০৪. ভদ্রলোকের নাম টি. আর্টলেট

ভদ্রলোকের নাম টি. আর্টলেট, কিন্তু লোকে তাকে টার্টলেট বলেই ডাকে। টার্টলেট নৃত্যকলায় পন্ডিত, রীতিমত একজন অধ্যাপক। বয়স পঁয়তাল্লিশ। এখনও বিয়ে করেননি, তবে এক বয়স্কা মহিলার সঙ্গে প্রায় বারো বছর ধরে তার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে।

সতেরো জুলাই, আঠারোশো পঁয়ত্রিশ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম, রাত ঠিক সোয়া তিনটেয়। এতদিন দৈর্ঘ্যে তিনি পাঁচ ফুট দুইঞ্চি আর প্রস্থে সোয়া দুফুট হয়েছেন। গত বছরে ছয় পাউন্ড বাড়ায় এখন তার ওজন হয়েছে একশো পাউন্ড দুই আউন্স। মাথাটা চারকোনা। চুলের রঙ ধূসর বাদামী, কপালের কাছে নেই বললেই চলে। কপালটা বেশ চওড়া। ডিম্বাকৃতি মুখ। গায়ের রঙ ফর্সা। চোখের রঙ ধূসর বাদামী। চোখ জোড়া গর্তে ঢাকা, তবে দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। নাকের তলায় গোঁফটাকে রাজকীয় না বলে উপায় নেই, চিবুকে সুন্দর দাড়ি আছে। জীবনযাত্রা নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা। আচরণে শান্তশিষ্ট। নৃত্য করেন ও নৃত্য শেখান, তাই মোটাসোটা হবার সুযোগ পাননি। ফুসফুস অত্যন্ত স্পর্শকাতর, একটুতেই বুকে ঠান্ডা লেগে যায়, তাই ধূমপান পরিহার করে চলেন। কফি ও মদ স্পর্শ করেন না। হালকা বিয়ার চলে, আর মাঝে মধ্যে চলে মেয়েলি পানীয় শ্যাম্পেন। শরীর-স্বাস্থ্য সম্পর্কে এতটা সতর্ক বলেই জন্মের পর থেকে তার জন্যে কখনও ডাক্তার ডাকতে হয়নি। হাত-পা খুব দ্রুত নড়ে, ক্ষিপ্রবেগে হাঁটেন। সোজা-সরল মানুষ, কোন ঘোরপ্যাচঁ পছন্দ করেন না। নিজের নয়, সারাটা জীবন শুধু অন্যের উপকার করার কথা ভাবছেন। স্ত্রী অসুখী হতে পারেন, শুধু এই ভয়ে এখনও বিয়ে করতে পারছেন না।

কোল্ডেরুপ প্রাসাদে নৃত্যশিক্ষক হিসেবেই তার আগমন ঘটেছিল। তার আগে যেখানে তিনি অধ্যাপনা করতেন, ছাত্র সংখ্যা কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় নেমে যায়। এখানে তিনি বেশ ভালই আছেন। কিছু কিছু বাতিক থাকলেও, মানুষ হিসেবে তিনি খুবই ভাল, সেই সঙ্গে সাহসীও বটেন। গডফ্রে আর ফিনাকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করেন, তারাও তাকে ভারি পছন্দ করে। টার্টলেটের একটাই উচ্চাশা-নাচের সমস্ত রহস্য এই দুজনকে শেখাতে হবে।

তো অধ্যাপক টার্টলেটকেই ভাগ্নের সহযাত্রী হিসেবে বেছে নিলেন কোল্ডেরুপ। তিনি আভাস পেয়েছেন, গডফ্রের এই যে বেড়াতে যাবার শখ চেপেছে, তাতে প্রথম থেকেই ইন্ধন যুগিয়েছেন টার্টলেট। কাজেই সিদ্ধান্ত নিলেন, গডফ্রে যখন যাবেই, তার সঙ্গে টার্টলেটও যান। পরদিন, মে মাসের ষোলো তারিখে, নিজের অফিসে ডেকে পাঠালেন তাঁকে।

কোল্ডেরুপের ডাকটা অনুরোধই, কিন্তু টার্টলেট সেটাকে অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করলেন। যে-কোন পরিস্থিতির জন্যে মানসিকভাবে তৈরি হলেন তিনি, তারপর পকেট-বেহালাটা নিয়ে নাচতে নাচতে প্রাসাদের সিঁড়ি বেয়ে ওপর তলায় উঠে এলেন। নক করলেন একবার, দরজা ঠেলে অফিস কামরায় ঢুকলেন–শরীরটা একদিকে কাত হয়ে আছে, কনুইসহ হাত প্রায় বৃত্ত রচনা করেছে, হাসি হাসি মুখ, গোড়ালি জোড়া শূন্যে তোলা, ফলে শরীরের সব ভার চেপেছে পায়ের পাতায়। অন্য কোন লোক এই ভঙ্গিতে দাঁড়াতে চেষ্টা করলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেত, কিন্তু টার্টলেট সটান দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন।

মি টার্টলেট, কোল্ডেরুপ বললেন, আপনাকে একটা খবর দেয়ার জন্যে ডেকেছি। খবরটা শুনে আপনি হয়তো চমকে উঠবেন।

বলুন।

এক দেড় বছরের জন্যে আমার ভাগ্নের বিয়েটা পিছিয়ে দিতে হচ্ছে। গডফ্রের ইচ্ছে হয়েছে দেশ ভ্রমণে বেরুবে।

গডফ্রে তো সোনার টুকরো ছেলে। আমি জানি, সে তার দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে…

ভূমিকার শুরুতেই টার্টলেটকে থামিয়ে দিলেন কোল্ডেরুপ। সোনার টুকরো ছেলেটা শুধু কি তার দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে? আমার তো ধারণা সে তার নাচের মাস্টারেরও মুখ উজ্জ্বল করবে।

কোল্ডেরুপের ঠাট্টা টার্টলেট ধরতে পারলেন না। স্থির একটা নৃত্যভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেটা বদলে আরেকটা ভঙ্গি নিলেন। তাঁর হাসি দেখে বোঝা গেল, কথাটাকে তিনি তার প্রশংসা বলেই ধরে নিয়েছেন।

কোল্ডেরুপই আবার মুখ খুললেন, ছাত্রের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে, আপনার মন খারাপ করবে না?

মন খারাপ? হ্যাঁ, অবশ্যই মন খারাপ করবে। তবে প্রয়োজন হলে…

কোল্ডেরুপ আবার তাকে বাধা দিলেন, আমার মতে, শিক্ষকের কাছ থেকে প্রিয় ছাত্রকে আলাদা করা এক ধরনের নিষ্ঠুরতা। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, গডফ্রের সঙ্গে তার শিক্ষকও বিশ্বভ্রমণে যাবেন। একজন শিক্ষক তার ছাত্রের মনে বেড়ানোর আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলেছেন, কাজেই তাকে সম্মানিত করা উচিত।

টাৰ্টলেট আবার নৃত্যভঙ্গিমায় একটা পরিবর্তন আনছিলেন, কোল্ডেরুপের কথায় মনোযোগ থাকায় তাতে খানিকটা ত্রুটি থেকে গেল। তবে সেটা সংশোধনের কথা তাঁর মনে থাকল না।

সানফ্রান্সিসকো তথা ক্যালিফোর্নিয়ার বাইরে পা ফেলতে হবে, এ-কথা জীবনে কখনও ভাবেননি টার্টলেট। বিশ্বভ্রমণে বেরুতে হবে তাঁকে? সাগর পাড়ি দিতে হবে? স্বভাবতই বেশ খানিকটা ঘাবড়ে গেছেন ভদ্রলোক। হ্যাঁ, কথাটা সত্যি, প্রিয় ছাত্রকে তিনি অ্যাডভেঞ্চারে যাবার জন্যে প্ররোচিত করেছেন। ব্যাপারটা বুমেরাং হয়েছে। এখন ঝুঁকি আর ঝামেলা সব তার ওপর দিয়েই যাবে। তিনি তোতলাতে শুরু করলেন, আ-আ-মি, মা-নে, আ-আ…

হ্যাঁ, গডফ্রের সঙ্গে আপনিই যাবেন, কোল্ডেরুপের গলায় রায় ঘোষণার সুর, বুঝিয়ে দিলেন এ বিষয়ে তিনি আর কোন কথা বলতে আগ্রহী নন।

প্রতিবাদ করার সাহস নেই, শাস্তি-টা মাথা পেতে নিতে হলো টাৰ্টলেটকে। কবে যাব আমরা? নাচের মুদ্রা আরেকবার পাল্টে জিজ্ঞেস করলেন।

খুব তাড়াতাড়ি, মাসখানেকের মধ্যেই।

প্রথমে কোথায় যাব?

প্রশান্ত মহাসাগর ধরে প্রথমে যাবেন নিউজিল্যান্ডে, বললেন কোল্ডেরুপ। শুনেছি ওখানে নাকি মাওরিদের কনুই অত্যন্ত শক্ত, বেরিয়ে থাকে বাইরের দিকে, তাতে নাকি অন্য লোকের পাঁজরে খোঁচা মারা খুব সহজ। ওদেরকে আপনারা কনুই ভাঁজ করে রাখার নিয়ম শেখাবেন। মাথা ঝাঁকিয়ে দরজাটা দেখিয়ে দিলেন তিনি।

নাচ ভুলে গেলেন টার্টলেট, অন্তত আপাতত। গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে এমন এক ভঙ্গিতে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন, সেটাকে কোনভাবেই নৃত্য বলা চলে না, হাঁটাই বলতে হবে।

কোল্ডেরুপের ব্যক্তিগত নৌ-বহর আছে। তারই একটা জাহাজ নিয়ে সাগর পাড়ি দেবে গডফ্রে। জাহাজটার নাম স্বপ্ন। ছয়শো টন ওজন, দুশো ঘোড়া শক্তি। শক্ত-সমর্থ, সাতঘাটের পানি খাওয়া ক্যাপটেন টারকট আপাদমস্তক নাবিক। হারিকেন, টর্নেডো, সাইক্লোন আর টাইফুন তার বন্ধু। বয়স পঞ্চাশ হলে কি হবে, চল্লিশ বছরই কেটেছে সাগরে। তিনি যাননি, এমন সাগর দুনিয়ায় একটিও নেই। ক্যাপটেন টারকট বাদে আরও আঠারোজন থাকছে জাহাজে-একজন মেট, একজন এঞ্জিনিয়ার, বয়লার রূমের কর্মী চারজন, বারোজন দক্ষ মাল্লা। ঘণ্টায় আট মাইলের বেশি স্পীড তোলার প্রয়োজন না হলে সাগর পাড়ি দেয়ার জন্যে এই জাহাজের কোন তুলনা নেই।

স্বপ্ন কোন মাল বহন করবে না। মাল-পত্র না থাকায়, জাহাজটাকে যদি কোন কারণে ডুবিয়ে দিতে হয়, কোল্ডেরুপের তেমন কোন লোকসান হবে না। ওদেরকে নিয়ে বেড়ানোর ফাঁকে স্বপ্নকে একটা দায়িত্বও পালন করতে হবে–বিভিন্ন দেশে নানারকম ব্যবসা আছে কোল্ডেরুপের, সুযোগ-সুবিধে মত সে-সব ব্যবসা তদারকি করতে হবে। ক্যাপটেন টারকটের সঙ্গে গোপন বৈঠকে বসলেন কোল্ডেরুপ বেশ কয়েকবার। সে-সব বৈঠকে কি নিয়ে আলোচনা হলো তা কেউ জানতে পারল না। সবাই শুধু জানল যে স্বপ্ন প্রথমে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে নোঙর ফেলবে। তবে কয়লার প্রয়োজন দেখা দিলে প্রশান্ত মহাসাগরের যে-কোন দ্বীপে বা কোন চীনা বন্দরে থামতে পারবে।

রওনা হবার আগে গডফ্রে আর ফিনার যুগল ফটো তোলা হলো। হাজার হোক বাগদত্ত তো! যুগল ছবি ছাড়াও দুজনের আলাদা আলাদা ছবিও তোলা হলো। ফিনার ছবি থাকবে স্বপ্নে, মানে জাহাজে। আর গডফ্রের ছবি ঝুলবে ফিনার শোবার ঘরে।

টার্টলেটেরও একটা ফটো তোলার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু তার দুর্ভাগ্যই বলতে হবে যে ছবিটা তোলার পর দেখা গেল এমন ঝাপসা হয়ে আছে যে মানুষটিকে চেনাই যাচ্ছে না। আসলে ক্যামেরাম্যান বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও মুহূর্তের জন্যেও স্থির হতে পারেননি টার্টলট, ফলে ছবিটা নড়ে গেছে। অবশ্য আরও কয়েকবার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু ফলাফল সেই একই। টার্টলেট স্থির হতে পারেন না, কাজেই তার ছবিও ঝাপসা ওঠে। শেষ পর্যন্ত গোটা পরিকল্পনাটাই বাদ দিতে হলো।

নয় জুন। সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। রওনা হবার জন্যে জাহাজের এঞ্জিন স্টার্ট দেয়া হলো। কাগজ-পত্র সব ঠিক আছে কিনা শেষবার দেখা হচ্ছে। হ্যাঁ, বীমা কোম্পানির রসিদটাও সঙ্গে রাখছে ওরা। সকালের দিকে মন্টোগোমারি স্ট্রীটের প্রাসাদে বিদায়-সম্বর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। এত উত্তেজিত বোধ করছিলেন টার্টলেট, বসতে পারেননি, সারাক্ষণ টেবিলের কিনারা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর একের পর এক শ্যাম্পেন ভর্তি গ্লাস খালি করেছেন। এটা যে তাঁর ভয় তাড়াবার চেষ্টা, তা আর কাউকে বলে দিতে হলো না। দেখা গেল পকেট-বেহালাটা সঙ্গে করে আনতে ভুলে গেছেন তিনি, বাধ্য হয়ে লোক পাঠাতে হলো তার বাড়ি থেকে সেটা আনার জন্যে।

শেষ বিদায় জানানো হলো জাহাজের ডেকে। করমর্দনের পালা চুকল জাহাজের সিঁড়িতে। আসি, ফিনা।

এসো, গডফ্রে।

কোল্ডেরুপ বললেন, ঈশ্বর তোমার সহায় হোন।

স্বপ্ন রওনা হলো। ডেক আর জেটি থেকে রুমাল নাড়া হচ্ছে। একটু পরই সানফ্রান্সিসকো উপসাগরের মুখে স্থাপিত স্বর্ণতোরণ পার হয়ে এল স্বপ্ন। সামনে খোলা প্রশান্ত মহাসাগরের সীমাহীন চঞ্চল জলরাশি আপন খেলায় মত্ত। তারপর, যেন চিরকালের জন্যে, জাহাজের পিছনে বন্ধ হয়ে গেল স্বর্ণতোরণটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *