০৪. রবিনের ফোক্সওয়াগনে করে হাসপাতালে ছুটল

রবিনের ফোক্সওয়াগনে করে হাসপাতালে ছুটল তিন গোয়েন্দা। ভটভট ভটভট করে কোনমতে চলল গাড়ি। যতটা স্পীড দেয়া সম্ভব দেয়ার চেষ্টা করল রবিন। পথে তিনবার বন্ধ হলো ইঞ্জিন। নেমে নেমে ঠিক করতে হলো মুসাকে।

হাসপাতালের সামনে গাড়ি থামতেই লাফিয়ে নেমে পড়ল কিশোর। দিল দৌড়। তার পেছনে ছুটল অন্য দুজন। অ্যাক্সিডেন্টের রাতে কি ঘটেছিল, আজ জানতে পারবে জুনের মুখ থেকে।

অ্যাই, যাচ্ছ কোথায়! থাম!

তীক্ষ্ণ চিৎকার শুনে ফিরে তাকাল তিন গোয়েন্দা। সেই লাল চুল নার্স, মারগারেট ইলারসন।

সরি, যেতে পারবে না, আজ আর কর্কশ ব্যবহার করল না। হাসলও মৃদু। মেয়ের সঙ্গে রয়েছেন মিস্টার লারসেন। ডাক্তার পরীক্ষা করছেন জুনকে। তোমাদের অপেক্ষা করতে হবে, রবিনের দিকে তাকাল। খারাপ না লাগলে আমার এখানেই এসে বসতে পারো।

হলের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। পাঁচ মিনিট কাটতেই যেন পাঁচটা বছর লাগল। তারপর দশ মিনিট। এই অপেক্ষা যেন পাগল করে দেবে তাকে।

আর বসে থাকতে পারল না। এককোণে নিচু একটা টেবিলে কিছু পত্রপত্রিকা পড়ে আছে। এগিয়ে গেল সেগুলোর দিকে।

এত তাড়া কিসের তোমাদের? নার্স জিজ্ঞেস করল।

আছে। অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপারে জানতে চাই, ঘুরে দাঁড়িয়ে জবাব দিল কিশোর।

কিছুই বলতে পারবে না ও। মনে করতে পারবে না। অ্যামনেশিয়ায় ভূগছে।

অ্যামনেশিয়া! ওই একটি শব্দই যেন হাজার টনী পাথরের মত আঘাত করল কিশোরকে। এত আশা, এত প্রতীক্ষা, সব যেন নিমেষে অর্থহীন হয়ে গেল।

অবশেষে জুনের ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন লারসেন। বাইরে এলেন না, দরজায়ই দাঁড়ালেন। পরনে গাঢ় লাল জগিং স্যুট, হলুদ স্ট্রাইপ দেয়া। বুকের কাছে আঁকা কমলা রঙের মুরগী।

যাই, হ্যাঁ, মেয়েকেই বললেন বোঝা গেল। কাল আবার আসব। বাড়ি নিয়ে যাব তোকে। কিছু ভাবিসনে। সব ঠিক হয়ে যাবে।

হেসে দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন লারসেন। হাসিটা মুছে গেল পরক্ষণেই। আনমনে বিড়বিড় করে কি বললেন। মেয়েকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যেই বোধহয় হাসি হাসি করে রেখেছিলেন মুখ। তিন গোয়েন্দার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটিবারের জন্যেও ফিরে তাকালেন না।

কি বলছেন শুনতে পারলে হত, নিচু গলায় বলল মুসা।

কি যে করি জাতীয় কিছু বললেন বলে মনে হলো, আন্দাজ করল রবিন।

চলো, জুনের ঘরের দরজার দিকে রওনা হলো কিশোর।

বিছানায় উঠে বসেছে জুন। বয়েস উনিশ-বিশ হবে। পিঠে বালিশ ঠেস দেয়া। এলোমেলো চুল। অনেক সময় একটানা ঘুমানোয় ফুলে আছে মুখ। তবে বড় বড় নীল চোখজোড়া স্বচ্ছ এবং পরিষ্কার।

এসেছ, মুসার দিকে তাকিয়ে যেন ওই একটি শব্দেই হুঁশিয়ার করে দিতে চাইল ফারিহা। রবিন আর কিশোরও বুঝল ওর ইঙ্গিত। জুনের দিকে ফিরল সে, জুন, এই হলো আমাদের তিন গোয়েন্দা। ও কিশোর পাশা, ও মুসা আমান, আর ও হলো রবিন মিলফোর্ড।

হাই, খসখসে নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল জুন। তোমাদের কথা অনেক শুনেছি।

হেসে জিজ্ঞেস করল রবিন, এখন কেমন লাগছে?

আর কেমন। মনে হচ্ছে দালানের তলায় চাপা পড়েছিলাম। একটা হাড়ও আস্ত নেই। সারা গায়ে ব্যথা। বাবা যে কাল কি করে বাড়ি নিয়ে যাবে কে জানে।

ও কিছু না। ঠিকই যেতে পারবে। কাল সেরে যাবে, দেখ।

এসব কথা ভাল লাগছে না কিশোরের। আসল কথায় যেতে চায়। কিছুটা অধৈর্য ভঙ্গিতেই ফারিহার বিছানার পাশের চেয়ারটা টেনে নিয়ে এসে বসল জুনের বিছানার পাশে। তোমার অ্যাক্সিডেন্টটার কথা জানতে এসেছিলাম।

ফারিহা বলেছে, তোমরা আসবে। তবে আগেই একটা কথা জানিয়ে রাখি, আমার অ্যামনেশিয়া হয়েছে।

কিছুই মনে করতে পারছ না?

শেষ কথা মনে করতে পারছি, দুদিন আগে সকালে আমার বেড়ালটাকে, খাইয়ে বাবার অফিসে গিয়েছিলাম। আর কিছু মনে নেই। তবে ডাক্তার ভরসা দিয়েছে এই স্মৃতিবিভ্রম সাময়িক। শীঘ্রি আবার সব মনে করতে পারব। যে কোন মুহূর্তে ফিরে আসতে পারে স্মৃতি।

আমরা তোমাকে সাহায্য করতে পারি, রবিন বলল। অনেক সময় কথা মনে করিয়ে দিলে মনে পড়ে যায় এসব অবস্থায়।

তাহলে অ্যাক্সিডেন্টের কথা কিছুই মনে করতে পারছ না? কিশোর তাকিয়ে রয়েছে জুনের মুখের দিকে। তোমার বাবার অফিসে কি জন্যে গিয়েছিলে?

কলেজ থেকে সবে ব্যবসার ওপর ডিগ্রী নিয়েছি, জুন জানাল। তাই বাবার ব্যবসাটায় ঢোকার চেষ্টা করছি। এক ডিপার্টমেন্ট থেকে আরেক ডিপার্টমেন্টে ঘুরে বোঝার চেষ্টা করছি। যতই বই পড়ে শিখে আসি না কেন, হাতে কলমে কাজ করাটা অন্য জিনিস।

গত শুক্রবারে শেষ কোন ডিপার্টমেন্টে ঢুকেছিলে, কিশোর জিজ্ঞেস করল, মনে করতে পারো?

না।

ঘুমের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখে কিছু কথা বলেছ। মনে করতে পারো?

মাথা নাড়ল জুন।

রবিন আর মুসার দিকে তাকিয়ে কিশোর বলল, চলো, বাইরে গিয়েই কথা বলি।

হলে বেরিয়ে এল তিনজনে। ভোতা গলায় কিশোর বলল, কোন লাভ হলো না।

ফারিহা আশা দিয়েছে, মুসা বলল। হবে।

হবে না। বসে বসে টেলিভিশন দেখা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না ওর।

আমার তো এখন মনে হচ্ছে, কোন রহস্যই নেই, নিরাশ কণ্ঠে বলল কিশোর। ফারিহার কথাই আর বিশ্বাস করতে পারছি না।

ও এমনিতেও বাড়িয়ে কথা বলে, ফস করে বলে বসল রবিন।

রেগে গেল মুসা। ওর মাথায় আমার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধি। কথা খুব ভাল মনে রাখতে পারে। কয়েক মাস আগেও কোন মেয়ে কোন পোশাকটা পরেছিল, কোন লিপস্টিক লাগিয়েছিল, ঠিক বলে দিতে পারে।

খুব ভাল, আরেক দিকে তাকিয়ে বলল কিশোর। যদি কোনদিন তিন গোয়েন্দা বাদ দিয়ে তিন ফ্যাশন ডিজাইনার হয়ে যাই, তাহলে ওকে আমাদের সহকারী করে নেব।

ভুরু কুঁচকে কিশোরের দিকে তাকিয়ে রইল মুসা।

রাগ কোরো না, ওকে বোঝানোর চেষ্টা করল কিশোর। জুন একটা বড় অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। মাথায় গোলমাল হওয়াটা স্বাভাবিক। ঘুমের ঘোরে প্রলাপ বকাটা আরও বেশি স্বাভাবিক। এখন তো ধরেছে অ্যামনেশিয়ায়। ওর প্রলাপ বিশ্বাস করে রহস্য খুঁজতে যাওয়াটা কি ঠিক?

কেন, তোমার অনুভূতি কি এখন অন্য কথা বলছে…

অ্যাই, রাখ রাখ, হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে গেছে রবিন। একটা কথা…

অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল কিশোর। কী?

একটা কথা খেয়াল করোনি? অ্যাক্সিডেন্টের দিনের কথা শুধু মনে করতে পারছে না জুন। কেন পারছে না? কেন একটা দিন স্মৃতি থেকে মুছে গেল?

তাই তো! ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে লাগল কিশোর। তবে মনোযোগ দিতে পারল না। চেঁচিয়ে কথা বলছে নার্স মারগারেট, আমার কাজ আপনি করবেন? হাসালেন। এক ঘণ্টায়ই কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে আরম্ভ করবে। কানে রিসিভার ঠেকিয়ে মাথা কাত করে কাঁধ উঁচু করে রিসিভারটা ধরে রেখেছে সে। দুই হাত মুক্ত রেখেছে কাজ করার জন্যে। কিছু ফর্মে স্ট্যাম্প দিয়ে সীল মারছে। আপনি আমাকে বিরক্ত করে ফেলেছেন, বুঝলেন। আধ ঘণ্টা পর পরই জিজ্ঞেস করছেন জুন কেমন আছে। আরও তিরিশজন রোগী আছে এখন আমার হাতে। সবার আত্মীয়রাই যদি এভাবে ফোন করত, এতক্ষণে পাগলা গারদে পাঠাতে হত আমাকে। কেমন আছে জানতে চাইছেন তো? বলতে পারব না। হাসপাতালে এসে দেখে যান।

রেগে গেছে মারগারেট। চেহারা দেখেই অনুমান করা যায়। ওপাশের কথা শুনতে শুনতে আরও রেগে গেল, ডাক্তারকেই জিজ্ঞেস করুন। ধরুন। খটাস করে রিসিভারটা টেবিলে নামিয়ে রেখে ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। গটমট করে হেঁটে রওনা হলো।

জুন কেমন আছে, এবার জিজ্ঞেস করছে কেন? দুই সহকারীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল কিশোর।

কারণ, বেশি উদ্বিগ্ন, জবাব দিল মুসা।

উদ্বেগটা কি জুনের অসুখের কারণে? না সে মুখ খুলেছে কিনা জানার জন্যে? কেশে গলা পরিষ্কার করল কিশোর। মিস্টার এক্সও হতে পারে।

এক কাজ করো না, পরামর্শ দিল রবিন। গলার স্বর তো নকল করতেই পার। কথা বলো ওর সঙ্গে। লোকটার কণ্ঠস্বর চিনে রাখো। ডাক্তার হয়ে যাও।

ঠিক বলেছ। দুই লাফে টেবিলের কাছে গিয়ে রিসিভার তুলে নিল সে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল নার্স আসছে কিনা। তারপর রিসিভার কানে ঠেকিয়ে বলল, হ্যালো, ডক্টর পাশা বলছি। হঠাৎ করেই যেন অনেক বেড়ে গেছে তার বয়েস, ভারি হয়ে গেছে কণ্ঠস্বর, কারও বাবারও বোঝার সাধ্যি নেই, তার বয়েস চল্লিশের কম।

কই, এ নাম তো শুনিনি? ওপাশ থেকে জবাব এল। মসৃণ কণ্ঠ। মাঝবয়েসী একজন মানুষ। দ্রুত কথা বলে। এ হাসপাতালে ওই নামের ডাক্তার আছে?

তাহলে আমি এলাম কোথেকে? নতুন এসেছি। আপনি জুন লারসেনের খোঁজ নিতে চাইছিলেন তো মিস্টার…

কিশোর আশা করেছে, নামটা বলবে লোকটা। বলল না। জিজ্ঞেস করল, ও কেমন আছে?

ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছাড়া এ খবর কাউকে জানানো নিষেধ। আপনি ওর কে হন?

এক মুহূর্ত দ্বিধা করে জবাব দিল লোকটা, আমি ওদের পারিবারিক বন্ধু।

ঘনিষ্ঠ?

দেখুন, এত প্রশ্ন করছেন কেন? আমি একটা সহজ কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম, জুন কেমন আছে?

হুঁশ ফিরেছে। বিপদ কেটেছে।

ও, লোকটা খুশি হয়েছে না শঙ্কিত হয়েছে বোঝা গেল না ঠিকমত। তবে উদ্বিগ্ন হয়েছে বলে মনে হলো কিশোরের। জিজ্ঞেস করল, কিছু বলতে হবে জুনকে? কি নাম বলব?

না, কিছু বলতে হবে না, ডক্টর। থ্যাঙ্ক ইউ, লাইন কেটে গেল ওপাশ থেকে।

কি বলল? কিশোরকে চুপ হয়ে যেতে দেখে জিজ্ঞেস করল মুসা।

তেমন কিছুই বলল না, আস্তে করে রিসিভারটা ডেস্কে রেখে দিল আবার কিশোর।

তরুণ একজন ডাক্তারকে নিয়ে ফিরে এল নার্স। রিসিভার কানে ঠেকিয়েই মুখ বিকৃত করে ফেলল। রেখে দিয়েছে! লোকটার মাথা খারাপ!

দুই সহকারীকে নিয়ে সরে এল কিশোর। নিচু গলায় বলল, নাহ, রহস্য একটা আছে, মানতেই হচ্ছে। কিছু একটা ঘটছে! কি, সেটাই বুঝতে পারছি না!

তার মানে কেসটা ছাড়ছ না? হেসে বলল রবিন। আরেকটু হলেই হতাশ করেছিলে আমাকে। কোন রহস্যের সমাধান না করে ছেড়ে দেবে কিশোর পাশা, ভাবাই যায় না।

ছাড়ব একবারও বলিনি। মনে হয়েছিল, কোন রহস্য নেই। এখন ভাবছি, ভয়ানক কোন বিপদ ঝুলছে জুনের মাথার ওপর। সেটা জানতে হবে যে, ভাবেই হোক। ওর কাছাকাছি থাকতে হবে আমাদের।

তবে থাকাটা সম্ভব হলো না। তিনজনেরই কিছু না কিছু কাজ আছে। বসে থাকে না ওরা কেউই। মুসা আবার গাড়ির ব্যবসা শুরু করেছে। তবে গাড়ি বেচাকেনার চেয়ে মেরামতের দিকেই নজর দিয়েছে বেশি। নিক ওকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়ে গেছে ইঞ্জিনের ব্যাপারে (গাড়ির জাদুকর দ্রষ্টব্য)। ওর পাশের বাড়ির ভদ্রলোকের করভেট গাড়িটার ইগনিশন নাকি ঠিকমত কাজ করছে না, মেরামত করে দেবে কথা দিয়েছে সে। বিনিময়ে অবশ্যই পারিশ্রমিক নেবে।

রবিনকে যেতে হবে ট্যালেন্ট এজেন্সিতে। একটা ক্লাব একটা রক ব্যান্ড চেয়ে পাঠিয়েছে। সেটা পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

আর কিশোর কথা দিয়েছে মেরিচাচীকে, পাশের বাড়ির মিসেস ব্যালানটাইনকে বাগানের ঘাস কাটায় সাহায্য করবে। মিসেস ব্যালানটাইন মেরিচাচীর বান্ধবী। কিশোর আগ্রহী হয়েছে অবশ্য অন্য কারণে। ওই মহিলারও পেটের চিরকালীন অসুখ আছে। কি কি খেলে ভাল থাকেন, বলতে পারবেন কিশোরকে।

কাজেই সেদিন আর জুনের কাছে থাকা হলো না কারোরই।

পরদিন সকালে হাসপাতালে মুসার সঙ্গে দেখা হলো কিশোরের। আগেই এসে বসে আছে মুসা। কারণ, ফারিহাকে সেদিন ছেড়ে দেয়ার কথা। আর জুনের বাবা বলেছেন, মেয়েকে এসে নিয়ে যাবেন সেদিনই।

হাসপাতাল ছাড়তে নারাজ ফারিহা। কারণ, জুনের প্রলাপ রহস্য ভেদ করার প্রবল আগ্রহ। কিন্তু থেকেও লাভ নেই। জুন তো আর থাকছে না। তাছাড়া ভাল হয়ে গেলে হাসপাতালই বা ওদেরকে রাখবে কেন?

জুনের শরীর অনেক ভাল হয়েছে। তবে স্মৃতি ফিরে আসেনি। বিছানায় বালিশ ঠেস দিয়ে বসে বাবার আসার অপেক্ষা করছে সে। বকবক করছে, বাবাকে তো চিনি। আসবে সেই জগিং স্যুট পরেই। আজ হয়তো দেখা যাবে গরিলা সেজেই এসেছে। ওরকম রোমশ পোশাকও অনেক আছে তার। ব্যান্ড পার্টি না নিয়ে এলেই বাঁচি। সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি করা স্বভাব।

দশ মিনিট পর দরজায় দেখা দিলেন লারসেন। হাই, খুকি, চিনতে পারছ আমাকে? হেসে জিজ্ঞেস করলেন। বাদামী জগিং স্যুট পরেছেন। একটা প্লাস্টিকের তীর ঢুকিয়ে রেখেছেন চুলের মধ্যে। ওই লোকটাও পাগল, মনে হলো মুসার।

বাবা, জুন বলল। না চেনার কোন কারণ নেই। মাত্র চব্বিশটা ঘণ্টা মনে করতে পারছি না আমি। বিশ বছর নয়। নিশ্চয় চিনতে পারছি তোমাকে। যা আনতে বলেছিলাম এনেছ?

হাতে করে একটা ছোট সুটকেস নিয়ে এসেছেন লারসেন। মেয়ের সামনে এনে রাখলে সেটা। খুলল জুন। নীল সিল্কের একটা পাজামা বের করে তুলে ধরে বলল, এটা কি?

কি আবার, পাজামা, হাসি হাসি গলায় বললেন লারসেন। নীল ব্লাউজটাও নিয়ে এসেছি। দেখ। এগুলো আনতেই তো বলেছিলি, নাকি?

যেটাতে বলেছিলাম সেটাতে খোঁজোনি, হেসে বলল জুন। অন্য ওয়ারড্রোব থেকে এনেছ। এই কাপড় পরে বাইরে বেরোনো যায়? তুমিই বলো?

চোখের সানগ্লাসটা ঠেলে কপালে তুলে দিলেন লারসেন। মেয়ের হাত থেকে নিলেন পাজামাটা। কেন, পরা যাবে না কেন? এ জিনিস পরে পার্টিতেও যেতে পারিস। স্বচ্ছন্দে। খারাপটা কি দেখলি?

মা বেঁচে থাকলে তোমার মাথায় হাতুড়ির বাড়ি মারত এখন। এ জিনিস পরে বাইরেই বেরোয় না মেয়েরা। আর পার্টিতে যাওয়া!

কেন, অসুবিধেটা কি? শরীর ঢাকা থাকলেই হলো, বলতে বলতে ফারিহার দিকে চোখ পড়ল লারসেনের। তুড়ি বাজিয়ে বললেন, ব্যস, মিটে গেল ঝামেলা। ওর একটা কাপড় পরে নিলে পারিস। এই মেয়ে, একশো পনেরো হবে না তোমার ওজন?

থ হয়ে গেল ফারিহা। আপনি জানলেন কি করে?

জানব না মানে? তিরিশ গজ দূর থেকেও যে-কোন মুরগী দেখলে বলে দিতে পারি ওটার ওজন। আর তুমি তো মানুষ। তোমার পোশাক জুনের লাগবেই। একই গড়ন।

বাবা, অস্বস্তি বোধ করছে জুন। চুপ করো তো। ফারিহা, কিছু মনে কোরো না। বাবার ধারণা, দুনিয়ার সবাই এক। কেউ কিছু মনে করে না, আবার বাবার দিকে ফিরল। বাবা, এটা তোমার অফিসের ইন্টারকমের বোতাম নয়, যে টিপে যা বলবে তাই হয়ে যাবে।

আমি কিছু মনে করিনি, হেসে বলল ফারিহা। নাও না। লাগলে নাও আমার একটা কাপড়। অনেক আছে স্যুটকেসে। পরে ফেরত দিয়ে দিয়ো।

আচ্ছাহ! হাঁপ ছেড়ে বাঁচল যেন জুন। তার বাবার আনা পোশাকগুলো পরে বেরোনোর কথা ভাবতেই মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিল তার। স্যুটকেসের ডালা বন্ধ করল। কিছু মেকআপও ধার দিতে হবে। পারবে? আমার আব্বাজান আমার মেকআপ বক্সটা আনতেও ভুলে গেছেন, নেমে পড়ল বিছানা থেকে। বাবাকে এসে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো গালে। তোমার তো অ্যাক্সিডেন্ট হয়নি, বাবা। তোমার অ্যামনেশিয়া হলো কি করে?

বোকার হাসি হাসলেন বাবা। আমারটা চিরকালের, জানিসই তো…তোর মা এ জন্যে কত বকাবকি করত…

জানি।

নিজের স্যুটকেসটা বয়ে জুনের এলাকায় নিয়ে এল ফারিহা। বিছানায় নামিয়ে রেখে বলল, নাও, যা ইচ্ছে বেছে নাও।

অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। বাড়ি গিয়েই ফেরত পাঠিয়ে দেব।

অত তাড়া নেই। যখন খুশি দিয়ো।

অ্যাই, শোন, জুন বলল। আমি জানি বাড়ি গিয়ে কি করবে বাবা। দুদিনের মধ্যেই একটা পার্টি দেবে। আমার হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার জন্যে উৎসব। এক কাজ করো না, তোমরাও চলে এসো। সবাইকেই দাওয়াত, তিন গোয়েন্দার কথাও বলল সে। পার্টিটা দারুণ হবে, আমি এখনই বলে দিতে পারি। তোমার কাপড়গুলো তখনই নিয়ে যেয়ো।

আচ্ছা।

খারাপ লাগল না তো? এসে নিয়ে যেতে বললাম বলে?

আরে না না, কি যে বলো। বরং খুশি হয়েছি। সত্যি।

হাসতে গিয়েও চেপে রাখল কিশোর। অতি আগ্রহটা প্রকাশ করল না। মনে মনে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠেছে যাওয়ার জন্যে। চিকেন কিং লারসেনের বাড়িতে দাওয়াত পাওয়ার সৌভাগ্য হবে, লোকটাকে আরও কাছে থেকে দেখতে পাবে, কল্পনাই করেনি কোনদিন। কিছুটা দেখেছে যদিও এই হাসপাতালে, আরও অনেক কিছু দেখা বাকি। জুনের পার্টিতে যাওয়ার চেয়ে ভাল সুযোগ আপাতত আর কিছু হতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *