০৪. মা আমার মারা গেলেন

মা আমার মারা গেলেন

গাড়ি চালক মি. বার্কিস কোচ স্টেশনে আমাকে সম্ভাষণ জানালেন এমনভাবে, যেন আমাদের শেষ দেখার পরে পাঁচ মিনিটও যায়নি। পেগোটির কথা জিজ্ঞেস করলেন তিনি। বললাম, তার বার্কিস ইচ্ছুক বার্তাটি আমি পাঠিয়েছি।

বাগানের গেট-এ তিনি আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। প্রতি পদক্ষেপে ভয় হতে লাগল জানালায় চোখ পাকিয়ে দাঁড়ানো মি. ও মিস মার্ডস্টোনকে দেখব বলে। কিন্তু খুবই খুশি হলাম ওদেরকে ওখানে না দেখে। দরজার কাছে যেতে শুনলাম, মা গান গাইছেন বসার ঘরে। নিঃশব্দে ঢুকলাম। আগুনের ধারে বসে তিনি একটা বাচ্চাকে খাওয়াচ্ছেন। আমার নবজাত ভাই! আনন্দে আত্মহারা হলাম!

মি. ও মিস মার্ডস্টোন কোথাও গেছেন। তাই মা, পেগোটি আর আমি আগুনের ধারে একত্রে বসে খেলাম। পেগোটিকে মি, বার্কিসের বার্তাটি আবারও দিলাম। সে অ্যাথনে মুখ ঢেকে হাসল।

পোকা ঢুকেছে লোকটার মাথায়! হাসতে হাসতে বলল পেগোটি। আমাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু আমি বিয়ে ওকে বা অন্য কাউকেই করব না।

কিন্তু, পেপগাটি ডিয়ার, বললেন মা নরম সুরে, তোমার একদিন বিয়ে করা উচিত। তবে এখন আমাকে ছেড়ে যেয়ো না।

থুথুরে বুড়ি, কালা, খোড়া আর একদম অন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমি যাব না। তার পরে চলে যাব আমার ডেভির কাছে। বলব, আমাকে থাকতে দাও।

আর আমি তোমাকে রানীর মত অভ্যর্থনা জানাব, বললাম আমার প্রিয় নার্সকে।

খাওয়ার পরে আমরা বসলাম আগুনের কাছ ঘেঁষে। মা আমাকে আগের মতই বুকে জড়িয়ে রাখলেন। খুদে ভাইটি জেগে উঠল। আমি ওকে কোলে তুলে নিলাম।

বসে বসে আমরা আমাদের পরিবার ও বন্ধুদের কথা বলাবলি করলাম। পেগোটি হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল, আচ্ছা, ডেভির সেই দাদীটির কি হলো?

আন্ট বেটসিকে তাঁর সাগর-তীরের কটেজেই থাকতে দাও, বললেন মা। অবশ্য যদি না চাও যে তিনি আবার আসুন।

খোদা না করুন! বলে চেঁচিয়ে উঠল পেগোটি। তবে আমি ভাবি, ডেভির ছেলে হয়ে জন্মানোর অপরাধটা তিনি মাফ করেছেন কিনা।

আমার এক মাসের ছুটির মধ্যে একমাত্র ওই রাতটিই সুখের। কারণ পরদিনই মিস মার্ডস্টোন আমার পেগোটির সঙ্গে বসে খাওয়া এবং খুদে ভাইটিকে কোলে নেয়া বন্ধ করে দিলেন। মি. মার্ডস্টোন বললেন পেগোটির সঙ্গে না মিশতে।

বাড়িতে জীবন আমার অসহ্য হয়ে উঠল। এদিকে ছুটিও ফুরিয়ে গেল দেখতে দেখতে।

চলে যেতে আমার দুঃখ লাগেনি। তবে মা-কে যখন বাগানের গেট-এ ছেড়ে বিদায় নিলাম তখন বিষাদে ভরে গেল মনটা। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আমার দিকে চেয়ে। মনে হলো তাকে জীবনের জন্য ছেড়ে যাচ্ছি।

দুই মাস পরে আমাকে ক্লাস থেকে ডেকে সালেম হাউসের বৈঠকখানায় নিয়ে সারা অন্তর দিয়ে আমি ধন্যবাদ জানালাম আমার পুরানো নার্সকে।

শেষ হলো বেড়ানোর দিন। আমাকে ফিরতে হলো বাড়িতে যদিও ওটাকে আমি আর নিজের বাড়ি বলি না। দিনের পর দিন, সপ্তার পর সপ্তা আমি উপেক্ষিত হলাম। আমার মা নেই, পেগোটি নেই। মনেপ্রাণে চাইলাম আমাকে স্কুলে ফিরে যেতে দেয়া হোক। কিন্তু তা হবার নয়। মি. মার্ডস্টোন বললেন খরচ জোগাতে তিনি পারবেন না।

শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আমাকে লণ্ডন পাঠাবেন-কাজ করতে! মি. মার্ডস্টোন ও তার এক বন্ধুর মালগুদামে যেতে হবে আমাকে। সেখানে সপ্তায়। সাত শিলিং, অর্থাৎ ১.৬৮ ডলার বেতন পাব আমি। ওই টাকায় আমার খাওয়াপরা সবই চালাতে হবে। গুদামঘরের কাছে একটা পরিবার থাকে। সেই পরিবারে। থাকার ঘর ভাড়াটা তিনি দেবেন।

এমনি করে, দশ বছর বয়সে আমি যাত্রা করলাম লণ্ডনে কাজ করার জন্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *