০৫. কালো একটা ঘোড়ায় চড়ে

কালো একটা ঘোড়ায় চড়ে স্কেলিটন মেসার উপর উঠল জেকব। ক্লিফের পুব দিকের উঁচু জায়গায় পৌঁছে ঘোড়া থেকে নামল সে। এখানে কোন চূড়া নেই, কিন্তু জায়গাটা যথেষ্ট উঁচু। এখান থেকে ক্যাসেল বুটের উপত্যকা, মার্শ-পাস আর বালির ঢিবিগুলো অনেক দূর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। দূরবীন বের করে নিয়ে অপেক্ষায় বসল সে।

দিনের আলো এখনও ফোটেনি। একটু ধোঁয়া, বা ধুলো ওড়া, কিংবা কোন ধাতুর উপর সকালের আলো পড়ে একটু ঝিলিক দিয়ে ওঠা-এই ধরনের কিছু একটা দেখার আশাতেই সে এখানে এসেছে আজ। কিন্তু আসলে ওসব কিছু দেখতে না পেলেই খুশি হবে-নিঝঞ্ঝাটেই থাকতে চায় সে।

একঘণ্টা ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে অনেক কিছুই তার চোখে পড়ল। অনেক দূরের ইকো ক্লিফ ধীরে ধীরে সোনালী রঙ নিল, থিফ রক এখনও আঁধারে-সূর্যের আলো যেন পৌঁছতে পারছে না ওখানে।

একটা চিল…একদল বুনো ঘোড়া…কয়েকটা তিতির পাখি। কিন্তু কোন ঘোড়সওয়ার বা মানুষ তার নজরে পড়ল না।

দূরবীন খাপে ভরে ডালিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে ফিরে চলল জেকব। মেয়েটি তার নিজের সম্পর্কে প্রায় কিছুই বলেনি ওকে। প্রথম দর্শনেই জেকবের মনে হয়েছিল ডালিয়ার জন্মই হয়েছে তার প্রেয়সী হবার জন্য।

কেউ কোথাও নেই, ডালিয়ার সপ্রশ্ন দৃষ্টির জবাবে বলল জেকব। মনে হয় ওরা বাড়ি ফিরে গেছে।

ওরা কি আবার আসবে?

মনে মনে ভেবে দেখল সে। বালির ঢিবির পিছনে শুয়ে কাছে থেকে দেখা মুখগুলো ভেসে উঠল ওর চোখের সামনে। হাওদের মধ্যে অন্তত একজন আসবেই।

অখণ্ড অবসর ওদের-চারদিকে নজর রাখার জন্য অবশ্য এর মাঝেও প্রত্যেকদিনই দুবেলা একবার করে জেকবকে মেসার উপর যেতে হয়। বাকি সময়টা দু’জনে কপোত-কপোতীর মত গল্প করে কাটায়। চাষ করা যাবে এমন একটা ছোট জায়গার কথা একদিন কথায় কথায় উল্লেখ করল ডালিয়া। শহর থেকে খাবারের সাপ্লাই আনতে পারেনি জেকব। জমানো খাবার কমে আসছে-কোমর বেঁধে লেগে গেল সে। এক সপ্তাহের মধ্যেই জমিটা পরিষ্কার করে কুপিয়ে তাতে বীজ বুনে ফেলল। বড় মাটির দলগুলো ভেঙে গম, শিম, বরবটি, আর মটর বুনতে ওকে সাহায্য করল ডালিয়া।

অন্য কোনখান থেকে খাবার আনতে হলে আবার ডালিয়াকে একা রেখে বেরুতে হবে তাকে। উপায় থাকলে সে আর তা করতে চায় না। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অনুসরণকারী দলটাকে ফ্রীডমে ফিরতে দেখল নিকোলাস। ক্লান্ত অবসন্ন দেহে একে একে ঘোড়া থেকে নেমে গলাটা একটু ভিজিয়ে নেবার জন্য সেলুনে ঢুকল ওরা।

বারটেন্ডার ফ্রেড পিছনের ঘর থেকে বিশেষ উপলক্ষে তুলে রাখা একটা বোতল বের করে এনে ওদের সামনে রাখল। চেহারা দেখেই যাত্রার ফলাফল আঁচ করে নিয়েছে সে।

পালিয়ে গেছে, সবার পক্ষ থেকে লী জানাল। স্রেফ ফাঁকি দিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে লোকটা

তবে রসদের জন্যে একদিন না একদিন ওকে আবার ফিরতেই হবে, নিজেদের অক্ষমতা ঢাকার চেষ্টা করল কীথ।

ওদের পিছন পিছন নিকোলাসও বারে এসে ঢুকেছে। বারে হেলান দিয়ে অন্যদিকে চেয়ে ওদের কথাবার্তা শুনছে। জেকবের পিছু নিয়ে ওকে অনুসরণ করেই এই শহরে পৌঁছেছে সে। এখানে গোলাগুলি, ডেরিকের মৃত্যু ইত্যাদি সব ঘটনাই শুনেছে।

লোকটা কোথায় অদৃশ্য হয়েছে জানো? উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য একটু থামল ক্লাইভ। মরমন কুয়ার কাছে!

বারের পিছনে একটা গ্লাস পালিশ করছিল ফ্রেড। কথাটা শুনে কাজের মাঝেই হাত থেমে গেল ওর। মরমন কুয়ায়?!

হ্যাঁ। আমাদের পথ দেখিয়ে ওই পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে হঠাৎ হাওয়া হয়েছে লোকটা।

বেশি ফটফট করা তোমার একটা বদ-অভ্যাস, ওকে বকল বার্ট। ক্লাইভের এমন করে হাটে হাঁড়ি ভাঙাটা মোটেও পছন্দ হয়নি তার।

মরমন কুয়া-ওটাই তো হারানো সোনার ওয়্যাগনগুলোর চাবিকাঠি। কথা বলতে বলতে বারে কনুই রেখে ঝুঁকে দাঁড়াল ফ্রেড। তোমরা তো রাতারাতি বড়লোক হয়ে যেতে চলেছ। কবে ফেরত যাচ্ছ ওখানে?

সত্যি কথা বলতে কি, নিজের গ্লাসটা বারের উপর নামিয়ে রাখল ক্লাইভ। আমরা এখনও…’

তোমরা তা হলে লোকটাকে পালাবার সুযোগ দিচ্ছ? ওকে বাধা দিয়ে বলে উঠল নিকোলাস।

এতক্ষণে অপরিচিত লোকটার দিকে চোখ পড়ল সবার। লী ছাড়া আর সবাই বোকা বনে গেছে এই অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে। কর্কশ স্বরে লী জবাব দিল, কক্ষনো না। দরকার হলে নরক পর্যন্ত ওকে ধাওয়া করে যাব-কিছুতেই ওকে ছাড়ব না আমি।

তোমাদের সবারই বাড়ি-ঘর আর খামার রয়েছে সেখানে তোমাদের কাজও রয়েছে প্রচুর, আর আমি হচ্ছি একজন হাত-পা ঝাড়া লোক, বলল নিকোলাস।

তোমার এ-কথার মানে? জানতে চাইল লী

তোমাদের ওই খুনীটাকে ধরে আনার জন্যে টাকা দিয়ে একজন লোক রাখাই সবদিক দিয়ে যুক্তিসঙ্গত হবে। আমাকে কাজটা দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে তোমরা নিজেদের খামারের কাজ দেখতে পারবে। তা ছাড়া লোকটা যে কে তা জানি আমি।

তুমি চেনো ওকে?

হ্যাঁ, ওর নাম জেকব রাইট। দাড়ি পাল্লা মার্কা ঘোড়া ওর।

বাইরের কোন সাহায্য আমাদের দরকার নেই, প্রতিবাদ করল গিবন। আমরা নিজেরাই ওকে খুঁজে বের করব।

আমার নাম নিকোলাস পামার। বসবাস করার মত কোন সুন্দর জায়গা পেলে থাকব বলে পশ্চিমে এসেছি। এই শহরটা আমাদের বেশ পছন্দ হয়েছে-আমাকে যদি কিছু অধিকার আর ক্ষমতা দেয়া হয় তবে তার বদলে তোমাদের এই কাজটা আমি করে দিতে রাজি আছি।

কী অধিকার আর ক্ষমতা চাও তুমি?

তোমাদের কথার ওপর একটা লোককে খুঁজে বের করে হত্যা করা ঠিক দেখায় না। কিন্তু তোমরা যদি আমাকে মার্শাল নিযুক্ত করো, তবে কথাটা অন্যরকম দাড়ায়।

ওদের মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এই ধরনের প্রস্তাব ওদের কাছে সম্পূর্ণ নতুন আর অপ্রত্যাশিত। লী কোন কথা বলছে না-গিবনও নীরব রয়েছে। বাকি সবাই ওই দুজনের মতামতের অপেক্ষা করছে।

কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে গিবনই প্রথম কথা বলল। শান্তিপূর্ণ শহর এটা। এখানে আমাদের কোন মার্শালের দরকার নেই।

ইউজিন কোন কথাই বলেনি। কতক্ষণে বাড়ি ফিরে যাবে এই চিন্তাই ওকে ব্যস্ত করে রেখেছে। জেকবের খোঁজে আবার বেরুবার দায়িত্ব থেকে রেহাই পেলেই সে বেঁচে যায়। তাই নিকোলাসের প্রস্তাবটা ওর কাছে ভালই মনে হচ্ছে। কিন্তু আবার এই বেয়াড়া রকম কঠিন চেহারার লোকটাকেও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না সে। তার মনে হচ্ছে গিবনও একই কারণে আপত্তি জানিয়েছে।

একটা মিটিং ডেকে শহরের সবার মতামত নেয়া দরকার, একটু ভেবে নিয়ে মন্তব্য করল লী। দু’একজনের মতামতের ওপর কোন সিদ্ধান্ত নেয়া আমাদের ঠিক হবে না।

গ্লাসের বাকি মদটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে নিক বলল, নদীর ধারে তাঁবু ফেলেছি আমি-দরকার হলে খবর দিয়ো। বারের উপর গ্লাসটা নামিয়ে রেখে বেরিয়ে গেল সে।

সেলুনের ব্যাট-উইং দরজার কবাট দুটো কয়েকবার এপাশ ওপাশ দুলে স্থির হয়ে গেল। কেউ কথা বলছে না দেখে ইউজিন মুখ খুলল এবার বাড়ি ফিরতে হয়-দেরি দেখে বউ খুব দুশ্চিন্তা করবে।

হ্যাঁ, চলো আমিও উঠছি, বলল গিবন।

সোজা হয়ে দাঁড়াল লী; নিকোলাসকে কাজে লাগাতে আমাদের কী অসুবিধা? আমার তো মনে হয় এতে বরং আমাদের সুবিধাই হবে। আমরা নিজেদের কাজ দেখব-লোকটাকে খুঁজে বের করে নিকোলাস আমাদের খবর দিলে তখন সবাই মিলে গিয়ে কাজটা শেষ করে আসব। এতে আপত্তি করার কী আছে?

ওকে আমরা কেউ চিনি না, লী, যুক্তি দেখাল গিবন।

তাতে কী? বার্ট নিজের মত প্রকাশ করল। দরকার হলে আবার আর একটা মিটিং ডেকে ওকে বরখাস্ত করব। তা ছাড়া আমার মনে হয় না এদিকে থাকতে এসেছে সে।

ওই ধারণা তোমার কী করে হলো?

একটু ভেবে দেখলেই বুঝবে। জেকবকে আগে থেকেই চেনে লোকটা। আমরা কী নিয়ে আলোচনা করছি সবই জানত সে। আমার মনে হয় জেকবের সাথে কোন শত্রুতা আছে ওর-পিছন পিছন ওকেই অনুসরণ করে এখানে পৌঁছেছে সে।

তা হলে আর টাকা দিয়ে ওকে রাখার কী দরকার? বলেই যাবার জন্য উঠল গিবন। চলো, ইউজিনকে বলল সে, একসাথেই যাই। তোমার খামার পেরিয়েই যেতে হবে আমার।

ওদের দুজনকে দরজার দিকে এগোতে দেখে কঠিন চোখে চাইল লী। তার মানে তোমরা লোকটাকে কাজে নেয়ার বিপক্ষে?

থেমে দাঁড়াল গিবন। মাথা নিচু করে পুরো এক মিনিট চিন্তা করে সে জবাব দিল, হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ লী, লোকটাকে পছন্দ হয়নি আমার। ওকে বিশ্বাসও হয় না। আমার মতে নিজেদের সমস্যা নিজেরা মেটানোই ভাল।

ক্ষুব্ধ হয়ে ঘুরে ওদের দিকে পিছন দিয়ে দাঁড়াল লী। একটু অপেক্ষা করে বেরিয়ে গেল ওরা।

বার থেকে বেরিয়ে কাঠের রেলের সাথে বাঁধা ঘোড়ার লাগাম খুলতে খুলতে ইউজিন বলল, লী-র যে কী হয়েছে জানি না, মনে হয় যেন অনেক বদলে গেছে সে।

ও কিছু নয়, ইউ, আমাদের অন্যান্য সবার মত সে-ও ক্লান্ত, তেতো বিরক্ত হয়ে উঠেছে ওর মন। ঠিকমত বিশ্রাম পেলেই আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।

গিবন তাকে নিশ্চিন্ত করতে চাইলেও ইউজিন স্পষ্ট বুঝতে পারছে গিবন নিজেও এ-ব্যাপারে চিন্তিত। লী সবসময়ই একটু কঠিন প্রকৃতির লোকই ছিল। কিন্তু ইদানীং সে যেন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে! ওর কাছে কোন উনিশ-বিশ নেই-সব কিছুই ওর কাছে হয় হ্যাঁ কিংবা না। ওর ধারণা, সে যেটা ঠিক মনে করে সেটাই ঠিক। ওটা যে আর কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যায় তা মানতে সে। রাজি নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *