০৫. উঠে আড়মোড়া ভাঙল মুসা

উঠে আড়মোড়া ভাঙল মুসা। সারা গায়ে ধুলো-মাটি, নোংরা। খিদেও পেয়েছে। আচ্ছা, পয়সা পেলে রুটি, পনির আর এক গেলাস দুধ দেবে তো বৃদ্ধা? রবিনেরও নিশ্চয় খিদে পেয়েছে। কি অবস্থায় আছে কে জানে।

সাবধানে বাইরে বেরোল মুসা। চিলেকোঠার জানালার নিচে এসে দাঁড়াল। রবিনের উদ্বিগ্ন মুখ দেখা যাচ্ছে।

কেমন? হাত নেড়ে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল মুসা।

ভাল, হাসল রবিন। কিন্তু নিচে তো নামতে পারছি না। মহিলার ছেলে সাংঘাতিক বদমেজাজী। কয়বার যে গালাগাল করেছে বেচারী বুড়িটাকে। কানে শোনে না, এটা যেন তার দোষ।

তাহলে ও বেরিয়ে যাক, চট করে ফিরে তাকাল মুসা, কে জানি আসছে। তাড়াতাড়ি ফিরে এসে ঢুকল আবার গোলাঘরে।

বেড়ার ছিদ্র দিয়ে দেখল, বেঁটে এক লোক, চওড়া কাঁধ, সোজা হয়ে দাঁড়ালে সামান্য কুঁজো মনে হয়, মাথায় এলোমেলো চুলের বোঝ। গতরাতে দ্বিতীয় বার একেই ঢুকতে দেখেছে মুসা।

আরে, এদিকেই তো আসছে। কিন্তু না, গোলাঘরে ঢুকল না লোকটা। পাশ দিয়ে চলে গেল। গেট ভোলা আর বন্ধ হওয়ার শব্দ কানে এল মুসার।

চলে গেছে, ভাবল মুসা। যাই এবার।

আবার বেরোল গোলাঘর থেকে।

দিনের আলোয় বড় বেশি বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে ছোট্ট সাদা বাড়িটাকে। নিঃসঙ্গ, নির্জন।

ঘরে ঢুকল মুসা। রান্নাঘরে পাওয়া গেল বৃদ্ধাকে। সিংকে বাসন-পেয়ালা ধুচ্ছে। মুসাকে দেখে অস্বস্তি ফুটল চোখে। ও, তুমি। ভুলেই গিয়েছিলাম তোমাদের কথা।-জলদি তোমার বন্ধুকে নিয়ে চলে যাও। আমার ছেলে দেখলে

কিছু রুটি আর পনির দিতে পারবেন? চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল মুসা। বুঝল, লাভ হবে না। গলা ফাটিয়ে চেঁচালেও শুনতে পাবে না মহিলা, একেবারেই কালা। হাত তুলে টেবিলে রাখা রুটি দেখাল সে।

না না! আঁতকে উঠল বৃদ্ধা। জলদি চলে যাও। আমার ছেলে এসে পড়বে।

ঠিক এই সময় পায়ের শব্দ হলো। মুসা কিছু করার আগেই ঘরে ঢুকল লোকটা, যাকে খানিক আগে বেরিয়ে যেতে দেখেছে।

হাতের ছোট ঝুড়িতে কয়েকটা ডিম।

চোখ গরম করে তাকাল লোকটা। এই ছেলে, এখানে কি? কি চাই?

না, কিছু না…মানে, এই…আমাদের কাছে কিছু রুটি বেচবে কি না…

আমাদের? তুমি একা নও?

নিজেকে জুতোপটা করতে ইচ্ছে হলো মুসার, মুখ ফসকে আমাদের বলে ফেলেছে। কিন্তু ফেলেছে তো ফেলেছেই, কথা ফিরিয়ে নেয়া আর যাবে না। চুপ করে রইল।

কি হলো? রা নেই কেন? গর্জে উঠল লোকটা। এতক্ষণে বুঝলাম, ডিম যায় কোথায়? তোমরাই চুরি করো রোজদাঁড়াও, দেখাচ্ছি মজা…

আর কি দাঁড়ায় মুসা? ঝেড়ে দিল দৌড়। গেট পেরিয়ে ছুটল। দুপদুপ করছে বুক, পেছনে তাকানোর সাহস নেই। ঘর থেকেই বোধহয় বেরোয়নি।

পায়ে পায়ে আবার গেটের কাছে ফিরে এল মুসা। উঁকি দিয়ে দেখল, একটা বড় কাঠের পাত্র হাতে নিয়ে উল্টো দিকে চলে যাচ্ছে লোকটা, সাদা বাড়ির পেছনে। বোধহয় মুরগীর খাবার দিতে যাচ্ছে।

এই-ই সুযোগ। ঢুকে পড়ল মুসা। চিলেকোঠার জানালায় দেখা যাচ্ছে রবিনের মুখ। ইশারায় নেমে আসতে বলল তাকে মুসা।

রবিন নেমে আসতেই আর দাঁড়াল না। বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল দুজনে। তাড়াতাড়ি পা চালাল।

আশপাশের অঞ্চল রাতে লেগেছিল এক রকম, এখন লাগছে আরেক রকম।

অনেকখানি আসার পর প্রথম কথা বলল রবিন, আরিব্বাপরে! সাংঘাতিক হারামী লোক। আর ওটা একটা ফার্ম হলো নাকি? গরু-শুয়োর কিছু নেই। একটা কুত্তাও না।

মনে হয় না ওটা ফার্ম, বেড়ার ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল মুসা, ফিরে তাকাল একবার বাড়ির ভাঙা গেটের দিকে। শিওর, পথ হারিয়েছিলাম কাল রাতে। ভুল জায়গায় উঠেছি। ইয়েলো পণ্ড ফার্ম হতেই পারে না।

কাজটা খারাপ হয়ে গেল তাহলে, জিভ দিয়ে চুকচুক শব্দ করল রবিন। কিশোর আর জিনা নিশ্চয় ফার্মে উঠেছে। আমাদের জন্যে খুব ভাববে।

হ্যাঁ, ছোট একটা পুকুর দেখে ঘুরল মুসা। চলো, হাত-মুখ ধুয়ে নিই। চেহারার যা অবস্থা হয়েছে একেকজনের। লোকে দেখলে পাগল ভাববে।

হাত-মুখ ধুয়ে কাপড় বদলে নিল দুজনে। ময়লা কাপড় ভরে রাখল ব্যাগে, পরে সময়-সুযোগমত ধুয়ে নেবে।

পাড়ের ওপর উঠতেই একটা ছেলেকে দেখতে পেল, শিস দিতে দিতে আসছে। হাল্লো, বলল হাসিখুশি ছেলেটা। ছুটি কাটাতে বেরিয়েছ বুঝি?

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকাল মুসা। আচ্ছা ভাই, ইয়েলো পণ্ড ফার্মটা কোথায়? ওই ওটা? বৃদ্ধার বাড়িটা দেখাল।

আরে দূর, ওটা ফার্ম নাকি? ও-তো মিসেস হ্যাগার্ডের বাড়ি। নোংরা। নাক কুঁচকাল ছেলেটা। ওটার ধারে-কাছে যেয়ো না। বুড়ির ছেলে একটা ইবলিস, গাঁয়ের লোকে ওর নাম রেখেছে ডারটি রবিন।…ইয়েলো পণ্ড ওই ওদিকে। ব্যাংকিন রেস্ট ছাড়িয়ে গিয়ে, বায়ে। .

থ্যাংকু, বলল মুসা।

মাঠের পথ ধরে হেঁটে চলেছে রবিন আর মুসা। পেটে খিদে। মনে ভাবনা। কিশোর আর জিনা নিশ্চয় খুব দুশ্চিন্তা করছে।

সরু পথটার কাছে এসে থামল, সেই যে সেই পথটা, যেটার দু-ধারে পাতাবাহারের জঙ্গল পথকে সুড়ঙ্গ বানিয়ে দিয়েছে।

হাত তুলে দেখাল রবিন, ওই যে দেখো, কোথায় নেমে যাচ্ছিলাম। নালা।

নালায়েকের বাচ্চা, বিড়বিড় করে টমটমওয়ালাকে গাল দিল মুসা।

র‍্যাংকিন রেস্টের কাছে আসতেই কিশোর আর জিনার দেখা পাওয়া গেল। মুসা আর রবিনকে আগেই দেখেছে ওরা, নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ছুটে আসছে। তাদের সঙ্গে লাফাতে লাফাতে আসছে রাফিয়ান।

নাস্তা কেউই খায়নি। র‍্যাংকিন রেস্টে ঢুকল ওরা।

এগিয়ে এল সেই মহিলা, গতদিন ডাস্টার দিয়ে যে জানালা পরিষ্কার করছিল। কি চাই?

নাস্তা খাইনি এখনও, বলল কিশোর। কিছু আছে?

পরিজ আর মাখন, জানাল মহিলা। আর আমাদের নিজেদের কাটা গরু, নিজেদের মুরগীর ডিম। নিজেদের হাতে চাক ভেঙে মধু এনেছি আমরা, আর পাউরুটি আমি নিজে বানিয়েছি। চলবে? কফিও আছে।

ইস, আন্টি, জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে আপনাকে, দাঁত আর একটাও ভেতরে রাখতে পারছে না মুসা। জলদি করুন। এক বচ্ছর কিছু খাইনি।

হেসে চলে গেল মহিলা।

ছোট গোছানো ডাইনিং রুমে আরাম করে বসল অভিযাত্রীরা। খানিক পরেই রান্নাঘর থেকে ভেসে এল ভাজা মাংস আর কড়া কফির জিভে পানি আসা গন্ধ। লম্বা জিভ বের করে ঠোঁট চাটল রাফিয়ান।

কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল মুসা, ও তো দেখছি ভাল হয়ে গেছে। মিস্টার নরিসের ওখানে গিয়েছিলে?

হ্যাঁ, বলল কিশোর। গিয়ে দেখলাম বাড়ি নেই। তার স্ত্রী বললেন, এসে পড়বেন শিগগিরই। খুব ভাল মহিলা। বসতে দিলেন। বসলাম।

কিন্তু শিগগির আসেননি ভদ্রলোক, জিনা যোগ করল। কাজে আটকে গিয়েছিলেন। সাড়ে সাতটার পর এলেন। খুব খারাপ লাগছিল, তাদের খাওয়ার সময় তখন।

তবে মিস্টার নরিসও ভাল, বলল কিশোর। রাফির পা দেখল, চেপে ধরে কি জানি কি করল..এমন জোরে কাউ করে উঠল রাফি, যেন ছাত ছুঁড়ে বেরিয়ে যাবে…জিনা গিয়ে লাফ দিয়ে পড়ল মিস্টার নরিসের ওপর…হাহ হাহ…ভদ্রলোক তো হেসেই বাঁচেন না…

যাব না, চোখমুখ ঘুরিয়ে বলল জিনা। যা ব্যথা দিয়েছে…

ডাক্তার যা করেন, বুঝেশুনেই করেন…

হ্যাঁ, তাই তো দেখছি, আবার রাফিয়ানের মাথায় হাত বোলাল মুসা। একেবারে ভাল হয়ে গেছে। তারপর কি করলে?

খাওয়ার জন্যে চাপাচাপি শুরু করলেন মিসেস নরিস, বলল কিশোর। কিছুঁতেই এড়াতে পারলাম না। খাওয়ার পর বেরোতেও দিতে চাইলেন না। বললেন, বৃষ্টিবাদলার মধ্যে গিয়ে কি করবে, শুয়ে থাকো এখানেই। তোমরা ভাববে বললাম। শেষে, ন-টা বাজার পর আকাশ পরিষ্কার হলে ছাড়লেন। ইয়েলো পণ্ডে গিয়ে তোমাদের পেলাম না। ভাবলাম, বৃষ্টিতে আটকে গেছ, অন্য কোথাও রাত কাটাতে উঠেছ। কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না। এতক্ষণে না পেলে পুলিশকে জানাতাম।

ফার্মটা কিন্তু দারুণ, মাথা কাত করল জিনা। ছোট একটা ঘরে থাকতে দিল আমাদের। বিছানা বেশ নরম। আমার বিছানার পাশে নিচে রাফি শুয়েছিল।

আর কি কপাল, কপাল চাপড়াল মুসা, আমি কাটিয়েছি খড়ের গাদায়…

মস্ত ট্রে-তে খাবার বোঝাই করে নিয়ে ঘরে ঢুকল মহিলা। পরিজ থেকে ধোঁয়া উঠছে। সাদা বিরাট বাটিতে সোনালি মধু। ইয়া বড় এক ডিশ ভরতি মাংস-ভাজা আর ডিম সেদ্ধ। আরেকটা বাসনে ভাজা ব্যাঙের-ছাতাও রয়েছে। .

খাইছে! হাততালি দিয়ে উঠল মুসা। ঢোক গিলল।

টেবিলে ট্রে নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল মহিলা, এগুলো খাও। টোস্ট, ডিম ভাজা আর মাখন নিয়ে আসছি। দুধ-কফি পরে আনব। নাকি এখনি?

না না, তাড়াতাড়ি হাত নাড়ল মুসা, পরেই আনুন। একটা ডিম তুলে নিয়ে আস্ত মুখে পুরল। সেটা অর্ধেক চিবিয়েই এক টুকরো মাংস নিয়ে কামড় বসাল। প্লেটে খাবার তুলে নেয়ার তর সইল না।

হেসে যার যার প্লেট টেনে নিল অন্যেরা। খাবার তুলে নিল প্লেটে। বাকি খাবার সহ ট্রে-টা মুসার দিকে ঠেলে দিয়ে বলল জিনা, নাও, রাফিয়ানকেও কিছু দিয়ো।

কি আর বলব রে ভাই, ব্যাঙের ছাতার শেষ টুকরোটা মুখে পুরল মুসা। অন্ধকারে গিয়ে উঠেছিলাম এক বান্দরের বাড়িতে। রবিন, তুমি বলো। দরজায় দেখা দিয়েছে মহিলা, হাতে আরেক ট্রে, লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সেদিকে গোয়েন্দা সহকারী।

সংক্ষেপে জানাল রবিন, পথ হারিয়ে কিভাবে গিয়ে উঠেছিল বাড়িটাতে।

বাধা না দিয়ে চুপচাপ শুনল কিশোর, তারপর বলল, ঘণ্টা শুনে ভয় পেয়েছে, নিশ্চয় মুসা ভূতের ভয় ঢুকিয়েছে তোমার মনে?

জোরে জোরে দুহাত নাড়ল মুসা, কি বোঝাতে চাইল সে-ই জানে। মুখ ভর্তি খাবার, কথা বলতে পারছে না।

অ, তোমরা তাহলে শোনননি কিসের ঘণ্টা, বলল কিশোর। পাগলা-ঘন্টি, মিসেস নরিস বলেছেন। জেল থেকে কয়েদী পালালে নাকি ওরকম বাজিয়ে হুঁশিয়ার করে দেয়া হয় গ্রামবাসীকে।

আর আমরা এদিকে কি ভয়ই না পেয়েছিলাম, মলিন হেসে মাথা নাড়ল রবিন।

নাস্তা শেষ হলো। এক টুকরো খাবারও পড়ে রইল না। উচ্ছিষ্টও না। যা ছিল, সাবাড় করে দিয়েছে রাফিয়ান।

কিছু স্যাণ্ডউইচ কিনে নেয়া দরকার, বলল কিশোর। দুপুরে খাওয়ার জন্যে।

হ্যাঁ, নাও, সঙ্গে সঙ্গে বলল মুসা।

বাইরে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে কিশোর বলল, মুসা, রবিনের কথা তো বললে। তুমি গোলাঘরে কিভাবে রাত কাটালে বললে না তো।

এতক্ষণে মনে পড়ল মুসার, রবিনকেও বলা হয়নি রাতের কথা। বলার অবকাশও পায়নি অবশ্য। দুজনে তখন ইয়েলো পণ্ড খোঁজায় এত ব্যস্ত, পেটে খিদে, আলাপ করার মানসিকতাই ছিল না।

এক কাণ্ড হয়েছে কাল রাতে, বলল মুসা। ওটা সত্যি ভূতের বাড়ি।

তোমার কাছে তো সবই ভূত, হাত নাড়ল কিশোর। চলো, কোথাও বসে শুনি। মনে হচ্ছে, অনেক কিছু বলার আছে তোমার।

নির্জন একটা জায়গা দেখে ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসল ওরা।

সব খুলে বলল মুসা। চুপ করে শুনল সবাই।

পকেট থেকে কাগজটা বের করে দিল মুসা। ওটার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল অন্যেরা। এমন কি রাফিয়ানও ফাঁক দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে দিল, যেন মহা-পণ্ডিত।

আগামাথা কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না, নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে। কিশোর। তবে নকশা-টকশা কিছু হবে। কিসের কে জানে।

ব্যাটা বলল, জানাল মুসা, টিকসির কাছে নাকি বাকি অর্ধেক আছে।

এই টিকসিটা কে? বলল জিনা। আল্লাহ মালুম।

রবিনের নামই বা জানল কিভাবে? এই কিশোর, কি ভাবছ? কনুই দিয়ে কিশোরের পাজরে তো দিল জিনা।

বুঝতে পারছি না, মাথা নাড়ল কিশোর।

আমি পারছি, দু-আঙুলে চুটকি বাজাল হঠাৎ রবিন।

জিজ্ঞাসু চোখে তার দিকে তাকাল কিশোর।

মুসা, ছেলেটা কি বলেছিল? বলল রবিন। বলেছিল বুড়ির ছেলের নাম ডারটি রবিন রেখেছে লোকে। গতরাতে আমাকে নয়, ওকেই ডেকেছিল বুলেট-মাথা। বুড়ির ছেলে গোলাঘরে তার জন্যেই অপেক্ষা করেছে। জানে না, আগেই এসে তোমাকে ডারটি ভেবে মেসেজ দিয়ে চলে গেছে লোকটা।

ঠিক বলেছ, একমত হলো মুসা।

আনমনে বলল শুধু কিশোর, হুঁ। জেল পালানো কয়েদীর সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই তো? প্রশ্ন রাখল জিনা।

অসম্ভব না, বলল কিশোর। হতেও পারে। মেসেজটা সে-ই দিয়ে গেছে। হয়তো। কিন্তু কার কাছ থেকে আনল?

জেরি? মুসা বলল।

জেরি, না? হতে পারে। হয়তো সে এখন জেলে আছে, তার বন্ধু বুলেটমাথা, পালিয়েছে। বন্ধুর কাছেই মেসেজটা দিয়েছে সে। তাহলে ডারটি রবিন ওদেরই দলের কেউ। কোন বদ-মতলব আছে ব্যাটাদের।

কি মতলব?

তা জানি না। তবে হতে পারে, পাগলাঘন্টি শুনেই ডারটি বুঝেছে, যে তার বন্ধু পালিয়েছে। মেসেজ নিয়ে আসবে তার কাছে। তাই গোলাঘরে এসে বসেছিল মেসেজের আশায়।

হ্যাঁ, তাই হবে, মাথা দোলাল মুসা।

অথচ ভুলে মেসেজটা পড়ল এসে তোমার হাতে, রবিন বলল। মুসা, ভূতই মনে হয় গতরাতে আমাদেরকে পথ ভুলিয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল ওখানে, কোন একটা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে…

ধ্যাত, সব বাজে কথা, হাত নেড়ে মাছি তাড়াল যেন জিনা। চলো, গিয়ে পুলিশকে জানাই। কয়েদী ধরতে সুবিধে হবে তাদের।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর। ছুটিতে এসেছি আনন্দ করতে, ডাকাত-টাকাতের খপ্পরে পড়তে চাই না। ম্যাপ বের করে নীরবে দেখল মিনিটখানেক। এই থানা-টানা থাকলে এখানেই থাকবে।

উঠল ওরা। খুশি হলো রাফিয়ান। নাস্তার পর পরই এত সময় ধরে বসে থাকাটা মোটেই পছন্দ হচ্ছিল না তার। লাফাতে লাফাতে আগে আগে চলল সে।

পা তো একেবারে ভাল, ছুটিটা মাঠে মারা যায়নি বলে রবিনও খুশি। ভালই হয়েছে, শিক্ষা হয়েছে একটা। বোকার মত আর খরগোশের গর্তে ঢুকবে না।

হ্যাঁ, সত্যই শিক্ষা হয়েছে রাফিয়ানের। আর গর্তে ঢুকল না। তবে পরের আধ ঘন্টায় অন্তত ডজনখানেক বার মুখ ঢোকাল খরগোশের গর্তে। ধরা তো দূরের কথা, ছুঁতেও পারল না কোনটাকে। ওর চেয়ে খরগোশের পাল অনেক বেশি তাড়।

খোলা মাঠে বুনো ঘোড়া চরছে।

একবার একটা পাহাড়ী পথে মোড় নিতেই মুখোমুখি হয়ে গেল একপাল বুনো ঘোড়ার। অবাক চোখ মেলে অভিযাত্রীদের দেখল। তারপর একই সঙ্গে ঘুরে খুরের খটাখট তুলে দ্রুত হারিয়ে গেল পাহাড়ের ঢালের বনে। পিছু নেয়ার জন্যে পাগল হয়ে উঠল রাফিয়ান, জোর করে তার গলার বেল্ট টেনে ধরে রাখল জিনা।

খুব সুন্দর, না? বলল সে। আদর করতে ইচ্ছে করে।

গতদিনের মতই সকালটা সুন্দর, রোদে উজ্জল। পায়ের তলায় সবুজ ঘাস। একটা ঝর্নার পাড় দিয়ে হাঁটছে এখন। মৃদু ঝিরঝির করে বইছে টলটলে পানি, যেন গান গেয়ে নেচে নেচে ছুটে চলেছে মাতোয়ারা হয়ে।

দুপুরের দিকে জুতো খুলে ঝর্নায় পা ডুবিয়ে বসল ওরা। পায়ে হালকা পালকের মত পরশ বোলাচ্ছে পানি।

স্যাণ্ডউইচ দিয়ে দুপুরের খাওয়া সেরে পেট পুরে খেলে ঝর্নার পানি।

পানিতে পা রেখেই নরম ঘাসে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল জিনা। খোলা নীল আকাশের দিকে তামাটে চোখ। হলুদ রোদে যেন জ্বলছে তামাটে চুল। খুব সুন্দর লাগছে তাকে।

কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর আবার শুরু হলো চলা।

ডিয়াটোতে কখন পৌঁছবে জানে না। তবে তাড়াও নেই। সাঁঝের আগে কোন ফার্মহাউস খুঁজে পেলেই হলো। রাতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

থানা থাকলে সেটা খুঁজে বের করতে হবে আগে, বলল কিশোর। তারপর ফার্ম…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *