০৪. প্রেস ম্যানেজার লেখা একটা কামরায়

প্রেস ম্যানেজার লেখা একটা কামরায় রানাকে ঠেলে দিল গার্ড। ক্যামকর্ডার হাতে দ্বিতীয় গার্ডকে দেখল রানা, ভিডিওটেপে ওর ছবি তুলছে। আরেক গার্ড, অকস্মাৎ ছুটে এসে হকিস্টিক দিয়ে বাড়ি মারল ওর পেটে। প্রচণ্ড ব্যথায় কূজো হয়ে গেল ও, প্রথম গার্ডের লাথি খেয়ে ছিটকে পড়ল মেঝেতে। ব্যথা আর অপমান বাড়িয়ে তুলল এক কোণে লুকিয়ে থাকা চতুর্থ গার্ড, সে-ও বেরিয়ে এসে ওর পাজরে লাথি কষল।

চতুর্থ গার্ড বলল, মি. ফাউলারের ধারণা আপনি ব্যাংকার নন। আর আমাদের  ধারণা, হকিস্টিক দিয়ে আচ্ছামত পেদানো হলে ঠিকই আপনি মুখ খুলবেন।

ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে দ্বিতীয় গার্ড আরও খানিক সামনে এগিয়ে এল। পরমুহুর্তে আবার হকিষ্টিক পড়ল রানার পেটে। ব্যথায় চোখে অন্ধকার দেখছে রানা, তারপরও পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টায় চারদিকে দৃষ্টি বুলাচ্ছে। কামরাটা তেমন বড় নয়। এক সেট সোফা, একটা গ্লাস ডেস্ক, একজোড়া চেয়ার, দুটো ফাইলিং কেবিনেট। চারজন লোক। পিস্তল বেরিয়েছে মাত্র একটা। হকিষ্টিকও একটা। দুই সেকেন্ডের মধ্যে ইতিকর্তব্য স্থির করে ফেলল ও।

সত্যি কথা বলবেন, আপনি কি ব্যাংকার? জিজ্ঞেস করা হলো ওকে।

পেটে এখনও আগুন জ্বলছে, চোখ-মুখ কুঁচকে রানা বলল, না, আমি অ্যাসট্রোনট।

চতুর্থ গার্ড লাথি মারার জন্যে পা ছুড়ল, তবে এবার রানা তৈরি ছিল। ওর নড়ে ওঠায় সাপের ছোবল মারার গতি। লোকটার পা তো ধরলই, সেটাকে বন্দীও করল বগলের নিচে, তারপর নিজের একটা পা ছুড়ল দ্বিতীয় গার্ডের ক্যামকর্ডার লক্ষ্য করে। ব্যথায় গুঙিয়ে উঠল লোকটা। হাত থেকে ক্যামেরাটা ফেলে দিয়ে খামচে ধরল একটা চোখ, কারণ ক্যামেরার আইপস ভেতরে ঢুকে গেছে। শূন্যে থেকে ক্যামেরাটা লুফে নিল রানা, ছুড়ে মারল প্রথম গার্ডের মুখে, হাতের পিস্তল ছেড়ে দিয়ে পড়ে গেল সে, জ্ঞান হারিয়েছে।

তৃতীয় গার্ড রানাকে খোলা টার্গেট হিসেবে পেয়ে গেল। সময়ের অপচয় না করে হকিষ্টিক চালাল সে, অস্ত্রটা সরাসরি রানার মুখে নামিয়ে আনছে। শরীরটাকে বাম দিকে গড়িয়ে দিল রানা, ফলে ওর বগলের নিচে পা আটকে আছে যে গার্ডের, হকিস্টিকের সামনে পড়ে গেল সে। নাক আর কপাল চুরমার হয়ে গেল তার, অজ্ঞান শরীরটা রানার ওপর ঢলে পড়ল।

তিন সহকর্মী অচল হয়ে পড়ায় হাতের হকিস্টিক ফেলে দিয়ে পিস্তল ধরতে গেল তৃতীয় গার্ড। কিন্তু অজ্ঞান গার্ডকে গায়ের ওপর থেকে সরিয়ে ফেলল রানা, দেখা গেল ওর হাতে ওয়ালথার পি নাইনটি নাইনটা বেরিয়ে এসেছে। স্থির হয়ে গেল লোকটা।

গুলির শব্দ হলে এত সাধের পার্টি ভেঙে যাবে। মি. ফাউলার  কি তোমাকে আদর করবেন? অবশ্য তোমার কিছু এসে যাবে না, কারণ তুমি তো মারাই যাবে।

লোকটা নড়ছে না।

তারমানে এসে যায়। সেক্ষেত্রে পিস্তলটা সোফার ওপর ছুড়ে দাও।

রানার নির্দেশ পালন করল লোকটা। পিস্তলটা ডান হাত থেকে বাম হাতে নিল রানা, খালি হাতটা লম্বা করল গার্ডের দিকে।

বসতে সাহায্য করো।

হাত বাড়াল গার্ড। তার কব্জিটা চেপে ধরল রানা। পা দিয়ে লোকটার জুতোর ওপর শক্ত হাড়ে আকস্মিক চাপ দিল, সেই সঙ্গে হ্যাচকা টান দিল হাতটায়। রানার ওপর দিয়ে উড়ে গেল লোকটা, পড়ল গ্লাস ডেস্কে, সেটা বিস্ফোরিত হলো। ধীরে ধীরে, আড়ষ্ট ভঙ্গিতে সিধে হলো রানা। প্রথম গার্ড নড়তে শুরু করেছে দেখে মাথার পাশে লাথি মারল, মেঝে থেকে তার পিস্তলটা তুলে রেখে দিল পকেটে। আবার ঝুকল ও, গার্ডের কোমরে আটকানো ওয়াকি-টকি থেকে এয়ারফোন জ্যাকটা খুলে নিল। কথাবার্তা শুনে মনে হলো রুটিন, গার্ড কাউকে সতর্ক করার সময় পায়নি।

দরজা খুলে বাইরে তাকাতে যাবে রানা, ওকে ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল লীনা। ওয়াং, হাতে একটা মাস্টার কী। কামরার মেঝেতে এতগুলো লোককে পড়ে থাকতে দেখে বিস্ফারিত হয়ে গেল তার চোখ। রানা তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার হাতে জাদুর কাঠি?

রানার হাতে ধরা পিস্তলটার দিকে একবার তাকাল লীনা, বলল, আপনার হাতেও তো মানুষ মারার লাঠি ।

ওয়াকি-টকি থেকে যান্ত্রিক আওয়াজ ভেসে এল, সিকিউরিটি! আর্জেন্ট! প্রেস ম্যানেজারের কামরায় তোমরা কে আছ, সাড়া দাও।

লীনাকে আরও একটু ভেতরে টেনে নিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল রানা। বিধ্বস্ত গ্লাস ডেস্কের আবর্জনা থেকে সিগারের একটা বাক্স তুলে নিয়ে দ্বিতীয় একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। দরজাটা খুলে সাবধানে ভেতরে ঢুকল ওরা। নিজের লাইটার জ্বেলে একটা চুরুট ধরাল রানা।

মন্দ নয়, বলল লীনা। আপনি ধোয়া গিলুন, আর আমি চিন্তা করি কিভাবে এখান থেকে পালানো যায়।

অতিথিরা যখন বেরিয়ে যাবে, তাদের সঙ্গে মিশে যাব আমরা।

কিন্তু ওদের বেরুতে আরও কয়েক ঘন্টা দেরি আছে।

আমি আপনার সঙ্গে একমত নই, বলে হাতের জ্বলন্ত চুরুটটা উঁচু করে স্মোক ডিটেকটরের সামনে ধরল রানা, অপেক্ষা করছে।

ওদিকে, এফএমজিএন নিউজরূমে, ফিতে কাটার জন্যে বিশাল এক কাচি হাতে প্রস্তুত হয়েছে ফাউলার। এই সময় ফায়ার অ্যালার্ম বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সাদা পাউডারের মেঘ খসে পড়তে শুরু করল সিলিং থেকে।

কামরায় উপস্থিত সবাই আঁতকে উঠল। আগুন! আগুন! বলে চিৎকার জুড়ে দিল অনেকে। নিউজরূমের সব কটা ক্ৰীন খালি হয়ে গেল, এক মুহুর্ত পর ফুটল শুধু প্লীজ স্ট্যান্ড বাই লেখা মেসেজটা। প্রথমে হতভম্ব হয়ে পড়েছিল ফাউলার, এই মুহুর্তে তাকে প্রচণ্ড রাগে কাপতে দেখা যাচ্ছে, মারমুখো চেহারা নিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। অ্যালার্ম বেল থামল, তার বদলে রেকর্ড করা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, অটোমেটেড ফায়ার অ্যালার্ম সিস্টেম অ্যাকটিভেট করা হয়েছে। লাল সাইন দিয়ে চিহ্নিত কাছাকাছি দরজার দিকে শান্তভাবে এগোন সবাই। আপনারা ফায়ার রিটারড্যান্ট পাউডার দেখতে পাচ্ছেন, তাতে আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। ওই পাউডার মানুষ, পোষা প্রাণী বা ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্টের কোন ক্ষতি করবে না। একই ঘোষণা জার্মান ভাষাতেও প্রচার করা হচ্ছে।

লোকজন কাছাকাছি দরজার দিকে ছুটল। ভিড়ের মধ্যে স্ত্রীকে একবার দেখতে পেল ফাউলার। মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করছে পামেলা।

বন্ধ অফিস দরজার বাইরে লোকজনের হৈ-চৈ শুনতে পাচ্ছে রানা ও লীনা। চলুন, এবার বেরিয়ে পড়ি, লীনাকে বলল রানা। দরজা খুলে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল ওরা। সিলিং থেকে এখনও পাউডার ঝরছে, রেকর্ড করা কণ্ঠ থেকে ঘোষণাটাও থামেনি। রানা লক্ষ্য করল, প্রতিটি ফ্লোরে কয়েকজন করে সিকিউরিটি গার্ড চারদিকে তীক্ষ নজর রাখছে, যেন হন্যে হয়ে খুঁজছে কাউকে। জার্মান স্যাডিস্ট, মেনাচিম, ওদেরকে জরুরী নির্দেশ দিচ্ছে বলে মনে হলো। ভিড়ের মধ্যে ওকে ওরা দেখতে না পাবারই কথা, তবে বলাও যায় না। জ্যাকেটের কলারটা তুলে ঘাড় ঢাকল ও ভান করছে চুলে যাতে পাউডার না লাগে।

লোকজনের চেহারার ওপর চোখ বুলাচ্ছে একজন গার্ড, তাকে পাশ কাটিয়ে এল ওরা। পাশ কাটাবার সময় রানার দিকে তাকাল লোকটা, সঙ্গে সঙ্গে লীনা বলে উঠল, আমার স্বামীর জন্যে এই পাউডার সাংঘাতিক অ্যালার্জিক। মি. ফাউলারকে বলবে, ওটা যেন তিনি বদলান।

মাথা ঝাকিয়ে বাকি লোকজনের দিকে মনোযোগ দিল গার্ড। দরজা পার হয়ে পেভমেন্টে বেরিয়ে এল ওরা। কমপ্লেক্সের বাইরে সিকিউরিটি গার্ডদের খুব ব্যস্ত দেখা গেল। লোকজনকে থামাতে চেষ্টা করে তারা বোঝাতে চাইছে, পার্টি এখনও শেষ হয়নি, আসলে ফলস অ্যালার্ম বেজে উঠেছিল। কিন্তু অতিথিরা এ-সব কথা কানে তুলছেন না, কাপড়চোপড় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সবাই খুব রেগে আছেন, গজর গজর করতে করতে যে-যার গাড়িতে উঠে পড়ছেন।

অতিথিদের থামাবার জন্যে ফাউলার নিজেও কমপ্লেক্সের বাইরে বেরিয়ে এল। কিন্তু কোন লাভ হলো না। মেনাচিমকে দেখা গেল তার পাশে। স্যার, লোকটাকে কোথাও আমরা পেলাম না। এখনও ভেতরে তাকে খোজা হচ্ছে।

মাথা ঝাকাল ফাউলার। এত রেগে আছে যে কথা বলতে পারছে না। চোয়ালে  হাত ঘষছে সে। এই সময় স্ত্রীকে দেখতে পেল, একদল অতিথির সঙ্গে কথা বলছে। এগিয়ে এসে পামেলার

হাত ধরল, টেনে আনল একটা পিলারের আড়ালে।

হাত ছাড়ো! আমার লাগছে! প্রতিবাদ করল পামেলা।

তুমি ঠিক জানো, মি. রানা একজন ব্যাংকার? কর্কশ সুরে জানতে চাইল ফাউলার।

হ্যা! বলল পামেলা। আগেই তো বলেছি। ছাড়ো!

স্ত্রীকে ছেড়ে দিল ফাউলার। কেন মনে হচ্ছে তুমি সত্যি কথা বলছ  না?

কনুইয়ের ওপর হাতটা ডলছে পামেলা। চোখে ঠাণ্ডা দৃষ্টি। তুমিই জানো।

চড় তুলেও নিজেকে সামলে নিল ফাউলার, লোকজনের সামনে স্ত্রীকে মারধর করাটা উচিত হবে না ভেবে।

তোমার কি হয়েছে বলো তো, ম্যাডক? জিজ্ঞেস করল পামেলা। আগেও তোমাকে বহুবার বলেছি, মেনাচিম বা আর যাদের সঙ্গে তুমি মেলামেশা করছ তারা লোক ভাল নয়। অথচ….

বড় করে শ্বাস টানল ফাউলার। ওরা আমার সাংঘাতিক বাধ্য, পামেলা। অনুগত। ভৃত্য বলতে পারো। আমি সব কিছুর ওপর বিশ্বস্ততা আর আনুগত্যকে মূল্য দিই। তোমাকে আমি কথাটা বিশেষভাবে মনে রাখতে বলছি।

আমিও তোমাকে মনে রাখতে বলব যে স্বামীকে বিপথগামী হতে দেখলে পামেলা চুপ করে থাকবে না।

স্ত্রীকে ঠাস করে চড় মারল ফাউলার। কার কি প্রতিক্রিয়া হলো দেখার জন্যে দাঁড়াল না, রানাকে খোজার জন্যে অন্য দিকে চলে গেল। অপমানিতা পামেলার চোখে পানি বেরিয়ে এল, স্বামীর গমন পথের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ভাবছে, এত অল্প সময়ের ভেতর লোকটা এভাবে বদলে গেল কিভাবে? আজকাল প্রায়ই তার গায়ে হাত তুলছে কোন কারণ ছাড়াই। রানা তখন বলল, ওর স্বামী সম্ভবত ভয়ানক কোন ক্রাইমে জড়িয়ে পড়ছে। কথাটা কতটুকু সত্যি? সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে যাদেরকে চাকরি দেয়া হয়েছে তাদের একজনকেও ভাল মানুষ বলে মনে হয়নি ওর। আর মেনাচিমকে তো বিভীষিকা বললেই হয়। আসলে কি ঘটছে? তবে যাই ঘটুক, আজ লোকজনের সামনে এই যে তাকে অপমান করা হলো, এটা সে মেনে নেবে না।

পামেলা সিদ্ধান্ত নিল, সে তার বোনের কাছে নিউ ইয়র্কে চলে যাবে। ফাউলারকে ভালবেসেই বিয়ে করেছিল সে, কিন্তু সেই ভালবাসার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই, কাজেই তার সঙ্গে ঘর করার আর কোন মানে হয় না। সে বরং আবার মডেলিং শুরু করবে।

কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে আসার পর রানাকে ফাকি দিয়ে ভিড়ের সঙ্গে মিশে গেল লীনা ওয়াং, রাস্তা পেরিয়ে দুশো গজ হাঁটল, উঠে এল একটা পার্কিং গ্যারেজের তিনতলায়। লাল একটা ফেরারির দরজা খুলল সে, সীটে বসে বোতামে চাপ দিতে একটা প্যানেল সরে গেল, ভেতরে দেখা গেল একটা কমপিউটর মনিটর ও ফ্যাক্স মেশিন। কী বোর্ডের বোতামে দ্রুত চাপ দিয়ে নামটা টাইপ করল। সে–মাসুদ রানা। সাবজেক্টের জাতীয়তা–ইউনাইটেড কিংডম। চেহারার বৈশিষ্ট্য-সুদৰ্শন। টাইপ করার সময় আপন মনে হাসছে লীনা।

ক্রীনে ফুটে উঠল একটা মাত্র শব্দ–সার্চিং।

কয়েক মুহুর্ত অপেক্ষা করতে হবে, সময়টা নষ্ট না করে কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট করার জন্যে ফ্যাক্স মেশিন চালু করল লীনা।

লীনা ওয়াং চায়না ইন্টেলিজেন্স এর একজন এজেন্ট। বিশেষ একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে বেইজিং থেকে হামবুর্গে পাঠানো হয়েছে তাকে। ব্যাপারটা শুরু হয় জেনারেল ফুয়াং চু দেশ ছেড়ে পালানোর পর। জেনারেল শুধু যে পালিয়ে গেছেন, তা নয়, সঙ্গে করে অতি গোপন ও মূল্যবান একটা ডিভাইসও নিয়ে গেছেন।

বস তাকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন ডিভাইসটা কি। ওটা একটা রেডার, এতটাই লোফ্রিকোয়েন্সী ওয়েভ প্রডিউস করে যে কোন প্লেনে ব্যবহার করা হলে সেটা অন্য কোন রেডারে ধরা পড়বে না। চীন-সোভিয়েত সীমান্তে একটা সোভিয়েত প্লেন দুর্ঘটনায় পড়ে বিধ্বস্ত হয়, রাশিয়ানদের আগে চীনা সৈন্যরা পৌছায় সেখানে, তারাই ডিভাইসটা দেখতে পেয়ে নিজেদের ঘাঁটিতে নিয়ে আসে। বেইজিঙে আনার পর জেনারেল ফুয়াং চুকে ওটা নিরাপদে রাখতে দেয়া হয়েছিল।

বস লীনাকে ডিভাইসটার গুরুত্ব ভালভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। পরীক্ষা করার পর ওটার টেকনোলজি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে, তারপর তারা নিজেরাই ওরকম রেডার তৈরি করতে পারবেন। ফলে তাঁদের সামরিক ক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে, কারণ তখন তাদেরও অনেক ভেহিকেল শত্রুপক্ষের রেডারে ধরা পড়বে না।

লীনাকে জানানো হয়, সন্দেহ করা হচ্ছে জেনারেল ফুয়াং চু ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় অনুগোপন করে আছেন। তবে না, ডিভাইসটা তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যাননি, অন্য কোনভাবে দেশের বাইরে পাচার করেছেন।

খোঁজ নিতে গিয়ে লীনা জানতে পারে রেডারটা রফতানিযোগ্য চা-এর বাক্সে ভরা হয়েছিল, বাক্সটা তোলা হয়েছিল জার্মানগামী একটা জাহাজে। তদন্তে ধরা পড়ল, হামবুর্গের ফাউলার মিডিয়া গ্রুপ নেটওঅর্ক বিল্ডিং থেকে চা-এর একটা অর্ডার এসেছিল, বাক্সটা সেখানেই ডেলিভারি দেয়া হয়েছে। এই সূত্র ধরেই লীনার হামবুর্গে আগমন।

লীনা এখন জানে, গোলযোগ থেমে গেলে এফএমজিএন বিল্ডিঙে চুপিচুপি তাকে একবার ঢুকতে হবে। তার ধারণা, লো-ইমিশন রেডার ডিভাইসটা ওই বিল্ডিঙেই কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ফাউলার আর তাঁর প্রতিষ্ঠানের যতটুকু দেখেছে সে, পুরোটাই অশুভ আর ভুয়া মনে হয়েছে তার। বসকে রিপোর্ট করার সময় কথাটা জানাতে ভুলল না।

ইতিমধ্যে কমপিউটর তার সার্চ শেষ করেছে। ভুরু কুঁচকে ক্রীনের দিকে তাকিয়ে থাকল লীনা। মাসুদ রানা সম্পর্কে কোন তথ্যই কমপিউটর দিতে পারছে না। লীনা ভাবল, সে যদি ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট হয়, তার কাভারও দুর্ভেদ্য হবার কথা। কমপিউটরকে আরও তথ্য দিতে না পারলে কাজ হবে না। ঠিক আছে, পরে চেষ্টা করা যাবে।

হামবুর্গের আটলান্টিক হোটেলে উঠেছে রানা। এখানকার একজন বাঙালী শেফ, সিলেটের লোক, ওর খুব ভক্ত। তবে এই মুহুর্তে খিদে বা খাদ্যবস্তু নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রশ্নই ওঠে না, পেটের লাল হয়ে ফুলে ওঠা মাংস আর চামড়ার ওপর বরফ চেপে ধরে ব্যথায় কাতরাচ্ছে। এমনি সময় নক হলো স্যুইটের দরজায়।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল রানা, একটা তোয়ালে কোমরে জড়ানো, আরেকটা তোয়ালে পেটের ওপর চেপে ধরা। দ্বিতীয়টার ভেতর বরফের টুকরো আছে। দ্বিতীয় তোয়ালে ফেলে দিয়ে বালিশের তলা থেকে পিস্তলটা হাতে নিল ও, সুইচের দিকে হাত বাড়িয়ে নিভিয়ে দিল আলো। সিটিংরুমে ঢুকে দরজার পাশে দাঁড়াল, কোন আওয়াজ করছে না। আবার নক হতে বলল, কাম ইন।

অন্ধকার সুইটের ভেতর ঢুকল কেউ। দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে তার ঘাড়ে পিস্তলটা চেপে ধরল রানা।

পামেলার গলা শোনা গেল, রূম সার্ভিসকে এভাবেই খাতির করো বুঝি?

আলো জ্বালল রানা। রূম সার্ভিসের একটা ট্রলি নিয়ে এসেছে পামেলা। তাতে শ্যাম্পেনের বোতল আর গ্লাস রয়েছে। এখনও পার্টির সেই ড্রেসই পরে রয়েছে পামেলা। পিস্তল পকেটে ভরে দরজাটা বন্ধ করে দিল রানা। এতক্ষণে ওর পেটের দিকে নজর পড়ল পামেলার, আঁতকে উঠল সে।

ওহ গড! চড় খাওয়া গালে হাত তুলল রানা। এখানে ব্যথাটা আরও বেশি। কিন্তু মারলে কেন? খারাপ কিছু বলেছিলাম, এত বছর পর তার প্রতিশোধ নিলে?

বললে, অপেক্ষা করো, এখুনি ফিরে আসছি–কিন্তু পাচ বছর আর এলে না।

কাধ ঝাকাল রানা। হঠাৎ ঘাড়ে একটা কাজ চাপে।

তোমার সব ভাল, শুধু মাঝে মধ্যে দু একটা মিথ্যে অজুহাত বাদে।

তোমারও সব ভাল, শুধু ম্যাগাজিনে ছবি ছাপাবার লোভটা বাদে।

সেই শখ আজ আর নেই আমার, বলল পামেলা। আমি বদলে গেছি, রানা।

দরজায় তালা লাগাল রানা। তুমি সুখী হয়েছ জানতে পারলে আমি খুশি হব।

কাউচে বসল পামেলা। বিয়ের আগেই ওকে আমি

ভালবাসি। সদর্থে অ্যামবিশাস ছিল ও, অত্যন্ত শক্ত ধাতুতে গড়া একজন কাজ পাগল মানুষ। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বদলে গেল, হয়ে উঠল একটা মনস্টার। আমি ওকে ফেরাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। তুমি কি এতটাই অসুস্থ যে শ্যাম্পেনের বোতল খুলতে পারবে না?

তুমি জানো এ-সব আমি খাই না।

তারমানে তুমি বদলাওনি।

না। ইতস্তত করছে রানা। কেন এসেছ, পামেলা?

ওকে আমি ছেড়ে এসেছি, বলল পামেলা। প্রায়ই মার খাচ্ছি, তবে লোকজনের সামনে নয়। আজ….

ফাউলারকে ত্যাগ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।

জানি। তবে আমি শুধু পরনের কাপড় আর পুরানো

পাসপোর্টটা নিয়ে এসেছি। নিউ ইয়র্কে আমার এক বোন আছে, সে-ই নিজের টাকা দিয়ে প্লেনের টিকেট কেটে এয়ারপোর্টে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কাল বিকেলের ফ্লাইটে চলে যাচ্ছি আমি। ততক্ষণ তোমার এখানে যদি লুকিয়ে থাকতে চাই….

ঝুঁকি আছে, তবে তোমাকে আমি ফিরিয়ে দিতে পারি না,  বলল রানা। তোমার পিছু নিয়ে কেউ আসেনি তো?

না, আমি খুব সাবধানে এসেছি। কি যেন চিন্তা করল পামেলা। কথা দিচ্ছি, আমি তোমাকে কোনভাবে বিব্রত করব না। এমনকি, পুরানো সম্পর্কের কথাটাও মনে করিয়ে দেব না।

হ্যাঁ, অতীত ভুলে থাকাই ভাল।

এখন তাহলে তুমি ব্যাংকার? হেসে উঠল পামেলা। বলো দেখি, এখনও কি বালিশের তলায় পিস্তল রেখে ঘুমাও?

অভ্যাস।

বোতলটা খুলে একটা গ্লাসে শ্যাম্পেন ঢালল পামেলা। চুমুক দিয়ে বলল, আমাকে বলবে, এখানে তুমি কি করছ? ফাউলারই বা কি করছে? তুমি একটা ক্ৰাইমের কথা বলেছ। আসলে কি ঘটছে বলো তো?

তোমার স্বামী হয়তো বিপদের মধ্যে আছে।

স্যাটেলাইট সম্রাটের বিপদ? না, রানা, তুমি যদি ওর পিছনে লেগে থাকো, বুঝতে হবে তুমিই বিপদের মধ্যে আছ।

আমার কাজই বিপদের মধ্যে থাকা, বলল রানা। তবে, কি জানো, ক্রাইমটা ফাউলার করছে, নাকি তার অর্গানাইজেশনের অন্য কেউ, আমি সঠিকভাবে জানি না।

তারমানে কি তুমি আমার কাছ থেকে তথ্য চাও?

না। আমার প্ল্যানে তুমি নেই।

পামেলা জানে, রানা মিথ্যে কথা বলছে। শোনো, মি.

ব্যাংকার.., ঝুকে রানার কপালে হালকা একটা চুমো খেলো সে, …ভাল না বাসলেও, সে আমার স্বামী, আমি তার সঙ্গে বেঈমানী করতে পারব না।

নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দূরে সরে এল রানা। ঠিক আছে, বুঝতে পারছি। তুমি বেডরুমে থাকো, আমি সিটিংক্ৰমে, কেমন? কাল আমি তোমাকে এয়ারপোর্টে দিয়ে আসব।

রাতটা আমরা গল্প করে কাটাতে পারি না? জিজ্ঞেস করল পামেলা, স্নান হয়ে গেল চেহারা। অন্তত যে কথাটা বলি বলি করেও বলা হয়নি, সেই কথাটা আজ আমাকে বলার সুযোগ দেবে না?

কি কথা? অবাক হয়ে জানতে চাইল রানা।

তুমি ছিলে আমার জীবনের একমাত্র পুরুষ যে জানত একটা মেয়েকে কিভাবে ছুতে হয়, কিভাবে ভালবাসতে হয়, কিভাবে তার যত্ন নিতে হয়। তুমি ছিলে আমার জীবনে একমাত্র সত্যিকার পুরুষ।

কিন্তু পামেলা সে-সব কথা মনে রেখে কেন শুধু শুধু নিজেকে…

না, রানা, নিজেকে আমি কষ্ট দিতে চাইছি না, মাথা নেড়ে বলল পামেলা। আমি শুধু তোমার আমার সম্পর্কটা রোমন্থন করতে চাইছি। তাতে যদি একটা রাত সুখী হতে পারি আমি, তুমি নিষ্ঠুরের মত বাধা দিতে চাইছ কেন?

হেসে ফেলল রানা। তুমি আগের মতই রোমান্টিক আর ছেলেমানুষ রয়ে গেছ, পামেলা।

হ্যাঁ, সেদিক থেকে আমি বদলাইনি, স্বীকার করল পামেলা। বোধহয় সেজন্যেই আমার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলে তুমি, তাই না?

এফএমজিএন কমপ্লেক্সের পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ শান্ত। ফায়ার ডিপার্টমেন্ট চেক করার পর রিপোর্ট দিয়েছে কোথাও আগুন লাগেনি, ব্যাপারটা ফলস অ্যালার্মই ছিল। অতিথিরা সবাই চলে গেছেন। বেশিরভাগ খাবার আর শ্যাম্পেনে হাতই দেয়া হয়নি। কমপ্লেক্সের ভেতর প্রতিটি ইঞ্চি সাদা পাউডারে ঢাকা। ওপরের অন্ধকার নিউজরুমে, সামনে কনসোল নিয়ে গম্ভীর মুখে বসে আছে ম্যাডক ফাউলার। পার্টি চলার সময় অতিথিদের দিকে তাক করা একটা ক্যামেরার টেপ–মনিটরে দেখানো হচ্ছে এখন। পামেলা আর রানাকে দেখতে পেয়ে বোতামে চাপ দিল ফাউলার, ছবিটা ফ্রিজ হয়ে গেল স্ক্রীনে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, তার স্ত্রী পামেলা রানার কানে ফিসফিস করছিল। ব্যাপারটা কি? গোপন কোন সম্পর্ক?

ফাউলার হঠাৎ সচেতন হয়ে উঠল। দাতে দাত ঘষছে। রাগের সঙ্গে দেরাজ খুলে একটা শিশি বের করল, পানি ছাড়াই একজোড়া ট্যাবলেট খেলো। কামরার আরেক প্রান্তে ফোনে কথা বলছে মেনাচিম। কথা শেষ হতে ফাউলারের কাছে চলে এল সে। বলল, খারাপ খবর, স্যার।

বলো।

মাসুদ রানা বাংলাদেশী। কিন্তু সঙ্গে ব্রিটিশ পাসপোর্টও রাখে। শোনা যাচ্ছে ব্রিটিশ ফরেন অফিসের সঙ্গে কি রকম একটা সম্পর্ক আছে।

পরিষ্কার কথা স্পাই । আর কি?

শুনতে আপনার ভাল লাগবে না, স্যার।

আমার স্ত্রী চলে গেছেন।

মেনাচিম অবাক। বস তাহলে জানেন? তবে, এ-ও ঠিক, বস সব সময় তার চেয়ে এক পা এগিয়ে থাকেন। আরে, সেজন্যেই তো উনি বস।

পামেলা আমাকে মিথ্যে কথা বলছে। আমার সঙ্গে বেঈমানী করেছে। ও দায়ী আঙুল তুলে মনিটরের রানাকে দেখাল ফাউলার। আমাদের লোকজনকে বেরিয়ে পড়তে বলো। শহরের ভবঘুরে আর হোটেল ক্লার্কদের ঘুষ দিক–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই মাসুদ রানাকে আমার সামনে হাজির করো। আমি যদি ওর পিঠের ছাল না তুলি! আর পামেলাকে…

চিন্তা করবেন না, স্যার। তাঁকেও

আমরা খুঁজে বার করব

আমরা প্রথমে রানাকে ধরব। তাকে পেলে পামেলাকেও পাব।

স্যার, পাবার পর কি আমাকে…

না। কঠিন হয়ে উঠল ফাউলারের চেহারা। ভুলে যেয়ো না ও আমার স্ত্রী। এক মুহূর্ত চিন্তা করল। যাও, ডাক্তারকে খবর দাও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *