০৫. কিছু না-ই যদি হবে

কি বলো? কথাটা ধরলো কিশোর, কিছু না-ই যদি হবে, তাহলে লিখেছে কেন?

ওরকম নোটিশ এই এয়ারফীন্ডের আশেপাশে অনেক দেখতে পাবে, হালকা গলায় বললো জনি। বিপদ আছে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়ে সরে থাকতে বলেছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটা বিপদও দেখিনি আমি। শুধু প্লেন আছে, কামান-বন্দুকবোমা কিছু নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাকি অনেক এয়ারফীন্ডের পাশে মাইন পড়ে থাকতে দেখা গেছে, এখানে তা-ও দেখিনি।

তাহলে নোটিশ লিখেছে কেন? মুসাও ধরলো। তোমার খালাতো ভাইকে জিজ্ঞেস করলেই পারো। লিখেছে যখন, নিশ্চয় কোনো কারণ আছে।

বললাম তো, নেই, জোর দিয়ে বললো জনি। জন্মের পর থেকেই ওই নোটিশ দেখে আসছি। একসময় হয়তো লাগিয়েছিলো কোনো কারণে, এখন সেই কারণটা আর নেই। এখানে এসে গোসল করি, যা খুশি করি আমরা। কেউ কিছু বলে না।

বেশ মেনে নিলাম তোমার কথা, বললো বটে কিশোর, কিন্তু মানতে যে পারেনি সেটা তার স্বরই জানিয়ে দিলো। এখানে নোটিশ লাগানোর কোনো কারণ অবশ্য আমিও দেখছি না। কাঁটাতার নেই, বেড়া নেই, কিছুই নেই। শুধু নোটিশ লিখে রাখলেই কি আর লোকে মানবে?

ওসব কথা বাদ দিয়ে এখন এসো, পানিতে নামি।

সুইমস্যুট পরে ডাইভ দিয়ে পানিতে পড়লো ওরা। যতটা ভেবেছিলো, তার চেয়ে গভীর। চমৎকার ঠাণ্ডা, এই গরমে বেশ আরামদায়ক। কুকুরদুটোও তীরে থাকলো না, ঝাঁপিয়ে পড়লো পানিতে। মজা পেয়ে দাপাদাপি করতে লাগলো। রাফি তো উত্তেজনায় চেঁচাতেই শুরু করলো।

এই রাফি, চুপ! ধমক দিলো জনি।

কেন, চুপ করবে কেন? কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলো জিনা।

এয়ারফীন্ডে কেউ থাকলে শুনতে পাবে।

শুনুক না, অসুবিধে কি? তুমি তো বললে নোটিশ এমনি এমনিই লিখেছে।

আর কিছু বললো না জনি।

রাফির দেখাদেখি কিছুক্ষণ পর ডবিও চেঁচাতে শুরু করলো। আবার ধমক লাগালো জনি, এই ডবি, চুপ করলি। মারবো কষে এক থাপ্পড়!

কিন্তু ডবি চুপ করার আগেই ঘটে গেল আরেক ঘটনা। ধমক দিলো একটা কণ্ঠ, উঁচু গলায় কথা বলা স্বভাব লোকটার, এই, হচ্ছে কি! সরকারি এলাকায় অন্যায় ভাবে ঢুকেছে। নোটিশ দেখোনি?

চিৎকার থামিয়ে দিলো কুকুর দুটো। কে কথা বলে দেখার জন্যে ঘুরে তাকালো সবাই।

এয়ারফোর্সের ইউনিফর্ম পরা একজন লোক, বিশালদেহী, মোটা, লাল মুখ।

কি হয়েছে? লোকটার দিকে সঁতরে এগোলো কিশোর। আমরা গোসল করছি। কোনো ক্ষতি করছি না।

নোটিশ দেখোনি? গাহের দিকে হাত তুললে লোকটা।

দেখেছি। কিন্তু এখানে তো কোনো বিপদ দেখছি না, নিজেকে লাথি মারতে ইচ্ছে করলো কিশোরের, নোটিশ দেখেও জনির কথা বিশ্বাস করেছে বলে।

উঠে এসো! গর্জে উঠলো লোকটা। সব্বাই।

ধীরে ধীরে পানি থেকে উঠে এলো সবাই। কুকুর দুটো উঠে গা ঝাড়া দিয়ে তাকালো লোকটার দিকে।

এই কুত্তাদুটোকেই ঘেউ ঘেউ করতে শুনেছি তাহলে? তোমরা তো ছোট নও, নোটিশ বোঝার বয়েস হয়েছে। তারপরেও অমান্য করলে কেন? উপদেশ দিতে আরম্ভ করলো লোকটা, যা সব চেয়ে বেশি ঘৃণা করে কিশোর। চেঁচামেচি শুনে ভাবলাম, কেউ হয়তো বিপদে পড়েছে। তাই দেখতে এসেছি।

এখন তো দেখলেন পড়িনি, মুখ কালো করে বললো জনি।

পড়নি, কিন্তু পড়তে পারতে। এই ছেলে, তোমাকে আগেও দেখেছি মনে হয়? তুমি আর ওই কুত্তাটাকে? হ্যাঁ, মনে পড়েছে। হ্যাঙারের ওধার থেকে বেরিয়ে নিষিদ্ধ এলাকা দিয়ে চলেছিলে।

হ্যাঁ, গিয়েছিলাম, আমার খালাতো ভাই ফাইট-লেফটেন্যান্ট জ্যাক ম্যানরের সঙ্গে দেখা করতে, কিছুটা ঝাঁঝের সঙ্গেই বললো জনি। সেটা কি দোষের নাকি? সেদিনও বলেছি, আজও বলছি, শাইং করতে যাইনি। আর করার আছেই বা কি ওখানে? আমি শুধু আমার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম।

বেশ, আমিও দেখা করবো তার সাথে। দেখা করে বলবো, ভালোমতো ধোলাই দেয় যেন তোমাকে। বড় বেশি ফড়ফড় করো! চোখের মাথা খেয়েছো নাকি? চারদিকে নোটিশ ছড়িয়ে আছে দেখোনি?

তারমানে কি তলে তলে জরুরী কিছু ঘটছে? ফস করে জিজ্ঞেস করে বসলো জনি।

ঘটলে যেন বলবো তোমাকে! বিরক্ত কণ্ঠে বললো লোকটা। এখানে বিপদের কিছু নেই আমিও জানি। ঝর্নার পানি এসে জমা হয় এই পুকুরে, মাছটাছও জিয়ানো নেই যে নষ্ট হবে। তাছাড়া লোকে এখানে পিকনিক করতে এসে জায়গাটাকে সরগরম করে তুললে ভালোই লাগতো, যা নীরব হয়ে থাকে! কিন্তু সেটা করতে দিতে পারি না। আমার ওপর আদেশ রয়েছে কাউকে যেন ঢুকতে না দেয়া হয়।

লোকটা ঠিকই বলছে, ভাবলো কিশোর। জনি তর্ক করছে অযথা। নোটিশ অমান্য করে ওরাই বেআইনী কাজ করেছে। উচিত হয়নি। বললো, দেখুন, আমরা সত্যি অন্যায় করেছি। গরম লাগছিলো তো, ঠাণ্ডা পানির কথা শুনে লোভ সামলাতে পারিনি। গোসল করতে চলে এসেছি। ঠিক আছে, আর আসবো না।

কিশোরের দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকালো বিমান বাহিনীর গার্ড। হাসি ফুটলো মুখে। বুদ্ধিমান ছেলে। এই গরমের দিনে তোমাদের গোসলটা নষ্ট করলাম বলে খারাপই লাগছে আমার। ওই ছেলেটার মাথায় গোলমাল আছে, জনির দিকে হাত তুললো সে। বেশি গোঁয়ার। এতোই যদি গোসলের শখ ছিলো, তোমার ভাইয়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এলে না কেন? তাহলেই তো আমি আর কিছু বলতাম না। আমার জানা থাকতো, এই সময়ে কুকুরের চিৎকার শোনা যাবে, কিছু হৈ-হট্টগোল শুনতে পাবো। দেখতে আসতাম না।

থাক, কিছু মনে করবেন না, কিশোর বললো। আর আসব না। তাছাড়া এখানে থাকছিও না আমরা, যে জ্বালাতে আসবো। মাত্র কয়েকটা দিন, বেড়াতে এসেছি।

সো লং জানিয়ে, অনেকটা স্যালুটের ভঙ্গিতে হাত তুলে, মার্চ করে চলে গেল লোকটা।

ও ব্যাটা এখানে মরতে এলো কেন? এখনও মেনে নিতে পারছে না জনি। আমাদের গোসলটা নষ্ট করলো! গোপন কোনো ব্যাপার যদি না-ই থাকে…।

আই, চুপ করো! ওকে থামিয়ে দিলো মুসা। কিশোরের মতো সে-ও খুব লজ্জা পেয়েছে। দোষ তো ওদেরই। নোটিশ দেখার পরেও নামলো কেন পানিতে? ও কি বলে গেল শুনলে না? ওর ওপর আদেশ রয়েছে। আমাদের মতো তো আর ইস্কুলের ছাত্র নয় যে অফিসিয়াল আদেশকেও কিছু না বলে উড়িয়ে দেবে। সরকারি চাকরি করে। ইউনিফর্মের একটা দাম তো আছে।

যা, মাথা ঝাঁকালো কিশোর। আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। গা মুছে চলো এখন তোমাদের বাড়িতে। তোমার মার কাছ থেকে কিছু খাবার চেয়ে নেবো। সাঁতার কেটে সব হজম হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সহজ করার জন্যে হাসলো সে।

কিন্তু হাসি ফোঁটানো গেল না জনির মুখে। একে তো লোকটার ব্যবহার ভালো লাগেনি, তার ওপর বন্ধুদের কাছে লজ্জা পেয়েছে। বড়মুখ করে এনেছিলো। রাগে, ক্ষোভে এখন মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে।

গা মুছে কাপড় বদলাতে বদলাতে জিজ্ঞেস করলো, আমার ভাইয়ের কাছ থেকে অনুমতি যদি নিই, আবার আসবে তো?

না, বললো কিশোর। তবে তার সাথে দেখা করতে পারলে খুশি হবো।

হুঁ! আবার চুপ হয়ে গেল জনি।

বাড়ির কাছাকাছি আসতে দেখা গেল, ভেড়ার বাচ্চা কোলে নিয়ে প্রায় ছুটে আসছে ল্যারি।

ওই যে আসছে, হেসে বললো জিনা। ছড়াকার ভুল করেছেন। ওকে নিয়েই বরং ছড়াটা লিখে ফেলা উচিত ছিলোঃ ল্যারি হ্যাড আ লিটল ল্যাম্ব…

হেসে উঠলো সবাই।

ছড়াটা আমিও জানি, হেসে বললো ল্যারি। ম্যারি হ্যাড আ লিটল ল্যাম্ব, ওটা তো? সুর করে দুলে দুলে ছড়া বলতে আরম্ভ করলো সে।

বাড়ি থেকে আবার বেরিয়েছো? জনি বললো।

বা-রে। মা-ই তো তোমাদের ডাকতে বললো। চায়ের সময় হয়েছে…

মোটেও ডাকতে পাঠায়নি মা। তুমি নিজেই এসেছে, মা জানে না…

না এসে কি করবো? টোখোটা পালালো। ওকে খুঁজতে খুঁজতেই না…

আমাদের কাছে চলে এসেছো? হেসে ফেললো রবিন।

আমাদের কি দোষ? বড় বড় মায়াবী চোখ মেলে রবিনের দিকে তাকালো ল্যারি। মা বললো চা হয়েছে। ভাবলাম বুঝি তোমাদের ডাকতে বলছে, তাই…

চলে এসেছে, এই তো? খুব ভালো করেছো, আদর করে তার গাল টিপে দিলো জিনা।

খুশি হয়ে উঠলো আবার ল্যারি। ভেড়ার বাচ্চাটাকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ওকে আদর করলে না? ও মন খারাপ করবে তো।

হাসতে বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো জিনা। বললো, জনি, তুমি খুব ভাগ্যবান। ইস, আমার যদি এমন একটা ভাই থাকতো!

হাসি ফুটলো জনির মুখে। খানিক আগের গোমড়া ভাবটা কেটে গেল। ল্যারির হাত ধরলো, চল, বাড়ি চল।

হাঁটতে হাঁটতে মুসা ঠাট্টা করলো, ল্যারি, তোমার বাচ্চাটা খালি পালায়, ওকে বেঁধে রাখতে পারো না?

সঙ্গে সঙ্গে জবাব এলো, রাখতাম তো। কিন্তু ও যে খুব কাঁদে। মা নেই তো, তাই।

একেবারে চুপ হয়ে গেল মুসা।

জানালা দিয়ে দলটাকে আসতে দেখে বেরিয়ে এলেন মা। এসেছো। ভালো করেছে। মেহমান এসেছে বাড়িতে। ভাবলাম, তোমরা এলে দেখা হতো। আলাপ করতে পারতে।

কে এসেছে, মা? ভুরু কোঁচকালো জনি।

জ্যাক।

জ্যাক ভাইয়া! এসেছে! খুব ভালো হয়েছে…!

কথা শুনে বেরিয়ে এলো এক সুদর্শন তরুণ। লম্বা। হাসি হাসি মুখ। দেখেই তাকে ভালো লেগে গেল তিন গোয়েন্দা আর জিনার।

হাল্লো! হেসে বললো জ্যাক। তোমাদের কথা খালার কাছে শুনলাম। দেখা হয়ে ভালো হলো। হাত মেলাতে এগিয়ে এলো সে।

এক এক করে তিন গোয়েন্দা আর জিনা হাত মেলালো। এগিয়ে এলো রাফিয়ান। জ্যাকের সামনে বসে একটা পা উঁচু করে দিলো। আরি, কুকুরটা কি করছে! অবাক হয়ে বললো সে।

হাত মেলাতে বলছে, হেসে বললো জিনা। আপনাকে পছন্দ হয়ে গেছে ওর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *