০৪. মিউজিক নেস্ট থেকে দূরে

রিচার্ড হ্যারিস, মিউজিক নেস্ট থেকে দূরে মহাসড়কের শান্ত পরিবেশে ফিরে এসে বন্ধুদেরকে বলল কিশোর, মেইন স্ট্রীটের একটা অলঙ্কারের দোকানের নাম।

পথের ধারে ঘাসের ওপর সাইকেল নিয়ে এল সে, সাইকেল থেকে নামল। রবিন আর মুসাও নামল।

শোনো, মুসা প্রস্তাব দিল, এত সব ঝুট ঝামেলা না করে চলো আবার মিস, কারমাইকেলের বাড়িতে ফিরে যাই। তার সামনে খাঁচা থেকে ছেড়ে দিই টমকে। কুড়ি ডলার নিয়ে ফিরে আসব। ছাড়া পেলেই বাড়ি ফিরে যাবে টম, তার বন্ধুদের কাছে। আমাদেরও ঝামেলা শেষ।

এই আশঙ্কাই করছিল কিশোর। তবে একেবারে মন্দ বলেনি মুসা, অন্তত পাখিটার পক্ষ থেকে ভাবলে সেটা করাই ভাল। কেন খাঁচায় বন্দি রেখে কষ্ট দেয়া? ছাড়া পেলে নিজের ঝাঁকে বন্ধুদের মাঝে ফিরে যেতে পারবো।

কিন্তু এই পায়রাটাই এখন একমাত্র সূত্র রহস্যভেদী কিশোর পাশার কাছে, হাতছাড়া করতে সায় দিচ্ছে না তার মন। চমৎকার একটা রহস্য দানা বেঁধে উঠেছে, শুরুতেই দেবে সব ভণ্ডুল করে, এটা ভাবতে পারছে না।

হেডকোয়ার্টারে চালু করে দিয়ে আসা জবাব দেয়ার যন্ত্রটার কথা ভাবল কিশোর। সবুজ গাড়িওয়ালা লোকটা আগের কবুতরটাকে চুরি করে থাকলে, আর সেটা স্লেটারের জানা না থাকলে শিগগিরই ফোন করবে। দু-আঙলাকে ফেরত চাইবে। নিতে আসবে। তখন তার সামনে থাকতে চায় কিশোর। দেখতে চায়, তিন-আঙলাকে দেখে কি প্রতিক্রিয়া হয় সুেটারের। চিনতে পারে কিনা কবুতরটাকে।

এখুনি ছেড়ে না দিয়ে, বলল কিশোর, আগে রিচার্ড হ্যারিসের সঙ্গে দেখা করে নিই। যাওয়ার সময় পথেই পড়বে তার দোকান। রবিন, তুমি কি বলে?

ঠিক আছে,অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলল মুসা, তোমরা যখন চাও:হ্যালো, মিটার রিচার্ড হ্যারিস, আসিতেছি আমরা।

রকি বীচের সব চেয়ে দামী অলঙ্কারের দোকান রিচার্ড হ্যারিস-মালিকের নামে নাম। খরিদ্দার আকৃষ্ট করার জন্যে বাইরের শো-কেসে ঘুড়ি কিংবা আঙটির। মত শস্তা জিনিস নেই। আছে কুচকুচে কালো মখমলে মোড়া ধাতব স্ট্যাওে ঝোলানো মুক্তার অনেক দামী, একটা হার, আর সেটার দুপাশে বেশ কায়দা করে আটকানো হীরের দুটো ব্রৌচ। উজ্জল দিবালোকে ঝলমল করে জ্বলছে, য়েন, নীরবে ঘোষণা করছে আমাদের দেখেই অবাক হয়ে গেলেন? ভেতরে এসে দেখুন না, আরও কত কি আছে।

ভেতরে অনেকগুলো কাচের বাক্স সাজানো। ভেতরে দামী দামী সব গহনা।

বড় একটা বাক্সের ওপাশে দাঁড়ানো একজন লোক। বেঁটে গাঁট্টাগোট্টা শরীর, গায়ে কালো কোট, পরনে কড়া ইস্তিরী করা ডোরাকাটা প্যান্ট। সিঙ্কের টাই আর শক্ত মাড় দেয়া কারও মনে হচ্ছে আছে পরনে, তবে সেটা দেখা যায় না দাড়ির জন্যে। লম্বা কালো দাড়ি মুখের পুরোটাই প্রায় ঢেকে দিয়েছে, শুধু নাক আর চোখ দেখা যাচ্ছে। ঘন জঙ্গলের মাঝে খোলা জায়গার মত ঠোঁট দেখা যায়, তবে অস্পষ্ট।

বলো? তিন গোয়েন্দাকে কতে দেখে প্রশ্ন করল লোকটা।

মিস্টার রিচার্ড হ্যারিস? জানতে চাইল কিশোর।

হ্যাঁ।

কিশোর জানাল, তারা মিস কোরিন কারমাইকেলের বন্ধু। মহিলার নাম নেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল হ্যারিসের চোখ।

বলে গেল কিশোর, কারমাইকেলের কাছেই মিস্টার হ্যারিসের নাম শুনেছে ওরা। একটা বেলজিয়ান রেসিং হোমার নিয়ে এনেছে। দেখে দয়া করে যদি মিস্টার হ্যারিস জানান কবুতরটা কার (যদি অবশ্য চিনতে পারেন) তো সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকবে কিশোর, ইত্যাদি ইত্যাদি।

আরে না না, কে বলে আমি বিশারদ, বিনয়ে গলে গেল মিস্টার হ্যারিস। একবার কবুতর পোষার শখ হয়েছিল, চেষ্টা করেছিলাম। ভাল লাগেনি, ছেড়ে দিয়েছি। সে অনেক বছর আগের কথা। মুসার হাতের খাঁচার দিকে তাকাল। ওটাই নাকি?

হ্যাঁ, খাঁচাটা ওপরে তুলল মুসা, হ্যারিসকে ভালমত দেখানোর জন্যে।

মিনিটখানেক নীরবে পাখিটাকে দেখল হ্যারিস, জিজ্ঞেস করল, পেলে কোথায়? তোমাদের কাছে এল কি করে?

আমাদের বাড়িতে কে জানি ফেলে রেখে গেছে, সেটারের কথা চেপে গেল কিশোর।

কে?

জানি না, মুসা জবাব দিল। সকাল বেলা পেলাম। সে জন্যেই এসেছি আপনার কাছে। ভাবলাম, আপনি হয়তো জানেন…।

মাথা নাড়ল হ্যারিস। বেলজিয়ান রেসিং হোমার নয় এটা। মানে, হোমারই, তবে রেসার বলা চলে না। মেয়ে পাখি তো, রেস দেয় না।

কিন্তু বলতে গিয়েও কি ভেবে থেমে গেল রবিন। চুপ হয়ে গেল!

তাহলে বলতে পারছেন না এটা কার? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

না, আবার মাথা নাড়ল হ্যারিস। মনে হলো, হাসছে।

ঠোঁট পুরোপুরি দেখা যায় না তো, ঠিক বোঝা গেল না। সরি, তোমাদের সাহায্য করতে পারলাম না। মিস কারমাইকেলকে আমার সালাম জানিও।

জানাবে, বলল কিশোর। মূল্যবান সময় নষ্ট করে তাদের কথা শোনার জন্যে বার বার ধন্যবাদ দিল মিস্টার হ্যারিসকে।

দোকান থেকে বেরিয়ে এল তিন গোয়েন্দা।

ফুটপাথে তুলে রাখা সাইকেলগুলো স্ট্যাণ্ড থেকে নামাল। সাইকেলের ক্যারিয়ারে খাঁচাটা বসিয়ে বাধছে মুসা। মোড়ের ওপাশ থেকে বেরোল একটা কালো গাড়ি, ওদের পাশ দিয়ে গেল।

সাইকেলে চড়তে যাচ্ছিল মুসা আর কিশোর, থামাল রবিন ইশারা করল অলঙ্কারের দোকানের দিকে!

কি? ভুরু কোচকাল কিশোর।

ওই লোকটা, আবার দোকানের দিকে হাত তুলল রবিন, রিচার্ড হ্যারিস। হয় কবুতরের ক-ও জানে না সে, কিংবা মিছে কথা বলেছে।

কেন? মিছে বলবে কেন? মুসা বলল।

জানি না। সকালে লাইব্রেরি থেকে যে বইটা এনেছি, তাতে লেখা আছে, পুরুষ-মেয়ে নিয়ে কোন কথা নেই, ট্রেনিং পেলে সব হোমারই রেসার হতে পারে। বেশ কয়েকবার ওয়ার্ল্ড চ্যামপিয়ন হয়েছে মেয়ে কবুতর।

ঘড়ি দেখল কিশোর। ডিনারের সময় হয়ে গেছে। চলো বাড়ি যাই। খাওয়ার পর হেডকোয়ার্টারে বসে আলোচনা করব।

ঠিক বলেছ, মাথা দোলাল মুসা, আগে খাওয়া, তারপর অন্য সব। কিন্তু এই টমকে যদি রাখতেই হয়…

মেয়ে তো, হেসে বলল রবিন, টম আর হয় কি করে? টমনী রাখো।

ছেলে হোক মেয়ে হোক, নাম একবার রেখে ফেলেছি, ব্যস। টমই সই। অনেকেই ছেলের নাম রাখে মেয়েদের, মেয়ের নাম ছেলেদের। আমাদের জরজিনা বেগমের কথাই ধরো না, জিনা:শুনতে নাকি তার ভাল লাগে না, বলে জর্জ।

ঠিক আছে, বাবা টমই, যাও, হাত তুলল রবিন।

যা বলছিলাম, টমকে যদি রাখতেই হয়, নিরাপদ জায়গায় রাখতে হবে। হেডকোয়ার্টারের ভেতর বড় খাঁচাটা নিয়ে গিয়ে তাতে রাখব। আরামেও থাকবে, নিরাপদও।

রেখো, ফুটপাথ থেকে সাইকেল নামাল কিশোর।

খাওয়ার পর তাদের ব্যক্তিগত ওয়ার্কশপে চলে এল তিন গোয়েন্দা। প্রথমেই কবুতরের বড় খাঁচাটা হেডকোয়ার্টারে ঢোকানোর পালা। দুই সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকবে না। কিন্তু অসুবিধে নেই। আরও অনেক গোপন পথ আছে। মোবাইল হোমের ছাতের স্কাইলাইটের ঢাকনা সরিয়ে সে-পথে ঢোকানো যাবে।

বড় খাঁচাটা নিয়ে জঞ্জালের ওপর দিয়ে উঠে গেল মুসা। অনেক দিন একভাবে পড়ে থেকে থেকে একটার সঙ্গে আরেকটা শক্ত হয়ে আটকে গেছে আলগা জঞ্জাল, মুসার ভারে নড়লও না। কিশোর আর রবিন কবুতর সহ ছোট আঁচাটা নিয়ে দুই সুড়ঙ্গ দিয়ে ট্রেলারে ঢুকল। ছাতের ওপর থেকে স্কাইলাইটের ফোকর দিয়ে দড়িতে বেঁধে খাঁচা নামিয়ে দিল মুসা। নিজেও নেমে এল। ভেতর থেকেই আবার লাগিয়ে দিল টাকনা।

ছোট খাঁচা থেকে বড় খাঁচায় কবুতর সরানোয় ব্যস্ত হলো মুসা, রবিন তাকে সাহায্য করল। কিশোর এগোল ডেস্কের দিকে। মুখচোখ উজ্জল। ঢুকেই তাকিয়েছে আগে যন্ত্রটার দিকে। সিগন্যাল লাইট জ্বলছে। তারমানে মেসেজ টেপ করেছে যন্ত্রটা।

রিংকি, ভাবল কিশোর। ও-ই ফোন করেছিল। তাহলে সবুজ গাড়িওয়ালাই… ডেস্কে ঘুরে গিয়ে নিজের চেয়ারে বসল সে।

শোনো, শোনো, টেপটা চালু করে দিয়ে দুই সঙ্গীকে ডাকল সে।

ফিরে তাকাল মুসা আর রবিন।

সাহায্য! মহিলা কণ্ঠ। সাহায্য চাই।

প্লীজ, সাহায্য করো আমাকে কেঁদে ফেলবেন যেন মিস কারমাইকেল। খুন! এই মাত্র দেখলাম ওর লাশ… কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল কণ্ঠ। কয়েক মুহূর্ত কোপানোর পর আবার শোনা গেল, হীরা! হীরাকে পিটিয়ে মেরেছে। আরও একটা লাশ পেয়েছি। আমার সুন্দর একটা বাজ পাখি। প্লীজ, সাহায্য করো আমাকে। আমার পাখিগুলোকে খুন করছে কেউ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *