ম্লান আলোয়, হুয়ানার ঠোঁট আর চোখজোড়া ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে। কিন্তু কিনোর মুখের চেহারায় এখন অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।

এরকম সুযোগ আর আসবে না, বলল ও। আমাদের ছেলেকে ইসকুলে পাঠাতে হবে না? আমি চাই না ও আমার মত বেহদ্দ গরীব থাকুক। জীবনে ওকে অনেক উন্নতি করতে হবে।

হুয়ান আবারও চিৎকার করে উঠল।

মুক্তাটা আমাদের ধ্বংস করে দেবে। আমাদের বাচ্চাটাও রেহাই পাবে না।

চুপ করো তো! ধমক দিল কিনো। কাল সকালেই তো মুক্তাটা বেচে দেব। তখন আর ভয় কিসের? এবার একটু শান্ত হও, বউ।

খুদে আগুনটার দিকে যখন চাইল, কিনোর চোখের কালো মণি দুটো ধকধক করে জ্বলছে। হাতে তখনও ছুরিটা ধরা ওর। ছুরিটা চোখের কাছে তুলে ধরে ওটার উদ্দেশে চাইল সে। হালকা রক্তের একটা দাগ ধরা পড়ল ওর চোখে। মাটিতে ঘষে ঘষে ফলাটা পরিষ্কার করল ও।

ভোরের বাতাস বইছে গাছ-গাছালির ফাঁকে ফাঁকে, সাগরের বুকে। বেলাভূমিতে আছড়ে পড়ছে খুদে খুদে উর্মি। কিনো তার মাদুরটা টেনে মুক্তোটা তুলে নিল গর্ত থেকে। রত্নটা হাতে ধরে রেখে দীর্ঘক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইল। মুক্তোটার শোভা আবারও স্বপ্নাবিষ্ট করে তুলল ওকে। কী অপরূপ জিনিসটা, আহা। ভবিষ্যতে সুখ কেনা যাবে এটা দিয়ে। দীপ্তিমান মুক্তোটা সবধরনের রোগ-বালাই আর বিপদ-আপদ ঠেকিয়ে রাখবে। কিনোর পরিবারকে আর কোনদিন খিদের জ্বালা সইতে হবে না।

মুক্তোটার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে, চোখ থেকে ক্রোধের দৃষ্টি মুছে গেল ওর, সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল আশ্চর্য এক স্নিগ্ধতা। হুয়ানা স্বামীর দিকে চাইতে তার মুখে হাসি লক্ষ্য করল। হাসি ফুটল হুয়ানার মুখেও। বুক ভরা আশা নিয়ে নতুন দিনটা শুরু করল ওরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *