০৪. বাতাসের গতিতে চাউর হয়ে যায় খবর

বাতাসের গতিতে চাউর হয়ে যায় খবর।

কিনো, হুয়ানা আর অন্যান্য ডুবুরিরা কিনোর খুদে কাঠের বাসাটায় এল, ততক্ষণে রাষ্ট্র হয়ে গেছে কিনো দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মুক্তোটা খুঁজে পেয়েছে। বাচ্চারা বলতে পারার আগেই তাদের মায়েরা খবর জেনে বসে আছে।

কাঠের বাড়িগুলোতে তো বটেই বড়লোকদের পাথরের বাড়িতেও ছড়িয়ে গেছে সংবাদটা। পাদ্রীর কানে কথাটা যেতেই, গির্জার মেরামতির চিস্তা ঘাই মারল তার মাথায়। মুক্তোটার মূল্য কত হতে পারে ভাবনা চলল মগজে। কিনো কখনও কয়োটিটোকে গির্জায় নিয়ে এসেছিল কিনা মনে করার চেষ্টা করলেন। আচ্ছা, কিনো আর হুয়ানার বিয়ে কি পড়িয়েছিলেন তিনি?

দোকানদারদের কানে মুক্তোর খবর পৌঁছলে, অবিক্রিত জিনিসপত্রের দিকে প্রথমেই আশান্বিত দৃষ্টি চলে গেল তাদের।

বলাবাহুল্য, ডাক্তারের কানেও খবরটা গেছে। বৃদ্ধা এক মহিলার চিকিৎসা করছিল তখন সে। মহিলার রোগ আর কিছু না, বার্ধক্যজনিত; কিন্তু ডাক্তার সে কথা ফাঁস করবে কেন? বৃদ্ধা মহিলার পকেট কাটতে হবে? কিনোর মুক্তোর কথা শুনে দীর্ঘক্ষণ ও নিয়ে মাথা ঘামাল ডাক্তার।

ওর বাচ্চার চিকিৎসা করব আমি, মনে মনে আওড়াল। বিছের কামড়ের দাওয়াই দেব।

গির্জার সামনে বসে থাকা ভিখিরিদেরও অজানা রইল না খবরটা। খুশিতে হেসে উঠল ওরা। ওদের জানা আছে, গরীব কোন লোক সহসা আঙুল ফুলে কলাগাছ হলে কাঙালিদের ভিক্ষে দেয়।

ডুবুরিদের কাছ থেকে মুক্তো কেনে ব্যবসায়ীরা। বায়ার বলা হয় এদের। শহরে খুদে খুদে অফিস নিয়ে বসে থাকে। কেউ মুক্তো নিয়ে এলে, দর কষাকষি করে খুব অল্প দামে বেচতে বাধ্য করে। মুক্তো কেনা হলে পর, একাকী বসে থাকে ব্যবসায়ীরা। আঙুলে নেড়েচেড়ে দেখে মুক্তোগুলো। কিন্তু এরা আসলে মুক্তোর মালিকানা পায় না। মস্ত বড় এক মুক্তো ব্যবসায়ী এসব ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের পয়সা দিয়ে কাজ করায়।

কিনোর মুক্তোর খবর পৌঁছে গেল এদের কানে। উদাস হয়ে গেল তারা, আহা, প্রকাণ্ড মুক্তোটার মালিক যদি হতে পারত। প্রত্যেক ছোট ব্যবসায়ীই মনে মনে সান্ত্বনা পায়, ধনী ব্যবসায়ীটি তো আর চিরদিন বেঁচে থাকবে না। লোকটা মারা গেলে কাউকে না কাউকে তার স্থান নিতে হবে। আমার টাকা থাকলে আমিই হতে পারতাম অমন বড় ব্যবসায়ী, ভাবে সবাই।

কিনোর প্রতি আগ্রহী এখন অনেকে। মুক্তো পাওয়ার খবর শুনে সবার মনেই কিছু না কিছু প্রতিক্রিয়া হয়েছে। সবার স্বপ্নে ভাগ বসিয়েছে কিনোর মুক্তো। তাদের আশা-আকাক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে মুক্তোটা।

একজন মাত্র মানুষ সবার স্বপ্নসাধ পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সে লোকটি হচ্ছে কিনো। কাজেই সে বেচারা নিজের অজান্তেই অনেকের শত্রু হয়ে গেছে।

মুক্তোর খবরটা শহরে যেন অশুভ এক ছায়া ফেলেছে। আর সেই অশুভ ছায়াটা যেন হুল তুলেছে শহরবাসীকে দংশাবে বলে। কাঁকড়াবিছের বিষে গোটা শহর এখন বিষাক্ত হওয়ার অপেক্ষায়।

কিনো আর হুয়ানা কিন্তু এসব কথা ঘুণাক্ষরেও জানে না। তারা মহা আনন্দিত, উত্তেজিত। তাদের ধারণা, আর সবাইও বুঝি তাদের মতই আনন্দে আত্মহারা। বিকেলে, পাহাড় টপকে সূর্যটা যখন টুপ করে সাগরে পড়েছে, কিনো তখন তার কাঠের বাড়িতে বসে। তার পাশে বসা হুয়ানা। বাসায় গিজগিজ করছে প্রতিবেশী। কিনোর হাতে ধরা মুক্তোটা উষ্ণ আর প্রাণবন্ত অনুভূতি ছড়াচ্ছে। পড়শীরা মুক্তোটা চেয়ে চেয়ে দেখছে। আশ মিটছে না যেন কারও। মানুষের কপাল এতখানি খোলে কিভাবে পরস্পর আলোচনা করছে তারা। কিনোর ভাই, হুয়ান টমাস, ওর একপাশে বসে।

তুই তো এখন ধনী মানুষ, কি করবি ভাবছিস? জানতে চায় সে।

মুক্তোটায় চোখ রাখল কিনো। হুয়ানা মাথা নিচু করে মুখ লুকাল শালে, প্রতিবেশীরা যাতে ওকে দেখতে না পায়।

দ্যুতি ছড়ানো মুক্তোটার দিকে চেয়ে কত অপূর্ণ স্বপ্নের কথাই বিভোর হয়ে ভাবছে কিনো। মুক্তোটার মধ্যে সে নিজের, হুয়ানার আর কয়োটিটোর ছবি দেখতে পাচ্ছে। গির্জায় গেছে ওরা। পাদ্রীর খরচ মেটাতে পারবে, ফলে এতদিনে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারছে।

আমরা গির্জায় যাব-বিয়ে করতে, বলল কিনো।

মুক্তোর মধ্যে ফুটে উঠেছে সুবেশ কিনো পরিবারের ছবি। বিয়ের কল্পনা করছে কিনো। হুয়ানার পরনে নয়া শাল আর নয়া স্কার্ট। লম্বা ঝুলের স্কার্টের নিচ দিয়ে পায়ে জুতোও দেখা যাচ্ছে হুয়ানার। কিনোর গায়ে সাদা রঙের নতুন পোশাক, আর হাতে নতুন হ্যাট। কয়োটিটোর পায়েও জুতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানী করা নীলরঙা নাবিক স্যুট আর ছোট্ট এক ক্যাপ পরেছে ওর বাচ্চা। ঝকমকে মুক্তোটার মধ্যে এ সব কিছুই পরিস্কার লক্ষ্য করছে কিনা।

নতুন কাপড় কিনব আমিরা, স্বপ্নাচ্ছন্নের মত বলল সে।

আরও কি কি কিনবে তার স্বপ্নজাল বুনতে লাগল এবার কিনো। পয়সা হয়েছে যখন, একটা রাইফেল কিনবে। রাইফেল হাতে ওই তো মুক্তোর গায়ে ছবি দেখা যাচ্ছে কিনোর। বড় সুখকর সব ছবি ফুটে উঠছে কিনোর মনের পর্দায়।

একটা রাইফেল কিনতে পারি, মৃদু সুরে বলল কিনো। মানে কিনব আরকি।

প্রতিবেশীরা, নীরবে কিনোর কথা শুনছিল, মাথা নাড়ল। পেছন দিকে বসে থাকা এক লোক নরম সুরে আওড়াল, রাইফেল। কিনো রাইফেল কিনবে।

কিনোর দিকে চাইল হুয়ানা। চোখ বিস্ফোরিত ওর। কিনোর মধ্যে কি যেন এক আশ্চর্য ক্ষমতা এসে গেছে, অনুভব করছে ও।

মুক্তোটার দিকে চেয়ে থেকে, আরেকটি স্বপ্ন দেখতে ব্যস্ত এখন কিনো। স্কুলে খুদে এক ডেস্কের পেছনে বসে আছে ওর আদরের কয়েটিটো সোনামণি। একবার পথে যেতে যেতে, স্কুলের খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে একটা ডেস্ক দেখেছিল কিনো। কয়োটিটোর গায়ে জ্যাকেট, ধবধবে সাদা কলার আর সিল্কের মোটাসোটা টাই। মস্ত বড় এক কাগজে কি সব যেন লিখছে ও। পড়শীদের দিকে তাকাল কিনে।

আমার ছেলে ইসকুলে যাবে, বলল সে, এবং নীরব হয়ে গেল প্রতিবেশীরা।

হুয়ানা বিস্মিত চোখ মেলে চাইল। কিনোর দিকে চেয়ে রয়েছে উজ্জ্বল দৃষ্টিতে। এবার চট করে কোলের বাচ্চাটার দিকে চাইল।

এ কি সত্যিই সম্ভব? ভাবল ও।

আমার ছেলে বই খুলে পড়বে, কথার খেই ধরে কিনে। আমার ছেলে লিখতে শিখবে। অঙ্কও শিখবে। ওর সাথে সাথে আমাদেরও সব শেখা হয়ে যাবে।

মুক্তোটায় চোখ রাখল আবারও কিনো। দেখতে পেল, কাঠের ছোট্ট বাসাটায় আগুনের পাশে বসে ও আর হুয়ানা, ওদিকে বিশাল এক বই খুলে বসেছে কয়েটিটো।

মুক্তাটা আমাদের সব সাধ-আহ্লাদি পূরণ করবে, বলল কিনো।

জীবনে কোনদিন একসঙ্গে এত কথা বলেনি ও, সহসা ভয় পেয়ে গেল। ভীতিবোধের ফলে মুক্তোটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরল।

কিনোর মুক্তো দেখার পর থেকে পড়শীরা উপলব্ধি করছে, তারা দর্শনীয় কিছু একটা দেখেছে। আগামী বহু বছরের গাল-গল্পের খোরাক পেয়ে গেছে সবাই। কিনোর স্বপ্ন সার্থক হলে, প্রতিবেশীরা বলতে পারবে, কিনোর চোখ কিভাবে প্রভা ছড়িয়েছিল। তারা বলাবলি করবে, কী এক অদ্ভুত ক্ষমতা কিনোর ভেতর প্রবেশ করে তাকে আশ্চর্য শক্তিশালী করে তুলেছিল।

আর যদি কিনোর স্বপ্ন ব্যর্থ হয়, তবে ভিন্ন ইতিহাস রচনা করা হবে। তখন বলা হবে, নির্বোধের পাগলামি ভর করেছিল কিনোর ওপর, আর তাই কত আগডুম বাগড়ম কথাই না বলেছিল উজবুক লোকটা।

বন্ধ মুঠোর দিকে তাকাল কিনো। ছড়ে যাওয়া জায়গাটা সাদা হয়ে আছে।

সন্ধে লেগে আসছে, ঘন হচ্ছে অন্ধকার। হুয়ানা শালে পুরে বহন করছে বাচ্চাটাকে। ও উঠে গিয়ে অাগুনে কয়েক টুকরো খড়ি জোগাল। উস্কে-ওঠা অাগুন পড়শীদের চেহারায় খেলা করে যাচ্ছে। বাসায় যাওয়ার সময় হয়েছে সবাই টের পাচ্ছে। কিন্তু ওঠার নাম করছে না কেউ। আঁধার গাঢ় হলে, আগুন যখন প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ছায়া ফেলল দেয়ালে, পরস্পরের সাথে ফিসফাস করতে শুরু করল ওরা।

পাদ্রী আসছেন। ওই যে, এসে পড়েছেন।

পুরুষরা হ্যাট খুলে সরে দাঁড়াল দোরগোড়া ছেড়ে। মহিলারা শালে মুখ ঢেকে মাথা নোয়াল। কিনো আর তার ভাই, হুয়ান টমাস সটান উঠে দাঁড়াল। ভেতরে প্রবেশ করলেন পাদ্রী। বয়স্ক লোক তিনি, চুল পাকিয়ে ফেলেছেন। চোখজোড়ায় ওঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। সবাই তার কাছে শিশুর মতন, এবং তিনি তাদের সাথে কথাও বলেন ছেলে ভুলানো ভঙ্গিতে।

কিনো, মৃদু স্বরে বললেন পাদ্রী। নামজাদা এক লোকের নামে তোমার নাম। গির্জার একজন মহান পাদ্রী ছিলেন তিনি।

পাদ্রী এরপর তাঁর কথাগুলোয় গুরুত্ব আরোপ করলেন।

মানুষকে তিনি বহু কিছু শিখিয়েছেন। তোমার জানা নেই? প্রশ্ন করলেন পাদ্রী। বইতে সবই লেখা আছে।

কয়োটিটোর মাথার দিকে চট করে দৃষ্টি চলে গেল কিনোর। একদিন ওর ছেলেও বইয়ে কি লেখা আছে সব জানবে। এ মুহূর্তে খুব একটা স্বস্তি বোধ করছে না ও। পড়শীদের উদ্দেশে চেয়ে বুঝতে চাইল, অন্যরকম অনুভূতি কেন হচ্ছে তার। পাদ্রী কথার সুতো ধরলেন।

শুনলাম তুমি নাকি মস্ত এক মুক্তো পেয়েছ।

মুঠো খুলে মুক্তোটা মেলে ধরল কিনো। ওটার আকৃতি আর সৌন্দর্য দেখে শ্বাস চাপলেন পাদ্রী।

খোদাকে, যিনি তোমাকে এটা দান করেছেন, শুকরিয়া জানাতে ভোলোনি নিশ্চয়ই, বললেন তিনি। খোদার কাছে প্রার্থনা করলে ভবিষ্যতে তিনি এমনি আরও দেবেন।

কিনো নীরবে মাথা নাড়ে, কিন্তু হুয়ানা এবার নম্র সুরে আলোচনায় যোগ দেয়।

করব, ফাদার, আর আমরা বিয়েটাও করে নেব। কিনো তাই বলেছে। হুয়ানা পড়শীদের দিকে চাইতে তারা সায় জানিয়ে মাথা নাড়ল।

তোমাদের মাথায় প্রথমেই ভাল ভাল চিন্তা এসেছে জেনে খুব খুশি হলাম, বললেন পাদ্রী। খোদা তোমাদের মঙ্গল করুন, বাছারা।

পাদ্রী ঘুরে দাঁড়ালেন, এবং লোকজন তাঁকে পথ ছেড়ে দিল। কিনোর হাত শক্ত করে চেপে ধরল মুক্তোটা। চারধারে দৃষ্টি বুলিয়ে নিল ও। আতঙ্কবোধটা ক্রমেই আবারও গ্রাস করছে ওকে।

পড়শীরা বিদায় নিলে চুলোর পাশে বসল হুয়ানা। খুদে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ওপর সেদ্ধ বিনের পাত্রটা চাপাল ও। কিনো দরজা অবধি হেঁটে গিয়ে উঁকি দিল বাইরে। প্রতিবেশীদের চুলোয় রান্না চড়েছে ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। আকাশে আজ তারার মেলা। গা হিম হয়ে এল ওর, নাক ঢেকে নিল কম্বলে।

রোগাটে কুকুরটা ওর কাছে এসে গা ঝাড়া দিল। কিনো চোখ নামাল, কিন্তু আসলে ও কুকুরটাকে দেখছে না। বড্ডো নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে ওর নিজেকে, মোটেও নিরাপদ বোধ করছে না সে। নিশাচর কীট-পতঙ্গ কী এক অশুভ তান ধরেছে মনে হলো ওর। শিউরে উঠল কিনো। কম্বলটা ভালমত টেনে দিল নাক পর্যন্ত। মুক্তোটা তখনও হাতে ধরা ওর। জিনিসটা উষ্ণ আর মসৃণ ঠেকল ওর তালুতে।

পেছনে হুয়ানার অস্তিত্ব টের পাচ্ছে কিনো। কেক বানাচ্ছে ও আগুনের কাছে বসে। কমুহূর্তের জন্যে নিরাপত্তার অনুভূতি হলো কিনোর। এরপর আবার ভয়টা জাঁকিয়ে বসল মনের মধ্যে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে সাহস পাচ্ছে না কিনো। পরিকল্পনা করা বিপজ্জনক, জানা আছে তার। বেশি বেশি পরিকল্পনা করে যে, তার কপালে খারাবি থাকে।

মুক্তো বেচে হাতে টাকা পেতে চায় কিনো। স্কুলে পাঠাতে চায় ছেলেকে। কত পরিকল্পনাই না আছে তার মাথার মধ্যে। কিন্তু সে সঙ্গে বিপদের আশঙ্কাও কি নেই? কিন্তু টাকাটা যে ওর ভীষণ দরকার। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকে, রাতের আঁধারের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল ও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *