০৪. র‍্যাঞ্চে পৌঁছতে দুই ঘণ্টা লাগল

র‍্যাঞ্চে পৌঁছতে দুই ঘণ্টা লাগল।

এঁকেবেঁকে, কখনও ঘুরে ঘুরে চলে গেছে পাহাড়ী পথ। পাহাড়ের ঢাল বনে ছাওয়া। সামনে, দূরে একসারি উঁচু পর্বত। ডজ জানালেন, ওটাই সিয়েরা মাদ্রে।

টেলিভিশনে দেখা পুরানো একটা সিনেমার কথা মনে পড়ল রবিনের। হেসে জিজ্ঞেস করল সে, ওই সিয়েরা মাদ্রে পর্বতেই হামফ্রে বোগার্ট আর তার সাথীরা গুপ্তধন খুঁজতে গিয়েছিল, তাই না?

রবিনের কথায় কেন যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন ডজ। মাথা নেড়ে বললেন, দ্য ট্রেজার অভ সিয়েরা মাদ্রে শুধুই একটা ছবি। সত্যি নয়। ওই পর্বতে গুপ্তধন নেই।

চট করে পেছনের সীটে বসা মুসার দিকে তাকাল রবিন।

এর খানিক পরেই র‍্যাঞ্চে পৌঁছল ওরা। কাঠের তৈরি লম্বা, নিচু একটা বাড়ি। চারপাশের খোলা প্রান্তর ঢালু হয়ে নেমে গেছে একটা লেকের ধারে। মাঠে কয়েকটা ঘোড়া চরছে, এছাড়া জীবনের আর কোন চিহ্নই নেই কোথাও।

লেকের দিকে তাকিয়ে রয়েছে মুসা। দুই-তিন মাইল লম্বা আর আধমাইল মত চওড়া হবে লেকটা, আন্দাজ করল সে। ভাবল, মাছ ধরার চমৎকার জায়গা। সাথে করে ছিপ নিয়ে আসায় ভালই হয়েছে। লেকের অন্যপাশে আর কোন বাড়ি-ঘর নেই। কেবল গাছের জটলা। তবে গাছপালার ওপাশে পুরানো একটা বাড়ির টাওয়ার চোখে পড়ছে। গির্জা হতে পারে, কিংবা দুর্গ। হয়তো মানুষ বাস করে ওখানে।

ডজের পিছু পিছু বারান্দায় উঠল ওরা। বড় একটা ঘরে ঢুকল। ফায়ারপ্লেস আছে। আরাম করে বসার জন্যে আছে অনেকগুলো চেয়ার।

খিদে পেয়েছে নিশ্চয়? জিজ্ঞেস করলেন ডজ।

একেবারে মনের কথাটা বলে ফেলেছেন, মুসা বলল।

হাত তালি দিল ডজ। সঙ্গে সঙ্গে এসে ঢুকল একজন মেকসিকান লোক।

ওর নাম পিরেটো, ডজ জানালেন। আমার বাবুর্চি। তিন গোয়েন্দার নাম ধরে ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোন প্রয়োজনই বোধ করলেন না যেন।

পিরেটোর বয়স পঞ্চাশের মত। গাট্টাগোট্টা শরীর। বাদামী মুখের চামড়ায় অসংখ্য ভাঁজ, লম্বা কালো চুল। গায়ে ডেনিম শার্ট, পরনে জিনস, পায়ে কাউবয় বুট। বাবুর্চি না হয়ে র‍্যাঞ্চ হ্যান্ড বা রাখাল হলেই যেন বেশি মানাত তাকে, ভাবল কিশোর।

দ্রুত স্প্যানিশ ভাষায় লোকটাকে নির্দেশ দিতে লাগলেন ডজ। নাস্তা আর এক্ষুণি শব্দ দুটো বুঝতে পারল কিশোর।

মাথা ঝাঁকাল পিরেটো। চোখের মণি বাদামী, তবে এতটাই গাঢ়, প্রায় কালোই মনে হয়। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করল রবিন, কথা বলার সময় ডজের দিকে সরাসরি তাকায় না। কেমন যেন একটা এড়িয়ে চলার প্রবণতা। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রক গায়কের মাঝে যেমন থাকে অনেকটা তেমনি।

ভাল বাবুর্চি পিরেটো। মুসা আর কিশোর শুয়োরের মাংস খায় না, জেনে গেছে। তাই গরুর মাংস ভাজা করে আনল। সেই সঙ্গে প্রচুর ডিম আর গরম গরম রোল।

লম্বা টেবিলটার মাথায় তিন গোয়েন্দার সঙ্গে বসলেন ডজ, তবে খেলেন না কিছু। কাঁটা চামচ দিয়ে একটা রোলকে খোঁচাতে থাকলেন নার্ভাস ভঙ্গিতে। তিন গোয়েন্দার খাওয়া শেষের অপেক্ষা করছেন, যেন কিছু বলার জন্যেই। কিছু একটা ভাবিয়ে তুলেছে মনে হয় তাকে।

পেট ভরল? মুসাকে শেষ টুকরোটা মুখে পুরতে দেখে বললেন তিনি।

বোঝাই হয়ে গেছে। দারুণ লাগল।

উঠে দাঁড়ালেন ডজ। এসো তোমাদেরকে র‍্যাঞ্চটা দেখাব।

বাইরে বেরিয়ে দ্রুত একটা বেড়ার কাছে নিয়ে এলেন ওদেরকে। অনেকখানি জায়গা ঘিরে বেড়া দেয়া হয়েছে। মাঠের এক ধারে ছোট একটা কাঠের ছাউনি।

এসো, আমার বারো দেখাব। ওদের মতামতের অপেক্ষা না করেই ছাউনিটার দিকে এগিয়ে গেলেন ডজ। ওটার কাছে পৌঁছার আগেই ছাউনি থেকে বেরিয়ে এল একটা গাধা, মেকসিকানরা বলে বারো। বেরিয়েই ওদেরকে দেখে থমকে গেল, তারপর যেন লজ্জা পেয়েই ওদের কাছ থেকে সরে গেল।

মেরুদন্ডের ওপর দিয়ে কালো একটা দাগ গিয়ে কাঁধের কাছটায় ছড়িয়ে পড়েছে জানোয়ারটার। চামড়াটাকে প্রায় সাদাই বলা চলে। বড় বড় কান, লম্বা লেজের মাথায় চুলের ঘন গোছা। সামনের একপায়ে দড়ি বাঁধা। সেটা ছুটিয়ে পালানোর চেষ্টা করল।

যে-কোন পোষা জানোয়ার মুসার পছন্দ। গাধাটাকে আদর করার জন্যে এগোতে গেল সে। থামিয়ে দিলেন ডজ। ছুঁয়ো না। বয়স একেবারেই কম, বড়জোর দুবছর। পোষ মানেনি এখনও।

কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে মাটিতে পা ঠুকছে গাধাটা। এলোপাতাড়ি কয়েকবার পেছনের পা ছুঁড়ে যেন বুঝিয়ে দিতে চাইল কাছে গেলে ভাল হবে না।

অনেক বুনো গাধা আছে এখানকার পাহাড়ে, ডজ জানালেন। মাস দুই আগে আমার মাঠে ঢুকে পড়েছিল ওটা। ধরে ফেললাম। ওর নাম রেখেছি শারি। মুসার দিকে তাকালেন তিনি। নাম ধরে ডেকে দেখ। বলো, এদিকে এসো, শারি। দেখ কি করে।

ব্যাপারটা কি? ওদেরকে শিশু মনে করছেন নাকি ডজ? এমন ভাবে কথা বলছেন! তবে যেহেতু জানোয়ারটাকে ভাল লেগেছে তার, ডজের কথামত ডাক দিয়ে বলল, এখানে এসো, শারি। এসো।

লম্বা কানদুটোকে পেছন দিকে শুইয়ে ফেলল শারি। প্রায় ঘাড় ছুঁয়েছে কানের ডগা। ঘোড়ার স্বভাব জানা আছে মুসার। তা থেকেই আন্দাজ করল, সতর্ক হয়ে উঠেছে গাধাটা কিংবা রেগে গেছে। আরেকবার ডাকল নাম ধরে। কাছে তো এলই না, আরেকটু সরে গেল ওটা, দড়ি লম্বা হলে আরও সরত।

তুমি ডাকো, রবিনকে বললেন ডজ।

কি হবে ডেকে? এসব ছেলেমানুষী ভাল লাগছে না রবিনের। বললে আরও সরে যেতে চাইবে।

তা ঠিক। হাসলেন ডজ। কিশোরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ডাকবে?

শারির আসা-যাওয়া নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই কিশোরের। এলেই বা কি, না এলেই কি? কিন্তু যে ভঙ্গিতে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ডজ, কৌতূহল হল তার।

বিরক্তি চেপে জোরে ডাক দিল কিশোর, এদিকে আয়, শারি।

অদ্ভুত কান্ড করল শারি। ঝটকা দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল এদিকে। সরাসরি কিশোরের দিকে। একবার কেঁপে উঠল কানের ডগা। সামনের দিকে বাড়িয়ে দিল।

খাইছে! কান্ডটা কি হলো?

আবার! ফিসফিসিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন ডজ। আবার ডাকো!

আগ্রহী হয়ে উঠেছে কিশোর। আবার ডাক দিল, এদিকে আয়, শারি!

দড়ি বাঁধা পা দিয়ে বাতাসে লাথি মারল শারি, দড়িটা খুলে ফেলার চেষ্টা করল। তারপর দৌড়ে এল কিশোরের দিকে। ফুটখানেক দূরে এসে দাঁড়িয়ে গেল। গলা লম্বা করে নাক দিয়ে আলতো গুতো দিল ওর বুকে।

তোমার প্রেমে পড়ে গেছে! মেয়ে, গাধা তো! হেসে কিশোরের কাঁধে চাপড় মারল রবিন। কেমন লাগছে, কিশোর? মাত্র তিনটে শব্দ ব্যবহার করলে। আর জলজ্যান্ত একটা গাধাকে পটিয়ে ফেললে।

পিছিয়ে গেল কিশোর। গাধাটার এই আচরণ অবাক করেছে ওকে। রবিনের কথায় লজ্জা পেয়েছে।

আদর করো ওকে! কিশোরের হাত চেপে ধরল ডজ, যাতে সরে যেতে না পারে। দেখ, কি করে?

প্রচন্ড কৌতূহল চাপতে পারল না কিশোর। আস্তে করে হাত বুলিয়ে দিল শারির মাথায়। ঝট করে কান সোজা করে ফেলল গাধাটা। আবার কিশোরের বুকে নাক ঘষল।

চওড়া হাসি ছড়িয়ে পড়েছে ডজের মুখে। যেন এইমাত্র বিরাট অঙ্কের একটা বাজি জিতে গেছেন, এমনি ভাবভঙ্গি। ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে কিশোরকে অবাক করে দিয়ে বললেন, নাহ, আর কোন সন্দেহ নেই আমার! আমি এখন শিওর, ও তোমাকে পিঠে চড়তে দেবে। যাও। ওঠো। বয়েস কম হলে কি হবে, যা শক্তি আছে তোমার মত একজন মানুষকে সহজেই বইতে পারবে। সাধে কি আর বলে ভারবাহী গাধা। এমন ভঙ্গিতে কথাগুলো বললেন তিনি, যেন মস্ত এক দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পেয়েছেন।

দ্বিধা করছে কিশোর। গাধার পিঠে চড়ার আগ্রহ নেই। কিন্তু ডজের অতি আগ্রহ অসংখ্য প্রশ্নের ভিড় জমিয়েছে ওর মনে। কিছু একটা ব্যাপার নিশ্চয় রয়েছে এসবের পেছনে। গোয়েন্দা হিসেবে এখন তার উচিত সমস্ত সূত্র খতিয়ে দেখা।

ডান পা তুলে দিয়ে লাফিয়ে গাধার পিঠে চড়ে বসল সে। ঘাড় বাঁকা করে বড় বড় কোমল চোখ মেলে ওকে দেখার চেষ্টা করল শারি। টান টান হয়ে গেছে কান, খাড়া হয়ে আছে মাথার ওপর। সওয়ারি হিসেবে কিশোরকে নিতে মনে হয় আপত্তি নেই তার।

হ্যাঁ, এবার চলতে বলো। ফিসফিস করে শিখিয়ে দিলেন ডজ। গলায় উত্তেজনা।

হঠাৎই কথাটা মনে পড়ে গেল কিশোরের। প্রকাশ করল না সেটা। চলতে বলল গাধাটাকে।

টলমল পায়ে আগে বাড়ল ওটা। জিন, লাগাম কিছুই নেই। শারির গলা জড়িয়ে ধরে রাখতে হলো কিশোরকে, যাতে পড়ে না যায়। একটা সূত্র ধরিয়ে দিয়েছেন তাকে ডজ। মেকসিকোতে তো বটেই, আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলেও কাউবয়রা ঘোড়া চালানোর সময় কিছু বিকৃত শব্দ ব্যবহার করে, যেমন, চলতে বললে বলে গিডিআপ, আর থামতে বললে হুয়া। সেটাই পরখ করে দেখার ইচ্ছে হলো তার। কয়েক কদম এগোতেই বলল সে, হয়া, শারি, হয়া!

সঙ্গে সঙ্গে আদেশ পালন করল গাধাটা। থেমে গেল।

বাহ! এগিয়ে এলেন ডজ। কিশোরকে গাধার পিঠ থেকে নামতে সাহায্য করলেন। চমৎকার শিখে ফেলেছ তো তুমি। গাধাটাকেও পোষ মানিয়ে ফেলেছ।

হ্যাঁ, মুসা বলল। মানুষ, জানোয়ার সব কিছুকেই পোষ মানাতে ওস্তাদ কিশোর পাশা। ও যে কোন কাজটা পারে না, সেটাই বুঝি না মাঝে মাঝে।

মজার কান্ড করল, ডজের দিকে তাকিয়ে বলল কিশোর। ভুল করে হয়তো আমাকে অন্য কেউ ভেবেছে শারি, যার কথা সে শোনে।

তা কি করে হয়? মাথা নাড়লেন ডজ। এখানে যখন এসে ঢুকল, পুরোপুরি বুনো ছিল শারি। সারা জীবনে কেবল দুজন লোককে দেখেছে। আমাকে, আর পিরেটোকে।

কিন্তু আপনাদের দুজনের কারও মতই দেখতে নই আমি। নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল গোয়েন্দাপ্রধান। জটিল কোন ভাবনা মাথায় ঢুকলেই মাঝে মাঝে এই কাজটি করে সে। তার ধারণা এতে তার ভাবনার একাগ্রতা আসে।

আধঘণ্টা পরে যখন বিশাল ঘরটায় এসে বসল, তখনও চিমটি কাটা বন্ধ হলো না তার। রবিন আর মুসাও বসেছে ওর সঙ্গে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল সে, মাঠের ধারের ছাউনিটার দিকে। বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে আছে সাদা গাধাটা। এদিকেই তাকিয়ে  রয়েছে জানোয়ারটাও। আস্তে করে ডাক দিচ্ছে, যেন চাইছে কিশোর গিয়ে আবার তাকে আদর করুক।

শারি! ছিপটা জোড়া লাগাতে লাগাতে আচমকা চিৎকার করে উঠল মুসা। ঠিক, মনে পড়েছে। শারি হলো গিয়ে ড্যাগউডের স্ত্রীর নাম! যে ধাঁধাটার সমাধান করেছিলে সেদিন, তাতে একটা জবাব ছিল, শারি।

তা ছিল, সায় দিয়ে বলল কিশোর। তবে শুধু শারিই নয়। আরও কিছু জবাব ছিল ওটাতে। আরও সূত্র।

আর কি সূত্র? ব্যাগ খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করল রবিন। কাপড় বের করে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে লাগল ওয়ারড্রোবের ড্রয়ারে। ওই গাধাটা কেন তোমার প্রেমে পড়ল, সেই সূত্র?

রসিকতাটা এড়িয়ে গিয়ে কিশোর বলল, গাধাটাকে বলার জন্যে আমাদেরকে যেসব শব্দ বলেছে, ক্রসওয়ার্ড পাজলের উত্তরগুলোই হলো সেসব শব্দ।

তাই? মুসার প্রশ্ন। আর কোনটা?

দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ মুদল কিশোর। ধীরে ধীরে বলতে লাগল, কাম। হিয়ার। গিডি আপ। উওউ। দুর্ভাগ্য কিংবা দুঃখ বোঝাতে ব্যবহার হয় এই উওউ শব্দটা। আর, হুয়া শারি, মানে হলো, থাম। শারি! এবং প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গাধাটা।

নিজের বাংকে গিয়ে বসে পড়ল রবিন। চিন্তিত ভঙ্গিতে ভ্রূকুটি করল একবার। বলল, কিশোর, তুমি কিছু একটা ভাবছ।

নীরবে রবিনের দিকে তাকিয়ে রইল কিশোর। জবাব দিল না।

আবার বলল রবিন, মুসাও তো ওই শব্দগুলোই ব্যবহার করেছিল। শারি তো ওর কথা শোনেনি?

জানি, রবিনের মতই অবাক হয়েছে কিশোরও। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না। তবু বলতে হচ্ছে, ওই গাধাটার সঙ্গে কোথাও দেখা হয়েছে আমার। সে জন্যেই আমাকে চিনতে পারছে। অন্তত আমার গলা যে চিনেছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *