০৪. রাতের খাওয়া খেতে বসছে রবিন

রাতের খাওয়া খেতে বসছে রবিন। বার বার তাকাচ্ছে টেলিফোনের দিকে। এই খানিক আগে ফিরেছে লাইব্রেরি থেকে, পার্ট-টাইম চাকরি করে ওখানে।

ইস্ এখনও ফোন করছে না কেন কিশোর?

খাওয়া শেষ হয়ে এসেছে রবিনের, তা-ও ফোন বাজছে না। উঠে গিয়ে সিংকে। প্লেট চোবাল, ধুয়ে পরিষ্কার করে এনে রাখল আবার জায়গামত।

কাছেই কাজ করছেন মিসেস মিলফোর্ড।

মা, বলল রবিন, কিশোর কোন খবরটবর দিয়েছে?

ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, মুখ ফেরালেন তিনি। ভুলেই গিয়েছিলাম। একটা মেসেজ আছে।

কি মেসেজ? উত্তেজিত হয়ে উঠল রবিন। কি লিখেছে?

আগের দিন যা যা ঘটেছে, তাকে জানিয়েছে কিশোর। সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্টের ফাইল তৈরি করে ফেলেছে রবিন, এটা তার দায়িত্ব। আজ বিকেলে হেডকোয়ার্টারে কাকাতুয়ার রহস্য নিয়েই আলোচনা করার কথা।

এই যে, লিখে রেখেছি, মা বললেন, পকেট হাতড়ে বের করলেন এক টুকরো কাগজ। কি যে সব বলে কিশোর, মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝি না। ভুলে যেতাম, তাই লিখে রেখেছি। এই যে।

ও ওরকম করেই বলে, মাকে বোঝাল রবিন, হাত বাড়াল কাগজটার জন্যে।

বেশি পড়াশোনা করে তো, বড় বড় কঠিন শব্দ আপনাআপনি মুখে চলে আসে। চাচা-চাচীর সঙ্গেও ওভাবেই কথা বলে। বেশিদিন তোমার সঙ্গে ওভাবে বললে

তুমিও বুঝে যাবে, আর উদ্ভট লাগবে না।

কি বলছে, কিছুই বুঝিনি। জোরে জোরে পড়লেন মিসেস মিলফোর্ড, লাল কুকুর চার। উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। তীর বরাবর বুকে হাঁটবে। সহজ সহজ বাক্য, অথচ মানে করতে গেলে মনে হয় গ্রীক। কি বুঝিয়েছে রে?

জবাব নেই। রবিন ততক্ষণে পৌঁছে গেছে দরজার কাছে। ডাকলেন মা। এই রবিন, না বলেই চলে যাচ্ছিস যে?

দরজায় দাঁড়িয়ে ঘুরল রবিন, হতাশ ভঙ্গিতে কপাল চাপড়াল, ওফ্‌ফো, মা, এই সহজ কথাগুলো বুঝতে পারছ না। ইংরেজিই তো লিখেছে।

কোথায় ইংরেজি। কোন ধরনের কোড। এই, বল না। হ্যাঁ, কোডই। বাইরের লোক যাতে বুঝতে না পারে… কি বলছিস তুই, রবিন? মা অবাক। আমি তোর মা, বাইরের লোক?

তোমাকে বাইরের লোক বললাম নাকি? খালি উল্টোপাল্টা বোঝে। ঠিক আছে, কোন্ কথাটা জানতে চাও?

এই যে, উড়ে এসে জুড়ে বসেছে?

কয়েকটা হারানো কাকাতুয়াকে খুঁজছি আমরা, ওটারই কোড : উড়ে এসে জুড়ে বসেছে।

হুঁ, মায়ের আশঙ্কা দূর হলো, ভয়ের কিছু নেই, বিপদ হবে না ছেলের।

যাওয়ার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছে রবিন, মা আবার প্রশ্ন করার আগেই বলল, আর লাল কুকুর চার মানে…

থাক থাক, ওগুলোর মানে আর জানার দরকার নেই, হাত তুললেন মিসেস মিলফোর্ড। যা, বেশী রাত করিস না। গির্জার ফাদারকে দাওয়াত করতে যেতে হবে। আগামী রোববারে আমাদের এখানেই খাবেন।

লাল কুকুর চার হলো তিন গোয়েন্দার হেডকোয়ার্টারে ঢোকার অনেকগুলো পথের একটা। ওটা দিয়ে ঢোকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে মেসেজে।

স্যালভিজ ইয়ার্ডের বেড়ায় নানা রকম ছবি। এক জায়গায় একটা লাল কুকুর বসে আছে, একটা বাড়িতে আগুন লেগেছে, তা-ই দেখছে। কুকুরটার একটা চোখ আসলে কাঠের গিঁট। আলগা। নখ দিয়ে খুঁচিয়ে ওটা বের করে নিল রবিন, ভেতরে আঙুল ঢুকিয়ে গোপন সুইচ টিপল। আস্তে করে তিন দিকে সরে গেল বেড়ার তিনটে অংশ, গোপন দরজার পাল্লা। ভেতরে ঢুকে আবার সুইচ টিপে দরজা বন্ধ করে দিল সে।

এক জায়গায় অনেকগুলো তক্তা আর লোহার বীম আড়াআড়ি পড়ে আছে মনে হয়, ওভাবেই ওগুলো সাজিয়েছে তিন কিশোর। নিচে দিয়ে পথ। বুকে হেঁটে যেতে হয়। ওপরে একটা তীর চিহ্ন। ট্রেলারটা কোনদিকে আছে, তার নির্দেশ।

বুকে হেঁটে এগিয়ে ট্রেলারের নিচে পৌঁছে গেল রবিন। দুইবার টোকা দিতেই ভেতর থেকে তুলে নেয়া হলো একটা পান্না। হেডকোয়ার্টারে ঢুকল সে।

হেডকোয়ার্টার মানে তিরিশ ফুট লম্বা একটা বাতিল মোবাইল হোম, জঞ্জালের তলায় চাপা পড়ে আছে। সেটাকে সারিয়ে নিয়ে অফিস সাজিয়েছে তিন গোয়েন্দা। নানারকম সুযোগ-সুবিধে আছে তার মধ্যে। ছোট একটা ল্যাবরেটরিও আছে, আছে ফটো প্রসেস করার ডার্করুম।

ডেস্কের ওপাশে নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে আনমনে একটা পেন্সিল কামড়াচ্ছে কিশোর। রবিনকে দেখে বলল, এত দেরি যে?

মেসেজ দিতে মা ভুলে গিয়েছিল। তবে আগে দিলেও আসতে পারতাম না, খেয়ে আসতে দিত না। কেন ডেকেছ? জরুরী মীটিং?

হ্যাঁ, মাথা ঝাকাল কিশোর। বিলি শেকসপীয়ার আর লিটল বো-পীপকে খুঁজে বের করা দরকার।

কিভাবে, তাই তো মাথায় ঢুকছে না, মুসা বলল। মোটকা হাইমাসকে চিনি, সন্দেহ করছি ওই ব্যাটাই চুরি করেছে। ব্যস! আর কোন সূত্র নেই। পুলিশ চেষ্টা করলে হয়তো গাড়িটা খুঁজে বের করতে পারে, কিন্তু তারা তো শুনলে হাসে। এক কাজ করলে কেমন হয়? গিয়ে পুলিশ চীফ ইয়ান ফ্লেচারকে ধরলে?

ভুলে যাও কেন? ভুরু নাচাল কিশোর। মিস্টার ফোর্ড আর মিসেস বোরো কেউই পুলিশের সাহায্য নিতে রাজি নন।

তাহলে? দু-হাত নাড়ল মুসা। আমি তো কোন উপায়ই দেখছি না।

উপায় একটা আছে।

আছে? এক সঙ্গে গলা সামনে বাড়াল রবিন আর মুসা।

আছে। ভূত-থেকে-ভূতে।

আরে, তাই তো, হাসল রবিন। এই কথাটা মনে পড়েনি!

আমিও একটা আস্ত গাধা, হতাশা চলে গেছে মুসার কণ্ঠ থেকে, উত্তেজনা ফুটেছে চেহারায়। তা এখুনি শুরু করে দিই না। আগামী কাল সকালেই খোঁজ পেয়ে যাব।

তা করতে পারো, রাজি হলো কিশোর।

আচ্ছা, একটা পুরস্কার ঘোষণা করলে কেমন হয়? প্রস্তাব রাখল রবিন।

তাহলে উৎসাহী হবে বাচ্চারা। তাড়াতাড়ি কাজ হবে।

ঠিকই বলছে। কি পুরস্কার দেয়া যায়?

আমি বলছি, হাত তুলল মুসা। বলব, যে আগে খোঁজ দিতে পারবে, তাকে রোলস-রয়েসে চড়িয়ে এক ঘণ্টা ঘোরাব।

মন্দ না, বলল কিশোর। দেখেছি তো, ছেলেমেয়েরা যেভাবে চকচকে চোখে তাকায় গাড়িটার দিকে। তা নাহয় ঘোরালাম। সেই সাথে কিছু নগদের কথাও বলি? এই বিশ-পঁচিশ ডলার? আরও বেশি আগ্রহী হবে।

তা-ই ঠিক হলো। গাড়িতে এক ঘণ্টা চড়ানো, আর পঁচিশ ডলার পুরস্কার।

চালু করে দেয়া হলো ভূত-থেকে-ভূতে।

রাত করতে মানা করে দিয়েছেন মা। উঠল রবিন।

বাড়ি ফিরে দেখল গুম হয়ে বসে আছেন মা, হাতে রিসিভার।

কি হয়েছে, মা? কোন গোলমাল?।

সেই তখন থেকে কতবার চেষ্টা করছি, মিসেস ফেনারকে আসতে বলব। একা কুলিয়ে উঠতে পারব না, অনেক মেহমান আসবেন, আমাকে একটু সাহায্য করবে সে। লাইনই পাচ্ছি না। সব কটা লাইন এনগেজড! কি যে হলো আজ। একটাও খালি নেই।

ঢোক গিলল রবিন। জানে, কেন খালি নেই লাইন। কিন্তু সে-কথা মাকে বলা যাবে না।

আবার ডায়াল ঘোরাতে শুরু করলেন মিসেস মিলফোর্ড। মা এভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, খারাপই লাগল রবিনের। কিন্তু কিছুই করার নেই তার এখন। সে নিজে চেষ্টা করলেও লাইন পাবে না।

দোতলায় নিজের ঘ-১ উঠে এল রবিন। কাপড় ছাড়তে ছাড়তে একটা মোটামুটি হিসাব করল : কালো গাড়িটার খোঁজ চেয়ে তারা তিনজনে পাঁচজন করে বন্ধুকে ফোন করেছে। ওরা করবে আরও পাচজনকে, হয়ে গেল পঁচাত্তর। তারা করবে আরও পাঁচজনকে। হয়ে গেল তিনশো পঁচাত্তর। তারা আরও পাঁচ…হলো আঠারোশো পঁচাত্তর…তারা আবার পাঁচ…নয় হাজার তিনশো পঁচাত্তর… আরিব্বাপরে! লস অ্যাঞ্জেলেস আর হলিউডের কোন ছেলেমেয়ের জানতে আর বাকি থাকে না। লুকাবে কোথায় হাইমাস? নাহ্ কিশোরটা একটা জিনিয়াস, বন্ধুগর্বে আধহাত উঁচু হলো রবিনের বুক।

শুয়ে পড়ল রবিন। বালিশে হাত, তার ওপর মাথা রেখে ভাবতে শুরু করল সে। বিলি শেকসপীয়ার, লিটল বো-পীপ আর তাদের বিচিত্র বুলির কথা। গতকাল থেকেই কিছু আছে, কিন্তু ধরতে পারছে না। এখন আরেকবার চেষ্টা করল। টু-টু-টু বি অর নট…আচ্ছা, কাকাতুয়া তোতলাবে কি করে? সে জানে, এর কোন বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই। ইচ্ছে করেই ভুল শেখায়নি তো? কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারল না রবিন, গোলমালটা ধরতে পারছে না। সেটা অন্য কোথাও।

ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল সে। মাঝরাতে ঘুমের ঘোরেই যেন কানের কাছে বলল কেউ ও লিটল বো-পীপ হ্যাজ লস্ট হার শীপ অ্যাণ্ড ডাজ নট নো হোয়্যার টু ফাইণ্ড ইট। কল অন শার্লক হোমস।

ঘুম ভেঙে গেল রবিনের। অখণ্ড নীরবতা। ভুলটা আবিষ্কার করে ফেলেছে মগজ। তার মনে পড়ল মাদার গুজ-এ লেখা লাইনটা হলো : লিটল বো-পীপ হ্যাজ লস্ট হার শীপ অ্যাণ্ড ডাজনট নো হোয়্যার টু ফাইণ্ড দেম।

দেম-এর জায়গায় ইট বলে কাকাতুয়াটা।

ব্যাপারটা হয়তো বিশেষ কিছুই নয়। কিন্তু কিশোরের কাছে শিখেছে রবিন, গোয়েন্দাগিরিতে অতি সামান্য ব্যাপারও অবহেলা করতে নেই।

 

হুম, চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর, ঠিকই বলেছ, রবিন। এক বচন বহুবচন দুটোর বেলাতেই হয় শীপ, তাই ইট বললেও শুদ্ধ, দেমও শুদ্ধ। কিন্তু…

খাইছে! হাত তুলল মুসা। এই, তোমাদের ব্যাকরণ ক্লাস থামাও। গুঙিয়ে উঠল, স্কুলে শুনতে শুনতেই অবস্থা কাহিল…

হেডকোয়ার্টারে আলোচনায় বসেছে তিন গোয়েন্দা। দশটা বাজতে কয়েক মিনিট বাকি। ভুত-থেকে-ভূতের মাধ্যমে খবর আসার সময় হয়েছে।

কিন্তু ভুল করেছে, মুসার কথায় কান দিল না রবিন। যিনি শিখিয়েছেন, ভুল তাঁরই।

কটা ভুল? বলল কিশোর। বিলি শেকসপীয়ার তোতলায়, সেটা একটা ভুল। মাদার গুজ থেকে শেখানো হয়েছে লিটল বো-পীপকে, সেখানে আরেকটা ভুল।

তাতে কি? মুসার প্রশ্ন। মাত্র তো দুটো। এক গ্রামার ক্লাসেই কয়েক ডজন ভুল করি আমি। আর কবিতা মুখস্থ লিখতে দিলে তো….।

সেটা তোমার হয়, বলল কিশোর। কিন্তু উচ্চ শিক্ষিত একজন ইংরেজ ভদ্রলোক এই সাধারণ ভুল করবেন না। একটা হলে ধরে নিতাম, নাহয় হয়ে গেছে কোনভাবে। কিন্তু দুটো? উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হয়।

উদ্দেশ্যপ্র… শূন্য দৃষ্টি ফুটল মুসার চোখে। তাকে দোষ দিতে পারল না রবিন। কিশোর পাশার ভাবনার সঙ্গে সব সময় তাল মিলিয়ে চলা কঠিন। অনেক সময় খুব বেশি শর্টকাটে এগিয়ে যায় তার মস্তিষ্ক।

ইচ্ছে করে ভুল শিখিয়েছেন বলতে চাইছ? জিজ্ঞেস করল রবিন।

হ্যাঁ। দুটো রহস্য আমাদের হাতে। এক : হাইমাস কেন কাকাতুয়া চুরি করছে? দুই? কেন ওগুলোকে ভুল বুলি শেখানো হয়েছে?

মাথায় ঢুকছে না, মাথা নাড়ল রবিন। এত কঠিন বুলি কেন শেখানো হয়েছে, সেটাও তো আরেক রহস্য। এসব কথা সাধারণত লোকে শেখায় না।

গভীর হচ্ছে রহস্য, বাস্তবে নেই যেন কিশোর, কণ্ঠে খুশির আমেজ। জটিল সমস্যা পেয়ে গেছে সে, জট ছাড়াবে ধীরে ধীরে, তাতেই তার আনন্দ। যে-ই শিখিয়েছে, অনেক ধৈর্যের সঙ্গে কষ্ট করে শেখাতে হয়েছে। নিশ্চয় অহেতুক কষ্ট করেনি। আর হাইমাসও বিনা কারণে কাকাতুয়া দুটোকে চুরি করেনি। নিশ্চয় কোন কারণ আছে।

কিশোর! উত্তেজিত মনে হলো রবিনকে। আরও পাখি তো থাকতে পারে? সেই কালো কাকাতুয়াটা? ব্ল্যাকবিয়ার্ড…

আরি সব্বোনাশ! আঁতকে উঠল মুসা। দুটোতেই মাথা ঘুরছে। আরও আমদানী করছ?

হাসতে গিয়েও থেমে গেল অন্য দুজন। ফোন বেজে উঠেছে। ছোঁ মেরে তুলে নিল কিশোর। হ্যালো হ্যাঁ।…তাই নাকি?…শেষ নম্বর দুটো ওয়ান থ্রী? …ও না না, তাহলে না, সরি। থ্যাংকু। হতাশ হয়ে রেখে দিল রিসিভার।

হলিউডের একটা ছেলে, জানাল সে। গাড়ির নম্বর মিলছে না।

আবার বাজল টেলিফোন। রিসিভার কানে ঠেকিয়ে স্পীকারের সুইচ টিপতে আর ভুল করল না কিশোর। সবাই শুনতে পেল ওপাশের কথা। সান্তা মনিকার একটা ছেলে কালো একটা রেঞ্জার দেখেছে, তবে কয়েক বছরের পুরানো গাড়ি। গাড়িতে ছিল দুই তরুণ দম্পতি। না, এবারেও হলো না।

আরও আটজন ফোন করল। কিন্তু সবগুলো বেঠিক।

নাহ্ কাজ হলো না, হতাশ হয়ে ভাবল কিশোর। ভূত-থেকে-ভূতে সাহায্য করল না এবার তিন গোয়েন্দাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *