০৪. শুকনো একটা ওঅশের কাছে

শুকনো একটা ওঅশের কাছে পৌঁছে সৈন্যদের থামার নির্দেশ দিল সার্জেন্ট টমাস হ্যালিগান। ওঅশের তলায় আসা মাত্র যার যার জায়গায় শুয়ে পড়ল ক্লান্ত, বিধ্বস্ত সৈন্যরা। সতীর্থদের ছেড়ে এগিয়ে গেল হ্যালিগান, ওঅশের উল্টো কিনারার ঢালে এসে বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে দৃষ্টি চালাল।

দশ বছর বয়সে পশ্চিমে এসেছিল হ্যালিগান, তখন থেকে কাজে লেগে গেছে। ষোলো বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। এখন, বিয়াল্লিশ বছর বয়সে, পোড়খাওয়া দক্ষ সৈনিকে পরিণত হয়েছে। চাকুরির নয় বছর মরুভূমিতে কেটেছে, তাই মরুভূমি সম্পর্কে জানে সে। অভিজ্ঞতাটা মরুভূমিকে সমীহ ও ভয় করার জন্য যথেষ্ট।

ঘণ্টাখানেক আগে দক্ষিণে চলে যাওয়া ছোটখাট এক দল ইন্ডিয়ানের ট্র্যাক পেরিয়ে এসেছে ওরা। ট্র্যাকিং সম্পর্কে যথেষ্ট দক্ষতা থাকায় হ্যালিগান বুঝতে পারেনি দুলে ক’জন রৈভস্কিন ছিল। অন্তত ছয়জন, অনুমান করেছে সে, তবে এটা নিশ্চিত বুঝেছে যে-দলটা আক্রমণ করেছিল ওদের, এরা সেই দলের নয়, বরং ভিন্ন দল। এলাকায় একই সময়ে ইন্ডিয়ানদের একাধিক দলের আনাগোনার তাৎপর্য একটাই-সীমান্তের ধারে কোন ঘটনা ঘটেছে। ইন্ডিয়ান তৎপরতার খবর ফোর্ট ইয়োমাতে রিপোর্ট করার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে উপলব্ধি করল সার্জেন্ট হ্যালিগান।

উপুড় হয়ে বালির উপর শুয়ে আছে সে, লাগাতার ছোটাছুটির মাঝে ক্ষণিকের এই বিরতিটুকু উপভোগ্য মনে হচ্ছে। ঠোঁটজোড়া শুকিয়ে ফেটে গেছে, চোখের চারপাশ লালচে রঙ ধারণ করেছে; সারা শরীরে এতটাই ক্লান্তি যে হাল ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করছে। চাইছে বটে, কিন্তু হ্যালিগান জানে বাস্তবে হাল ছেড়ে দেবে না সে, কিংবা দেওয়াও উচিত হবে না। একই জায়গায় ঠায় পড়ে থাকল, ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বিপদের কথা ভাবল মনে মনে। নিজের শরীরের গন্ধে ঘেন্না ধরে গেছে ওর, বেশ কয়েকদিন গোসল করা হয়নি। ঘামের বিশ্রী গন্ধের সঙ্গে ঘোড়া আর গানপাউডারের গন্ধ মিলেমিশে গেছে। এমনকী নোংরা ইউনিফর্মটাকেও এখন আর প্রেরণা বা গর্বের কোন বস্তু মনে হচ্ছে না।

সব মিলিয়ে ওরা ছয়জন, ঘোড়া আছে মোটে তিনটা। বাড়তি রাইফেল, অ্যামুনিশন আর ক্যান্টিন বহনের জন্য ঘোড়াগুলোকে ব্যবহার করছে, ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে লড়াইয়ের পর থেকে পায়ে হাঁটছে সবাই। পাপাগো ওয়েলস থেকে অন্তত ত্রিশ মাইল পশ্চিমে আক্রান্ত হয়েছিল, সেই থেকে টানা হেঁটে অনেকটা পথ অতিক্রম করেছে, কিন্তু সামনের পথটুকুকে এই মুহূর্তে অনতিক্রম্য এবং যোজন দূরত্ব মনে হচ্ছে।

সৈনিক জীবনে ফোর্ট ইয়োমায় খুব কম সময়ই নিয়োজিত ছিল সে, স্বভাবতই টুকসনের পশ্চিমের এলাকা সম্পর্কে অনভিজ্ঞ হ্যালিগান। পানিই এখানে মুখ্য বিষয়। শেরিফের পাসি বাহিনীর একমাত্র জীবিত সদস্য, মার্ক ডুগানের কাছে জেনেছে কিপ্রিয়ানো ওয়েল নামে আরও একটা অগভীর কূপ রয়েছে…বছরের এই সময়ে ওটায় পানি থাকার সম্ভাবনা কম; কিন্তু এটাই ওদের শেষ আশা। পাপাগো ওয়েস পর্যন্ত যাওয়ার মত যথেষ্ট পানি যদি কিপ্রিয়ানো ওয়েলে পাওয়া যায়…

সামনে, দিগন্তের সঙ্গে মিশে যাওয়া নিচু পাহাড়সারির নাম এগুয়া ডালস, কিপ্রিয়ানো ওয়েলের অবস্থান ওই পাহাড়ে। আসলে এ-ধরনের কূপ বা পুকুর হচ্ছে অগভীর খাদে বা গর্তে বৃষ্টিপাতের ফলে জমে যাওয়া পানি। পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা কেউই দিতে পারে না। সঙ্গে যে-পানি আছে, কিপ্রিয়ানোয় পৌঁছানোর আগেই শেষ হয়ে যাবে, জানে টমাস হ্যালিগান। কিপ্রিয়ানোয় যদি পানি না পাওয়া যায়, পাপাগো ওয়েলসে যেতে হরে। সেটা সম্ভব হবে না, একরকম নিশ্চিত সে।

তাপ, পানিশূন্যতা আর লাগাতার পথচলার কারণে ক্লান্তির চরমে পৌঁছে গেছে সৈন্যরা। আধ-ঘণ্টার বিশ্রাম দিয়েছিল হ্যালিগান, সহকর্মীদের করুণ দশা ওকে দ্বিধান্বিত করে তুললেও উঠে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিল। এখানে বসে থাকলে কাজের কাজ কিছু হবে না।

জড়সড় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল সৈন্যরা।

কাছাকাছি থেকো সবাই, নির্দেশ দিল সার্জেন্ট। আশপাশে আরও ইন্ডিয়ান থাকতে পারে।

মাইল দুয়েক সৈন্যদের মার্চ করাল সে, তারপর থামার নির্দেশ দিল। ডাফি, ব্লট, কেলার…ঘোড়ায় চড়ো তোমরা। অন্যদের বিমূঢ় মুখের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসল হ্যালিগান। হতাশ হয়ো না। পালাক্রমে সবাই ঘোড়ায় চড়ব আমরা। বাকি পথটা এভাবেই পেরোতে হবে।

কিছু বলতে গিয়েও দ্বিধা করল মার্ক ডুগান, শেষে না-বলাই সাব্যস্ত করল। তিন ঘোড়ার একটা ওর, সেটা কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করতে যাবে কেন? করলেও, সার্জেন্ট নির্দেশ দেওয়ার কে? ছয়জনে মিলে বিপদ উতরে যেতে হবে, উপলব্ধি করল সে, এ-মুহূর্তে সাধারণ মানুষ বা সৈন্যের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। খাটো, গাট্টাগোট্টা মানুষ মার্ক ডুগান; মাথা-মোটা, একগুঁয়ে এবং রগচটা বলে বদনাম আছে তার। সেনাবাহিনীর পোষ্ট স্থাপন আর ফেরি চলাচল শুরু হওয়ার পর প্রথম যারা ইয়োমায় বসতি করেছিল, ডুগান তাদের একজন।

ওঅশের তলা বেশ গভীর, আলগা বালিতে ভরা; তবে কিনারার দিকে বালির সঙ্গে পাথর থাকায় হাঁটতে সুবিধা হচ্ছে। ওঅশ থেকে উঠে আসা তেমন কঠিন নয়, তবে খোলা জায়গা পেরিয়ে যেতে হবে। বিপজ্জনক তো বটেই, হঠকারিও হবে কাজটা। সেধে বিপদে পড়ার ইচ্ছে নেই সার্জেন্ট হ্যালিগানের।

শরীর আর কাপড় ধুলোয় একাকার হয়ে গেছে সবার, কিন্তু ভ্রুক্ষেপ করছে না কেউ। আসলে পানির চাহিদা, ক্লান্তি এবং ইন্ডিয়ানদের আচমকা আক্রমণের আশঙ্কা ছাড়া অন্য কিছুতে আমল দিচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে দেওয়ার কথাও নয়। টলমল পায়ে এগিয়ে চলল ছয়জন মানুষ। অদৃশ্য কোন যাদুবলে আক্রান্ত হয়েছে যেন, ঘোরলাগা মানুষের মত একই ভঙ্গিতে এগিয়ে চলছে সবাই; উত্তাপ, ধুলো আর দূরত্ব সম্পর্কে অসচেতন।

হাঁটতে হাঁটতে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করল সার্জেন্ট হ্যালিগান। অ্যাপাচি চীফ চুরুতি যে লোকবল সংগ্রহ করছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। শিগগিরই মহা উৎসাহে আক্রমণ করবে। ইন্ডিয়ানদের তীব্র আক্রোশ আর প্রতিহিংসার শিকার হবে সাদারা, শত মাইলের মধ্যে কোন এলাকাই বাদ পড়বে না। সব মিলিয়ে জনা পঞ্চাশেকের বেশি হওয়ার কথা নয়, কিন্তু এই পঞ্চাশজনই নরক নামিয়ে আনতে সক্ষম। এদেরকে কোনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারলে আকস্মিক কিন্তু তীব্র এই বিশৃঙ্খলা রোধ করা সম্ভব। নিজের দায়িত্ব উপলব্ধি করতে পারছে হ্যালিগান-যত দ্রুত সম্ভব ফোর্টে গিয়ে কমান্ডিং অফিসারের কাছে রিপোর্ট করতে হবে।

ইন্ডিয়ান আক্রমণের প্রথম তোপে পড়বে বিচ্ছিন্ন বাথান বা খনির লোকজন। সাহায্য পৌঁছা’নোর আগেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এরা। সৌভাগ্যবান কয়েকজন যদি পালাতে পারে, হয়তো ইয়োমা বা টুকসনে পৌঁছতে পারবে।

সূর্যাস্তের একটু আগে কিপ্রিয়ানো ওয়েলে পৌঁছল সার্জেন্টের দল।

মূল দল থেকে একটু আগে রয়েছে মার্ক ডুগান, স্কাউটের দায়িত্ব পালন করছে। অন্যদের এগোতে দেখে হাত তুলে থামার ইশারা করল সে, তারপর হাঁটু গেড়ে বসে মাটিতে ট্রাক জরিপ করতে শুরু করল। এখানে এসেছিল ওরা, সার্জেন্ট, একটু পর ফলাফল জানাল সে। সঙ্গে একজন বন্দি ছিল।

ডুগানের দেখানো ট্র্যাক খুঁটিয়ে দেখল হ্যালিগান। ইন্ডিয়ানদের পায়ের ছাপের সঙ্গে মিশে গেলেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে বন্দি একজন মহিলা…সাদা মহিলা।

কূপের কাছে চলে গিয়েছিল টেরিল ডাফি, ফিরে এসে রিপোর্ট করল সে। বেশি নেই, সার্জেন্ট। যা আছে, ক্যান্টিন ভরার পর ঘোড়াগুলোকে খাওয়ালে শেষ হয়ে যাবে সব পানি।

পাঁচ কি ছয়জন ইন্ডিয়ান ছিল, মৃত মিউলটাকে দেখিয়ে বলল ডুগান, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে ওটা থেকে। মিউলটাকে জবাই করার জন্য এখানে থেমেছিল ওরা। খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম নিয়েছে।

নিজের অসহায়ত্বে অস্থির বোধ করছে সার্জেন্ট। মেয়েটাকে সাহায্য করবে কী, নিজেদেরই বেহাল দশা! সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘোড়া, খাবার বা অ্যামুনিশন ছাড়া ইন্ডিয়ানদের পিছু নেওয়া দারুণ বোকামি হবে। কী বুঝলে, ডুগান? জানতে চাইল সে।

মিনিট কয়েক সার্জেন্টের দেখানো ট্র্যাক খুঁটিয়ে দেখল ডুগান, শেষে বলল: মেয়েটা পালিয়ে গেছে। বোধহয় ইন্ডিয়ানরা ভরপেট খেয়ে ঘুম দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল ও, তারপর চুপিসারে কেটে পড়েছে।

একটা ঘোড়া নিয়ে গেলেই পারত! মন্তব্য করল ডাফি।

হয়তো ইন্ডিয়ানরা জেগে যাবে বলে নেয়নি। পায়ে হেঁটে চলে গেছে মেয়েটা।

চিহ্ন দেখে বোঝা গেল মেয়েটাকে অনুসরণ করেছে অ্যাপাচিরা। ভাগ্য নেহাত সুপ্রসন্ন না হলে এতক্ষণে ধরাও পড়ে গেছে বোধহয়। ফিল্ডগ্লাস তুলে বিস্তীর্ণ মরুভূমির যতটুকু সম্ভব, খুঁটিয়ে নিরীখ করল সার্জেন্ট; কিন্তু তাপতরঙ্গের কারণে বেশিদূর দেখতে পাচ্ছে না, দৃষ্টিসীমায় বাধা হয়ে দাড়িয়েছে প্রচণ্ড দাবদাহ। আসলে কিছুই করার নেই ওদের, তিক্ত মনে ভাবল টমাস হ্যালিগান, যা ঘটার কয়েক ঘণ্টা আগে ঘটে গেছে।

শেষ রাতের দিকে রওনা দিয়েছিল, বলল মার্ক ডুগান। মনে হয় ধরা পড়ার আগে বেশিদূর যেতে পেরেছে মেয়েটা।

হয়তো, নিজেই ট্র্যাকগুলো খুঁটিয়ে দেখল সার্জেন্ট। নাক বরাবর ধীর গতিতে এগিয়েছে মেয়েটা। চালাক মেয়ে। দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেনি। জানত যে ছোটাছুটি করলে মরুভূমিই খুন করে ফেলবে ওকে। আমার তো মনে হয় একটা সম্ভাবনা আছে ওর। মুখ তুলে সহযোদ্ধাদের দিকে তাকাল সে। বেশ, ক্যান্টিন ভরা হয়ে গেলে রওনা দেব আমরা।

সার্জ, প্রস্তাব করল ডাফি। আমাদের দুই বা তিনজন যদি ঘোড়ায় চড়ে পিছু নেয়, হয়তো সর্বনাশ হয়ে যাওয়ার আগেই মেয়েটাকে বাঁচাতে পারব।

উঁহু, আলাদা হওয়া চলবে না। একসঙ্গে থাকব আমরা।

মুখ আর ঘাড়ে ঘামের ধারা নামছে, টের পেল হালিগান। দুস্তর মরুভূমিতে কতদূর যেতে সক্ষম হবে কমবয়সী মেয়েটা, তাও রাতের বেলা? পায়ে হেঁটে দুর্ধর্ষ অ্যাপাচিদের ফাঁকি দেওয়া আদৌ সম্ভব? সমর্থ, অভিজ্ঞ পুরুষমানুষ হলে না হয় কথা ছিল। বুদ্ধি করে যদি কোথাও লুকিয়ে পড়ে, কিছুটা হলেও সম্ভাবনা থাকবে; মেয়েটাকে খুঁজে না পেলে হয়তো চলে যাবে অ্যাপাচিরা।

ক্লান্ত সৈনিকদের সার বেঁধে দাঁড়াতে দেখল সার্জেন্ট। মিনিট খানেকের মধ্যে রওনা দিল ওরা।

অস্তমান সূর্যকে সামনে রেখে পশ্চিমে এগোল ওরা। শিগ্‌গিরই অন্ধকার নামবে। ক্লান্তিতে পর্যদস্ত সবাই, কিন্তু তারপরও, মার্চ শুরু করার পর এই প্রথম কিছুটা হলেও উৎসাহ নিয়ে এগোচ্ছে। গোমড়ামুখো একগুঁয়ে জেফ কেলারও দ্রুত পা ফেলছে, যেন বুঝতে পেরেছে দুর্ভোগের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে ওরা।

সারারাত ধরে এগিয়ে চলল ছোট্ট দলটা। দু’বার ঘণ্টাখানেকের জন্য থেমে ঘুমানোর সুযোগ দিয়েছে সার্জেন্ট। ক্লান্তির চরমে পৌঁছে গেছে সবাই, পা আর চলছে না, কিন্তু নেতার দায়িত্ব ছাড়াও বাড়তি একটা দায় রয়েছে টমাস হ্যালিগানের-ইন্ডিয়ানদের হাত থেকে পালিয়ে যাওয়া মেয়েটার কথা ভুলতে পারছে না…একটু নাগাড়ে চললে হয়তো সময়মত পৌঁছতে সক্ষম হবে ওরা।

কিপ্রিয়ানো ওয়েল থেকে পানি পেয়েছে, কিন্তু এতটা দূরত্ব অতিক্রম করতে গিয়ে নিজেদের শক্তি আর সামর্থ্যও বিসর্জন দিতে হয়েছে। উত্তাপ এবং মরুভূমি কেড়ে নিচ্ছে ওদের শক্তি। সেইসঙ্গে রয়েছে লাগাতার হাঁটা বা মার্চ করার অবসাদ। যতটা সম্ভব এগিয়ে যেতে হবে। বলতে গেলে পুরো চব্বিশ ঘণ্টাই চলার মধ্যে রয়েছে-যে কোন বিচারে নির্মম নিষ্ঠুরতা বলা চলে, কিন্তু কেউই অভিযোগ করছে না। সবাইকে বাঁচানোর জন্য এই দুর্ভোগ-জানে ওরা-চেষ্টা করছে। সার্জেন্ট, যদিও সাফল্য অনিশ্চিত।

পুবাকাশ যখন ধূসর হয়ে এসেছে, তখন ওদের প্রতি প্রথম দয়া, হলো ভাগ্যদেবীর-দুর্ভাগ্যের শেকলটা ছিন্ন হলো ক্ষণিকের জন্য। বোল্ডারসারি পেরিয়ে খোলা জায়গায় পা রাখবে, এসময় একটু দূরে একটা পনির পিঠে দেখতে পেল এক ইন্ডিয়ানকে। ঘোড়ার পিঠে ঠায় বসে আছে সে, এতটুকু নড়ছে না, সামনের পাথুরে ঢালে কোন কিছুর উপর স্থির হয়ে আছে সমস্ত মনোযোগ। সার্জেন্টকে হাত তুলতে দেখে নিঃশব্দে থেমে গেল অন্যরা।

ত্রিশ গজ দূরে বোল্ডারের আড়ালে কিছু দেখছে ইন্ডিয়ান। মিনিট পূর্ণ হওয়ার আগেই আড়াল থেকে বেরিয়ে এল আরেক রেডস্কিন, সতর্কতার সঙ্গে এগোল লক্ষ্যের দিকে। জিনিসটা দেখতে পাচ্ছে না সৈন্যরা।

সার্জেন্টের ইশারা পেয়ে পাথুরে ঢালের দিকে এগোল ডাফি, ব্লট আর কেলার; এমন পথ বেছে নিয়েছে, যাতে ইন্ডিয়ানদের চোখের আড়ালে থাকতে পারবে। অন্য দু’জন এগিয়ে এসে হ্যালিগানের গা ঘেঁষে দাড়াল।

অপেক্ষায় থাকল সার্জেন্ট। ইন্ডিয়ানরা যদি ওদের আগেই মেয়েটাকে খুঁজে পায়, ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াবে পরিস্থিতি, কারণ সেক্ষেত্রে মেয়েটাকে উদ্ধার করতে ওরা যদি আক্রমণ করে, সঙ্গে সঙ্গে খুন হয়ে যাবে হতভাগী। আক্রমণ যদি করতেই হয়, সবার আগে দুই ইন্ডিয়ানকে খোলা জায়গায় পেতে হবে…

গুলি চালাও।

নির্দেশটা শেষ দিকে ঢাকা পড়ে গেল রাইফেলের সম্মিলিত গর্জনে। পনির পিঠে আসীন ইন্ডিয়ানের শরীর ঝুঁকি খেল বার দুয়েক, তারপর ভেঁতা শব্দে আছড়ে পড়ল বালিময় মাটিতে! ঢালের উপর, দুই পদক্ষেপ এগোল দ্বিতীয় ইন্ডিয়ান। বুলেটের ধাক্কায় পাথুরে মাটিতে ভূপতিত হলো সে, ঢাল ধরে গড়িয়ে নেমে এল শরীরটা, রক্তের ধারা ফেলে এল পিছনে।

একেবারে ডানে রয়েছে টেরিল ডাফি। আচমকা গুলি করল সে, পরপর দুবার।

কাছাকাছি আরও ইন্ডিয়ান থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে নিজেদের উপস্থিতি ঘোষণা করা বোকামি জেনেও চিৎকার করল সার্জেন্ট হ্যালিগান। এই যে, শুনতে পাচ্ছ?

জোড়ায় জোড়ায় এগোল ওরা। পাথরের আড়াল থেকে একটা গুলি ছুটে এল, কিন্তু কারও গায়ে লাগল না। ততক্ষণে ছুটে কাছে পৌঁছে গেছে ওরা। সবার আগে পৌঁছল জেফ কেলার, কোমরের কাছে ধরে রেখেছে রাইফেল। তবে তার আগেই গুলি করল টম হার্শ। বোল্ডারের ওপাশে ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল, ঝড়ের বেগে দূরে সরে যাচ্ছে। মিনিট কয়েকের মধ্যে নীরব হয়ে গেল জায়গাটা।

বোল্ডারের ফাঁক গলে উদ্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গেল সৈন্যরা। দূরে তিন রেডস্কিনকে ঘোড়ায় ছুটে যেতে দেখতে পেল, একজন বেকায়দা ভঙ্গিতে বসেছে স্যাডলে, আহত হয়েছে নির্ঘাত। ধারে-কাছে পড়ে আছে তিনটা লাশ। কিছুটা হলেও সন্তুষ্ট বোধ করল সার্জেন্ট। উচিত শিক্ষা দেওয়া গেছে বদমাশগুলোকে।

দুটো বোল্ডারের ফাঁকে ছোট্ট ফাটলে বসে ছিল মেয়েটা। নেহাত সঙ্কীর্ণ ফাটল, একটা বাচ্চার জন্যও বোধহয় যথেষ্ট নয়। সৈন্যদের দেখে উঠে দাঁড়াল, মেয়েটা, হেঁটে বেরিয়ে এল খোলা জায়গায়। প্রায় শীর্ণদেহ মেয়েটার, পরনে এলোমেলো ধূলিমলিন কাপড়।

আমার নাম মিমি রজার্স, বলল মেয়েটা। তোমাদের দেখে কী যে খুশি হয়েছি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *